মাওবাদী অধ্যুষিত সুকমা জেলায় IED বিস্ফোরণে খতম পুলিশ জওয়ান

1_1462236323

মাওবাদী অধ্যুষিত ছত্তিশগড়ের সুকমা জেলায় জোড়া বিস্ফোরণ৷ বিস্ফোরণে নিহত হয়েছে ডিসট্রিক্ট রিজার্ভ গ্রুপের এক জওয়ান৷

সুকমার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইরফান খান বলেন, ‘‘সোমবার সকাল ১১টা ৪৫ মিনিট নাগাদ মারাইগুড়া থানার কাছে মারাইগুড়া-গোলাপাল্লি রোডের উপর প্রথম বিস্ফোরণটি ঘটে৷ ঘটনার সময় এলাকায় টহল দিচ্ছিল সিআরপিএফ এবং ডিআরজি’র জওয়ানরা৷ সেই সময় রাস্তায় পুঁতে রাখা আইইডি’র উপর পা পড়ে যান অ্যাসিস্ট্যান্ট কনস্টেবল মাদক জোগার৷ গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়৷ সেখান থেকে তাঁকে তেলেঙ্গানায় বদলি করা হলে, সেখানেই মৃত্যু হয় তাঁর৷

সুত্রঃ http://www.bengali.kolkata24x7.com/jawan-killed-in-ied-blast.html

Advertisements

দলিত আইনের ছাত্রী জিসা’র পাশবিক ধর্ষণ ও হত্যার প্রতিবাদে নকশালপন্থী DSU এর নিন্দা

Perumbavoor-Jisha-photos-latest-News-568x700

Let us forge a revolutionary unity to smash Brahmanical Patriarchy and casteism!

While the horror of the institutional rape and murder of Dalit student Delta Meghwal is still fresh in our memory, yet in another instance on April 28 a young Dalit law student was attacked brutally, gang raped and murdered in Ernakulam district, Kerala. The sheer extent of barbaric brutality is revealed by the post-mortem report which suggests that Jisha was tortured severely by the accused using a sharp weapon that pulled out her intestines. There were over 30 injury marks on her body. Two sides of her chest were found to be mutilated, and her vagina was penetrated with an iron rod and her body had a fatal injury on her head.

The heinous gang-rape and murder of Dalit student Jisha has once again exposed the Brahmanical Hindutwa Patriarchy which treats women as an object to be oppressed, mutilated and silenced. It reflects a society which has no space for Dalits, Adibasis, Muslims, oppressed gender, oppressed sexualities. Police never investigated the repeated appeal and complaints of Jisha earlier when she received numerous threats of murder by her neighbour which she brought to notice of police.

In the entire incident police has remained a mute spectator and by their sheer indifference has allowed this incident to take place. Instead of taking proper action, now police has started witch hunting the Assamese migrant labours who come to Kerala as day wage labourers.The very fact that corporate media which leaves no stone unturned in profiling Dalits, women, Muslims, Adibasis ,all oppressed communities, students and teachers , human rights activists, political prisoners etc has maintained a criminal silence on such a grave issue is also reflection of the larger Brahmanical and corporate control of these institutions, where the voices and concerns of oppressed and marginalised are ignored, curbed and sidelined. It was only after weeks when the voices of protest grew stronger the corporate media was forced to cover this news.

In a true reflection of opportunist and regressive character of revisionist left, CPI(M) also ignored and offered a deaf ear to Jisha’s mother’s cry for help from local CPI(M )-MLA to build a safe shelter for her and her daughter. The sky piercing slogans and claims raised by SFI that Jisha was from SFI only adds insult to this injury. On the other end, the killer of Rohith Vemula and Akhlaq, the fascist saffron forces like RSS-BJP and their stooges like ABVP, who have deliberately maintained silence on Delta Megwal’s rape, are busy shedding their crocodile tears in name of justice for Jisha.

The sheer brazenness and impunity of such act shows us how women from marginalised section under this Brahmanical social order are robbed of their right to life dignity and livelihood and reduced to a disposable entity. The tragic death of Jisha shows the systemic denial and indifference of the entire Brahmanical Hindu Fascist State machinery raging from police to media to the local MLA is towards the concerns of oppressed and the marginalised. These are not isolated and separate sporadic incidents of caste and gender atrocity, but are the reflections and continuations of a thousand year old history of Brahmanical Hinduism which has now conjoined with the majoritarian Indian State and its imperialist masters to emerge as Brahmanical Hindutva Fascism. But this oppression is not the only reality. The valiant history of resistance against this structural violence is also a reality. DSU strongly condemns the brutal rape and murder of Dalit law student Jisha and demands the culprits to be punished. It is not the grand rhetoric or opportunistic alliances, but only the united and uncompromising struggle among the oppressed which can only bring annihilation of caste and class and can break the shackles of Brahmanical patriarchy!


তুরস্কের বিপ্লবীদের জোট ‘HBDH’ ৪ ফ্যাসিবাদী পুলিশকে খতম করেছে

hbdh-amblem (1)

অনুদিতঃ 

তুরস্কের মাওবাদী, পিকেকে ও অন্যান্য বিপ্লবীদের জোট Peoples’ United Revolution Movement (HBDH) এক বিবৃতিতে, গত ৬ই মে তারিখে বিকেল প্রায় ৪.৩০টায় Giresun এর Çaldağ অঞ্চলে পুলিশের কাজে নিযুক্ত সৈন্য ঘাঁটি বিরুদ্ধে চালানো সশস্ত্র অ্যাকশনের দায়িত্ব স্বীকার করেছে।

HBDH বলেন, যে বেস কমান্ডারকে উদ্দেশ্য করে এই হামলা চালানো হয়েছে, সে অ্যাকশনের সময় গুরুতর আহত হয় এবং পরে হাসপাতালে মারা যায়, এছাড়া আরো ৩ জন সশস্ত্র পুলিস নিহত হয় এবং আরো জোর দিয়ে বলেন যে, বেসামরিক নাগরিকদের উপর ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রীয় বাহিনীর নীতি বাস্তবায়নের বিরুদ্ধে অনুরূপ আরো সশস্ত্র অ্যাকশন চালানো হবে।  সুর, সিজরে, সিরনাক, নুসাইবিন ও গেভের এ তুর্কি রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়াশীল কার্যকলাপের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ হিসেবে এই আক্রমণ চালানো হয়।

HBDH তাদের এই অ্যাকশনটি বিপ্লবী কমরেড Deniz Gezmiş এবং Azad Siser প্রতি উৎসর্গ করেন এবং এই মে মাস মাহির হুসাইন ইব্রাহিম, খাকি ও কামালসহ বিপ্লবী শহীদের মাস হিসেবে উল্লেখ করেন।

সর্বশেষে, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার জন্যে HBDH এর আন্দোলনে যোগ দিতে তুরস্কের তরুণ যুবকদের প্রতি আহবান জানানো হয়।


আন্তর্জাতিক সাপ্তাহিক পদক্ষেপ-ICSPWI এর বিবৃতি

brazil-anti-ogh

ICSPWI salutes the success of the International action week in various countries in the world.It is important that many workers, youth, women, people have directly participated with the spirit of international solidarity with political prisoners in the jails of Modi’s regime. It is important that many Maoist, revolutionary and anti-imperialist organizations have organized different kind of actions according to the conditions and the level of the possibility in every country. A bulletin will be realized in this month with reports and infos..

The wind of this IAW arrives in India and the Indian people involved in revolutionary struggle and in the the people’s war is encouraged in the epochal struggle for a New Democratic Revolution. Now we need for the initiatives to continue particularly against Green Hunt and Aerial attacks against the people. In some universities in Europe there has been advanced the ICSPWI proposal to invite Indian democratic representatives of associations and people’s organization in the next months.

We need in the same time to develop analysis of concrete situation for preparing a new wave of international support, for extending mass mobilization against Indian regime and imperialist states that have close relations with the Indian regime. We need an antifascist and anti-imperialist alliance with all that are available in this new wave.

For this a series of talks will be realized in the next weeks and months, particularly in Europe in June-July, in Latin America in October:

Other new proposals can be sent to ICSPWI that will send them to all solidarity movement.

Unconditional freedom for all political prisoners in India!

Stop Green Hunt, the war and aerial attacks on the people!

Support the People’s war in India!

ICSPWI

icsgpindia@gmail.com

7th May 2016


ফেসবুক সেন্সরশীপ বিরুদ্ধে প্রতিবাদ

13174143_562998323881740_7823170377384450859_n

কুর্দিদের উপর ফেসবুকের সেন্সরশিপের প্রতিবাদে ফেসবুক সদর দপ্তরে কুর্দিরা প্রতিবাদ বিক্ষোভ দেখিয়েছে।  ফেসবুক এরদোগানের তুরস্কের রাষ্ট্রের সঙ্গে একটি ঘৃণ্য চুক্তি করেছেন।

চুক্তিটি হচ্ছে, ফেসবুকে কুর্দি সম্প্রদায়, পিকেকে ও এর প্রতিষ্ঠাতা আবদুল্লাহ ওকালানের সংশ্লিষ্ট কোন পোষ্ট করতে অনুমতি দেওয়া হবে না।  অথচ,  আইএসআইএস/ আলনুসরা এর ভিডিও বা শিরশ্ছেদ ছবি পোস্ট করার অনুমতি দেওয়া হয়।

কুর্দিরা বলছেন,  আমরা অত্যাচারিত হচ্ছি এবং কুর্দিস্তানে আমাদের বাড়ি জমি হারাচ্ছি,  এমনকি এখন আমরা সোশ্যাল মিডিয়া বা ইন্টারনেটের মাধ্যমে আমাদের নিজেদের প্রকাশ করতে পারছিনা।

মার্ক জুকারবার্গের নাম ইতিহাসে লেখা হচ্ছে, যেমন “নিরীহ কুর্দি নারী ও হাজার হাজার শিশুকে হত্যা করা হচ্ছে, ফেসবুক সিইও মার্ক জুকারবার্গ, কুর্দিদের সেন্সরে এরদোগানকে সাহায্য করে যাচ্ছে, যখন এরদোগান আইএসআইএসকে তহবিল যোগাচ্ছে। “

ফেসবুক এখন ফ্যাসিস্ট বুক

ফ্যাসিস্ট বুক কুর্দিদের উপর সেন্সরশিপ বন্ধ কর

 13119027_562998300548409_2193861948400812598_n

13178528_562998403881732_5203172640182403759_n

13102680_562998363881736_3986282257650942214_n

13119002_562998297215076_1824414904787025087_n


৯ মে ভারতবর্ষের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধের তাৎপর্য উপলব্ধি করুন-

rebelion2

৯ মে ভারতবর্ষের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধের তাৎপর্য উপলব্ধি করুন-

প্রকৃত স্বাধীনতা, মুক্তি ও গণতন্ত্র অর্জনে জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব সফল করুন

 

ভারতবর্ষের ইতিহাসে ১৮৫৭ সালে সংঘটিত বৃটিশ বিরোধী ভারতীয় সিপাহী ও কৃষক জনতার বিপ্লবী যুদ্ধ এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। মহামতি কার্ল মার্কস এই মহান বিদ্রোহকে “ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ” বলে আখ্যায়িত করেছেন। ভারতবর্ষের ইতিহাস সামন্তবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী অসংখ্য কৃষক বিদ্রোহের ইতিহাস। ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধের মধ্য দিয়ে সামন্তবাদী ভারতবর্ষ বৃটিশ উপনিবেশবাদীদের প্রতিনিধি ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর উপনিবেশে পরিণত হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে তা বিস্তৃত হয়। এক পর্যায়ে গোটা ভারতবর্ষ বৃটিশ উপনিবেশবাদ-সাম্রাজ্যবাদের উপনিবেশে পরিণত হয়। তারা এদেশে বেপরোয়া ও বর্বরভাবে লুণ্ঠন চালায়, এদেশের সম্পদ ইংল্যান্ডে পাচার করে। তাদের শাসন-শোষণ তীব্র করার লক্ষ্যে লর্ড কর্ণওয়ালিসের আমলে ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তন করা হয়। এ হচ্ছে ভারতবর্ষের বিশেষ বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন সামন্তবাদ, যাকে কার্ল মার্কস এশিয়াটিক সামন্তবাদ বলেছেনÑ তার পরিবর্তে ইউরোপীয় ধরণের চিরায়ত সামন্তবাদী (Classical Feudalism) আদল প্রতিষ্ঠার অপপ্রয়াস। এর লক্ষ্য ছিল কৃষক-জনতার উপর শোষণ তীব্র করা এবং শোষিত কৃষকের বিদ্রোহ দমন করা। এই সময়কালে সন্ন্যাস বিদ্রোহ (১৭৬৩-১৮০০), বারানসী বিদ্রোহ (১৭৮১), ওয়াহাবী বিদ্রোহ (১৮২৪-৭০), সাঁওতাল বিদ্রোহ (১৮৫৭-৫৮) ইত্যাদি কৃষক বিদ্রোহ উল্লেখযোগ্য।

বৃটিশ উপনিবেশবাদের শোষণ-শাসনের বিরুদ্ধে কৃষক-জনতার পুঁঞ্জিভূত ক্ষোভ-বিক্ষোভ, বিভিন্ন বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে আত্মপ্রকাশ করে। ১৮৫৭ সালে মহান ‘সিপাহী বিদ্রোহ’ কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। উপরোক্ত সংগ্রামী প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় বৃটিশ উপনিবেশবাদের হাত থেকে স্বাধীনতার লক্ষ্যে এই স্বাধীনতা যুদ্ধের সূত্রপাত। সিপাহীদের এই বিদ্রোহ সিপাহীদের উপর বৃটিশদের নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করলেও এটা এদেশের কৃষক জনগণের শোষণ-নির্যাতনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার আকাঙ্খায় বৃটিশ বিরোধী সংগ্রামের বহিঃপ্রকাশ। কারণ সামরিক উর্দিপরা সিপাহীরা শোষিত কৃষক জনতারই সন্তান। এই বিদ্রোহের ঘটনাবলীর দিকে তাকালে দেখা যায় পলাশী যুদ্ধের শতবর্ষ জয়ন্তীকে সামনে রেখে বৃটিশ শাসনকে উৎখাত করার জন্য ভারতীয় সিপাহীরা প্রস্তুত হচ্ছিল। এ সময়ে মার্চ মাসে কলিকতার নিকটস্থ ব্যারাকপুরের সৈন্য ব্যারাকের ঘটনাকে কেন্দ্র করে মঙ্গল পান্ডেকে ফাঁষীকাষ্ঠে ঝুলিয়ে হত্যা করা হলে এই ফাঁসীর সংবাদ শোনার সঙ্গে সঙ্গে চারদিকে সিপাহীরা মঙ্গল পান্ডের হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য বিদ্রোহ ঘোষণা করে। এর কিছুদিন পর ১৮৫৭ সালের ১০ মে মীরাটের সিপাহীরা বিদ্রোহ ঘোষণা করে মীরাটের সব ইংরেজ সৈন্যকে হত্যা করে। এরপর ১১ মে তারা দিল্লী অভিমুখে রওনা দেয়। দিল্লীর পার্শ্ববর্তী অবস্থিত সমস্ত ভারতীয় সৈন্যেরাও বিদ্রোহ ঘোষণা করে দিল্লী অভিমুখে যাত্রা করে। এই বিদ্রোহে কৃষক জনতা অংশ গ্রহণ করে। দিল্লীতে সিংহানহারা মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহকে দিল্লীর সম্রাট বলে ঘোষণা করা হয়। কাসিপুর সিপাহীদের নেতৃত্ব গ্রহণ করে গদিচ্যুত পেশোয়ার নানা সাহেব এবং সেনাপতি তাঁতিয়া টোপি। মধ্য ভারতে সিপাহীদের নেতৃত্ব গ্রহণ করে ঝাঁসীর গদিচ্যুত রাণী লক্ষ্মীবাঈ। এইভাবে সিপাহী বিদ্রোহ বাংলাদেশের ব্যারাকপুর থেকে আরম্ভ করে দ্রুত বহরমপুর, আম্বালয়, মীরাট, লক্ষ্মৌ, দিল্লী, রুডকি, কাশী, আজমগড়, জৌনপুর, এলাহাবাদ, কানপুর, ফতেপুর, বিঠুর, মিয়ামী, ফিরোজপুর, গোবিন্দপুর, পেশোয়ার, ঝিলাম, শিয়ালকোট, পাটনা, আরা, জগদীশপুর, আটক, মৈনপুর, সাহারানপুর, বাদায়ুন, ইন্দোর, ফৌজাবাদ প্রভৃতি অঞ্চলে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। মাত্র ৪০ হাজার ইংরেজ সৈন্যের বিরুদ্ধে ২ লক্ষ ১৫ হাজার ভারতীয় সৈন্য পরাজয়ের মুখোমুখি হয়।

এভাবে বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়লেও বিপ্লবী নেতৃত্বের অভাব, সামন্ত অভিজাতদের হাতে নেতৃত্ব থাকা, সামগ্রিক পরিকল্পনা এবং যুদ্ধের রণনীতি-রণকৌশল অনুসরণে ব্যর্থতা, কৃষকদের মুক্তির ও ভাগ্য উন্নয়নের কোন ঘোষণা না থাকা, বৃটিশ উচ্ছেদের সাধারণ লক্ষ্য থাকলেও পরবর্তী করণীয় হিসাবে প্রগতিশীল সমাজের লক্ষ্য নির্ধারণ না করে সামন্তবাদী মোঘল সাম্রাজ্যবাদের অধীন পুরাতন ভারতবর্ষ পুনঃপ্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেওয়া ইত্যাদি কারণে এই মহাবিদ্রোহ ব্যর্থ হয়। এই যুদ্ধ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী হলেও সাম্রাজ্যবাদের সাথে সাথে সামন্তবাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়নি। বৃটিশ উপনিবেশবাদী শক্তি হত্যা, রক্তের বন্যায় নির্মমভাবে তা দমন করে। এ সময়ে ১৮৫৭ সালের ১ নভেম্বর বৃটিশ রাজ রাণী ভিক্টোরিয়া ভারত শাসনের দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীকে ভেঙ্গে দেওয়ার ঘোষণা দেয়। বৃটিশ হত্যার প্রত্যক্ষ শরীক নন এমন সকল বিদ্রোহী সামন্তদের সাধারণ ক্ষমা প্রদর্শনের আশ্বাসসহ ভারতীয় সামন্তদের সম্পত্তির অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা দেয়। এই বিদ্রোহ দমনের মধ্য দিয়ে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর স্থলে সরাসরি বৃটিশ সরকারের অধীনে ভারত শাসন করার ঘোষণা দেয় এবং বিদ্রোহ চলাকালীন সময়ে সুযোগ-সুবিধা বঞ্চিত সামন্তদের মধ্যে ভাঙ্গন ঘটিয়ে পক্ষে টেনে আনার কৌশল কাজে লাগায়। তবে যে সব সামন্ত বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেয় তাদেরকে ফাঁসীকাষ্ঠে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়।

এই বিদ্রোহ দুই বছরব্যাপী স্থায়ী হয়। এই স্বল্পস্থায়ী হওয়ার নানা কারণ থাকলেও সামরিক যুদ্ধ-কৌশলের ক্ষেত্রে একটা কারণ হচ্ছে গেরিলা-কৌশলের বদলে প্রধানত সামনাসামনি অবস্থানগত যুদ্ধ পরিচালনা। এই যুদ্ধ ব্যাপক এলাকা জুড়ে সংগঠিত হয়েছিল। এই ত্রুটি-বিচ্যুতি, দুর্বলতা-ব্যর্থতা থাকা সত্ত্বেও এই মহাবিদ্রোহ বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের উপর প্রবল আঘাত হিসাবে গণ্য হয়েছিল। কার্ল মার্কস তাই এ বিদ্রোহকে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ হিসাবে আখ্যায়িত করেন।

ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ তার নিজস্ব স্বার্থেই রেল লাইন স্থাপন ও কিছু কল-কারখানা গড়ে তুললে শ্রমিকশ্রেণী গড়ে ওঠে। তবে ভারতবর্ষে কুটির শিল্প ও জাতীয় শিল্পের বিকাশ প্রতিহত করায় এখানে জাতীয় বুর্জোয়ার বিকাশ না হয়ে প্রধানত মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া শ্রেণী গড়ে উঠে। এই সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে ঔপনিবেশিক সামন্তবাদী ভারতবর্ষে কার্যকরী দুই মৌলিক দ্বন্দ্ব- সাম্রাজ্যবাদের সাথে সমগ্র জনগণের দ্বন্দ্ব এবং সামন্তবাদের সাথে কৃষক তথা ব্যাপক জনগণের দ্বন্দ্ব সমাধানের জন্য জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করতে নেতৃত্ব প্রদান করার দায়িত্ব ঐতিহাসিকভাবে শ্রমিকশ্রেণীর উপর বর্তালো। ১৯৭১ সালের ৭ নভেম্বর মহান সমাজতান্ত্রিক রুশ বিপ্লব জয়যুক্ত হওয়ার ফলশ্রুতিতে ১৯১৯ সালে তৃতীয় আন্তর্জাতিক গড়ে উঠলে ১৯২০ সালের ১৭ অক্টোবর রাশিয়ার (সোভিয়েত ইউনিয়নের) তাসখন্দে (বর্তমানে উজবেকিস্তানের রাজধানী) ভারতের শ্রমিকশ্রেণীর পার্টি তথা ভারতের কমিউনিষ্ট পার্টি জন্ম হয়। ২০ এবং ৩০-এর দশকে কমিউনিষ্ট বিপ্লবীদের তৎপরতায় ভারতবর্ষের অভ্যন্তরে কমিউনিষ্ট পার্টির সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে উঠে এবং পার্টির নেতৃত্বে শ্রমিক-কৃষকের আন্দোলন-সংগ্রাম শুরু হয়। এ প্রেক্ষাপটে শোলাপুর কমিউন, পেশোয়ারে শ্রমিক বিদ্রোহ, তে-ভাগা, টঙ্ক, নানকার, তেলেঙ্গানা কৃষক বিদ্রোহ, বোম্বাই-এ নৌ-বিদ্রোহ, কোলকাতায় ছাত্রবিদ্রোহ ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সংগ্রাম সংগঠিত হয়। ২য় বিশ্বযুদ্ধে ফ্যাসীবাদের পরাজয়ের মধ্যে দিয়ে পূর্ব ইউরোপের ৭টি দেশে শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্বে জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন হলে দুনিয়া জোড়া সমাজতন্ত্র ও জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের এক মিলিত মহাপ্রবাহ সৃষ্টি হয়। কিন্তু ভারতের কমিউষ্টি পার্টি বলশেভিক বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন না হওয়া এবং গুরুতর আদর্শগত-রাজনীতিগত ভুল-ত্রুটি করায় এই সম্ভাবনাকে নেতৃত্ব দিয়ে জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব জয়যুক্ত করতে ব্যর্থ হয়।’

বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ তার শোসন-শাসন রক্ষায় এবং বিপ্লব ঠেকানোর জন্য গ্রহণ করে নতুন কৌশল। তারা তাদের বিশ্বস্ত দালাল সামন্তবাদ ও আমলা-মুৎসুদ্দি পুঁজিপতিদের স্বার্থরক্ষাকারী রাজনৈতিক দল, ভারতীয় কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের হাতে ক্ষমতা দিয়ে পর্দার আড়ালে চলে যায়। বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদী প্রতিক্রিয়াশীল দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে “ভাগ কর, শাসন কর (Divide & rule)” কৌশল প্রয়োগ করে ভারতবর্ষ বিভক্ত করে সৃষ্টি করে নয়াঔপনিবেশিক ভারতীয় ইউনিয়ন এবং পাকিস্তান নামক দু’টি রাষ্ট্র। ফলে যুগ যুগ ধরে শ্রমিক-কৃষক-জনগণ স্বাধীনতা, জাতীয় মুক্তি ও গণতন্ত্রের যে লড়াই চালাচ্ছিলো সে লক্ষ্য হয় না অর্জন। অসমাপ্ত রয়ে যায় এদেশের জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব। অর্জিত হয় না বিভিন্ন জাতিসত্তার আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার।

নয়াঔপনিবেশিক-আধাসামন্তবাদী পাকিস্তানে শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি জনগণ সে লক্ষ্য অর্জনে অব্যাহত সংগ্রাম চালিয়ে যায়। শ্রমিকশ্রেণীর পার্টি হিসাবে কমিউনিষ্ট পার্টি বিপ্লবী নেতৃত্ব প্রদানে বিভিন্ন ব্যর্থতা ঘটে। সাম্রাজ্যবাদী পরিকল্পনায় বাঙ্গালী জাতিসত্তার আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের আকাঙ্খা ব্যবহার করে উগ্র বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদকে কাজে লাগিয়ে রুশ-ভারতের আগাসনের মধ্যে দিয়ে ১৯৭১ সালে সৃষ্টি করা হয় বাংলাদেশ। সাম্রাজ্যবাদ-সামন্তবাদ বিরোধী জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লবের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ সৃষ্টি না হওয়ায় অর্জিত হয় না প্রকৃত জাতীয় মুক্ত, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র। নয়াঔপনিবেশিক-আধাসামন্তবাদী বাংলাদেশে ঘাড়ে চেপে বসে আছে সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও আমলা দালাল পুঁজিবাদী শোষণের তিন পাহাড় এবং তাদের স্বার্থরক্ষাকারী স্বৈরাচারী শোষণের রাষ্ট্র, সরকার ও সংবিধান। শ্রমিকশ্রেণীর পার্টি নেতৃত্বে শ্রমিক-কৃষক মৈত্রীর ভিত্তিতে প্রচলিত আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থাকে উৎখাত করে জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব জযযুক্ত করা ছাড়া মুক্তির আর কোন পথ নেই।

ঔপনিবেশিক-সামন্তবাদী ভারতবর্ষের জনগণ স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও জাতীয় মুক্তির লক্ষ্যে শত শত বছর ধরে যে লড়াই চালিয়ে আসছে সেই জনতার সংগ্রামের প্রকৃত ইতিহাসকে আড়াল করে উগ্র বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের ’৭১-এ তথাকথিত মুক্তি ও স্বাধীনতা এসে গেছে বলে যে মিথ্যাচার ও ইতিহাসের বিকৃতি করছে তাদের প্রতিক্রিয়াশীল স্বরূপ জনসমক্ষে উন্মোচিত করে দিতে হবে। যারা ইসলামের দোহাই দিয়ে সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গিতে ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা অর্জিত হওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলো এবং ইখতিয়ারউদ্দিন মোহাম্মদ-বিন-বখতিয়ার খিলজির বঙ্গ বিজয়কে স্বাধীনতা হিসাবে দেখাতে চায় তারাও ইসলামের বিকৃতি সাধনকারী মিথ্যাচারী এক ঝাঁক প্রতিবিপ্লবী ছাড়া আর কিছু নয়। সাম্রাজ্যবাদ ও তার উল্লেখিত দালালদের মিথ্যাচার ও ইতিহাস বিকৃতির বিরুদ্ধে আজ রুখে দাঁড়াতে হবে। জনতার সামনে তুলে ধরতে হবে প্রকৃত স্বাধীনতা ও জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসকে, যা আজো অর্জিত হয়নি। তুলে ধরতে হবে ১৮৫৭ সালে ভারতবর্ষের ১ম স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রকৃত তাৎপর্যকে। স্বাধীনতা, জাতীয় মুক্তি ও গণতন্ত্রের সংগ্রামকে পরিণতিতে নিতে হবে জাতীয় গনতান্ত্রিক বিপ্লব জযযুক্ত করার মধ্য দিয়ে। এ দায়িত্ব শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্বে শ্রমিক-কৃষক, মধ্যবিত্ত. মেহনতি জনতার।

সুত্রঃ 

13076745_715535491921699_3304914592563662269_n


মৌলবাদ, ধর্মীয় সন্ত্রাস ও সাম্রাজ্যবাদ -আনু মুহাম্মদ

american-imperialism-and-islamic-fundamentalism-cartoon

পুঁজিবাদ সম্প্রসারণে ঔপনিবেশিক ব্যবস্থা খুবই সহায়ক হয়েছিলো। আর উপনিবেশগুলোতে রাজনৈতিক ক্ষমতা সম্প্রসারণে মিশনারীদের বিভিন্ন মাত্রার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিলো, ভূমিকা ছিলো স্থানীয় ধর্মীয় নেতা ও ক্ষমতাবানদেরও। আবার ঔপনিবেশিক শাসন বিরোধী ভূমিকাতেও মিশনারী ও স্থানীয় কোনো কোনো ধর্মীয় নেতার ভূমিকাও দেখা গেছে। উত্তর উপনিবেশকালে প্রান্তস্থ দেশগুলোতে খুঁটি ধরে রাখতে, সমাজতন্ত্র ঠেকাতে পুঁজিবাদী কেন্দ্র বা সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো ধর্মীয় শক্তি ব্যবহারে ব্যাপক সাফল্য দেখিয়েছে। মূলধারার চার্চ সাম্রাজ্যবাদের খুঁটি হিসেবেই বরাবর ভূমিকা পালন করেছে। একদিকে মুসলিম রাজতন্ত্র টিকিয়ে রাখা অন্যদিকে ইহুদীবাদীদের পৃষ্ঠপোষকতার মধ্য দিয়ে তেলসমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে সাম্রাজ্যবাদ নিজেদের দীর্ঘমেয়াদী অবস্থান পাকাপোক্ত করেছে। মুসলিম প্রধান দেশগুলোতে ইসলামপন্থী দল ও ধর্মীয় নেতাদের মাধ্যমে সমাজতন্ত্র বিরোধী আতঙ্ক সৃষ্টি করবার কাজ সহজ ছিলো। বস্তুত এই ধর্মপন্থীরা এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকায় সামরিক বেসামরিক স্বৈরশাসকদের সমর্থন দেবার মাধ্যমে সাম্রাজ্যবাদের আধিপত্যের পথও সুগম করেছে। ৮০ দশক থেকে ইসলামী ‘মৌলবাদী’ তৎপরতা বেড়ে যাওয়ার সাথে প্রান্তস্থ দেশগুলোতে বিপন্নদশা ও সাম্রাজ্যবাদ নিয়ন্ত্রিত বিশ্ব রাজনীতি সম্পর্কিত। যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ৮০ দশক পর্যন্ত ধর্মপন্থী শক্তিগুলোকে সমাজতন্ত্র ও সবরকম মুক্তির লড়াই-এর বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছে। এই পর্যায়ের সর্বশেষ বড় উদাহরণ আফগানিস্তান। প্রথমে মুজাহেদীনদের মাধ্যমে আফগানিস্তানে সোভিয়েত সমর্থিত সরকার উচ্ছেদ করে যুক্তরাষ্ট্র। সেইসময় আফগান মুজাহেদীনদের সবরকম পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে তারা। প্রশিক্ষণ দিয়েছে, অস্ত্র দিয়েছে, অর্থ দিয়েছে। অর্থ দিয়েছে সৌদী আরবও। ইউএসএইড সরবরাহ করেছে ইসলামী উন্মাদনা সৃষ্টির মতো বই, শিশুদের পাঠ্যপুস্তক। যার মধ্যে সোভিয়েত সৈন্যের চোখ উপড়ে ফেললে বেহেশতে যাবার প্রতিশ্রুতিও ছিলো। সিআইএ-র এসব কার্যক্রম বাস্তবায়নে মাঠের ভূমিকা পালন করেছে পাকিস্তান সেনাবাহিনী। সামরিক শাসনের মাধ্যমে জেনারেল জিয়াউল হকের মতো একজনকে অধিষ্ঠিত করা সেসময় যুক্তরাষ্ট্রের খুব কাজে দিয়েছে। একপর্যায়ে আকস্মিকভাবে বিশাল শক্তি নিয়ে উদিত হয় তালিবান। মুজাহিদীনদের বিরুদ্ধে যাদের অস্ত্র, সরঞ্জাম, প্রশিক্ষণ এবং কৌশলগত সমর্থন সবই যোগান দিয়েছে সেই যুক্তরাষ্ট্রই।

তালেবানরা আফগানিস্তানে ক্ষমতা দখলের সূচনা করে ১৯৯৭ সালের ২৪ মে। ঠিক তার আগের দিন যুক্তরাষ্ট্রের বৃহৎ ব্যবসা জগতের মুখপাত্র ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল আফগানিস্তান নিয়ে একটি সম্পাদকীয় প্রকাশ করে। সেখানে লেখা হয়: ‘আফগানিস্তান হচ্ছে মধ্য এশিয়ার তেল, গ্যাস ও অন্যান্য প্রাকৃতিক গ্যাস রফতানির প্রধান পথ।…তাদের পছন্দ কর বা না কর ইতিহাসের এই পর্যায়ে তালিবানরাই আফগানিস্তানে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সবচাইতে উপযুক্ত।’ (জার্নাল, ১৯৯৭) দুদিন পর অর্থাৎ ১৯৯৭ সালের ২৬ মে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃস্থানীয় পত্রিকা নিউইয়র্ক টাইমস লেখে: ‘কিনটন প্রশাসন মনে করে যে, তালিবানদের বিজয় ইরানের পাল্টা শক্তি হিসেবে দাঁড়াবে..এমন একটি বাণিজ্য পথ উন্মুক্ত করবে যা এই অঞ্চলে রাশিয়া ও ইরানের প্রভাবকে দুর্বল করবে।’ (টাইমস, ১৯৯৭) মার্কিন তেল কোম্পানি ইউনোকাল কিনটন প্রশাসন ও ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের অবস্থানকে ‘খুবই ইতিবাচক অগ্রগতি’ বলে অভিহিত করে। এই কোম্পানি বিশ্ববাজারে বিক্রির জন্য তুর্কমেনিস্তান থেকে আফগানিস্তান হয়ে পাকিস্তান পর্যন্ত পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস ও অপরিশোধিত তেল নেয়ার প্রকল্প নিয়ে অপেক্ষা করছিলো।

একইবছর যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক দিক থেকে আরও অনেক শক্তিশালী ও আক্রমণাত্মক করবার প্রকল্প নেয়া হয়, যার শিরোনাম ছিলো: “প্রজেক্ট ফর দ্য নিউ আমেরিকান সেঞ্চুরি”। এতে যারা স্বার করেন তাঁদের মধ্যে ইউনোকাল কর্মকর্তা, অস্ত্র ব্যবসায়ীসহ আরও ছিলেন ডিক চেনি, ডোনাল্ড রামসফেল্ড, জেব বুশ এবং ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা। (আলী, ২০০৩) বিশ্বব্যাপী নয়া উদারতাবাদী ধারার সংস্কার, দখল, আধিপত্যের নতুন পর্ব আরও জোরদার হয়। ২০০১ সালে নিউইয়র্কের ‘টুইন টাওয়ার’ হামলার পর থেকে এই কর্মসূচির অধিকতর সামরিকীকরণ ঘটে। পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী ইসলাম ও মুসলমান বিদ্বেষী প্রচারণাও জোরদার হয়। সৌদীসহ মুসলিম রাজতন্ত্রকে ভর করেই এই সন্ত্রাসী আধিপত্য বিস্তৃত হয়। এই প্রচারণার প্রতিক্রিয়ায় ইসলামপন্থী রাজনীতির ক্ষেত্রও উর্বর হতে থাকে। অপমান, বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে মুসলমানদের ক্ষোভে ইসলামপন্থী রাজনীতির নতুনভাবে প্রসার ঘটে।

কার্যত সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর তাদের নতুন শত্রুপক্ষ নির্মিত হয় ১৯৯১ সালে প্রথম ইরাকের যুদ্ধের মধ্য দিয়ে। তারপর থেকে ক্রমান্বয়ে ‘ইসলামী সন্ত্রাসী’ বাড়তে থাকে এবং তার বিরোধী লড়াই একটি বৈশ্বিক এজেন্ডার রূপ দেয়। সোভিয়েত প্রভাবের বিরুদ্ধে ৮০ দশকে ইসলামপন্থী জঙ্গি সশস্ত্র বিভিন্ন গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যে ঐক্য তৈরি হয়, যেভাবে তার আন্তর্জাতিক সংগঠন গড়ে তোলা হয় তার ধারাবাহিকতা পরেও অব্যাহত থাকে। এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব বর্তমান সময়ে ক্রমবর্ধমান নৃশংসতার মধ্যেও পাওয়া যাবে। আইসিস, তালেবান, আল কায়েদা ইত্যাদি নামে পরিচিত যেসব গোষ্ঠীকে দমন করবার কথা বলে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বজুড়ে দখলদারিত্বের নতুন জাল ফেঁদেছে তারা সবাই মার্কিনীদেরই সৃষ্ট বা লালিত পালিত দানব। এগুলোর সূত্রে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন নতুন ভয়ংকর ঘটনা ঘটছে। ইসলামের নাম নিয়ে এইসব গোষ্ঠীর বর্বর দিগভ্রান্ত সন্ত্রাসী তৎপরতাকে কেউ কেউ ‘জিহাদ’ কেউ কেউ ‘সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী লড়াই’ বলে মহিমান্বিত করতে চান। মোহমুক্ত থাকলে এসব বয়ান যে কতো ভ্রান্ত তা উপলব্ধি কঠিন নয়।

অনেকে আবার এরকম ভাবে বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ‘সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধ’ পরিচালনা করছে ‘ইসলামী জঙ্গি’দের বিরুদ্ধে সেকুলার শক্তির পক্ষে। এটিও আরেকটি বড় ভ্রান্তি। বস্তুত নির্বাচিত সেকুলার সরকার উচ্ছেদে মার্কিনী রেকর্ড অনেক। ৭০ ও ৮০ দশকে আফগানিস্তানে সেকুলার সরকারই ক্ষমতায় ছিলো, কিন্তু তারা ছিলো মার্কিন বিরোধী সোভিয়েত পন্থী। এই সরকারগুলো আফগানিস্তানে ভূমি সংস্কার, নারী অধিকার, শিক্ষা ও চিকিৎসা সংস্কারে অনেক দূর অগ্রসর হয়েছিলো। ইরাক ও লিবিয়াতেও সেকুলার সরকার ছিলো। শিক্ষা, চিকিৎসা, বিশুদ্ধ পানিসহ জন অধিকারের ক্ষেত্রেও তাদের অনেক সাফল্য ছিলো। যুক্তরাষ্ট্র সাদ্দাম ও গাদ্দাফীকে উচ্ছেদের পর সেসব ব্যবস্থা তছনছ হয়ে গেছে। আর সেখানে বিভিন্ন ইসলামপন্থী গোষ্ঠীর প্রভাব বেড়েছে।

একইসঙ্গে গণনায় লাশের সংখ্যাও বাড়ছে। গত ২৯ মার্চ “বডি কাউন্ট: ক্যাজুয়ালটি ফিগারস আফটার টেন ইয়ারস অব দ্য ওয়ার অন টেরর” নামের এই রিপোর্ট প্রকাশ করেছে জার্মান, কানাডিয়ান ও মার্কিন তিনটি সংগঠন যৌথভাবে। এগুলো হলো ইন্টারন্যাশনাল ফিজিশিয়ানস ফর দ্য প্রিভেনশন অব নিউকিয়ার ওয়ার, ফিজিশিয়ানস ফর সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি, এবং ফিজিশিয়ানস ফর গ্লোবাল সারভাইভাল”। এই রিপোর্টে ২০০৪ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত পরিচালিত সমীক্ষায় দেখানো হয়েছে যে, এক দশকে যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণে ইরাক, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে ১৩ লাখেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ১০ লাখ ইরাকে, দুই লাখের বেশি আফগানিস্তানে। মার্কিন ড্রোন ও অন্যান্য আক্রমণে ৮০ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন শুধু পাকিস্তানেই। এর মধ্যে বেসামরিক নাগরিকের সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার।

মার্কিন গবেষক উইলিয়াম ব্লুম যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ভূমিকার দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষক। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রই বিশ্বের সবচাইতে বড় দখলদার শক্তি। ১৯৪৫ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৪০টি দেশের সরকারকে উৎখাতের চেষ্টা করেছে, ৩০টি জনপ্রিয় জাতীয় মুক্তি আন্দোলনকে ধ্বংস করেছে, ২৫টি দেশে বোমা মেরে ক্ষতবিক্ষত করেছে, বহুলক্ষ মানুষ হত্যা করেছে, তার কয়েকগুণ বেশি সংখ্যক মানুষের জীবন তছনছ করেছে।’২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধের নামে ইরাক দখল ও ছিন্নভিন্ন করলো। তারপর থেকে বিশ্বের বহুদেশে দখল ও হত্যাকান্ড চলছে সন্ত্রাস দমনের মুখোশে।

২০০১ এর আগে ইরাক লিবিয়া সিরিয়ায় আল কায়েদা বা তালেবান ধারার কোন কিছুর অস্তিত্ব ছিলো না। তথাকথিত ‘সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধ’ এই অঞ্চলকে চেনা অচেনা সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে পরিণত করেছে। সর্বশেষ এই অঞ্চলে বিরাট শক্তি ও সম্পদ নিয়ে আবির্ভূত হয়েছে আইসিস যা ইসলামী রাষ্ট্র বা খিলাফৎ প্রতিষ্ঠার কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। নতুন শত শত গাড়ি, বার্ষিক ১৬ হাজার কোটি টাকার বাজেট এবং প্রায় ৩০ হাজার সশস্ত্র সদস্য নিয়ে আচমকা তারা হাজির। তারা ইরাক, সিরিয়ায় একের পর এক অঞ্চল দখল করছে। তারা একের পর এক ভিন্নধর্ম ও মতাবলম্বী, সংখ্যালঘু জাতির মানুষদের ধরছে, গলা কাটা ও নির্যাতনের দৃশ্য ইন্টারনেটের মাধ্যমে প্রচার করছে। হঠাৎ করে এরকম একটি বিশাল বাহিনীর জন্ম এবং ক্রমান্বয় বিজয় আফগানিস্তানে তালিবানদের আচমকা আবির্ভাব এবং দ্রুত আফগানিস্তান দখলের কথা মনে করিয়ে দেয়।

ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া ছিন্নভিন্ন হবার ফলে এই দেশগুলোর মানুষদের নারকীয় অনিশ্চিত অবস্থায় পড়তে হয়েছে। ইউরোপে অভিবাসনে বিশাল স্রোত এরই ফলাফল। অন্যদিকে এর প্রত্যক্ষ সুবিধাভোগী তিনপক্ষ: সৌদী আরব, ইজরায়েল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার বৃহৎ ব্যবসায়ী গোষ্ঠী। তাদের কাছে ইরাকের সাদ্দামের অপরাধ স্বৈরশাসন ছিলো না ছিলো তেল ক্ষেত্র জাতীয়করণ এবং সামরিক শক্তি হিসেবে সৌদী আরব ও ইজরায়েলের কর্তৃত্ব অস্বীকারের ক্ষমতা। লিবিয়ার গাদ্দাফিরও একই অপরাধ ছিলো। সৌদী রাজতন্ত্র বরাবরই তার ওপর গোস্বা ছিলো। জীবনের শেষ পর্যায়ে পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে সুসম্পর্ক গড়ার লক্ষ্যে ‘নয়া উদারতাবাদী’ বলে পরিচিত পুঁজিপন্থী কিছু সংস্কারের পথে গেলেও গাদ্দাফীর বড় অপরাধ ছিলো সৌদী রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে স্পষ্ট আক্রমণাত্মক কথাবার্তা। ২০১১ সালে গাদ্দাফী সরকারকে উচ্ছেদ করবার জন্য ন্যাটো বাহিনীর ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচি এবং আল কায়েদাসহ বিভিন্ন ভাড়াটিয়া ইসলামপন্থীদের জড়ো করার কাজটি যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা কয়েকটি দেশ ও সৌদী আরবের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়।

সিরিয়ার আসাদ সরকারেরও অপরাধ স্বৈরশাসন নয়, অপরাধ সৌদী আরব-ইজরাইল অক্ষের কাছে তার অগ্রহণযোগ্যতা। সিরিয়ার আসাদ সরকার উচ্ছেদের জন্য অতএব বিভিন্ন ক্ষুদ্ধ গোষ্ঠীকে পৃষ্ঠপোষকতা দেয় পশ্চিমা শক্তি ও সৌদী-কাতার-জর্ডান রাজতন্ত্র। ইরানকে কাবু করাও এর একটি উদ্দেশ্য ছিলো। আসাদ বিরোধী এসব গোষ্ঠীর অধিকাংশই আল কায়েদা ঘরানার বিভিন্ন গ্রুপ, ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসী। সৌদী আরব, কাতার, তুরস্ক, জর্ডান, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে বিপুল অর্থ, যুক্তরাষ্ট্র থেকে অস্ত্র যোগানের ওপর ভর করেই এসব গোষ্ঠী শক্তিপ্রাপ্ত হয়। এর সাথে মার্কিন, ব্রিটিশ, ফরাসি ও ইজরায়েলী গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বিত ভূমিকা ছিলো উল্লেখযোগ্য। এদেরই অনেকে এখন গঠন করেছে আইসিস। যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট বাইডেন কিছুদিন আগে এক বক্তৃতায় মুখ ফসকে আইসিস এর পেছনে এই দেশগুলোর শত হাজার কোটি ডলার সহ নানা পৃষ্ঠপোষকতার কথা বলে ফেললেও পরে মিত্রদের ক্ষোভের মুখে মাফ চেয়েছেন। বাইডেন অবশ্য নিজেদের ভূমিকার কথা বলেননি। কিন্তু সত্য ঢাকা পড়েনি।

‘মৌলবাদ’কে একটি গ্রামীণ, অনাধুনিক, পশ্চাৎপদ বিষয় হিসেবে দেখলে এর শেকড় সন্ধান পাওযা যাবে না, এর ব্যাপ্তি বোঝানো যাবে না। মার্কিন ইসলামবিষয়ক পন্ডিত আমিনা ওয়াদুদ এর মতে ‘ইসলামপন্থীদের বর্তমান পুনরুত্থান একটি উত্তর-আধুনিক ঘটনা’। যেভাবেই বলি না কেনো, ‘মৌলবাদী’ শক্তিগুলোর ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভাবকে নিছক স্থানীয় বা জাতীয় বিষয় হিসেবে দেখা চলে না। তথ্য যুক্তি দিয়েই তারিক আলী দেখিয়েছেন যে, ‘বর্তমান সময়ে সবচাইতে বড় ‘মৌলবাদ’, ‘সকল মৌলবাদের জন্মদাতা’ হলো- মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ’।

তাই এটা বিস্ময়কর নয় যে, একইসাথে ‘সন্ত্রাস বিরোধী তৎপরতা’র নামে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ হচ্ছে, অস্ত্র যোগান বাড়ছে, নিরাপত্তা ব্যবস্থা কঠোর হচ্ছে, নতুন নতুন দৃশ্যমান অদৃশ্য সন্ত্রাসী গোষ্ঠী তৈরি হচ্ছে, গোয়েন্দা সংস্থার দাপট বাড়ছে, সন্ত্রাস বাড়ছে, তা দমনে নতুন নতুন দমন পীড়নের আইন, বিধিনিষেধ তৈরি হচ্ছে। যারা সবচাইতে বড় সন্ত্রাসী তারাই বিশ্বজুড়ে দাপাচ্ছে ‘সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধ’ নাম দিয়ে। বাংলাদেশ এরই অন্তর্ভুক্ত একটি অঞ্চল, যাকে বিশ্ব সন্ত্রাসের উর্বর ভূমি বানানোর চেষ্টাও খুব জোরদার বলে মনে হয়।

২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিনী দ্বিতীয় দফা আক্রমণ ও সর্বব্যাপী আগ্রাসনের পরিপ্রক্ষিতে এর অর্থনীতি ও রাজনীতি বিস্তারিত তথ্য ও বিশ্লেষণ আছে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি আয়োজিত সেমিনারে উপস্থাপিত আমার “যুদ্ধের অর্থনীতি, ইরাকে মার্কিন দখলদারিত্ব এবং বিশ্ব জোট” শীর্ষক প্রবন্ধে। বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি সাময়িকী, ২০০৪।

সুত্রঃ

13076745_715535491921699_3304914592563662269_n