ভারতের গণযুদ্ধের আন্তর্জাতিক সমর্থন নিয়ে IDSA রিপোর্ট

20111023144014954734_9

ভারতের ‘ইন্সটিটিউট অব ডিফেন্স স্টাডিজ এন্ড এনালাইসিস-(IDSA)’ তাদের এক রিপোর্টে জানাচ্ছে, বহির্বিশ্বে মাওবাদীদের সংযোগ তাদের জন্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করছে।  এটি বিশ্বের বিভিন্ন অংশে তাদের দৃশ্যমানতা এবং প্রচারণা দিয়েছে।  এভাবে তারা ভ্রাতৃসুলভ দলগুলোর সাথে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সমর্থন সচল করতে সক্ষম হয়েছে।  তাছাড়া, এই সংযোগগুলো থেকে মাঝে মধ্যে শুধুমাত্র টাকা ও অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আসা হয়।  যাইহোক, এ জন্য বিদেশে সব ভারতীয় দূতাবাসের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ যে, এই আন্তর্জাতিক গ্রুপ গুলোকে গভীর ভাবে নিরীক্ষণ করা এবং তাদের মিথ্যা দাবি খণ্ডন করা এবং তাদের এই অপপ্রচার মোকাবেলা করা।  এ বিষয়টি তদন্তের জন্যে দরকারী হবে।যে, ভবিষ্যতে এই সংযোগগুলো একটি অস্ত্র সাপ্লাই চেইন প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করবে।

উল্লেখ্য যে, মে দিবস ২০১৬তে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ৩০টি মাওবাদী পার্টি ও সংগঠনগুলো এক যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করেছে এবং ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি(মাওবাদী) ও মনিপুরের কমিউনিস্ট পার্টি(মাওবাদী) এই যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছে।

সুত্রঃ http://www.eurasiareview.com/01052016-the-maoist-global-web-analysis/

Advertisements

জে.ভি. স্তালিনঃ শ্রেণি সংগ্রাম

joseph-stalin-facts

শ্রেণি সংগ্রাম

-জে.ভি. স্তালিন

 

‘শ্রমিক শ্রেণির ঐক্যই কেবল পারে ধনিক শ্রেণির ঐক্যকে টলিয়ে দিতে’- কার্ল মার্কস

আজকের সমাজ অত্যন্ত জটিল! এ’হলো রং- বেরংয়ের শ্রেণি ও গোষ্ঠীগুলির জোড়াতালি- বৃহৎ মাঝারি ও পেটি বুর্জোয়া; বৃহৎ মাঝারি ও পেটি বুর্জোয়া সামন্ততান্ত্রিক জমিদার; দিনমজুর, অদক্ষ শ্রমিক ও দক্ষ কারখানা-শ্রমিক; উচ্চতম, মাঝারি ও নিম্নতম যাজকমন্ডলী; উচ্চতন, মাঝারি ও ক্ষুদে আমলাতন্ত্র; নানামতের বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় এবং অনুরূপ নানা রকমের অন্যান্য গোষ্ঠী। আমাদের সমাজের এই হলো বহুবর্ণ ছবি!

কিন্তু এটাও স্পষ্ট যে সমাজ যত বেশি বিকশিত হতে থাকে, ততই অধিকতর স্পষ্টভাবে দুটি প্রধান প্রবণতা এই জটিলতার মধ্যেও ফুটে ওঠে এবং ততই বেশি তীব্রতরভাবে এই জটিল সমাজ দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরে বিভক্ত হয়- ধনিক শ্রেণির শিবির ও শ্রমিক শ্রেণির শিবির। জানুয়ারি মাসের অর্থনৈতিক দাবিতে অনুষ্ঠিত ধর্মঘটগুলি (১৯০৫) স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দেয় যে রাশিয়া বস্তুত দুটি শিবিরে বিভক্ত, সেন্ট পিটার্সবুর্গের নভেম্বর মাসের ধর্মঘটগুলি (১৯০৫) এবং সারা রাশিয়াব্যাপী জুন-জুলাই মাসের ধর্মঘটগুলি (১৯০৬) এই দুই শিবিরের নেতাদের মধ্যে সংঘর্ষ এবং তার দ্বারা বর্তমান সময়কার শ্রেণি বিরোধ পরিপূর্ণভাবে উদঘাটিত করে। তারপর থেকে পুঁজিবাদী শিবির পুরোপুরি সজাগ আছে। এই শিবিরে উত্তেজনাপূর্ণ ও বিরামহীন প্রস্তুতি চলছে: পুঁজিবাদীদের স্থানীয় সমিতি গঠিত হচ্ছে। স্থানীয় সমিতিগুলি মিলে গঠন করছে আঞ্চলিক সমিতি; আবার আঞ্চলিক সমিতিগুলি মিলে গড়ে তুলছে সারা রাশিয়া সমিতি; টাকা পয়সা তোলা এবং সংবাদপত্র বের করা আরম্ভ হচ্ছে এবং পুঁজিবাদীদের সারা রাশিয়া কংগ্রেস ও কনফারেন্স আহ্বান করা হচ্ছে।…

এইভাবে শ্রমিক শ্রেণিকে দমন করার উদ্দেশ্যে পুঁজিবাদীরা একটি পৃথক শ্রেণীতে সংগঠিত হচ্ছে।

অন্যদিকে শ্রমিক শ্রেণির শিবিরও সম্পূর্ণ জাগ্রত। এখানেও চলছে আসন্ন সংগ্রামের জন্য ব্যাগ্র প্রস্তুতি। প্রতিক্রিয়াশীলদের হাতে নির্যাতন সত্ত্বেও এখানেও স্থানীয় ট্রেড ইউনিয়ন গঠিত হচ্ছে, স্থানীয় ট্রেড ইউনিয়নগুলি মিলে গড়ে তুলছে আঞ্চলিক ইউনিয়ন, ট্রেড ইউনিয়নের তহবিল তোলা আরম্ভ হচ্ছে, ট্রেড ইউনিয়নের ছাপাখানা গড়ে উঠছে এবং শ্রমিকদের ইউনিয়নসমূহের সারা রাশিয়া কংগ্রেস ও কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

এটাও স্পষ্ট যে শোষণকে প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে শ্রমিক শ্রেণিও একটি পৃথক শ্রেণিতে সংগঠিত হচ্ছে।

একটা সময় ছিল যখন সমাজে শান্তি ও স্বস্তি বিরাজ করতো। সে-সময়ে এইসব শ্রেণি ও শ্রেণি সংগঠনের কোন চিহ্ন ছিল না। সে-সময়েও অবশ্য একটা সংগ্রাম চলতো, কিন্তু সে সংগ্রামের চরিত্র ছিল স্থানীয়, তার কোন সার্বিক শ্রেণি চরিত্র থাকতো না; পুঁজিপতিদের নিজস্ব কোন সমিতি ছিল না এবং প্রত্যেক পুঁজিপতি নিজে নিজেই ‘তার’ ‘তার’ শ্রমিকদের সাথে মোকাবেলা করতে বাধ্য হতো। সত্য বটে, স্থানীয় সোশ্যাল ডেমোক্রাট সংগঠনগুলি শ্রমিকদের অর্থনৈতিক সংগ্রামে নেতৃত্ব দিত। কিন্তু সকলে স্বীকার করবেন যে, তখন নেতৃত্ব ছিল দুর্বল নৈমিত্তিক। সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক সংগঠগুলি তখন তাদের নিজেদের পার্টির ব্যাপারেই পুরোপুরি সামলাতে পারতো না।

কিন্তু জানুয়ারির অর্থনৈতিক দাবিতে অনুষ্ঠিত ধর্মঘটসমূহ একটি নতুন মোড় সূচিত করলো। পুঁজিপতিরা ব্যস্ত সমস্ত হয়ে উঠলো এবং স্থানীয় সমিতি গড়তে শুরু করলো। জানুয়ারির ধর্মঘটগুলি সেন্ট পিটার্সবুর্গ, মস্কো, ওয়ারসো, রিগা ও অন্যান্য শহরে পুঁজিপতিদের সমিতির জন্ম দেয়। তেল, ম্যাঙ্গানিজ, চিনি, কয়লা শিল্পসমূহে পুঁজিপতিরা তাদের পুরানো ‘শান্তিপূর্ণ’ সমিতিগুলিকে ‘সংগ্রামী সমিতিতে’ রূপান্তরিত করে এবং তাদের অবস্থানকে শক্তিশালী করিতে আরম্ভ করে। কিন্তু পুঁজিপতিরা এতেই সন্তুষ্ট থাকেনি। তারা একটি সারা রাশিয়া সমিতি গঠন করার সিদ্ধান্ত নিল এবং তদনুসারে ১৯০৫ সালের মার্চ মাসে মরোজভের উদ্যোগে তারা মস্কোতে একটি সাধারণ কংগ্রেসে সমবেত হলো। এটিই হলো পুঁজিপতিদের প্রথম রাশিয়া কংগ্রেস। এখানে তারা একটি চুক্তি সম্পাদন করলো; এই চুক্তির দ্বারা তারা অঙ্গীকারবদ্ধ হলো যে, নিজেদের মধ্যে আগে বন্দোবস্ত না করে শ্রমিকদের জন্য কোন সুযোগ সুবিধা দেবে না এবং চরম অবস্থায় তারা লক আউটও ঘোষণা করবে। পুঁজিপতি ও শ্রমিকদের প্রচন্ড সংগ্রামের এই হলো সূচনা। এ থেকে রাশিয়ায় একের পর এক বড় লক আউট ঘোষণার হিড়িক পড়লো। একটি বিরাট সংগ্রাম চালাতে হলে প্রয়োজন একটি শক্তিশালী সমিতির; এবং এজন্য একটি আরও বেশি সুসংবদ্ধ সমিতি গড়ে তোলার জন্য পুঁজিপতিরা আরেকবার মিলিত হবার সিদ্ধান্ত নিল। তাই প্রথম কংগ্রেসের তিন মাস পরে (১৯০৫ সালের জুলাই মাসে) পুঁজিপতিদের সারা রাশিয়া দ্বিতীয় কংগ্রেস মস্কোতে আহুত হলো। এখানে তারা প্রথম কংগ্রেসের প্রস্তাবগুলি পুনরোনুমোদন করলো, পুনরোনুমোদদের পর লক আউটের প্রয়োজনীয়তা এবং নিয়ম কানুনের খসড়া তৈরির জন্য আরও একটি কংগ্রেস অধিবেশনের বন্দোবস্ত করার জন্য একটি কমিটি নির্বাচিত করলো। ইতিমধ্যে কংগ্রেসের প্রস্তাবগুলি কার্যে পরিণত করা হলো। বাস্তব ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে যে, পুঁজিপতিরা অক্ষরে অক্ষরে এই প্রস্তাবগুলি কার্যে পরিণত করছে। রিগা, ওয়ারসো, ওদেসা, মস্কো ও অন্যান্য বড় বড় নগরের লক আউটগুলির কথা যদি স্মরণ করা যায়, যদি স্মরণ করা যায় সেন্ট পিটার্সবুর্গের নভেম্বরের সেই দিনগুলির কথা, যখন ৭২ জন পুঁজিপতি সেন্ট পিটার্সবুর্গের ২ লক্ষ শ্রমিকদের নিষ্ঠুর লক আউটের ভয় দেখিয়েছিল, তাহলে সহজেই বোঝা যায়, পুঁজিপতিদের সারা রাশিয়া সমিতি কী প্রচন্ড শক্তির প্রতিনিধিত্ব করে। কিভাবে খুটিনাটি ব্যাপারে তাদের সিদ্ধান্তগুলি কার্যে পরিণত করে। তারপর দ্বিতীয় কংগ্রেসের পর পুঁজিপতিরা আর একটি কংগ্রেস ডাকলো (১৯০৬ সালের জানুয়ারি মাসে), এবং সর্বশেষ এ বছর এপ্রিল মাসে পুঁজিপতিদের সারা রাশিয়া উদ্বোধনী কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হলো। এখানে সকলের জন্য একরূপ আইন-কানুন তৈরি হলো এবং একটি কেন্দ্রীয় ব্যুরো (দফতর) নির্বাচিত হলো। সংবাদপত্রের রিপোর্ট থেকে জানা যায় এই সমস্ত নিয়ম-কানুন সরকার এরই মধ্যে অনুমোদন করেছে।

তাই কোন সন্দেহ থাকতে পারে না রাশিয়ার বৃহৎ বুর্জোয়ারা ইতিমধ্যে একটি পৃথক শ্রেণীতে সংগঠিত হয়েছে; এর নিজস্ব স্থানীয় এবং কেন্দ্রীয় সংগঠন আছে এবং তারা একটি মাত্র পরিকল্পনা অনুযায়ী সারা রাশিয়ার পুঁজিপতিদের জাগিয়ে তুলতে পারে।

মজুরি কমানো, কাজের দিন লম্বা করা, শ্রমিক শ্রেণীকে দুর্বল করা, তার সংগঠনগুলিকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করা- পুঁজিপতিদের সাধারণ সমিতির এই হলো উদ্দেশ্য।

ইতোমধ্যে শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন এগোচ্ছে এবং বাড়ছে। এখানেও অর্থনৈতিক দাবির ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত জানুয়ারির ধর্মঘটগুলির (১৯০৫) প্রভাব অনুভূত হলো। আন্দোলন গণচরিত্র ধারণ করলো, এর প্রভাবগুলিও ব্যাপকতর হলো, এবং কালে এটা সুস্পষ্ট হলো যে, সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক সংগঠনগুলি পার্টি ও ট্রেড ইউনিয়নের কাজ দুই-ই চালাতে পারছে না। পার্টি ও ট্রেড ইউনিয়নগুলির মধ্যে শ্রমবিভাগের ধরনের একটা কিছু প্রয়োজন দেখা দিল। পার্টির বিষয়গুলি পার্টি সংগঠনসমূহের দ্বারা পরিচালিত করতে হলো, আর ট্রেড ইউনিয়নের বিষয়গুলি ট্রেড ইউনিয়ন সমূহের দ্বারা। সুতরাং ট্রেড ইউনিয়নের সংগঠন আরম্ভ হলো সারা দেশ জুড়ে ট্রেড ইউনিয়ন গঠিত হলো- মস্কো, সেন্টপিটার্সবুর্গ, ওদেসা, ওয়ারসো, রিগা, খারকভ ও তিফলিসে। সত্য বটে প্রতিক্রিয়াশীলরা ট্রেড ইউনিয়ন গড়ার কাজে বাধা দিলো। কিন্তু তা সত্ত্বেও আন্দোলনের প্রয়োজন বৃহত্তর হয়ে দাঁড়ালো এবং ইউনিয়নের সংখ্যা বেড়েই চললো। শীঘ্রই স্থানীয় ইউনিয়নের পিছনে পিছনে গড়ে উঠলো আঞ্চলিক ইউনিয়ন এবং অবশেষে অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছালো যখন, গত বছর সেপ্টেম্বর মাসে ট্রেড ইউনিয়নের একটা সারা রাশিয়া সম্মেলন আহুত হলো। শ্রমিকদের ইউনিয়নের সেইটিই হলো প্রথম সম্মেলন। অন্যান্য ফলাফলের মধ্যে এই সম্মেলনের অন্যতম ফলাফল হলো; এই সম্মেলন বিভিন্ন শহর থেকে ইউনিয়নগুলিকে এক জায়গায় টেনে আনলো এবং অবশেষে ট্রেড ইউনিয়গুলির একটি সাধারণ কংগ্রেস আহ্বানের জন্য একটি কেন্দ্রীয় ব্যুরো (দফতর) নির্বাচিত করলো। অক্টোবরের দিনগুলি এসে গেল এবং ট্রেড ইউনিয়নগুলি তখন আগেকার তুলনায় দ্বিগুণ শক্তিশালী হয়ে দেখা দিল। স্থানীয় এবং শেষে আঞ্চলিক ইউনিয়নগুলি দিনের পর দিন বেড়ে চলতে লাগলো। সত্য বটে ডিসেম্বরের পরাজয় ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের গতিবেগ লক্ষণীয়ভাবে মন্দীভূত করলো, কিন্তু পরবর্তিতে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন পুনরুজ্জীবিত হলো এবং ঘটনা এমন ভালভাবে এগোল যে, এই বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ট্রেড ইউনিয়নগুলির দ্বিতীয় সম্মেলন ডাকা হলো এবং প্রথম সম্মেলনের তুলনায় তা আরও ব্যাপক হলো। সম্মেলন স্থানীয়, আঞ্চলিক এবং সারা রাশিয়া কেন্দ্র গঠনের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করে নিল; আসন্ন সারা রাশিয়া কংগ্রেসের বন্দোবস্ত করার জন্য একটি সাংগঠনিক কমিশন নির্বাচিত করলো এবং ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন সংক্রান্ত সমসাময়িক প্রশ্নের ওপর যথোপযুক্ত প্রস্তাব গ্রহণ করলো।

সুতরাং কোন সন্দেহ থাকতে পারে না যে, প্রতিক্রিয়া প্রচন্ড মারমূর্তি ধারণ করা সত্ত্বেও শ্রমিক শ্রেণিও পৃথক শ্রেণিতে সংগঠিত হচ্ছে; তার স্থানীয়, আঞ্চলিক এবং কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নগুলিকে জোরদার করছে এবং পুঁজিপতিদের বিরুদ্ধে তার অগণিত সহকর্মীকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য প্রচেষ্টাও চালাচ্ছে।

উচ্চতর মজুরি অর্জন করা, কাজের দিনের সময় কমানো, শ্রম সংক্রান্ত উৎকৃষ্ট ব্যবস্থা কায়েম করা, শোষণ বন্ধ করা এবং পুঁজিপতিদের সমিতিগুলি প্রতিহত করা- শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়নগুলির এই হলো উদ্দেশ্য। এইভাবে আজকের দিনের সমাজ দুটি বৃহৎ শিবিরে বিভক্ত হচ্ছে; প্রত্যেকটি শিবির পৃথক শ্রেণিতে সংগঠিত হচ্ছে; তাদের মধ্যে যে শ্রেণি সংগ্রাম প্রজ্জলিত হয়েছে, তা বিস্তৃতিলাভ করেছে, প্রতিদিন তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে এবং অন্যান্য সমস্ত গোষ্ঠী এই দুই শিবিরের চারপাশে সমবেত হচ্ছে।

মার্কস বলেছেন প্রতিটি শ্রেণি-সংগ্রামই একটি রাজনেতিক সংগ্রাম। এর অর্থ হলো যদি আজ শ্রমিকেরা ও পুঁজিপতিরা পরস্পরের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক সংগ্রাম চালায়, তাহলে আগামী কাল তারা রাজনৈতিক সংগ্রাম চালাতে বাধ্য হবে এবং এইভাবে একটি সংগ্রামে, তারা তাদের নিজ নিজ শ্রেণিস্বার্থ রক্ষা করবে। এই সংগ্রামের দুটি ধরণ আছে। পুঁজিপতিদের বিশেষ ব্যবসাগত স্বার্থ আছে, এবং এই সমস্ত স্বার্থ রক্ষা করার জন্যই তাদের অর্থনীতি ভিত্তিক সংগঠনগুলি বিদ্যমান রয়েছে। কিন্তু তাদের ব্যবসাগত স্বার্থের অতিরিক্ত তাদের সাধারণ শ্রেণিস্বার্থ রয়েছে, যে স্বার্থ হলো পুঁজিবাদকে জোরদার করা। এবং এই সমস্ত সাধারণ স্বার্থ রক্ষা করতে তাদের অবশ্যই রাজনৈতিক সংগ্রাম চালাতে হবে এবং তাদের প্রয়োজন একটি রাজনৈতিক পার্টি। রাশিয়ার পুঁজিপতিরা এই সমস্যা খুব সহজেই সমাধান করলো। তারা উপলব্ধি করলো যে, পার্টি অকপটে এবং নির্ভীকভাবে তাদের স্বার্থ রক্ষা করে, তাহলো অক্টোবরি পার্টি, সেই জন্য তারা এই পার্টির চারপাশে সমবেত হতে এবং তার মতাদর্শগত নেতৃত্ব মেনে নিতে মনস্ত করলো। তারপর থেকে পুঁজিপতিরা এই পার্টির মতাদর্শগত নেতৃত্বের অধীনে তাদের রাজনৈতিক সংগ্রাম চালিয়ে আসছে এবং এর সাহায্যে তারা বর্তমান সরকারের ওপর প্রভাব বিস্তার করে (যে সরকার শ্রমিকদের ইউনিয়ন দাবিয়ে রাখে, কিন্তু পুঁজিপতি সমিতির সংগঠনের মঞ্জুরি ত্বরান্বিত করে) ডুমায় তাদের প্রার্থীদের নির্বাচনের ব্যবস্থা করে ইত্যাদি ইত্যাদি।

এইভাবে সমিতিগুলির সাহায্যে অর্থনৈতিক সংগ্রাম এবং অক্টোবরী পার্টির মতবাদগত নেতৃত্বের অধীনে সাধারণ রাজনৈতিক সংগ্রাম- বৃহৎ বুর্জোয়াদের চালিত শ্রেণি সংগ্রাম আজ সেই রূপই ধারণ করেছে।

বিপরীত দিকে শ্রমিক শ্রেণির শ্রেণি আন্দোলনেও আজ অনুরূপ দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। শ্রমিক শ্রেণির পেশাগত স্বার্থ রক্ষা করার জন্য ট্রেড ইউনিয়ন গঠিত হচ্ছে এবং এগুলি উচ্চতর মজুরি অর্জন, কাজের দিনের সময় কমানো ইত্যাদির জন্য সংগ্রাম করছে। কিন্তু পেশাগত স্বার্থের অতিরিক্ত শ্রমিক শ্রেণির অভিন্ন শ্রেণিস্বার্থও আছে; তাহলো সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের সংগঠন এবং সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। কিন্তু শ্রমিক শ্রেণি যতদিন একটি ঐক্যবদ্ধ এবং অবিভাজ্য শ্রেণি হিসাবে রাজনৈতিক ক্ষমতা জয় না করে, ততদিন সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পাদন করা অসম্ভব। এই জন্যই শ্রমিক শ্রেণিকে অতি অবশ্যই রাজনৈতিক সংগ্রাম চালাতে হবে এবং রাজনৈতিক আন্দোলনের ভাবাদর্শগত নেতা হিসাবে কাজ করার জন্য তার একটি রাজনৈতিক দল প্রয়োজন। অবশ্য অধিকাংশ শ্রমিক ইউনিয়ন কোন দলভুক্ত নয় এবং নিরপেক্ষ। কিন্তু এর মানে কেবল এই যে, অর্থ ও সাংগঠনিক বিষয়ে এইগুলি পার্টি নিরপেক্ষ। অর্থাৎ তাদের নিজস্ব তহবিল আছে, নিজস্ব পরিচালক সংস্থা আছে, তারা নিজেদের কংগ্রেস আহ্বান করে, তারা নিজেদের কংগ্রেস আহ্বান করে সরকারিভাবে তারা রাজনৈতিক পার্টিগুলির সিদ্ধান্ত মানতে বাধ্য নয়। কোন নির্দিষ্ট পার্টির ওপর ট্রেড ইউনিয়নগুলোর ভাবাদর্শগত নির্ভরতা সম্পর্কে বলতে গেলে এরকম নির্ভরতা সন্দোহাতীতভাবেই বিদ্যমান এবং তা না হয়ে পারে না, কেননা, অন্য সবকিছু ছাড়াও বিভিন্ন পার্টির সদস্যরা ইউনিয়নগুলির অন্তর্ভুক্ত এবং তারা অবশ্যম্ভাবীরূপে তাদের রাজনৈতিক প্রত্যয় ইউনিয়নগুলির ভিতর নিয়ে যায়। স্পষ্টতই শ্রমিক শ্রেণি যদি রাজনৈতিক সংগ্রাম ছাড়া কাজ না চালাতে পারে তাহলে তারা কোন না কোন রাজনৈতিক পার্টির ভাবাদর্শগত নেতৃত্ব ছাড়াও চলতে পারে না। এর চেয়ে আরও কিছু বেশি। তারা নিজেরাই একটা পার্টি খুঁজবেই যে পার্টি সুযোগ্যভাবে তার ইউনিয়নগুলিকে নেতৃত্ব দিয়ে সমাজতন্ত্রের প্রতিশ্রুতি দেশের দিকে নিয়ে যাবে। কিন্তু এখানে শ্রমিক শ্রেণিকে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে এবং সব দিকে নজর রেখে কাজ করতে হবে। রাজনৈতিক পার্টিগুলির ভাবাদর্শগত সম্পদ তাকে অবশ্যই সযত্নে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে এবং অবাধে সেই পার্টির ভাবাদর্শগত নেতৃত্বই সে গ্রহণ করবে, যে পার্টি সাহসিকতার সঙ্গে এবং নিরবচ্ছিন্নভাবে তার শ্রেণিস্বার্থ রক্ষা করবে, সর্বহারার লাল পতাকা ঊর্ধ্বে তুলে ধরবে, এবং অকুতোভয়ে তাকে রাজনৈতিক ক্ষমতার দিকে- সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের দিকে পরিচালিত করবে।

এই পর্যন্ত এই ভূমিকা রাশিয়ান সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক লেবার পার্টি পালন করে এসেছে এবং সেই জন্য ট্রেড ইউনিয়নগুলির কর্তব্য হলো একটি পার্টির ভাবাদর্শগত নেতৃত্ব মেনে নেওয়া।
সর্বসাধারণ জানে যে তারা প্রকৃতপক্ষে তা-ই করে।

এইভাবে ট্রেড ইউনিয়নগুলির সাহায্যে রাজনৈতিক দাবিতে অনুষ্ঠিত সংঘর্ষ এবং সোশ্যাল ডেমোক্রাসির ভাবাদর্শগত নেতৃত্বে রাজনৈতিক আক্রমণ- শ্রমিক শ্রেণির শ্রেণি সংগ্রাম আজ এইরূপ ধারণ করেছে।

শ্রেণি সংগ্রাম যে ক্রমবর্ধমান উদ্দীপনায় জ্বলে উঠবে, তাতে কোন সন্দেহই তাকতে পারে না। শ্রমিক শ্রেণির করণীয় কাজ হলো তার সংগ্রামে সাংগঠনিক পদ্ধতি ও মনোভাব প্রবর্তন করা। এই কাজ সম্পাদনের জন্য প্রয়োজন হলো ইউনিয়নগুলিকে শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ করা এবং এই কাজে ট্রেড ইউনিয়নগুলির সারা রাশিয়া কংগ্রেস বিপুল সাহায্য দিতে পারে। একটি দল নিরপেক্ষ শ্রমিকদের কংগ্রেস নয়, আমরা আজ যা চাই তা হলো শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন সমূহের কংগ্রেস, যাতে শ্রমিক শ্রেণি এক ঐক্যবদ্ধ ও অবিভাজ্য শ্রেণিতে সংগঠিত হতে পারে। সঙ্গে সঙ্গে শ্রমিক শ্রেণি অবশ্যই এই পার্টিকে শক্তিশালী ও সুসংহত করার জন্য অবশ্যই চেষ্টা করবে, যে পার্টি তার শ্রেণি সংগ্রামের ভাবাদর্শগত নেতা হিসাবে কাজ করবে।

 

সুত্রঃ

13076745_715535491921699_3304914592563662269_n


কমরেড লেনিনঃ অর্থনীতিবাদীদের আনাড়িপনা ও বিপ্লবীদের সংগঠন, শ্রমিকদের সংগঠন ও বিপ্লবীদের সংগঠন

lenin2

 

অর্থনীতিবাদীদের আনাড়িপনা ও বিপ্লবীদের সংগঠন
শ্রমিকদের সংগঠন ও বিপ্লবীদের সংগঠন

-ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়ানভ (লেনিন)

 

কোন কোন সোশ্যাল ডেমোক্রাটের রাজনীতিক সংগ্রাম সংক্রান্ত ধারণাটা মালিকদের আর সরকারের বিরুদ্ধে অর্থনীতিক সংগ্রাম সংক্রান্ত ধারণার সঙ্গে এক হলে স্বভাবতই মনে করা যেতে পারে, তাঁর কাছে বিপ্লবীদের সংগঠন এবং শ্রমিকদের সংগঠন কম বেশি একই। বাস্তবে তাইই ঘটে, যাতে আমরা যখন সংগঠনের কথা বলি, আমরা বলি একেবারেই আলাদা আলাদা ভাষায়। যেমন মোটামুটি সংগতিপূর্ণ একজন অর্থনীতিবাদীর সঙ্গে একবার আলাপের কথা আমার স্পষ্ট মনে আছে, তাঁর সঙ্গে আমার পূর্বপরিচয় ছিল না। রাজনীতিক বিপ্লব ঘটাবে কারা?- এই পুস্তিকাখানা নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল; সংগঠন সংক্রান্ত প্রশ্নটাকে তুচ্ছ করাই পুস্তিকাখানার প্রধান ত্রুটি, এ বিষয়ে আমরা শিগগিরই একমত হয়ে গিয়েছিলাম। মনে হচ্ছিল আমরা সম্পূর্ণতই একমত ….. কিন্তু আলোচনা এগোতে থাকলে স্পষ্ট হয়ে গেল আমরা বলছিলাম পৃথক পৃথক জিনিসের কথা। ধর্মঘট তহবিল, পারস্পরিক সাহায্য সমিতি ইত্যাদি উপেক্ষিত হয়েছে বলে আমার আলাপসঙ্গী লেখকের বিরুদ্ধে নালিশ তুললেন আর রাজনৈতিক বিপ্লব ঘটাবার একটা অপরিহার্য উপাদান হিসেবে বিপ্লবীদের সংগঠনের কথাটা ছিল আমার মনে। মতভেদটা যেই মাত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল তারপর মূলনীতি সংক্রান্ত একটা প্রশ্নেও অর্থনীতিবাদীটির সঙ্গে একমত হয়েছিলাম বলে আমার মনে পড়ে না।

আমাদের মতানৈক্যের মূলটা ছিল কোথায়? সেটা হলো এই যে, সংগঠন আর রাজনীতি উভয় প্রশ্নে অর্থনীতিবাদীরা বরাবর সোশ্যাল ডেমোক্রাসি থেকে ভ্রষ্ট হয়ে গিয়ে পড়ছে ট্রেড ইউনিয়নবাদে। মালিকদের আর সরকারের বিরুদ্ধে শ্রমিকদের অর্থনীতিক সংগ্রামের চেয়ে সোশ্যাল ডেমোক্রাসির রাজনীতিক সংগ্রাম ঢের বেশি বিস্তৃত এবং জটিল। তেমনি (বাস্তবিকপক্ষে, সেই কারণে) বৈপ্লবিক সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক পার্টির সংগঠন হতেই হবে এই (অর্থনীতিক) সংগ্রামের জন্য গঠিত শ্রমিকদের সংগঠন থেকে ভিন্ন রকমের। শ্রমিকদের সংগঠন হওয়া চাই, প্রথমত, ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠন; দ্বিতীয়ত, সেটা হওয়া চাই যথাসম্ভব বিস্তৃত; আর তৃতীয়ত, সেটার হওয়া চাই অবস্থা অনুসারে যথাসম্ভব প্রকাশ্য (এখানে এবং পরে আমি অবশ্য বলেছি কেবল স্বৈরতান্ত্রিক রাশিয়া প্রসঙ্গে) অন্যদিকে প্রথমত আর সর্বোপরি তাদেরই নিয়ে হওয়া চাই বিপ্লবীদের সংগঠন যারা বৈপ্লবিক ক্রিয়াকলাপকে নেয় পেশা হিসাবে (সেই কারণে আমি বলছি, বিপ্লবীদের সংগঠনের কথা- বিপ্লবী বলতে বুঝাতে চাইছি বিপ্লবী সোশ্যাল ডেমোক্রাট)। এই রকমের সংগঠনের সদস্যদের এই সাধারণ বিশেষক থাকায় বৃত্তিগত আর পেশাগত তো বটেই শ্রমিক আর বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে যা থাকে সেই সমস্ত পার্থক্য উভয় বর্গ থেকে নিশ্চিহ্ন হওয়া চাই। বাধ্য হয়েই এই রকমের সংগঠন খুব বিস্তৃত হবে না, আর হবে যথাসম্ভব গুপ্ত। এই ত্রিবিধ পার্থক্য নিয়ে বিচার বিবেচনা করা যাক।

রাজনীতিক স্বাধীনতা আছে যে সব দেশে সেগুলিতে ট্রেড ইউনিয়ন আর রাজনীতিক সংগঠনের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট, যেমন স্পষ্ট ট্রেড ইউনিয়ন আর সোশ্যাল ডেমোক্রাসির মধ্যেকার পার্থক্য। পরে উল্লেখিত আর আগে উল্লেখিতের মধ্যেকার পার্থক্য প্রত্যেকটা দেশেই স্বভাবতই পৃথক হবে ঐতিহাসিক, আইনগত ও অন্যান্য অবস্থা অনুসারে; সেগুলো হতে পারে কমবেশি কাছাকাছি, জটিল ইত্যাদি (আমাদের মতে, সেগুলো হওয়া উচিত যথাসম্ভব কাছাকাছি এবং কম জটিল); কিন্তু মুক্ত দেশগুলিতে ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠনের সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক পার্টি সংগঠনের সঙ্গে এক হয়ে যাবার কোন প্রশ্ন থাকতে পারে না। তবে রাশিয়ায় আপাত দৃষ্টিতে মনে হয় স্বৈরতন্ত্রের জোয়াল সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক সংগঠন এবং শ্রমিক সমিতিগুলির মধ্যেকার সমস্ত পার্থক্য বিলুপ্ত করে দেয়- কেননা সমস্ত শ্রমিক সমিতি এবং সমস্ত পাঠচক্র নিষিদ্ধ, শ্রমিকদের অর্থনৈতিক সংগ্রামের প্রধান অভিব্যক্তি আর অস্ত্র ধর্মঘট- একটা ফৌজদারী (এবং কখনও কখনও এমনকি রাজনীতিক) অপরাধ বলে গণ্য হয়। কাজেই আমাদের দেশের অবস্থা অর্থনীতিক সংগ্রামে ব্যাপৃত শ্রমিকদের রাজনীতিক প্রশ্নাবলীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হতে প্রবৃত্ত করে একদিকে, আর অন্যদিকে সোশ্যাল ডেমোক্রাটদের প্রবৃত্ত করে সোশ্যাল ডেমোক্রাসির সঙ্গে ট্রেড ইউনিয়নবাদকে তালগোল পাকিয়ে দিতে (আর আমাদের ক্রিচেভস্কিয়া মার্তিনভরা অ্যান্ড কোং প্রথম ধরনের প্রবৃত্তি নিয়ে অধ্যবসায়ী আলোচনা করে, কিন্তু দ্বিতীয়টি লক্ষ্য করতে অপারগ)। মালিকদের আর সরকারের বিরুদ্ধে অর্থনীতিক সংগ্রামে যারা পনর আনাই ডুবে রয়েছেন তাঁদের কথাটা ভাবুন তো একবার। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ তাঁদের সক্রিয়তার সমগ্র কালপর্যায়ে (চার থেকে ছয় মাস) বিপ্লবীদের অপেক্ষাকৃত জটিল সংগঠনের প্রয়োজন সম্বন্ধে ভাবার প্রবৃত্তি বোধ করবেন না কখনও। অন্যান্যেরা হয়তো হাতে পাবেন বেশ ব্যাপকভাবেই পরিবেশিত বের্নস্টাইনবাদী সাহিত্য, তার থেকে তারা নীরস দৈনন্দিন সংগ্রামে অগ্রগতির প্রগাঢ় গুরুত্ব সম্বন্ধে দৃঢ়প্রত্যায়ী হয়ে উঠবেন। আরও কেউ কেউ হয়তো প্রলেতারীয় সংগ্রামের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ এবং অঙ্গাঙ্গী সম্পর্কের- ট্রেড ইউনিয়ন আর সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক আন্দোলনের মধ্যে সম্পর্কের- নতুন দৃষ্টান্ত দুনিয়াটাকে দেখিয়ে দেবার মনোমোহিনীভাবে মশগুল হয়ে যাবেন। এমন সব ব্যক্তি যুক্তি দেখাতে পারেন যে, কোন দেশ পুঁজিতন্ত্রের ক্ষেত্রে, আর তার ফলে শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলনের ক্ষেত্রে যত দেরিতে ঢোকে, সে দেশের সমাজতন্ত্রীরা ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনে অংশগ্রহণ করতে এবং সে আন্দোলনকে সমর্থন করতে পারে ততই বেশি, আর অসোশ্যাল ডেমোক্রাটিক ট্রেড ইউনিয়ন থাকার কারণ ততই কম। এই অবধি যুক্তিটা পুরোপুরি সঠিক, কিন্তু দুঃখের কথা কেউ কেউ আরও ছড়িয়ে গিয়ে ট্রেড ইউনিয়নবাদের সঙ্গে সোশ্যাল ডেমোক্রাসি মিলে মিশে একেবারে এক হয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন। আমাদের সংগঠন সংক্রান্ত পরিকল্পনার ওপর এমন সব স্বপ্নের হানিকর ক্রিয়া কতখানি সেটা আমরা ঠিকই দেখতে পাবো সেন্ট পিটার্সবুর্গ মুক্তি সংগ্রাম লীগ এর নিয়মাবলির দৃষ্টান্ত থেকে।

অর্থনীতিক সংগ্রামের জন্য শ্রমিকদের সংগঠন হওয়া চাই ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠন। এইসব সংগঠনের যথাসম্ভব আনুকূল্য করা এবং এইসব সংগঠনে সক্রিয়ভাবে যথাসম্ভব কাজ করা উচিত প্রত্যেকটি সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক শ্রমিকের। তা ঠিক, কিন্তু ট্রেড ইউনিয়নগুলিতে সদস্য হওয়ার উপযুক্ত বিবেচিত হবে কেবল সোশ্যাল ডেমোক্রাটরাই এমনটা দাবি করা আমাদের স্বার্থের অনুযায়ী নয়; কেননা এর ফলে জনগণের মধ্যে আমাদের প্রভাবের পরিধি সঙ্কুচিতই হয়ে যাবে শুধু। মালিক আর সরকারের বিরুদ্ধে সংগ্রামে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আবশ্যকতা যে বোঝে এমন প্রত্যেকটি শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়নে যোগ দিন। যারা উপলব্ধির অন্তত এই প্রাথমিক মাত্রায় পৌঁছেছে তাদের সবাই ট্রেড ইউনিয়নগুলিতে সম্মিলিত না হলে, ট্রেড ইউনিয়নগুলি খুবই বিস্তৃত সংগঠন না হলে, ট্রেড ইউনিয়নগুলির লক্ষ্যই হাসিল করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। এই সব সংগঠন যত বিস্তৃত হবে ততই ব্যাপক হবে সেগুলির ওপর আমাদের প্রভাব- অর্থনীতিক সংগ্রামের স্বতঃস্ফূর্ত বিকাশের কারণেই শুধু নয়, এই প্রভাবের আরও কারণ হলো সাথীদের ওপর প্রভাব বিস্তারের জন্য ট্রেড ইউনিয়নের সমাজতন্ত্রী সদস্যদের প্রত্যক্ষ এবং সচেতন প্রচেষ্টা। তবে কোন বিস্তৃত সংগঠন কঠোর গোপনীয়তার পদ্ধতি প্রয়োগ করতে পারে না (কেননা, অর্থনীতিক সংগ্রামের জন্য যা তার চেয়ে ঢের বেশি তালিম আবশ্যক সেজন্যে)।

বিরাট সদস্য সংখ্যা আর কঠোর গোপন পদ্ধতি- এই দুটো আবশ্যকতার মধ্যেকার অসংগতিকে খাপ খাওয়ান যায় কেমন করে? ট্রেড ইউনিয়নগুলি আমরা যথাসম্ভব প্রকাশ্য করবো কীভাবে? সাধারণভাবে বলতে গেলে তার উপায় আছে দুটো মাত্র ঃ হয় ট্রেড ইউনিয়নগুলি বৈধকরণ (কোন কোন দেশে সমাজতান্ত্রিক আর রাজনীতিক সমিতিগুলির বৈধকরণের আগে সেটা ঘটেছিল), নইলে সংগঠন থাকুক গুপ্ত, কিন্তু এতই মুক্ত অনিয়তাকার, জার্মানিরা যাকে বলে Lose (ঢিলেঢালা) যাতে, সদস্যদের বেশির ভাগের দিক থেকে দেখলে, গোপন পদ্ধতির প্রয়োজন হয়ে যায় নগণ্য । রাশিয়ার অসমাজতান্ত্রিক এবং অরাজনীতিক ইউনিয়নগুলির বৈধকরণ শুরু হয়েছে- এতে কোন সন্দেহ নেই যে, শ্রমিক শ্রেণির দ্রুত বেড়ে চলা সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক আন্দোলনের প্রত্যেকটা অগ্রগতির ফলে বৈধ প্রচেষ্টার সংখ্যা বাড়বে, সে প্রচেষ্টায় উৎসাহ সৃষ্টি হবে- এইসব প্রচেষ্টার বেশির ভাগ আসছে বিদ্যমান ব্যবস্থার সমর্থকদের মধ্যে থেকে, কিন্তু অংশত শ্রমিকদের নিজেদেরই এবং উদারপন্থী বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে থেকেও। ভাসিলিয়েভরা এবং জুবাতভরা ইতিমধ্যে বৈধতার ঝান্ডা উড়িয়েছে। ওজেরভরা আর ভোর্মসরা সমর্থনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং সমর্থন দিয়েছে, নতুন ধারার সমর্থকদের এখন দেখা যায় শ্রমিকদের মধ্যে। এখন থেকে এই ধারাটাকে আমরা হিসাবে না ধরে পারি না। সেটাকে হিসাবে ধরতে হবে কীভাবে, সে সম্পর্কে সোশ্যাল ডেমোক্রাটদের মধ্যে কোন দ্বিমত থাকতে পারে না। এই আন্দোলনের জুবাতভরা আর ভাসিলিয়েভরা, রাজনীতিক পুলিশ আর যাজকেরা যে কোন ভূমিকায় নামলে সেটাকে আমাদের অটল থেকে উত্থাপিত করতে হবে এবং শ্রমিকদের কাছে বুঝিয়ে বলতে হবে তাদের আসল মতলবের কথা। শ্রমিকদের বৈধ সভাগুলিতে উদারপন্থী রাজনীতিকদের বক্তৃতায় যেসব মিলজুল আর সমন্বয়ের সুর শোনা যাবে সেগুলোকেও আমাদের উদঘাটন করে দিতে হবে, সেগুলো শান্তিপূর্ণ শ্রেণিগত সহযোগের বাঞ্ছনীয়তা সম্বন্ধে আন্তরিক প্রত্যয়প্রসূতই হোক, আর হীন তোষামোদ করে কর্তৃপক্ষের অনুগ্রহ লাভের বাসনাপ্রসূত হোক, কিংবা হোক শুধু আনাড়িপনার ফল, সেসব নির্বিশেষে। শেষে পুলিশ প্রায়ই যে সব ফাঁদ পাতে সেগুলো সম্বন্ধে আমাদের শ্রমিকদের হুঁশিয়ার করে দিতে হবে, এইসব প্রকাশ্য সভা আর অনুমত সমিতিতে পুলিশ গনগনে লোকদের খুঁজে বের করে এবং বেআইনি সংগঠনে প্ররোচনাদাতা চর মোতায়েন করার জন্য বৈধ সংগঠনগুলিকে কাজে লাগাবার চেষ্টা করে।

এই সব কিছু করার অর্থ আদৌ এমনটা নয় যে, এ কথা ভুলে যেতে হবে যে, শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলন বৈধকরণের ফলে শেষ পর্যন্ত লাভবান হবো আমরা- জুবাতভরা নয়। তার উলটো গম থেকে আগাছা নিড়বার জন্যে আমাদের সহায়ক হবে আমাদের উদ্ঘাটন অভিযানই। আগাছা কী সেটা আমরা আগেই নির্দেশ করেছি। গম বলতে আমরা বুঝাতে চাইছি সবচেয়ে অনগ্রসর অংশগুলি সমেত ক্রমাগত বেশিসংখ্যক শ্রমিকের মনোযোগ বিভিন্ন সামাজিক আর রাজনীতিক প্রশ্নে আকৃষ্ট করা, এবং মূলত বৈধ যেসব কাজের (আইনসঙ্গত বই পরিবেশন, পারস্পরিক সহায়তা ইত্যাদি) বিকাশের ফলে আমরা আলোড়নের মধ্যে ক্রমবর্ধমান পরিমাণে মাল মশলা পাব তা অবশ্যম্ভাবী, সেগুলো থেকে আমাদের বিপ্লবীদের মুক্ত করা। এদিক থেকে দেখলে, জুবাতভদের আর ওজেরভদের আমরা একথা বলতে পারি এবং তা আমাদের বলতে হবে; লেগে থাকুন ভদ্রমহোদয়গণ, যথাসাধ্য করুন! যখনই আপনারা শ্রমিকদের পথে কোন ফাঁদ পাতবেন (সরাসরি প্ররোচনা হিসাবেই হোক, আর স্ত্রুভেবাদের সাহায্যে শ্রমিকদের সততাসহকারে নীতিভ্রষ্ট করেই হোক), তাহলে আপনাদের স্বরূপ যাতে উদ্ঘাটিত হয় তার ব্যবস্থা আমরা করবো। কিন্তু যখনই আপনারা কোন সত্যিকারের অগ্রপদক্ষেপ করবেন, সেটা অতি দ্বিধাগ্রস্ত আঁকাবাঁকা হলেও আমরা বলবো চালিয়ে যান! আর একমাত্র পদক্ষেপ যা সত্যিকারের অগ্রপদক্ষেপ হতে পারে সেটা হলো শ্রমিকদের কর্মকান্ডক্ষেত্রের সত্যিকারের প্রসার, সেটা ক্ষুদ্র হলেও। এমন প্রত্যেকটা প্রসারের ফলে আমাদের সুবিধে হবে, আর আমরা সেই রকমের বৈধ সমিতির উদ্ভব ত্বরিত করতে সাহায্য করবো যেখানে প্ররোচনাদাতা চরেরা সমাজতন্ত্রীদের খুঁজে বের করে না, সেখানে সমাজতন্ত্রীরা পায় নতুন নতুন অনুগামী। এককথায়, আগাছা দূর করতে প্রচেষ্টা চালানই এখন আমাদের গমের জন্যে জমি সাফ করি। আফানাসি ইভানভিচরা আর পুলখেরিয়া ইভানভনারা যখন ফুলের টবের ফসলের যত্ন করছেন তখন আমাদের প্রস্তুত রাখতে হবে কাটিয়েদের- আজকের আগাছা কেটে ফেলার জন্যই শুধু নয় আগামী দিনের গম কাটার জন্যও।

এইভাবে যথাসম্ভব কম গুপ্ত এবং যথাসম্ভব ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠন গড়ার সমস্যাটার সমাধান বৈধকরণের উপায়ে আমরা করতে পারি নে (কিন্তু) জুবাতভরা আর ওজেরভরা এমন সমাধানের কোন আংশিক সুযোগও আমাদের কাছে খুলে ধরলে আমরা নিশ্চয়ই খুবই খুশি হবো- এই উদ্দেশ্যে তাদের বিরুদ্ধে আমাদের আয়াসসাধ্য লড়াই চালাতে হবে!) আর রইল গুপ্ত ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠন; যে সব শ্রমিক এই পথ ধরছে (তা আমরা নিশ্চিতভাবেই জানি) তাদের সম্ভাব্য সমস্ত সহায়তা আমাদের দিতেই হবে। ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠনগুলি মহামূল্যবান হতে পারে অর্থনীতিক সংগ্রামের বিকাশ আর সংহতির জন্যই শুধু নয়, রাজনীতিক আলোড়ন আর বৈপ্লবিক সংগঠনের পক্ষেও সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা সহায়ক হয়ে উঠতে পারে। এই উদ্দেশ্য সাধন করতে হলে এবং সোশ্যাল ডেমোক্রাসির বাঞ্ছিত খাতে জায়মান ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনকে চালিত করতে হবে, সেন্ট পিটার্সবুর্গের অর্থনীতিবাদীরা প্রায় পাঁচ বছর ধরে যে সংগঠন পরিকল্পনা পোষণ করে আসছেন সেটা কী আজগুবি তা আমাদের প্রথমে স্পষ্ট বুঝতে হবে। সেই পরিকল্পনা প্রকাশিত হয়েছে ১৮৯৭ সালের জুলাই মাসের শ্রমিকদের পারস্পরিক কল্যাণ তহবিলের নিয়মাবালীতে (১নং রাবোচায়া মিশল থেকে নিয়ে ৯-১০নং লিস্তক রাবোৎনিকায়) তাছাড়া ১৯০০ সালের অক্টোবর মাসের ট্রেড ইউনিয়ন শ্রমিক সংগঠনের নিয়মাবলিতেও (সেন্ট পিটার্সবুর্গে ছাপানো বিশেষ ইস্তেহার, ১নং ইস্ক্রায় তার উল্লেখ ছিল)। উভয় প্রস্থ নিয়মাবলির একটা প্রধান ত্রুটি আছে; উভয় ক্ষেত্রে বিস্তৃত শ্রমিক সংগঠনকে স্থাপন করা হয়েছে কঠোরভাবে বাঁধাধরা কাঠামোয়, আর সেই সংগঠনকে গুলিয়ে ফেলা হয়েছে বিপ্লবীদের সংগঠনের সঙ্গে। নিয়মাবলির যে প্রস্থটার কথা শেষে উল্লেখ করা হয়েছে সেটাকে ধরা যাক, কেননা এটাকে রচনা করা হয়েছে অধিকতর সবিস্তারে। এতে আছে বাহান্নটা অনুচ্ছেদ; তেইশটা অনুচ্ছেদ হলো শ্রমিক চক্রগুলির গঠন, কর্মপ্রণালী এবং এক্তিয়ার নিয়ে- এই চক্র সংগঠিত হবে প্রত্যেকটা কারখানায় (দশ জনের বেশি নয়), আর তাতে নির্বাচিত হবে কেন্দ্রীয় (কারখানা) গ্রুপ। ২নং অনুচ্ছেদে আছে ঃ কারখানায় কিংবা কর্মশালায় যা কিছু চলবে তা লক্ষ্য করবে এবং ঘটনাবলির নথি রাখবে কেন্দ্রীয় গ্রুপে। কেন্দ্রীয় গ্রুপ চাঁদাদাতাদের কাছে মাসিক আর্থিক হিসাব পেশ করবে (১৭ নং ইত্যাদি)। এলাকা সংগঠন নিয়ে আছে ১০টা অনুচ্ছেদ, আর ঊনিশটা অনুচ্ছেদ আছে শ্রমিক সংগঠন কমিটি এবং সেন্ট পিটার্সবুগ মুক্তি সংগ্রাম লীগ এর মধ্যে খুবই জটিল পারস্পরিক সংযোগের কথা (প্রত্যেকটা এলাকায় এবং নির্বাহী গ্রুপগুলির নির্বাচিত প্রতিনিধিরা- প্রচারকদের গ্রুপগুলি, বিভিন্ন প্রদেশ আর বিদেশে সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার গ্রুপগুলি গুদাম প্রকাশন আর তহবিল ব্যবস্থাপকের জন্য গ্রুপগুলি)।

সোশ্যাল ডেমোক্রাসি = শ্রমিকদের আর্থনীতিক সংগ্রামের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নির্বাহী গ্রুপগুলি! অর্থনীতিবাদীদের ভাব ভাবনা কিভাবে সোশ্যাল ডেমোক্রাসি থেকে বিচ্যুত হয়ে চলে যায় ট্রেড ইউনিয়নবাদে, আর মুক্তির জন্য সমগ্র প্রলেতারীয় সংগ্রাম পরিচালিত করতে যা সক্ষম বিপ্লবীদের এমন সংগঠন নিয়েই যে কোন সোশ্যাল ডেমোক্রাটের ব্যাপৃত থাকা চাই প্রথমত আর সর্বোপরি, এমন কোন ভাব ভাবনা তাদের কাছে কতখানি বিজাতীয়, সেটা এর চেয়ে স্পষ্ট করে ফুটিয়ে তোলা দুষ্কর। শ্রমিক শ্রেণির রাজনীতিক মুক্তি এবং জার স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে সংগ্রামের কথা বলার সঙ্গে সংগঠনের এমন সব নিয়মাবলীর খসড়া রচনার অর্থ হলো সোশ্যাল ডেমোক্রাসির যথার্থ কাজ সম্পর্কে একেবারেই কোন ধারণাই না থাকা। জনগণের মধ্যে সম্ভাব্য ব্যাপকতম রাজনীতিক আলোড়ন চালানো আবশ্যক, যে আলোড়নে বিশিষ্ট হয়ে উঠবে রুশ স্বৈরতন্ত্রের প্রত্যেকটা দিক এবং রাশিয়ার বিভিন্ন সামাজিক শ্রেণির বিশেষত্বগুলো, এমন উপলব্ধির একটা ক্ষীণ আভাসও ফুটে ওঠেনি ওই গোটা পঞ্চাশেক অনুচ্ছেদের একটায়ও। রাজনীতিক লক্ষ্য তো দূরের কথা ট্রেড ইউনিয়ন লক্ষ্য হাসিল করার জন্যও এই রকমের নিয়মাবলী কোন কাজের নয়। কেননা ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠিত হয় বৃত্তি অনুসারে, তাতে তার কোন উল্লেখ নেই।

তবে বোধ হয় সবচেয়ে বিশেষক হলো সমগ্র ব্যবস্থাটার বিস্ময়কর মাথা ভারি অবস্থা, তাতে প্রত্যেকটা পৃথক কারখানা আর তার কমিটিতে বাঁধা ছকের হাস্যকর রকম তুচ্ছ ধরনের নিয়ম এবং তিন পর্বের নির্বাচন ব্যবস্থার স্থায়ী সূত্র ধরে বেঁধে দেবার চেষ্টা করা হয়েছে। অর্থনীতিবাদের সঙ্কীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিতে আবদ্ধ মন হারিয়ে গিয়েছে নানা খুটিনাটির মধ্যে, সেগুলোতে লাল ফিতে আর আমলাতান্ত্রিকতার বোটকা গন্ধ একেবারে সুস্পষ্ট। কার্যক্ষেত্রে অবশ্য ধারাগুলোর তিন চতুর্থাংশ কখনও প্রযোজ্য নয়; আর অন্যদিকে এই রকমের গুপ্ত সংগঠন যাতে প্রত্যেকটা কারখানায় থাকে কেন্দ্রীয় গ্রুপ তাতে রাজনীতিক পুলিশদের ব্যাপক পরিসরে হামলা চালানো খুবই সহজ হয়ে পড়ে। পোল্যান্ডের কমরেডরা তাদের আন্দোলনের একটা অনুরূপ পর্ব পার হয়ে এসেছেন, তাতে প্রত্যেকটা শ্রমিক কল্যাণ তহবিলের বিস্তৃত সংগঠনের বিষয়ে সোৎসাহ ছিলেন, কিন্তু যখন তারা দেখেছিলেন এমন সংগঠন রাজনৈতিক পুলিশের জন্য ফলাও মৌসুমই যোগায় শুধু, তখন তাঁরা এ চিন্তা ছেড়েছিলেন চটপট। ব্যাপক গ্রেফতার নয়, শ্রমিকদের বিস্তৃত সংগঠন যদি আমরা চাই আমরা যদি গোয়েন্দা পুলিশের মনোতুষ্টির ব্যবস্থা করতে না চাই তা হলে আমাদের এমন ব্যবস্থা করতেই হবে যাতে এই সব সংগঠনের কঠোরভাবে বাঁধাধরা কোন আনুষ্ঠানিক গড়ন না থাকে। কিন্তু সেক্ষেত্রে সেগুলি কী সক্রিয় থাকতে পারবে? দেখা যাক কাজ কর্মগুলি কী; কারখানায় যা কিছু চলে তা লক্ষ্য করা এবং ঘটনাবলির নথি রাখা (নিয়মাবলির ২নং অনুচ্ছেদ) আনুষ্ঠানিকভাবে স্থাপিত গ্রুপ থাকা এই উদ্দেশ্যে সত্যিই কি আবশ্যক? বিশেষ বিশেষ গ্রুপ স্থাপন না করে বেআইনি পত্র পত্রিকাগুলিতে চিঠিপত্র লেখালেখি দিয়েই কি এই উদ্দেশ্য আরও ভালভাবে সাধিত হতে পারে না? … কর্মশালার অবস্থা উন্নীত করার জন্য শ্রমিকদের সংগ্রাম পরিচালন (নিয়মাবলির ৩নং) এর জন্যেও তো কোন বাঁধাধরা সাংগঠনিক আকারের দরকার নেই। কান্ডজ্ঞানসম্পন্ন যে কোন আলোড়ক সাধারণ কথাবার্তার মধ্যে শ্রমিকদের দাবি দাওয়া জেনে নিয়ে সেগুলো কোন ইস্তেহারে প্রকাশ করার জন্য বিপ্লবীদের কোনÑ বিস্তৃত নয়- সঙ্কীর্ণ সংগঠনের কাছে পাঠিয়ে দিতে পারেন। … একটা তহবিল গড়া… তাতে রুবল দুই কোপেক করে চাঁদা দিতে হবে (৯নং), আর তারপর চাঁদাদাতাদরে কাছে মাসিক আর্থিক হিসাব পেশ করা (১৭নং), সেসব সদস্য চাঁদা দেয় না তাদের বহিষ্কৃত করা (১০নং) ইত্যাদি। এটা তো পুলিশের একেবারে স্বর্গরাজ্য, কেননা কোন কেন্দ্রীয় কারখানা তহবিলের এমন গোপনীয়তার ভিতরে অনুপ্রবেশ করে টাকা বাজেয়াপ্ত করে সেরা সেরা লোকদের গ্রেফতার করার চেয়ে সহজ তাদের পক্ষে আর কিছুই হতে পারে না। কোন সুপরিচিত (খুবই সঙ্কীর্ণ, খুবই গুপ্ত) সংগঠনের মোহর ছাপানো এক কোপেক কিংবা দুকোপেকের কুপন বের করা, কিংবা কোন রকমের কুপন ছাড়াই চাঁদা তুলে কোন বেআইনি কাগজে সঙ্কেত বিবরণ প্রকাশ করাটা কি আরও সহজ নয়? তাতে উদ্দেশ্য সাধিত হয়, কিন্তু গোয়েন্দা পুলিশের পক্ষে কোন সুলুক পাওয়াটা হয় শতগুণ কঠিন।

নিয়মাবলির বিশ্লেষণ চালিয়ে যেতে পারতাম, কিন্তু আমি মনে করি, যা বলা হলো সেটাই যথেষ্ট। সবচেয়ে বিশ্বস্ত, অভিজ্ঞ এবং পোক্ত শ্রমিকদের একটা ছোট সুসংবদ্ধ কেন্দ্রী ভাগ, তার প্রতিনিধিরা থাকবে প্রধান এলাকাগুলিতে কঠোর গোপনতার সমস্ত নিয়ম অনুসারে সেটা যুক্ত থাকবে বিপ্লবীদের সংগঠনের সঙ্গে- জনগণের ব্যাপকতম সমর্থনে এবং কোন আনুষ্ঠানিক সংগঠন ছাড়াই সেটা ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠনের সমস্ত কাজকর্ম চালাতে পারে, তার ওপর সেটা চালাতে পারে এমনভাবে যা সোশ্যাল ডেমোক্রাসির পক্ষে বাঞ্ছনীয়। একমাত্র আমরা এই উপায়েই সমস্ত গোয়েন্দা পুলিশ সত্ত্বেও সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের সংহতি আর বিকাশ নিশ্চিত করতে পারি।

এই মর্মে আপত্তি উঠতে পারে যে, সংগঠন এতই loose যা সুনির্দিষ্টভাবে গড়াও নয়, যার কোন তালিকাভুক্ত আর রেজিস্ট্রি করা সদস্য শ্রেণীও নেই, সেটাকে আদৌ সংগঠনই বলা যায় না। হয়তো তাই-ই, আমি নামের পিছনে ছুটছি না। কিন্তু এই সদস্যবিহীন সংগঠন যা আবশ্যক সেই সবই করবে এবং একেবারে শুরু থেকেই আমাদের ভবিষ্যৎ ট্রেড ইউনিয়নগুলি এবং সমাজতন্ত্রের মধ্যে নিবিড় সংযোগ নিশ্চিত করবে। স্বৈরতন্ত্রের আমলে নির্বাচন, রিপোর্ট, সর্বজনীন ভোটাধিকার ইত্যাদি নিয়ে শ্রমিকদের বিস্তৃতি চাইতে পারে কোন সংশোধনের অসাধ্য স্বপ্নবিলাসী। এর থেকে পাওয়া নীতি শিক্ষাটা সহজ সরল ঃ বিপ্লবীদের একটি শক্তিশালী সংগঠনের পোক্ত ভিত্তি দিয়ে শুরু করলে আমরা সমগ্রভাবে আন্দোলনের সুস্থিতি নিশ্চিত করতে পারি, আর সোশ্যাল ডেমোক্রাসি এবং খাস ট্রেড ইউনিয়ন দুইয়েরই লক্ষ্য সাধন করতে পারি। কিন্তু আমরা যদি শুরু করি বিস্তৃত শ্রমিক সংগঠন দিয়ে, যাকে নাকি ধরতে হবে জনগণের সবচেয়ে বেশি নাগালের মধ্যে বলে (কিন্তু আসলে যা গোয়েন্দা পুলিশের বেশি নাগালের মধ্যে এবং বিপ্লবীদের এনে ফেলে পুলিশের সবচেয়ে বেশি নাগালের মধ্যে), তাহলে আমরা একটা কিংবা অন্যটা কোন লক্ষ্যই হাসিল করতে পারবো না; আমাদের হাতুড়ে প্রণালী দূর হবে না, আর আমরা ইতস্তত ছড়িয়ে থাকি বলে এবং পুলিশ সর্বক্ষণ আমাদের শক্তি ভেঙে দেবার দরুন আমরা জুবাতভ আর ওজেরভ ধরনের ট্রেড ইউনিয়নগুলিকেই শুধু জনগণের আরও বেশি নাগালের মধ্যে এনে দেব।

যথাযথভাবে বলতে গেলে বিপ্লবীদের সংগঠনের কাজ কর্ম হওয়া উচিত কী? বিষয়টা নিয়ে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করবো। তবে আমাদের সন্ত্রাসবাদীর উপস্থাপিত খুবই নমুনাসই একটা যুক্তি প্রথমে বিচার বিবেচনা করা যাক- তিনি (কপাল মন্দ) এ ব্যাপারে অর্থনীতিবাদীর পাশের বাড়ির পড়শী। শ্রমিকদের জন্য প্রকাশিত সভবোদা নামে পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় সংগঠন শীর্ষক প্রবন্ধটির লেখক তাঁর ইভানভো-ভজনেসেস্কের অর্থনীতিবাদী শ্রমিক বন্ধুদের স্বপক্ষে দাঁড়াতে চেষ্টা করেছেন। তিনি লিখেছেন ঃ “জনগণ যখন মূক, অচেতন, যখন আন্দোলন ওঠে না নিচ থেকে, সেটা খারাপ। যেমন ধরুন কোন বিশ্ববিদ্যালয় শহরের ছাত্ররা গ্রীষ্মের কিংবা অন্য কোন ছুটিতে বাড়ি গেল, আর অমনি শ্রমিক আন্দোলন থেমে গেল। যে শ্রমিক আন্দোলনকে বাইরে থেকে ঠেলে ঠেলে দিতে হয় সেটা কি কোন সত্যিকারের শক্তি হতে পারে? তা হয় না। …সেটা এখনও হাটতে শেখেনি, সেটা এখনও দড়ি ধরে হাটি হাটি পা পা অবস্থায়। সব ব্যাপারেই তাই। ছাত্ররা চলে গেল আর সব কিছু থেমে গেল। যারা সবচেয়ে যোগ্য তাদের ধরে ফেলা হয়Ñ ননী তোলা দুধ টকে যায়। কমিটি গ্রেফতার হলে নতুন কমিটি গড়তে পারা অবধি সব কিছু স্তব্ধ। পরে কি রকমের কমিটি স্থাপিত হবে তা জানবার জো নেই- সেটা হতে পারে একেবারেরই আগেরটার মতো নয়। প্রথমটা বলেছিল এক কথা, দ্বিতীয়টি বলতে পারে উলটো কথা। গতকাল আর আগামীকালের মধ্যেকার ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়ে যায়, অতীতের অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতের পথপ্রদর্শকের কাজ করতে পারে না। আর এই সব কিছুরই কারণ এই যে শিকড় গাড়ে নি গভীরে- জনগণের মধ্যে; শত মূককে নিয়ে নয়, কাজ চলে ডজনখানেক বিজ্ঞ ব্যক্তিকে দিয়ে। ডজনখানেক বিজ্ঞ ব্যক্তিকে এক তুড়িতে সাফ করে দেওয়া যায়, কিন্তু সংগঠন যখন হয় জনগণকে জুড়ে, সবকিছু আসে জনগণের মধ্যে থেকে, তখন যত চেষ্টা করুক কেউই আদর্শকে বানচাল করতে পারে না।” (পৃষ্ঠা ৬৩)।

বাস্তব অবস্থাগুলির বর্ণনা সঠিক। আমাদের আনাড়ীপনার চিত্র আঁকা হয়েছে ভালভাবেই। কিন্তু সিদ্ধান্তটা রাবচায়া মিসল-এরই পক্ষে উপযুক্ত- নির্বুদ্ধিতা আর রাজনৈতিক বোধহীনতা এই দুই দিক থেকেই। সিদ্ধান্তটা চূড়ান্ত নির্বুদ্ধিতার প্রকাশ, কেননা এই লেখক আন্দোলনের শিকড়ের গভীরতা সংক্রান্ত দার্শনিক আর সামাজিক ঐতিহাসিক প্রশ্নটাকে গুলিয়ে ফেলেছেন গোয়েন্দা পুলিশের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সেরা প্রণালী সংক্রান্ত টেকনিক্যাল আর সাংগঠনিক প্রশ্নের সঙ্গে। ওটা চূড়ান্ত রাজনৈতিক বোধহীনতা, তার কারণ খারাপ নেতাদের কাছ থেকে ভাল নেতাদের উদ্দেশ্যে আবেদন জানাবার বদলে লেখক আবেদন জানিয়েছেন সাধারণভাবে নেতাদের কাছ থেকে জনতার উদ্দেশ্যে। রাজনৈতিক আলোড়নের জায়গায় উত্তেজনাকর সন্ত্রাসবাদ স্থাপন করার ধারণা আমাদের রাজনীতিগতভাবে যতখানি পিছনে টেনে নেয়, এটা সেই পরিমাণেই আমাদের সংগঠনগতভাবে পিছনে টেনে নেবার চেষ্টা। বাস্তবিকপক্ষে, আমি পড়েছি একেবারে প্রাচুর্যের দরুন ফ্যাসাদ (embarras de richesses) এর অবস্থায়; সভবোদা যে জট পাকিয়েছে সেটাকে যে কোথা থেকে খুলতে শুরু করবো তা আমার বোঝা শক্ত। স্পষ্টতার জন্যে আমি একটা দৃষ্টান্ত দিয়ে শুরু করতে চাইছি। জার্মানদের কথা ধরুন। তাদেরটা গণ-সংগঠন, হাঁটতে শিখেছে, এটা কেউ মেনে নিতে নারাজ হবেন না আশা করি। তবু লক্ষ্য করুন, এই লক্ষ লক্ষ মানুষ তাদের ডজনখানেক পরীক্ষিত নেতাকে কত মূল্যবান মনে করেন, কী দৃঢ়ভাবে তারা আঁকড়ে আছে ঐ নেতাদের। পার্লামেন্টে বৈরভাবাপন্ন পার্টিগুলির সদস্যরা সমাজতন্ত্রীদের বিদ্রুপ করে প্রায়ই বলেছে ঃ তোমরা খাসা গণতন্ত্রী বটে! তোমাদেরটা শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলন শুধু নামেই, আসলে সর্বদাই চোখে পড়ে নেতাদের সেই একই ঘোট, সেই একই বেবেল, আর একই লিবকেখট- বছরের পর বছর আর তাই চলে আসছে দশকের পর দশক। নির্বাচিত বলে ধরে নেওয়া তোমাদের শ্রমিক প্রতিনিধিরা সম্রাটের উপযুক্ত আমলাদের চেয়ে স্থায়ী। কিন্তু নেতাদের বিরুদ্ধে জনতাকে লাগিয়ে দেবার, জনতার মধ্যে অসার দাম্ভিক আর কুপ্রবৃত্তি জাগিয়ে তোলার এবং ডজনখানেক বিজ্ঞ ব্যক্তির প্রতি জনগণের আস্থা নষ্ট করে আন্দোলনের মজবুতি আর সুস্থিতি কেড়ে নেবার এইসব বাগাড়ম্বর পূর্ণ অপচেষ্টাকে জার্মানরা শুধু হেসে উড়িয়ে দেয়। রাজনীতিক চিন্তন জার্মানদের মধ্যে যথেষ্ট বিকশিত; আর পেশাগতভাবে সুশিক্ষিত, দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় দীক্ষিত এবং ষোল আনা মিলজুল রেখে কর্মরত এই ডজনখানেক সুপরীক্ষিত এবং প্রতিভাবান নেতা (প্রতিভাবান মানুষ জন্মায় না শতে-শতে) ছাড়া আধুনিক সমাজে কোন শ্রেণী কৃতসঙ্কল্প সংগ্রাম চালাতে পারে না সেটা বুঝবার মতো যথেষ্ট রাজনীতিক অভিজ্ঞতা তাদের সঞ্চিত হয়েছে। জার্মানদের মধ্যেও থেকেছে বক্তৃতাবাগিশেরা, তারা শত মূকের স্তবকতা করেছেন তাদের তুলে ধরেছে ডজনখানেক বিজ্ঞ জনের ঊর্ধ্বে, গুণগান করেছে জনগণের কড়া পড়া হাতের, আর (মস্ট আর হাসেলমানের মতো) তাদের তাড়িত করেছে বেপরোয়া বৈপ্লবিক কর্মকান্ডে এবং দৃঢ় আর অবিচলিত নেতাদের বিরুদ্ধে অবিশ্বাসের বীজ ছড়িয়েছে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের ভিতরকার সমস্ত বক্তৃতাবাগীশদের বিরুদ্ধে দৃঢ় আর ক্ষমাহীন লড়াই চালিয়েই সমাজতন্ত্র বাড়তে পেরেছে, আর যেমনটা তেমনি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। অথচ স্বতঃস্ফূর্তভাবে জেগে-ওঠা জনগণকে পরিচালিত করাবার জন্য যথেষ্ট তালিম পাওয়া পরিপক্ক এবং অভিজ্ঞ নেতার অভাব আছে, সম্পূর্ণত এই কারণেই রাশিয়ায় সোশ্যাল ডেমোক্রাসি যখন চলেছে সঙ্কটের ভিতর দিয়ে তখন আমাদের পন্ডিতম্মন্না মূর্খরা নির্বোধের প্রগাঢ়তাসহকারে তারস্বরে বলছেঃ ‘আন্দোলনটা যখন নিচে থেকে ওঠে না সেটা খারাপ ব্যাপার’!

‘ছাত্রদের নিয়ে গড়া কমিটি কোন কাজের নয়, ওটা সুস্থিত নয়।’ খুব ঠিক কথা। কিন্তু এর থেকে যে সিদ্ধান্ত নিতে হবে সেটা এই যে, আমাদের চাই পেশাদার বিপ্লবীদের কমিটি, আর পেশাদার বিপ্লবী হতে সক্ষম কোন শ্রমিক কিংবা ছাত্র তাতে কিছু এসে যায় না। আপনারা কিন্তু সিদ্ধান্ত করছেন এই যে, শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলনকে বাইরে থেকে ঠেলে দেওয়া চলবে না কিছুতেই। রাজনীতিক হাবাগোবা ভাবের দরুন আপনার দেখতে পাচ্ছেন না যে, আপনারা আমাদের অর্থনীতিবাদীদের সুবিধে করে দিচ্ছেন, আর পরিপুষ্ট করে তুলছেন আমাদের আনাড়ীপনাকে। জিজ্ঞেস করতে পারি কিÑ আমাদের ছাত্ররা আমাদের শ্রমিকদের ঠেলে ঠেলে দিচ্ছে সেটা কিসে? সেটা এই অর্থে যে, ছাত্রদের নিজেদের রাজনৈতিক জ্ঞানের যে টুকরোটাকরা ছিল সমাতান্ত্রিক ভাব ধারণার ছিঁটেফোটা যা তারা আয়ত্ত করে উঠতে পেরেছে (কেননা আজকালকার ছাত্রদের মূখ্য মানসিক খোরাক বৈধ মার্কসবাদ তাদের দিতে পারে শুধু জ্ঞানের প্রাথমিক উপাদান, শুধু টুকরোটাকরা) সেটা তারা নিয়ে গেছে শ্রমিকদের কাছে। এমন বাইরে থেকে ঠেলা মারার আধিক্য কখনও হয়নি; বরং তার উল্টো- এযাবত আমাদের আন্দোলনে সেটা হয়েছে খুবই কম, লজ্জাকর ও জঘন্য পরিমাণে কম, কেননা আমরা নিজেদের রসে ভাপে সিদ্ধ হচ্ছি বড় বেশি অধ্যাবসায় সহকারে, মালিক আর সরকারের বিরুদ্ধে শ্রমিকদের প্রাথমিক অর্থনৈতিক সংগ্রামের প্রতি আমরা নতি স্বীকার করেছি বড় বেশি দাসের মতো। আমাদের পেশাদার বিপ্লবীদের এই রকমের ঠেলে দেবার কাজ করতে হবে আমরা এ যাবৎ যা করেছি তার চেয়ে শতগুণ বেশি জোরসে এবং তা আমরা করবো। কিন্তু আপনারা বেছে নিয়েছেন বাইরে থেকে ঠেলে দেবার মতো বিকট কথাটা,- যারা শ্রমিকদের কাছে বাইরে থেকে রাজনৈতিক জ্ঞান এবং বৈপ্লবিক অভিজ্ঞতা নিয়ে আসে তাদের সবার প্রতি শ্রমিকদের (অন্তত আপনাদের মতো সমান অনগ্রসর শ্রমিকদের) অবিশ্বাস বোধ জাগিয়ে না তুলে পারে না এই কথাটা এমন সমস্ত লোককে বাধা দেবার সাহজিক ইচ্ছা জাগিয়ে না তুলে পারে না এই কথাটা- এর থেকেই প্রমাণ হয় যে আপনারা বক্তৃতাবাগীশ, আর বক্তৃতাবাগীশেরা শ্রমিক শ্রেণির নিকৃষ্টতম শত্রু।

মিনতি করি, বিতর্কে আমার অ-কমরেডসুলভ প্রণালীর কথা তুলে তড়িঘড়ি হৈ-হল্লা জুড়ে দেবেন না যেন। আপনাদের অভিপ্রায়ের বিশুদ্ধতা নিয়ে সন্দেহ করার এতটুকু ইচ্ছাও আমার নেই। আমি যা আগেই বলেছি, তা রাজনীতিক হাবাগোবা ভাব থেকেও কেউ বক্তৃতাবাগীশ হয়ে দাঁড়াতে পারে। কিন্তু আমি দেখিয়েছি আপনারা নেমে গেছেন বক্তৃতাবাগীশের পর্যায়ে, আর বক্তৃতাবাগীশেরা যে শ্রমিক শ্রেণির নিকৃষ্টতম শত্রু একথা বার বার বলতে আমি কখনও কান্তিবোধ করবো না। নিকৃষ্টতম শত্রু, তার কারণ, তারা জনগণের মধ্যে হীন সহজ প্রবৃত্তি জাগিয়ে তোলে, যারা তাদের বন্ধু বলে পরিচয় দেয়, এবং কখনও কখনও সেটা আন্তরিকভাবেই তাদের মধ্যে কাউকে শত্রু বলে চিনতে অনগ্রর শ্রমিকরা অপারগ। নিকৃষ্টতম শত্রু তার কারণ অনৈক্য আর দোদুল্যমানতার কাল পর্যায়ে যখন আমাদের আন্দোলন সবে দানা বেঁধে উঠতে শুরু করেছে এমন সময়ে জনগণকে বিপথ চালিত করার জন্যে বক্তৃতাবাগীশির চেয়ে সহজ প্রণালী আর কিছুই নয়, এই জনগণ তাদের ভুল বুঝতে পারে শুধু পরে- তিক্ত অভিজ্ঞতার ভিতর দিয়ে। এই কারণেই রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রাটদের আজকের শ্লোগান হওয়া চাই- সভবোদ আর রাবোচিয়ে দিয়োলোর বিরুদ্ধে সুদৃঢ় সংগ্রাম, উভয়েই নেমে গেছে বক্তৃতাবাগীশির পর্যায়ে।

ডজনখানেক বিজ্ঞজনকে সাফ করে দেওয়া যায় শত মূঢ়ের চেয়ে সহজে। এই আশ্চর্য সত্যটাকে (যার জন্যে শত মুক আপনাদের প্রশংসা করবে সবসময়েই) স্বতঃপ্রতিপন্ন মনে হয় তার একমাত্র কারণ এই যে, যুক্তিটা একেবারে মধ্যেই আপনারা একটা থেকে লাফিয়ে অন্য প্রশ্নে চলে গেছেন, আপনারা শুরু করেছিলেন একটা কমিটি উৎখাত করার কথা দিয়ে, এবং সংগঠনের উৎখাত হবার কথা দিয়ে, আর তাই নিয়ে বলে চলছিলেন, তারপর আপনারা লাফিয়ে চলে গেলেন গভীরে আন্দোলনের শিকড় বের করা প্রশ্নে। প্রকৃত অবস্থা অবশ্য এই যে, আমাদের আন্দোলনের অসংখ্য হাজার শিকড় জনগণের মধ্যে গভীর অনুপ্রবিষ্ট রয়েছে বলেই তা উৎখাত হতে পারে না; কিন্তু আলোচ্য বিষয়টা তা নয়। গভীরে শিকড় নিয়ে বললে আমাদের যাবতীয় আনাড়ীপনা সত্ত্বেও আমরা এখনও উৎখাত হব না, অথচ আমরা সবাই অভিযোগ করি, এবং অভিযোগ না করে পারি নে যে সংগঠনগুলি উৎখাত হচ্ছে, তার ফলে আন্দোলনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা অসম্ভব। কিন্তু আপনারা যেহেতু সংগঠনগুলি উৎখাত হওয়ার প্রশ্ন তুলছেন এবং মতটা আঁকড়ে ধরেই থাকছেন, তাই আমি বলবো, শত মূঢ়কে উৎখাত করার চেয়ে ডজনখানেক বিজ্ঞজনকে উৎখাত করা ঢের বেশি কঠিন। আমার গণতন্ত্র বিরোধী অভিমত ইত্যাদির জন্যে আপনারা আমার বিরুদ্ধে জনগণকে যতই উত্তেজিত করুন না কেন, এই মতাবস্থান আমি বজায় রাখব। আমি বার বার যা বলেছি, সংগঠন প্রসঙ্গে বিজ্ঞজন বলতে আমি বুঝিয়েছি পেশাদার বিপ্লবীদের- তারা গড়ে উঠুক ছাত্রদের কিংবা মেহনতিদের মধ্য থেকে সেটা নির্বিশেষে। আমি দৃঢ়োক্তি করছি ঃ ১) যা ধারাবাহিকতা বজায় রাখে এমন নেতাদের সুস্থিত সংগঠন ছাড়া কোন বিপ্লবী আন্দোলন টিকে থাকতে পারে না; ২) যত ব্যাপক জনগণ স্বতঃস্ফূতভাবে সংগঠনের মধ্যে এসে পড়ে আন্দোলনের ভিত্তি রচনা করবে এবং তাতে অংশগ্রহণ করবে, এমন সংগঠনের প্রয়োজন হবে ততই জরুরি, আর এই সংগঠন হওয়া চাই ততই বেশি পোক্ত (কেননা জনগণের অপেক্ষাকৃত অনগ্রসর অংশগুলিকে ভিন্ন পথে চালিত করা হরেক রকমের বক্তৃতাবাগীশদের পক্ষে অনেক সহজ); ৩) এমন সংগঠন হবে প্রধানত এমন সব লোক নিয়ে পেশাগতভাবে বৈপ্লবিক ক্রিয়াকলাপে ব্যাপৃত; ৪) স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আমরা এমন সংগঠনের সদস্যপদ যত বেশি সীমাবদ্ধ রাখবো এমনসব লোকেদের মধ্যে যারা পেশাগতভাবে বৈপ্লবিক ক্রিয়াকলাপে ব্যাপৃত এবং যারা রাজনীতিক পুলিশের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের বিদ্যা আয়ত্ত করেছে পেশাগতভাবে, সংগঠনকে উৎখাত করা হবে ততই বেশি কঠিন; এবং ৫) শ্রমিক শ্রেণি এবং অন্যান্য সামাজিক শ্রেণি থেকে যারা আন্দোলনে যোগ দিয়ে তাতে সক্রিয়ভাবে কাজ করতে সক্ষম হবে তাদের সংখ্যা হবে ততই বেশি।

আমাদের অর্থনীতিবাদী, সন্ত্রাসবাদী এবং অর্থনীতিবাদী-সন্ত্রাসবাদীদের আমি আহ্বান জানাচ্ছি তাঁরা খন্ডন করুন তো এইসব উপস্থাপনা। এখন আমি শেষের দুটো কথা নিয়ে আলোচনা করছি। কোনটাকে সাফ করে দেওয়া অপেক্ষাকৃত সহজ- ডজনখানেক বিজ্ঞজনকে, না শত মূঢ়- এ প্রশ্নটা উপরে আলোচিত পর্যবসিত হয়: কঠোর গোপনীয়তা রক্ষা করা যখন অপরিহার্য সেক্ষেত্রে গণ সংগঠন থাকা সম্ভব কিনা। যে পরিমাণে গোপনীয়তা ছাড়া সরকারের বিরুদ্ধে অটল ও নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামের প্রশ্ন ওঠে না ততখানি গোপনীয়তা আমরা গণসংগঠনে রক্ষা করতে পারিনে। যথাসম্ভব স্বল্প সংখ্যক পেশাদার বিপ্লবীর হাতে সমস্ত গোপন কাজকর্ম কেন্দ্রীভূত করার অর্থ এই নয় যে, তাঁরা সবার হয়ে চিন্তা করবেন, আর জনতা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকায় আসবে না। বরং তার উল্টো, জনতা তার কাতার থেকে ক্রমাগত বেশি সংখ্যক পেশাদার বিপ্লবীদের তুলে ধরবে, কেননা জনতা তখন জানতে পারবে যে, আর্থনীতিক সংগ্রামে ব্যাপৃত মুষ্টিমেয় ছাত্র কিংবা মুষ্টিমেয় মেহনতি মানুষ কমিটি গড়ার জন্য জড় হওয়া যথেষ্ট নয়- পেশাদার বিপ্লবী হতে বছরের পর বছর তালিম নিতে হয়; কেবল আনাড়ী ধরনের প্রণালী সম্বন্ধে নয়- এমন তালিম সম্বন্ধে জনতা চিন্তা করবে। সংগঠনের গোপন কাজকর্মের কেন্দ্রীকরণ বলতে কোনক্রমেই আন্দোলনের সমস্ত কাজ কর্মের কেন্দ্রীকরণ বোঝায় না। বেআইনি সংবাদপত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গোপন কাজকর্ম ডজনখানেক পেশাদার বিপ্লবীর হাতে কেন্দ্রীভূত বলে ওই সংবাদপত্রে জনগণের বিস্তৃততম অংশের অংশগ্রহণ কমবে না, বরং সেটা বাড়বে দশ গুণ। এইভাবে এবং কেবল এইভাবেই আমরা এটা নিশ্চিত করবো যাতে বেআইনি সংবাদপত্র পড়া, তার জন্যে লেখা এবং কিছু পরিমাণে তা বিলি করাও প্রায় আর গোপন কাজ থাকবে না, কেননা যে কাগজ বিলি হচ্ছে হাজারে হাজারে তার প্রতিটি কপি নিয়ে বিচার সংক্রান্ত আর প্রশাসনিক লালফিতের কার্যধারা চালানো যে বোকামি এবং অসম্ভব সেটা পুলিশ বুঝতে পারবে অচিরে। সংবাদপত্রের ব্যাপারেই শুধু নয়, আন্দোলনের প্রত্যেকটা কাজকর্মে এমনকি বিক্ষোভ প্রদর্শনের ব্যাপারেও এটা প্রযোজ্য। তাতে জনগণের সক্রিয় এবং ব্যাপক অংশগ্রহণের ক্ষতি হবে না তার উল্টো, সেটার সুবিধেই হবে, কেননা পেশাগত তালিম পুলিশের চেয়ে কম যায় না এমন ডজনখানেক অভিজ্ঞ বিপ্লবীর হাতে কেন্দ্রীভূত থাকবে সমস্ত কাজের গোপন দিক-ইস্তেহার লেখা, মোটামুটি পরিকল্পনা রচনা; প্রত্যেকটা শহর মহল্লার জন্যে, প্রত্যেকটা কারখানা মহল্লার জন্যে এবং প্রত্যেকটা শিক্ষায়নের জন্য নেতৃসংস্থা নিয়োগ করা ইত্যাদি (আমি জানি আমার অগণতান্ত্রিক অভিমতে আপত্তি উঠবে, কিন্তু একেবারেই কা-জ্ঞান বর্জিত এই আপত্তির পুরো জবাব আমি নিচে দেব)। বিপ্লবীদের একটা সংগঠনে সবচেয়ে গোপনীয় কাজকর্ম কেন্দ্রীভূত হলে বহুসংখ্যক অন্যান্য সংগঠনের ক্রিয়াকলাপের পরিধি বাড়বে এবং গুণ উন্নততর হবে, সেগুলি কমবে না, সেইসব সংগঠন বিস্তৃত জনসাধারণের জন্যে, কাজেই যথাসম্ভব ঢিলাঢালা এবং যথাসম্ভব অগুপ্ত- যেমন, শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন; শ্রমিকদের আত্মশিক্ষাচক্র এবং বেআইনি সাহিত্যের পাঠচক্র; তাছাড়া, জনসমষ্টির অন্যান্য সমস্ত অংশের মধ্যে সমাজতান্ত্রিক এবং গণতান্ত্রিক চক্রও ইত্যাদি ইত্যাদি। এমনসব চক্র ট্রেড ইউনিয়ন এবং সংগঠন আমাদের সর্বত্র আবশ্যক যথাসম্ভব বেশি সংখ্যায়, সেগুলির কর্মবৈচিত্র্য হবে ব্যাপকতম; কিন্তু ব্যাপরটা হবে অযৌক্তিক অদ্ভুত এবং হানিকর যদি সেগুলিকে বিপ্লবীদের সংগঠনের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়; যদি এই দুইয়ের মধ্যেকার সীমারেখাটাকে মুছে দেওয়া হয়; গণআন্দোলনের সেবা করতে হলে আমাদের এমন সব লোক থাকা চাই যারা একমাত্র সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক ক্রিয়াকলাপেই ব্যাপৃত থাকবে এবং পেশাদার বিপ্লবী হওয়ার জন্য এমনসব লোককে ধৈর্যসহকারে এবং অবিচলিতভাবে তালিম দিতে হবে এটা যে খুবই ক্ষীণভাবে স্বীকৃত সেটাকে যদি আরও অস্পষ্ট করে ফেলা হয়।

হ্যাঁ, এই স্বীকৃতিটা অবিশ্বাস্য রকমের ক্ষীণ। সংগঠনের ব্যাপারে আমাদের নিকৃষ্টতম অপরাধ হলো এই যে, আমাদের আনাড়ীপনা দিয়ে আমরা রাশিয়ার বিপ্লবীদের মর্যাদা খর্ব করেছি। তত্ত্ব সংক্রান্ত প্রশ্নে যে তুলতুলে আর নড়বড়ে যার দৃষ্টিভঙ্গি সঙ্কীর্ণ, নিজ কুঁড়েমির কৈফিয়ত হিসেবে যে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ততার ওজর দেখায়, জনগণের মুখপাত্রের চেয়ে ট্রেড ইউনিয়ন সম্পাদকের সঙ্গে যার মিল বেশি, এমনকি বিরোধীরাও যার প্রতি সসম্ভ্রম হবে এমন বিস্তীর্ণ এবং বলিষ্ঠ পরিকল্পনার কথা যে ভাবতে পারে না, নিজ পেশাগত বিদ্যায়- রাজনৈতিক পুলিশের বিরুদ্ধে লড়ার বিদ্যায়- যে অনভিজ্ঞ এবং জোবড়া জোবড়া, এমন লোক বিপ্লবী নয়, সে হতভাগা আনাড়ী।

কোন সক্রিয় কর্মী এইসব অকপট মন্তব্যে যেন অসন্তুষ্ট হবেন না, কেননা তালিম যে যথেষ্ট নয়, সেটা প্রথমে এবং সর্বোপরি আমি প্রয়োগ করছি নিজের ওপর। আমি একটা পাঠচক্রে কাজ করতাম- সেটা খুবই বিস্তৃত এবং সর্বতোমুখী কাজ হাতে নিয়েছিল; আমরা সবাই, সেই চক্রের সদস্যরা এই উপলব্ধি থেকে যন্ত্রণা আর জ্বালা বোধ করেছিলাম যে, ইতিহাসের যে মুহূর্তে আমরা একটা সুবিদিত উক্তি একটু বদলে বলতে পারতাম; বিপ্লবীদের একটা সংগঠন আমাদের দাও, তাহলে রাশিয়াকে আমরা পাল্টে দেব। তখন আমরা কাজ করছিলাম আনাড়ীর মতো। তখন আমি যে নিদারুণ লজ্জা বোধ করেছিলাম সে কথা আমার যতই মনে পড়ে ততই বেশি আমি তিক্ততা বোধ করি সেইসব নকল সোশ্যাল ডেমোক্রাটদের প্রতি যাদের প্রচার বিপ্লবীর মর্যাদাকে কলঙ্কিত করেছে, যারা এটা বুঝতে অপারগ যে, বিপ্লবীকে আনাড়ীর পর্যায়ে অধঃপতিত করার ধ্বজাধারী হওয়া নয়, আমাদের কাজ হল আনাড়ীদের বিপ্লবীর পর্যায়ে উন্নীত করা।

 

সুত্রঃ 

13076745_715535491921699_3304914592563662269_n


ফ্রেডারিক এঙ্গেলস: মার্কস ও নিউ রাইনিশ গেজেট

engels

মার্কস ও নিউ রাইনিশ গেজেট

-ফ্রেডারিক এঙ্গেলস

আমরা যাকে জার্মান কমিউনিস্ট পার্টি বলতাম, ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের আরম্ভে তা ছিল শুধু একটি স্বল্পসংখ্যকের কোষকেন্দ্র, ছিল গোপন প্রচারমূলক সমিতি হিসাবে সংগঠিত কমিউনিস্ট লীগ। সেই সময়ে জার্মানিতে সংঘ ও সভা সমিতির কোন অধিকার ছিল না বলেই লীগকে গুপ্ত সংগঠন হতে হয়েছিল। বিদেশের বিভিন্ন শ্রমিক সংস্থা থেকে লীগ তার সদস্য সংগ্রহ করতো। এইসব সংস্থা ছাড়াও জার্মান দেশেই এর প্রায় ত্রিশটি সমিতি বা বিভাগ ছিল আর নানা জায়গায় বিচ্ছিন্নভাবে সদস্য ছিল। এই ক্ষুদ্র সংগ্রামী বাহিনীর ছিল একজন প্রথম শ্রেণির নেতা। তিনি মার্কস। সবাই স্বেচ্ছায় তার নেতৃত্ব মেনে নিত। আর তাঁরই দৌলতে লীগ নীতি ও রণকৌশলের এমন এক কর্মসূচি পেয়েছিল যার তাৎপর্য আজো পর্যন্ত পুরোপুরি বজায় আছে। সে কর্মসূচি কমিউনিস্ট ইশতেহার।

এখানে সর্বাগ্রে কর্মসূচির রণকৌশলের অংশটুকু নিয়েই আমাদের আগ্রহ। তার সাধারণ প্রতিপাদ্য হলো এই; শ্রমিক শ্রেণির অন্যান্য পার্টিগুলির প্রতিপক্ষ হিসাবে কমিউনিস্টরা স্বতন্ত্র পার্টি গঠন করে না। সমগ্রভাবে প্রলেতারিয়েতের স্বার্থ থেকে বিচ্ছিন্ন স্বতন্ত্র কোন স্বার্থ তাদের নেই। প্রলেতারীয় আন্দোলনকে রূপ দেওয়া বা গড়ে পিঠে তোলার জন্য তাঁরা নিজস্ব কোন গোষ্ঠীগত নীতি খাড়া করে না।

শ্রমিক শ্রেণির অন্যান্য পার্টি থেকে কমিউনিস্টদের তফাতটা শুধু এই : (১) নানা দেশের মজুরদের জাতীয় সংগ্রামের ভিতর দিয়ে তারা জাতি নির্বিশেষে সারা প্রলেতারিয়েতের সাধারণ স্বার্থটার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে, তাকেই সামনে টেনে আনে। (২) বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে শ্রমিক শ্রেণির যে বিভিন্ন পর্যায়ের মধ্যে দিয়ে আত্মপ্রকাশ করতে হয় তার মধ্যে তারা সর্বদা ও সর্বত্র সমগ্র আন্দোলনের স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করে।

সুতরাং কমিউনিস্টরা হলো একদিকে কার্যক্ষেত্রে প্রতি দেশের শ্রমিক শ্রেণির পার্টিগুলির সর্বাপেক্ষা অগ্রসর ও দৃঢ়চিত্ত অংশ- যে অংশ অন্যান্য সবাইকে সামনে ঠেলে নিয়ে যায়। অপরদিকে তত্ত্বের দিক থেকে শ্রমিক শ্রেণির অধিকাংশের তুলনায় তাদের এই সুবিধা যে শ্রমিক আন্দোলনের এগিয়ে যাওয়ার পথ, শর্ত এবং শেষ সাধারণ ফলাফল সম্বন্ধে তাদের স্বচ্ছ বোধ রয়েছে।

তাই জার্মান পার্টি সম্পর্কে বিশেষ করে বলা হয়েছিল : জার্মানিতে বুর্জোয়ারা যখন বিপ্লবী অভিযান করে তখনই কমিউনিস্টরা তাদের সঙ্গে একত্রে লড়ে নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্র, সামন্ত জমিদারতন্ত্র এবং পেটি বুর্জোয়ার বিরুদ্ধে।

কিন্তু বুর্জোয়া ও প্রলেতারিয়েতের যে বৈরী বিরোধ বর্তমান তার যথাসম্ভব স্পষ্ট স্বীকৃতিটা শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে সঞ্চার করার কাজ থেকে তারা মুহূর্তের জন্যও বিরত হয় না। এই জন্য যাতে বুর্জোয়া শ্রেণি নিজ আধিপত্যের সঙ্গে সঙ্গে যে সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থা নিয়ে আসতে বাধ্য, জার্মান মজুরেরা যেন তৎক্ষণাৎ তাকেই বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করতে পারে; সেইজন্যই যাতে, জার্মানিতে প্রতিক্রিয়াশীল শ্রেণিগুলির পতনের পর যেন বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধেই অবিলম্বে লড়াই শুরু হতে পারে।

কমিউনিস্টরা প্রধানত জার্মানির দিকে মন দিচ্ছে, কারণ সে দেশে একটি বুর্জোয়া বিপ্লব আসন্ন ইত্যাদি (ইশতেহার, চতুর্থ পরিচ্ছেদ)। এই রণকৌশলগত কর্মসূচি যে পরিমাণ ন্যায্য প্রতিপন্ন হয়েছে তা আর কোন কর্মসূচি হয়নি। বিপ্লবের প্রাক্কালে ঘোষিত হয়ে এটি সে বিপ্লবের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। তারপর থেকে যখনই শ্রমিকদের কোন পার্টি তাদের কাজ কর্মে এর থেকে বিচ্যুত হয়েছে তখনই প্রতিটি বিচ্যুতির শাস্তিও তারা পেয়েছে। আর আজ প্রায় ৪০ বছর পরেও মাদ্রিদ থেকে সেন্টপিটার্সবুর্গ পর্যন্ত ইউরোপের যে সব দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ও সচেতন শ্রমিক পার্টির পথের নিশানা হয়ে রয়েছে।

প্যারিসের ফেব্রুয়ারি মাসের ঘটনাবলীর ফলে জার্মানির আসন্ন বিপ্লব ত্বরান্বিত হলো আর তাতে করে সে বিপ্লবের চরিত্র গেল বদলে। নিজস্ব ক্ষমতাবলে জয়লাভ করার বদলে জার্মান বুর্জোয়া শ্রেণি জয়ী হল ফরাসি শ্রমিক বিপ্লবের টানে। পুরানো প্রতিদ্বন্দ্বীদের অর্থাৎ নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্র, সামন্ততান্ত্রিক ভূমি মালিকানা, আমলাতন্ত্র ও কাপুরুষ মধ্যবিত্ত শ্রেণির চূড়ান্ত ফয়সালা করতে পারার আগেই তাকে এক নতুন শত্রুর অর্থাৎ প্রলেতারিয়েতের সম্মুখীন হতে হলো। কিন্তু ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের তুলনায় জার্মানি অনেক পশ্চাৎপদ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আর তা থেকে উদ্ভুত তার সমান পশ্চাৎপদ শ্রেণি সম্পর্কের ফল সঙ্গে সঙ্গে দেখা গেল।

জার্মান বুর্জোয়া তখন সবেমাত্র তার বৃহদায়তন শিল্প প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করেছে। রাষ্ট্রে নিজের নিঃশর্ত আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করার শক্তি বা সাহস কোনটাই তার ছিল না, আর তা করার কোন চূড়ান্ত প্রয়োজনীয়তাও ছিল না। প্রলেতারিয়েতও সমান অপরিণত। তারা বেড়ে উঠেছিল পরিপূর্ণ মানসিক দাসত্বের মধ্যে। তারা ছিল অসংগঠিত; স্বতন্ত্র সংগঠন গড়ে তোলার মতো ক্ষমতা তখনও তাদের হয়নি। বুর্জোয়া স্বার্থের সঙ্গে তাদের স্বার্থের গভীর বিরোধ সম্পর্কে কেবল একটা ঝাপসা অনুভূতি তাদের ছিল। তাই মূলতঃ বুর্জোয়ার ভয়াবহ প্রতিপক্ষ হলেও তারা তখনও বুর্জোয়াদের রাজনৈতিক অনুসঙ্গ হিসাবেই রইল। জার্মান প্রলেতারিয়েত তখন যা ছিল তাই দেখে নয় বরং ভবিষ্যতে সে যা হয়ে উঠবে বলে ভয় ছিল এবং ফরাসি প্রলেতারিয়েত তখন যা হয়ে উঠেছে, তাই দেখে ভয় পেয়ে বুর্জোয়ারা মনে করলো যে, তার পরিত্রাণের একমাত্র পথ হলো রাজতন্ত্র ও অভিজাততন্ত্রের সঙ্গে কোন ধরনের একটা আপোস, তা সে আপোস যতই কাপুরুষোচিত হোক না কেন! প্রলেতারিয়েত তখন নিজে তার ঐতিহাসিক ভূমিকার কথা জানতো না বলে প্রথমে তাদের বেশিরভাগকে নিয়ে তারা বুর্জোয়াদের অতি অগ্রণী চরম বামপন্থী অংশের ভূমিকা পালন করতে বাধ্য হয়। জার্মান শ্রমিকদের সবচেয়ে বড় কাজ ছিল শ্রেণিগত পার্টি হিসাবে স্বতন্ত্র সংগঠন গড়ার জন্য তাদের যে সব অধিকার অপরিহার্য সেগুলি অর্থাৎ মুদ্রণ, সংগঠন আর সভা সমাবেশের স্বাধীনতা অর্জন করা। নিজের শাসন ক্ষমতার স্বার্থেই এইসব অধিকারের জন্য লড়াই করা বুর্জোয়ার উচিত ছিল; কিন্তু শ্রমিকদের ভয়ে এখন সে এদের এইসব অধিকারের বিরোধিতা করতে থাকলো। যে বিরাট জনসংখ্যাকে অকস্মাৎ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয়েছিল তাদের দু’একশত ছাড়া লীগ সদস্য হারিয়ে গেল। জার্মান প্রলেতারিয়েত এইভাবে রাজনৈতিক রঙ্গভূমিতে প্রথমে অবতীর্ণ হল চরম গণতান্ত্রিক পার্টি হিসাবে।

আমরা যখন জার্মানিতে এক বৃহৎ সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠা করলাম তখন নিশান কী হবে তা এই থেকেই স্থির হয়ে গেল। সে নিশান একমাত্র গণতন্ত্রের নিশান হওয়াই সম্ভব ছিল। কিন্তু সেটা এমন এক গণতন্ত্র যা সর্বত্র এবং সর্বক্ষেত্রে ফুটিয়ে তুলবে তার বিশিষ্ট প্রলেতারীয় চরিত্র সেটা কিন্তু তখনও তার পতাকায় চিরকালের মতো উৎকীর্ণ করে নেওয়া সম্ভব ছিল না। আমরা যদি তা না করতাম, আন্দোলনে যোগ দিতে, তার তখনই বর্তমান সবচেয়ে অগ্রণী, কার্যত প্রলেতারীয় দিকটার পক্ষ নিয়ে তা আরও এগিয়ে দিতে না চাইতাম তাহলে আমাদের পক্ষে ক্ষুদ্র প্রাদেশিক একপাতা কাগজে কমিউনিজম প্রচার করা আর বিরাট সক্রিয় এক পার্টির বদলে অতি ক্ষুদ্র এক সঙ্কীর্ণ সম্প্রদায় গড়া ছাড়া আর কিছু করার থাকতো না। কিন্তু বিজনে প্রচারকের ভূমিকা আমাদের জন্য নয়। ইউটোপীয়দের যে আমরা এত ভাল করে পড়েছিলাম, নিজেদের কর্মসূচি রচনা করলাম সেটা এই উদ্দেশ্যে নয়। আমরা যখন কলোনে এলাম তখন আংশিকভাবে গণতন্ত্রীদের, আর আংশিকভাবে কমিউনিস্টদের পক্ষ থেকে সেখানে বৃহৎ এক সংবাদপত্রের ব্যবস্থা চলছিল। এটিকে পুরোপুরিভাবে কলোনের সঙ্কীর্ণ স্থানীয় পত্রিকায় পরিণত করে আমাদের বার্লিনে পাঠাবার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু প্রধানত মার্কসেরই চেষ্টায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই আমরা প্রতিষ্ঠা অর্জন করে নেই আর সংবাদপত্রটি আমাদের হয়ে দাঁড়ায়। এই বদলে আমাদের হাইনরিখ ব্যুরগের্সকে সম্পাদকমন্ডলীতে নিতে হয়েছিল। তিনি একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন, তারপর আর কোন দিন লেখেননি।

বার্লিন নয়, বিশেষ করে কলোনই আমাদের প্রয়োজন ছিল। প্রথমত, কলোনই রাইন প্রদেশের কেন্দ্র। রাইন প্রদেশ ফরাসী বিপ্লবের মধ্য দিয়ে গেছে ‘কোড নেপোলিয়ন’ মারফৎ আধুনিক অধিকার জ্ঞান অর্জন করেছে, নিজস্ব বৃহদায়তন শিল্প গড়ে তুলেছে, আর সব দিক দিয়েই তা তখন জার্মানির সবচেয়ে অগ্রণী অংশ। নিজেদের পর্যবেক্ষণ থেকেই আমরা সমসাময়িক বার্লিনকে খুব ভাল করেই চিনতাম। তার বুর্জোয়া তখন সবেমাত্র জন্মগ্রহণ করেছে। তার তোষামুদে পেটি বুর্জোয়ার মুখে খুব দুঃসাহস, কিন্তু কাজে তারা কাপুরুষ, আর শ্রমিক শ্রেণি তখনো পর্যন্ত মোটেই বিকাশলাভ করেনি, অসংখ্য আমলাতন্ত্রী, অভিজাত ও দরবারি জঞ্জাল সেখানে। তার পুরো চরিত্রই হলো কেবল রেসিডেন্টের মতো। কিন্তু চূড়ান্ত কথা হলো: বার্লিনে তখন ঘৃণ্য প্রুশীয় ল্যান্ডর‌্যাখট বলবৎ রয়েছে আর পেশাদার বিচারকেরা রাজনৈতিক মামলার বিচার করছেন। রাইনে ‘কোড নেপোলিয়ন’ বলবৎ ছিল, তাতে মুদ্রণ সংক্রান্ত কোন মামলার প্রশ্নই ছিল না, কারণ আগে থেকেই এতে সেন্সর ব্যবস্থার কথা ধরে নেওয়া হয়েছিল। আর আইন না ভেঙে রাজনৈতিক অপরাধ করলে জুরির সামনে হাজির হতে হতো। বার্লিন বিপ্লবের পরে তরুণ শ্লোফেল বাজে কারণে এক বছরের জন্য দন্ডিত হন। কিন্তু রাইনে আমরা মুদ্রণের শর্তহীন স্বাধীনতা উপভোগ করতাম- আর সেই স্বাধীনতা শেষ বিন্দু পর্যন্ত কাজে লাগাতাম।

এইভাবে ১৮৪৮ সালের ১লা জুন আমরা খুব অল্প শেয়ার ক্যাপিটাল নিয়ে কাজ শুরু করলাম। তার খুব সামান্যই মিটিয়ে দেওয়া হয়েছিল, আর শেয়ার হোল্ডারররাও ছিল একান্তই অনির্ভরযোগ্য। প্রথম সংখ্যার পরই তাদের অর্ধেক আমাদের পরিত্যাগ করলো আর মাসের শেষে একজনও আর রইল না।

সম্পাদকমন্ডলীর গঠনতন্ত্র পরিণত হল মার্কসের একনায়কত্বে। বড় একটা দৈনিক পত্রিকা যাকে নির্দিষ্ট সময়ে প্রকাশিত হতে হবে, সেখানে অন্য কোন ধরনের সংগঠনে স্বীয় নীতির সুসংহত প্রচার সম্ভব নয়। তাছাড়া এ প্রশ্নে আমাদের কাছে মার্কসের একনায়কত্ব ছিল কেমন স্বতঃসিদ্ধ তর্কাতীত, আমরা সবাই সাগ্রহে তা মেনে নিয়েছিলাম। মূলত তার স্বচ্ছ দৃষ্টি আর দৃঢ় মনোভাবের জন্যই এই পত্রিকাটি বিপ্লবের বছরগুলিতে সবচেয়ে নামকরা জার্মান সংবাদপত্রে পরিণত হয়।

নিউ রাইনিশ গেজেট পত্রিকার রাজনৈতিক কর্মসূচিতে দুটি মূলকথা ছিল : একটি একক অখন্ড গণতান্ত্রিক জার্মান প্রজাতন্ত্র আর রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ, পোল্যান্ডের পুনঃপ্রতিষ্ঠাসহ।
সে সময়ে পেটি বুর্জোয়া গণতন্ত্র প্রধানত দুটি ভাগে বিভক্ত ছিল : উত্তর জার্মান- গণতান্ত্রিক এক প্রুশীয় সরকারকে মেনে নিতে আপত্তি ছিল না এদের; আর দক্ষিণ জার্মান, সে সময়ে ছিল পুরোপুরিভাবে এবং নির্দিষ্টভাবে বাদেনীয়- এরা সুইজারল্যান্ডের অনুকরণে জার্মানিকে একটি ফেডারেল প্রজাতন্ত্রে রূপান্তর করতে চাইতো। উভয়ের বিরুদ্ধেই আমাদের লড়াই করতে হলো। জার্মানির প্রুশীয়করণ আর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যে তার বিভাগ চিরস্থায়ী করা, দুটোই প্রলেতারিয়েতের স্বার্থের পক্ষে সমান ক্ষতিকর ছিল। এই স্বার্থরক্ষার জন্য জার্মানিকে একটি জাতি হিসাবে ঐক্যবদ্ধ করা একান্ত জরুরি হয়ে পড়েছিল। একমাত্র এর ফলেই চিরাচরিত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সমস্ত বাধা প্রতিবন্ধক থেকে মুক্ত এমন এক যুদ্ধ ক্ষেত্রের সৃষ্টি হতো যেখানে প্রলেতারিয়েত ও বুর্জোয়ার পরস্পরের শক্তি যাচাই করার কথা। কিন্তু প্রুশিয়ার নেতৃত্বে ঐক্যবন্ধন ছিল প্রলেতারিয়েতের স্বার্থের একান্ত বিরোধী। জার্মানির বিপ্লবের পক্ষে সত্যিকারের একমাত্র যে আভ্যন্তরীণ শত্রুকে উচ্ছেদ করা উচিত ছিল সে হলো সামস্ত ব্যবস্থাধারা, সামস্ত ঐতিহ্য ও রাজবংশসহ প্রুশীয় রাষ্ট্র, আর তাছাড়া জার্মানিকে বিভক্ত করে জার্মান অস্ট্রিয়াকে বাদ দিয়ে প্রাশিয়া জার্মানিকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারতো। প্রুশীয় রাষ্ট্র ধ্বংস ও অস্ট্রীয় রাষ্ট্র চূর্ণ করে প্রজাতন্ত্র হিসাবে জার্মানির সত্যকার ঐক্যসাধন, এছাড়া আমাদের আর কোন আশু বিপ্লবী কর্মসূচি থাকতে পারতো না। এবং রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধের মাধ্যমে একমাত্র সেই মাধ্যমেই এ কাজ করা যেত। আমি আবার পরে এ কথায় ফিরে আসবো।

সাধারণ আড়ম্বর গুরুগাম্ভীর্য বা উল্লাসের সুর ছিল না কাগজটিতে। আমাদের বিরোধীরা ছিল সম্পূর্ণরূপেই ঘৃণ্য আর বিনা ব্যতিক্রমে তাদের সকলের প্রতিই ছিল আমাদের চরম ঘৃণা। ষড়যন্ত্রকারী রাজতন্ত্র, দরবারী চক্র, অভিজাততন্ত্র, -সমগ্র সম্মিলিত প্রতিক্রিয়া যাদের সম্পর্কে কূপমন্ডুকেরা এমন নৈতিক বিরক্তি বোধ করে থাকেন, তাদের প্রতি শুধু ব্যঙ্গ ও উপহাস নিক্ষেপ করতাম শুধু আমরা। বিপ্লবের মাধ্যমে রঙ্গমঞ্চে যেসব নতুন পূজ্যজনদের আবির্ভাব ঘটেছিল, অর্থাৎ মার্চ মন্ত্রীবর্গ, ফ্রাঙ্কফুর্ত ও বার্লিন পরিষদ ও সেখানকার দক্ষিণপন্থী, বামপন্থী উভয় অংশ, তাদের সম্পর্কে আমাদের আচরণ ছিল একই। প্রথম সংখ্যার প্রথম প্রবন্ধেই ফ্রাঙ্কফুর্ত পার্লামেন্টের অকিঞ্চিতকরতাকে, তার দীর্ঘ বক্তৃতার অনাবশ্যকতাকে, তার ভীরু প্রস্তাবাবলীর উদ্দেশ্যহীনতাকে ব্যঙ্গ করা হয়েছিল। তার মূল্য হিসাবে আমাদের শেয়ার হোল্ডারদের অর্ধেককে হারাতে হয়। ফ্রাঙ্কফুর্ত পার্লামেন্টকে এমনকি একটা বিতর্ক ক্লাবও বলা যেত না, সেখানে প্রায় কোন বিতর্কই হতো না এবং এমন সব প্রস্তাব গৃহীত হতো যার উদ্দেশ্য ছিল জার্মান কূপমন্ডূকদের অনুপ্রেরণা দেওয়া, তবে কেউই সেদিকে দৃষ্টিপাত করতো না।

বার্লিন পরিষদের গুরুত্ব এর চেয়ে বেশি ছিল, তাদের বিরুদ্ধে ছিল সত্যিকারের এক শক্তি। শুধু হাওয়ায় ফ্রাঙ্কফুর্তের মেঘাতীত উচ্চতায় তারা বিতর্ক ও প্রস্তাব গ্রহণ করতো না। তাই এদের দিকে বেশি মন দেওয়া হতো। কিন্তু সেখানেও শুলৎসেদেলিচ, বেরেন্দস, এলস্নার স্তাইন প্রভৃতি বামপন্থীদের পূজ্যজনদের প্রতিও ফ্রাঙ্কফুর্তের পূজ্যজনদের মতোই তীব্র আক্রমণ চালানো হতো; তাদের দৃঢ়তার অভাব, ভীরুতা ও তুচ্ছ হিসেবিপনাকে নির্মমভাবে উদঘাটন করা হতো এবং তারা কিভাবে আপোস মারফত ধাপে ধাপে বিপ্লবের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেছে তা প্রমাণ করে দেওয়া হতো। এর ফলে স্বভাবতই গণতান্ত্রিক পেটি বুর্জোয়ারা ত্রাস বোধ করতো, এই পূজ্যজনদের তারা সবে সৃষ্টি করেছিল নিজ প্রয়োজনেই। তবে এই আতঙ্কে বোঝা গেল আমাদের বাণ ঠিক লক্ষ্যেই বিঁধেছে।

মার্চের দিনগুলির সঙ্গে সঙ্গেই নাকি বিপ্লব শেষ হয়ে গেছে, আর এখন শুধু তার ফল হস্তগত করা বাকি এই বলে পেটি বুর্জোয়া পরম উৎসাহের সঙ্গে যে বিভ্রান্তি প্রচার করেছিল আমরা তার বিরুদ্ধের সমান প্রতিবাদ জানাই। আমাদের কাছে ফেব্রুয়ারি এবং মার্চ সত্যকার বিপ্লবের তাৎপর্য লাভ করতো তখনই যদি সেটা একটি দীর্ঘ বিপ্লবী আন্দোলনের শেষ না হয়ে শুরু হতো, মহান ফরাসি বিপ্লবের মতো যার মধ্যে দিয়ে জনগণ তাদের নিজেদের সংগ্রামের ধারায় বিকশিত হয়ে উঠতো আর আমাদের পার্টিগুলি ক্রমশ আরও তীক্ষ্ণভাবে পৃথক হয়ে বড় বড় শ্রেণিগুলির সঙ্গে অর্থাৎ বুর্জোয়া শ্রেণি পেটি বুর্জোয়া শ্রেণি আর প্রলেতারীয় শ্রেণির সঙ্গে সম্পূর্ণরূপে মিশে যেত আর প্রলেতারিয়েত একাধিক লড়াইয়ের মধ্যে একটির পর একটি অবস্থান জিতে নিত। সুতরাং আমরা সবাইতো একই জিনিস চাই; সব পার্থক্যের একমাত্র কারণ হলো ভুল বোঝাবুঝি, এই বাঁধা বুলির সাহায্যে গণতান্ত্রিক পেটি বুর্জোয়া যখনই প্রলেতারিয়েতের সঙ্গে তার শ্রেণি বিরোধের কথা চাপা দিতে চাইতো তখনই আমরা সর্বত্র তার বিরুদ্ধে দাঁড়াতাম। কিন্তু পেটি বুর্জোয়াকে আমরা আমাদের প্রলেতারীয় গণতন্ত্র সম্পর্কে মিথ্যা ধারণা করার সুযোগ যতই কম দিতাম, আমাদের সম্পর্কে ততই তারা নিরীহ ও আপোসমুখী হয়ে উঠতো। যতই তীব্র ও দৃঢ়ভাবে তাদের বিরোধিতা করা যায় ততই তারা নম্র হয়ে ওঠে এবং শ্রমিকদের পার্টিকে ততই সুবিধাদান করতে থাকে। এ সম্বন্ধে আমরা নিশ্চিত হয়ে উঠেছি।

শেষতক আমরা বিভিন্ন তথাকথিত জাতীয় পরিষদের পার্লামেন্টারি ক্রেটিনিজম উদঘাটন করে দিতাম। এই ভদ্রমহোদয়রা ক্ষমতার সব মাধ্যমই হাতছাড়া হয়ে যেতে দিয়েছিলাম- অংশত স্বেচ্ছায়- সেগুলিকে সরকারের হাতে ফিরিয়ে দিয়ে। বার্লিন ও ফ্রাঙ্কফুর্তে নতুন শক্তিপ্রাপ্ত প্রতিক্রিয়াশীল সরকারের পাশাপাশি ছিল শক্তিহীন পরিষদগুলি। তারা কল্পনা করতো যে তাদের অক্ষম প্রস্তাবাবলী পৃথিবী উল্টিয়ে দেবে। চরম বামপন্থী পর্যন্ত সকলেই ছিল এই নির্বোধ আত্ম প্রতারণার শিকার। আমরা তাদের বার বার বলতাম তাদের পার্লমেন্টীয় জয়ই হবে কার্যত তাদের যুগপৎ পরাজয়।

আর বার্লিন ও ফ্রাঙ্কফুর্ত দু’জায়গাতেই ঠিক তাই ঘটল। বামপন্থীরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করার সঙ্গে সঙ্গেই সরকার পরিষদকে ভেঙ্গে দিল। সরকার যে এ কাজ করতে পারলো তার কারণ হলো পরিষদ জনগণের আস্থা হারিয়েছিল।

পরে আমি মারাত সম্পর্কে বুজারের বই পড়ে দেখতে পাই যে, একাধিক ব্যাপারে আমরা না জেনে সত্যিকারের জনগণের বন্ধুর (রাজতন্ত্রীদের নকল জনগণের বন্ধু নয়) মহান আদর্শ অনুকরণ করেছিলাম এবং যে ক্রুদ্ধ গর্জন ও ইতিহাস বিকৃতির ফলে প্রায় এক শতাব্দী ধরে সবাই সম্পূর্ণ বিকৃত এক মারাতের পরিচয় পেয়ে এসেছিল। তার একমাত্র কারণ হলো, মারাত নির্মমভাবে সেই মুহূর্তের পূজ্যজনদের অর্থাৎ লাফায়েৎ, বায়ির ও অন্যান্যদের মুখোশ টেনে খুলে দিয়েছিলেন এবং দেখিয়ে দিয়েছিলেন যে, ইতিমধ্যেই তারা বিপ্লবের প্রতি সম্পূর্ণ বিশ্বাসঘাতক হয়ে উঠেছে। তাছাড়া আমাদের মতো তিনিও এ ঘোষণা চাননি যে, বিপ্লব শেষ হয়েছে, বরং তিনিও চেয়েছিলেন বিপ্লব অবিরাম চলুক।

আমরা খোলাখুলি ঘোষণা করলাম যে আমরা যে ধারার প্রতিনিধি সে ধারা আমাদের পার্টির আশু লক্ষ্য অর্জনের জন্য সংগ্রাম শুরু করতে পারবে একমাত্র তখনই যখন জার্মান সমস্ত সরকারি পার্টিগুলির মধ্যে সবচেয়ে চরমপন্থী পার্টিটি ক্ষমতায় আসবে। তখন আমরা হয়ে উঠবো তার বিরোধী দল। কিন্তু ঘটনাক্রমে দাঁড়ালো এই যে, আমাদের জার্মান বিরোধীদের ব্যঙ্গ করা ছাড়াও জ্বালাময়ী আবেগও ঝঙ্কৃত হয়ে উঠলো। ১৮৪৮ সালের জুন মাসে প্যারিসের শ্রমিকদের বিদ্রোহ যখন শুরু হয় ততক্ষণে আমরা ঘাঁটি নিয়ে বসেছি। প্রথম গুলিবর্ষণ থেকেই আমরা দৃঢ়ভাবে বিদ্রোহের পক্ষ নিলাম। তাদের পরাজয়ের পর মার্কস একটি অত্যন্ত জোরালো প্রবন্ধে পরাজিতদের স্মৃতিতে অঞ্জলি দেন।

আমাদের অবশিষ্ট শেয়ার হোল্ডাররাও তখন আমাদের পরিত্যাগ করলো। কিন্তু আমাদের সেই সন্তোষ রইল যে জার্মানিতে এবং প্রায় সমগ্র ইউরোপে একমাত্র আমাদেরই কাগজ বিধ্বস্ত প্রলেতারিয়েতের পতাকা ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছিল এমন এক মুহূর্তে যখন সব দেশের বুর্জোয়া ও পেটি বুর্জোয়া পরাজিতদের উদ্দেশ্যে কদর্য গালি বর্ষণ করেছে।

আমাদের বৈদেশিক নীতি ছিল সরল; প্রতিটি বিপ্লবী জাতির পক্ষ সমর্থন এবং ইউরোপীয় প্রতিক্রিয়ার শক্তিশালী দুর্গ রাশিয়ার বিরুদ্ধে বিপ্লবী ইউরোপের এক সাধারণ যুদ্ধের জন্য আহ্বান। ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে আমাদের কাছে এ কথাটা পরিষ্কার হয়ে গেল যে, বিপ্লবের সত্যিকার ভয়ঙ্কর শত্রু মাত্র একটি- রাশিয়া এবং আন্দোলন যতই সারা ইউরোপে ছড়িয়ে পড়বে সংগ্রামে নামার প্রয়োজনীয়তাও এ শত্রুর পক্ষে অদম্য হয়ে উঠবে। ভিয়েনা মিলান ও বার্লিনের ঘটনাবলীর ফলে রুশ আক্রমণ অবশ্য বিলম্বিত হবার কথা, কিন্তু বিপ্লব রাশিয়ার কাছে যত এগিয়ে আসছে সেই আক্রমণের অপরিহার্যতা ততই সুনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। কিন্তু যদি জার্মানিকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামানো যেত তাহলে হ্যাপসবুর্গ এবং হয়েনৎসলার্নের শেষ হতো এবং বিপ্লব সর্বত্র জয়ী হতো।

রুশরা যখন সত্যি সত্যি হাঙ্গেরি আক্রমণ করলো সেই মুহূর্ত পর্যন্ত সংবাদপত্রের প্রতিটি সংখ্যায় এই নীতি বিধৃত ছিল। এই আক্রমণ আমাদের ভবিষ্যদ্বাণী পুরোপুরি প্রমাণ করলো এবং সুনিশ্চিত করলো বিপ্লবের পরাজয়।

১৮৪৯ সালের বসন্তকালে যখন চূড়ান্ত সংগ্রামের দিন ঘনিয়ে আসছে তখন সংখ্যায় সংখ্যায় সংবাদপত্রটির সুর খুব তীব্র এবং আবেগ দীপ্ত হয়ে উঠতে থাকলো। সিলেজীয় মিলিয়ার্ডে ভিলহেলম ভলফ সিলেজীয় কৃষকদের মনে করিয়ে দিলেন যে, তারা যখন সামন্ততান্ত্রিক অধীনতা থেকে মুক্তি পায় তখন সরকারের সাহায্যে জমিদাররা কিভাবে তাদের টাকা এবং জমির ব্যাপারে ঠকিয়েছিল এবং তিনি দাবি করলেন যে ক্ষতিপূরণ হিসাবে শতকোটি টেলার দিতে হবে।

এই সময়ে মার্কসের মজুরি শ্রম ও পুঁজি কয়েকটি সম্পাদকীয় নিবন্ধের আকারে প্রকাশিত হয়ে আমাদের নীতির সামাজিক লক্ষ্য স্পষ্টভাবে নির্ধারিত করে দিল। যে বিরাট সংগ্রামের প্রস্তুতি চলছিল ফ্রান্স, ইতালি, জার্মানি ও হাঙ্গেরীতে যে বিরোধ তীব্রতর হয়ে উঠেছিল প্রতি সংখ্যায় এবং প্রতি বিশেষ সংখ্যায় তার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলো। বিশেষ করে এপ্রিল ও মে মাসের বিশেষ সংখ্যাগুলিতে ছিল জনগণের উদ্দেশ্যে সংগ্রামে প্রস্তুত থাকার আহ্বান।
আমরা যে দুর্গসৈন্য ও কারাগার সম্বলিত প্রথম শ্রেণীর এক প্রুশীয় দুর্গের মধ্যে এমন নির্ভয়ে আমাদের কাজ চালিয়ে যেতাম তাতে জার্মানির সর্বত্র বিস্ময় প্রকাশ করা হতো। কিন্তু সম্পাদকদের ঘরে ৮টি বন্দুক ২৫০টি কার্তুজ এবং কম্পোজিটরদের লাল জ্যাকোবিন টুপির দরুন আমাদের বাড়িও অফিসারদের কাছে এমন এক দুর্গ বলে প্রতীয়মান হত যা নেহাৎ হানা দিয়ে আধিকার করা সম্ভব নয়। অবশেষে এলো ১৮৪৯ সালের ১৮ মে তারিখের আঘাত।

দ্রেজদেন ও এলবারফিল্ডে বিদ্রোহ দমিত হলো, ইসারলোহন বেষ্টিত হলো, রাইন প্রদেশ ও ভেস্তফালিয়া সৈন্য প্লাবিত হয়ে উঠলো। প্রুশীয় রাইনল্যান্ড ধর্ষণের পর তাদের পালাটিনেট ও বাদেনের বিরুদ্ধে পাঠানোর কথা। অবশেষে তখন সরকার আমাদের দিকে এগোবার সাহস পেল। সম্পাদকমন্ডলীর অনেককে অভিযুক্ত করা হলো। অন্যদের অপ্রুশীয় বলে নির্বাসন দেওয়া হলো। এর বিরুদ্ধে কিছুই করার ছিল না, কেননা সরকারের পিছনে রয়েছে পুরো একটা সৈন্যবাহিনী। আমাদের দুর্গ সমর্পণ করতে হলো। কিন্তু আমরা পিছু হটে এলাম আমাদের রসদ ও অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ব্যন্ড বাজিয়ে, শেষ লাল সংখ্যার পতাকা উড়িয়ে; তাতে আমরা নিষ্ফল অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে কলোনের শ্রমিকদের সাবধান করে দিয়ে বলেছিলাম : ‘আপনারা যে সহানুভূতি দেখিয়েছেন তার জন্য নিউ রাইনিশ গেজেটের সম্পাদকরা বিদায়কালে আপনাদের ধন্যবাদ জানাচ্ছে। চিরকাল এবং সর্বত্র তাদের শেষ কথা হবে : শ্রমিক শ্রেণির মুক্তি।’

এইভাবে অস্তিত্বের এক বছর পূর্ণ হওয়ার আগে নিউ রাইনিশ গেজেট পত্রিকার অবসান হলো। প্রায় কোন আর্থিক সম্বল ছাড়া এটি শুরু হয়েছিল- আমি আগেই বলেছি যে সামান্য যেটুকু প্রতিশ্রুতি পাওয়া গিয়েছিল তা-ও আসেনি- কিন্তু সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যেই তার প্রচার প্রায় পাঁচ হাজারে গিয়ে পৌঁছেছিল। কলোনের অবরুদ্ধ অবস্থার ফলে এটি বন্ধ হয়ে যায়। অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি আবার তাকে গোড়া থেকে শুরু করতে হয়। কিন্তু ১৮৪৯ সালের মে মাসে যখন কাগজটি বন্ধ করে দেওয়া হলো তখন তার গ্রাহক সংখ্যা আবার ছয় হাজারে গিয়ে পৌঁছেছিল। কলোনিশ গেজেট পত্রিকার নিজের স্বীকারোক্তি অনুসারে গ্রাহক সংখ্যা নয় হাজারের বেশি ছিল না। নিউ রাইনিশ গেজেটের মতো ক্ষমতা ও প্রভাব তথা প্রলেতারীয় জনগণকে প্রদীপ্ত করে তোলার সামর্থ্য পরে বা আগে কোন জার্মান সংবাদপত্রের হয়নি। এবং এর জন্য সে ঋণী সর্বাগ্রে মার্কসের কাছে।

যখন আঘাত এলো সম্পাদকীয় বিভাগে সবাই ছড়িয়ে পড়লেন। মার্কস প্যারিসে গেলেন- সেখানে নাটকের যে শেষ অঙ্কের প্রস্তুতি চলছিল তা অনুষ্ঠিত হলো ১৮৪৯ সালের ১৩ জুন তারিখে এখন যখন ওপর থেকে ভেঙ্গে যাওয়া বা বিপ্লবে যোগ দেওয়া এই দুটোর মধ্যে একটাকে বেছে নেওয়ার সময় হল ফ্রাঙ্কফুর্ত পরিষদের তখন ভিলহেলম ভলফ পরিষদে তার আসন গ্রহণ করলেন, আর আমি পালাটিনেটে গিয়ে ভিলিখের স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীতে অ্যাডজুট্যান্ট হলাম।
(সমাপ্ত)

 

সুত্রঃ 
13076745_715535491921699_3304914592563662269_n


নয়া গণতান্ত্রিক গণমোর্চা ও তার সদস্য সংগঠনগুলোর নেতৃত্বে সারাদেশব্যাপী মে দিবস পালিত

13140964_483002311882920_546250739_n

নয়া গণতান্ত্রিক গণমোর্চা

জাতীয় কমিটি

প্রেস বিজ্ঞপ্তি

 

নয়া গণতান্ত্রিক গণমোর্চা ও তার সদস্য সংগঠনগুলোর নেতৃত্বে সারাদেশব্যাপী মে দিবস পালিত

রাজশাহীঃ রাজশাহীর সাধুর মোড় থেকে পথসভা শেষে নয়া গণতান্ত্রিক গণমোর্চার ব্যানারে র‍্যালি শুরু হয়। র‍্যালিটি সাহেব বাজারের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে জিরো পয়েন্টে এসে সমাবেশে মিলিত হয়।  সমাবেশে কমরেড খোকন এর সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন, নয়া গণতান্ত্রিক গণমোর্চার রাজশাহী জেলা শাখার সভাপতি শামিম পারভেজ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক গোলাম সারোয়ার, কৃষক মুক্তি সংগ্রাম এর নেতা এমদাদ আলী মাষ্টার।  সমাবশে বক্তারা মে দিবসের ইতিহাস তুলে ধরেন ও বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর চরিত্র যে ঐ হে মার্কেটের শ্রমিকদের উপর গুলি চালানো শাসকগোষ্ঠীরর থেকে ভিন্ন নয় তা তুলে ধরেন।  তারা দেশের এই ফ্যাসিবাদী দূরাবস্থা থেকে উত্তরণ এর পথ হিসেবে নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের বিপ্লবী পথকে নির্দেশ করেন।  

সিরাজগঞ্জঃ সকাল নয়টায় সিরাজগঞ্জ শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে একটি র‍্যালি হয়।  র‍্যালি শেষে স্থানীয় একটি বাজারে পথসভা অনুষ্ঠিত হয়।  বিকেল চারটায় স্থানীয় বাহিরগোলা গুরের বাজারে মে দিবস উদযাপন কমিটির ব্যানারে আলোচনা সভা ও সফদার হাশ্মীর বিখ্যাত নাটক হত্যারে মঞ্চস্থ করা হয় বর্তমান প্রেক্ষাপটকে তুলে ধরে।  আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন নয়া গণতান্ত্রিক গণমোর্চার সিরাজগঞ্জ জেলা কমিটির আহবায়ক আবু বক্কর সিদ্দিক এবং সভা পরিচালনা করেন গণমোর্চার নেতা কমরেড আব্দুল আলিম।  সভায় আলোচনা করেন বিপ্লবী ছাত্র-যুব আন্দোলন এর জাতীয় কমিটির সহ-আহবাহক আহনাফ আতিফ অনিক, বিপ্লবী ছাত্র-যুব আন্দোলনের জাতীয় কমিটির সহ-আহবায়ক জাকি সুমন, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের নেতা কমরেড বরকত উল্লাহ ও জাতীয় গণফ্রন্টের নেতা কমরেড হালিম।বক্তারা শ্রমিক-কৃষকের সার্বিক মুক্তির লক্ষ্যে এই মালিক শ্রেনীর সরকার ও রাষ্ট্রকে উচ্ছেদ করে জনগনের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে বেগবান করার আহবান জানান।  আলোচনা সভা শেষে স্থানীয় ছেলেমেয়েরা সুকান্তের বিপ্লবী কবিতা আবৃত্তি করে ও এরপরেই হত্যারে নাটক মঞ্চস্থ করা হয়।  

ফুলবাড়ি(দিনাজপুরঃ ফুলবাড়ি থানা কৃষক মুক্তি সংগ্রাম এর নেতৃত্বে স্থানীয় খয়েরবাড়ী হাট ও মাদিলা হাটে পথসভা অনুষ্ঠিত হয়।  সভায় বক্তব্য রাখেন কৃষক মুক্তি সংগ্রাম এর নেতা আমিনুল হক, মোসলেম উদ্দিন ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দ।  ময়মনসিংহঃবিপ্লবী শ্রমিক আন্দোলন এর নেতৃত্বে শহরের কাঠগোলা বাজারে আলোচনা সভা করা হয় এবং শহরের বিভিন্ন স্থানে পথসভা করা হয়।  

ঢাকাঃ মহান মে দিবস উপলক্ষে সকাল ৯ টা ৩০ মিনিটে ওসমানী উদ্যানে জমায়েত হয়ে বিপ্লবী শ্রমিক আন্দোলন, বিপ্লবী ছাত্র – যুব আন্দোলন এবং নয়াগণতান্ত্রিক গণমোর্চা’র ব্যানারে বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়।মিছিলটি গোলাপ শাহের মাজার, জিপিও, পল্টন মোড় হয়ে প্রেস ক্লাবের সামনে এসে শেষ হয়।  মিছিল শেষে বিপ্লবী শ্রমিক আন্দোলন এর ব্যানারে প্রতিবাদী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন বিপ্লবী শ্রমিক আন্দোলনের প্রাক্তন নেতা ও নয়াগণতান্ত্রিক গণমোর্চার বর্তমান সভাপতি জাফর হোসেন।  সমাবেশ পরিচালনা করেন বিপ্লবী ছাত্র – যুব আন্দোলনের আহবায়ক বিপ্লব ভট্টাচার্য্য।  সমাবেশে বক্তব্য রাখেন শহীদ বিপ্লবী ও দেশপ্রেমিক স্মৃতিসংদের সভাপতি হাসান ফকরী, কমরেড ফয়সাল, তৌহিদুল ইসলাম, নজরুল ইসলাম, কমরেড জয়, নাসীমা নাজনীন, আব্দুর রাজ্জাক, জাকি সুমন প্রমুখ।  সমাবেশে বক্তারা বলেন মে দিবস কোন উৎসব উদযাপনের দিন নয়, প্রতিবাদী দিবস। রক্ত দিয়ে পাওয়া এই দিবসের সত্যিকারের দাবি এখনও বাস্তবায়িত হয়নি।  বক্তারা আর ও বলেন যে,মালিক শ্রমিক কখনো ঐক্য হতে পারেনা।  উনারা সরকারি এই ভুয়া প্রচারণার তীব্র নিন্দা জানান।  বক্তারা জোর দিয়ে বলেন, শ্রমিকদের অধিকার বল প্রয়োগের মাধ্যমেই আদায় করতে হবে।  এই ব্যবস্থা উচ্ছেদ করে সমাজতন্ত্র – কমিউনিজম প্রতিষ্ঠা করতে হবে।  তবেই কেবল সত্যিকারের মুক্তি সম্ভব।  শ্রমিক, কৃষক, মধ্যবিত্ত জনগণকে একতাবদ্ধ হয়ে সমাজ পরিবর্তনের বিপ্লবী রাজনীতিতে সজ্জিত হওয়ার আহবান জানিয়ে সমাবেশের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।

বার্তা প্রেরক
বিপ্লব ভট্টাচার্য
13162109_482996725216812_696448777_n
13162510_482996835216801_647845729_n
13150085_483002395216245_1741292571_n
13140628_482997481883403_947833003_n
13162511_482997171883434_216357717_n
13152837_483002791882872_1343783885_n
13115859_483000981883053_77834097_n
13152811_483000481883103_639033279_n