ভারতের গণযুদ্ধের সংবাদ- ০৭/০৪/২০১৬ তারিখের

মাওবাদী নেত্রী ভুত্তাম অন্নপূর্ণা

মাওবাদী নেত্রী ভুত্তাম অন্নপূর্ণা

CB07-DRILL_GCBC_CB_2804154f

ভারতের গণযুদ্ধের সংবাদ- ০৭/০৪/২০১৬ তারিখের

  • গত ৬ই এপ্রিল ছত্তিসগড়ের বস্তারে কোন্দাগাও জেলা ও কঙ্কার জেলায় সিপিআই(মাওবাদী)’র গেরিলারা ৩ জন গ্রামবাসীকে জন-আদালতে বিচারের পর হত্যা করেছে।

  • গত বুধবার জেলার পুলিশ ও সিআরপিএফ-এর ২৬ ব্যাটালিয়নের একটি যৌথ দল বোকারোতে স্কুলের ছাদ থেকে মাওবাদীদের পেতে রাখা ৩কেজির IED বিস্ফোরক উদ্ধার করেছে। স্কুলের পার্শ্ববর্তী এলাকা মাওবাদী বিরোধী দমন অভিযানের যাতায়তের পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

  • গত মঙ্গলবার রাতে ছাপ্রা জেলায় এক স্বর্ণ ব্যবসায়ীর কাছ থেকে সাংগঠনিক অর্থ সংগ্রহ করতে গেলে পুলিশ ২ জন সক্রিয় মাওবাদী সদস্যকে গ্রেফতার করে। ওই ব্যবসায়ী ইতিপূর্বে মাওবাদীদের নামে থানায় এজাহার দায়ের করেছিল।

  • বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স অপারেশনস অধিদপ্তর কর্তৃক প্রেরিত একটি সতর্ক বার্তায় বলছে যে, মাওবাদীরা এখন উন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে দূরবর্তী বা সুইচের সমন্বয়ের মাধ্যমে নিরাপত্তা বাহিনীকে লক্ষ্য করে আইইডি-IED বিস্ফোরণ ঘটাতে সক্ষমতা অর্জন করেছে।

  • গত বৃহস্পতিবারে ঝাড়খণ্ডের গিরিধি জেলায় মাওবাদী গেরিলাদের পেতে রাখে IED বিস্ফোরণে ৩জন CRPF জওয়ান জখম হয়েছে।

  • রায়গদা জেলায় যৌথ বাহিনীর অভিযান বন্ধের দাবী সম্বলিত মাওবাদীদের পোস্টার উদ্ধার করেছে পুলিশ।

  • মধ্যপ্রদেশের বালাঘাট জেলায় গতকাল পুলিশের সাথে নকশালদের বন্দুকযুদ্ধে একজণ নকশাল আহত হয়েছেন। নকশালরা আহত সাথীকে তাদের সাথে নিয়ে যায় বলে জানিয়েছে পুলিশ।

  •  মধ্যপ্রদেশের বালঘাট জেলায় গ্রামবাসীদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে ৬জন নারী গেরিলাসহ ২০জনের নকশালদের একটি দল ‘ক্যাঙ্গারু কোর্ট’ আহবান করে, যেখানে গ্রাম পঞ্চায়েতকে মহাত্মা গান্ধী ন্যাশনাল রুরাল এমপ্লয়মেন্ট গ্যারান্টি অ্যাক্ট (MGNREGA) এর অধীনে শ্রমিকদের মজুরির বকেয়া বেতন নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে অথবা তাদের পদত্যাগ করতে বলেছে।

  • কোম্বাটোর জেলায় মাওবাদী হামলা মোকাবেলায় প্রস্তুতি স্বরূপ স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (এসটিএফ) এর কর্মকর্তারা, পুলিশ কর্মকর্তাদের জন্য তিনদিনের একটি প্রতিরক্ষা প্রশিক্ষণ ক্যাম্প পরিচালনা করেছে।

  • মাওবাদী নেত্রী ভুত্তাম অন্নপূর্ণাকে গ্রেফতারের পর পুলিশ তাল্লেইপালেম এ উচ্চ সতর্কাবস্থা জারী করেছে।

 

অনুবাদ সূত্রঃ

http://www.satp.org/satporgtp/detailed_news.asp?date1=4/7/2016&id=3#3

http://timesofindia.indiatimes.com/city/jamshedpur/IED-on-Bokaro-school-roof/articleshow/51724565.cms

http://timesofindia.indiatimes.com/city/patna/Two-Maoists-arrested/articleshow/51719284.cms

http://www.firstpost.com/india/concerns-mount-for-security-forces-after-maoists-acquire-advanced-tech-to-trigger-off-ieds-2716926.html

http://timesofindia.indiatimes.com/city/ranchi/3-CoBRA-jawans-injured-in-Jharkhand-blast/articleshow/51728867.cms

http://timesofindia.indiatimes.com/city/bhubaneswar/Maoist-posters-found-in-Rayagada/articleshow/51722571.cms

http://www.ptinews.com/news/7308518_One-ultra-hurt-in-encounter-with-police-in-MP.html

http://www.firstpost.com/india/naxals-hold-kangaroo-court-order-sarpanch-to-pay-workers-under-mgnrega-or-resign-2716322.html?utm_source=FP_CAT_LATEST_NEWS

http://www.thehindu.com/news/cities/Coimbatore/training-camp-for-police-personnel-concludes/article8443669.ece

http://www.newindianexpress.com/states/andhra_pradesh/Arrested-Maoist-Leader-Believes-in-Change-Only-Thru-Revolutions/2016/04/07/article3367677.ece

Advertisements

পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টি-র মতাদর্শগত তত্ত্বগত মুখপত্র “লালঝাণ্ডা”

poster

পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টি-র এর মতাদর্শগত তত্ত্বগত মুখপত্র “লালঝান্ডা”

(মাওবাদী বলশেভিক পুনর্গঠন আন্দোলনMBRM কর্তৃক প্রকাশিত প্রচারিত)

 

লালঝাণ্ডা – ১

লালঝাণ্ডা – ২

(উপরের “লালঝাণ্ডা- ” এবং “লালঝাণ্ডা- ক্লিক করে পুস্তকসমূহ পড়াdownload করা যাবে)

সূত্রঃ pbspmbrm


বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামী যোদ্ধা কল্পনা দত্ত

Kalpana_Dutt

বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামী যোদ্ধা কল্পনা দত্ত

সারা ভারতবর্ষে ১৭৫৭ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত বৃটিশ ঔপনিবেশিক দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে যে ক’জন নারী সশস্ত্র বিদ্রোহে অংশগ্রহণ করেছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন কল্পনা দত্ত।

তৎকালীন ভারতবর্ষের বাংলায় চট্টগ্রাম জেলার শ্রীপুর গ্রামে ১৯১৩ সালের ২৭ জুলাই কল্পনা দত্ত জন্মগ্রহণ করেন।

১৯২৯ সালে মেট্রিক পাশ করে কলকাতা বেথুন কলেজে ভর্তি হন। বেথুন কলেজের যখন তিনি ছাত্রী তখন থেকে রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হন। দারিদ্রপীড়িত ভারতীয় সমাজের শ্রেণি বৈষম্য, নারীর প্রতি সহিংসতা, নিপীড়ন, বৈষম্য বিশেষভাবে তাকে আলোড়িত করে। এবং সর্বোপরি দেশব্যাপী বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সশস্ত্র বিদ্রোহের অগ্নিশিখা দাবানলের মতো যখন ছড়িয়ে পড়েছে, কল্পনা দত্ত রাজনৈতিক  মনোমুগ্ধে তখন বিদ্রোহে ঝাঁপিয়ে পড়তে কুন্ঠাবোধ করেননি।

কল্পনা দত্ত প্রথমে যোগদান করলেন বেথুন কলেজের ছাত্রীদের দাবি দাওয়া ভিত্তিক সংগঠন কল্যানী ঘোষের ‘ছাত্রী সংঘে’। ছাত্রী সংঘের মাধ্যমেই তার যোগাযোগ হয় সূর্যসেন ও তার স্বদেশী আন্দোলনের নেতা পূর্ণেন্দ্র দস্তিদারের সাথে। এরপর থেকেই তিনি পুরোদমে কাজ করতে শুরু করলেন।

মাষ্টারদা সূর্যসেন ১৯৩১ সালে চট্টগ্রামের পাহাড়তলীর ইউরোপীয়ান ক্লাব আক্রমণের পরিকল্পনা করেন। ইউরোপীয়ান ক্লাব আক্রমণের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পান কল্পনা দত্ত এবং প্রীতিলতা। কিন্তু অপারেশনের পূর্বেই কল্পনা দত্ত গ্রেফতার হয়ে যাওয়ায় তাতে তিনি অংশ নিতে পারেননি। এই অপারেশনেই প্রীতিলতা শহীদ হন। গ্রেফতার হলেও কল্পনা দত্ত তার বুদ্ধিমত্তা দিয়ে বৃটিশ আইন ও পুলিশকে ফাঁকি দিতে সক্ষম হন। বৃটিশ পুলিশ তাকে জামিনে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। কল্পনা দত্ত’র এই কেস ‘ভ্যাগাবন্ড কেস’ নামে পরিচিত ছিল।

মুক্তি পেয়ে কল্পনা দত্ত গোপন জীবনে চলে যান এবং সূর্যসেনের সাথে সার্বক্ষণিকভাবে কাজ শুরু করেন। সহকর্মী অনন্ত সিং-সহ জেলবন্দীদেরকে মুক্ত করার লক্ষ্যে (ডিনামাইট বানানোর জন্য মাল সংগ্রহ করে) চট্টগ্রামের বাড়িতে ডিনামাইট বানিয়ে পাঠানোর পূর্বেই ১৯৩৩ সালে কল্পনা দত্ত’র উপর পুলিশের নজরদারি আসে।

এই পরিস্থিতিতে চট্টগ্রামে বৃটিশ বিরোধী বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক গ্রেফতার, জেল-জুলুম-হত্যা বেড়ে গেল। চট্টগ্রামকে মিলিটারি এরিয়া ঘোষণা করা হল। প্রতিটি গ্রামে মিলিটারী ক্যাম্প বসানো হলো। ১৯৩৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি সূর্যসেন বৃটিশ পুলিশের হাতে গ্রেফতার হলেন। কল্পনা দত্ত পুলিশের ঘেরাও ভেঙ্গে তখন বের হতে পারলেও ১৯ শে মে সমুদ্রের পাড়ে গাহিরা গ্রামে তারকেশ্বর দস্তিদার, মনোরঞ্জন দত্ত, মনোরঞ্জন সেন, অর্ধেন্দু গুহসহ মিলিটারির ঘেরাওয়ে পড়েন। কল্পনা দত্তরা মিলিটারির সাথে দীর্ঘ সময় যুদ্ধ চালান। কিন্তু এক পর্যায়ে তাদের গুলি শেষ হয়ে যায়। এই যুদ্ধে মনোরঞ্জন দত্ত শহীদ হন। এবং প্রায় সকলেই গ্রেফতার হন। গ্রেফতার হবার পর কল্পনা দত্তকে হাতকড়া পরিয়ে কোমরে দড়ি বেঁধে টেনে হিঁচড়ে যখন শারীরিক ও অন্যান্য টর্চার করতে-করতে নিয়ে যাচ্ছিল তখন মিলিটারি সুবেদারের বিরুদ্ধে সাধারণ সিপাহীগণ প্রতিবাদ করছিলেন।

 কল্পনা দত্তের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়- রাষ্ট্রদ্রোহ, বিস্ফোরক আইন, অস্ত্র আইন, হত্যা- ইত্যাদি। এই মামলার আসামী করা হয়েছিল কল্পনা দত্ত ছাড়াও সূর্যসেন, তারেকেশ্বর দস্তিদারকে। এই মামলায় সূর্যসেন এবং তারেকেশ্বরকে ফাঁসি দেয়া হয়। কল্পনা দত্তকে ‘মহিলা’ এবং বয়স কম বলে যাবজ্জীবন দীপান্তর দেয়।

জেলের ভেতর কল্পনা দত্ত তার বিপ্লবী দৃঢ়তা অব্যাহত রাখেন। রাজবন্দীদের সঙ্গে থাকার কারণে বহির্জগত সম্পর্কে জানার সুযোগ হয়। তাদের মাধ্যমে কমিউনিস্ট ধারার বইপত্র সংগ্রহ করে পাঠ করেন। এবং স্বদেশী আন্দোলন থেকে তার চিন্তাভাবনাকে পরিচালিত করেছিলেন নতুন এক পথে- যা হলো মানবমুক্তির কমিউনিস্ট দর্শন।

১৯৩৭ সালে প্রাদেশিক স্বায়ত্বশাসন প্রতিষ্ঠা পায়। রাজবন্দীদের আন্দামান থেকে ফিরিয়ে আনা এবং মুক্তির দাবিতে ছাত্র-জনতার তুমুল আন্দোলনের মুখে কল্পনাকে সরকার মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।

মুক্তির এক সপ্তাহ পরেই কল্পনা দত্ত তৎকালীন ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সাথে যোগাযোগ করেন।

১৯৪০ সালে কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। কল্পনা দত্ত আত্মগোপন করে কাজ চালিয়ে যান। ১৯৪১ সালে চট্টগ্রামে সাম্রাজ্যবাদী জাপানী আক্রমণকারীদের হামলার আশংকা দেখা দিলে জাপান বিরোধী প্রচার কাজে যোগ দেন।

১৯৪৩ সালে বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদীদের সৃষ্ট দুর্ভিক্ষে সারা বাংলায় ৫০ লক্ষ এবং চট্টগ্রামে ২ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়। সেই সময়ে কল্পনার নেতৃত্বে গঠিত ‘মহিলা সমিতি’ নিরন্ন, দরিদ্র, অসহায় মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। ১৯৪৩ সালেই তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন। এই বছরেই তিনি বোম্বাইতে অনুষ্ঠিত কমিউনিস্ট পার্টির সম্মেলনে চট্টগ্রামের প্রতিনিধিত্ব করেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার আগে ১৯৪৫ সালে চট্টগ্রামের হাটহাজারী থানায় কাছাড়পাড়া গ্রামের মুসলিম পাড়ায় দেশী-বিদেশী সেনাদল আক্রমণ করে ব্যাপক নারী ধর্ষণ করে। কল্পনা দত্ত কংগ্রেসসহ অন্যান্য বুর্জোয়া দল নিয়ে এই হামলার প্রতিবাদে ৭ দিন হরতাল ঘোষণা করেন।

এছাড়াও তিনি সামাজিক সমস্যা ও নিজের বিপ্লবী জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখালেখিও করেছেন।

ব্যক্তিগত জীবনে তিনি সর্বভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক পূরণ চাঁদ যোশীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবন্ধ হন। ১৯৯৫ সালে তিনি ৮১ বছর বয়সে মৃত্যু বরণ করেন।

কল্পনা দত্ত’র সশস্ত্র বিপ্লবী জীবনের কাজ আমাদের দেশের বিপ্লবী নারী এবং সাধারণ নারীদের জন্য শিক্ষনীয় হয়ে থাকবে। বিংশ শতকের গোড়ার দিকে ভারতবর্ষে যে ক’জন  নারী বৃটিশ বিরোধী সশস্ত্র আন্দোলনে যোগ দেন তাদের মধ্যে কল্পনা দত্ত অন্যতম। সেকালে যে বিপ্লবী চেতনা ও ব্যক্তিগত সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন সেটা শিক্ষনীয়। নারীদের মুক্তি সংগ্রামে বের করে আনার জন্য তা এক অত্যুজ্জল দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেও কল্পনা দত্ত’র পরবর্তী রাজনৈতিক জীবনে তিনি সংশোধনবাদী সংস্কারবাদে গড়িয়ে পড়েন ও সংশোধনবাদী সিপিএম-এ যোগ দেন। শেষ জীবনে কল্পনা দত্ত যে রাজনীতি চর্চা করেছেন তা নারীজাতির মুক্তির সুপথ ছিল না। বরং তা ছিল অন্তরায়। এটা ছিল তার গুরুতর রাজনৈতিক দুর্বলতা। কল্পনা দত্ত সম্পর্কে এই মূল্যায়ন মাথায় রেখেই সচেতন নারী সমাজকে এগিয়ে যেতে হবে


বিদেশে নারী শ্রমিকদের দুঃসহ জীবন- দায়ী পুঁজিবাদী ব্যবস্থা ও শাসক শ্রেণি

Bangladeshi-female-migrant-workers

বিদেশে নারী শ্রমিকদের দুঃসহ জীবন দায়ী পুঁজিবাদী ব্যবস্থা ও শাসক শ্রেণি

 

মধ্যযুগে ইউরোপ থেকে সাদা চামড়ার বিত্তশালী মানুষরা আফ্রিকায় গিয়ে বন্দুকের ডগায় জোর কারে কালো নারী-পুরুষদের ধরে ধরে জাহাজে করে ইউরোপে নিয়ে দাস মালিকদের কাছে বিক্রি করত। আজকের বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদী-পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় সে বর্বরতার রূপের দিক থেকে কিছু পরিবর্তন হলেও সারবস্তুগত কোনই পরিবর্তন হয়নি। আধুনিক সভ্য সমাজে মানুষ পাচারের কাহিনী ভিন্ন। জনশক্তি রপ্তানির নামে বিদেশে দরিদ্র নারী-পুরুষদের বেশুমার পাচার করে দেশী-বিদেশী দালালচক্র কোটি কোটি টাকার মুনাফা লুটছে। এই দালাল চক্র আর কেউ নয় দেশের এবং বিদেশের পুঁজিপতি শাসক শ্রেণিরই অংশ।

বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর সাম্রাজ্যবাদ নির্ভর এ দেশের শাসকশ্রেণি দেশের দরিদ্র মানুষের জন্য কর্মসংস্থান করতে ব্যর্থ হয়ে বিদেশে জনশক্তি রপ্তানী করছে। এই সুবাদে দেশে এবং বিদেশে গড়ে উঠে বৈধ-অবৈধ হরেক রকমের রিক্রুটিং এজেন্সি। এরা আদম ব্যবসায়ী নামে পরিচিত। এই আদম ব্যবসায়ী দালাল চক্র উন্নত জীবন, ভালো চাকরী, মোটা অংকের বেতন ইত্যাদির  লোভ দেখিয়ে দরিদ্র শ্রেণির মানুষদের বিদেশগামী করে। ’৮০’র দশক থেকে শুরু হওয়া এই মানব পাচার একবিংশ শতাব্দিতে জনস্রোতে রূপান্তরিত হয়। এই মানব পাচারে নারী পাচারও চলে সমান তালে। দরিদ্র নারীরা এই প্রলোভনে পড়ে ভিটে-মাটি বিক্রি বা ঋণ করে লক্ষ লক্ষ টাকা দালালদের হাতে তুলে দিয়ে বিদেশে পাড়ি জমায়।

গৃহকর্মী, হাসপাতালের আয়া, নার্স, গার্মেন্ট শ্রমিক বা অন্যান্য শ্রমজীবী পেশার, এমনকি বিয়ের প্রলোভনে ফেলেও হাজার হাজার নারীকে  দেশ থেকে পাচার করা হচ্ছে। এই নারীদের পতিতাবৃত্তি করতে বাধ্য করা হচ্ছে বা পতিতা হিসেবে বিক্রি করে দেয়া হচ্ছে। আর যারা শ্রমিক হিসেবে পেশায় নিয়োজিত হতে পারছেন তারাও নানাভাবেই শোষণ-নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন, বিশেষত যৌন নির্যাতনের শিকার।

গৃহকর্মী বা অন্যান্য পেশার নামে দালাল চক্র হাজার হাজার দরিদ্র নারী ও শিশুদের ভারত, পাকিস্তান এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে  পাচার করছে। মালয়েশিয়ায়ও যে পাচার করা হচ্ছে তা গত বছর সাগরে ভাসা মানুষের চিত্র থেকে বেরিয়ে এসেছে।  ২৮ মে, ২০১৫-এর পত্রিকায় প্রকাশ, বাংলাদেশ থেকে নারী পাচারের ক্ষেত্রে ভয়ংকর দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে ভারত। “সেভ দ্য চিল্ড্রেন” জরিপ সুত্রে জানা যায় বিগত পাঁচ বছরে শুধু ভারতেই পাঁচ লাখ নারী ও শিশু পাচার হয়েছে। জাতিসংঘের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান ইউনিসেফের বরাত দিয়ে ইউএনডিপি’র ভারপ্রাপ্ত কান্ট্রি ডিরেক্টর বলেছেন, বাংলাদেশ থেকে গত ১০ বছরে ৩ লাখ নারী ও শিশু ভারতে পাচার হয়েছে। একই সময়ে পাকিস্তানে পাচার হয়েছে ২ লাখ নারী ও শিশু। এই নারী ও শিশুর বয়স ১২-৩০ বছরের মধ্যে। টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৫০ হাজার নারী ও শিশু ভারত পাকিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্যে পাচার হয়ে থাকে। এই সব নারীর বেশীর ভাগ পতিতাবৃত্তি করতে বাধ্য হন। ভারতীয় সমাজ কল্যাণ বোর্ডের এক তথ্য থেকে জানা যায় সেখানকার বিভিন্ন পতিতা পল্লীতে প্রায় ৫ লাখ পতিতা কর্মী রয়েছে। এর বেশীর ভাগ বাংলাদেশী। চাকুরী, বিয়ে এবং আর্থিক প্রলোভন দেখিয়ে এই নারীদের পাচার করা হয়েছে ও হচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যেও একই পরিণতির শিকার নারী ও শিশুরা। হাসপাতালে চাকুরী দেয়ার কথা বলে কাতারে নিয়ে গিয়ে বেশ কিছু নারীকে পতিতালয়ে বিক্রি করে দিয়েছে বলে পত্রিকায় প্রকাশ। সেখানে বিভিন্ন দেশের পর্যটকদের মনোরঞ্জন করাসহ দুর্বিসহ জীবনে আটকে পড়েছে কয়েকশ বাংলাদেশী নারী। শুধু কাতারেই নয়, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কয়েকশ’ পতিতালয়ে বাংলাদেশী তরুণী-যুবতীরা পতিতাবৃত্তি করতে বাধ্য হচ্ছেন। দুবাইয়ের পতিতালয়, হোটেল, রেস্তোরাঁ, পানশালা এবং ফ্লাটসমূহে নারীর রমরমা বাণিজ্য ব্যাপকভাবেই চলছে। দুবাইয়ের পত্রিকাসূত্রে জানা গেছে শুধু দুবাইতেই অন্ততঃ ৩০ হাজার বাংলাদেশী নারী ইচ্ছা-অনিচ্ছায় দেহ ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছে।

 এ সময় সিরিয়া থেকে তিনজন নারী দেশে ফিরে আসার পর তাদের সাক্ষাৎকার টিভিতেও প্রচার করা হয়। এরপর পরই পুলিশ-প্রশাসনের কার্যালয়ে ভুক্তভোগীদের পরিবার পরিজন দৌড়াদৌড়ি শুরু করে। ১৭/৯/১৫ এ এমন ৩৫ জনের নাম ঠিকানা পত্রিকায় প্রকাশ করা হয়। যারা দেশে পরিবার-পরিজনের কাছে সংবাদ পাঠাতে পারছেন তারাই হয়ত উদ্ধারের চেষ্টা করছেন। আর যারা পারছেন না, তারা হয়তো অন্ধকার জীবনেই পচে মরছেন। অনেকেই হয়তো এর সাথেই মানিয়ে চলছেন অসহায় হয়ে।

বিদেশে নারী শ্রমিকদের দুঃসহ জীবনের কথা পত্র-পত্রিকায় প্রচার হওয়ার কারণেই গত বছর  মে-জুনে সরকার সৌদী আরবে (৩ পৃষ্ঠায় দেখুন) ২০ হাজার গৃহকর্মী এবং মাসে মাসে ১০ হাজার করে গৃহকর্মী পাঠানোর ঘোষণা দিলেও সে পরিমাণ সারা পায়নি। ২০০৮ সালে সৌদি আরবে বাংলাদেশের শ্রম বাজার বন্ধ হয়ে যায়। সৌদি আরব এ সময় শ্রীলঙ্কা, ভারত, ভিয়েতনাম, মৌরতানিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন থেকে গৃহকর্মী নিচ্ছিল। গৃহকর্মী হিসেবে যাওয়া মেয়েরা শারিরীক ও মানসিকভাবে নির্যাতনের শিকার হওয়ায় এই সব দেশ থেকে এখন নারী কর্মী পাঠনো প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে। এ কারণেই সৌদি আরব এখন বাংলাদেশ থেকে গৃহকর্মী নেয়ার চুক্তি করেছে।

 যারা শ্রমিক হিসেবে কাজ পেয়েছেন তারাও শ্রম শোষণের শিকার হচ্ছেন। ভোর ৫টা থেকে রাত ১০/১১ টা পর্যন্ত কাজ করতে হয়। সৌদি আরবে পাঠানো গৃহকর্মীদের বেতন ধরেছে মাত্র ৮০০ রিয়াল যা বাংলাদেশের টাকায় ১৬/১৭ হাজার টাকা। লেবানন থেকে ফেরত আসা এক নারী শ্রমিক থেকে জানা যায় গৃহকর্মী হিসেবে তার বেতন ছিল মাত্র ১২ হাজার টাকা। অন্যান্য দেশের গৃহকর্মী এবং গার্মেন্ট শ্রমিকরাও এই পরিমাণ বেতনই পেয়ে থাকেন। বিদেশে নারী শ্রমিকরদেরও মজুরী কম এবং তারা মজুরী বৈষম্যের শিকার। অসুস্থ হলে চিকিৎসা না করে তাদেরকে দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেয়।

 গৃহকর্মীদের বন্দী জীবন-যাপন করতে হয়। ঘরের বাইরে একাকী যেতে দেয়া হয় না, বাংলাদেশী নারী শ্রমিকদের সাথে কথা বলতে দেয়া হয় না। যদি তারা পালিয়ে গিয়ে অন্যত্র কাজ নেন। গৃহমালিকরা বাড়ীর বাইরে গেলে ঘরে তালা লাগিয়ে যায়। অমানুষিক ও অতিরিক্ত কাজ করানো হয়। অনেকেই শারিরীক নির্যাতনের শিকার হন।  ইচ্ছা করলেও চাকরী পরিবর্তন করতে পারে না বা করলেও টাকা পয়সা আদায় করা যায় না। বা তা আদায় হলেও দালালরা নিয়ে নেয়। এই সব গৃহশ্রমিকগণ গৃহকর্তা এবং তাদের ছেলেদের দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার হন হরহামেশাই। যৌন নির্যাতনের শিকার নারীরা অন্তসত্ত্বা হয়ে পড়লে তাদেরকেই আবার অনৈতিক সম্পর্কের জন্য কঠোর শাস্তি প্রদান করা হয় মধ্যপ্রাচ্যের আদালতগুলোতে। এই নারীদের শাস্তিস্বরূপ শারিরীক নির্যাতন করা হয়।

২৭ অক্টোবর ‘১৫ এ পত্রিকায় প্রকাশ গৃহশ্রমিক হিসেবে কাজ করার সময় ধর্ষণের শিকার হয়ে অন্তঃসত্তা হয়ে পড়া শত শত নারীকে ব্যভিচারের দায়ে বিচার করছে সংযুক্ত আরব আমিরাত কর্তৃপক্ষ। বিবিসির অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এ তথ্য। -দ্য গার্ডিয়ান বিবিসির এক গোপন ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, অন্তঃসত্ত্বা নারীদের শেকল দিয়ে বেঁধে আদালতে বিচারকের সামনে হাজির করা হচ্ছে। লন্ডনের হিউম্যান রাইটস ওয়াচের নারী অধিকার গবেষক রথনা বেগম বলেন ‘……… যৌক্তিকভাবে এই অপরাধের জন্য নারী ও পুরুষ উভয়কে দন্ডিত করা উচিত হলেও কেবল নারীরাই আসছেন বিচারের আওতায়। কেননা গর্ভধারণকেই দেখা হচ্ছে অপরাধের প্রমাণ হিসেবে’। অথচ বিচার হওয়া উচিত শুধুই গৃহমালিকদের। কারণ প্রবাসী গৃহশ্রমিকদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে গৃহমালিকরা তাদের উপর যৌন নির্যাতন চালায়। গৃহমালিকদের এই পশু চরিত্রের কারণেই সুন্দরী গৃহকর্মী নিতে সৌদি নারীদের  আপত্তি দেখা যায়।

পাকিস্তানে পাচার হয়ে যাওয়া বাংলাদেশি নারীরা পতিতাবৃত্তি ছাড়াও কোন কোন পুরুষের তিন নম্বর চার নম্বর স্ত্রীর মর্যাদা পেয়ে থাকেন। বয়স্ক নারীদের ক্ষেতে-খামারে শ্রমমূলক কাজে নিয়োজিত করে। যাদের অমানুষিক পরিশ্রম করে জীবন ধারণ করতে হয়। এই নারীরা শ্রম শোষণের শিকার হচ্ছেন। বিদেশে নারী শ্রমিকগণ বাংলাদেশের দূতাবাসগুলো থেকে তেমন কোন সহযোগিতা পান না।

লক্ষ লক্ষ দরিদ্র নারীরা সংসারে স্বচ্ছলতা আনতে মোটা বেতনের আশায় মা-বাবা, স্বামী-সন্তানের মায়া ত্যাগ করে ভিটে-মাটি বিক্রি করে বা ধার-দেনা করে সুদূর প্রবাসে ছুটে যান। কিন্তু  শ্রমিক পেশায় নিয়োগ প্রাপ্তরাও শ্রম শোষণের শিকার হচ্ছেন পূঁজিবাদী শ্রমশোষণের ব্যবস্থার নিয়মানুসারেই। তাই অকাট্য প্রমাণ দিয়েই বলা যায় প্রবাসী নারী শ্রমিকরা নারী এবং শ্রমিক এই দ্বৈত শোষণের শিকার।

সুতরাং পুরুষতান্ত্রিক এই পুঁজিবাদী- সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থায় যত নারী অধিকারের কথা বলা হউক না কেন দেশে বিদেশে এবং পৃথিবীর যে কোন প্রান্তেই পুঁজিপতিরা নারীকে ভোগ্যপণ্য এবং ব্যবসায়িক পণ্য হিসেবে দেখছে। পুঁজিবাদী অর্থনীতি শুধু মুনাফা লুটার ধান্ধায় থাকে। নারীর শ্রম এবং যৌনতাকে মুনাফার অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে তারা গণ্য করে। তাই সাম্রাজ্যবাদ-পুঁজিবাদ  মুনাফার জন্য মদ-গাজা-হিরোইন, সোনা-দানা পাচারের সাথে নারীকেও পাচার করে। আর এই বিদেশী পাচারকারীদের সাথে যুক্ত এ দেশের শাসকশ্রেণি। সম্প্রতি পত্র-পত্রিকা, টিভি-রেডিও প্রভৃতি প্রচার মাধ্যমে প্রকাশিত খবর ও প্রতিবেদনের অসংখ্য তথ্য থেকে এ সত্য বেড়িয়ে আসছে যে এসব পাচারের সাথে জড়িত রয়েছে তথাকথিত জনপ্রতিনিধি, বুর্জোয়া রাজনৈতিক নেতা, মোড়ল শ্রেণির লোকরা। মানব পাচারকারী দালালদের স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, ইউপি চেয়াম্যান, মেম্বার এবং মাতাব্বরা মদদ দিয়ে থাকে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, উপজেলা চেয়ারম্যান এবং সংসদস সদস্যরা পর্যন্ত এই মানব পাচারের সাথে যুক্ত। শুধু আওয়ামী শাসকগোষ্ঠিই নয়, শাসকশ্রেণির সকল গোষ্ঠিই এ পাচারের সাথে যুক্ত। কারণ পুঁজিবাদী ব্যবস্থা এবং অর্থনীতিই দেশী-বিদেশী শাসকশ্রেণিকে এই পথে চালিত করে।

তাই, শ্রমিক-কৃষক ও দরিদ্র শ্রেণির নারীদেরকে শোষণ-নির্যাতনের হাত থেকে তাদের মুক্তির জন্য পুঁজিবাদী এই বিশ্ব ব্যবস্থা উচ্ছেদের জন্য বিপ্লবী সংগ্রামে যোগ দিতে হবে এবং নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব সফল করতে তাদের ভূমিকা রাখাতে হবে। একটি প্রগতিশীল বিশ্বব্যবস্থা তথা শোষণ মুক্ত সমাজ সমাজতন্ত্র-কমিউনিজমের জন্য সংগ্রাম করতে হবে। তা হলেই বিশ্ব পুঁজিপতিদের মুনাফার হাতিয়ার হওয়া থেকে নারীরা মুক্ত হতে পারবেন। মানুষ হিসেবে সম্মান ও মর্যাদার আসনে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন।