মারা গেলেন পাঞ্জাবের প্রবীন মাওবাদী সতনাম সিং

2016_4$largeimg29_Friday_2016_010829042

মারা গেলেন জঙ্গলনামার লেখক সতনাম সিং। বুধবার পাতিয়ালায়  নিজের বাড়িতে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মঘাতী হন এই প্রবীন মাওবাদী। ৬৪ বছর বয়সে অবসাদের শিকার হয়ে নিজের জীবন শেষ করলেন এই পাঞ্জাবের বিপ্লবী ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অতি পরিচিত এই মানুষটি। সাতের দশকে নকশালবাড়ির ডাকে বাড়ি ছেড়ে আন্দোলনে ঝাপিয়ে পড়েন। তার পর সময়ের সাথে সাথে আন্দোলনের সঙ্গে তাঁর ভূমিকাও পাল্টায়। তবে আগাগোড়া মাওবাদী আন্দোলনের পাশে ছিলেন। ২০০৪ সালে বাস্তর ঘুরে লেখেন jangalnama। বেশ কয়েকটি ভাষা অনুবাদ করা হয় বইটি। হঠাত্ই থেমে গেল আজীবন সংগ্রামী এই মানুষটির জীবন। রাজনীতিতে যখন চোর চিটিংবাজে ভরে গেছে সেই সময় এই রকম মানুষের চলে যাওয়া সমাজের অনেক ক্ষতি বলে মনে করেন তাঁর প্রিয়জনেরা।

8303639._UY475_SS475_

Advertisements

সাম্রাজ্যবাদের দৃষ্টিতে ‘শ্রেষ্ঠ বাঙালী’

Untitled

 

সাম্রাজ্যবাদের দৃষ্টিতে  ‘শ্রেষ্ঠ বাঙালী’

(জুলাই, ’০৪)

বৃটিশ প্রচার মাধ্যম বিবিসি রেডিও’র বাংলা বিভাগ গত মার্চ-এপ্রিলে একটি অনুষ্ঠান প্রচার করে “হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী” নামে। বিবিসি’র বাংলা ভাষাভাষি শ্রোতাদের মতামতের ভিত্তিতে এই “শ্রেষ্ঠ বাঙালি”দের নির্বাচন করা হয়েছে বলে প্রচার করা হয়। ২৬ মার্চ থেকে শুরু করে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত ২০ দিন ধরে প্রতিদিন একজনের নাম প্রকাশ করা হয়। ২০-তম “শ্রেষ্ঠ বাঙালী” থেকে শুরু করা হয় এবং শেষ দিন এসে ১ম স্থান অধিকারীর নাম জানানো হয়। হঠাৎ করে এমন একটি উদ্যোগ বিবিসি কেন এখন নিল তার কোন ব্যাখ্যা তারা দেয়নি।

বিবিসি যদিও ২০ জনের একটি তালিকা প্রকাশে জোর দিয়েছিল, কিন্তু অনুষ্ঠানের মাঝে মাঝে তারা আরো তথ্য দেয়, যাতে ২১-তম থেকে ৩০-তম পর্যন্ত নাম জানা যায়। জানা যায় যে, মোট ১৪০ জনের নাম তারা ভোটে পেয়েছে; কিছু ব্যক্তি (যেমন, বৃটিশ-বাঙালী ধনকুবের শামসের মুসা) নিজেদের নাম ‘শ্রেষ্ঠ’ তালিকায় তোলার জন্য ভাড়াটিয়া চিঠি পাঠিয়েছিল যা বিবিসি বাতিল করে; শ্রেষ্ঠ নারীর নাম তেমন একটা আসছিল না, যেক্ষেত্রে বিবিসি শ্রোতাদেরকে উদ্বুদ্ধ করে- ইত্যাদি।

তালিকায় প্রথম হয় শেখ মুজিব, ২য় রবীন্দ্রনাথ। জিয়াউর রহমান ১৯-তম। ২০-এর মধ্যে স্থান না পেলেও শেখ হাসিনা হয় ২৬-তম, খালেদা জিয়া ৪০-এর কাছে। গোলাম আযমের স্থান হয় হাসিনার আগে ২৪-তম-তে। ভাসানী, তিতুমীর, জগদীশচন্দ্র বসু- এ ধরনের কিছু প্রগতিশীল রাজনীতিক, সংগ্রামী বা বিজ্ঞানীর নামও অবশ্য এ তালিকায় উঠে আসে। তবে এ তালিকায় প্রধানত যাদের নাম এসেছে তারা হলেন চলমান গণবিরোধী সমাজ ব্যবস্থার প্রতিনিধি-স্থানীয় ব্যক্তিত্ব।

এ তালিকা প্রকাশের পর এদেশের শাসক শ্রেণী- তাদের রাজনীতিক, পত্র-পত্রিকা ও বুদ্ধিজীবীদের প্রতিক্রিয়া ছিল দেখার মত। এই গণশত্রু বড় ধনীরা (ও তাদের নুন খাওয়া বুদ্ধিজীবীরা) নিজেদের বিচার-বুদ্ধি-বিবেচনা এবং জাতীয় স্বার্থের বদলে সাম্রাজ্যবাদীদের সার্টিফিকেটকেই-যে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়- তার আরেক প্রস্থ প্রমাণ দেখা গেল। আওয়ামীপন্থীরা ছিল দারুণ খুশি- বিবৃতি, মিছিল, পত্র-পত্রিকায় নিবন্ধ ও খবরে তারা দেশ ভাসিয়ে দেয়। অথচ তারা তলে হাত দিয়ে দেখেনি যে, এই জরীপকে উর্ধ্বে তুলে ধরার অর্থ হলো গোলাম আযমকেও শ্রেষ্ঠ বাঙালি স্বীকার করা, এমনকি শেখ হাসিনার চেয়েও শ্রেষ্ঠ! সুতরাং আওয়ামীপন্থীদের এখন উচিত হবে শেখ মুজিবের সাথে গোলাম আযমের ছবিটাও ঘরে টাঙ্গিয়ে রাখা।

* এমন তালিকা সম্পর্কে প্রথমেই যে প্রশ্নটা আসে তাহলো শ্রেষ্ঠতার মানদণ্ড কী? আমরা যদি ধরেও নেই যে, বিবিসি কোন কারচুপি করেনি (বাস্তবে বুর্জোয়া প্রচার মাধ্যমগুলো এ ধরনের জরীপে প্রায়ই কারচুপি করে, বা তা তারা অজান্তেই করে ফেলে, সাধারণভাবে তাদের শ্রেণী স্বার্থ দ্বারা পরিচালিত হওয়া ছাড়াও নিজ শ্রেণীর মাঝে নিজেদের সংকীর্ণ গোষ্ঠীবাদী- এমনকি ব্যক্তিগত স্বার্থ দ্বারা চালিত হবার কারণে), তাহলেও বিবিসি’র অবশ্যই নিজস্ব একটা মানদণ্ড রযেছে- যা তার শ্রোতাদেরও একটা বড় অংশের মানদণ্ড- অনেক ক্ষেত্রে অসচেতনভাবেই। বাস্তবে শ্রেষ্ঠতার মানদণ্ড সর্বদাই পৃথক হয়- শ্রেণীগত বিচারে। বৃটিশ আমলে ঐ উপনিবেশবাদীদের চোখে অসংখ্য মহান বিপ্লবী স্বাধীনতাকামী বা কৃষক-উত্থানের নেতারা কেউই শ্রেষ্ঠ ছিলেন না; বরং তারা ছিলেন স্রেফ ক্রিমিন্যাল। এমনকি তাদের বহু ইতিহাস ও নাম বৃটিশ উপনিবেশবাদীরা স্রেফ গায়েব করে দিয়েছে। আজকের যুগে আমরা তাদের নামও জানি না। অথচ বৃটিশ শাসনের সমর্থক, বা তাদের কাছের মানুষ রামমোহন রায়, রবীন্দ্রনাথ, গান্ধী, জিন্নাহ্- এরা ছিল বৃটিশের কাছে শ্রেষ্ঠতম।

সুতরাং, বিবিসি’র মত একটি সাম্রাজ্যবাদী প্রতিষ্ঠান এমন মানদণ্ডের উর্ধ্বে উঠতে কখনই সক্ষম নয়। বিবিসি শুধু বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদী বুর্জোয়াদের প্রচার মাধ্যমই নয়, এটা বৃটিশ সরকারের সাথেও জড়িত। সুতরাং তাদের কোন বড় রাজনৈতিক প্রচারণা তাদের এই শ্রেণী-স্বার্থ বিরোধী হতে পারে না। বরং তাকেই তা সেবা করে ও তা দ্বারাই পরিচালিত। সুতরাং এই-যে শ্রেষ্ঠ বাঙালীদের তালিকা তৈরির প্রয়াস, এবং এতে উঠে আসা ফলাফলের মোট প্রভাব, এসবই তাদের সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থেই হতে বাধ্য।

যেমন এ তালিকায় শেখ মুজিব হয়েছে ১নং শ্রেষ্ঠ বাঙালি। এই ফলটা অস্বাভাবিক নয়। কারণ, বাংলাদেশি ক্রিমিন্যাল শাসকশ্রেণীর প্রধানতম রাজনৈতিক প্রতিনিধি হলো শেখ মুজিব। এ শ্রেণীরই আরো সব প্রতিনিধি জিয়া, হাসিনা, খালেদা, সোহরাওয়ার্দী, এমনকি গোলাম আযম বা কাদের সিদ্দিকী- এরা সবাই এ তালিকায় রয়েছে।

এটা ঠিক যে, এ তালিকায় নাম ওঠা প্রত্যেকেই জনগণের শত্রু স্থানীয় নন। এটা হয়েছে এ কারণে যে, বিদ্যমান ব্যবস্থা অতীতের কিছু ইতিবাচক ব্যক্তিত্ব বা ইতিহাসকে তাদের মত করে ব্যবহার করে, তা করতে তারা সক্ষম এবং তা করতে বাধ্যও বটে। এটা তারা করতে পারে এজন্য যে, ঐসব ব্যক্তিত্বের সময়কার যে ভূমিকা ছিল যুগের/সময়ের দ্বারা সীমাবদ্ধ, সে ভূমিকা এখন আর বর্তমান শাসক শ্রেণীর জন্য তেমন বিপজ্জনক নয়। নতুবা তাদের ইতিবাচক দিকের পাশাপাশি এমন সব গুরুতর দুর্বলতা তাদের ছিল যা এখন বিদ্যমান ব্যবস্থার কাজেই লাগে। ফলে শাসকশ্রেণী এইসব ইতিবাচক ব্যক্তিত্ব ও ইতিহাসের বিকৃত ও খণ্ডিত উপস্থাপন ও ব্যাখ্যার মাধ্যমে একদিকে জনগণকে বিভ্রান্ত করতে পারে, অন্যদিকে নিজের স্বার্থ হাসিল করতে পারে।

কিন্তু প্রশ্নটা হলো, এই মতামত-তো বিবিসি’র নয়- শ্রোতাদের। আমরা কেন বিবিসি’র মত বলে একে তুলে ধরছি? এ বিষয়টা বোঝা যাবে জনমত, বিশেষত বুর্জোয়া গণতন্ত্রে জনমত গড়ে ওঠার প্রক্রিয়াটা বুঝতে পারলে। জনগণকে এ ব্যবস্থার মধ্যেই বাছতে হয়, আর জনগণ এই ভণ্ডামিতে অংশ নেন বিদ্যমান ব্যবস্থার শেখানো চেতনা ও সংস্কৃতির উল্টো কিছু এখনি করে ফেলতে পারেন না বলে। সুতরাং জনমত মূলত সৃষ্টি হয় বিদ্যমান ব্যবস্থা দ্বারাই। ইতিহাসের সন্ধিক্ষণে ব্যাপক গণবিদ্রোহ বা গণবিপ্লবকালেই শুধু এটা উল্টে যায়। নতুবা জনমত-জরীপ এই ব্যবস্থার অধীনস্থ তার স্বার্থাধীনে বিভিন্ন মতকেই যাচাই করে মাত্র।

নির্দিষ্টভাবে বিবিসি’র কথাই ধরা যাক। এর শ্রোতামণ্ডলী, এবং বিশেষত এইসব জনমত জরীপে অংশগ্রহণকারী উৎসাহী শ্রোতারা হলেন প্রধানত মধ্যবিত্তের সেই অংশ, যারা ব্যবস্থার শিক্ষা দ্বারাই শিক্ষিত এবং কম/বেশি এর মধ্যেই চিন্তা করেন। যেমন, আলোচ্য জরীপে যদিও বলা হয়েছে “হাজার বছরের”, কিন্তু একমাত্র অতীশ দীপংকর ছাড়া আর সব নাম এসেছে বিগত মাত্র দু’শ বছরের মধ্যে। এটাই প্রমাণ করে যে, এ তালিকা করায় যারা মত দিয়েছেন তারা কতটুকু গভীরে ও কতটা ব্যাপকতায় যেতে সক্ষম। এর কারণ হলো, বিদ্যমান ব্যবস্থা মোটামুটি এটুকুই তাদেরকে শিখিয়েছে। আমাদের প্রাইমারী স্কুলে পড়ানো হয় মুজিব-জিয়ার জীবনী, রবীন্দ্র-নজরুলের কবিতা। এই মৌল শিক্ষায় বেড়ে ওঠা ও বিবিসি’র মত সাম্রাজ্যবাদী প্রচার মাধ্যমে আলোকপ্রাপ্ত জনগোষ্ঠী ভোট-তো দেবে এই গণ্ডীর মধ্যেই। এর অন্যথা হতে পারে না।

সুদূর অতীতের কথা বাদই দেয়া যাক- সে ইতিহাস খুব একটা নেই, নেই শাসকদের স্বার্থেই ও তাদের কারণেই- কিন্তু শুধু বিগত দু’শ বছরের ব্যক্তিত্বের ইতিহাসকেও কতটা সত্য বলা যায়? ইতিহাস লেখা হয় শাসকদের দ্বারা। তাদের স্বার্থ অনুযায়ী। এর মধ্য দিয়েই ব্যক্তির নাম উঠে আসে। সেটাই ব্যাপক জনগণকে জানানো ও শেখানো হয়। সুতরাং, চলমান দেশীয় ও বিশ্ব-ব্যবস্থার বিপরীত কোন বিপ্লবী রাজনীতিতে শিক্ষিত না হয়ে প্রকৃত শ্রেষ্ঠ বিচারের কোন পথই নেই। সে কারণেই বৃটিশ আমলের শ্রেষ্ঠতম মানুষ- প্রীতিলতা, ক্ষুদিরাম, বাঘা যতিন, কানু, ভোলা, নুরুলদীন, বীরসা, সুকান্ত, মানিক- এরা শ্রেষ্ঠ নন। এদের নামও খুব একটা কেউ জানেন না। শ্রেষ্ঠ হলো সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার স্তাবক ও স্বাধীনতাকামী বিপ্ল¬বী- দের চরিত্রহনক রবীন্দ্রনাথ! সাম্প্রতিককালের শ্রেষ্ঠ মানুষ চারু মজুমদার, সরোজ দত্ত, সিরাজ সিকদার, মনিরুজ্জামান তারা, বাদল দত্ত, আসাদ- এরা শ্রেষ্ঠ-তো ননই, বরং সন্ত্রাসী ও ক্রিমিন্যাল! অসংখ্য কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, তরুণ, নারী, বিজ্ঞানী, উদ্ভাবক- যারা যুগে যুগে মহান সব অবদান রেখেছেন ও রাখছেন- তারা কেউই শ্রেষ্ঠ নন। তাদের নামই মানুষ জানেন না। তেভাগা, ষাট-দশক, ’৭১, ’৭২-’৭৫-এর অসংখ্য সব বীরদের নাম কেউ জানে না। জানানো হয় জিয়া-মুজিবের নাম- যাদের একজন ’৭১-এ যুদ্ধের শুরুতেই আত্মসমর্পণ করেছিলো; আর অপরজন বাধ্য হয়ে যুদ্ধে জড়িয়ে অন্যের অনুরোধে একটা ‘স্বাধীনতার ঘোষণা’ দিয়ে তড়িঘড়ি ভারতে পালিয়েছিল। আসলে, অসংখ্য শ্রেষ্ঠ মানুষের মহত্ব, বীরত্ব, জ্ঞান ও ত্যাগের একটি কণার সাথেও তুলনা হয় না প্রচারিত ও বিজ্ঞাপিত ‘শ্রেষ্ঠ’দের সমগ্র শক্তি। কিন্তু তাদেরকে বিশাল করে তোলা হয়। সেটা তোলে এই ব্যবস্থা, যা কিনা এই শ্রেষ্ঠত্বের বিপরীতে সবধরনের ইতরতা ও নীচুতারই প্রতীক মাত্র।

সুতরাং বিদ্যমান ব্যবস্থার জন্য শ্রেষ্ঠ বাঙালী অন্বেষণ এই ব্যবস্থার রাজনীতি-অর্থনীতি-সংস্কৃতিকে রক্ষা করার একটা প্রচেষ্টা- যে ব্যবস্থা কিনা একেবারে শেষ পর্যন্ত পচে গেছে এবং সমূহ ধ্বংসের মুখোমুখি। একে ধ্বংস করার ও আমূল বদলে ফেলার সংগ্রামে- শুধু রাজনৈতিক ক্ষেত্রেই নয়, অর্থনীতি, বিজ্ঞান, সংস্কৃতিসহ সর্ব ক্ষেত্রে- যে অসংখ্য বীর ছিলেন ও এখনো রয়েছেন, তাদের মাঝে কিছু লোককে শ্রেষ্ঠ হিসেবে বাছাই করার কাজ একটা অসম্ভব চেষ্টা মাত্র। আসলে এইসব প্রতিনিধি-স্থানীয় বীরসহ সমগ্র জনগণ একত্রে হলেন শ্রেষ্ঠ- যারা উদ্যোগী, উদ্যমী, পরিশ্রমী, মেধাবী, সাহসী, ত্যাগী ও মহান। এই জনগণের মাঝে প্রধানতম কিছু প্রতিনিধি নিশ্চয়ই রয়েছেন। কিন্তু তাদের কয়েকজনের একটি তালিকা করে ব্যাপকতম অগ্রসর মানুষদের থেকে পৃথক করাটা একটা ধৃষ্টতা ছাড়া কিছু নয়।

তদুপরি যখন শ্রেষ্ঠদেরকে ‘বাঙালি’ হিসেবে বাছাই করা হয় তখন আরেকটি বিষাক্ত চেতনা এ ভূখণ্ডের জনগণের মাঝে ঢোকানো হয়। এটা হলো এক প্রতিক্রিয়াশীল জাতীয়তাবাদ, যা এদেশের ক্রিমিন্যাল শাসকশ্রেণীর বড় এক হাতিয়ার- হোক তা বাঙালী বা বাংলাদেশী নামে। সাঁওতাল বিদ্রোহের মহান নেতা সিধু-কানু বাঙালী ছিলেন না। তাই বলে কি তাঁরা এই ভূখণ্ডের শ্রেষ্ঠতম সন্তান নন? শ্রেষ্ঠ খুঁজতে গিয়ে বাঙালির মধ্যে আটকে থাকা ও রাখাটা একটি কুপমণ্ডুকতা মাত্র – যাতে এদেশী বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীরা ব্যাপক জনগণকে অব্যাহতভাবে কলুষিত করে চলেছে। একটা বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি ছাড়া আজকের যুগে শ্রেষ্ঠত্বের কোন রকম বিচার হতেই পারে না। উপরোক্ত জাতীয়তাবাদ আজকের সকল প্রগতির বিরোধী। একজন ইংরেজ বা পাকিস্তানী অথবা ভারতীয় বিপ্লবী বা প্রগতিশীল বিজ্ঞানী ও সংস্কৃতিকর্মী অনেক গ্রহণীয় একজন বাঙালী ‘শ্রেষ্ঠ’ প্রতিক্রিয়াশীলের চেয়ে। জনগণ যাতে এই চেতনায় সজ্জিত হতে না পারেন তার চেষ্টাই আমাদের শাসকশ্রেণী অবিরত করে চলে- যাকে বিবিসি ও সাম্রাজ্যবাদ মদদ দেয়। বিবিসি’র জরীপ এমন ধারারই একটি কাজ।

আমাদের দেশের ব্যাপক জনগণ সরকারী রেডিও/টিভি  এবং বুর্জোয়া পত্রিকার জঘন্য ধরনের মিথ্যা-সংবাদ ও মূল্যায়ন প্রচারের অত্যাচারে দেশীয়-

আন্তর্জাতিক খবরের জন্য বিবিসি’র মুখাপেক্ষী হন। ফলে বিবিসি’র একটা গ্রহণযোগ্যতা এদেশের জনগণের মাঝে এখনো রয়েছে- এটা সত্য। কিন্তু এতে এক ব্যাপক ধস নেমেছিল ইরাকে মার্কিন-বৃটিশ আগ্রাসনের সময়। মানুষ দেখতে পান, বিবিসি সেভাবে আর নিরপেক্ষ নয়, বরং বিশ্ব-জনগণের বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন ও বর্বর নিপীড়নের দিকেই তারা পক্ষপাতিত্ব করছে। সুতরাং বাঙালি জনগণের কাছে বিবিসি’র গ্রহণযোগ্যতা ধরে রাখার একটা চেষ্টাও তারা চালাচ্ছে বটে। কিন্তু যা কিছু তারা করুক, গণতন্ত্রের বুর্জোয়া/সাম্রাজ্যবাদী শ্রেণী-চরিত্র ও স্বার্থকে তারা অতিক্রম করতে সক্ষম নয়। এই মূলগত সত্যটার উপলব্ধি খুবই জরুরী, যখন কিনা আমরা তাদের এই ‘শ্রেষ্ঠ বাঙালী’ প্রজেক্টকে মূল্যায়ন করতে চাই।

সূত্রঃ আন্দোলন সিরিজ ৩


মহান মে দিবসে ‘নয়া গণতান্ত্রিক গণমোর্চার’ পোস্টার

13090194_481706245345860_57690903_n