আইএসের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে ইয়াজিদি নারীরা

yazidi-woman-4

মধ্যপ্রাচ্যে জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসের উত্থানের পর, সবচেয়ে বেশি নিপীড়নের শিকার হয়েছে ইয়াজিদি সম্প্রদায়।  সারা পৃথিবীতে এ সম্প্রদায়ের প্রায় ৭ লাখ মানুষ থাকলেও, তাদের সিংহভাগের বসবাস উত্তর ইরাকের সিনজার পর্বতের আশপাশে।  ২০১৪ ও ১৫ সালে বহু ইয়াজিদি নারীকে ধরে নিয়ে নির্যাতন করেছে আইএস।  আর জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত ও হত্যার শিকার হয়েছে অসংখ্য ইয়াজিদি পুরুষ।

আইএসের হাতে নির্যাতনের শিকার ইয়াজিদিদের অনেক নারী তাই এবার জঙ্গিগোষ্ঠীটির বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে নেমেছেন।  নিজ সম্প্রদায়ের ওপর চালানো নির্যাতনের প্রতিশোধ নিতে জীবন দিতে প্রস্তুত তারা।

খ্রিস্টান ও ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের কাছে অগ্রহণযোগ্য ইয়াজিদিরা নৃতাত্ত্বিকভাবে কুর্দি সম্প্রদায়ভুক্ত।  ২০১৪ সালে ইরাক ও সিরিয়ায় আইএসের উত্থানের পর সিনজার পর্বতের আশপাশে বসবাসরত ইয়াজিদিদের ওপর নির্মম নির্যাতন চালায় জঙ্গিগোষ্ঠীটি।

আইএস শত শত নারীকে অপহরণ করে মাসের পর মাস আটকে রাখে।  ২০১৫ সালে মুক্তির পর কয়েকজন ইয়াজিদি নারী গণমাধ্যমে আইএসের অত্যাচারের রোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছিলেন।  আইএসের নৃশংসতা থেকে আজও যাদের মুক্তি মেলেনি, তাদের জন্য অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছেন হাসিবা নৌজাদ ও আসিমা দাহিরের মতো ইয়াজিদি ও কুর্দি নারী যোদ্ধারা।

এক নারী যোদ্ধা বলেন, ‘যুদ্ধক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের মাঝে আমি কোনো পার্থক্য দেখি না, একজন পুরুষের পাশে আমরা যখন অস্ত্র হাতে দাঁড়াই- এটা তাদের আরও বেশি উৎসাহিত করে।’

ইয়াজিদি নারী ও শিশুদের আর্তনাদ, যুদ্ধের মাঠে নামিয়েছে অনেককে।  প্রথাগত সংসার ভুলে মরুভূমি আর বনে-বাদারেই কাটছে তাদের অষ্ট প্রহর। নিজের জীবনের বিনিময়ে হলেও আইএসের নির্যাতনের প্রতিশোধ নিতে চান তারা।

এক নারী যোদ্ধা বলেন, ‘আমার যে বোনেরা আইএসের হাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছে, তাদের কথা ভেবে আমার দম বন্ধ হয়ে আসতো।  তাই কুর্দি নারীদের সঙ্গে আমিও যুদ্ধে নেমেছি।’

তাদের মতো আরও অনেক নারী কুর্দি পেশমার্গা বাহিনীর পক্ষে যুদ্ধে নাম লিখিয়েছেন।  পুরুষদের মতো যুদ্ধক্ষেত্রে তারাও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন।  এমনকি ইরাকের উত্তরাঞ্চল মসুল থেকে আইএসকে হটাতে এ নারীদেরও বড় ভূমিকা ছিলো বলে জানিয়েছে গণমাধ্যম।

১৮ ও ১৯ শতকে অটোম্যান সাম্রাজ্যের অধীনে ইয়াজিদিরা অন্তত ৭২ বার হামলা ও গণহত্যার শিকার হয়েছে।  ২০০৭ এ উত্তর ইরাকে গাড়ি বোমা হামলায় কয়েকশ’ ইয়াজিদি নিহত হয়।  আইএসের হামলার শিকার হওয়ার আগে আল-কায়দার রোষানলে পড়েছিলো ইরাক ও সিরিয়ার এ সংখ্যালঘুরা।

বারবার আক্রমণের মুখে পড়া ইয়াদিজিদের একটি বড় অংশ, এরইমধ্যে মধ্যপ্রাচ্য ছেড়ে গেছে।  পর্যবেক্ষণ সংস্থা সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটসের তথ্যমতে, গত ২ বছরে লক্ষাধিক ইয়াজিদি ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নিয়েছে।

Advertisements

বিশাখাপত্তনমে গ্রেহাউন্ডের গুলিতে নিহত ২ নারীসহ ৩ মাওবাদী

Cops on Maoist

অনুদিতঃ

বুধবার সন্ধের সময় বিশাখাপত্তনমের কয়েরু মণ্ডলে অন্ধ্রের গ্রেহাউন্ডের গুলিতে ৩ মাওবাদী হয়েছেন।  পুলিসের দাবি সংঘর্ষে নাকি নিহত হয়েছেন ওই মাওবাদীরা।  নিহতদের মধ্যে ২ জন নারী গেরিলা।  উদ্ধার করা হয়েছে একটি একে ৪৭, দুটি এসএলআর, একটি পিস্তল ও কিট ব্যাগ।

নিহতদের মধ্যে একজন হচ্ছে গোপাল ওরফে আজাদ, তিনি গালিকোন্দা এরিয়া স্কোয়াডের প্রধান ছিলেন।  সাত বছর আগে তিনি মাওবাদী আন্দোলনে যোগ দেন।  আজাদ, শ্রীকাকুলাম এবং কোরাপুট বিভাগের উপ-প্রধান চৈতন্য ওরফে অরুণার ভাই, অরুণা পূর্ব বিভাগের প্রধান  ছালাপাতি ওরফে কাইলাসাম এর স্ত্রী।

বুধবার পুলিসি সন্ত্রাসের অভিযোগে বিশাখাপত্তনম , পূর্ব গোদাবরী ও খাম্মামের লাগোয়া অঞ্চলে বনধের ডাক দিয়েছিল মাওবাদীরা।  এর আগেও গত ২১ ফেব্রুয়ারি ওই একই জায়গায় নিহত হন ২ মাওবাদী।

সুত্রঃ http://timesofindia.indiatimes.com/city/visakhapatnam/Three-Maoists-killed-in-encounter/articleshow/52116095.cms


উপমহাদেশের শাসক শোষক শ্রেণির শ্রেণিগত অবস্থান ও অসাম্প্রদায়িক চরিত্র প্রসঙ্গে

ভারতীয়_উপমহাদেশ.svg

 

উপমহাদেশের শাসক শোষক শ্রেণির শ্রেণিগত অবস্থান ও অসাম্প্রদায়িক চরিত্র প্রসঙ্গে

 

জয়ন্ত মুখোপাধ্যায় ॥ এদেশের শাসক শোষক শ্রেণী নিজেদের শাসক শোষণ টিকিয়ে রাখার স্বার্থে জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন তত্ত্বের অবতারণা করে থাকে।  সাম্রাজ্যবাদের দালাল দেশের শাসক শোষক শ্রেণী নিজেদেরকে স্বাধীন গণতান্ত্রিক দেশের অধিপতি, স্বাধীন বুর্জোয়া হিসাবে পরিচিত করার বহুমুখী চেষ্টা করে থাকে।  শুধু তাই নয় শাসক শোষক শ্রেণীর যে অংশই ক্ষমতায় আসে তারা নিজেদের অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক ইত্যাদি বৈশিষ্ট্যমন্ডিত বলে প্রচার করে থাকে।  তাদের এই সব বক্তব্য প্রতিষ্ঠিত করার জন্য ভাড়া খাটা বুদ্ধিজীবীদের প্রচেষ্টার কোন ঘাটতি নেই।  তারা প্রভু সাম্রাজ্যবাদ ও তাদের এদেশীয় দালালদের স্বার্থে কঠিন কঠোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে কীভাবে শাসক শোষক শ্রেণীকে জনগণের সামনে মহিমান্বিত করা যায় আর সাম্রাজ্যবাদী শোষণ ও জাতিগত নিপীড়নকে আড়াল করা যায়।  অবশ্য এই সব পন্ডিতেরা যে একেবারে নিঃস্বার্থভাবে এই সব সেবা প্রদান করে চলেছেন তা কিন্তু নয়। সাম্রাজ্যবাদী প্রভুদের ছুড়ে দেওয়া উচ্ছিষ্টের কিছু অংশ তারাও ভোগ করছেন।

অষ্টাদশ শতাব্দীতেই ভারতবর্ষে সামন্তবাদী সমাজের গর্ভের পুঁজির বিকাশ ও বুর্জোয়া শ্রেণীর উদ্ভব ঘটতে থাকে। কিন্তু ১৭৫৭ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তৎকালীন বাংলা বিহার দখল করে ভারতবর্ষে ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করে। পরবর্তিকালে গোটা ভারতবর্ষ দখল করে ইংরেজরা ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত করে। তারা ভারতবর্ষে স্বাধীন পুঁজির বিকাশ বাধাগ্রস্ত করে এবং সারা দেশে তাদের অনুগত এক দালাল শ্রেণী সৃষ্টি করে। এই সব দালালরা ব্রিটেনে উৎপাদিত শিল্প পণ্য এদেশে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সহযোগী হিসাবে বাজারজাত করার প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকতো। সেই সাথে এদেশে উৎপাদিত কাঁচামাল কম মূল্যে কিনে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে তুলে দিত। এর মাধ্যমে এরা কোম্পানির ছুড়ে দেওয়া উচ্ছিষ্ট ভোগ করতো। এদেরকেই বলা হতো কোম্পানির দালাল বা মুৎসুদ্দি। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাদের পুঁজির বিকাশের স্বার্থেই ভারতে স্বাধীন বুর্জোয়া বিকাশ উচ্ছেদ করতে সকল রূপের পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং মুৎসুদ্দি শ্রেণীর বিকাশে সর্বাত্মক সহায়ক ভূমিকা গ্রহণ করে।

এই সময়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতবর্ষে বিশেষ করে বঙ্গদেশে বিকাশমান বস্ত্র বয়ন শিল্প ধ্বংস করে এবং গোটা ভারতবর্ষে ব্রিটেনের বস্ত্র শিল্পের বাজারে পরিণত করে। তারা ভারতবর্ষের সামন্ততন্ত্রকে উচ্ছেদ করে না; বরং এশিয়াটিক সামন্ততন্ত্রের স্থলে ইউরোপীয় আদলে এখানকার সামন্তবাদকে পুনরুজ্জীবিত করে। যার ফলে কৃষক জমির ওপর অধিকার হারায় ও জমির ওপর নব্য সৃষ্ট জমিদারদের একচ্ছত্র অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও পরবর্তিকালে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ তাদের সৃষ্ট সামন্ত-মুৎসুদ্দি শ্রেণীকে সমন্বিত করে একটি স্থায়ী মিত্র শ্রেণী ভারতবর্ষের মাটিতে গড়ে তোলে। এই সামন্ত-মুৎসুদ্দি শ্রেণী-ই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের হয়ে এদেশের জনগণের ওপর নির্মম শোষণ লুণ্ঠন ও নিপীড়ন চালায়। ঔপনিবেশিক শক্তির সৃষ্ট এই সামন্ত-মুৎসুদ্দি শ্রেণীর অব্যাহত সহযোগিতার কারণে-ই ভারতবর্ষের মাটিতে ব্রিটিশ শক্তির প্রত্যক্ষ ঔপনিবেশিক শাসন ১৯০ বৎসর দীর্ঘস্থায়ী হয়। ভারতবর্ষের এই সামন্ত-মুৎসুদ্দি শ্রেণীর এই সাম্রাজ্যবাদ নির্ভরতা ও সাম্রাজ্যবাদের দালাল হয়ে প্রভুর সেবা করার চরিত্র শুধু যে ঔপনিবেশিক আমলে বহাল ছিল তাই নয়, নয়া ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পরও তাদের এই চরিত্র বহাল রয়েছে।

পুঁজিবাদ যখন লগ্নি পুঁজির দিকে ছুটতে শুরু করে তখন-ই ব্রিটিশ বুর্জোয়া শ্রেণী ভারতের সামন্ত-মুৎসুদ্দি শ্রেণীকে দিয়ে রাজনৈতিক দল গঠন করে। এই প্রক্রিয়ায় প্রথমে ভারতের মাটিতে দাঁড় করায় কংগ্রেস ও পরে মুসলিম লীগ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর কালে পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে সরাসরি ঔপনিবেশিক ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। তারই প্রেক্ষিতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ১৯৪৭ সালে সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে ভারতবর্ষকে বিভক্ত করে ভারত ও পাকিস্তান নামক দু’টি নয়া ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র সৃষ্টি করে এর শাসনভার তাদের প্রশিক্ষিত দালাল কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের হাতে অর্পণ করে। পরবর্তিকালে ১৯৭১ সালে সাম্রাজ্যবাদী পরিকল্পনায় এই নয়া ঔপনিবেশিক পাকিস্তান রাষ্ট্রের একাংশ নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় নয়া ঔপনিবেশিক বাংলাদেশ রাষ্ট্র। নয়া ঔপনিবেশিক ব্যবস্থায় সাম্রাজ্যবাদের সরাসরি উপস্থিতির অবসান ঘটলেও সাম্রাজ্যবাদী লগ্নি পুঁজির শোষণ ও জাতিগত নিপীড়নের অবসান ঘটে না। সামন্তবাদের অবশেষসমূহ এখনও এখানকার কৃষক জনতার ওপর নির্মম শোষণ চালাচ্ছে। সাম্রাজ্যবাদের সৃষ্ট দালাল দেশীয় সামন্ত-মুৎসুদ্দি শ্রেণীর সহায়তায় এই শোষণ নিপীড়ন আজও বহাল রয়েছে। নয়া ঔপনিবেশিক ব্যবস্থায় জাতীয় পুঁজির বিকাশ ঘটেনি এবং স্বাধীন জাতীয় অর্থনীতিও গড়ে ওঠেনি। সাম্রাজ্যবাদী প্রভুদের লগ্নি পুঁজির ওপর ভিত্তি করে এখানকার সামন্ত-মুৎসুদ্দি শ্রেণী অগ্রসর হচ্ছে।

ভারতবর্ষ আজ তিনটি নয়া ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রে বিভক্ত।  এই তিনটি নয়া ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রে সাম্রাজ্যবাদের দালাল দেশীয় সামন্ত-মুৎসুদ্দি শ্রেণী রাষ্ট্র ক্ষমতায় রয়েছে। সাম্রাজ্যবাদের দালাল এই দেশীয় সামন্ত-মুৎসুদ্দি শ্রেণীকে উৎখাত ছাড়া সাম্রাজ্যবাদী শোষণ ও জাতিগত নিপীড়নের অবসান ঘটবে না; জাতীয় পুঁজির বিকাশ ঘটবে না; স্বাধীন জাতীয় অর্থনীতিও গড়ে উঠবে না। এসব হলো ইতিহাসে প্রতিষ্ঠিত সত্য। এই সত্যকে আড়াল করতেই সাম্রাজ্যবাদ ও তার দালাল দেশীয় সামন্ত-মুৎসুদ্দি শ্রেণী নানা অপপ্রয়াস চালাচ্ছে। এরাই এখানকার মুৎসুদ্দি শ্রেণীকে জাতীয় বুর্জোয়া হিসাবে প্রচার চালাচ্ছে।

ঔপনিবেশিক ভারতে পুঁজিপতি শ্রেণীর উত্থান খুব দ্রুত হয়। এই পুঁজিপতি শ্রেণীর সকলেই মূলত মুৎসুদ্দি পুঁজির মালিক। ঔপনিবেশিক সময়ে ভারতে পুঁজিপতি শ্রেণীর শ্রেণী চরিত্র সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে অমিত ভট্টাচার্য তার আধুনিক ভারতের অর্থনৈতিক ইতিহাসের রূপরেখা গ্রন্থে বর্ণনা করছেন যে, “…. প্রাক-পুঁজিবাদী সমাজে বণিক ও মহাজনী পুঁজি উৎপাদনশীল পুঁজির ওপর আধিপত্য করে, আবার পুঁজিবাদী সমাজে তারা উৎপাদনশীল পুঁজির এজেন্ট হিসাবে কাজ করে। ভারতবর্ষে বরাবরই বণিক ও মহাজনী পুঁজির প্রাধান্য ছিল। ঊনবিংশ শতকে ভারতবর্ষ কাঁচামাল যোগানের উপাঙ্গ এবং ব্রিটেনের শিল্পজাত দ্রব্যের লোভনীয় বাজারে পরিণত হয়। এর ফলে আমাদের দেশে এক ধরনের বাণিজ্যিক বিপ্লব ঘটে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্রিটিশ বুর্জোয়ারা এদেশীয় মুৎসুদ্দি শ্রেণীর সহযোগিতায় বেশ কিছু ব্যবসা কেন্দ্র গড়ে তোলে, যাদের কাজ হলো ভারতবর্ষ থেকে কাঁচামাল ব্রিটেনে পাঠানো আর ব্রিটেন থেকে পাঠানো পণ্যদ্রব্য এখানকার বাজারগুলিতে বিক্রি করা। কৃষক সমাজের ওপর শোষণ নিপীড়নের পাহাড় চেপে বসে, যে পাহাড়ের মাথায় ছিল ব্রিটিশ এজেন্সি হাউস ও বিনিময় ব্যাংকগুলি। তার তলার সারিতে ছিল ভারতীয় আমদানি ও রপ্তানিকারী, দালাল, বণিক, ভূস্বামী ও মহাজনেরা। বণিক পুঁজি ও মহাজনী পুঁজি পারস্পরিক গাঁটছড়ায় আবদ্ধ ছিল। বাণিজ্যিক দাদন ব্যবস্থা প্রচলিত হওয়ায় কৃষকেরা কার্যত ভূমিদাসে পরিণত হয়। একইভাবে বাণিজ্যিক দাদন ব্যবস্থার মাধ্যমে তাঁতি ও অন্যান্য হস্তশিল্পীরা বণিক ও সুদখোর মহাজনদের হাতে নিপীড়িত ও নির্যাতিত হত। ভারতে অবস্থানকারী ব্রিটিশ পুঁজি, যা ম্যানেজিং এজেন্সি সংস্থাগুলির মাধ্যমে কাজ চালাতো এবং ভারতীয় বহির্বাণিজ্য, শিল্প, ব্যাংকিং ও বিমা ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করতো- সে সবই ছিল মূলত বণিক পুঁজি। তাই শিল্পের তুলনায় বাণিজ্য ছিল বেশি লাভজনক এবং যে কোন প্রাক-পুঁজিবাদী সমাজের মতো ভারতবর্ষেও বাণিজ্য শিল্পের ওপর আধিপত্য করতো।

ভারতের পুঁজিপতিরা বণিক ও মহাজনী শ্রেণী থেকে উদ্ভুত হয়েছিল। তাদের প্রায় সকলের কাছেই শিল্পের বিকাশ হলো এক নগণ্য বিষয়। ভারতীয় বুর্জোয়ারা জন্মলগ্ন থেকেই বিদেশি পুঁজির মধ্যস্থ হিসাবে মুৎসুদ্দির ভূমিকা পালন করে এসেছে।” [অমিত ভট্টাচার্য- আধুনিক ভারতের অর্থনৈতিক ইতিহাসের রূপরেখা; পৃষ্ঠা ১৫৬]।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে ভারতীয় পুঁজিপতিরা বেশ কিছু শিল্প কারখানা দেশে গড়ে তোলে। এই সব পুঁজিপতিদের উত্থান হয়েছে ব্রিটিশ বিভিন্ন কোম্পানির স্থানীয় দালাল বা মুৎসুদ্দি হিসাবে কাজ করার ভিতর দিয়ে। এইসব পুঁজিপতিদের মধ্যে অনেকের সাথে সামন্ত স্বার্থের সরাসরি সম্পর্ক ছিল। ভারতে প্রথম পর্যায়ে যে শিল্প কারখানা গড়ে ওঠে তার মধ্যে ছিল সুতিবস্ত্র ও ইস্পাত কারখানা। এই সব শিল্প কারখানা স্থাপনে যে সব পুঁজিপতিরা এগিয়ে এসেছিল তাদের পুঁজি গড়ে উঠেছিল চীনের আফিম বাণিজ্য, বিভিন্ন ব্রিটিশ কোম্পানির মালের বেচা কেনার দালালি ও মহাজনী পুঁজি থেকে। এই সময়ে ভারত থেকে বিদেশে যেসব পণ্য রপ্তানি করা হতো তার এক-তৃতীয়াংশের বেশি আসতো আফিম থেকে। এই আফিম বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে ভারত, চীন ও ব্রিটেনের মধ্যে একটি ত্রিকোণ বাণিজ্য গড়ে ওঠে। ব্রিটিশ কোম্পানিগুলো ভারত থেকে আফিম নিয়ে চীনে উচ্চ দামে বিক্রি করতো। চীনে আফিম বিক্রি করে যে অর্থ অর্জন করতো তা দিয়ে সস্তা দামে চীনের চা, পশম, চীনা মাটির দ্রব্যাদি কিনে ইউরোপের বাজার উচ্চ মূল্যে বিক্রি করে প্রচুর লাভ করতো। এই কাজে ভারতীয় বড় বণিকরা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসক ও বণিকদের মধ্যস্থ হিসাবে কাজ করে প্রচুর অর্থের মালিক হয়।

এই পর্যায়ে ভারতীয় পুঁজিপতি পারসি বণিক কাওয়াসজি নানাভাই ডাভর বম্বে শহরে ব্রিটিশ বণিকের সাথে গাঁটছড়া বেঁধে সুতিবস্ত্রের কারখানা গড়ে তোলেন। এই কাওয়াসজির পিতা এবং কাওয়াসজি নিজেও ব্রাউন কিং এ্যান্ড কোম্পানি এবং ডব্লু এ্যান্ড টি এডমন্ড এ্যান্ড কোম্পানি নামে দুটি ব্রিটিশ সংস্থার দালাল হিসাবে কাজ করতো। অপর এক পারসি বণিক মানাকজি নাসারভানজি পেটিট বম্বে শহরে দ্বিতীয় সুতিবস্ত্র কারখানা প্রতিষ্ঠা করেন। এই মানাকজি নাসারভানজি পেটিট সাটন, ম্যালকম এ্যান্ড কোম্পানি, ভাইরেম হান্টার এ্যান্ড কোম্পানি এবং ডব্লু হ্যালি এ্যান্ড রেনি কোম্পানি নামক ব্রিটিশ এজেন্সি হাউসগুলোর দালালি করতেন। আর এক ভারতীয় পুঁজিপতি ও বস্ত্র শিল্প মালিক হোরমানজি বামনজি ওয়াদিয়া এবং তার পুত্র বামনজি হোরমানজি ওয়াদিয়া ব্রিটিশ এজেন্সি হাউস ফরবেস এ্যান্ড কোম্পানির দালালের কাজ করতেন। সেই সাথে এই সব কোম্পানির সাথে তুলা ও আফিমের ব্যবসা করে অর্থের মালিক হয়েছিলেন। ১৮৬১ সালে শেঠ রঞ্জোদলাল ছোটেলাল আমেদাবাদ শহরে সুতিবস্ত্র কারখানা গড়ে তোলেন। এই শেঠজি পাঁচমহল জেলায় ব্রিটিশের রাজনৈতিক এজেন্ট ছিল। আমদেবাদের অপর এক শিল্পপতি বেচারদাস অম্বাইদাস চীনে আফিম বাণিজ্যে নিযুক্ত ব্রিটিশের লস্করি কোম্পানির সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। বস্ত্র শিল্পের অন্য মালিক কারিমভয়, জামসেদজি টাটা এরাও চীনে ব্রিটিশের তুলা ও আফিম বাণিজ্যের সাথে জড়িত ছিল। ১৮৭৭ সালে জামসেদজি টাটা বম্বেতে এমপ্রেস মিল নামে একটি সুতিবস্ত্র কারখানা প্রতিষ্ঠা করেন। এই সব কারখানা তৈরিতে যে যন্ত্রপাতি আমদানি হতো তা মূলত ব্রিটেন থেকেই আসতো। এইসব বস্ত্র শিল্পে যে সব কাপড় উৎপাদন হতো তা ছিল মোটা কাপড় এবং তা ব্রিটেনের ল্যাঙ্কাশায়ারের মিহি সুতিবস্ত্রের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না। এই সময়ে টাটা স্টিল মিল গড়ে ওঠে। ১৯০০ সালে ভারতের রাষ্ট্রসচিব লর্ড জর্জ হ্যামিল্টন জামসেদজি নুসেরওয়ানজি টাটাকে ইস্পাত শিল্প কেন্দ্র গড়ে তোলার প্রস্তাব করেন এবং রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা প্রদানের প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন। সেই মোতাবেক ১৯০৫ সালে টাটা আয়রন এ্যান্ড স্টিল কোম্পানির কারখানা নির্মাণে পদক্ষেপ নেয়। মার্কিন ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি জুলিয়ান কেনেডি সাহলিন এ্যান্ড কোম্পানি এই কারখানা নির্মাণ করার ঠিকাদারী কাজ পায়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়েই ভারতে মুৎসুদ্দি শ্রেণীকে কিছু সুবিধা প্রদানের সিদ্ধান্ত নেয় ঔপনিবেশিক সরকার। তারই প্রেক্ষিতে ১৯১৬-১৮ সালে ভারত সরকার শিল্প কমিশন গঠন করে। এই কমিশনের প্রস্তাব অনুসারে ইন্ডিয়ান ফিসক্যাল কমিশন গঠিত হয়। এই কমিশন শুল্ক বোর্ড গঠন করে এবং কিছু কিছু শিল্পের প্রসারের জন্য সরকারি সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। যে সব শিল্প এই সংরক্ষণমূলক সুবিধা পায় তার মধ্যে ছিল ইস্পাত, সুতিবস্ত্র, কাগজ, দেশলাই, ভারী রাসায়নিক দ্রব্য ও চিনি।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর বহু মাড়োয়ারি ব্যবসা সংস্থা শিল্প ক্ষেত্রে বিনিয়োগে এগিয়ে আসে। এই সময়ে বিরলা পাট, সুতিবস্ত্র, কাগজ ও অন্যান্য শিল্পে বিনিয়োগ করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে তারা ব্রিটিশ সংস্থাসমূহের এজেন্ট হিসাবে আফিমের কারবার করতো। পরে তারা হরদুৎরাই চামারিয়ার সঙ্গে একজোট হয়ে একটি সিন্ডিকেট গঠন করে ব্রিটিশের সহযোগী হিসাবে আফিম বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করতো। ঘনশ্যামদাস বিরলা নিজে কলকাতায় ইউরোপীয় সংস্থাসমূহের দালাল হিসাবে ব্যবসা শুরু করেন। বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে তারা প্রচুর অর্থ উপার্জন করে। তারা ব্রিটিশ ও জাপানি পুঁজিপতিদের মধ্যস্থ দালাল হয়েও কাজ করে। এই সময়ে কোশোরাম পোদ্দার নামে মাড়োয়ারি ব্যবসায়ী জাপানি সংস্থার প্রতিনিধি হিসাবে কাজ করে প্রচুর মুনাফা অর্জন করে। ১৯২১ সালে সিংঘানিয়া পরিবার কানপুরে একটি সুতিবস্ত্র কারখানা নির্মাণ করে। পরে তারা পাট শিল্প ও চিনি শিল্পও গড়ে তোলে। এই সিংঘানিয়া পরিবার টাটা বিরলাদের মতোই ব্রিটিশের সাথে আফিমের ব্যবসা করে প্রচুর অর্থ আয় করে। ব্রিটিশ পুঁজিপতিরা কানপুরে যে সব কারখানা স্থাপন করে সিংঘানিয়া তাদের উৎপাদিত দ্রব্য বিক্রি করার এজেন্সি পায়। যমুনা লাল বাজাজ ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়ী পরিবার। জাপানি সংস্থা মিৎসুইয়ের সঙ্গে এদের আর্থিক গাঁটছড়া ছিল। অন্যান্য জাপানি সংস্থার সাথেও তাদের ঘনিষ্ট সম্পর্ক ছিল। রুইয়া পরিবারও জাপানি সংস্থা মিৎসুইয়ের সাথে ঘনিষ্টভাবে সম্পর্কিত ছিল। ভারতের অন্যতম পুঁজিপতি ও শিল্প উদ্যোক্তা হলো গোয়েঙ্কা পরিবার। ১৯৩৪ সালে বোম্বেতে তারা একটি সুতিবস্ত্র কারখানা ক্রয় করে। কিন্তু শিল্পপতি হলেও তারা ব্রিটিশের মধ্যস্থতা থেকে সরে আসেনি। এই গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা রামদত্ত গোয়েঙ্কা ইউরোপীয় ম্যানেজিং এজেন্সি সংস্থা কেটলওয়েল বুলেন ও ল্যাঙ্কাশায়ারের সুতিবস্ত্র আমদানিকারী র‌্যালি ব্রসের দালালি করে অর্থপার্জন করতেন। ভারতের বৃহৎ মুৎসুদ্দি শ্রেণীর এক প্রতিনিধি স্যার পুরুষোত্তমদাস ঠাকুরদাস। তিনি Killick Nixon & co. Volkart Bros. সহ বোম্বের বিভিন্ন ব্রিটিশ ম্যানেজিং এজেন্সির সাথে যুক্ত ছিলেন। তিনি ফিকি (Federation of Indian chamber of commerce and indusry)র প্রতিনিধি হিসাবে লন্ডনে গোলটেবিল বৈঠকে যোগদান করেন। তাছাড়া তিনি ভারতে ব্রিটিশদের নিয়ন্ত্রিত Imperial bank of India–র পরিচালন সমিতির সদস্য ছিলেন। ভারতের আর এক মুৎসুদ্দি ও শিল্পপতি লালা শ্রীরাম ব্রিটিশ ম্যানেজিং এজেন্সিগুলোর দালালি করে প্রচুর অর্থ উপার্জন করেন।

ব্রিটিশ একচেটিয়া বুর্জোয়া শ্রেণীর পরিচালিত বিভিন্ন ম্যানেজিং এজেন্সিতে সক্রিয় ভারতীয় বিভিন্ন মুৎসুদ্দি পুঁজিপতিরা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর শিল্পে বিনিয়োগে মনোযোগী হয়। তারা যে পুঁজি সঞ্চয় করেছিল তা নিজেদের পায়ের ওপর দাঁড়িয়ে নয়, বরং বিদেশি পুঁজির সেবা করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে ভারতের বৃহৎ পুঁজি এবং ব্রিটিশপুঁজি ও ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের বন্ধন অনেক দৃঢ় হয়। ভারতের বৃহৎ পুঁজির মালিকরা তাদের ভবিষ্যৎ আশা আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটায় বোম্বে পরিকল্পনার মাধ্যমে। ১৯৪৪ সালে এই বোম্বে পরিকল্পনা প্রকাশ করা হয়। এই পরিকল্পনা প্রণয়েনের সময়ে ভারতের যে বৃহৎ পুঁজির মালিকরা যুক্ত ছিলেন তাদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিলেন স্যার জে.আর.ডি.টাটা, স্যার জিডি বিরলা, স্যার পুরুষোত্তমদাস ঠাকুরদাস, স্যার শ্রীরাম, স্যার আর্দেশির দালাল, কস্তুরভাই লালভাই প্রমুখ। এই পরিকল্পনায় ১০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা করা হয় যার মধ্যে ৭০০ কোটি টাকা বিদেশ থেকে আসবে বলে ধরা হয়। এই মনোভাব স্বাধীন বুর্জোয়া শ্রেণীর নয়, বরং দালাল বুর্জোয়া শ্রেণীর। এই পরিকল্পনায় ভারতীয় পুঁজিপতিরা বিদেশি পুঁজির দিকে তাকিয়ে ছিলেন। বোম্বে পরিকল্পনায় সামন্ততন্ত্র অবসানের কোন কথাও বলা হয়নি। বম্বে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিদেশি পুঁজি ভারতে বিনিয়োগ করাকে স্বাগত জানানোর জন্য ফিকির এক প্রতিনিধি দল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইংল্যান্ড সফর করেন। এই প্রতিনিধি দলে ছিলেন জে.আর.ডি.টাটা, জি.ডি.বিরলা, স্যার পদস্পদ সিংঘানিয়া, কস্তুরভাই লালভাই, এম.এ.এইস. ইস্পাহানি প্রমুখ।

১৯৪৭ সালে নয়া ঔপনিবেশিক ভারত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে এই বোম্বে পরিকল্পনাকারীদের ক্ষমতা আরও বৃদ্ধি পায় এবং সরকার তাদের পরিকল্পনাকে অগ্রসর করতে সর্বাত্মক সহযোগিতা করে চলে। এ সম্পর্কে অমিত ভট্টাচার্য আধুনিক ভারতের অর্থনৈতিক ইতিহাসের রূপরেখা গ্রন্থে লিখেছেন, “ভারত সরকারের শিল্প নীতি সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত (৬ এপ্রিল ১৯৪৮) সংক্রান্ত স্মারকলিপিতে স্পষ্টভাবে বলা হয় যে, ভারতে বিদেশি পুঁজি বিনিয়োগ ও উদ্যোগের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা থাকবে। ১৯৪৯ সালের অক্টোবর মাসে প্রধানমন্ত্রী নেহেরু খাদ্য, পুঁজি ও প্রযুক্তির সন্ধানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যান (Inside America)। সেখানে তিনি মার্কিন পুঁজিপতিদের আশ্বস্ত করেন এই বলে যে, ভারতে ব্যক্তি মালিকানাধীন পুঁজির বিনিয়োগে কোন প্রতিবন্ধকতা থাকবে না। বৃহৎ পুঁজিপতিরাও একইভাবে বিদেশি পুঁজিকে আমন্ত্রণ জানাতে উৎসাহী ছিল। জি.ডি.বিরলা জানালেন যে এদেশে যেহেতু যথেষ্ট পরিমাণ পুঁজির বাজার নেই তাই বাইরে থেকে পুঁজি আনতে হবে। (The path to prosperity)। টাটা সন্স-এর কর্ণধার স্যার হোমি মোদিরও মনোভাব একই রকম ছিল। ১৯৪৯-৫০ সালে Fiscal commission -এর বি.এম.বিরলা ও অম্বালাল যার ৮ জন সদস্যের দু’জন ছিলেন- বিদেশি পুঁজি বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয় (ÒWe…. would stipulate that in special cases,where the quantity of domestic production is small in relation to the total domestic demand and the indigenous industry is not likely to expand at a sufficently fast rate there should be nothing to prevent from inviting foreign capital on such terms and conditions as they may lay down”)। [অমিত ভট্টাচার্য- আধুনিক ভারতের অর্থনৈতিক ইতিহাসের রূপরেখা; পৃষ্ঠা-১৫২]।

অমিত ভট্টাচার্য আরও উল্লেখ করেন যে, “সরকারি মনোভাব প্রকাশিত হয়েছিল অর্থমন্ত্রী ড. জন মাথাইয়ের প্রথম বাজেট বক্তৃতাতে (১৯৫০-৫১)। সংসদে পেশ করা এই বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেনঃ “….এই দেশে বিদেশি পুঁজির প্রয়োজন শুধু আমাদের নিজস্ব সম্পদের পরিপূরক হিসাবে নয়, একই সঙ্গে আমাদের বিনিয়োগকারীদের মনে আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলার জন্যও”। [সূত্র- ঐ]।

ভারতের বৃহৎ পুঁজিপতি শ্রেণী সাম্রাজ্যবাদী লগ্নি পুঁজির সাথে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। তারা স্বাধীন বুর্জোয়া শ্রেণীর অংশ নয়, তারা মুৎসুদ্দি শ্রেণীর অংশ। এদের সাথে সামন্ত স্বার্থেরও গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের পরিকল্পনায় ধর্ম, বর্ণ, সম্প্রদায় নিয়ে যে বিরোধ সৃষ্টি করা হয়েছিল, সেই বিরোধকে কাজে লাগিয়েই ১৯৪৭ সালে সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ দেশীয় সামন্ত-মুৎসুদ্দি শ্রেণীর সহযোগিতায় ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি নয়া ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের সৃষ্টি করেছিল। নয়া ঔপনিবেশিক ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রে যারা রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছিল তারা সাম্রাজ্যবাদের দালাল দেশীয় সামন্ত-মুৎসুদ্দি শ্রেণীর প্রতিনিধি। আবার ১৯৭১ সালে উগ্র জাতীয়তাবাদকে কাজে লাগিয়ে সাম্রাজ্যবাদী পরিকল্পনায় যে নয়া ঔপনিবেশিক বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, সেখানেও সাম্রাজ্যবাদের দালাল দেশীয় সামন্ত-মুৎসুদ্দি শ্রেণী রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন হয়। এখনও তারই ধারবাহিকতা বহন করে চলেছে।

সাম্রাজ্যবাদের সৃষ্ট এই সামন্ত-মুৎসুদ্দি শ্রেণী কখনও অসাম্প্রদায়িক ধর্ম নিরপেক্ষ, প্রগতিশীল জাতীয়তাবাদী এর কোনটাই হতে পারে না। সামন্ত-মুৎসুদ্দি শ্রেণী সাম্রাজ্যবাদী প্রভুর পরিকল্পনা মোতাবেক দেশের শ্রমিক কৃষক জনগণের শ্রেণী সংগ্রাম, জাতীয় সংগ্রামকে বিপর্যস্ত করার জন্যই ধর্ম, বর্ণ, সম্প্রদায়, উগ্র জাতীয়তাবাদ ইত্যাদি প্রতিক্রিয়ার মতাদর্শ ব্যবহার করে জনগণকে বিভ্রান্ত ও বিভক্ত করে সাম্রাজ্যবাদী প্রভুর স্বার্থ ও নিজেদের শ্রেণী স্বার্থ, গোষ্ঠী স্বার্থ উদ্ধার করে থাকে। ১৯৪৭ এর পর নয়া ঔপনিবেশিক পাকিস্তান রাষ্ট্র তো খোলাখুলিভাবে সাম্প্রদায়িকতাকে সামনে আনে। আর নয়া ঔপনিবেশিক ভারত রাষ্ট্র সর্বভারতীয় জাতীয়তাবাদের নামে সাম্প্রদায়িকতাকে ব্যবহার করে চলে। যার কারণে ভারতীয় উপমহাদেশ জুড়ে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাস্পে গোটা অঞ্চলের জনজীবনকে ক্ষতবিক্ষত করে। সেই সময়ে সাম্প্রদায়িক অপশক্তির শিকার হয়ে গোটা উপমহাদেশের প্রায় দুই কোটি মানুষ গৃহহারা, সহায় সম্পদ হারা হয়ে দেশান্তরি হতে বাধ্য হন। এর পরও বাংলাদেশের শাসক শোষক শ্রেণীর একাংশ নয়া ঔপনিবেশিক ভারতকে অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক বলে বর্ণনা করে নিজেদের গোষ্ঠীস্বার্থ উদ্ধারে জনগণকে বিভ্রান্ত করে চলেছে।

বাংলাদেশ নিয়েও শাসক শোষক শ্রেণীর মধ্যে চলছে বিভ্রান্তি। শাসক শোষক শ্রেণীর একাংশ নিজেরা ক্ষমতায় থাকলে বাংলাদেশ অসাম্প্রদায়িক আর তার প্রতিপক্ষরা ক্ষমতায় আসলে বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক বলে প্রচার করে থাকেন। এর কোন বস্তুগত ভিত্তি নেই। বাংলাদেশের নাগরিকদের সরকারি বেসরকারি কোন কাজে কোন আবেদনপত্র করতে হলে আবেদনে ধর্মীয় পরিচয়, বর্ণের পরিচয় উল্লেখ করতে হয়। বাংলাদেশ এমন একটি রাষ্ট্র যেখানে দেশের প্রতিটি নাগরিকের যেমন সাম্প্রদায়িক ও বর্ণগত পরিচয় রয়েছে, তেমনি রাষ্ট্রেরও একটি ধর্ম রয়েছে। বাংলাদেশের রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম। গণতান্ত্রিক অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে রাষ্ট্রেরও যে একটি ধর্ম থাকে- এ এক বিষ্ময়ই বটে। ইসলাম ধর্ম বাদেও অন্যান্য ধর্মের অনুসারি বিপুল সংখ্যক জনগণ এদেশে বাস করে। ইসলামে রাষ্ট্র ধর্ম হিসাবে ঘোষণা করা ও বহাল রাখা এদেশে বসবাসকারী ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জন্য যেমন বৈষম্যমূলক তেমনি অমর্যাদাকরও বটে। বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে শাসক শোষক গোষ্ঠীর ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে। শাসক শোষক শ্রেণীর বিভিন্ন অংশ বিভিন্ন সময়ে তাদের স্বার্থে সংবিধান সংশোধন করলেও এই রাষ্ট্র ধর্ম সংক্রান্ত ধারাটি সংবিধান থেকে বিলোপ করেনি বরং এটিকেই ব্যবহার করে চলেছে।

উপমহাদেশের বিভিন্ন দেশে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান সম্প্রতি বিশেষভাবে সামনে আনা হচ্ছে। পাকিস্তান থেকে শুরু করে ভারত বাংলাদেশ কোন রাষ্ট্রই এই অশুভ চক্রের আওতার বাইরে নয়। পাকিস্তানে সংখ্যালঘু শিয়া সম্প্রদায়ের ওপর হামলা বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। নয়া ঔপনিবেশিক ভারত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই সাম্প্রদায়িক হানাহানি এখানকার নিয়মিত ঘটনা। প্রতি বছরই দেশের বিভিন্ন স্থানে শত শত ছোট বড় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সংঘটিত হচ্ছে, আর এই সব দাঙ্গায় হাজার হাজার নিরীহ মানুষের প্রাণ যাচ্ছে। আমাদের বাংলাদেশও এই তৎপরতা মুক্ত নয়। বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন মহাজোট সরকার নিজেদের অসাম্প্রদায়িক শক্তি বলে প্রচার করে। তাদের শাসনকালেও এদেশে সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস বৃদ্ধি পেয়েছে। বিগত সময়ে চট্টগ্রামে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া হিন্দু সম্প্রদায়ের ঘরবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় স্থানে হামলা এখনও ঘটে চলেছে।

ক্ষমতাসীন মহাজোট সরকার ও তার পেটুয়া বুদ্ধিজীবী, কলাম লেখকদের পক্ষ থেকে সম্প্রতি খুব জোর প্রচার করা হচ্ছে, বাংলাদেশ ও ভারতে অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র এবং সরকার প্রতিষ্ঠিত রয়েছে; আর পাকিস্তান একটি সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র। তাদের এই বক্তব্যের ভিত্তিতেই তাদের যুক্তির বিচার করা দরকার। পাকিস্তান খোলাখুলিভাবেই সাম্প্রদায়িকতার পক্ষে অবস্থান নেয়। পাকিস্তান সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র তাদের এই বক্তব্যকে মেনে নিয়েই অগ্রসর হতে চাই। তাই পাকিস্তানের সাম্প্রদায়িকতা প্রসঙ্গে এখানে আলোচনা নিষ্প্রয়োজন বোধ করছি। কিন্তু বাংলাদেশ ও ভারতকে অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার যে প্রয়াস চলছে তা আলোচনা করা আবশ্যক। ক্ষমতাসীন শাসক শোষক গোষ্ঠী এই রাষ্ট্রকে শুধু অসাম্প্রদায়িক বলছে না, এই দুই রাষ্ট্রে ক্ষমতাসীন সরকারকে অসাম্প্রদায়িক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াস চালাচ্ছে। আমরা পাকিস্তানকে বাদ দিয়ে এই দুই রাষ্ট্র সম্পর্কে আলোচনা করতে চাই, তার কারণ হচ্ছে শাসক শোষক গোষ্ঠীর এতদ সংক্রান্ত বক্তব্যের সাথে আমাদের ভিন্নমত রয়েছে। শাসক শোষক গোষ্ঠী জনগণের সামনে যে অসত্য বার্তা দিচ্ছে তার মুখোশ উন্মোচন করা এদেশের গণতান্ত্রিক শক্তির দায়িত্বও বটে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরের পর থেকেই ক্ষমতাসীন মহাজোট সরকারের এই অপপ্রচার আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। নয়া ঔপনিবেশিক ভারত প্রতিষ্ঠার পর থেকে ভারতে দীর্ঘ সময় ধরে কংগ্রেসের শাসন প্রতিষ্ঠিত ছিল। ভারতে কিছু সময়ের জন্য বিজেপি সরকার ক্ষমতায় ছিল। জনতা পার্টি বা বিভিন্ন দলকে নিয়ে কোয়ালিশন সরকার কয়েকবার ক্ষমতায় আসলেও তাদের ক্ষমতার মেয়াদ মোটেও উল্লেখযোগ্য কিছু নয়। ভারতের রাজনীতিতে কংগ্রেস নিজেদের ধর্ম নিরপেক্ষ শক্তি হিসাবে পরিচিত করতে চায়। অবশ্য তাদের এই ধর্ম নিরপেক্ষতার বুলি কতটা শুদ্ধ তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এর বিপরীতে বিজেপি খোলাখুলি হিন্দুত্ববাদের প্রচার করে থাকে। বিজেপি বা সংঘ পরিবার তার প্রতিষ্ঠার পর থেকেই নিজেদের হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক শক্তি হিসাবে প্রতিষ্ঠার প্রয়াস অব্যাহত রেখেছে। ভারতের লোকসভা নির্বাচনের আগেও বিজেপি ও তার সংঘ পরিবার হিন্দুত্ববাদ পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেই ভোটারদের কাছে ভোট প্রার্থনা করে।

নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি সরকার গঠন করার পরও তারা হিন্দুত্ববাদের কর্মসূচি বন্ধ করেনি বা তাদের এই কর্মসূচি থেকে সরে আসারও কোন প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেনি। বরং বিজেপি ও তার মূল পৃষ্ঠপোষক সংঘ পরিবার এই হিন্দুত্ববাদী কর্মসূচি আরও বহুগুণ বৃদ্ধি করেছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতার আসার পর রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ (আরএসএস) এবং তাদের সংঘ পরিবারের অন্যান্য দল বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, বজরং দল ইত্যাদির মাধ্যমে ‘ঘরওয়াপসি’ কর্মসূচি গ্রহণ ও তা বাস্তবায়নের কৌশল গ্রহণ করে চলেছে। এই ‘ঘরওয়াপসি’ কর্মসূচি হচ্ছে ভারতে বসবাসকারী বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষদের বল প্রয়োগে, প্রলোভন দেখিয়ে বা ছলে বলে কলে কৌশলে হিন্দু ধর্মে ধর্মান্তরিত করার কর্মসূচি। বিগত লোকসভা নির্বাচনে জয়ের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় এসেই তিনি ঘোষণা করেছিলেন ‘ঘরওয়াপসি’ কর্মসূচি হচ্ছে ঘরে ফেরার কর্মসূচি। তার মতে ভারতের সব লোকই হিন্দু। তাদের ওপর জুলুম করে মুসলমান ও খ্রিষ্টানরা তাদের ধর্মান্তরিত করেছে। তিনি এই ধর্মান্তরিত লোকদের সবাইকে হিন্দু ধর্মের কাঠামোর মধ্যে ফিরিয়ে আনার অভিপ্রায়ে এই কর্মসূচি।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির এই ‘ঘরওয়াপসি’ কর্মসূচি ঘোষণার পর ধর্মান্তকরণ শুরু হলে ভারতের অভ্যন্তরে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। ভারতের বাইরেও এই কর্মসূচির বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এই প্রেক্ষাপটে নরেন্দ্র মোদি আর কোন কথাবর্তা না বলে তার জোটসঙ্গীদের দিয়ে এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের কৌশল গ্রহণ করেন। এত সব ঘটনার পরও নরেন্দ্র মোদি এই কর্মসূচির বিরুদ্ধে আজও একটি কথাও বলেন নাই বা ভারতীয় সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক এই কর্মসূচির বিরুদ্ধে কোন আইনগত পদক্ষেপও গ্রহণ করেন নাই। নরেন্দ্র মোদি এবং তার দল বিজেপি’র এই উগ্র সাম্প্রদায়িত চরিত্র এবং তার বহিঃপ্রকাশ এই প্রথম নয়। নরেন্দ্র মোদি গুজরাট রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হবার পর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ঘটিয়েছিলেন। এই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় শত শত মুসলিম নিহত হয়েছিলেন, দাঙ্গাকারীদের আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে হাজার হাজার মানুষ আশ্রয় শিবিরে আশ্রয় গ্রহণে বাধ্য হয়েছিলেন। প্রভু সাম্রাজ্যবাদীদের সমর্থন ও ভারতের মুৎসুদ্দি পুঁজির সহযোগিতা নিয়ে নরেন্দ্র মোদি এই মামলা থেকে রেহাই পেলেও তার হাত থেকে এই রক্তের দাগ এখনও মুছে যায়নি।

বিজেপি ক্ষমতায় এসে দলের শীর্ষ নেতারা এমনকি মন্ত্রীরা পর্যন্ত বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক উসকানিমূলক মন্তব্য করে চলেছেন। তাদের এই সব মন্তব্যের কারণে দেশে বিদেশে সমালোচিত হলেও দলের ভিতরে তাদেরকে কোন জবাবদিহিতা করতে হচ্ছে না। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংহ সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে গরু পাচার সমস্যা নিয়ে তার এক বক্তব্যে বলেছেন যে, বাংলাদেশের মানুষ যাতে গরু খেতে না পারে তার ব্যবস্থা করতে হবে। শুধু রাজনাথ সিংহ নয়, এই গরু খাওয়া নিয়ে ভারতে এক ঘৃণ্য রাজনীতি চলছে। সংখ্যলঘু বিষয়ক মন্ত্রী মোক্তার আব্বাস নাকভি আর এক ধাপ উঁচুতে উঠে মন্তব্য করেছেন, যারা গরু খায় তারা যেন পাকিস্তানে চলে যায়। আবার স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এই সব মন্তব্যের প্রতিবাদ করেছেন। এখানে উল্লেখ্য ভারতে হিন্দু ধর্মাবলম্বী বাদেও আরও বহু ধর্মের লোক বাস করে; যাদের অনেকেই গো মাংস ভক্ষণ করে থাকে। ভারতের মুৎসুদ্দি শ্রেণীর মূল অংশগুলো ভারত রাষ্ট্রে বিচ্ছিন্নতার সমস্যা নিয়ে বড়ই উদ্বিগ্ন। ভারতের মুৎসুদ্দি শ্রেণী বেপরোয়া লুটপাটের স্বার্থেই ভারতের অখন্ডতা টিকিয়ে রাখার পক্ষে অনমনীয় অবস্থান গ্রহণ করে থাকে। এই অখন্ডতাকে টিকিয়ে রাখার লক্ষ্যে অতীতে ভারতের সামন্ত-মুৎসুদ্দি শ্রেণী সর্ব ভারতীয় জাতীয়তাবাদের এক জগাখিচুড়ি তত্ত্ব প্রচার করতো। এই তত্ত্বের অসারতা জনগণের সামনে উন্মোচিত হয়ে যাওয়ায় এখন ভারতের সামন্ত-মুৎসুদ্দি শ্রেণী রাষ্ট্রের অখন্ডতাকে টিকিয়ে রাখার লক্ষ্যে সামনে আনছে হিন্দুত্ববাদ বা উগ্র সাম্প্রদায়িকতার তত্ত্ব।

বিগত ১৯৪৭ সালে সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতেই ভারতবর্ষকে বিভক্ত করে ভারত ও পাকিস্তান নামক দুটি নয়া ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র সৃষ্টি করেছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ। এর আগে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ভারতে ১৯০ বছরের ঔপনিবেশিক শাসন চালায়। এই ঔপনিবেশিক শাসন আমলে ব্রিটিশরা তাদের ঔপনিবেশিক স্বার্থে, উপনিবেশের জনগণের জাতীয় মুক্তির আন্দোলণকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে সাম্প্রদায়িকতাকে চাঙ্গা করে। ঔপনিবেশিক শক্তি ভারতবর্ষে জাতি, ধর্ম, বর্ণ ইত্যাদি ইত্যাদি প্রশ্নে জনগণের স্তরে যে সব অবৈরি দ্বন্দ্ব ছিল সেগুলোকে চাঙ্গা করে জনগণের স্তরে বিভেদ বিভ্রান্তি বিভক্তি বৃদ্ধি করে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মূল সহযোগী হয় ভারতবর্ষের সামন্ত-মুৎসুদ্দি শ্রেণী। ভারতের এই সামন্ত-মুৎসুদ্দি শ্রেণী ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ সৃষ্ট এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক স্বার্থের সাথে তাদের স্বার্থ ছিল এক ও অভিন্ন বন্ধনে আবদ্ধ। ভারতবর্ষে মুৎসুদ্দি পুঁজির বিকাশের প্রেক্ষিতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ দীর্ঘস্থায়ী ঔপনিবেশিক স্বার্থ বিবেচনায় রেখে ভারতে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ নামক সামন্ত-মুৎসুদ্দি শ্রেণীর দুটি রাজনৈতিক দল সৃষ্টি করে। এই দুটি রাজনৈতিক দল যে শুধু ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের সৃষ্ট তাই নয়, এরা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের দ্বারা সম্পূর্ণরূপে নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত ছিল।

বিগত ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ নয়া ঔপনিবেশিক ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের শাসনভার কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের হাতে অর্পণ করে।  মুসলিম লীগ পাকিস্তানের সমগ্র জনগণের ওপর শাসন শোষণ পরিচালনার জন্য অত্যন্ত খোলাখুলিভাবে সাম্প্রদায়িকতাকে সামনে আনে।  আর ভারতের কংগ্রেস সর্ব ভারতীয় জাতীয়তাবাদের উদ্ভট তত্ত্বের আড়ালে সাম্প্রদায়িকতাকে কাজে লাগাতে থাকে। নয়া ঔপনিবেশিক দুই রাষ্ট্রেই সাম্রাজ্যবাদী লগ্নি পুঁজির শোষণ লুণ্ঠন অব্যাহত থাকে এবং সাম্রাজ্যবাদের সৃষ্ট জনগণের মধ্যেকার বিভেদ সৃষ্টির নীতিকে কাজে লাগিয়ে দুই দেশের সামন্ত-মুৎসুদ্দি শ্রেণী তাদের শোষণ শাসন অগ্রসর করে চলে।  কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের স্তরে শ্রেণী সচেতনতা ও শ্রেণী সংগ্রামের তীব্রতা বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে সাম্রাজ্যবাদীরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। তাছাড়াও আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্ব সংঘাতের কারণেও সাম্রাজ্যবাদী প্রভুরা এদেশের উদীয়মান সামন্ত-মুৎসুদ্দি শ্রেণীকে তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজে লাগাতে তৎপর হয়ে ওঠে। সাম্রাজ্যবাদীরা মুসলিম লীগ থেকে একটি অংশকে আলাদা করে প্রথমে আওয়ামী মুসলিম লীগ ও পরে আওয়ামী লীগ সৃষ্টি করে এবং এদেরকে এদেশের রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত করার পরিকল্পনা করে অগ্রসর হয়। সাম্রাজ্যবাদী প্রভুরা এদেরকে দিয়ে উগ্র বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ সামনে আনে।

সাম্রাজ্যবাদীরা এদেশে জনগণের স্তরে বিভেদ বিভ্রান্তি বিভক্তি বৃদ্ধির লক্ষ্যেই সাম্প্রদায়িকতা ও উগ্র জাতীয়তাবাদ এই দুই শক্তিকেই কাজে লাগতে থাকে। সাম্রাজ্যবাদী প্রভুরা যখন যে শক্তিকে যেভাবে প্রয়োজন সে ভাবেই কাজে লাগিয়ে চলেছে; কখনও তারা সাম্প্রদায়িকতাকে সামনে আনছে আবার কখনও উগ্র জাতীয়তাবাদকে। সামন্ত-মুৎসুদ্দি শ্রেণীর একটি অংশ নামে জাতীয়তাবাদী হলেও সাম্প্রদায়িকতা থেকেই এদের উদ্ভব এবং এরা কখনওই সাম্প্রদায়িকতা মুক্ত নয়। এই অংশটি সাম্প্রদায়িকতাকে অতি সূক্ষ্ম কৌশলে কাজে লাগিয়ে থাকে। এই উপমহাদেশের সামন্ত-মুৎসুদ্দি শ্রেণী যে কারণে ১৯৪৭ সালে প্রগতিশীল জাতীয়তাবাদী হতে পারেনি সেই কারণ আজও দূরীভূত হয়নি। আমাদের দেশের সামন্ত-মুৎসুদ্দি শ্রেণীর রাজনৈতিক শক্তির একটি অংশ এবং তাদের পক্ষের পেটুয়া বুদ্ধিজীবী ও কলাম লেখকেরা নিজেদের বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদী ও অসাম্প্রদায়িক শক্তি হিসাবে জাহির করতে বড়ই তৎপর। কিন্তু কী কারণে এই সামন্ত-মুৎসুদ্দি শ্রেণী ১৯৪৭ সালে বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদী হতে পারলো না, সাম্প্রদায়িক হয়ে সাম্প্রদায়িকতার প্রেক্ষিতে দেশ বিভাগে ভূমিকা রাখলো আবার কী কারণে যে তারা হঠাৎ করেই বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদী হয়ে গেল তার কোন ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ অবশ্য এই সব বুদ্ধিজীবী ও কলাম লেখকেরা দিচ্ছেন না।

একইভাবে এই বুদ্ধিজীবী ও কলাম লেখকেরা বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, বাংলাদেশকে একটি জাতীয় রাষ্ট্র হিসাবে প্রমাণিত করার চেষ্টায় বস্তা বস্তা কাগজ লিখে চলেছেন। আমাদের প্রতিবেশী ভারত রাষ্ট্রেও আমাদের দেশের জনসংখ্যার প্রায় সম সংখ্যক বাঙ্গালী জনগোষ্ঠী বসবাস করছেন। বাঙ্গালী জাতীয়তার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত এই রাষ্ট্র থেকে তারা কেন বাইরে থাকলো, তারা কোন বাঙ্গালী আর আমরা কোন বাঙ্গালী, এই দুই দেশের বাঙ্গালীদের মধ্যে কোন পার্থক্য আছে কি না সে সম্পর্কের কিছু আলোকপাত করছেন না। এই সমস্ত পেটুয়া বুদ্ধিজীবী ও কলাম লেখকেরা এই সকল প্রশ্নে একবারেরই নীরব। এর কারণ দেশবাসীর সামনে খোলাসা করবেন কী! সাম্রাজ্যবাদী দেশের একচেটিয়া পুঁজি ও এদেশের মুৎসুদ্দি পুঁজির স্বার্থ রক্ষাকারী এইসব বুদ্ধিজীবী ও কলাম লেখকরা এদেশ নিয়ে সাম্রাজ্যবাদীদের ষড়যন্ত্র চক্রান্ত কোন অবস্থাতেই ফাঁস করবেন না। বরং সাম্রাজ্যবাদীদের এই ষড়যন্ত্র চক্রান্ত জনগণের সামনে আড়াল করে ও এই সব ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নে সহযোগিতা করে লগ্নি পুঁজির ছুড়ে দেওয়া উচ্ছিষ্ট ভক্ষণ করে কিভাবে নিজেদের শ্রীবৃদ্ধি ঘটানো যায় সেই চিন্তাতেই তারা সদা মগ্ন।

সাম্প্রদায়িকতা ও জাতীয়তাবাদ এর কোনটাই আকাশ থেকে খসে পড়া উল্কা পিন্ডের মতো কোন বস্তু নয়; যে কেউ একে খুঁজে পেল, নিজেদের হস্তগত করলো আর এর মালিক হয়ে গেল এই রকম কোন বস্তু নয়। এর মূল ভিত্তি নিহিত থাকে সমাজের প্রচলিত অর্থনৈতিক জীবনে বা সমাজ কাঠামোর মধ্যে। যে কোন সমাজের প্রচলিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যে রকমের হবে তার ওপর ভিত্তি করেই গড়ে ওঠে তার মতাদর্শ। সামন্ত সমাজের অর্থনৈতিক ভিত্তির কারণে তার মতাদর্শগত ভিত্তি হলো ধর্ম বা সাম্প্রদায়িকতা। আর বুর্জোয়া শ্রেণীর মতাদর্শ হলো জাতীয়তাবাদ। জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে বুর্জোয়া শ্রেণী বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করেছে এবং জাতীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছে। বাংলাদেশসহ আমাদের উপমহাদেশের কোন দেশেই স্বাধীন বুর্জোয়া শ্রেণীর বিকাশ হয়নি। ঔপনিবেশিক ব্যবস্থা টিকে থাকার কারণে এ অঞ্চলে বিকাশ ঘটেছে মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া শ্রেণীর। তাই এতদঞ্চলে বুর্জোয়া শ্রেণী রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করতে পারেনি এবং জাতীয় রাষ্ট্রও গঠন করতে পারেনি। সাম্রাজ্যবাদের সৃষ্ট সামন্ত-মুৎসুদ্দি শ্রেণীই এতদঞ্চলের দেশগুলোতে রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে। যার কারণে এই সব দেশের শাসক শোষক শ্রেণী সাম্প্রদায়িকতাকে ত্যাগ করতে পারেনি ও সুষ্ঠু প্রগতিশীল জাতীয়তাবাদী চিন্তা চেতনার বিকাশ ঘটাতে পারেনি।

বাংলাদেশসহ এতদঞ্চলের দেশগুলোতে সাম্প্রদায়িক শক্তির তৎপরতা বৃদ্ধি ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ড চালানোর পিছনে ক্রিয়াশীল রয়েছে সাম্রাজ্যবাদী পরিকল্পনা ও তার সাথে শাসক শোষক শ্রেণীর স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রশ্ন। আর এই সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে যুক্ত শাসক শোষক শ্রেণীর বিভিন্ন অংশ। কিন্তু বাংলাদেশে কিছু সংখ্যক বুদ্ধিজীবী, সুশীল সমাজ ও কলাম লেখকেরা এই প্রতিষ্ঠিত সত্যকে অস্বীকার করতে চায়। তারা শাসক শোষক শ্রেণীর একটি অংশ অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল জাতীয়তাবাদী শক্তি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। তারই সমর্থনে যতসব বস্তাপচা তত্ত্ব হাজির করে জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। সেই সাথে তারা ভারতকে অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র ও ভারতের প্রধানমন্ত্রীর অসাম্প্রদায়িক ভাবমূর্তি তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। নরেন্দ্র মোদি কিভাবে কখন খ্রিষ্টান সম্পদায়কে বড় দিনের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন, মুসলিম সম্প্রদায়কে রমজানের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন ইত্যাদি ইত্যাদি বক্তব্য তুলে ধরছেন। মোদি বাংলাদেশ সফরে কিভাবে জঙ্গিবাদ সন্ত্রাসবাদ মৌলবাদ বিরোধিতার কথা বলেছেন সেই সব বিষয়ের অবতারণা করে তাকে অহিংসার দেবদূত বানানোর চেষ্টা করছেন।

এই সব ভাড়া খাটা বুদ্ধিজীবী আর কলাম লেখকদের নিকট থেকে এর থেকে আর বেশি কিছু আশা করা যায় না। যাদের টাকায় তাদের উদর পূর্তি হয়, ভোগ বিলাস চলে তাদের স্বার্থে কলম না ধরে এরা পারেই না। শাসক শোষক শ্রেণীকে একদিকে তারা অসাম্প্রদায়িক হিসাবে তুলে ধরছেন, আবার এই সব দেশে সাম্প্রদায়িক শক্তির অস্তিত্বকে ও তার সন্ত্রাসী তৎপরতার বিরুদ্ধেও কথা বলছেন। শাসক শোষক শ্রেণী যদি অসাম্প্রদায়িক হয়ে থাকে তবে এতদঞ্চলে সংঘটিত সাম্প্রদায়িক হানাহানির জন্য দায়ী কে? তাহলে এতদঞ্চলের জনগণ কী সাম্প্রদায়িক হয়ে গিয়েছে! জনগণই কী সাম্প্রদায়িকতার বিস্তার ঘটাচ্ছে! সাম্রাজ্যবাদ ও তার দালালদের সেবাদাস এই ভাড়া খাটা বুদ্ধিজীবী ও কলাম লেখকরা সাম্প্রদায়িক হানাহানি বিস্তারের জন্য শাসক শোষক শ্রেণীকে দায়মুক্তি দিয়ে জনগণের ওপর এই দায়ভার চাপাচ্ছেন। এটা হলো এই কলাম লেখকদের প্রতিক্রিয়াশীল ভূমিকা। তারা নিজেদের প্রগতিশীল বোল চালের আড়ালে জনগণ যাতে তাদের প্রকৃত শত্রুকে চিহ্নিত করতে না পারে সেই প্রতিক্রিয়াশীল ভূমিকাই পালন করে চলেছেন।

সুত্রঃ 

13076745_715535491921699_3304914592563662269_n