ফ্রেডারিক এঙ্গেলস: মার্কস ও নিউ রাইনিশ গেজেট

engels

মার্কস ও নিউ রাইনিশ গেজেট

-ফ্রেডারিক এঙ্গেলস

আমরা যাকে জার্মান কমিউনিস্ট পার্টি বলতাম, ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের আরম্ভে তা ছিল শুধু একটি স্বল্পসংখ্যকের কোষকেন্দ্র, ছিল গোপন প্রচারমূলক সমিতি হিসাবে সংগঠিত কমিউনিস্ট লীগ। সেই সময়ে জার্মানিতে সংঘ ও সভা সমিতির কোন অধিকার ছিল না বলেই লীগকে গুপ্ত সংগঠন হতে হয়েছিল। বিদেশের বিভিন্ন শ্রমিক সংস্থা থেকে লীগ তার সদস্য সংগ্রহ করতো। এইসব সংস্থা ছাড়াও জার্মান দেশেই এর প্রায় ত্রিশটি সমিতি বা বিভাগ ছিল আর নানা জায়গায় বিচ্ছিন্নভাবে সদস্য ছিল। এই ক্ষুদ্র সংগ্রামী বাহিনীর ছিল একজন প্রথম শ্রেণির নেতা। তিনি মার্কস। সবাই স্বেচ্ছায় তার নেতৃত্ব মেনে নিত। আর তাঁরই দৌলতে লীগ নীতি ও রণকৌশলের এমন এক কর্মসূচি পেয়েছিল যার তাৎপর্য আজো পর্যন্ত পুরোপুরি বজায় আছে। সে কর্মসূচি কমিউনিস্ট ইশতেহার।

এখানে সর্বাগ্রে কর্মসূচির রণকৌশলের অংশটুকু নিয়েই আমাদের আগ্রহ। তার সাধারণ প্রতিপাদ্য হলো এই; শ্রমিক শ্রেণির অন্যান্য পার্টিগুলির প্রতিপক্ষ হিসাবে কমিউনিস্টরা স্বতন্ত্র পার্টি গঠন করে না। সমগ্রভাবে প্রলেতারিয়েতের স্বার্থ থেকে বিচ্ছিন্ন স্বতন্ত্র কোন স্বার্থ তাদের নেই। প্রলেতারীয় আন্দোলনকে রূপ দেওয়া বা গড়ে পিঠে তোলার জন্য তাঁরা নিজস্ব কোন গোষ্ঠীগত নীতি খাড়া করে না।

শ্রমিক শ্রেণির অন্যান্য পার্টি থেকে কমিউনিস্টদের তফাতটা শুধু এই : (১) নানা দেশের মজুরদের জাতীয় সংগ্রামের ভিতর দিয়ে তারা জাতি নির্বিশেষে সারা প্রলেতারিয়েতের সাধারণ স্বার্থটার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে, তাকেই সামনে টেনে আনে। (২) বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে শ্রমিক শ্রেণির যে বিভিন্ন পর্যায়ের মধ্যে দিয়ে আত্মপ্রকাশ করতে হয় তার মধ্যে তারা সর্বদা ও সর্বত্র সমগ্র আন্দোলনের স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করে।

সুতরাং কমিউনিস্টরা হলো একদিকে কার্যক্ষেত্রে প্রতি দেশের শ্রমিক শ্রেণির পার্টিগুলির সর্বাপেক্ষা অগ্রসর ও দৃঢ়চিত্ত অংশ- যে অংশ অন্যান্য সবাইকে সামনে ঠেলে নিয়ে যায়। অপরদিকে তত্ত্বের দিক থেকে শ্রমিক শ্রেণির অধিকাংশের তুলনায় তাদের এই সুবিধা যে শ্রমিক আন্দোলনের এগিয়ে যাওয়ার পথ, শর্ত এবং শেষ সাধারণ ফলাফল সম্বন্ধে তাদের স্বচ্ছ বোধ রয়েছে।

তাই জার্মান পার্টি সম্পর্কে বিশেষ করে বলা হয়েছিল : জার্মানিতে বুর্জোয়ারা যখন বিপ্লবী অভিযান করে তখনই কমিউনিস্টরা তাদের সঙ্গে একত্রে লড়ে নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্র, সামন্ত জমিদারতন্ত্র এবং পেটি বুর্জোয়ার বিরুদ্ধে।

কিন্তু বুর্জোয়া ও প্রলেতারিয়েতের যে বৈরী বিরোধ বর্তমান তার যথাসম্ভব স্পষ্ট স্বীকৃতিটা শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে সঞ্চার করার কাজ থেকে তারা মুহূর্তের জন্যও বিরত হয় না। এই জন্য যাতে বুর্জোয়া শ্রেণি নিজ আধিপত্যের সঙ্গে সঙ্গে যে সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থা নিয়ে আসতে বাধ্য, জার্মান মজুরেরা যেন তৎক্ষণাৎ তাকেই বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করতে পারে; সেইজন্যই যাতে, জার্মানিতে প্রতিক্রিয়াশীল শ্রেণিগুলির পতনের পর যেন বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধেই অবিলম্বে লড়াই শুরু হতে পারে।

কমিউনিস্টরা প্রধানত জার্মানির দিকে মন দিচ্ছে, কারণ সে দেশে একটি বুর্জোয়া বিপ্লব আসন্ন ইত্যাদি (ইশতেহার, চতুর্থ পরিচ্ছেদ)। এই রণকৌশলগত কর্মসূচি যে পরিমাণ ন্যায্য প্রতিপন্ন হয়েছে তা আর কোন কর্মসূচি হয়নি। বিপ্লবের প্রাক্কালে ঘোষিত হয়ে এটি সে বিপ্লবের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। তারপর থেকে যখনই শ্রমিকদের কোন পার্টি তাদের কাজ কর্মে এর থেকে বিচ্যুত হয়েছে তখনই প্রতিটি বিচ্যুতির শাস্তিও তারা পেয়েছে। আর আজ প্রায় ৪০ বছর পরেও মাদ্রিদ থেকে সেন্টপিটার্সবুর্গ পর্যন্ত ইউরোপের যে সব দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ও সচেতন শ্রমিক পার্টির পথের নিশানা হয়ে রয়েছে।

প্যারিসের ফেব্রুয়ারি মাসের ঘটনাবলীর ফলে জার্মানির আসন্ন বিপ্লব ত্বরান্বিত হলো আর তাতে করে সে বিপ্লবের চরিত্র গেল বদলে। নিজস্ব ক্ষমতাবলে জয়লাভ করার বদলে জার্মান বুর্জোয়া শ্রেণি জয়ী হল ফরাসি শ্রমিক বিপ্লবের টানে। পুরানো প্রতিদ্বন্দ্বীদের অর্থাৎ নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্র, সামন্ততান্ত্রিক ভূমি মালিকানা, আমলাতন্ত্র ও কাপুরুষ মধ্যবিত্ত শ্রেণির চূড়ান্ত ফয়সালা করতে পারার আগেই তাকে এক নতুন শত্রুর অর্থাৎ প্রলেতারিয়েতের সম্মুখীন হতে হলো। কিন্তু ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের তুলনায় জার্মানি অনেক পশ্চাৎপদ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আর তা থেকে উদ্ভুত তার সমান পশ্চাৎপদ শ্রেণি সম্পর্কের ফল সঙ্গে সঙ্গে দেখা গেল।

জার্মান বুর্জোয়া তখন সবেমাত্র তার বৃহদায়তন শিল্প প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করেছে। রাষ্ট্রে নিজের নিঃশর্ত আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করার শক্তি বা সাহস কোনটাই তার ছিল না, আর তা করার কোন চূড়ান্ত প্রয়োজনীয়তাও ছিল না। প্রলেতারিয়েতও সমান অপরিণত। তারা বেড়ে উঠেছিল পরিপূর্ণ মানসিক দাসত্বের মধ্যে। তারা ছিল অসংগঠিত; স্বতন্ত্র সংগঠন গড়ে তোলার মতো ক্ষমতা তখনও তাদের হয়নি। বুর্জোয়া স্বার্থের সঙ্গে তাদের স্বার্থের গভীর বিরোধ সম্পর্কে কেবল একটা ঝাপসা অনুভূতি তাদের ছিল। তাই মূলতঃ বুর্জোয়ার ভয়াবহ প্রতিপক্ষ হলেও তারা তখনও বুর্জোয়াদের রাজনৈতিক অনুসঙ্গ হিসাবেই রইল। জার্মান প্রলেতারিয়েত তখন যা ছিল তাই দেখে নয় বরং ভবিষ্যতে সে যা হয়ে উঠবে বলে ভয় ছিল এবং ফরাসি প্রলেতারিয়েত তখন যা হয়ে উঠেছে, তাই দেখে ভয় পেয়ে বুর্জোয়ারা মনে করলো যে, তার পরিত্রাণের একমাত্র পথ হলো রাজতন্ত্র ও অভিজাততন্ত্রের সঙ্গে কোন ধরনের একটা আপোস, তা সে আপোস যতই কাপুরুষোচিত হোক না কেন! প্রলেতারিয়েত তখন নিজে তার ঐতিহাসিক ভূমিকার কথা জানতো না বলে প্রথমে তাদের বেশিরভাগকে নিয়ে তারা বুর্জোয়াদের অতি অগ্রণী চরম বামপন্থী অংশের ভূমিকা পালন করতে বাধ্য হয়। জার্মান শ্রমিকদের সবচেয়ে বড় কাজ ছিল শ্রেণিগত পার্টি হিসাবে স্বতন্ত্র সংগঠন গড়ার জন্য তাদের যে সব অধিকার অপরিহার্য সেগুলি অর্থাৎ মুদ্রণ, সংগঠন আর সভা সমাবেশের স্বাধীনতা অর্জন করা। নিজের শাসন ক্ষমতার স্বার্থেই এইসব অধিকারের জন্য লড়াই করা বুর্জোয়ার উচিত ছিল; কিন্তু শ্রমিকদের ভয়ে এখন সে এদের এইসব অধিকারের বিরোধিতা করতে থাকলো। যে বিরাট জনসংখ্যাকে অকস্মাৎ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয়েছিল তাদের দু’একশত ছাড়া লীগ সদস্য হারিয়ে গেল। জার্মান প্রলেতারিয়েত এইভাবে রাজনৈতিক রঙ্গভূমিতে প্রথমে অবতীর্ণ হল চরম গণতান্ত্রিক পার্টি হিসাবে।

আমরা যখন জার্মানিতে এক বৃহৎ সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠা করলাম তখন নিশান কী হবে তা এই থেকেই স্থির হয়ে গেল। সে নিশান একমাত্র গণতন্ত্রের নিশান হওয়াই সম্ভব ছিল। কিন্তু সেটা এমন এক গণতন্ত্র যা সর্বত্র এবং সর্বক্ষেত্রে ফুটিয়ে তুলবে তার বিশিষ্ট প্রলেতারীয় চরিত্র সেটা কিন্তু তখনও তার পতাকায় চিরকালের মতো উৎকীর্ণ করে নেওয়া সম্ভব ছিল না। আমরা যদি তা না করতাম, আন্দোলনে যোগ দিতে, তার তখনই বর্তমান সবচেয়ে অগ্রণী, কার্যত প্রলেতারীয় দিকটার পক্ষ নিয়ে তা আরও এগিয়ে দিতে না চাইতাম তাহলে আমাদের পক্ষে ক্ষুদ্র প্রাদেশিক একপাতা কাগজে কমিউনিজম প্রচার করা আর বিরাট সক্রিয় এক পার্টির বদলে অতি ক্ষুদ্র এক সঙ্কীর্ণ সম্প্রদায় গড়া ছাড়া আর কিছু করার থাকতো না। কিন্তু বিজনে প্রচারকের ভূমিকা আমাদের জন্য নয়। ইউটোপীয়দের যে আমরা এত ভাল করে পড়েছিলাম, নিজেদের কর্মসূচি রচনা করলাম সেটা এই উদ্দেশ্যে নয়। আমরা যখন কলোনে এলাম তখন আংশিকভাবে গণতন্ত্রীদের, আর আংশিকভাবে কমিউনিস্টদের পক্ষ থেকে সেখানে বৃহৎ এক সংবাদপত্রের ব্যবস্থা চলছিল। এটিকে পুরোপুরিভাবে কলোনের সঙ্কীর্ণ স্থানীয় পত্রিকায় পরিণত করে আমাদের বার্লিনে পাঠাবার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু প্রধানত মার্কসেরই চেষ্টায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই আমরা প্রতিষ্ঠা অর্জন করে নেই আর সংবাদপত্রটি আমাদের হয়ে দাঁড়ায়। এই বদলে আমাদের হাইনরিখ ব্যুরগের্সকে সম্পাদকমন্ডলীতে নিতে হয়েছিল। তিনি একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন, তারপর আর কোন দিন লেখেননি।

বার্লিন নয়, বিশেষ করে কলোনই আমাদের প্রয়োজন ছিল। প্রথমত, কলোনই রাইন প্রদেশের কেন্দ্র। রাইন প্রদেশ ফরাসী বিপ্লবের মধ্য দিয়ে গেছে ‘কোড নেপোলিয়ন’ মারফৎ আধুনিক অধিকার জ্ঞান অর্জন করেছে, নিজস্ব বৃহদায়তন শিল্প গড়ে তুলেছে, আর সব দিক দিয়েই তা তখন জার্মানির সবচেয়ে অগ্রণী অংশ। নিজেদের পর্যবেক্ষণ থেকেই আমরা সমসাময়িক বার্লিনকে খুব ভাল করেই চিনতাম। তার বুর্জোয়া তখন সবেমাত্র জন্মগ্রহণ করেছে। তার তোষামুদে পেটি বুর্জোয়ার মুখে খুব দুঃসাহস, কিন্তু কাজে তারা কাপুরুষ, আর শ্রমিক শ্রেণি তখনো পর্যন্ত মোটেই বিকাশলাভ করেনি, অসংখ্য আমলাতন্ত্রী, অভিজাত ও দরবারি জঞ্জাল সেখানে। তার পুরো চরিত্রই হলো কেবল রেসিডেন্টের মতো। কিন্তু চূড়ান্ত কথা হলো: বার্লিনে তখন ঘৃণ্য প্রুশীয় ল্যান্ডর‌্যাখট বলবৎ রয়েছে আর পেশাদার বিচারকেরা রাজনৈতিক মামলার বিচার করছেন। রাইনে ‘কোড নেপোলিয়ন’ বলবৎ ছিল, তাতে মুদ্রণ সংক্রান্ত কোন মামলার প্রশ্নই ছিল না, কারণ আগে থেকেই এতে সেন্সর ব্যবস্থার কথা ধরে নেওয়া হয়েছিল। আর আইন না ভেঙে রাজনৈতিক অপরাধ করলে জুরির সামনে হাজির হতে হতো। বার্লিন বিপ্লবের পরে তরুণ শ্লোফেল বাজে কারণে এক বছরের জন্য দন্ডিত হন। কিন্তু রাইনে আমরা মুদ্রণের শর্তহীন স্বাধীনতা উপভোগ করতাম- আর সেই স্বাধীনতা শেষ বিন্দু পর্যন্ত কাজে লাগাতাম।

এইভাবে ১৮৪৮ সালের ১লা জুন আমরা খুব অল্প শেয়ার ক্যাপিটাল নিয়ে কাজ শুরু করলাম। তার খুব সামান্যই মিটিয়ে দেওয়া হয়েছিল, আর শেয়ার হোল্ডারররাও ছিল একান্তই অনির্ভরযোগ্য। প্রথম সংখ্যার পরই তাদের অর্ধেক আমাদের পরিত্যাগ করলো আর মাসের শেষে একজনও আর রইল না।

সম্পাদকমন্ডলীর গঠনতন্ত্র পরিণত হল মার্কসের একনায়কত্বে। বড় একটা দৈনিক পত্রিকা যাকে নির্দিষ্ট সময়ে প্রকাশিত হতে হবে, সেখানে অন্য কোন ধরনের সংগঠনে স্বীয় নীতির সুসংহত প্রচার সম্ভব নয়। তাছাড়া এ প্রশ্নে আমাদের কাছে মার্কসের একনায়কত্ব ছিল কেমন স্বতঃসিদ্ধ তর্কাতীত, আমরা সবাই সাগ্রহে তা মেনে নিয়েছিলাম। মূলত তার স্বচ্ছ দৃষ্টি আর দৃঢ় মনোভাবের জন্যই এই পত্রিকাটি বিপ্লবের বছরগুলিতে সবচেয়ে নামকরা জার্মান সংবাদপত্রে পরিণত হয়।

নিউ রাইনিশ গেজেট পত্রিকার রাজনৈতিক কর্মসূচিতে দুটি মূলকথা ছিল : একটি একক অখন্ড গণতান্ত্রিক জার্মান প্রজাতন্ত্র আর রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ, পোল্যান্ডের পুনঃপ্রতিষ্ঠাসহ।
সে সময়ে পেটি বুর্জোয়া গণতন্ত্র প্রধানত দুটি ভাগে বিভক্ত ছিল : উত্তর জার্মান- গণতান্ত্রিক এক প্রুশীয় সরকারকে মেনে নিতে আপত্তি ছিল না এদের; আর দক্ষিণ জার্মান, সে সময়ে ছিল পুরোপুরিভাবে এবং নির্দিষ্টভাবে বাদেনীয়- এরা সুইজারল্যান্ডের অনুকরণে জার্মানিকে একটি ফেডারেল প্রজাতন্ত্রে রূপান্তর করতে চাইতো। উভয়ের বিরুদ্ধেই আমাদের লড়াই করতে হলো। জার্মানির প্রুশীয়করণ আর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যে তার বিভাগ চিরস্থায়ী করা, দুটোই প্রলেতারিয়েতের স্বার্থের পক্ষে সমান ক্ষতিকর ছিল। এই স্বার্থরক্ষার জন্য জার্মানিকে একটি জাতি হিসাবে ঐক্যবদ্ধ করা একান্ত জরুরি হয়ে পড়েছিল। একমাত্র এর ফলেই চিরাচরিত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সমস্ত বাধা প্রতিবন্ধক থেকে মুক্ত এমন এক যুদ্ধ ক্ষেত্রের সৃষ্টি হতো যেখানে প্রলেতারিয়েত ও বুর্জোয়ার পরস্পরের শক্তি যাচাই করার কথা। কিন্তু প্রুশিয়ার নেতৃত্বে ঐক্যবন্ধন ছিল প্রলেতারিয়েতের স্বার্থের একান্ত বিরোধী। জার্মানির বিপ্লবের পক্ষে সত্যিকারের একমাত্র যে আভ্যন্তরীণ শত্রুকে উচ্ছেদ করা উচিত ছিল সে হলো সামস্ত ব্যবস্থাধারা, সামস্ত ঐতিহ্য ও রাজবংশসহ প্রুশীয় রাষ্ট্র, আর তাছাড়া জার্মানিকে বিভক্ত করে জার্মান অস্ট্রিয়াকে বাদ দিয়ে প্রাশিয়া জার্মানিকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারতো। প্রুশীয় রাষ্ট্র ধ্বংস ও অস্ট্রীয় রাষ্ট্র চূর্ণ করে প্রজাতন্ত্র হিসাবে জার্মানির সত্যকার ঐক্যসাধন, এছাড়া আমাদের আর কোন আশু বিপ্লবী কর্মসূচি থাকতে পারতো না। এবং রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধের মাধ্যমে একমাত্র সেই মাধ্যমেই এ কাজ করা যেত। আমি আবার পরে এ কথায় ফিরে আসবো।

সাধারণ আড়ম্বর গুরুগাম্ভীর্য বা উল্লাসের সুর ছিল না কাগজটিতে। আমাদের বিরোধীরা ছিল সম্পূর্ণরূপেই ঘৃণ্য আর বিনা ব্যতিক্রমে তাদের সকলের প্রতিই ছিল আমাদের চরম ঘৃণা। ষড়যন্ত্রকারী রাজতন্ত্র, দরবারী চক্র, অভিজাততন্ত্র, -সমগ্র সম্মিলিত প্রতিক্রিয়া যাদের সম্পর্কে কূপমন্ডুকেরা এমন নৈতিক বিরক্তি বোধ করে থাকেন, তাদের প্রতি শুধু ব্যঙ্গ ও উপহাস নিক্ষেপ করতাম শুধু আমরা। বিপ্লবের মাধ্যমে রঙ্গমঞ্চে যেসব নতুন পূজ্যজনদের আবির্ভাব ঘটেছিল, অর্থাৎ মার্চ মন্ত্রীবর্গ, ফ্রাঙ্কফুর্ত ও বার্লিন পরিষদ ও সেখানকার দক্ষিণপন্থী, বামপন্থী উভয় অংশ, তাদের সম্পর্কে আমাদের আচরণ ছিল একই। প্রথম সংখ্যার প্রথম প্রবন্ধেই ফ্রাঙ্কফুর্ত পার্লামেন্টের অকিঞ্চিতকরতাকে, তার দীর্ঘ বক্তৃতার অনাবশ্যকতাকে, তার ভীরু প্রস্তাবাবলীর উদ্দেশ্যহীনতাকে ব্যঙ্গ করা হয়েছিল। তার মূল্য হিসাবে আমাদের শেয়ার হোল্ডারদের অর্ধেককে হারাতে হয়। ফ্রাঙ্কফুর্ত পার্লামেন্টকে এমনকি একটা বিতর্ক ক্লাবও বলা যেত না, সেখানে প্রায় কোন বিতর্কই হতো না এবং এমন সব প্রস্তাব গৃহীত হতো যার উদ্দেশ্য ছিল জার্মান কূপমন্ডূকদের অনুপ্রেরণা দেওয়া, তবে কেউই সেদিকে দৃষ্টিপাত করতো না।

বার্লিন পরিষদের গুরুত্ব এর চেয়ে বেশি ছিল, তাদের বিরুদ্ধে ছিল সত্যিকারের এক শক্তি। শুধু হাওয়ায় ফ্রাঙ্কফুর্তের মেঘাতীত উচ্চতায় তারা বিতর্ক ও প্রস্তাব গ্রহণ করতো না। তাই এদের দিকে বেশি মন দেওয়া হতো। কিন্তু সেখানেও শুলৎসেদেলিচ, বেরেন্দস, এলস্নার স্তাইন প্রভৃতি বামপন্থীদের পূজ্যজনদের প্রতিও ফ্রাঙ্কফুর্তের পূজ্যজনদের মতোই তীব্র আক্রমণ চালানো হতো; তাদের দৃঢ়তার অভাব, ভীরুতা ও তুচ্ছ হিসেবিপনাকে নির্মমভাবে উদঘাটন করা হতো এবং তারা কিভাবে আপোস মারফত ধাপে ধাপে বিপ্লবের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেছে তা প্রমাণ করে দেওয়া হতো। এর ফলে স্বভাবতই গণতান্ত্রিক পেটি বুর্জোয়ারা ত্রাস বোধ করতো, এই পূজ্যজনদের তারা সবে সৃষ্টি করেছিল নিজ প্রয়োজনেই। তবে এই আতঙ্কে বোঝা গেল আমাদের বাণ ঠিক লক্ষ্যেই বিঁধেছে।

মার্চের দিনগুলির সঙ্গে সঙ্গেই নাকি বিপ্লব শেষ হয়ে গেছে, আর এখন শুধু তার ফল হস্তগত করা বাকি এই বলে পেটি বুর্জোয়া পরম উৎসাহের সঙ্গে যে বিভ্রান্তি প্রচার করেছিল আমরা তার বিরুদ্ধের সমান প্রতিবাদ জানাই। আমাদের কাছে ফেব্রুয়ারি এবং মার্চ সত্যকার বিপ্লবের তাৎপর্য লাভ করতো তখনই যদি সেটা একটি দীর্ঘ বিপ্লবী আন্দোলনের শেষ না হয়ে শুরু হতো, মহান ফরাসি বিপ্লবের মতো যার মধ্যে দিয়ে জনগণ তাদের নিজেদের সংগ্রামের ধারায় বিকশিত হয়ে উঠতো আর আমাদের পার্টিগুলি ক্রমশ আরও তীক্ষ্ণভাবে পৃথক হয়ে বড় বড় শ্রেণিগুলির সঙ্গে অর্থাৎ বুর্জোয়া শ্রেণি পেটি বুর্জোয়া শ্রেণি আর প্রলেতারীয় শ্রেণির সঙ্গে সম্পূর্ণরূপে মিশে যেত আর প্রলেতারিয়েত একাধিক লড়াইয়ের মধ্যে একটির পর একটি অবস্থান জিতে নিত। সুতরাং আমরা সবাইতো একই জিনিস চাই; সব পার্থক্যের একমাত্র কারণ হলো ভুল বোঝাবুঝি, এই বাঁধা বুলির সাহায্যে গণতান্ত্রিক পেটি বুর্জোয়া যখনই প্রলেতারিয়েতের সঙ্গে তার শ্রেণি বিরোধের কথা চাপা দিতে চাইতো তখনই আমরা সর্বত্র তার বিরুদ্ধে দাঁড়াতাম। কিন্তু পেটি বুর্জোয়াকে আমরা আমাদের প্রলেতারীয় গণতন্ত্র সম্পর্কে মিথ্যা ধারণা করার সুযোগ যতই কম দিতাম, আমাদের সম্পর্কে ততই তারা নিরীহ ও আপোসমুখী হয়ে উঠতো। যতই তীব্র ও দৃঢ়ভাবে তাদের বিরোধিতা করা যায় ততই তারা নম্র হয়ে ওঠে এবং শ্রমিকদের পার্টিকে ততই সুবিধাদান করতে থাকে। এ সম্বন্ধে আমরা নিশ্চিত হয়ে উঠেছি।

শেষতক আমরা বিভিন্ন তথাকথিত জাতীয় পরিষদের পার্লামেন্টারি ক্রেটিনিজম উদঘাটন করে দিতাম। এই ভদ্রমহোদয়রা ক্ষমতার সব মাধ্যমই হাতছাড়া হয়ে যেতে দিয়েছিলাম- অংশত স্বেচ্ছায়- সেগুলিকে সরকারের হাতে ফিরিয়ে দিয়ে। বার্লিন ও ফ্রাঙ্কফুর্তে নতুন শক্তিপ্রাপ্ত প্রতিক্রিয়াশীল সরকারের পাশাপাশি ছিল শক্তিহীন পরিষদগুলি। তারা কল্পনা করতো যে তাদের অক্ষম প্রস্তাবাবলী পৃথিবী উল্টিয়ে দেবে। চরম বামপন্থী পর্যন্ত সকলেই ছিল এই নির্বোধ আত্ম প্রতারণার শিকার। আমরা তাদের বার বার বলতাম তাদের পার্লমেন্টীয় জয়ই হবে কার্যত তাদের যুগপৎ পরাজয়।

আর বার্লিন ও ফ্রাঙ্কফুর্ত দু’জায়গাতেই ঠিক তাই ঘটল। বামপন্থীরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করার সঙ্গে সঙ্গেই সরকার পরিষদকে ভেঙ্গে দিল। সরকার যে এ কাজ করতে পারলো তার কারণ হলো পরিষদ জনগণের আস্থা হারিয়েছিল।

পরে আমি মারাত সম্পর্কে বুজারের বই পড়ে দেখতে পাই যে, একাধিক ব্যাপারে আমরা না জেনে সত্যিকারের জনগণের বন্ধুর (রাজতন্ত্রীদের নকল জনগণের বন্ধু নয়) মহান আদর্শ অনুকরণ করেছিলাম এবং যে ক্রুদ্ধ গর্জন ও ইতিহাস বিকৃতির ফলে প্রায় এক শতাব্দী ধরে সবাই সম্পূর্ণ বিকৃত এক মারাতের পরিচয় পেয়ে এসেছিল। তার একমাত্র কারণ হলো, মারাত নির্মমভাবে সেই মুহূর্তের পূজ্যজনদের অর্থাৎ লাফায়েৎ, বায়ির ও অন্যান্যদের মুখোশ টেনে খুলে দিয়েছিলেন এবং দেখিয়ে দিয়েছিলেন যে, ইতিমধ্যেই তারা বিপ্লবের প্রতি সম্পূর্ণ বিশ্বাসঘাতক হয়ে উঠেছে। তাছাড়া আমাদের মতো তিনিও এ ঘোষণা চাননি যে, বিপ্লব শেষ হয়েছে, বরং তিনিও চেয়েছিলেন বিপ্লব অবিরাম চলুক।

আমরা খোলাখুলি ঘোষণা করলাম যে আমরা যে ধারার প্রতিনিধি সে ধারা আমাদের পার্টির আশু লক্ষ্য অর্জনের জন্য সংগ্রাম শুরু করতে পারবে একমাত্র তখনই যখন জার্মান সমস্ত সরকারি পার্টিগুলির মধ্যে সবচেয়ে চরমপন্থী পার্টিটি ক্ষমতায় আসবে। তখন আমরা হয়ে উঠবো তার বিরোধী দল। কিন্তু ঘটনাক্রমে দাঁড়ালো এই যে, আমাদের জার্মান বিরোধীদের ব্যঙ্গ করা ছাড়াও জ্বালাময়ী আবেগও ঝঙ্কৃত হয়ে উঠলো। ১৮৪৮ সালের জুন মাসে প্যারিসের শ্রমিকদের বিদ্রোহ যখন শুরু হয় ততক্ষণে আমরা ঘাঁটি নিয়ে বসেছি। প্রথম গুলিবর্ষণ থেকেই আমরা দৃঢ়ভাবে বিদ্রোহের পক্ষ নিলাম। তাদের পরাজয়ের পর মার্কস একটি অত্যন্ত জোরালো প্রবন্ধে পরাজিতদের স্মৃতিতে অঞ্জলি দেন।

আমাদের অবশিষ্ট শেয়ার হোল্ডাররাও তখন আমাদের পরিত্যাগ করলো। কিন্তু আমাদের সেই সন্তোষ রইল যে জার্মানিতে এবং প্রায় সমগ্র ইউরোপে একমাত্র আমাদেরই কাগজ বিধ্বস্ত প্রলেতারিয়েতের পতাকা ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছিল এমন এক মুহূর্তে যখন সব দেশের বুর্জোয়া ও পেটি বুর্জোয়া পরাজিতদের উদ্দেশ্যে কদর্য গালি বর্ষণ করেছে।

আমাদের বৈদেশিক নীতি ছিল সরল; প্রতিটি বিপ্লবী জাতির পক্ষ সমর্থন এবং ইউরোপীয় প্রতিক্রিয়ার শক্তিশালী দুর্গ রাশিয়ার বিরুদ্ধে বিপ্লবী ইউরোপের এক সাধারণ যুদ্ধের জন্য আহ্বান। ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে আমাদের কাছে এ কথাটা পরিষ্কার হয়ে গেল যে, বিপ্লবের সত্যিকার ভয়ঙ্কর শত্রু মাত্র একটি- রাশিয়া এবং আন্দোলন যতই সারা ইউরোপে ছড়িয়ে পড়বে সংগ্রামে নামার প্রয়োজনীয়তাও এ শত্রুর পক্ষে অদম্য হয়ে উঠবে। ভিয়েনা মিলান ও বার্লিনের ঘটনাবলীর ফলে রুশ আক্রমণ অবশ্য বিলম্বিত হবার কথা, কিন্তু বিপ্লব রাশিয়ার কাছে যত এগিয়ে আসছে সেই আক্রমণের অপরিহার্যতা ততই সুনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। কিন্তু যদি জার্মানিকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামানো যেত তাহলে হ্যাপসবুর্গ এবং হয়েনৎসলার্নের শেষ হতো এবং বিপ্লব সর্বত্র জয়ী হতো।

রুশরা যখন সত্যি সত্যি হাঙ্গেরি আক্রমণ করলো সেই মুহূর্ত পর্যন্ত সংবাদপত্রের প্রতিটি সংখ্যায় এই নীতি বিধৃত ছিল। এই আক্রমণ আমাদের ভবিষ্যদ্বাণী পুরোপুরি প্রমাণ করলো এবং সুনিশ্চিত করলো বিপ্লবের পরাজয়।

১৮৪৯ সালের বসন্তকালে যখন চূড়ান্ত সংগ্রামের দিন ঘনিয়ে আসছে তখন সংখ্যায় সংখ্যায় সংবাদপত্রটির সুর খুব তীব্র এবং আবেগ দীপ্ত হয়ে উঠতে থাকলো। সিলেজীয় মিলিয়ার্ডে ভিলহেলম ভলফ সিলেজীয় কৃষকদের মনে করিয়ে দিলেন যে, তারা যখন সামন্ততান্ত্রিক অধীনতা থেকে মুক্তি পায় তখন সরকারের সাহায্যে জমিদাররা কিভাবে তাদের টাকা এবং জমির ব্যাপারে ঠকিয়েছিল এবং তিনি দাবি করলেন যে ক্ষতিপূরণ হিসাবে শতকোটি টেলার দিতে হবে।

এই সময়ে মার্কসের মজুরি শ্রম ও পুঁজি কয়েকটি সম্পাদকীয় নিবন্ধের আকারে প্রকাশিত হয়ে আমাদের নীতির সামাজিক লক্ষ্য স্পষ্টভাবে নির্ধারিত করে দিল। যে বিরাট সংগ্রামের প্রস্তুতি চলছিল ফ্রান্স, ইতালি, জার্মানি ও হাঙ্গেরীতে যে বিরোধ তীব্রতর হয়ে উঠেছিল প্রতি সংখ্যায় এবং প্রতি বিশেষ সংখ্যায় তার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলো। বিশেষ করে এপ্রিল ও মে মাসের বিশেষ সংখ্যাগুলিতে ছিল জনগণের উদ্দেশ্যে সংগ্রামে প্রস্তুত থাকার আহ্বান।
আমরা যে দুর্গসৈন্য ও কারাগার সম্বলিত প্রথম শ্রেণীর এক প্রুশীয় দুর্গের মধ্যে এমন নির্ভয়ে আমাদের কাজ চালিয়ে যেতাম তাতে জার্মানির সর্বত্র বিস্ময় প্রকাশ করা হতো। কিন্তু সম্পাদকদের ঘরে ৮টি বন্দুক ২৫০টি কার্তুজ এবং কম্পোজিটরদের লাল জ্যাকোবিন টুপির দরুন আমাদের বাড়িও অফিসারদের কাছে এমন এক দুর্গ বলে প্রতীয়মান হত যা নেহাৎ হানা দিয়ে আধিকার করা সম্ভব নয়। অবশেষে এলো ১৮৪৯ সালের ১৮ মে তারিখের আঘাত।

দ্রেজদেন ও এলবারফিল্ডে বিদ্রোহ দমিত হলো, ইসারলোহন বেষ্টিত হলো, রাইন প্রদেশ ও ভেস্তফালিয়া সৈন্য প্লাবিত হয়ে উঠলো। প্রুশীয় রাইনল্যান্ড ধর্ষণের পর তাদের পালাটিনেট ও বাদেনের বিরুদ্ধে পাঠানোর কথা। অবশেষে তখন সরকার আমাদের দিকে এগোবার সাহস পেল। সম্পাদকমন্ডলীর অনেককে অভিযুক্ত করা হলো। অন্যদের অপ্রুশীয় বলে নির্বাসন দেওয়া হলো। এর বিরুদ্ধে কিছুই করার ছিল না, কেননা সরকারের পিছনে রয়েছে পুরো একটা সৈন্যবাহিনী। আমাদের দুর্গ সমর্পণ করতে হলো। কিন্তু আমরা পিছু হটে এলাম আমাদের রসদ ও অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ব্যন্ড বাজিয়ে, শেষ লাল সংখ্যার পতাকা উড়িয়ে; তাতে আমরা নিষ্ফল অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে কলোনের শ্রমিকদের সাবধান করে দিয়ে বলেছিলাম : ‘আপনারা যে সহানুভূতি দেখিয়েছেন তার জন্য নিউ রাইনিশ গেজেটের সম্পাদকরা বিদায়কালে আপনাদের ধন্যবাদ জানাচ্ছে। চিরকাল এবং সর্বত্র তাদের শেষ কথা হবে : শ্রমিক শ্রেণির মুক্তি।’

এইভাবে অস্তিত্বের এক বছর পূর্ণ হওয়ার আগে নিউ রাইনিশ গেজেট পত্রিকার অবসান হলো। প্রায় কোন আর্থিক সম্বল ছাড়া এটি শুরু হয়েছিল- আমি আগেই বলেছি যে সামান্য যেটুকু প্রতিশ্রুতি পাওয়া গিয়েছিল তা-ও আসেনি- কিন্তু সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যেই তার প্রচার প্রায় পাঁচ হাজারে গিয়ে পৌঁছেছিল। কলোনের অবরুদ্ধ অবস্থার ফলে এটি বন্ধ হয়ে যায়। অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি আবার তাকে গোড়া থেকে শুরু করতে হয়। কিন্তু ১৮৪৯ সালের মে মাসে যখন কাগজটি বন্ধ করে দেওয়া হলো তখন তার গ্রাহক সংখ্যা আবার ছয় হাজারে গিয়ে পৌঁছেছিল। কলোনিশ গেজেট পত্রিকার নিজের স্বীকারোক্তি অনুসারে গ্রাহক সংখ্যা নয় হাজারের বেশি ছিল না। নিউ রাইনিশ গেজেটের মতো ক্ষমতা ও প্রভাব তথা প্রলেতারীয় জনগণকে প্রদীপ্ত করে তোলার সামর্থ্য পরে বা আগে কোন জার্মান সংবাদপত্রের হয়নি। এবং এর জন্য সে ঋণী সর্বাগ্রে মার্কসের কাছে।

যখন আঘাত এলো সম্পাদকীয় বিভাগে সবাই ছড়িয়ে পড়লেন। মার্কস প্যারিসে গেলেন- সেখানে নাটকের যে শেষ অঙ্কের প্রস্তুতি চলছিল তা অনুষ্ঠিত হলো ১৮৪৯ সালের ১৩ জুন তারিখে এখন যখন ওপর থেকে ভেঙ্গে যাওয়া বা বিপ্লবে যোগ দেওয়া এই দুটোর মধ্যে একটাকে বেছে নেওয়ার সময় হল ফ্রাঙ্কফুর্ত পরিষদের তখন ভিলহেলম ভলফ পরিষদে তার আসন গ্রহণ করলেন, আর আমি পালাটিনেটে গিয়ে ভিলিখের স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীতে অ্যাডজুট্যান্ট হলাম।
(সমাপ্ত)

 

সুত্রঃ 
13076745_715535491921699_3304914592563662269_n

Advertisements


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s