ফিলিপিনের মাওবাদীরা ৩ পুলিশ কর্মকর্তা ও ২ সেনাকে বন্দী করেছে

NPA1

গত ৩রা এপ্রিল রোববার ভোর ৬টার দিকে, ফিলিপিনের কমিউনিস্ট মাওবাদী নিউ পিপলস আর্মি(NPA)’র ১০ প্লাটুনের সদস্যরা মিন্দানাও অঞ্চলের ৭টি এলাকার জাতীয় মহাসড়কে চেক পয়েন্ট বসিয়েছে এবং পুলিশের ৩জন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও ২জন সেনাসহ ৫ জনকে বন্দী করেছে। এ সময় তিনটি 9 mm পিস্তল, একটি .38 ক্যালিবার রিভলবার, তিনটি .45 ক্যালিবার পিস্তল এবং হ্যারিস রেডিও জব্দ করা হয়।

এসময় চেকপয়েন্টে মাওবাদী NPA’র সদস্যরা প্রতিক্রিয়াশীল নির্বাচনের নিরর্থকতা সম্পর্কে মোটর গাড়ি চালকদের অবহিত করতে তাদের মাঝে লিফলেট বিতরণ করেন। লিফলেটে গেরিলা অঞ্চলের প্রতিক্রিয়াশীল নির্বাচন সম্পর্কে বলা হয়-

  • প্রার্থীদের ভোট ক্রয়, প্রতারণা এবং সন্ত্রাসবাদ সহ নোংরা রাজনীতি পরিহার করা উচিত।
  • প্রার্থীদের আগ্নেয়াস্ত্র বা সশস্ত্র রক্ষীবাহিনী আনা উচিত নয়।
  • প্রার্থীদের এনপিএ আন্দোলন এবং বিপ্লবী গণসংগঠনের বিরুদ্ধে নজরদারি করতে প্রচারণায় ব্যবহার করা উচিত নয় এবং
  • প্রার্থীদের- শাসানো বা ভোটারদের চাপ করা উচিত নয়।

 

অনুবাদ সূত্রঃ davaotoday.com

Advertisements

ঝিনাইদহের শৈলকুপায় ‘বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি’র সদস্য গ্রেফতার

হানেফ আলী মণ্ডল (মাঝে)

হানেফ আলী মণ্ডল (মাঝে)

সূত্রঃ bdnews24.com


ভয় আর লোভের সাঁড়াশির মাঝে দাঁড়িয়ে নিয়ামগিরির ডোঙরিয়ারা

http://freemediaperson.com এর ১৯ মার্চের রিপোর্ট। 

বহিরাগতদের সন্দেহের চোখে দেখে ডোঙরিয়া যুবকরা। ছবি- ফ্রিমিডিয়াপারসন ওয়েবসাইট থেকে।

বহিরাগতদের সন্দেহের চোখে দেখে ডোঙরিয়া যুবকরা। ছবি– ফ্রিমিডিয়াপারসন ওয়েবসাইট থেকে।

আজ আমি দেখেছি নিয়ামগিরি
তাই ধন্য এ মোর নয়নদুটি
কী সুন্দর সে পর্বতমালা
তার সুরেলা পাখির ডাক
তার হরিণ, সারং, ভালুক
তাদের কত যুগের বাস।
—  ডোঙরিয়া জনজাতির গান

নিয়মগিরি পাহাড় উড়িষ্যার দক্ষিণ পশ্চিম অংশে রায়গড়া আর কালাহান্ডি জেলায় অবস্থিত। প্রাকৃতিক বৈচিত্র সম্পন্ন এই অঞ্চলটিতে ‘ডোঙরিয়া কন্ডা’ নামক আদিবাসীদের বাস। জঙ্গলই তাদের নিবাসস্থল। এবং প্রকৃতির সাথে একাত্ম হয়ে তারা জঙ্গলের সমস্ত নিয়ম মেনে সেখানেই পশুপাখিদের সঙ্গে সহাবস্থান করছে। ২০০১ সালের জনগণনা অনুযায়ী, তাদের সংখ্যা ৮০০০ এর মতো।

এই নিয়ামগিরিতে প্রায় শ’ খানেক জলধারা আছে, যার মধ্যে পঁচিশটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো বৃষ্টির জলে পুষ্ট। পনেরো রকমের প্রায় বিলুপ্তপ্রায় ওষধি গাছ রয়েছে এখানে। জীববৈচিত্র্য ও প্রাণীবৈচিত্র্যর জন্য এই অঞ্চলটিকে ইকো-সেনসিটিভ রিজিয়ন বলা হয়েছে (এনভায়রনমেন্ট প্রটেকশন অ্যাক্ট, ১৯৮৬ এবং এনভায়রনমেন্ট প্রটেকশন রুলস, ফরেস্ট প্রটেকশন অ্যাক্ট, ১৯৮০, ওয়াল্ড লাইফ প্রোটেকশন অ্যাক্ট, ১৯৭২ অনুযায়ী)।

ওড়িশার নবীন পটনায়ক সরকার এবং লন্ডনের শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত মাইনিং কোম্পানি বেদান্ত-র বিরুদ্ধে, বুলেট আর ব্যাটন সামলে দাঁড়িয়ে আছে ৮০০০ ডোঙরিয়া পুরুষ নারী আর শিশু।

২০০৬ সালে কর্পোরেট বেদান্ত গ্রুপ উড়িষ্যায় একটি অ্যালুমিনা সংশোধনাগার তৈরি করে, যার মূল উদ্দেশ্য নিয়ামগিরি পাহাড়ের বক্সাইটকে কেটে বার করা। উড়িষ্যা সরকার বেদান্ত গ্রুপের আর্জি মেনে নিয়ে ডোঙরিয়াদের পাহাড় খালি করার নির্দেশ দিয়েছিল। প্রকৃতির সন্তান ডোঙরিয়া-রা প্রতিবাদ করেছিল। ‘নিয়মগিরি’ দেবতার বিনাশ তারা সহ্য করতে পারবে না। আর তারা নিজেদের জমিও হস্তান্তরের বিরুদ্ধে। চলল তাদের সত্যাগ্রহ আন্দোলন। একদিকে বেদান্ত গ্রুপ তাদের টাকার লোভ দেখাল, অন্যদিকে উড়িষ্যা সরকার তাদের মাওবাদী তকমা দিয়ে বিনাশ করতে উদ্যত হলো।

কিন্তু ২০১৩ সালে সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপে ‘ডোঙরিয়া’রা এই যুদ্ধ জয়লাভ করে। ডোঙরিয়াদের ১২টি গ্রামের গ্রামসভায় বিপুলভাবে জয়লাভ করে বক্সাইট খননের বিরুদ্ধে জনমত। ২০১৪ সালে কেন্দ্রীয় সরকার বেদান্তর লিজ বাতিল করে। শান্তিপূর্ণ ডোঙরিয়ারা খুশি হয়। তাদের জীবন চলতে থাকে জঙ্গলে, খান ছত্রিশেক সারাবছর-জল-থাকা ঝর্ণার পাশে। ঐ ঝর্ণাগুলো থেকেই তো পশ্চিম উড়িষ্যার দুটি মুখ্য নদী পুষ্ট হচ্ছে — বংশধারা এবং নাগাবলী।

এক ডোঙরিয়া বসতি। ছবি -ফ্রিমিডিয়াপারসন ওয়েবসাইট থেকে।

এক ডোঙরিয়া বসতি। ছবি -ফ্রিমিডিয়াপারসন ওয়েবসাইট থেকে

পটনায়ক সরকার পশ্চিম উড়িষ্যার প্রচুর আদিবাসীকে মেরে দিয়েছে, আরো বেশ কিছুকে জেলে ঢুকিয়েছে গত কয়েক মাসে, বাম জঙ্গী দমনের নামে। অন্যদিকে বেদান্ত গ্রুপ এগিয়ে এসেছে টাকার থলি নিয়ে, ডোঙরিয়াদের তরুণতর প্রজন্মকে জিতে নিতে। ফেব্রুয়ারি মাসে উড়িষ্যা সরকার সুপ্রিম কোর্টে একটি আর্জি জানিয়ে বলে, ফের একবার গণভোট হোক ঐসব গ্রামে, কারণ পুরনো জমানার অনেকে মারা গেছে, গ্রামসভায় ঢুকেছে অনেক কমবয়সীরা। এই দাবি যাচাই করতে ফ্রিমিডিয়াপারসন ডট কম এর একটি প্রতিনিধিদল নিয়ামগিরির তিনটি গ্রাম, পালবেরি, কুনা কাধু এবং কেন্দুবার্দি যায় মার্চ মাসের মাঝামাঝি।

নিয়মগিরি সুরক্ষা সমিতি-র আহ্বায়ক কুন্তি মাঝি জানালেন, ‘নিয়ামগিরির ১২০ টা গ্রামের মধ্যে এই ১২টা গ্রামকে তো নির্বাচন করেছিল নবীন পট্টনায়ক সরকার-ই। কালাহান্ডি আর রায়গর-এর জেলা বিচারকদের উপস্থিতিতে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হয়েছিল বেদান্তকে প্রত্যাখ্যান করার। … এরই মধ্যে সরকার এবং বেদান্ত ভয় দেখাচ্ছে, ক্রিমিনাল কেস দিচ্ছে, ঘুষ দিচ্ছে, লোভ দেখাচ্ছে, এমনকি মাওবাদী বলে ভুয়ো সংঘর্ষে মেরেও দিচ্ছে।’

উড়িষ্যা এবং ছত্তিশগড় সরকারের না-বলা বার্তাটি হলো — ‘আত্মসমর্পন করো, অথবা মরো’। আধিকারিকরা দাবি করছে, শয়ে শয়ে মাওবাদীদের কাছের লোক আত্মসমর্পন করছে। এরা কেউ মাওবাদীদের কাছের লোক নয়, বরং এরা মাইনিং প্রকল্পের বিরোধী, কারণ মাইনিং হলে তাদের ভিটে মাটি চাটি হবে। এরাই সারাক্ষণ পুলিশের ভয়ে থাকছে।

প্রশাসন সেই পুরনো বচনটা একেবারে অক্ষরে অক্ষরে পালন করছে, ‘কুকুরটাকে মারার আগে একটু বদনাম দিয়ে নাও, তারপর মারো।’ পুলিশের চোখে জল-জঙ্গল-জমির অধিকারের লড়াইয়ে থাকা আদিবাসী মানেই মাওবাদী।

দীর্ঘদিনের গান্ধীবাদী সমাজকর্মীদের মাওবাদী বলে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ভুবনেশ্বরের এক উঁচুতলার পুলিশ অফিসার, গোয়েন্দা, সে বলেছে, কালাহান্ডির নিয়ামগিরি সুরক্ষা সমিতি মাওবাদী। কোরাপুট-রায়গড়া জেলা ভিত্তিক চাষী মুলিয়া আদিবাসী সঙ্ঘ, সেটাও মাওবাদী। এ দুটোই নাকি মাওবাদীদের গণসংগঠন।

পরিবেশবাদী সংগঠন গ্রীন কালাহান্ডির চেয়ারম্যান সিদ্ধার্থ নায়ক বলেন, উড়িষ্যার মানুষ বোলাঙ্গিরের গন্ধমার্দন জেলার বক্সাইট মাইনিং বন্ধ করে দিয়েছে। বালেশ্বরের বালিয়াপালের ন্যাশনাল মিশাইল টেস্টিং রেঞ্জ বাতিল করে দিয়েছে। পস্কোর স্টিল প্ল্যান্ট আটকে দিয়েছে। কারণ এই আন্দোলনগুলো ছিল শান্তিপূর্ণ। যদি এগুলো হিংসাত্মক হতো, তাহলে সরকার যে কোনো সময় আরো বেশি হিংসা ঘটিয়ে এগুলোকে ধ্বংস করে দিত।’

২৭ ফেব্রুয়ারি নিয়ামগিরিতে বার্ষিক তিনদিনের উৎসব চলাকালীন বিশ বাইশ বছর বয়সী মান্ডা কাদ্রাকা-কে হত্যা করে পুলিশ। পুলিশের দাবি ছিল, সেটা মাওবাদী বিরোধী অপারেশন ছিল, যার জেরে মারা গেছে কাদ্রাকা। পুলিশের এই দাবি স্থানীয় মানুষকে আরো রাগিয়ে দিয়েছে।

ডোঙরিয়াদের যুব সম্প্রদায় বাইরে থেকে এই এলাকায় কেউ এলেয় সন্দেহের চোখে তাকায়, — ‘তামা ক্যামেরা কু হানি পাকেইবু’ (এই কুড়ুল দিয়ে তোমার ক্যামেরা গুঁড়িয়ে দেবো), এই মিডিয়া টিমটাকে দেখেই এক ডোঙরিয়া যুবক চিৎকার করে উঠেছিল। কুমতি মাঝি দ্রুত হস্তক্ষেপ করে বাঁচায়।

পুলিশ যখন মিথ্যে অপরাধে অভিযুক্ত করার ভয় দেখাচ্ছে, তখন কর্পোরেট বেদান্ত টাকা পয়সা ছড়িয়ে কিছু ডোঙরিয়া যুবককে কাজে লাগিয়েছে। এদের ডোঙরিয়া সমাজ ঘৃণার চোখে দেখে।

‘কিছু দালাল আছে যারা আমাদের ডোঙরিয়া ছেলে/মেয়েদের কাউকে কাউকে লোভ দেখাচ্ছে বেদান্তর পক্ষে সাফাই গাইবার জন্য। কিছু ডোঙরিয়া মেয়েকে দেহব্যবসার লোভও দেখানো হচ্ছে।’ — রাগতস্বরে জানালো পালবাড়ি গ্রামের জিলু মাঝি।

ভয় দেখানো আর লোভ দেখানো — ডোঙরিয়াদের ঐক্য ভাঙার দুই তরিকা। কিন্তু এর থেকেও ভয়ঙ্কর প্রশাসনের তরফে তাদের নাগরিকত্বকেই না স্বীকার করা। নিয়ামগিরির আদিবাসীদের এক বড়ো অংশ জানালো, তাদের প্রশাসন থেকে ভোটার কার্ড, আধার কার্ড, বিপিএল কার্ড দিচ্ছে না। অফিসিয়াল রেকর্ডে তাদের অস্তিত্বই নেই।

ডোঙরিয়াদের নবীন প্রজন্মের জিলু আর বারি মাঝি অবশ্য জোর গলায় বললেন, ‘রক্ত ঝরাবো, তবু আমাদের বন ছাড়বো না। যদি সুপ্রিম কোর্টও সরকারের পক্ষে সায় দেয়, তবুও আমরা জঙ্গল ছেড়ে যাব না।’

আপডেট : সুপ্রিম কোর্ট আপাতত উড়িষ্যা সরকারের নতুন করে গ্রামসভার মতামত নেওয়ার প্রস্তাবটিতে সায় দেয়নি, তবে বেদান্তর মাইনিং বন্ধ করার গ্রামসভার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত (২০১৩) বিষয়ে যে নতুন করে আপিল করা যেতে পারে, সে পথও বন্ধ করেনি।

সূত্রঃ songbadmanthan


তামিলনাড়ুতে মাওবাদীদের ভোট বয়কটের ডাকে দেশদ্রোহীতার মামলা

TN-Assembly-boycot_2799500g

তামিলনাড়ুর নীলগিরি জেলায় ভোট বয়কটের প্রচারের পর পরই ৭ মাওবাদীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদোহীতার মামলা রুজু করল পুলিস। দ্য হিন্দু পত্রিকায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী গ্রামের মোড়লের  অভিযোগের ভিত্তিতেই রবিবার মামলা দায়ের করেছে পুলিস। বেশ কিছুদিন ধরেই তামিলনাড়ু-কেরল ও কর্ণাটকে নিজেদের গতিবিধি বাড়াতে চাইছে মাওবাদীরা। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে ভোট বয়কটের ডাকের সঙ্গে রাষ্ট্রদোহীর মামলার সম্পর্ক কী?


“আগুনের পরশমনি”: হুমায়ূন আহমেদের ১৯৭১

hqdefault

আগুনের পরশমনি”: হুমায়ূন আহমেদের ১৯৭১

(ফেব্রুয়ারী, ’৯৫)

“আগুনের পরশমনি” ঔপন্যাসিক, নাট্যকার হুমায়ূন আহমেদ পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র। ১৯৭১ এর প্রেক্ষাপট। এমনই একসময় তিনি এটি সৃষ্টি করলেন, যখন ’৭১ ইতিহাসে পরিণত হয়েছে এবং আজকের উৎসুক তরুণ প্রজন্মকে তা জানতে হয় প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে নয়, বরং রক্ষিত অতীতের ইতিহাস থেকে।

কিন্তু ১৯৭১ এক জীবন্ত বাস্তবতা হলেও তার কোন একক ব্যাখ্যা নেই। একদিকে এদেশের বুর্জোয়া শাসক শ্রেণী, অন্যদিকে প্রগতিশীল ও বিপ্লবী শক্তির ব্যাখ্যা এ প্রশ্নে ভিন্ন। কিন্তু ক্ষমতা, অর্থ ও প্রচার ব্যবস্থার একচেটিয়া মালিকানার কারণে বিগত চব্বিশ বছর যাবত শাসক শ্রেণীর বক্তব্যই প্রতিষ্ঠা অর্জন করেছে এবং এদেশের বুদ্ধিজীবীদের বড় অংশটির বিশ্বাসে পরিণত হয়েছে।

অবশ্য ’৭১-কে নিয়ে শাসক দালাল বুর্জোয়া শ্রেণীর বড় ৪টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে, বিশেষত প্রধান দু’টি উপদল আওয়ামী লীগ ও বি.এন.পি’র মধ্যে কোন্দলের অন্ত নেই। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাদের বক্তব্যের সারবস্তু মৌলিকভাবে অভিন্ন। তারা ১৯৭১-এর এক সাদামাটা চিত্রকে তুলে ধরেঃ যেমন- ’৭১-এ ইয়াহিয়া-ভুট্টোর নেতৃত্বে পাকিস্তানী শাসকচক্র, তথা পাকবাহিনী বর্বর নিপীড়ন ও হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল এবং তার বিরুদ্ধে নয় মাসের এক মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাঙালী জাতি স্বাধীনতা অর্জন করেছিল। এরা ইতিহাসকে এমনভাবে তুলে ধরে যেন ’৭১-এর বাঙালী জাতি ছিল এক ও অখণ্ড সত্ত্বা। বাঙালী জাতি বুর্জোয়া, শহুরে মধ্যবিত্ত, কৃষক, শ্রমিক ইত্যাদি শ্রেণীতে বিভক্ত ছিল না এবং বিভিন্ন শ্রেণীর ভূমিকা ও দুর্ভোগেও বিভিন্নতা ছিল না। ’৭১-এ যুদ্ধ করেছিল কারা? এদের উত্তর হচ্ছে- প্রথমত আর্মি, তারপর ছাত্র-বুদ্ধিজীবী। হত্যার শিকার কারা হয়েছিল? এরা আর্মি, পুলিশ, বিডিআর, তারপর ছাত্র-মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী এই গণ্ডির বাইরে বড় বেশি যায় না। নেতৃত্ব দিয়েছিল কারা? বুর্জোয়া শ্রেণী, তাদের রাজনৈতিক দল এবং আর্মির তৎকালীন মেজর-কর্নেলরা। এরা শত্রু হিসেবে শুধু পাকিস্তানকে চিহ্নিত করে, সাম্রাজ্যবাদ-সম্প্রসারণবাদকে নয়। পাকিস্তানকে চিহ্নিত করতে গিয়ে এরা যেমন অতীতে, তেমনি আজও  এদেশের বিহারী জনগোষ্ঠীকেও শত্রুর পর্যায়ভুক্ত করে ফেলে। এদেশের নিপীড়িত অন্যান্য জাতি সম্পর্কেও এরা নীরব। এভাবে শাসক শ্রেণী ’৭১-এর নামে মূলত এক দেশ বিক্রেতা প্রতিক্রিয়াশীল বাঙালি জাতীয়তাবাদকে তুলে ধরে। এটাই এদের ’৭১-এর চেতনা যা দুর্ভাগ্যবশত এদেশের মধ্যবিত্ত বা এমনকি কম বেশি প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়কেও মারাত্মকভাবে গ্রাস করেছে।

এই প্রেক্ষাপটে হুমায়ূন আহমেদ নির্মাণ করেছেন ‘আগুনের পরশমনি’। ইতিমধ্যে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা এবং বুদ্ধিজীবীদের প্রশংসা ও স্বীকৃতিও তিনি পেয়েছেন। তাই, স্বাভাবিকভাবেই এটি বিশ্লেষণ দাবি করে।

ঢাকা শহরের র‌্যাংকিন ষ্ট্রীটের একটি বাড়ি। মতিন সাহেব ( আবুল হায়াত), তার স্ত্রী (ডলি জহুর), কন্যা রাত্রি (বিপাশা) ও অপলা এবং কাজের মেয়ে বিন্তি- এই নিয়ে সংসার। বাইরে গুলির শব্দ, আতঙ্কগ্রস্থ ও বিপর্যস্ত সবাই- যা তখনকার ঢাকা শহরের পরিস্থিতিকে তুলে ধরে। মতিন সাহেব স্বাধীন বাংলা বেতারে শেখ মুজিবের ৭ই মার্চের ভাষণ “এবারের সংগ্রাম …..” শুনছেন। সূচনা এভাবেই। অর্থাৎ শেখ মুজিবকে স্বাধীনতার উদগাতা স্থপতি হিসেবে তুলে ধরে ছবির সূত্রপাত হচ্ছে। শাসক বুর্জোয়া শ্রেণীর একটি উপদল আওয়ামী লীগ এভাবেই ঘটনাকে তুলে ধরে। জিয়াসহ একটা কম্প্রোমাইজ ফর্মুলায় মুজিবকে মেনে নিতে বি.এন.পি’রও আপত্তি নেই।

কিন্তু প্রকৃত সত্যটা কি? ’৭১-এর মার্চের প্রথমেই ব্যাপক ছাত্র-শ্রমিক-জনতা স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন এবং দেশ জুড়ে স্বতঃস্ফুর্তভাবেই স্বাধীনতার ঘোষণা ধ্বনিত হয়েছিল। অথচ শেখ মুজিব ২৫শে মার্চ পর্যন্ত পাকিস্তানের কাঠামোর মধ্যেই একটা সমাধানের জন্য ইয়াহিয়ার সাথে আপোষ-আলোচনা চালিয়েছিলেন। শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগ চাচ্ছিল শ্রমিক-ছাত্র-জনতার জঙ্গী সংগ্রামের রেশকে টেনে রাখতে, আপোষ ফর্মূলায় পাকিস্তান ভিত্তিক সমাধান করতে। ইয়াহিয়া-ভুট্টোর সাথে মার্চ, ’৭১-এ মুজিবের আলোচনা সম্পর্কে জনগণকে তারা কিছুই জানতে দেয়নি। এ কারণেই ১লা থেকে ২৫শে মার্চ পর্যন্ত ইয়াহিয়া চক্র পাকিস্তান থেকে অস্ত্র ও সৈন্য এনে গণহত্যাযজ্ঞ ঘটাতে সক্ষম হয়। তাই ২৫শে মার্চের বা পরবর্তী গণহত্যার জন্য শেখ মুজিব-আওয়ামী লীগ কিংবা জিয়া-শফিউল্লাহ্র মত মেজর-কর্নেলরা যারা ২৫শে মার্চ রাত পর্যন্ত পাকবাহিনীর সেবা করেছেন- তারা সবাই-ই দায়ী। এটা ঐতিহাসিক সত্য যে, ছাত্র-শ্রমিক-জনতার চাপে পড়ে শেখ মুজিব ৭ই মার্চ “এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম” এ কথাটুকু বলতে বাধ্য হয়েছিলেন। কিন্তু পুরো ভাষণ ছিল পাকিস্তান ভিত্তিক সমাধানের প্রশ্নে বক্তব্য এবং তিনি, যতটুকু জানা যায়, “জয় বাংলা, জয় পাকিস্তান” বলেই তার ভাষণ শেষ করেছিলেন। শেখ মুজিবের ৭ই মার্চের ভাষণের পর সভা থেকে প্রত্যাগত ছাত্র-জনতার হতাশা জাহানারা ইমামের “একাত্তরের দিনগুলি” স্মৃতিচারণে শহীদ রুমীর সেদিনকার বক্তব্যেও উন্মোচিত হয়েছে। আজকের চেচনিয়ায় দুদায়েভ বা সোমালিয়ায় আইদিদের মত প্রতিক্রিয়াশীলরাও জাতীয় প্রশ্নে যা করেছে তার সামান্য ভগ্নাংশ সাহসও শেখ মুজিব দেখাননি। বরং ২৫শে মার্চে নিজ বাড়িতে বসে পাকবাহিনীর কাছে ধরা দিয়েছেন। ইতিহাসে এমন কলংকজনক আত্মসমর্পণের দৃষ্টান্ত খুব বেশি নেই।

শাসক বুর্জোয়ারা নির্লজ্জভাবে এসব ইতিহাসকে উল্টে দিতে চায়। হুমায়ূন আহমেদও তাদের এ বিকৃতিকেই গ্রহণ করেছেন।

এরপর ছবিটিতে দেখা যায় অস্ত্রসহ মুক্তিযোদ্ধা তরুণ বদি মতিন সাহেবের বাড়িতে আশ্রয় নিল এবং বদির গ্রুপ মে মাসের ঢাকায় পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে কয়েকটি অপারেশন পরিচালনা করল। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা বদি কোত্থেকে এল? এই বিষয়টি ছবিতে অনুপস্থিত। ছবির শেষে দেখা যাচ্ছে সূর্য উঠছে, রাত্রি তার কল্পনায় ঘড়ির কাঁটা সচল করে দিল, বন্দী পাখীকে খাঁচা থেকে মুক্তি দিলো। এগুলো মুক্তি তথা বিজয় অর্জনের প্রতীক। কিন্তু ২২/২৩ বছর পর যখন এই চলচ্চিত্র নির্মিত হল তখন কিভাবে এই মুক্তি অর্জিত হল, তার ইঙ্গিত থাকাটা স্বাভাবিক। ইঙ্গিত রয়েছেও। পুরো ছবিটি যা প্রতিফলিত করে তা হল, একদিকে পাকবাহিনী গণহত্যা ও নির্যাতন চালাচ্ছে, অন্যদিকে এর বিরুদ্ধে ঢাকা শহরে মুক্তিবাহিনীর গেরিলারা ঢুকে পড়েছে, এবং মুক্তিযোদ্ধাদের লড়াইয়ের মধ্য দিয়েই অনিবার্যভাবে স্বাধীনতা অর্জিত হবে। শাসক শ্রেণী ও তাদের প্রচারযন্ত্র এবং বিভিন্ন বুর্জোয়া পত্রপত্রিকা ঠিক এই বক্তব্যই প্রচার করে।

কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে পাকবাহিনীকে পরাজিত করে তাদের কথিত স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে- এটা প্রকৃত সত্যের এক সাংঘাতিক বিকৃতি। প্রকৃত ইতিহাস হচ্ছে, জনগণ কর্তৃক স্বতঃস্ফুর্তভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা ও জঙ্গী সংগ্রামের ফলে শেখ মুজিব-ইয়াহিয়া আপোষ প্রয়াসে ব্যর্থ হয়, এবং পাকবাহিনী জনগণের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। শেখ মুজিব ধরা দেন, তাজউদ্দীন-মুশতাকসহ আওয়ামী লীগের তাবৎ নেতৃত্ব, পাকবাহিনীকে কোন প্রতিরোধ না করে কাপুরুষের মত উর্ধ্বশ্বাসে ভারতে পলায়ন করেন। অন্যদিকে জিয়া-শফিউল্লাহ্-রফিক এইসব মেজর-কর্নেলরাও বিপুল অস্ত্র ও জনগণের বিপুল জঙ্গী উদ্দীপনা ও ত্যাগসহ সবকিছুকে ফেলে ভারতে পালায়। এত বড় নির্লজ্জ কাপুরুষোচিত ঐতিহাসিক পলায়ন দুনিয়ার বুর্জোয়া রাজনীতির ইতিহাসেও অতি অতি বিরল। এরা সবাই সরাসরি ভারতীয় প্রতিক্রিয়াশীল শাসক শ্রেণীর কোলে আশ্রয় নেয় এবং তাদের ছত্রছায়ায় মুক্তিযুদ্ধের নামে এক প্রহসন গড়ে তোলে। বদি বা বদির মত লক্ষ লক্ষ তরুণ ও এদেশের কোটি কোটি নরনারী ’৭১-এ একটি মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য ছিল উন্মুখ। তাদের বীরত্ব, সাহস ও আত্মবলিদানের স্পৃহা ও ভূমিকাকে কোনভাবেই খাটো করে দেখার অবকাশ নেই। কিন্তু ভারতের প্রতিক্রিয়াশীল শাসক শ্রেণীর পক্ষপুটে আশ্রয় গ্রহণকারী আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব ও মেজর-কর্নেলরা এই সব অগণিত যুবককে ভারতে টেনে নিয়ে যায়, এবং কিছু অস্ত্র ও ট্রেনিং দিয়ে তাদের নিয়ন্ত্রণেই বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্তভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠিয়ে দেয়। আর ভারতীয় বাহিনীর ছত্রছায়ায় থেকে মূলত ভারতের মাটিতেই ঘাঁটি গেড়ে মেজর-কর্নেলরা ও বেঙ্গল রেজিমেন্টের আর্মিরা বর্ডারে কিছু সশস্ত্র অপারেশন চালিয়ে যায়। এভাবে দেশজোড়া একটি একক রণনীতির ভিত্তিতে একটি সুবিশাল আত্মনির্ভরশীল গেরিলা যুদ্ধ গড়ে উঠা ও বিকশিত হয়ে ওঠার সম্ভাবনাকে, তথা এদেশের জনগণের বিশাল বিপুল গণযুদ্ধ উত্থানের সম্ভাবনাকে সচেতনভাবেই হত্যা করা হয়। দেশের অভ্যন্তরে এই বিচ্ছিন্ন, বিক্ষিপ্ত এ্যাকশন এবং বর্ডারে ভারতীয় কমান্ড ও পরিকল্পনার অধীনে মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপগুলোর পক্ষে সুসংগঠিত পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে তেমন কোন ব্যাপক যুদ্ধ গড়ে তোলা সম্ভব ছিল না এবং তাই কিছু বিক্ষিপ্ত-এ্যাকশন ছাড়া তারা কিছু করতেও পারেনি। বহু জায়গায় তারা দ্রুতই বিপর্যস্তও হয়ে পড়ে। মাত্র তিন/চার মাসেই বহু জায়গায় এই মুক্তিযোদ্ধাদের একাংশের গুরুতর মতাদর্শগত অধঃপতনও শুরু হয়েছিল। ভারতের শাসক শ্রেণীও এটাই চেয়েছিল। কারণ, তাদের উদ্দেশ্য ছিল প্রকৃত কোন আত্মনির্ভর গণযুদ্ধ যেন এখানে গড়ে না ওঠে, এবং তাদের নিয়ন্ত্রণ ও তাদের উপর নির্ভরশীলতা যেন বহাল থাকে ও শক্তিশালী হয়।

অবশেষে ডিসেম্বর মাসে খোদ ভারতীয় বাহিনী পাকিস্তানী বাহিনীকে যুদ্ধে পরাজিত করে আওয়ামী লীগ তথা এদেশের বড় বুর্জোয়া শাসক শ্রেণীকে ক্ষমতায় বসায়; যে যুদ্ধে মুক্তিবাহিনী একটা অধীনস্থ সহায়ক বাহিনী হিসেবে কাজ করে মাত্র। ফলে সত্যিকার স্বাধীনতার বদলে সাম্রাজ্যবাদের জাতিগত শাসন-শোষণ পূর্বের মতই জনগণের ঘাড়ে চেপে থাকে। শুধুমাত্র পাকিস্তানী শাসন-শোষণ অপসারিত হয়, কিন্তু তার জায়গা দখল করে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদীদের নতুন শোষণ-লুণ্ঠন। অর্থাৎ ৭ কোটি মানুষের জাগ্রত গণযুদ্ধ ও সত্যিকার মুক্তি অর্জনের একটি সম্ভাবনাকে এরা হত্যা করে।

সুতরাং হুমায়ূন আহমেদ তার চলচ্চিত্রে যে মূল সুর তুলে ধরেছেন তা এদেশের শাসক শ্রেণীর ইতিহাস বিকৃতকারী বক্তব্যেরই প্রতিধ্বনি। চলচ্চিত্রে মে মাসে যেভাবে ঢাকা শহরে এ্যাকশনের ঘটনা দেখানো হয়েছে প্রকৃতপক্ষে ’৭১-এর মে মাসে ঢাকা শহরে তেমন কোন এ্যাকশন হয়নি।

এ্যাকশন শুরু হয়েছিল আরো পরে। পাকিস্তানী আর্মির বিরুদ্ধে যে দীর্ঘক্ষণের একটি পথযুদ্ধ দেখানো হয়েছে ছবিটিতে যাতে একদিকে বাঙ্কারে পাকবাহিনী, তাদের মেশিনগান সক্রিয় হয়ে উঠেছে, অন্যদিকে গ্রেনেড ও ছোট অস্ত্র হাতে গাড়ির আড়ালে মুক্তিবাহিনী- তেমন বড় ধরনের লড়াই পুরো ’৭১-এ ঢাকা শহরে হয়নি। সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এভাবে লড়াই চালানোটা বাস্তবসম্মত নয়। অর্থাৎ ইতিহাসকে অনেক ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখানো হয়েছে এ ছবিতে।

‘আগুনের পরশমনি’তে মুক্তিযোদ্ধা বদি, মতিন সাহেব- এরা সবই ঢাকা শহরের শিক্ষিত স্বচ্ছল মধ্যবিত্ত অংশ থেকে আগত। মূলত এটি এই শ্রেণীর সক্রিয়তারই আলেখ্য। সাধারণ শ্রমজীবীরা, কর্মজীবী মানুষ যা-ও এতে আছে তারা মূলত নিষ্ক্রিয়। মতিন সাহেবের বড় মেয়ে রাত্রি, কিশোরী মেয়ে অপলা মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে দায়িত্ব সচেতন। কিন্তু কাজের মেয়ে বিন্তি হাস্যকরভাবে নিজ বিয়ে আর রূপচর্চা নিয়ে ব্যস্ত। এভাবে শ্রমজীবী মানুষকে হাসির উপাদান হিসেবে এ ছবিতে তুলে ধরা হয়েছে। একদিক থেকে দেখলে এখানে বাস্তবতাকে কিছুটা প্রতিফলিত করেছেন হুমায়ুন আহমেদ। কেননা ’৭১-এ আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব বা মেজর-কর্নেল সাহেবরা জনগণকে ফেলে ভারতে পালিয়েছিল এবং ভারতের ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা তাদের মুক্তিবাহিনী ছিল ছাত্র-শিক্ষিত মধ্যবিত্তদের মুক্তিবাহিনী। অন্তত নেতৃত্ব ছিল নিরংকুশভাবে এদের হাতে। শ্রমিক-কৃষক-সাধারণ মানুষ ছিল প্রধানত পরিত্যক্ত, অবহেলিত, প্রবেশাধিকার বিহীন।

হুমায়ূন আহমেদের চলচ্চিত্রে নারীরা ঘরে বন্দী। তারা কাঁদে আর নামায পড়ে। রাত্রি, অপলা, তার মা ও বদির মা-বোন সকলেই তাই। নায়িকা রাত্রি খাঁচায় বন্দী করে কবুতর রাখে, ঘড়ির কাঁটা অচল করে রাখে, এ কারণে যে দেশ মুক্ত হলে এদের মুক্তি দেবে, সচল করবে, রাস্তায় হারমোনিয়াম বাজাবে। রাত্রি কিন্তু যুদ্ধ করতে চায় না। দুঃস্বপ্ন দেখে আর কাঁদে। এই হচ্ছে হুমায়ূন আহমেদের নারী। অবশ্য এখানেও বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটেছে। ’৭১-এ যুদ্ধে নারীদের এভাবেই বাস্তবে মূলত পরিত্যাগ করা হয়েছিল।

প্রকৃতপক্ষে দেশের ভিতর থেকে আত্মনির্ভরতার ভিত্তিতে জনগণের গেরিলা যুদ্ধ গড়েই তোলেনি আওয়ামী লীগ ও মেজর-কর্নেলদের নেতৃত্ব। জনগণ ছিল পাকবাহিনীর বন্দুকের ডগায় নিষ্পেষিত, আর নেতৃত্ব ছিল ভারতে নিরাপদ আশ্রয়ে। ভারতীয় অস্ত্রে ভারতীয় পরিকল্পনায় গণবিচ্ছিন্ন অস্ত্রনির্ভর এ্যাকশনে অংশ নিতে চাইলে ভারতীয় ক্যাম্পে যেতে হবে। ফলে জনগণ তথা নারী ও শ্রমিক-কৃষকের জন্য ছিল যুদ্ধের দ্বার রুদ্ধ। বাস্তবে সচেতনভাবেই দ্বার রুদ্ধ করা হয়েছিল। হুমায়ূন আহমেদের চলচ্চিত্রেও ঘটনা তাই। কিন্তু সমস্যা যেখানে তা হলো হুমায়ূন আহমেদ এর পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। নারী বা সাধারণ মানুষের এই অবস্থানকে সমর্থন করেছেন। ’৭১-এর এই করুণ অবস্থানকে সমালোচনার দৃষ্টিতে দেখেননি। এভাবে এ ছবি মূল জনগণ ও নারী সম্প্রদায়ের বিপক্ষে চলে গেছে।

ধর্ম তথা নামায-কোরানের ব্যবহার ‘আগুনের পরশমনি’তে এতই বেশি যেন মনে হয় এদেশের মানুষের প্রধান পরিচয় তারা মুসলমান এবং তারা পাকিস্তানিদের চেয়ে ভাল মুসলমান। ১৯৭১ যেন ছিল কারা ভাল মুসলমান, আদর্শগতভাবে তার প্রতিযোগিতা। চলচ্চিত্র জুড়ে ধর্ম-কোরান আর জায়নামাজ- যা শুধু বি.এন.পি.-আওয়ামী লীগ-জাতীয় পার্টির কাছেই নয়, জামাতে ইসলামীর কাছেও গ্রহণীয়। বোঝা যায় হুমায়ুন আহমেদ এই প্রশ্নে সচেষ্ট ছিলেন। সংস্কৃতিতে এটি হচ্ছে, জনগণ ধর্ম মানে এই অজুহাতে ধর্মের প্রতিক্রিয়াশীলতাকে আরো গভীরভাবে চাপিয়ে দেয়ার প্রয়াস। প্রতিক্রিয়াশীল সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্যই এই। সর্বোপরি যে প্রশ্নটা সামনে চলে আসে তা হল, কি নির্মাণ করতে চেয়েছেন হুমায়ূন আহমেদ? ’৭১-এর যুদ্ধের উপাখ্যান, নাকি যুদ্ধের ঘটনাকে ব্যবহার করে একটি প্রেমের উপাখ্যান? বাস্তবে যা হয়েছে তা মূলত প্রেমের উপাখ্যান। ’৭১-এর যুদ্ধ হচ্ছে এর সূত্র মাত্র। এ কারণেই মুক্তিযোদ্ধা বদি, কিংবা তার চরম আত্মত্যাগী সহযোদ্ধা রাশিদুল করিমের চেয়ে তরুণী রাত্রি সামনে চলে এসেছে।

যুদ্ধকে হুমায়ুন আহমেদ এনেছেন অত্যন্ত খেলোভাবে। কোন সিরিয়াস সামরিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়নি।

’৭১-এর ঢাকায় বদির মত তরুণ উস্কোখুস্কো চেহারা নিয়ে ছালার ব্যাগে আধা প্রকাশ্যভাবে ষ্টেনগানের মত অস্ত্র নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে- এটা সামরিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বাস্তবসম্মত নয়। একইভাবে গ্রহণযোগ্য নয়, একই গাড়িতে বারংবার অপারেশন করা। সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটাও হাস্যকর যে, ডিনামাইট ফিট করে অল্পদূরে পাশেই রাস্তায় দাঁড়িয়ে বিস্ফোরণ চেয়ে চেয়ে দেখা। কমান্ডার বদি নিজে শহরের এ্যাকশনে এমনটা করেছেন- এভাবেই ছবিতে দেখানো হয়েছে। হুমায়ুন আহমেদ বলতে পারেন, বাস্তব ঘটনাবলী এভাবে ঘটেছে। সত্যিকার একটি গণযুদ্ধ গড়ে না ওঠার কারণে এবং ছাত্র ও শিক্ষিত তরুণদের নিয়েই মূল জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন মুক্তিবাহিনী গড়ার কারণে যতটুকু এ্যাকশন হয়েছিল তাও হয়েছিল সামরিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে অনেক ক্ষেত্রেই আনাড়ীভাবে। কিন্তু একজন সচেতন লেখক বা পরিচালকের উচিত এক্ষেত্রে সমালোচনামূলক অবস্থান গ্রহণ করা, যা হুমায়ূন আহমেদ পারেননি। তথাপি, ’৭১-এর ঐসব এ্যাকশনও হুমায়ূন আহমেদের ছবির মত এতবেশি আনাড়ী ছিল না। এদেশের বুদ্ধিজীবীরা ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ নামে অজ্ঞান, অথচ তারা-যে কোন প্রকৃত নির্মম কষ্টকর গেরিলাযুদ্ধের তিক্ত অভিজ্ঞতা অর্জন করেননি, তা আরো প্রমাণিত হয় এ ছবিটাতে।

আরো কিছু অসংগতি রয়েছে। যেমন বদি মায়ের সাথে দেখা করতে গেলে, তার মা বলল, যে বাড়িতে সে আশ্রয় নিয়েছে সে বাড়ির মেয়েকে বদির  সাথে বিয়ে দেবে কিনা। পরিস্থিতির সঙ্গে এই সংলাপ অসংগতিপূর্ণ ও স্থূল। প্রেমের ছবি বানানোর জন্যই এটা এসেছে।

অবশ্য এরপরও শিক্ষিত মধ্যবিত্তরা ছবিটি দেখেছেন ও প্রশংসা করেছেন। কারণ হুমায়ুন আহমেদ এই শ্রেণীটির অনুভূতি বোঝেন এবং সেখানে নাড়া দিতে চেয়েছেন। এর থেকেই এসেছে বদির মায়ের উপরোক্ত সংলাপ। রাত্রির চরিত্র এভাবেই নির্মিত হয়েছে। অপলা চরিত্রের বৈশিষ্ট্যও তাই। এককথায় শিক্ষিত স্বচ্ছল মধ্যবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্তের স্থূল অনুভূতিকে নাড়া দিতে চেয়েছেন হুমায়ুন আহমেদ।

কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে চমৎকারীত্ব রয়েছে। যেমন, বদির মামা যখন নিহত হলেন তখন তাকে দেখানো হলো না, দেখানো হলো রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। অথবা কুকুরের রক্ত চাটা। অভিনয়ে যিনি বদির মামার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন এককথায় তিনি অতি চমৎকার। ডলি জহুরও সুন্দর সাবলিল অভিনয় করেছেন। আবুল হায়াত তার স্বভাবসূলভ অভিনয়ের স্বাক্ষর রেখেছেন। আসাদুজ্জামান নুর তার নিজস্ব ধাঁচের অভিনয়ের গণ্ডীতেই আবদ্ধ ছিলেন। রাত্রির ভূমিকায় বিপাশার জড়তা কাটেনি। অপলা চরিত্রের অভিনয়ও দর্শকের মনে আঁচড় দেয়ার মতো। কিন্তু এর পরও কেন যেন মনে হয়েছে ‘আগুনের পরশমনি’ বড় পর্দার চলচ্চিত্র হওয়া সত্ত্বেও টেলিভিশনের ধারাবাহিক নাটকের ধরনটাকে অনেকটাই বজায় রেখেছে। এখানে সম্ভবত পরিচালনায় সীমাবদ্ধতা।

১৯৭১ ইতিহাসের একটা রক্তাক্ত অধ্যায়। ব্যাপক জনগণের ত্যাগ-তিতিক্ষার অধ্যায়। একই সাথে তা এদেশের শাসক বড় বুর্জোয়া শ্রেণী, তাদের বড় বড় রাজনৈতিক দল এবং বুর্জোয়া রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের কলঙ্ক, ব্যর্থতা, কাপুরুষতা, দেউলিয়াত্ব ও বিশ্বাসঘাতকতার এক দৃষ্টান্ত। একারণে ’৭১ একটি সত্যিকার গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধের জন্ম না দিয়ে বরং পরিণত হয়েছে ইতিহাসের ট্র্যাজেডিতে। শাসকশ্রেণী তাদের এ কলঙ্ককে মুছে ফেলতে চায়। তারা তাই ইতিহাসকে বিকৃত করে, ’৭১-এর চেতনার নামে দেশ বিক্রেতা প্রতিক্রিয়াশীল বাঙালী জাতীয়তাবাদের বিষবাষ্প ছড়ায় এবং জনগণের আজকের সংগ্রামের বিরুদ্ধে তাকে ব্যবহার করে। হুমায়ূন আহমেদ শাসক শ্রেণীর ইতিহাসের এই বিকৃতিকে ধারণ করেছেন। এ কারণেই এটি কোন সঠিক দিশা তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছে এবং পরিণত হয়েছে গণশত্রু বুর্জোয়া শাসক শ্রেণীর এক প্রয়োজনীয় ও তথাকথিত সুস্থ সাংস্কৃতিক হাতিয়ারে। এদেশের শ্রমিক, কৃষক ও প্রগতিশীল জনগণকে এই হাতিয়ারের বিরুদ্ধে দাঁড়াতেই হবে- নিজেদের প্রকৃত মুক্তি সংগ্রামকে এগিয়ে নেবার স্বার্থেই। অতীতের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে নিজেদের শ্রেণী স্বার্থের অবস্থান থেকে মূল্যায়ন করার জন্যই। এবং তাহলেই প্রকৃত ইতিহাসও বেরিয়ে আসবে, তাকে ভয়াবহ বিকৃতি থেকে রক্ষা করা যাবে এবং তাকে প্রতিষ্ঠিত করা যাবে।


বাঁশখালীতে রাষ্ট্রীয় দমনের প্রতিবাদে ‘নয়া গণতান্ত্রিক গণমোর্চা’র বিবৃতি

2016_04_04_21_02_00_oOle8gZxt1Y4FupsG7VL6i6yC68RoF_original

নয়া গণতান্ত্রিক গণমোর্চা
(New Democratic Peoples Forum)
জাতীয় কমিটি

বিবৃতি

বাঁশখালীতে সংগ্রামী জনতার উপর পুলিশের গুলি, বর্তমান ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রের জনবিরোধী ও পুঁজিপতিদের সেবা করার নগ্ন বহিঃপ্রকাশ
জনগণ আন্দোলন অব্যাহত রাখবে এবং বাধা অতিক্রম করে বিজয় অর্জন করবে

নয়া গণতান্ত্রিক গণমোর্চার জাতীয় নেতৃবৃন্দ এক বিবৃতিতে চট্টগ্রাম এর বাঁশখালীতে কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ এর বিরুদ্ধে আন্দোলনরত সংগ্রামী জনতার উপর গুলি এবং ৪ জনকে গুলি করে হত্যা করার তীব্র প্রতিবাদ জানান।
তারা বলেন, এই সরকার ও তার খুনী বাহিনী জনতার উপর নির্মম ভাবে গুলি চালিয়েছে।আজ এমন একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে যে, রাষ্ট্র যখন তখন যাকে খুশি তাকে পাখির মত গুলি করে হত্যা করছে।চলমান ইউপি নির্বাচনেও একি অবস্থা দেখা গেছে। পুলিশ নির্বিচারে গুলি করে মানুষ মারছে। অর্থাৎ বর্তমান ফ্যাসিবাদী সরকার জনগণ এর উপর ধারাবাহিক ভাবে অত্যাচার নির্যাতন করছে।
আজ যখন জনগন এস আলম কোম্পানী ও চাইনিজ কোম্পানীর কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিরোধিতা করছে তখন পুলিশ তাদের উপর গুলি করছে। আসলে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র কার স্বার্থে?? যখন সাধারণ জনগন এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র চাচ্ছেন না এবং তার প্রতিবাদে মিছিলে সমাবেশে গুলি চলছে তখন আর বুঝতে বাকি থাকে না যে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র কার স্বার্থে। এই রাষ্ট্র পুঁজিপতিদেরই স্বার্থ রক্ষা করে।তার জ্বলন্ত উদাহরণ এই সংগ্রামী জনতার উপর গুলিবর্ষণ।
এটা বন্ধ করার একমাত্র উপায় ঐক্যবদ্ধ হয়ে ফ্যাসিবাদী এই রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে উচ্ছেদ করা।
আর সেই লক্ষ্যে বিপ্লবী  বল প্রয়োগের গণ আন্দোলন গড়ে তোলা।আশা করি বাঁশখালীর সংগ্রামী জনতা পুলিশের ও রাষ্ট্র এর এই চরিত্র অনুধাবন করবেন ও সেই লক্ষ্যে নিজেরা সজ্জিত হয়ে আন্দোলন চলমান রাখবেন।

বার্তা প্রেরক
তৌহিদুল ইসলাম

মোবাইল:০১৯১৫২২১৯৮০