সালমান রুশদী বিতর্ক

Salmon_Rushdie_36844c

সালমান রুশদী বিতর্ক: গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বনাম মৌলবাদ ও সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত

(১৯৮৯)

বৃটেন প্রবাসী লেখক সালমান রুশদী ও তার সর্বশেষ উপন্যাস “স্যাটানিক ভার্সেস” সম্প্রতি সারা দুনিয়া জুড়ে এক বড় ধরনের আলোচনা ও বিতর্কের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। উপন্যাসটি প্রকাশের পর কিছুদিনের মধ্যেই তৃতীয় বিশ্বের প্রতিক্রিয়াশীল রাষ্ট্রগুলোর কয়েকটি উপন্যাসটিকে নিজ নিজ দেশে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এবং একই সাথে ইসলামী মৌলবাদীদের নেতৃত্বে বিভিন্ন দেশে উপন্যাসটি ও তার লেখকের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ, নিন্দা, আন্দোলন গড়ে তোলা হয় ও তার চেষ্টা চলতে থাকে। অন্যদিকে লেখকের অধিকার এবং ধর্ম  প্রশ্নে নিজ মত, ভিন্নমত প্রদানের অধিকারকে তুলে ধরে রুশদীর পক্ষেও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বহু প্রখ্যাত লেখক, বুদ্ধিজীবী, রাজনৈতিক দল, ব্যক্তি, গোষ্ঠী বক্তব্য বিবৃতি প্রকাশ করেন। কিন্তু এই আালোচনা-বিতর্ক ও আন্দোলন মৌলিক মোড় নেয় দু’টো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনায়। প্রথমত কিছুদিন আগে ধর্মীয় মৌলবাদী ইরানের ফ্যাসিষ্ট খোমেনী সরকার স্যাটানিক ভার্সেস-এর সাথে জড়িত সকল ব্যক্তিদের- তার লেখক ও প্রকাশকসহ- মৃত্যদণ্ড ঘোষণা করে, এবং এ মৃত্যুদণ্ড বাস্তবায়নের জন্য বড় দরের পুরস্কার ঘোষণা করে। অন্যদিকে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ, বিশেষত বৃটেন ও আমেরিকা এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে ইরান সরকারের “বর্বর” ঘোষণাকে নিন্দা করে এবং নিজেদেরকে গণতান্ত্রিক অধিকারের রক্ষাকর্তা হিসেবে জাহির করে উচ্চকন্ঠে বোলচাল শুরু করে। এই দু’টো ঘটনা এখন বিতর্কিত ইস্যুটিকে জটিল করে তুলেছে এবং স্পষ্টতঃই বোঝা যাচ্ছে, বিশ্ব রাজনীতির জটিলতা এখন কি পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং কি ভাবে একটি ইস্যুতে রাজনীতির সকল গুরুত্বপূর্ণ পক্ষই হস্তক্ষেপ করে নিজ স্বার্থের বলয়ে তাকে নিয়ে আসার চেষ্টা করছে। এটা আরো প্রমাণিত হয় তখন, যখন বর্বর ফ্যাসিবাদী ইসরাইল “গণতান্ত্রিক অধিকার”-এর কথা ঘোষণা করছে, রুশদীর পক্ষ নেয়ার ভাব দেখাচ্ছে, পাল্টা খোমেনীর মৃত্যদণ্ড ঘোষণা করছে এবং ফিলিস্তিনী জনগণ তথা মধ্যপ্রাচ্যের মুসলমান জনগণের বিরুদ্ধে তাদের ফ্যাসিষ্ট আক্রমণÑ সন্ত্রাস ও অপতৎপরতাকে উস্কিয়ে তোলার একটি অজুহাত ও অছিলা হিসেবে একে ব্যবহার করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে।

এ অবস্থায় সত্যিকার বিপ্লবীÑ যারা গণতন্ত্র চান এবং যারা সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী, মধ্যযুগীয় ধর্মীয় স্বৈরাচার বিরোধী, যে কোন রূপের ফ্যাসিবাদ বিরোধী তাদের সঠিক অবস্থান গ্রহণটা অত্যন্ত সতর্কতা ও সুবিবেচনা দাবি করে এবং এই ইস্যুতে তাদের তৎপর হওয়াটা অত্যন্ত জরুরী হয়ে পড়ে।

আমাদের দেশেও রুশদী প্রসঙ্গটি সম্প্রতি জোরদার করে তোলা হয়েছে। এ প্রশ্নে বিভিন্ন পক্ষীয় মতগুলো আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ব্লক ও গোষ্ঠীর প্রচারণাকেই যে অনুসরণ করছে, তাতে সন্দেহ নেই। বিভিন্ন গোষ্ঠীর ধর্মীয় মৌলবাদীরা কোমর বেঁধে মাঠে নেমে পড়েছে। ইতিমধ্যে তারা একটা হরতালও করে ফেলেছে- সাম্রাজ্যবাদের দালাল বুর্জোয়া প্রচারযন্ত্র ইত্তেফাক, ইনকিলাব, সংগ্রাম-এর সক্রিয় সহযোগিতা বলে। আগামীর মত মৌলবাদ বিরোধী দাবিদার বহুল প্রচারিত সাপ্তাহিক রুশদীকে ইহুদী-ইসরায়েলী এজেন্ট বানিয়ে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ দিয়েছে, অন্যদিকে ইসলামপন্থী মৌলবাদী গ্র“পের একাংশ তাদের পোষ্টারে রুশদীকে খৃষ্টধর্মী হিসেবে চিহ্নিত করে মুসলমান জনগণের সেন্টিমেন্টকে কাজে লাগাতে চেষ্টা করছে। ইত্তেফাকের সৌদি দালাল শয়তান লুব্ধক, যার নাকি মূল ব্যবসাই হচ্ছে সমাজতন্ত্র, কমিউনিজম ও মার্কসবাদের কুৎসা গাওয়া ও মধ্যযুগীয় ধর্মীয় অন্ধত্বের গুণগান গাওয়া, রুশদীকে বিকৃতভাবে বাঙালী-বিদ্বেষী হিসেবে দেখিয়ে জাতীয়তাবাদীদের- কেও রুশদীর বিরুদ্ধে উস্কিয়ে তুলতে চাচ্ছে, এবং ঘৃণ্য মিথ্যা প্রচারণা শুরু করেছে। অন্যদিকে জাতীয়তাবাদী ও প্রগতিশীল দাবিদার অনেক গোষ্ঠীই (‘সমাজতন্ত্রী’ আওয়ামী লীগ, বাকশাল, ‘মার্কসবাদী’ জাসদসহ) রুশদীকে “ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার” জন্য নিন্দা করে ধর্মীয় মৌলবাদীদের সুরেই সুর মিলিয়েছে- যদিও তারা এই ইস্যুতে মৌলবাদীদের অপতৎপরতা বৃদ্ধিতে গোষ্ঠীগত স্বার্থে অস্বস্তিও বোধ করছে। প্রগতিশীল দাবিদার অসংখ্য দল-গোষ্ঠী, লেখক, বুদ্ধিজীবী, সাংস্কৃতিক কর্মী, সাংবাদিক, শিক্ষক, গবেষক, আন্দোলক প্রভৃতি নীরব ভূমিকা গ্রহণ করে মৌলবাদী ও সাম্রাজ্যবাদের দালালদের জন্য মাঠ খালি করে দিয়েছে। এভাবেই প্রত্যেকেই কোন না কোনভাবে মধ্যযুগীয় মূল্যবোধ এবং প্রগতি ও গণতন্ত্রবিরোধী চিন্তাচেতনার প্রচার ও প্রসারেই সহায়তা করে চলেছে।

রুশদী ও স্যাটানিক ভার্সেস-এর প্রকৃত পরিচিতি ও চরিত্রটা কী এবং কীভাবেই-বা তাকে মূল্যায়ন করা হবে ? এ সম্পর্কে এখন শত মাথা কুটেও জনগণের জানার অবস্থা নেই। কারণ বইটি এখন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সাধারণ জনগণ দূরের কথা, যারা এগুলোর প্রতিবাদে মাঠ গরম করে ফেলেছে তাদের মাঝেও শতকরা একজনও সত্যিকারে জানেন কিনা-যে ঐ উপন্যাসটিতে কি বলা হয়েছে- তাতে ঘোরতর সন্দেহ পোষণ করা যুক্তিহীন হবে না। (পত্রিকান্তরে প্রকাশ, একজন বিক্ষোভকারী বলেছে রুশদী নাকি পুরান ঢাকায় থাকেন।) বইটি এদেশে কেউ পড়েছে বলে জানা যায়নি। তাই আমাদের পক্ষে সার্বিক কোন মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। সম্ভব নয় রুশদী ও স্যাটানিক ভার্সেসকে সামগ্রিকভাবে পর্যালোচনা করা।

তবে বিতর্ক-আলোচনার মধ্য দিয়ে যতটুকু তথ্য ফাঁক গলিয়ে বেরিয়ে এসেছে তা থেকে ধারণা করা যায় যে রুশদী অন্য কোন নির্দিষ্ট ধর্মের অবস্থান থেকে ইসলামকে দেখেননি, বরং তার অবস্থানটা রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে হচ্ছে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী। ভারতের এক মুসলিম পরিবারে জন্ম হলেও তিনি ভারতে থাকেননি, তরুণ বয়সে কিছুদিন পাকিস্তানে কাটিয়ে পরে ইংল্যান্ডে চলে যান। তার উপন্যাসগুলো মূলত ইংল্যান্ড প্রবাসী পাক-ভারতবর্ষীয় জনগণের জীবনযাত্রার উপর ভিত্তি করেই রচিত। এবং তিনি কঠোরভাবে বৃটেন সরকারের বর্ণবাদী নীতিরও বিরোধী (যে নীতিতে বৃটেন সরকার ও উগ্র বর্ণবাদীরা বৃটেন প্রবাসী উপমহাদেশীয় জনগণকে অহরহই অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক-সামাজিক নিপীড়ন করছে)। ব্যক্তি জীবনে রুশদী নাস্তিক এবং ইহুদী পরিবার উদ্ভূত এক উপন্যাসিককে তিনি বিয়ে করেন।

স্যাটানিক ভার্সেস হচ্ছে একটি উপন্যাস- যাতে ইসলাম ধর্ম ও তার প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদের জীবন সম্পর্কে রুশদীর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সমালোচনাধর্মী কিছু মূল্যায়ন প্রকাশ পেতে পারে বা পেয়েছে। কিন্তু রুশদী ইহুদী বা খৃষ্টান ধর্মীয় অবস্থান থেকে এমনটা করেছেন তা কোথাও জানা যায়নি। পশ্চিমা যে সাম্রাজ্যবাদীরা বা প্রতিক্রিয়াশীলরা প্রধানত খৃষ্টান বা ইহুদী ধর্মকে ভর করে গত শতাব্দীগুলোতে ও এই শতাব্দীতে তৃতীয় বিশ্বের ব্যাপক মুসলিম জনগণের উপর নির্যাতন চালিয়েছে তারা এই জনগণের ইসলাম ধর্মীয় অনুভূতিকেও অন্যায়ভাবে পদদলিত করেছে। তারা রুশদীর ইস্যুটাকে (তার ইসলাম বিরোধিতার কারণে) তাদের এই প্রতিক্রিয়াশীল উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার প্রচেষ্টা নিতে পারে। পৃথিবীটা আজ এমন জটিলই বটে। কিন্তু তাই বলে রুশদী খৃষ্টান বা ইংরেজ ইহুদী ইসরায়েলের দালাল, তাদের টাকা খেয়ে এ বই লিখেছেনÑ এমন কুযুক্তি দিতে পারে শুধুমাত্র ধর্মান্ধ মৌলবাদীরা, সচেতন ধর্মব্যবসায়ীরা অথবা এদের ক্রীড়নক বনে যাওয়া নিরেট মূর্খরাই।

তবুও রুশদী বিতর্কে পুংখানুপুংখ বক্তব্য রাখতে হলে উপন্যাসটিই জনগণের আগে জানা দরকার ছিল। অথবা এর উপর বিতর্ক-আলোচনার সুযোগ থাকার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থায় ও মৌলবাদীদের ‘গণতন্ত্রে’ সেই অধিকার জনগণের নেই। ধর্মব্যবসায়ী ফ্যাসিষ্ট সরকারগুলোও (তা সে ভারতের মত তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ হোক বা এরশাদ সরকারের মত ‘রাষ্ট্রধর্ম’ ওয়ালাই হোক- সৌদি আরব, ইরানের কথা-তো না বললেই চলে) সে অধিকার ও সুযোগ জনগণকে দেবে না। তাদের ভাবটা হচ্ছে জনগণকে অন্ধকারে থেকেই এই মধ্যযুগীয় মোল্লাদের কথামত চলতে হবে এবং মানুষকে খুন করতে হবে। কিন্তু এরপরও বিপ্লবীদের, প্রগতিশীলদের ও জনগণের একটি পক্ষ ও একটি অবস্থান নেয়ার প্রশ্ন থাকে এবং তা অপরিহার্য। স্যাটানিক ভার্সেস উপন্যাসে রুশদী কীভাবে কি বক্তব্য এনেছেন তা পরিস্কার না হলেও এটা বোঝা যায় যে তিনি ইসলাম ধর্ম থেকে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি সেখানে প্রকাশ করেছেন। কিন্তু দেখা যাচ্ছে এ কারণে মৌলবাদীরা তাকে হত্যা করার জন্য ভাড়াটিয়া খুনী লেলিয়ে দিয়েছে। পশ্চিমা বুর্জোয়া পুস্তক বিক্রেতা-প্রকাশকরা অনেকেই রুশদীকে বর্জন করেছে। তৃতীয় বিশ্বের অনেকগুলো রাষ্ট্র বইটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। এগুলো কি গণতান্ত্রিক অনুশীলন ? মোটেই তা নয়। ধর্ম প্রশ্নে গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে পৃথক করা এবং ধর্ম প্রশ্নে যে কোন মত পোষণ করা ও তা প্রচার করার অধিকার নিশ্চিত করা। যদিও পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীরা, মৌলবাদীরা ও তাদের দালালরা নাস্তিকতার দায় শুধু কমিউনিস্ট- দের উপর চাপিয়ে আজ বিশ্ব জুড়ে মধ্যযুগীয় ধর্মীয় মূল্যবোধকে রাষ্ট্রীয় তরফ থেকে জোরালো করে চলেছে, কিন্তু ধর্ম প্রশ্নে উপরোক্ত কর্মসূচী কমিউনিস্টরাই প্রথম আনেননি। এগুলো ছিল বুর্জোয়াদেরই গণতান্ত্রিক কর্মসূচি। যখন ইউরোপে বুর্জোয়া বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল তখন তারাই মধ্যযুগীয় স্বৈরাচারী ধ্যান-ধারণা ও অন্ধকারকে বিতাড়িত করার জন্য উপরোক্ত কর্মসূচি গ্রহণ করেছিল।

কিন্তু এই শতাব্দীতে ঐ বুর্জোয়ারাই সাম্রাজ্যবাদে পরিণত হয়েছে এবং সারা বিশ্ব জুড়ে সকল প্রগতিশীলতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। সকল প্রগতিচিন্তা, আধুনিকতা, গণতন্ত্র ও বিপ্লবের বিরুদ্ধে মধ্যযুগীয় মূল্যবোধকেই সাম্রাজ্যবাদ আজ বিশ্বজুড়ে প্রতিষ্ঠিত করছে ও তাকে মদদ দিচ্ছে। এ কারণেই আজ সারা বিশ্বে বিভিন্ন গোষ্ঠীর ধর্মীয় মৌলবাদীরা এত শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। সুতরাং আজ ধর্মীয় মৌলবাদ প্রধানত সাম্রাজ্যবাদেরই মদদে, প্রশ্রয়ে, তারই চক্রান্ত ছাড়া আর কিছু নয়। তাই মৌলবাদ বিরোধিতা ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা আজ প্রধানত একাকার হয়ে গেছে। অবশ্য কোন কোন ক্ষেত্রে জনগণ সাম্রাজ্যবাদ বা ক্ষমতাসীন প্রতিক্রিয়াকে বিরোধিতার জন্য বিপরীত-ধর্মীয় মৌলবাদকে আশ্রয় করেছেন- সঠিক মতাদর্শের অভাবে। কিন্তু সেটাও আজ হোক কাল হোক, সাম্রাজ্যবাদের খপ্পরেই পড়েছে ও পড়বে। আদর্শগতভাবে ধর্মীয় মৌলবাদকে সংগ্রাম করা সর্বদাই অপরিহার্য।

আজ রুশদী বিতর্কে ধর্মীয় মৌলবাদীদের একাংশ খৃষ্টান বা ইহুদী বিরোধিতার মধ্য দিয়ে বাহ্যত পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীদের কিছু কিছু বিরোধিতা দেখালেও তা সামগ্রিকভাবে সাম্রাজ্যবাদেরই অনুমোদিত এবং সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্তকেই তা পরিপুষ্ট করছে। সাম্রাজ্যবাদ আজ ভাবগত ক্ষেত্রে চায়-ই জনগণের গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল মূল্যবোধ ভূলুণ্ঠিত হয়ে মধ্যযুগীয় প্রতিক্রিয়াশীল মূল্যবোধ জনগণের মাঝে জেঁকে বসুক।

কিন্তু রুশদী বিতর্কে ধর্মীয় মৌলবাদকে বিরোধিতা করা তখনই সার্থক যখন ধর্ম প্রশ্নে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিটাকে উর্ধ্বে তুলে ধরা হবে। ধর্মীয় প্রশ্নে বহু বিভিন্ন মতবাদ পৃথিবীতে রয়েছে। এমনকি একই ধর্মের অন্তর্ভূক্ত বহু মতবাদ পরস্পরকে বৈরভাবে সংগ্রাম করছে ও করেছে- এমন দৃষ্টান্তও বহু রয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই একটি মতবাদ অন্যটাকে কমপক্ষে অনুভূতিগত আঘাত না করেই পারে না। ইসলাম ধর্ম পৌত্তলিকতাকে বিরোধিতা করে মূর্তি ভেঙ্গে ফেলাকে ধর্ম মনে করে; অন্যদিকে মূর্তিপূজা হিন্দু বা অন্য অনেকের কাছেই পবিত্র ধর্ম। ইহুদী ও খৃষ্টান ধর্মের বিরোধিতা করেই ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। উপমহাদেশে মধ্যযুগে বৌদ্ধ ও হিন্দু ধর্ম এবং আধুনিক ইতিহাসে ব্রাহ্ম ও হিন্দুদের পারস্পরিক বিরোধিতা অনেকেই জানেন। অন্যদিকে নাস্তিক্যবাদ সব ধর্মকেই বিরোধিতা করে। সুতরাং ধর্ম-প্রশ্নে একটি মতবাদ অন্যটিকে বিরোধিতা না করেই পারে না, এবং এতে অন্য মতবাদ অনুসারীরা অনুভূতিগত আঘাত না পেয়েই পারে না। (অবশ্য সমাজ-বিপ্লবীরা এ প্রশ্নে কীভাবে ভুল মতবাদগুলোকে সংগ্রাম করবেন সেটা ভিন্ন ব্যাপার। এক্ষেত্রে মার্কসবাদীরা অমার্কসীয়দের মত করে সংগ্রাম করেন না।) কিন্তু আজ যদি একটি ধর্মকে বিরোধিতা করলে বা তার আরাধ্য মানুষ নবী, অবতার ও বিষয়কে বিরোধিতা করলেই তাকে মেরে ফেলার নিয়ম আসে, তাহলে সেটা মধ্যযুগেই আমাদেরকে নিয়ে যাবে। মধ্যযুগ ছিল এ ধরনের ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর মাঝে হানাহানি, খুনোখুনিরই যুগ; তা ছিল ধর্মান্ধতার যুগ। খৃষ্টান ও মুসলমানদের মধ্যে শতবর্ষব্যাপী ধর্মযুদ্ধে লক্ষ লক্ষ লোক জীবন দিয়েছে। পৌত্তলিকরা সারা বিশ্বে অসংখ্য নিরাকারবাদীদের হত্যা করেছে। আমাদের দেশে বৌদ্ধ ও হিন্দু ধর্মের হানাহানি একদা এদেশের মাঠ-ঘাট-নদী-নালা রক্তে রঞ্জিত করে ফেলেছিল। সে যুগের শেষ দিকে নব উদ্ভূত বৈজ্ঞানিক চেতনাকে ধর্মান্ধ ক্ষমতাসীনরা বর্বরভাবে দমন করেছে। খৃষ্টধর্মের বিরোধী বলে দার্শনিক ব্রুনোকে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল। বৈজ্ঞানিক গ্যালিলিওকে একই কারণে বন্দী করে রাখা হয়েছিল। ঠিক সেই যুগটাই কি মৌলবাদীরা আমদানী করতে চাচ্ছে না? এটা মধ্যযুগীয় ফ্যাসিবাদী বর্বর দৃষ্টিভঙ্গি ছাড়া আর কী? আধুনিক যুগের বিকাশই পৃথিবীতে হয়েছে এই বর্বরতাকে সংগ্রাম করে, তাকে বিরোধিতা করে। মৌলবাদীরা কি আবার পুরনো যুগেই ফিরে যেতে চাচ্ছে না? আমাদের দেশে এখন কসাই খোমেনীর মত শুধু রুশদীকে হত্যা করার প্রচারণাই যে করা হচ্ছে তাই নয়, বরং “বাংলাদেশের রুশদী”দের হত্যার স্লোগানও তোলা হচ্ছে। এই প্রতিক্রিয়াশীল জোয়ার এমন শক্তিশালী হয়েছে যে, মৌলবাদী না হয়েও বুড়া আতাউর রহমান সম্প্রতি এক সভায় প্রকাশ্যে বলেছে- রুশদী সমর্থকরা হচ্ছে ইসলামের শত্রু, আর ইসলামের শত্রুদের হত্যা করা হচ্ছে মুসলমানদের কর্তব্য। কী সাংঘাতিক প্ররোচণা! এটা যদি দেশকে সাম্প্রদায়িক খুনোখুনির দিকে ঠেলে দেয়ার গভীর ষড়যন্ত্র না হয় তাহলে এটা কী? বহু মুসলমানের দৃষ্টিতে কাদিয়ানীরা ইসলামের শত্রু। তাদের সবাইকে তা হলে হত্যা করে ফেলতে হবে? পৌত্তলিকরা ইসলামের শত্রু। তাহলে কি সকল হিন্দুকে হত্যা করে ফেলতে হবে? ইরানে কসাই খোমেনী বাহাই সম্প্রদায়কে ইসলামের শত্রু ঘোষণা করে কচুকাটা করেছে ও হাজার হাজার বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মী-জনগণকে ইসলামের শত্রু বলে নির্বিচারে ফাঁসি দিয়েছে। পাকিস্তানে মওদুদী কাদিয়ানীদের বিরুদ্ধে গণহত্যার উস্কানী দিয়েছিল। ঠিক এরকম রাজত্বই কি তারা চাচ্ছে ? এদেশে দুই কোটির মত হিন্দু, খৃষ্টান, বৌদ্ধ ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বী রয়েছেন যারা নিশ্চয়ই ইসলামকে বিরোধিতা করেন। তারা যদি ইসলামকে সমর্থনই করতেন তাহলে তারা ভিন্ন ধর্মের হতেন না। অসংখ্য নাস্তিকতাবাদী রয়েছেন যারা ধর্মে বিশ্বাস করেন না। এদের সবাইকে ইসলামের শত্রু বলে হত্যার বিভৎসতা শুরু করাই কি এদের উদ্দেশ্য? এরা কি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ধ্বংস করে দেয়ার ষড়যন্ত্রেই নামেনি? এভাবে পৃথিবীতে কোন আধুনিক রাষ্ট্র কি থাকা সম্ভব? এদেশে মুসলমানরা নাস্তিক বা অন্য ধর্মীদের-কে হত্যা করবে, নাস্তিকদের দেশে তারা ধর্মবিশ্বাসীদের হত্যা করবে, ইহুদীরা ইসরাইলে মুসলমানদের হত্যা করবে, পাল্টা মুসলমানরা অন্যত্র ইহুদীদের কচুকাটা করবে, পাকিস্তানে কাদিয়ানীদের গণহত্যা করা হবে, পাল্টা ভারতে মুসলমানদের গণহত্যা করা হবে- এখানেই নিয়ে যাচ্ছে তাদের যুক্তি। কোন শুভবুদ্ধি সম্পন্ন লোক এই মধ্যযুগীয় ধর্মান্ধতাকে বিরোধিতা না করে পারবে? রুশদী কি বলেছেন তা বিস্তারিত আমরা জানি না। তার মতবাদ বা বক্তব্যকে সমর্থন করতেই হবে এমন কোন কথা নেই। কিন্তু ধর্ম প্রশ্নে তার একটি মতবাদ তিনি বলতে পারবেন না, সেটা তিনি বলেছেন বলে তাকে হত্যা করতে হবে, সারা দুনিয়ার ভাড়াটিয়া খুনীদের উস্কানো হবে টাকার লোভ দেখিয়ে, আর জনগণের ধর্মীয় অনুভূতিতে সুড়সুড়ি দিয়ে তাদেরকে সাম্প্রদায়িকতায় নামানো হবে- এগুলোকে কোন সত্যিকারের গণতান্ত্রিক ব্যক্তিই বিরোধিতা না করে পারেন না। আমাদের দেশে ও বিশ্বের মৌলবাদীরা যে তাদের প্রগতিবিরোধী চক্রান্ত থেকেই এত সোচ্চারে মাঠে নেমেছে- ধর্মপ্রাণ জনগণের অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধার জন্য নয়, তা মোটেই অস্পষ্ট নয়। এদেশে বিভিন্ন পদের শত-সহস্র ইসলাম বিরোধী তৎপরতা সরকার, সমাজপতি ও রাষ্ট্রের প্রশ্রয়ে প্রকাশ্যেই ঘটে চলেছে। শেরাটন-সোনারগাঁও-এর মদ উৎসব, বেশ্যাবৃত্তি, সারাদেশ জুড়ে প্রদর্শনীর নামে জুয়া, নগ্ন নৃত্য, দেশজুড়ে অসৎ সিনেমার জোয়ার, টেলিভিশনে পশ্চিমা অশালীনতা ও হাইজ্যাক মারদাঙ্গা খুনোখুনী প্রদর্শনী, নগ্ন পত্রপত্রিকা – এসব-তো কোনটাই রেখেঢেকে হচ্ছে না। এসবের জন্য কারা দায়ী তা-ও লুকানো নয়। জামাত থেকে শুরু করে গলাবেচা সাঈদী, আর পীর-ব্যবসায়ী কোন্ মৌলবাদীটি এসব কারণে কয়টা লোকের মৃত্যদণ্ড এ পর্যন্ত দিয়েছে? এগুলো না করে লন্ডন প্রবাসী এক নিরীহ ঔপন্যাসিকের হত্যার ঘোষণা দিয়ে এরা হরতাল করছে কোন উদ্দেশ্যে ?

আসলে তাদের শ্রেণী স্বার্থটি খুবই পরিস্কার। তাদের শ্রেণীস্বার্থ ও প্রভুস্বার্থের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কাজগুলো ধর্মবিরোধী হলেও তাদের খুব একটা আপত্তি নাই; কিন্তু আপত্তি হচ্ছে প্রগতিচিন্তা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রসারে। একেই তারা টুঁটি টিপে হত্যা করতে চায়। আর এ প্রয়োজনেই তারা আবার ধর্মকেও সামনে নিয়ে আসে। কিন্তু এ প্রসঙ্গেই এ ইস্যুতে সাম্রাজ্যবাদের ভূমিকা বিশ্লে¬ষণের বিষয়টিও চলে আসে। বৃটেন-মার্কিন দেখাতে চাচ্ছে তারা গণতন্ত্রের পীঠস্থান, তাই রুশদীকে হত্যার জন্য খোমেনীর হুমকিকে তারা নিন্দা করছে, বলছে এটা “বর্বর”, বলছে খোমেনীকে “ভদ্র” বানাতে হবে। বলছে তারা গণতন্ত্রের ঐতিহ্যের প্রতি বিশ্বস্ত থাকবেন। এসব বোলচাল বিশ্ব জনগণের দৃষ্টিকে কুয়াশাচ্ছন্ন করার অপচেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়। রুশদীকে হত্যার হুমকি দেয়ার কারণে খোমেনীকে বর্বর বলছে যে মার্কিন সেই মার্কিনের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট গুণ্ডা রিগ্যান মাত্র অল্প কিছুদিন আগে যখন লিবিয়ার গাদ্দাফীকে হত্যার হুমকি দিয়েছিল তখন কোথায় ছিল তার ‘সভ্যতা’ ‘গণতন্ত্র’ আর বিশ্ব রাজনীতির নিয়ম-কানুন? শুধু ঘোষণা দিয়ে হত্যার হুমকিই নয়, ঘোষণা ছাড়াই কত লক্ষ জনগণ ও বিপ্লবী কর্মী-নেতাকে তারা প্রকৃতই হত্যা করে ফেলেছে “ভিন্নমত” প্রকাশের ও প্রচারের অপরাধে (এবং এখনও বিশ্ব জুড়ে করে চলেছে) তার কোন হিসাব কি তাদের ‘সভ্য’ দেশের ‘গণতন্ত্রের’ খাতায় লেখা আছে? প্রকৃতপক্ষে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ যে রুশদীর খুব একটা পক্ষে নয় তা বোঝা যায় এতেই যে, রুশদীকে তার মত প্রকাশের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে আত্মগোপন করতে হয়েছে বা কার্যত বন্দীজীবন যাপন করতে হচ্ছে; মার্কিন-বৃটেন রুশদীর নাস্তিক্যবাদের পক্ষে ও ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে একটি কথাও বলেনি ও বড় বড় বুর্জোয়া প্রকাশক, পুস্তক-ব্যবসায়ীরা রুশদীকে বর্জন করেছে; সাম্রাজ্যবাদের দালাল তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রগুলো রুশদীকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে এবং সাম্রাজ্যবাদের দালাল মৌলবাদীরা তাদের প্রভুদের সমর্থন থেকে একটুও বঞ্চিত হচ্ছে না। সাম্রাজ্যবাদ ইরানের বিরুদ্ধে এখন রুশদী ইস্যুটাকে ব্যবহার করতে চাচ্ছে নিজ সাম্রাজ্যবাদী প্রভাব বলয় বৃদ্ধি করার স্বার্থে। উপরন্তু তাদের উপর নিজ দেশের জনমতের চাপও রয়েছে যা পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা তাদের পক্ষে কঠিন। ইরান-ইরাক যুদ্ধের পর ইরান আরো দ্রুত সাম্রাজ্যবাদী বলয়ে অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ছে। কিন্তু ইরানের শাসক গোষ্ঠীর মধ্যে এ নিয়ে এখন তীব্র দ্বন্দ্ব চলছে (এ নিবন্ধ যখন লেখা হচ্ছে তখন খোমেনীর উত্তরসুরী বলে প্রচারিত মোন্তাজেরী পদত্যাগ করেছে বা তাকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে)। রুশ-ব্লক নাকি মার্কিন-ব্লককে চয়েস করা হবে এবং সাম্রাজ্যবাদের সাথে কতটুকু মাখামাখি করা হবে বা না হবে তা নিয়েই এ দ্বন্দ্ব তীব্র হয়েছে। সুতরাং কসাই খোমেনী যে রুশদীর মৃত্যদণ্ড ঘোষণা করে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের সাথে দর কষাকষি করতে চাচ্ছে অথবা শাসক শ্রেণীর রুশ ব্লকীয় গোষ্ঠীরা এ থেকে সুবিধা আদায় করতে চাচ্ছে- সেটা পরিস্কার। এটা আরো পরিস্কার হয় যখন রুশদী ইস্যুতে ‘নাস্তিক’ রাশিয়া মৌলবাদী খোমেনীর পক্ষে দাঁড়িয়ে পশ্চিমাদের সমালোচনা করে এই ভাষায় যে, পশ্চিমারা এ নিয়ে বাড়াবাড়ি করে ফেলছে।

অন্যদিকে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদও এই ইস্যুকে কাজে লাগিয়ে ইরানের উপর চাপ সৃষ্টি করতে চাচ্ছে, ইরানকে চাপ দিয়ে বাগে আনার চেষ্টা চালাচ্ছে।

এভাবে বিশ্ব রাজনীতির জটিল চক্রাবর্তে পড়ে রুশদী ইস্যুতে বিভিন্ন পক্ষ-বিপক্ষের বিশ্বব্যাপী তৎপরতা চলছে। ধর্মীয় মৌলবাদী পাণ্ডারা এগুলো ঠিকই বোঝে ও জানে। কিন্তু তারা জনগণকে এগুলো জানায় না। জনগণকে তারা মধ্যযুগীয় মূল্যবোধে কলুষিত করার জন্যই একে ব্যবহার করতে চায় ও করে এবং এভাবে গণতন্ত্র ও প্রগতির বিরুদ্ধে তাদের চক্রান্তকে বিকশিত করতে চায়।

তবে এটাও সঠিক যে, পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে, বিশেষত তৃতীয় বিশ্বে নিপীড়িত মুসলিম জনগণের মাঝে ন্যায্য বিক্ষোভও রয়েছে, যা এই ইস্যুতে ধর্মীয় চেতনার রূপে প্রকাশ পাচ্ছে, এবং যাকে মৌলবাদী পাণ্ডারা ও প্রতিক্রিয়াশীলরা ব্যবহার করতে সচেষ্ট। পশ্চিমা উপনিবেশবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ খৃষ্টান ধর্মকে ব্যবহার করেছে বিশ্বজুড়ে জনগণের উপর নিপীড়ন করার জন্য। মধ্যপ্রাচ্যে ইহুদীদের তারা ব্যবহার করছে মুসলমান জনগণকে নিপীড়ন করার জন্য। এ কারণে “ইসলাম বিরোধী সাম্রাজ্যবাদী ইসরায়েলী ষড়যন্ত্রে” মুসলিম জনগণের ক্ষুব্ধ হবার ন্যায্যতাও রয়েছে। একে আমাদের অবশ্যই বিবেচনা করতে হবে। কিন্তু তাই বলে যে ধর্মীয় মৌলবাদীরা সাম্রাজ্যবাদেরই এজেন্ট তাদেরকে বিরোধিতা করা ও সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্তকে উন্মোচন ও বিরোধিতা করার করণীয়কে ভুলে গেলে চলবে না। উপরন্তু আদর্শগতভাবে সামগ্রিকভাবেই ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামটাকে দুর্বল করলে চলবে না। এগুলো দুর্বল করার অর্থ হচ্ছে গণতন্ত্রের সংগ্রামকে পরাজিত করা।

আমাদের দেশে এখন জামাত থেকে শুরু করে পীর গোষ্ঠীগুলো হয়ে বড় বড় মৌলানারা সবাই নিজেদের শ্রেণী স্বার্থেই মৌলবাদকে আঁকড়ে ধরে প্রচণ্ড প্রবলতায় তার প্রচারে নেমেছে। কিন্তু ঠিক এ কারণেই তারা ব্যাপক শ্রমিক, কৃষক, প্রগতিশীল ছাত্রসমাজ, বুদ্ধিজীবী ও ব্যাপক জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন। তাই রুশদী বিতর্কে এরা গলা ফাটালেও, আর পোস্টারে দেয়াল রাঙালেও জনগণ হচ্ছেন স্রেফ দর্শক। বরং জনগণ- যেমন হোটেল শ্রমিকরা এ মুহূর্তে চিন্তা করছেন এই মোল্লা-রাজাকাররা কিভাবে ধর্মের নামে তাদের রুজি রোজগার বন্ধ করে দেবে সেই সমস্যাটি। অথচ এমন অবস্থাতেও সংশোধনবাদী ও সুবিধাবাদী, প্রগতি-ব্যবসায়ী বুদ্ধিজীবীরা রুশদী ইস্যুতে মৌলবাদের বিরুদ্ধে স্পষ্ট প্রতিবাদে মাঠে নামেনি। তারা মৌলবাদীদেরকে কেতাবী সমালোচনা করলেও বিতর্কিত ইস্যুটাতে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে প্রচার-প্রসারের দায়িত্ব পালন করেননি। অতি সম্প্রতি সাঈদী বিরোধী সংগ্রামের ফলশ্র“তিতে মৌলবাদীরা কিছুটা যে কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল সে ক্ষতি তারা এবার সুদে-আসলে পুষিয়ে নিয়েছে। এ বড় ভয়াবহ ভবিষ্যতের পদধ্বনি। কিন্তু প্রতিক্রিয়ার সাথে কোন আপোষে প্রগতিশীলরা রেহাই পেতে পারে না। এই ধর্মান্ধ-ধর্মব্যবসায়ী ফ্যাসিষ্টরা ’৭১-সালে শুধু কমিউনিস্টদের গলাই কাটেনি, যে কোন প্রগতিশীল ব্যক্তিরই গলা তারা কেটেছে বা কাটার চেষ্টা করেছে। ইরান হচ্ছে এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। যে রুশপন্থী তুদেহ পার্টি খোমেনীর সাথে আপোষ করেছিল মাওপন্থী ও জাতীয়তাবাদী বিপ্লবীদেরকে বিরোধিতার জন্য, আপোষ করে পার পেয়ে যাবার আশায়, সেই তুদেহ পার্টির সাধারণ সমর্থকটি পর্যন্ত খোমেনীর নিপীড়ন ও হত্যা থেকে পরে রেহাই পায়নি। অতি সম্প্রতি ১৫/২০ হাজার জেলবন্দীকে খোমেনী হত্যা করেছে শুধু প্রগতিশীল প্রতিপক্ষকে স্তব্ধ করার জন্যই। সুতরাং আজ ধর্মীয় মৌলবাদীরা যা করছে, সেটা রুশদীর কারণে নয়, রুশদী তাদের উদ্দেশ্যও নয়, রুশদী  উপলক্ষ মাত্র। সাম্রাজ্যবাদ ও তার দালালেরা, সকল মধ্যযুগীয় ধর্মান্ধরা ও ধর্মব্যবসায়ীরা সকল প্রগতিচিন্তা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে টুঁটি চেপে হত্যা করার মতাদর্শগত প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছে- এটাই তাদের মূল উদ্দেশ্য। তারা জনগণের পশ্চাদপদ চিন্তা-চেতনাকে উস্কে দিয়ে ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টির অপচেষ্টায় নিয়োজিত। তারা সাম্প্রদায়িক হানাহানি খুনোখুনির ইন্ধন জুগিয়ে যাচ্ছে- যারপরনাই। একে বিরোধিতা না করে বিপ্লবী-তো দূরের কথা, কোন রকম গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল চিন্তার বিকাশ সম্ভবই নয়। যারা মনে করেছেন এখানে শরীর পুড়িয়ে লাভ কি, আমরা বরং গা বাঁচিয়ে রাজনীতি করে চলি, আমরা-তো একবারে বিপ্লবই করবো- তারা বোকার স্বর্গে বাস করছেন। কারণ এটাই এখন বিপ্লব, রুশদী বিতর্কে সঠিক অবস্থান নেয়া ও তার জন্য সংগ্রাম করাটাই এখন বিপ্লব একে এড়িয়ে গিয়ে, একে বাদ দিয়ে, গণতন্ত্র, প্রগতি, বিপ্লব  অসম্ভব, অকল্পনীয় ।

সূত্রঃ আন্দোলন প্রকাশনা, সিরিজ ৩

Advertisements


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s