বাংলাদেশের গণযুদ্ধের ৬ গেরিলার বিপ্লবী কবিতা

Mao_Zedong

আমাদের সাহিত্য ও শিল্পকলা হচ্ছে জনসাধারণের জন্যে, প্রথমতঃ শ্রমিক, কৃষক ও সৈন্যদের জন্যই এগুলো রচিত হয় এবং এগুলোকে শ্রমিক, কৃষক ও সৈন্যরাই ব্যবহার করে থাকেন কমরেড মাও সেতুং, [সাহিত্য ও শিল্পকলা সম্পর্কে ইয়েনানে প্রদত্ত ভাষণ- মে, ১৯৪২]

 

hh

বিদায় চিয়াং চিং

সাগর আলী

বিদায় চিয়াং চিং

কমরেড আমার

বিদায়, অকুতোভয়

বীর বিপ্লবী মাও প্রিয়া

বিদায় !

কারা প্রকোষ্ঠে পনের বছর

হার না মানা

ত্যাজি শির নিয়ে যে

মাও প্রদীপ জ্বালিয়ে

রেখেছিলে তুমি

তার আলো পৌঁছেছে

পেরু-ইরান-আমেরিকা

অন্ধ্র-বিহার

এই বাংলাদেশসহ

সারা দুনিয়ায়।

বুর্জোয়ারা পরম তৃপ্তিতে

তোমাকে ডেকেছে ‘কুচক্রি’

অভিধায় আমরা

তেমন কুচক্রি হতে

গর্ববোধ করি

মহান সাংস্কৃতিক বিপ্লবে

বিশ্ব প্রলেতারীয় পতাকা

হাতে ঝলসে ওঠা

আমরা আজন্ম তেমন

কুচক্রিই হতে চাই।

শেকল পরা হাতে

ধনীক শুয়োরদের আদালতে

দাঁড়ানো শ্রমিক শ্রেণী

ও তার বিপ্লব হয়ে

তীব্র কটাক্ষে ঘায়েল করো

বুর্জোয়া পৃথিবীকে

পেরু-ইরান-বিহার-অন্ধ্রে

এবং এই বাংলায়

আমরা তেমন কুচক্রী

হতে নিয়তঃ প্রয়াস পাই

যারা পরম অবজ্ঞায় ছুঁড়ে ফেলে দেয়

ওদের ‘মৃত্যু পরোয়ানা’

বিজয়ের হাস্যে।

মার্কিন আর পশ্চিমার কাছে

কাইশেকের উত্তরাধিকার

বুড়ো শকুন তেং

ও তার সাঙ্গাৎরা

বিকিয়ে দিয়েছে সেই

– স্বাধীনতা

– প্রলেতারীয় ক্ষমতা

– সাম্যবাদের অভিযান

সেই শোধনবাদী শুয়োরদের

সব কিছুকে আমরা

অবিশ্বাস করি।

অবজ্ঞা করি ! ঘৃণা করি !

ওরা বলছে

তুমি আত্মহত্যা করেছ

আমরা তা অবিশ্বাস করি।

ওরা তিলে তিলে

হত্যা করেছে তোমাকে

বলি আমরা।

ওরা বলছে

তোমার মৃত্যু হয়েছে

কমরেড, আমরা তা-ও

অবিশ্বাস করি।

তুমি বেঁচে আছো

যুগ যুগ রবে বেঁচে

যদ্দিন না

দুনিয়ার একটি দেং-ও

বেঁচে রবে

সাম্যবাদের পতাকা

যদ্দিন না

পত পত করে উড়বে

মনুষ্য পৃথিবীর

প্রতিটি প্রান্তরে।

  জুলাই, ’৯১

hh

পেরুতে লাল আগুন

– আঃ ছাত্তার

[১৯৯১ সাল পেরুর গণযুদ্ধের সাথে আন্তর্জাতিক সংহতি বর্ষ উপলক্ষ্যে]

পেরুতে বিপ্লবের লাল আগুন

নিভিয়ে দেয়ার অপচেষ্টা যখন চলছে,

আমাদের কাজ মার্কিন দূতাবাস উড়িয়ে দেওয়া

পেরুতে লাল আগুন

নেভানোর চেষ্টা যখন চলছে,

লিমা, আয়াকুচো, হুয়াল্লাগা ভ্যালীর

কোকো চাষীরা যখন রক্তাক্ত,

আন্দেজের স্বর্গীয় উদ্যান যখন তার সন্তানদের রক্তে প্লাবিত।

আমাদের কাজ মার্কিন দূতাবাস উড়িয়ে দেওয়া।

আমাদের মাথার উপর ডলারের খড়গ

এদেশের হৃৎপিণ্ড, ধমনি, শিরা-উপশিরাগুলি ফালি ফালি,

কুচি কুচি করে

চুষে নিচ্ছে যখন প্রতিফোঁটা তাজা রক্ত

তখনই আমাদের কাজ মার্কিন দূতাবাস উড়িয়ে দেওয়া।

প্রত্যেকটি দূতাবাসই যুদ্ধের কমান্ডিং পোষ্ট

আমাদের কাজ শত্রু’র কমান্ড পোষ্টগুলি উড়িয়ে দেওয়া

না হলে যতই মিটিং মিছিল করুন না কেন ………….

না না, মিটিং মিছিলের বিরোধিতা আমি করছি না,

মিটিং মিছিলকেই বরং বলছি

শত্রু’র কমান্ড পোষ্টগুলি উড়িয়ে দিন।

নাহলে আপনার সাম্যের রাজ্যের

বাস্তব ভিত্তিগুলো- ওরাই উড়িয়ে দেবে।

তাই যুদ্ধের কমান্ড পোষ্টগুলো উড়িয়ে দিন বন্ধুরা

শত্রু’র কমান্ড পোষ্টগুলো উড়িয়ে দিন।

নভেম্বর, ’৯১

hh

অপেক্ষা, আবার গরাদের ওপারে

তসলিম

সারাকার অগ্নিকাণ্ডে যখন

দগ্ধ হয়েছে আমার বোন

আমি আমার বোনের লাশের জন্য

গার্মেন্টস কয়েদখানার

গরাদের এপাশে

অপেক্ষা করছিলাম নিস্তব্ধ, নিথর।

আজ বছর না ফুরোতেই

আবার গরাদের বাইরে

অপেক্ষা করছি

আমার বোনের জন্য

কিন্তু আজ বোনকে আমার

লাশ করে নিতে আসিনি

এসেছি জীবন্ত বোনদের

মিছিলে নিতে

এসেছি তাদের যুদ্ধে নিতে।

বারবার আমরা কেবল

লাশ হতে আসিনি দুনিয়ায়

বারবার গরাদের এপারে

দাঁড়াতে আসিনি কেবল

গরাদ ভাংতেও এসেছি

জীবনের ডাকে এসেছি

লড়াই করতে এসেছি।

বারবার মালিকের কাছে

অধিকার ভিক্ষা করতে নয়

এসেছি মালিকানা আদায় করতে

এসেছি অধিকার ছিনিয়ে নিতে।

তাই, প্রিয় বিদ্রোহী

বোনেরা আমার –

মিছিলে আসুন, আসুন গণযুদ্ধে

এবার মৃত্যুর প্রতিশোধ নেব

মালিক শ্রেণীর মৃত্যুতে।

আসুন, মাও-এর পথে

গণযুদ্ধে আসুন

বন্দুকের নলে ঝলসে উঠে

ভেঙ্গে যাক যত অধীনতার শেকল

কেবল আমরা লাশ হতে

আসিনি দুনিয়ায় ————-

  ডিসেম্বর, ’৯১

hh

নারী হতে লজ্জা কিসের !

শ্যামল

[ ৮ মার্চ, ’৯২ নারী দিবস উপলক্ষ্যে ]

প্রতিবাদী নারী পুরুষের শ্লোগানে মুখরিত

নারী দিবসের র‌্যালী

যখন নারী মুক্তির

প্রলেতারী পতাকায়

করছিল শহর প্রদক্ষিণ

কটাক্ষ হানল কোন পুরুষ

সমবেত পুরুষদের দেখিয়ে বলল,

ঐ দেখ সব নারীরা।

পুরুষ এক কমরেড

জবাব দিলেন,

ঠিক তাই, নারী আমরা সবাই

যদি আরো জানতে চাও, শোন

পতিতা নারী আমরা।

পতিতাদের মুক্তির মিছিলে

নেমে পড়েছি বলে

যদি বলো আমরা পতিতার ছেলে,

জারজ- পরিচয়হীন

তবে আমরা তাও।

আমরাই ধর্ষিতা- এসিডদগ্ধা

স্বামী পরিত্যক্তা বা পরিবারের জোয়ালে

বাঁধা বধু বা বিধবা কলংকিনী

ধর্ম আর সতীত্বের বলি

না মানার নীরব চোখের কটাক্ষে

মৃত্যুবরণ, রাজতন্ত্রের পাথর নিক্ষেপে,

সহমরণের চিতায় জ্বলে ওঠা বিদ্রোহ

আমরাই দিনরাত্রের নারীযোদ্ধা

গার্মেন্টস মেয়ে

যাদের তোমরা ‘নষ্ট’ বলো।

আরো জানতে চাও ?

ঘোষণা করছি,

আজকের পুরুষতন্ত্রের সব থেকে

বড় দৈত্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত

গর্ভপাতের অধিকারের দাবীতে সোচ্চার

আমেরিকার গর্ভবতী নারীদের মিছিলে

আমরা গর্ভবতী নারী।

আমরাই রোজা- ক্লারাসেৎকিন

আমরাই কমরেড চিয়াং চিং

আমরা এডিথ লাগোস হত্যার

প্রতিশোধের প্রত্যয়ে অনড়

পেরুর নারী গেরিলা

আমরাই কমরেড মিচি।

নারী পুরুষ নই

আমরা সবাই মাও- লেনিন

আমরাই ষ্ট্যালিন ক্রুপস্কায়া

আমরা সর্বহারা

জাত নেই যার, দেশ নেই যার

জয়ের জন্য আছে সারা দুনিয়া।

মার্চ, ’৯২

hh

একজন বদলী শ্রমিক

              সবুজ

শ্রম চা – – – – – –– – – – – –

এই শব্দে একটু আগেই

ক্ষুধার্ত চিৎকার দিয়েছে

নিউজপ্রিন্ট

আরো অন্ধকার- ফাঁক করে

এই আঙ্গিনায় এসে দাঁড়িয়েছি

কতিপয় বেকার মানুষ

– কাজ চাই আমরা

মেশিন বার্কার থেকে হ্যান্ড বার্কার

প্রতিটি বার্কারে

কাজ চাই আমরা

-‘নিতে হবে বাকলের আটি ?’

ব্যর্থ বেকার বাকল বাহকেরা

ভৈরবীর পাড়ে এসে দাঁড়ায়

ওপাড়ে স্বল্প উজ্জ্বল সূর্য

তীর ঘেষে দাঁড়ানো প্রহরী ঘরবাড়ি

গাছ-গাছালী ভরা সবুজ প্রাচীর কিংবা

ঘনগ্রাম।

এ পাড়ে

দুর্বা ঘাসগুলো এখনো গোছল সারছে

হালকা কুয়াশায়

ডানপার্শ্বে

ঝরণার শব্দে ভাটার ভৈরবীতে নামছে

রাসায়নিক গন্ধে ভরা খয়েরী জল

বাঁ পাশে

ষ্টিমারের ডেক থেকে ফোস ফোস ফণা

তুলে উঠে নামে ক্রেন

আধুনিক সভ্যতার বাহক কাগজের

বেলগুলো

কি সুন্দরভাবেই না গুছিয়ে রাখা হচ্ছে

ষ্টিমারের বড় পেটে

গ্রাইন্ডার প্লান্টের গম্ভীর শব্দে আমার

দেহের নীচের মাটি তখন কাঁপছে

সামনে ক্ষুধার্ত পেটে শুয়ে আছে ভাটার

ভৈরবী নদী

তীরে দাঁড়িয়ে আছি

– এক ক্ষুধার্ত বেকার শ্রমিক

পেছনে ক্যান্টিন

প্লেট-চামচ-জগ ও গামলার শব্দ

শুনছি আমি

ভক্ষক নরদের কোলাহল আসছে ভেসে

হাওয়ায় ভাসছে চাপাতি, পরোটা,

হালুয়া ও ভাজির শব্দ

আর রাত থেকে

যদিও বেকার ও অনাহারী আমি

যদিও মোচড় দিয়ে উঠছে

পেটের ভিতরকার পাকানো দড়িগুলো

তবু

এই ক্যান্টিনে প্রবেশাধিকার নেই

আমার

এই যে ক্রেন উঠাচ্ছে- নামাচ্ছে টন টন

কাগজের বেল

তার জন্য সামান্যতম

শ্রম হলেও আমি দিয়েছি

এই যে বয়লার থেকে উঠছে সাদা

ধোঁয়া

এর সচলতার জন্য সামান্যতম শ্রম

হলেও আমি দিয়েছি

এই যে গ্রাইন্ডার প্লান্ট ঘর ঘর করে

ভাঙ্গছে কাঠের গুঁড়ি তার সচলতার

জন্য

সামান্যতম শ্রম হলেও আমি দিয়েছি।

কিন্তু সরকারী রেটের ডাল, ভাজি,

চাপাতি ও পরাটাগুলো

আমার জন্য অবৈধ

যদিও আমি ক্ষুধার্ত, খুবই ক্ষুধার্ত,

মোচড় দিয়ে উঠছে, রাক্ষুসে পেট

তবু পাঁচ গজ কাছে এই ক্যান্টিনে

প্রবেশাধিকার নেই আমার

যেখানে দাঁড়িয়ে আছি

এমনকি এই মাটিও আমার জন্য অবৈধ

ঘাড় ধাক্কাদের দয়ায় বা ফাঁকি দিয়ে

শকুন চোখ

যখনি দাঁড়াই এই ইয়ার্ডের

আত্মগর্বী শব্দ আর কেমিক্যাল দুর্গন্ধের

ভেতর

কেবলি ভাবি

এই ক্যান্টিন, এই ইয়ার্ড, এই শ্রমডাকু

নিউজপ্রিন্ট

কবে যে আমাদের হবে

এবং

সমুদ্র গর্জনের মতো দৃঢ় উচ্চারণ করে

কবে যে বলে উঠতে পারবো

এই ভূমি, কলকব্জা ও উৎপাদনগুলো

সব আমাদেরই !

সব আমাদেরই !!

মে, ’৯২

hh

মৃত্যু একটি গতিহীন শব্দ

রাজু

(কমরেড শিবলী কাইয়ুম স্মরণে)

সামরিক বা সংসদীয় স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে

অগ্রসেনা সে, বুর্জোয়া গণতন্ত্রে ভণ্ডামী অমানবিক

শ্রেণী শোষণ প্রণালীবদ্ধ ব্যাখ্যা করতো।

আহা

বলতো যখন সে,

জনগণের কী চমৎকার মনঃসংযোগ !

সামনে সংসদীয় গণতন্ত্রের সংবিধান

পেছনে জনজীবন বিপন্ন করা পুঁজির কালো

হাত,

কলকাঠি নাড়ায়, কলকাঠি নাড়ায়।

বলতো

সংসদ, যেন অনেকগুলো কুকুরের বৈঠক

হাউ হাউ কাউ কাউ ঘোঁৎ ঘোঁৎ।

জনসভার মঞ্চে গম গম আওয়াজে

তার কণ্ঠ যেন

হাজার বছর ধরে

শোষণের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক।

আজ সে প্রাণহীন

তার শেষকৃত্যে সে গতিহীন

আর সবাই সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে

লাল পতাকায় গতিশীল।

Advertisements


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.