মার্কসবাদী-লেনিনবাদী-মাওবাদী কমিউনিস্ট পার্টি(CPMLM) ফ্রান্স দলিল- ৫৯

ob_63a49f79da2251519a32f20833e1b21a_en-tete-grand-2

সিপিএমএলএম ফ্রান্স দলিল- ৫৯,

পুঁজিবাদী অথবা আধা-সামন্তবাদী আধা-উপনিবেশিক দেশ? ট্রটস্কিবাদ অথবা দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ?

 

ইউক্রেন, ফিলিস্তিন, সিরিয়া এবং ইরাকে যা হচ্ছে… তা পৃথিবীর দেশ সমূহের প্রকৃতি বিশ্লেষণের জন্য পুনরায় দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের শিক্ষাকে আরোপ করে।

দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের নিয়ম অনুসারে, বিশ্বের দেশ সমূহ দুই ভাগে বিভক্ত। প্রথম শ্রেনীর দেশ গুলো পুঁজিবাদী দেশ নিয়ে গঠিত, যারা সাম্রাজ্যবাদে পরিণত হয়েছে। সেই সকল দেশসমূহের প্রধান দ্বন্দ্ব সর্বহারা এবং বুর্জোয়ার মাঝে, সেখানকার জন্য করণীয় হলো সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সাধন করা। এই পরিস্থিতি অন্যান্য স্থানের জন্যsirajsikder প্রযোজ্য নয়ঃ অন্য ধরণের দেশগুলিকে অধীন করার প্রক্রিয়ায়, ঐ প্রথমোক্ত দেশসমূহ সামন্তবাদকে শক্তিশালী করেছে নির্দিষ্টতঃ বড় বড় ভূমি মালিকদের এক শক্তিশালী সংগঠন জন্ম দিয়ে।

এটা প্রচলিত স্থানীয় উৎপাদন ও এর সরল পুনঃ উৎপাদনকে বিনাশ করে দেয়, গণহারে নাগরিকদের স্থানান্তর ঘটায়, যারা শহরে নগরে এমনকি সাম্রাজ্যবাদী দেশে পাড়ি জমায়। এর অন্য আরো একটি দিক হলো সেখানে আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদী বুর্জোয়াদের সংগঠনঃ সাম্রাজ্যবাদের প্রতি সমর্পিত। ফলতঃ ঐসকল দেশে বিপ্লবের প্রথম ধাপ হিসাবে গণতান্ত্রিক বিপ্লব সাধন করতে হবে, বিলোপ করতে হবে সামন্তবাদকে এবং ধ্বংস সাধন করতে হবে সাম্রাজ্যবাদকে। অতঃপর সেই বিপ্লব অব্যাহতভাবে সামাজতান্ত্রিক বিপ্লবে রূপ নিবে এবং অনেক সাংস্কৃতিক বিপ্লবের মধ্য দিয়ে তাকে যেতে হবে।

দ্বন্দ্ববাদের নিয়ম প্রচলিত প্রতিটি বর্গের জন্য অবশ্যই প্রযোজ্য। সাম্রাজ্যবাদি দেশগুলো নিজেদেরকে প্রচলিত সাম্রাজ্যবাদী এবং পরাশক্তি হিসেবে বিভক্ত করেছে সাবেক সোভিয়েত সামাজিক-সাম্রাজ্যবাদী এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সহকারে। অন্য দিকে আধা উপনিবেশবাদী, আধা সামান্তবাদী দেশগুলো নিজেদেরকে বিভক্ত করেছে সাধারণ ও গতানুগতিক ধারার আর আধা উপনিবেশবাদী আধা সামান্তবাদী সম্প্রসারনবাদি দেশ হিসাবে আরো একটি গ্রুপের মধ্যে। আফগানিস্থানের আকরাম ইয়ারী, বাংলাদেশের সিরাজ সিকদার এবং তুরষ্কের ইব্রাহীম ক্যায়াপাক্কায়া এ বিষয়ে গুরুত্বপুর্ণ কাজ করে গেছেন। তাঁদের মূল্যবান লেখনিতে এগুলো পাওয়া যায়।

দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের এই হলো মৌলিক শিক্ষা। প্রতিবিপ্লবীরা অবশ্যই তাদের নানা প্রকার মতাদর্শ নিয়ে এর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে, কোনakramyariকোন সময়ে ‘বিপ্লবী’র ভাণও ধরে। সকল রকমফের সত্ত্বেও, এসকল মতাদর্শই বলে যে কোন আধা ঔপনিবেশিক আধ সামন্তবাদী দেশ নেই। ট্রটস্কিবাদ বিকশিত হয়েছে হোজাবাদ আর অন্যান্য মতবাদের মতই যাদের মতে দুনিয়ার সকল দেশই পুঁজিবাদী। আর এর অর্থ হলো সর্বত্রই সামাজতান্ত্রিক বিপ্লব সাধন করতে হবে, একদিকে গণতান্ত্রিক বিপ্লব আর অন্যদিকে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব এমন নয়।

এর ফল সহজেই বোধগম্য। এই প্রতিবিপ্লবী ধারণা নিপিড়িত দেশ সমূহের মাঝে বিদ্যমান আধা-সামন্তবাদী দিককে অস্বীকার করে। এর মাধ্যমে এইদেশসমূহ পিছিয়েই থেকে যাচ্ছে। এমনকি “আধুনিকীকরন” হলেও, আধুনিক শহর থাকলেও সামান্তবাদ গভীরভাবে শিকড় গেড়ে বসে আছে।

উদাহরন হিসাবে আমরা দেখতে পাই যে, এখনও ভারতীয় আধুনিক শহরগুলিতে জাত-পাত অত্যন্ত অনেক শক্তিশালী। তেল সমৃদ্ধ উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলির আধুনিক শহরে ও নগরে ধর্মীয় কুসংস্কার এখনও প্রাধান্য বিস্তার করে আছে। বাংলাদেশের কল কারখানাগুলো সাবেকী সামন্তবাদী কর্তৃত্ববাদী ভাব ধারায় পরিচালিত হচ্ছে ইত্যাদি।

ট্রটস্কিবাদ এবং অন্যান্য মতাদর্শ গণতান্ত্রিক বিপ্লবকে প্রতিরোধ করতে সামান্তবাদের দিকটিকে দুই ভাবে নেতিকরণ করার মাধ্যমে এমন প্রচেষ্টা চালায়। যেমন- প্রথমতঃ সংস্কারবাদি হিসাবে গতানুগতিক পন্থায় গণতান্ত্রিক সংগ্রামকে অস্বীকার করা, দ্বিতিয়তঃ অ- সমাজতান্ত্রিক হিসাবে প্রতিবিপ্লবী মনে করা। আমরা এখানে উদাহরন হিসাবে ফ্রান্সের “লুট্টি অব্রেরী” র কথা বলতে পারি, তারা জাতীয় মুক্তির বিষয়টিকে অস্বীকার করে।

অন্য মত সকল সামন্তবাদী অথবা বুর্জোয়া আমলাতান্ত্রিক আন্দোলনকে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী বুর্জোয়া আন্দোলন মনে করে। এই মতটিই ঐতিহাসিক ভাবে “চতুর্থ আন্তর্জাতিকের ঐক্যবদ্ধ সচিবালয়” কর্তৃক গ্রহন করা হয়েছিলো। যেখানে ফ্রান্সের “কমিউনিস্ট বিপ্লবী লীগ” একটি গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলো। এই অবস্থান মারাত্মক বিভ্রান্তি বা বিপর্যয় সৃষ্টি করে সামন্ত শক্তিসমূহ আর আমলাতান্ত্রিক বুর্জোয়া উপদলগুলোকে সাহায্য করে।

আমরা যখন ফিলিস্তিনের দিকে তাকাই, জাতিয় মুক্তি ও গণতান্ত্রিক বিপ্লবের বিরুদ্ধে হামাসের প্রতিবিপ্লবী ভুমিকা আমরা দেখতে পাই। গাজা উপত্যাকায় হামাস গণতান্ত্রিক ধারার বিপরিতে কাজ করেছে। তারা ধর্মীয় কুসংস্কারবাদ ছড়িয়েছে, এরা ইসলামিক “পুনঃ জাগরন” ইত্যাদির পক্ষে জাতীয় মুক্তির বিষয়টিকে নেতিকরণ করেছে। এসবই মুসলিম ভ্রাতৃত্বর সামন্তবাদী মতাদর্শের সাথে বিজড়িত।

যখন আমরা ইরাকের দিকে থাকাই, সেখানে আমরা দেখতে পাই কিভাবে “ ইরাক ও অন্যান্য অঞ্চল সহ ইসলামিক রাষ্ট্র” সংগঠনটি সামন্তবাদি শক্তিসমূহের দ্বারা সৃষ্ট হয়েছে। এবং সেই একই ঘটনা আফগানিস্থানেও ঘটেছে তালিবান উপদলগুলির ক্ষেত্রে। সিরিয়াতে আমরা দেখতে পাই, সিরিয়ান ফ্যাসিবাদি রাষ্ট্রের “বিরোধী”রা সাম্রাজ্যবাদি শক্তিসমূহের সাথে যুক্ত আমলাতান্ত্রিক পুঁজিপতি আর সামন্তবাদী শক্তিসমূহ নিয়ে গঠিত ( ফ্রান্স ও অ্যামেরিকার মত সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহের সাথে যুক্ত)। ইউক্রেনে, এটা পরিষ্কার যে, সেখানকার লড়াইটা চলছে আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদী উপদলগুলির মধ্যে – একদিকে মার্কিন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নপন্থী আর অন্যদিকে রুশপন্থী।

বাস্তবতা হলো, নিপিড়িত দেশসমূহে, গণযুদ্ধ না থাকলে, সাধারণ জনগণ সর্বদাই সামন্তবাদি অথবা আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদীদের উপদলসমূহের কাছে বন্দী হয়েই থাকে, পরস্পর বিরোধী অবস্থানে একেকজন একেক সাম্রাজ্যবাদী শক্তির প্রতি সমর্পিত থাকে। আমাদের এই ধারণা ভিন্ন যে কোন ধারণাই গনতান্ত্রিক বিপ্লবের প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করে। যেখানে আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদী উপদলের সংবিধানে সামন্তবাদই অনুমোদনকারী ভিত্তি সেখানে সামন্তবাদের বিরুদ্ধে আক্রমণাভিযান পরিচালনা না করে কীভাবে অগ্রগতি হতে পারে?

এই প্রসঙ্গে ইব্রাহীম কায়পাক্কায়া বলেনঃ

“আধা-উপনিবেশিক আধা-সামন্তবাদী দেশসমূহে সাম্রাজ্যবাদ বনাম দেশের মধ্যে দ্বন্দ্বের ওপর নেতৃত্বকারী ও নির্ধারক ভুমিকা পালনকারী “দ্বন্দ্ব”টি হচ্ছে বস্তুত সামন্তবাদ ও ব্যাপক জনগণের মধ্যকার দ্বন্দ্ব।

সাম্রাজ্যবাদ এসব দেশে তার অস্তিত্ব ও আধিপত্য বজায় রাখে iboসামন্তবাদকে রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক ক্ষেত্রে টিকিয়ে রেখে, একে শক্তিশালি করে এবং সামন্ত মালিকানা ও সামন্ত সম্পর্কের বিলোপের গতিকে শ্লথ করে।”

[সিপিএমএলএম বাংলাদেশ-সিপিএমএলএম ফ্রান্স-এর যৌথ দলিল ‘আধা উপনিবেশবাদ ও আধা সামন্তবাদের মধ্যে সম্পর্ক’তে উদ্ধৃত]

যখন সামন্তবাদ সাম্রাজ্যবাদ ও আধা উপনিবেশিক আধা সামন্তবাদী সম্প্রসারনবাদী শক্তিসমূহের দ্বারা সমর্থিত হয়, তখন তা বেশ শক্তিশালী হয়ে উঠে, এবং তা রোমান্টিকতাবাদের মাধ্যমে জনগণের মন জয় করে নেয়। এটা নিপিড়িত দেশগুলিতেই শুধু নয়, সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলির সেক্টরের ক্ষেত্রেও সত্য। ট্রটস্কিবাদ সামান্তবাদী মতাদর্শকে সহায়তা করে একটি “প্রতিরোধ” ও প্রগতিশীল হিসেবে একে হাজির করে।

নয়া ইহুদিবাদীদের কর্তৃক গাজায় আগ্রাসনের পর থেকে ফ্রান্স, জার্মানী, বেলজিয়াম, অস্ট্রিয়া প্রভৃতি পশ্চিম ইউরোপীয় দেশে সেমিটিক বিরোধী চিহ্নিত বিক্ষোভের মাধ্যমে এটা পরিষ্কার হয়েছে। এই বিক্ষোভ সমাবেশগুলো করেছে লক্ষ্যনীয়ভাবে ইসলামবাদী শক্তিগুলো – বিশেষ করে তুর্কি সম্প্রদায়ের মুসলিম ভ্রাতৃসংঘ – এবং ট্রটস্কিবাদীদের ঘোঁট।

সাধারণ জনগণকে অবশ্যই বর্তমান দুনিয়ার বাস্তবতার সামন্তবাদী দিক ও এর সমর্থনে ট্রটস্কীবাদের ভুমিকা সম্পর্কে ভালোভাবে সচেতন হওয়া দরকার।

grcp-11

মার্কসবাদী-লেনিনবাদী-মাওবাদী কমিউনিস্ট পার্টি ( ফ্রান্স)

জুলাই ২০১৪

 

সূত্রঃ http://sarbaharapath.com/?p=1088

Advertisements

মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবঃ কমরেড গণজালো, সিরাজ সিকদার, ইব্রাহীম কায়পাক্কায়া ও আকরাম ইয়ারি’র অবস্থান

vv

 

মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লব

 

কমরেড আকরাম ইয়ারি কি নিজেকে মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ফসল হিসেবে বিবেচনা করেছেন?

পিওয়াইও সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ঝড়ো বছরগুলিতে সক্রিয় ছিল।  আফগানিস্তানের কমরেড আকরাম ইয়ারি সর্বহারা বিপ্লব এবং মার্কসবাদ-লেনিনবাদে চেয়ারম্যান মাওসেতুঙের অবদানের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানান এবং একে মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওসেতুঙ চিন্তাধারা হিসেবে গ্রহণ করেন আফগানিস্তানের মূর্ত নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে প্রযোজ্য হিসেবে।

তিনি মাওসেতুঙ চিন্তাধারাকে আধুনিক সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে বিশ্ব সর্বহারার আন্তর্জাতিক ব্যানার হিসেবে বিবেচনা করেন।তিনি ক্রুশ্চেভের “তিন শান্তিপূর্ণ” ও “দু্ই সমগ্র” সম্পূর্ণভাবে বর্জন করেন।

তিনি পূর্ণত উপলব্ধি করেন যে পিওয়াইও নিশ্চিতভাবে মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পথনির্দেশের লড়াকু ফ্রন্ট লাইন হতে পারে যাতে সে ক্রুশ্চেভপন্থী সংশোধনবাদী পার্টি “আফগানিস্তানের জনগণতান্ত্রিক পার্টি”র বিরুদ্ধে সংগ্রামে নেতৃত্ব দিতে পারে।

কমরেড ইব্রাহিম কায়পাক্কায়া কি নিজেকে মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ফসল হিসেবে বিবেচনা করেছেন?

টিআইআইকেপির কর্মসূচির সমালোচনাতে ইব্রাহিম কায়পাক্কায়া ব্যাখ্যা করেন: “আমাদের আন্দোলন হচ্ছে মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ফল।”

কমরেড সিরাজ সিকদার কি নিজেকে মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ফসল হিসেবে বিবেচনা করেছেন?

সিরাজ সিকদার চিন্তাধারা ছিল মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লব ভিত্তিক। একটি সর্বহারা শ্রেণীর পার্টি গড়ে তোলার মতাদর্শিক প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য সিরাজ সিকদার ১৯৬৭ সালে মাও সেতুঙ গবেষণাগার গঠন করেন এবং মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাও সেতুঙ চিন্তাধারাকে মার্কসবাদের তৃতীয় স্তর ঘোষণা করেন। তিনি মস্কোপন্থী ও পিকিংপন্থী নির্বিশেষে সকল ধরণের ভ্রান্ত ধারার বিরুদ্ধে আপোষহীন সংগ্রাম পরিচালনা করেন। চীনা রাষ্ট্র পাকিস্তান রাষ্ট্রের সাথে ১৯৭১-এ আপোষ করে যখন সিরাজ সিকদার পাকিস্তান ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গণযুদ্ধ পরিচালনা করছিলেন। তিনি চীনপন্থী বা চীনের রাষ্ট্রের যে কোন ততপরতাকেই মাওবাদী বিবেচনা করেননি। এটা ছিল মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের তার গভীর উপলব্ধি যা তাকে চালিত করেছে যে কোন ধরণের সংশোধনবাদকে বর্জন করতে তার নাম ও রূপ যাই হোক না কেন।

কমরেড গনসালো কি নিজেকে মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ফসল হিসেবে বিবেচনা করেছেন?

হ্যাঁ, তার ১৯৮৮-র সাক্ষাতকারে, গনসালো ব্যাখ্যা করেন কীভাবে মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লব তাকে হোসে কার্লোস মেরিয়েতেগুইকে সত্যিকারভাবেবুঝতে সক্ষম করেছে।

“হ্যাঁ, আমি চীনে ছিলাম। চীনেআমার সৌভাগ্য হয়েছিল একটা স্কুলে শিক্ষা নিতে যেখানে আন্তর্জাতিক প্রশ্ন থেকে মার্কসবাদী দর্শন পর্যন্ত রাজনীতি শিক্ষা দেয়া হয়েছে।

পরীক্ষিত ও উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন মহান শিক্ষক বিপ্লবীগণ পাণ্ডিত্যপূর্ণ শিক্ষা প্রদান করেন। তাদের মধ্যে আমার মনে আছে আমাদের প্রকাশ্য ও গোপন কাজ সম্পর্কে শিক্ষা দেন এক শিক্ষক যিনি তার সমগ্র জীবন পার্টির জন্য, কেবলপার্টিরজন্য জীবন উতসর্গ করেছেন বহু বছর ধরে – এক জীবন্ত উদাহারণ ও অসাধারণ শিক্ষক।

তিনি আমাদের বহু জিনিস শিক্ষা দিয়েছেন, এবং তিনি আমাদের আরো অনেক কিছু শিখাতে চেয়েছেন কিন্তু কেউ কেউ তা গ্রহণ করেনি, সবচেয়ে বড় কথা এই জীবনে বহু ধরণের মানুষ আছে। পরে তারা আমাদের সামরিক বিষয়ে শিক্ষা দেন। কিন্তু এখানেও তারা রাজনীতি থেকে শুরু করে গনযুদ্ধ, তারপর সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলা, রণনীতি ও রণকৌশল শেখান। তারপর তার সাথে যে ব্যবহারিক দিক যেমন, এ্যামবুশ, আক্রমণ, সামরিক চলাফেরা এবং বিস্ফোরক তৈরি করা।

যখন আমরা বিপজ্জনক রাসায়নিক নাড়াচাড়া করছিলাম তারা আমাদের আহ্বান জানান সর্বদাই মতাদর্শকে প্রথম ও সর্বাগ্রে রাখতে, কারণ তা আমাদের সক্ষম করবে যে কোন কিছুই করতে, ও ভালভাবে করতে।

আমরা শিখলাম আমাদের প্রথম বিস্ফোরণ ঘটাতে।আমার জন্য এটা একটা স্মরণীয় উদাহারণ ও অভিজ্ঞতা, এক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা, আমার বিকাশে এক বড় পদক্ষেপ দুনিয়ার অভূতপুর্ব উচ্চতম স্কুলে ট্রেনিং নেওয়া।

আচ্ছা আপনি যদি একটা উপাখ্যান চান, এখানে তা। আমরা যখন বিস্ফোরক সংক্রান্ত পাঠ শেষ করলাম, তারা আমাদের বললেন যে সবকিছুই বিস্ফোরিত হতে পারে।

তাই, পাঠের শেষে আমরা একটা কলম নিলাম, তা বিস্ফোরিত হল, যখন আমরা আসন গ্রহণ করলাম, তা বিস্ফোরিত হল। এটা ছিলসাধারণ আগুণে কার্যকলাপ প্রদর্শন।

এগুলো ছিল নিখাদ হিসেবকৃত ‍উদাহারণ, আমাদের দেখাতে যে সবকিছুই বিস্ফোরিত হতে পারে যদি আপনি ঠিক করেন কীভাবে করবেন। আমরা অব্যাহতভাবে প্রশ্ন করি, “কীভাবে করলেন?কীভাবে করলেন?” তারা আমাদের বললেন, ব্যস্ত হয়োনা, ব্যস্ত হয়োনা, তোমরা ইতিমধ্যেই অনেক কিছু শিখেছ। মনে রেখ, জনগণ কী করতে পারে, তাদের রয়েছে অফুরন্ত সৃজনশীলতা, আমরা তোমাদের যা শেখালাম তা জনগণ করবে এবং তোমাদের সবকিছুই আবারো শেখাবে। এসবই তারা আমাদের বলেছেন। ঐ স্কুল আমার বিকাশে বিরাট অবদান রেখেছে এবং চেয়ারম্যান মাওসেতুঙের মূল্য বুঝতে শুরু করায় সাহায্য করেছে।

পরবর্তীতে আমি আরো কিছু অধ্যয়ন করি এবং আমি তা প্রয়োগ করতে চেষ্টা করি। আমার মনে হয়, চেয়ারম্যান মাওসেতুঙ, মাওবাদ এবং মাওয়ের অনুশীলন থেকে আমার এখনো প্রচুর শেখার আছে।

এটা এইনা যে আমি তার সাথে আমার নিজেকে তুলনা করছি, সরলভাবে এটা হচ্ছে আমার লক্ষ্য অর্জন করতে উচ্চতম শিখরকে রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করা। চীনে আমার অবস্থান ছিল স্মরণীয় এক অভিজ্ঞতা।

আমি সেখানে আরেক সময় ছিলাম যখন মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লব শুরু হচ্ছিল। আমরা তাদের কাছে মাওসেতুঙ চিন্তাধারা বলে যা বলা হয়েছে তার ব্যাখ্যা করতে বললাম। তারা আমাদের বেশিকিছু শেখালেন যা আমাকে বুঝতে সাহায্য করেছে, আমি বলব একটু বেশি, একটাযোগসূত্র যে যতবেশি আমি মাওসেতুঙকে বুঝি ততই আমি মেরিয়েতেগুইকে প্রশংসা করি ও মুল্য দেই।

যেহেতু মাও আমাদের আহ্বান জানান সৃজনশীলভাবে প্রয়োগ করতে, আমি ফিরে যাই ও মেরিয়েতেগুইকে পুনরায় অধ্যয়ন করি, আর দেখি যে তিনি ছিলেন আমাদের প্রথম সারির মার্কসবাদী-লেনিনবাদী যে আমাদের সমাজকে সমগ্রভাবে বিশ্লেষণ করেছেন।  এটা কঠিন সত্য।


অক্টোবর বিপ্লব ও কমরেড লেনিন

7518952_orig

অক্টোবর বিপ্লব ও কমরেড লেনিন

বিগত ১৯১৭ সালের ৭ নভেম্বর রুশ দেশে বলশেভিক পার্টি ও তার নেতা কমরেড লেনিনের নেতৃত্বে মহান অক্টোবর বিপ্লব সম্পন্ন হয়। বলশেভিক পার্টিকে ১৯০৫ সালের বিপ্লবী উত্থান, ১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের অভিজ্ঞতার ভিতর দিয়ে ১৯১৭ সালের ৭ নভেম্বর শ্রমিক শ্রেণির নেতৃত্বে মহান সর্বহারা সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করতে হয়। অক্টোবর বিপ্লব ছিল শ্রমিক শ্রেণির এক সফল পদক্ষেপ, পৃথিবীর ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা। ১৮৭১ সালে ঐতিহাসিক প্যারি কমিউন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শ্রমিক শ্রেণি রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের প্রয়াস চালালেও নানা কারণে তা ব্যর্থ হয়। রুশ দেশের শ্রমিক শ্রেণি প্যারি কমিউনের অজেয় শিক্ষা সামনে নিয়েই ১৯১৭ সালের ৭ নভেম্বর অক্টোবর বিপ্লবের মধ্য দিয়ে পুরাতন স্বৈরতান্ত্রিক জারতান্ত্রিক রাষ্ট্র যন্ত্রকে চূর্ণ করে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে পৃথিবীর বুকে প্রথম শ্রমিক শ্রেণির রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করে। অক্টোবর বিপ্লবের মাধ্যমে পৃথিবীর মানচিত্রে পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থার বিপরীতে সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার উদ্ভব ঘটে। অক্টোবর বিপ্লবের পর রুশ দেশের শ্রমিক শ্রেণি মানুষের ওপর মানুষের চাপিয়ে দেওয়া শোষণের চির অবসান ঘোষণা করে শ্রেণিহীন সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সমাজতান্ত্রিক বিনির্মাণের পথে যাত্রা শুরু করে। ইতিপূর্বেকার বিপ্লবগুলি শুধুমাত্র এক শোষকের পরিবর্তে অন্য শোষকের নিকট ক্ষমতার হস্তান্তর ঘটেছে। এই ক্ষেত্রে অক্টোবর বিপ্লব ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন। অক্টোবর বিপ্লব নিছক এক শোষকের পরিবর্তে অন্য শোষকের নিকট ক্ষমতার হস্তান্তর ছিল না। অক্টোবর বিপ্লব জারতন্ত্রকে উচ্ছেদ করে, কুলাকদের জমি বাজেয়াপ্ত করে ও তাদের ক্ষমতাকে ধ্বংস করে; গির্জা ও মঠের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে রাষ্ট্রের সম্পত্তিতে পরিণত করে; পুরোহিততন্ত্র ও ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে আলাদা করে। অক্টোবর বিপ্লব পুঁজিতন্ত্রকে চূর্ণ করে, বুর্জোয়া শ্রেণির নিকট থেকে উৎপাদনের সকল উপকরণগুলি ছিনিয়ে নেয়; কলকারখানা, জমি, রেলপথ, ব্যাংক প্রভৃতিকে সমগ্র জনগণের সাধারণ সম্পত্তিতে পরিণত করে। অক্টোবর বিপ্লব বুর্জোয়া শ্রেণি ও জোতদার জমিদারদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে এবং তাদের ক্ষমতাকে চূর্ণ করে রুশ দেশে সোভিয়েত যুগের সূচনা করে।রুশ দেশে অক্টোবর বিপ্লবের অবিসংবাদিত নেতা ছিলেন রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক লেবার পার্টি (বলশেভিক) এর নেতা কমরেড লেলিন। কমরেড ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়ানভ লেনিন ১৮৭০ সালের ২২ এপ্রিল রাশিয়ার ভলগা নদীর তীরবর্তী সিমবিস্ক শহরে জন্ম গ্রহণ করেন এবং ১৯২৪ সালের ২১ জানুয়ারি মস্কোতে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর পিতার নাম ছিল ইলিয়া নিকোলায়েভিচ উলিয়ানভ। ইলিয়া নিকোলয়েভিচ উলিয়ানভ কাজান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করে প্রথমে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, পরে স্কুল পরিদর্শক ও পরিচালক হিসাবে সরকারি চাকুরীতে যুক্ত ছিলেন। ভøাদিমির ইলিচ উলিয়ানভ ( লেনিন) স্কুল জীবনের শিক্ষা সমাপ্ত করে ১৮৮৭সালে কাজান বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মধ্যে জারতন্ত্র বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে যোগ দিয়ে তিনি জারের পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিতাড়িত হন। কাজান শহরে লেনিন গোপন মার্কসবাদী চক্রের সাথে যুক্ত হন এবং মার্কসবাদের ওপর গভীর ব্যুৎপত্তি লাভ করেন। ১৮৯৩ সালের শেষ পর্যায়ে কমরেড লেনিন সেন্টপিটার্সবুর্গ শহরে এবং শ্রমিক শ্রেণীর মার্কসবাদী চক্রগুলির সাথে গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলেন। রাশিয়ার সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে মার্কসবাদ প্রয়োগের ব্যাপারে তার অসাধারণ দক্ষতা, শ্রমিক শ্রেণির আদর্শের সুনিশ্চিত জয়ের ব্যাপারে তাঁর অবিচল আস্থা বিশ্বাস, সংগঠক হিসাবে তাঁর প্রতিভা দিয়ে ১৮৯৫ সালে সেন্টপিটার্সবুর্গের মার্কসবাদী চক্রগুলিকে একত্রিত করতে সক্ষম হন। বিপ্লবী মার্কসবাদী পার্টি গঠন করার লক্ষ্যে তিনি সেন্টপিটার্সবুর্গের ২০টি মার্কসবাদী চক্রকে একত্রিত করে নামকরণ করেন ‘শ্রমিক শ্রেণির মুক্তি সংগ্রাম সংঘ’ (লীগ অব স্ট্রাগল ফর দি ইমান্সসিপেশন অব দি ওয়ার্কিং ক্লাস)। কমরেড লেনিন শ্রমিক শ্রেণির মুক্তি সংগ্রাম গুরুত্ব সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে বলেন যে, শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলনের পৃষ্ঠপোষকতায় ইহাই হইল সংগঠিত বিপ্লবী পার্টির প্রথম সূত্রপাত।

ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধেও রাশিয়াতে ভূমিদাস প্রথার অবসান ঘটেনি। পশ্চিম ইউরোপের অধিকাংশ দেশে সামন্ততন্ত্র উচ্ছেদ করে বুর্জোয়া শ্রেণী রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করলেও রাশিয়াতে বুর্জোয়া শ্রেণী ও শিল্পের বিকাশ তখনও সেই অর্থে ঘটেনি। রাশিয়াতে টিকে ছিল জারের কঠিন কঠোর একনায়কত্ব। রাশিয়ার অর্থনীতি ছিল তখনও কৃষি নির্ভর। আর ভূমির মালিকানা ছিল জমিদার জোতদার কুলাকদের হাতে। ক্রিমিয়া যুদ্ধের পরিণতিতে ১৮৫৫ সালে রাশিয়াতে ব্যাপক কৃষক বিদ্রোহ শুরু হয়। জার সরকার সর্বশক্তি প্রয়োগ করে কৃষক বিদ্রোহ দমনে ব্যর্থ হয়ে অবশেষে ১৮৬১ সালে রাশিয়া থেকে ভূমিদাস প্রথা অবসানের আইন পাশ করে। ভূমিদাস প্রথার আনুষ্ঠানিক অবসান ঘোষণা করিলেও কৃষকগণ জমিদার জোতদার কুলাকদের নিকট নগদ অর্থের বিনিময়ে ভূমিদাসত্ব থেকে মুক্তির অধিকার অর্জন করতে হয়। এইভাবে রাশিয়ার জমিদার জোতদার কুলাকরা চাষিদের মুক্তির মূল্যস্বরূপ ২০০ কোটি রুবল আদায় করে নেয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে জমিদাররা চাষিদের মুক্তির মূল্য স্বরূপ এতদিনকার ব্যবহৃত জমির বড় অংশ ঘিরিয়া লইয়া চাষিদের নিকট থেকে কাড়িয়া লয়। এই সময়ে জার সরকার জমির বেচা কেনার আইন চালু করে। স্বল্প জমির মালিক অধিকাংশ চাষি মূলধনের অভাবে জমিতে চাষ আবাদ করতে ব্যর্থ হয়ে কুলাকদের কাছে জমি বিক্রি করতে বাধ্য হয়। এই সময়ে টাকার অংকে খাজনা দেওয়ার প্রথা চালু হয়। চাষিদের অত্যন্ত কঠিন শর্তে জমিদারের নিকট থেকে জমি ইজারা নিতে হতো। অধিকাংশ ক্ষেত্রে শস্য সংগ্রহকালে জমিদারকে উৎপন্ন ফসলের অর্ধেক ফসলি খাজনা হিসাবে দিতে হতো। যার প্রেক্ষিতে ভূমিদাসত্ব থেকে মুক্তির পর রাশিয়ার অধিকাংশ কৃষককে ভূমিহীন কৃষকে পরিণত হতে হয়।ভূমিদাস প্রথার অবসান ঘটার পর রাশিয়াতে দ্রুত পুঁজিবাদের বিকাশ ঘটতে থাকে। ১৮৬০ সাল থেকে ১৮৯০ সাল পর্যন্ত রাশিয়ায় শিল্প শ্রমিকের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি হয়। ঊনবিংশ শতকের শেষ দশকে শিল্পে নিযুক্ত শ্রমিকের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় পূর্বের তুলনায় দ্বিগুণ হয়। এই সময়ে রাশিয়াতে রেলপথ নির্মাণের ব্যাপক উদ্যোগ লক্ষ্য করা যায়। যার পরিপ্রেক্ষিতে ঊনবিংশ শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকে রাশিয়ায় শিল্প বিকাশের তেজিভাব আসে। রেলপথ বিস্তারের দরুন রেলের ইঞ্জিন, কোচ ও রেলের ট্রাক প্রস্তুতে ইস্পাতের চাহিদা বৃদ্ধি পায়। ফলে আকরিক লোহা, কয়লা ও জ্বালানি তেলের চাহিদা বৃদ্ধি পায়। ফলে রাশিয়াতে ধাতব ও জ্বালানি শিল্পের ব্যাপক বিকাশ শুরু হয়। এই পর্বে রাশিয়াতে ব্যাপক হারে বিদেশি পুঁজির লগ্নি বৃদ্ধি পায়। রাশিয়ায় পুঁজিবাদের বিকাশ শুরু হলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিম ইউরোপের পুঁজিবাদী দেশগুলোর তুলনায় রাশিয়া ছিল অনেক পশ্চাৎপদ। রাশিয়াতে শিল্পের প্রয়োজনীয় কাঁচামালের প্রাচুর্য ও শ্রমশক্তি ছিল তুলনামূলকভাবে সস্তা। তাই রাশিয়ার কাঁচামাল ও সস্তা শ্রমশক্তি লুটপাটের লক্ষ্যে পশ্চিম ইউরোপ ও মার্কিন পুঁজিপতিরা রাশিয়াতে পুঁজি লগ্নি করতে শুরু করে। এর ফলে রাশিয়ার বিরাট বিরাট শিল্প উদ্যোগ গড়ে ওঠে। এই সব পুঁজিতান্ত্রিক শিল্পায়তনে শ্রমিকদের নতুন এক সমস্বার্থবোধ জন্মায় এবং শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যে সংগ্রামশীল বিপ্লবী গুণ জন্ম লাভ করে। রাশিয়াতে বিপ্লব পূর্বকালে অন্যান্য পুঁজিবাদী দেশের মতোই শিল্প ক্ষেত্রে তেজি ভাব আর সঙ্কট, উৎপাদনে অচলাবস্থা ঘুরে ফিরে বার বারই আসতে থাকে। যার ফলে লক্ষ লক্ষ শ্রমিকের দারিদ্র্য ও বেকারত্ব বৃদ্ধি পায়। সেই সাথে বুর্জোয়া শ্রেণীর বিরুদ্ধে শ্রমিক শ্রেণীর শ্রেণী সংগ্রাম তীব্র হয়।কমরেড লেনিন সারা দেশব্যাপী শ্রমিক শ্রেণীর একটি রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলার ব্যাপারে মনোনিবেশ করেন। ১৮৯৫ সালের ডিসেম্বর মাসে কমরেড লেনিনকে জার সরকার গ্রেফতার করে। জেলাখানায় বসিয়াও কমরেড লেনিন বিপ্লবী কর্মকা- থেকে বিরত হন নাই। তিনি শ্রমিক শ্রেণীর মুক্তি সংগ্রাম সংঘকে পরামর্শ ও নির্দেশ দিতেন; বিভিন্ন পুস্তিকা ও ইস্তেহার রচনা করিয়া জার সরকারের অত্যাচারের মুখোশ খুলিয়া দিতেন। সেন্টপিটার্সবুর্গের শ্রমিক শ্রেণীর মুক্তি সংগ্রাম সংঘের কর্ম তৎপরতা রুশ দেশের অন্যান্য প্রদেশ ও শহরগুলির শ্রমিক সংস্থাগুলির মধ্যে প্রবল উৎসাহ সঞ্চার করে এবং এই সব সংস্থাগুলি পরস্পরের সাথে মিলিত হইয়া অনুরূপ সংঘ গঠন করিতে থাকে। সেন্টপিটার্সবুর্গ, মস্কো, কিয়েভ ও অন্যান্য শহরে শ্রমিক শ্রেণীর মুক্তি সংগ্রাম সংঘ গড়িয়া ওঠে। রুশ দেশের পশ্চিমের সীমান্ত প্রদেশগুলিতে সোস্যাল ডেমোক্রাটিক সংগঠনসমূহ গড়িয়া উঠিতে থাকে। ঊনবিংশ শতকের শেষ দশকের শেষভাগে মার্কসবাদী ধারার অনুসারী শ্রমিক সংস্থাগুলো পোল্যান্ড, লিথুয়ানিয়া ও লাটভিয়ায় সোস্যাল ডেমোক্রাটিক সংগঠন গড়িয়া ওঠে। ১৮৯৭ সালের অক্টোবর মাসে বুন্দ নামে পরিচিত ইহুদিদের জেনারেল সোস্যাল ডেমোক্রাটিক ইউনিয়ন রুশ দেশের পশ্চিমের প্রদেশগুলিতে গড়িয়া ওঠে। ১৮৯৮ সালে সেন্টপিটার্সবুর্গ, মস্কো, কিয়েভ ও একতোরনোস্লাভের শ্রমিক শ্রেণীর মুক্তি সংগ্রাম সংঘের সংগঠনগুলি বুন্দ এর সহযোগে ঐক্যবদ্ধভাবে একটি সোস্যাল ডেমোক্রাটিক পার্টি গড়িয়া তুলিতে উদ্যোগ নেয়। সোস্যাল ডেমোক্রাটিক মতবাদের এই সব অনুসারীরা ১৮৯৮ সালের মার্চ বেলারুশের মিনস্ক শহরে প্রথম কংগ্রেসের মাধ্যমে রুশ সোস্যাল ডেমোক্রাটিক লেবার পার্টি (আরএসএলডিপি) নামে একটি সংগঠন দাঁড় করায়। এই সময়ে কমরেড লেনিন সাইবেরিয়ায় নির্বাসনে থাকায় তিনি এই কংগ্রেসে উপস্থিত থাকতে পারেন নাই।১৯০০ সালে কমরেড লেনিন সাইবেরিয়ার নির্বাসন থেকে মুক্তি লাভ করেন। নির্বাসনে থাকাকালীন সময়ে কমরেড লেনিন সমগ্র রুশদেশের জন্য একটি একটি বেআইনি সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন। এই সময়ে রুশ সোস্যাল ডেমোক্রাটিক লেবার পার্টির বাইরেও বিভিন্ন ছোট ছোট মার্কসবাদী গ্রুপ ক্রিয়াশীল ছিল। আবার রুশ সোস্যাল ডেমোক্রাটিক লেবার পার্টির অভ্যন্তরেও বিভিন্ন মতাদর্শগত বিভ্রান্তি ক্রিয়াশীল ছিল। এই সব ভ্রান্ত মতাদর্শের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে সমগ্র পার্টিকে একই মতাদর্শে শিক্ষিত করা এবং সক্রিয় বিভিন্ন মার্কসবাদী চক্রগুলিকে ঐক্যবদ্ধ করে একই সংগঠনে টেনে আনা রাশিয়ার বিপ্লবী মার্কসবাদীদের দায়িত্ব হয়ে পড়ে। কমরেড লেনিন এই দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন। নির্বাসন থেকে ফেরার পথে কমরেড লেনিন সারা রাশিয়া ব্যাপী একটি বেআইনি মার্কসবাদী বেইআইনি সংবাদপত্র প্রকাশের তাঁর পরিকল্পনা নিয়ে উফা, পস্কভ, মস্কো ও সেন্টপিটার্সবুর্গে অনেকগুলি আলোচনা সভা করেন। দেশের ভিতরে জার সরকারের গোয়েন্দা পুলিশের নজর এড়িয়ে এই ধরনের সংবাদপত্রের প্রকাশনা অসম্ভব ছিল। বিদেশ থেকে এই ধরনের একটি সংবাদপত্র প্রকাশের বন্দোবস্ত করার লক্ষ্যে কমরেড লেনিন ১৯০০ সালের শরৎকালে বিদেশে পাড়ি জমান। বিদেশে শ্রমিক মুক্তি সংঘের প্লেখানভ, আক্সেলরড ও ডি. জাসুলিচের সঙ্গে আলোচনা করে একত্রে ওই বছরের ডিসেম্বর মাসে ‘ইসক্রা’ নামে একটি সংবাদপত্র প্রকাশ করেন। অবশ্য এই কাগজ প্রকাশ করার সমস্ত ব্যবস্থা আগাগোড়া কমরেড লেনিন করেছিলেন।১৮৯৮ সালে প্রথম কংগ্রেসের ভিতর দিয়ে রুশ সোস্যাল ডেমোক্রাটিক লেবার পার্টি গঠিত হলেও এই পার্টির কোন কর্মসূচি বা নিয়ম কানুন ছিল না। প্রথম কংগ্রেসে যে কেন্দ্রীয় কমিটি নির্বাচিত হয় তাঁরা গ্রেফতার হয়ে যায়। তবে তাঁদের গ্রেফতারের পর এই শূন্য স্থান পূরণের মতো কেউ ছিল না। তাই কংগ্রেসের পরও তাঁদের নীতি সম্পর্কে বিভ্রান্তি এবং ঐক্যবোধের অভাবের দিকটি সামনে আসে। সংগঠনের অভ্যন্তরে মতাদর্শগত ও সংগঠনমূলক বিভ্রান্তি বৃদ্ধি পেতে থাকে। সংগঠনের অভ্যন্তরে সক্রিয় বিভিন্ন সুবিধাবাদী চিন্তার অনুসারীরা শ্রমিক শ্রেণীর ঐক্যবদ্ধ ও কেন্দ্রীভূত পার্টি গঠনের বিরোধিতা করতো এবং সাংগঠনিক ঐক্যবোধের অভাব ও মতাদর্শগত বিভ্রান্তির প্রশংসা করতো। শ্রমিক শ্রেণীর ঐক্যবদ্ধ পার্টি গঠনের ব্যাপারের সংগঠনের মধ্যে নানা বিভ্রান্তি ক্রিয়াশীল ছিল। কেউ কেউ চিন্তা করতো দ্বিতীয় কংগ্রেস আহ্বান করিয়া স্থানীয় সংগঠনগুলিকে সম্মিলিত করে ঐক্যবদ্ধ পার্টি গঠন করতে হবে। কমরেড লেনিন ঐক্যবদ্ধ পার্টি গঠনের প্রক্রিয়ায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। কমরেড লেনিন পার্টির অভ্যন্তরে প্রচারিত এইসব ভ্রান্ত চিন্তার বিরোধিতা করেন। লেনিন মনে করেন, বিপ্লবী সোস্যাল ডেমোক্রাসির নীতি সম্বন্ধে কাগজপত্রে প্রচার চালানো দরকার এবং স্থানীয় সংগঠনগুলিকে সঠিক মতাদর্শকে সুচিন্তিতভাবে বাছিয়া নেয়ার সুযোগ দেয়া দরকার। এই অপরিহার্য কর্তব্য প্রথমে সমাধান করার পরই দ্বিতীয় কংগ্রেস আহ্বান করা দরকার। কমরেড লেনিন ব্যাপারটি সোজাসুজি এইভাবে প্রকাশ করেন, ‘ঐক্যবদ্ধ হইবার পূর্বে এবং ঐক্যবদ্ধ হইবার উদ্দেশ্যেই আমাদের প্রথমেই আমাদের পরস্পর বিরোধী মতাদর্শের মধ্যে পার্থক্যের সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট পার্থক্যের রেখা টানিয়া দেওয়া।’ (লেনিন নির্বাচিত রচনাবলী, প্রথম খন্ড)।

কমরেড লেনিন সারা দেশে শ্রমিক শ্রেণীর একটি ঐক্যবদ্ধ পার্টি গঠনের উদ্দেশ্যে একটি রাজনৈতিক সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠা করাই কাজের আরম্ভ ও কাক্সিক্ষত সংগঠন সৃষ্টির প্রথম ধাপ হিসাবে তুলে ধরেন। কমরেড লেনিন ‘কী করিতে হইবে’ গ্রন্থে শ্রমিক শ্রেণীর ঐক্যবদ্ধ পার্টি গঠনের একটি রূপরেখা তুলে ধরেন। “পার্টির কাঠামো ও গঠন সম্বন্ধে লেনিনের মত ছিল এই যে, পার্টির দুইটি অংশ থাকিবে ঃ (ক) পার্টির নেতৃস্থানীয় নিয়মিত কর্মীদের লইয়া একটি ঘনিষ্ঠ চক্র- এখানে প্রধানত সেই ধরনের কর্মীরা থাকিবেন যাঁহারা পেশাদার বিপ্লবী, অর্থাৎ এমন পার্টি কর্মী যাহারা পার্টির কাজ ছাড়া আর কিছু করেন না এবং যতটুকু থাকা দরকার অন্তত ততটুকু মার্কসবাদী জ্ঞান, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, সংগঠনের অভ্যাস এবং জারের পুলিশের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া ও এড়াইয়া যাওয়ার ক্ষমতা। (খ) স্থানীয় পার্টি সংগঠনগুলির সুবিস্তৃত জাল এবং বহু সংখ্যক এমন পার্টি সভ্য যাহারা লক্ষ লক্ষ মেহনতি জনগণের সহানুভূতি ও সমর্থন ভোগ করেন। লেনিন লিখিয়াছিলেন, আমি জোর করিয়া বলছি যে, (১) ধারাবাহিকতা রক্ষা করার জন্য যদি নেতাদের কোন স্থিতিশীল সংগঠন না থাকে তা হলে কোন বিপ্লবী আন্দোলনই স্থায়ী হয় না; (২) জনগণ যতই স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে অধিক সংখ্যায় সংগ্রামের দিকে আকৃষ্ট হয় …… ততই এইরূপ সংগঠনের প্রয়োজন আরও গুরুতর হয়ে ওঠে, এবং ততই সংগঠনকে আরও মজবুত করার দরকার হয়; (৩) যে সমস্ত লোক বিপ্লবকেই তাহাদের জীবনের একমাত্র পেশা বলিয়া মানিয়া নিয়াছে প্রধানত তাহারাই এই সংগঠনে থাকিবে; একটা স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আমরা এই সংগঠনের সভ্য সংখ্যা যত বেশি পেশাদার বিপ্লবী এবং যাহারা বিপ্লবী কাজকর্মে পুলিশকে প্রতিহত করিতে অভ্যস্ত ও সুকৌশলী, তাহাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখিতে পারি, ততই রাজনৈতিক পুলিশের পক্ষে এই সংগঠন ধ্বংস করা দুঃসাধ্য হইবে; এবং (৫) শ্রমিক শ্রেণী সমাজের অন্যান্য শ্রেণীর জনগণ ততই বেশি সংখ্যায় আন্দোলনে যোগ দিতে ও সক্রিয়ভাবে কাজ করিতে পারিবে। ( লেনিন- নির্বাচিত রচনাবলী)” [বলশেভিক পার্টির ইতিহাস, পৃষ্ঠা- ৪৫]।

কমরেড লেনিনের পরিকল্পনায় প্রকাশিত ইসক্রা পার্টি গঠনে বিপ্লবী সোস্যাল ডেমোক্রাসির পক্ষে এবং অর্থনীতিবাদী, সংস্কারবাদী, সুবিধাবাদী ধারার বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রচার চালায়। ইসক্রার আর একটি অন্যতম কাজ ছিল পার্টির কর্মসূচি প্রণয়ন। পার্টির কর্মসূচির মুসাবিদা করা ছিল অতি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এই পার্টি কর্মসূচির খসড়া প্রণয়নের সময়ে কমরেড লেনিন, প্লেখানভ ও সম্পাদকম-লীর অন্যান্য কমরেডদের মধ্যে মতপার্থক্য উপস্থিত হয়। অবশ্য লেনিনের নেতৃত্বে এই মতপার্থক্য কাটাইয়া বিপ্লবে সর্বহারা শ্রেণীর নেতৃত্বের ভূমিকা এবং সর্বহারা একনায়কত্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা এই খসড়ায় অন্তভুক্ত করা সম্ভব হয়। কৃষি কর্মসূচির অংশটি সম্পূর্ণ লেনিন রচনা করেন। কমরেড লেনিন ভূমিস্বত্বকে জাতীয় সম্পত্তিতে পরিণত করার পক্ষে ছিলেন। তবে তিনি চাষিদের ভূমিদাসত্ব থেকে মুক্তির সময়ে যে সব জমি জমিদাররা কাড়িয়া নিয়াছিল তা ফেরত দেওয়ার দাবি সংগ্রামের প্রথম স্তরে পেশ করার পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেন। আর প্লেখানভ ভূমিস্বত্বকে জাতীয় সম্পত্তিতে পরিণত করার পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেন। খসড়া কর্মসূচি প্রণয়ন ও ইসক্রার মাধ্যমে এই কর্মসূচি প্রচারের পর লেনিন দ্বিতীয় কংগ্রেসের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেন। ১৯০৩ সালের ১৭ জুলাই বিদেশের মাটিতে রুশ সোস্যাল ডেমোক্রাটিক লেবার পার্টির দ্বিতীয় কংগ্রেস শুরু হয়। প্রথমে বেলজিয়ামের ব্রাসেলস শহরে কংগ্রেস শুরু হয়। কিন্তু বেলজিয়ামের পুলিশ ডেলিগেটদের দেশ ত্যাগের নির্দেশ প্রদান করে। ফলে কংগ্রেসের অধিবেশন লন্ডনে স্থানান্তরিত হয়। ২৬টি সংগঠনের প্রতিনিধিরূপে মোট ৪৩ জন সদস্য কংগ্রেসে উপস্থিত থাকেন। প্রত্যেকটি সংগঠনের দুই জন করে প্রতিনিধি পাঠানোর অধিকার ছিল। তবে কয়েকটি সংগঠন মাত্র একজন করে প্রতিনিধি পাঠায়। কংগ্রেসে উপস্থিত ৪৩ জন প্রতিনিধির ৫১টি ভোটের অধিকার ছিল।কংগ্রেসে নানা মতের প্রতিনিধিরা যোগদান করে। তবে অর্থনীতিবাদীরা কোন প্রতিনিধি প্রেরণ করে নাই। উপস্থিত প্রতিনিধিদের মধ্যে অর্থনীতিবাদীদের সাথে সরাসরি যুক্ত কেউ না থাকিলেও কোন কোন প্রতিনিধির ওপর অর্থনীতিবাদীদের প্রভাব ছিল। তাছাড়া বুন্দ এর প্রতিনিধিরা অর্থনীতিবাদীদের সমর্থক ছিল। ফলে কংগ্রেসের পরিস্থিতি বেশ জটিল ছিল। খসড়া কর্মসূচির অনুমোদন সুনিশ্চিত করার জন্য লেনিনকে বিশেষভাবে পরিশ্রম করতে হয়। কংগ্রেসে উপস্থিত সুবিধাবাদীরা বিভিন্ন প্রশ্নে এই খসড়া কর্মসূচির বিরোধিতা করে। কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার সময়ে সুবিধাদীরা সর্বহারা একনায়কত্বের প্রশ্ন সম্পর্কে তীব্র আপত্তি উপস্থিত করে। তারা সর্বহারা একনায়কত্বের বিষয়টি কর্মসূচি থেকে বাদ দেওয়ার দাবি করে। কৃষক সমস্যা সম্বন্ধে খসড়া কর্মসূচির দাবিগুলি অন্তর্ভুক্ত করতে সুবিধাবাদীরা আপত্তি প্রকাশ করে। প্রত্যেক জাতির আত্মনিয়ন্ত্রাধিকারের দাবি সম্পর্কে বুন্দপন্থী এবং পোলিশ সোস্যাল ডেমোক্রাটরা দাবি জানায়। কমরেড লেনিন দাবি করেন, কর্মসূচির মধ্যে জাতিগত আত্মনিয়ন্ত্রাধিকারের দাবি অন্তভুক্ত না করার অর্থ হলো সর্বহারা আন্তর্জাতিকতাবাদকে পরিত্যাগ করা এবং জাতিগত উৎপীড়নের সহায়তা করা। ইসক্রাতে যে কর্মসূচির প্রস্তাব করা হয়েছিল কংগ্রেসে তা গৃহীত হয়। রাশিয়াতে অক্টোবর বিপ্লবের পর অষ্টম পার্টি কংগ্রেসে নতুন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। এর আগ পর্যন্ত দ্বিতীয় কংগ্রেসে গৃহীত পার্টির কর্মসূচি অব্যাহত ছিল।কর্মসূচি গ্রহণের পর দ্বিতীয় কংগ্রেসে পার্টির নিয়ম কানুন সম্বন্ধে খসড়া নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। পার্টির মধ্যে সঙ্কীর্ণ চিন্তা, সাংগঠনিক ঐক্য ও কঠোর নিয়মানুবর্তিতা প্রতিষ্ঠার জন্য নিয়মকানুন নির্দিষ্ট করা প্রয়োজন হয়ে পড়ে। কিন্তু পার্টির নিয়মকানুন নিয়ে কংগ্রেসে তীব্র মতপার্থক্য সৃষ্টি হয়। পার্টি সদস্য হওয়া সম্পর্কে নিয়মকানুনের প্রথম অনুচ্ছেদে যে সংজ্ঞা ছিল তা নিয়ে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়। পার্টি সদস্য কে হতে পারবে, কিভাবে পার্টি গঠিত হবে, পার্টি সংগঠনের প্রকৃতি কেমন হবে, মজবুত সংগঠন চাই না আগলা ধরনের একটা কিছু হলে চলবে- এই সব প্রশ্নে কমরেড লেনিন ও ইসক্রা পন্থীদের সাথে মার্টভ ও তার অনুসারীদের তীব্র মতপার্থক্য প্রকাশ পায়। কমরেড লেনিনের বক্তব্য সমর্থন করেন প্লেখানভ ও স্থিরমতি ইসক্রা পন্থীরা। আর মার্টভের বক্তব্য সমর্থন করেন সমর্থন করেন আক্সেলরড, জাসুলিস, ট্রটস্কি ও সুবিধাবাদীরা। লেনিনের বক্তব্য অনুসারে যে ব্যক্তি পার্টির কর্মসূচি মানবে, পার্টিকে অর্থ দিয়া সাহায্য করবে এবং পার্টির কোন না কোন সংগঠনে সংশ্লিষ্ট থাকবে তাকেই সভ্য করা হবে। মার্টভের মতে কর্মসূচি মেনে নেওয়া ও অর্থ সাহায্য করা পার্টি সভ্য হওয়ার পক্ষে অবশ্য কর্তব্য হলেও প্রত্যেককেই যে কোন না কোন সংগঠনের সংগঠিত থাকতে হবে এমন কোন শর্ত থাকা উচিত নয়। কমরেড লেনিন ও তার সমর্থক ইসক্রা পন্থীরা মনোলিথিক, সংগ্রামশীল সুনির্দিষ্ট সংগঠনে সংগঠিত পার্টি গড়ার জন্য চেষ্টা করেন। আর মার্টভের সমর্থকরা চেয়েছিল এমন একটি পার্টি যা বিভিন্ন মতের লোক নিয়ে আগলা অসংবদ্ধ ও অবয়বহীন ধরনের। পার্টির নিয়মাবলীর এই অনুচ্ছেদ প্রশ্নে তীব্র বিতর্কের পর কংগ্রেসে ভোটাভুটি হয়। এতে মার্টভের প্রস্তাবের পক্ষে পড়ে ২৮ ভোট আর লেনিনের প্রস্তাবের পক্ষে পড়ে ২২ ভোট এবং একজন সদস্য ভোট দানে বিরত থাকেন। অবশ্য এর পরে ইহুদি শ্রমিকদের সংগঠন বুন্দপন্থীরা তাদের উত্থাপিত একটি প্রস্তাবের পক্ষে সমর্থন না পাওয়ায় কংগ্রেস ত্যাগ করেন। যার ফলে লেনিন ও তার অনুসারীরা কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্টতা লাভ করে। কেন্দ্রীয় কমিটি ও পার্টির কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলির নির্বাচনে লেনিনের অনুসারীরা বিজয় অর্জন করে আর মার্টভের অনুসারীরা পরাজিত হয়। ইসক্রার সম্পাদকম-লীতে লেনিনের প্রস্তাব মতো মার্টভ, প্লেখানভ ও লেনিনকে নিয়ে নির্বাচিত করা হয়। মার্টভের প্রস্তাব কংগ্রেসের ভোটাভুটিতে বাতিল হয়ে যায়। মার্টভ ঘোষণা করেন কেন্দ্রীয় মুখপত্রের সম্পাদকম-লীতে তিনি যোগ দিবেন না।

দ্বিতীয় কংগ্রেসের পর পার্টির মধ্যে মত বিরোধ আরও তীব্র হয়। দ্বিতীয় কংগ্রেসের গৃহীত সিদ্ধান্তগুলি মেনশেভিকরা মানিয়া নিতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করে। তাহারা দাবি করে ইসক্রার সম্পাদকমন্ডলীতে তাদের অনুসারীরা যেন সংখ্যাগরিষ্ঠ হয় এবং কেন্দ্রীয় কমিটিতে বলশেভিক সদস্যদের সমান সংখ্যক সদস্য যেন তাদের থাকে। দ্বিতীয় কংগ্রেসের সিদ্ধান্তের পরিপন্থী বলিয়া বলশেভিকরা মেনশেভিকদের এই দাবি অগ্রাহ্য করে। দ্বিতীয় কংগ্রেসের পর প্লেখানভের মধ্যে দোদুল্যমানতা প্রকাশ পায়। প্লেখানভ মেনশেভিকদের পার্টি ভাঙ্গার হুমকির প্রেক্ষিতে তাদের সাথে একটি মিটমাটের প্রস্তাব করেন। তিনি মার্টভের প্রস্তাব মতো ইসক্রার কংগ্রেস বাতিল হয়ে যাওয়া পুরাতন সম্পাদকম-লীকে পুনর্বহালের দাবি পেশ করেন। কমরেড লেনিন সুবিধাবাদীদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম আরও সুসংহত করার লক্ষ্যে ইসক্রার সম্পাদকম-লী থেকে পদত্যাগ করেন। প্লেখানভ মেনশেভিকদের নিয়ে ইসক্রার সম্পাদকম-লী পুনর্গঠন করেন। এর পর ৫২ সংখ্যার পর থেকে ইসক্রা মেনশেভিকদের মুখপত্র হিসাবে প্রকাশিত হতে থাকে। ১৯০৪ সালের গ্রীষ্মকালে প্লেখানভের সহায়তায় এবং ক্রাসিন ও নস্কভ নামে দুইজন নীতিভ্রষ্ট বলশেভিকের বিশ্বাসঘাতকতার ফলে মেনশেভিকরা কেন্দ্রীয় কমিটিতে অধিকাংশ সদস্যপদ দখল করে। কমরেড লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিকরা তৃতীয় কংগ্রেস আহ্বান করিয়া নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি নির্বাচন করা এবং মেনশেভিকদের সাথে একটি বোঝাপড়া করার উদ্যোগ গ্রহণ করে।

১৯০৫ সালের ডিসেম্বর মাসে ফিনল্যান্ডের টামারফর্স শহরে একটি বলশেভিক সম্মেলন বসে। এই সময়ে যদিও বলশেভিক ও মেনশেভিকরা রুশ সোস্যাল ডেমোক্রাটির লেবার পার্টির অন্তর্ভুক্ত ছিল, তবু তাহারা দুটি আলাদা দল এবং তাদের দুটি আলাদা নেতৃত্বের কেন্দ্র ছিল। এই সময়ে জারতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে শ্রমিকরা পার্টির শক্তিগুলির ঐক্য এবং সর্বহারা শ্রেণীর একত্রীকরণের দাবি জানায়। টামারফর্স সম্মেলনে বলশেভিকরা শ্রমিকদের এই ঐক্যের দাবি সমর্থন করে এবং মেনশেভিকদের একটি ঐক্য কংগ্রেস আহ্বানের প্রস্তাব করে। শ্রমিকদের চাপে মেনশেভিকরা পার্টির একত্রীকরণের প্রশ্নে সম্মতি দেয়। কমরেড লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিকরা ঐক্য কংগ্রেসের জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। লেনিন ছিলেন ঐক্যের পক্ষে। তবে এই ঐক্য মতভেদকে চাপা নিয়ে নয়। আপোসপন্থীরা বলশেভিক ও মেনশেভিকদের মধ্যে যথার্থ কোন মতপার্থক্য নাই বলিয়া প্রচার করিত। লেনিন এই সব আপোসপন্থীদের বিরুদ্ধে লড়াই করেন এবং জোর দিয়া বলেন যে, বলশেভিকরা তাদের নিজস্ব মতামত নিয়া কংগ্রেসে যাবে, বলশেভিকদের কার্যক্রম কি এবং কোন ভিত্তির ওপর ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে তা শ্রমিকরা যাতে বুঝতে পারে।
১৯০৬ সালের এপ্রিল মাসে রুশ সোস্যাল ডেমোক্রাটিক লেবার পার্টির চতুর্থ কংগ্রেস সুইডেনের রাজধানী স্টকহোম শহরে অনুষ্ঠিত হয়। পার্টির ৫৭টি স্থানীয় সংগঠনের প্রতিনিধি হিসাবে ১১১ জন ডেলিগেট এই কংগ্রেসে উপস্থিত হন। এছাড়াও বিভিন্ন জাতির সোস্যাল ডেমোক্রাটিক পার্টির প্রতিনিধিরা এই কংগ্রেসে আসেন। ১৯০৫ সালের বিপ্লবে বলশেভিক সংগঠনগুলি চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে যাওয়ায় অনেক বলশেভিক সংগঠন প্রতিনিধি প্রেরণ করিতে পারেনি। আবার মেনশেভিকরা ব্যাপক সংখ্যক প্রতিনিধি প্রেরণ করে। তবে এই সব প্রতিনিধিদের অধিকাংশ ছিল পেটি বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবী মার্কা সুবিধাবাদী। মেনশেভিকরা শুরুমাত্র টিফলিস থেকে যত সংখ্যক প্রতিনিধি পাঠাইয়াছিল তাহা সেন্টপিটার্সবুর্গের সংগঠনের প্রতিনিধি সংখ্যার সমান। ফলে কংগ্রেসে মেনশেভিকদের সংখ্যাধিক্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তাই কংগ্রেসে যে সব সিদ্ধান্ত তা অনেকটা মেনশেভিকমার্কা। এই কংগ্রেসে যে ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয় তা শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিক। আসলে বলশেভিক ও মেনশেভিকদের মধ্যে নিজস্ব মত ও নিজস্ব সংগঠন টিকে থাকলো। এই কংগ্রেসে কৃষি প্রশ্ন, তৎকালীন পরিস্থিতি ও সর্বহারা শ্রেণীর কর্তব্য, স্টেট ডুমা, সাংগঠনিক প্রশ্নাবলী প্রভৃতি বিষয়ের ওপর আলোচনা হয়। তবে মেনশেভিকরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও শ্রমিকদের কথা মাথায় থাকায় পার্টি সভ্য হওয়া সংক্রান্ত লেনিনের প্রস্তাব মানিয়া নেয়। কৃষি প্রশ্নে তারা লেনিনের কর্মসূচির বিরোধিতা করে। মেনশেভিকরা সর্বহারা শ্রেণীর একনায়ত্বের বিরুদ্ধে খোলাখুলি অবস্থান গ্রহণ করে। তারা স্টেট ডুমা গঠনের জারের সিদ্ধান্তের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে। লেনিনের মত ছিল ডুমা হইল জারের এক বন্ধা উপাঙ্গ। জারতন্ত্রের দোষত্রুটিকে ঢাকা দেয়ার জন্য একে ব্যবহার করবে আর অসুবিধাজনক বিবেচিত হলে একে ঠেলে ফেলে দেবে। কংগ্রেসে ৯ জনের কেন্দ্রীয় কমিটি গঠিত হয়। এর মধ্যে ৩ জন বলশেভিক ও বাকি ৬ জন ছিল মেনশেভিক। কেন্দ্রীয় মুখপত্রের সম্পাদকীয় বিভাগে সকলেই ছিল মেনশেভিক। তবে চতুর্থ কংগ্রেসের ভিতর দিয়ে বলশেভিক ও মেনশেভিকদের মধ্যে মতপার্থক্য দূর হলো না তা নতুন রূপে আরম্ভ হলো।

স্টেট ডুমাকে ব্যবহারের প্রশ্নে বলশেভিক ও মেনশেভিকদের মধ্যে তীব্র মতপার্থক্য তৈরি হয়। মেনশেভিকরা দাবি জানাতে থাকে, প্রতিবিপ্লবী কনস্টিট্যুশনাল ডেমোক্রাটদের সাথে নির্বাচনের ব্যাপারে চুক্তি করা এবং আইন প্রণয়নের ব্যাপারে ডুমাতে তাদের সহযোগিতা করা হোক। কমরেড লেনিন ও বলশেভিকরা মেনশেভিকদের এই মতের তীব্র বিরোধিতা করেন। বলশেভিকদের মত হলো ডুমাতে তারা আইন প্রণয়নের জন্য যায় নাই; তারা ডুমাতে অংশ নিয়েছে বিপ্লবের স্বার্থে কাজে লাগানোর জন্য, এটাকে প্রচার মঞ্চ হিসাবে ব্যবহারের জন্য। মেনশেভিক কেন্দ্রীয় কমিটির এই নীতির বিপক্ষে অধিকাংশ পার্টি সংগঠন মত প্রকাশ করে। কমরেড লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিকরা তখন দাবি করে নতুন পার্টি কংগ্রেস ডাকার জন্য।

১৯০৭ সালের মে মাসে লন্ডনে পঞ্চম পার্টি কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। ৩৩৬ জন ডেলিগেট এই কংগ্রেসে যোগদান করেন। এর মধ্যে এর মধ্যে ১০৫ জন ছিল বলশেভিক, ৯৭ জন মেনশেভিক, বাকিরা বুন্দসহ সোস্যাল ডেমোক্রাটদের বিভিন্ন অংশ। এই কংগ্রেসের প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল বুর্জোয়া পার্টিগুলির সম্বন্ধে মনোভাব স্থির করা। এই কংগ্রেসে পোল্যান্ড ও লাটভিয়ার সোস্যাল ডেমোক্রাটরা বলশেভিকদের সমর্থন করার কারণে বলশেভিকরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। কংগ্রেসের বলশেভিকদের নীতিগুলি অনুমোদিত হয়। এই কংগ্রেস বিপ্লব বিরোধী সমস্ত বুর্জোয়া ও পেটি বুর্জোয়া সুবিধাবাদী দলের বিরুদ্ধে নির্মম সংগ্রাম চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়। কনস্টিট্যুশনাল ডেমোক্রাটদের সঙ্গে আপোস না করে তাদের মুখোশ খুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। কংগ্রেস নারদনিকদের সমাজতান্ত্রিক মুখোশ পরার চেষ্টাকে খুলে দেবার সিদ্ধান্ত করে। কংগ্রেস মেনশেভিকদের ট্রেড ইউনিয়নগুলি নিরপেক্ষ রাখার নীতির বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত নেয়। বলশেভিকদের প্রস্তাবমতো কংগ্রেস ট্রেড ইউনিয়নগুলিতে মতাদর্শ ও রাজনৈতিক কার্যক্রমে নেতৃত্বের ভূমিকা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়। মেনশেভিকরা কংগ্রেসের আগে শ্রমিক কংগ্রেস নাম দিয়া এক সম্মেলন ডাকার প্রস্তাব করেছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল কনস্টিট্যুশনাল ডেমোক্রাট, সোশ্যালিস্ট রেভেল্যুশনারি, এনাকিস্ট সকলেই যাতে এই কংগ্রেসে প্রতিনিধি পাঠাতে পারে তার উপযোগী এক কংগ্রেস আহ্বান করা। মেনশেভিকরা সোস্যাল ডেমোক্রাটিক লেবার পার্টি বিলোপ করিয়া শ্রমিক শ্রেণীর অগ্রণী বাহিনীকে পেটি বুর্জোয়াদের সাথে মিশাইয়া দেয়ার অপচেষ্টা করেছিল। কমরেড লেনিন মেনশেভিকদের এই অপচেষ্টার মুখোশ উন্মোচন করে দেন এবং কংগ্রেস মেনশেভিকদের শ্রমিক সম্মেলন করার অপচেষ্টার নিন্দা করে।
এদিকে রাশিয়ার অভ্যন্তরে ১৯০৫ সালে জারতন্ত্রের তীব্র আক্রমণে শ্রমিক কৃষক সৈনিক নাবিকদের অভ্যুত্থান ব্যর্থ হয়। এর পর শুরু হয় স্তলিপিন প্রতিক্রিয়ার যুগ। জারের মন্ত্রী স্তলিপিন দেশের সর্বত্রই ফাঁসির মঞ্চ স্থাপন করে। কয়েক হাজার বিপ্লবীকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলানো হয়। একের পর পর বিভিন্ন ডিক্রি জারি করে জারতন্ত্র শ্রমিক কৃষকের অধিকার আরও সঙ্কুচিত করতে শুরু করে। ১৯০৬ সালের ৯ নভেম্বর কৃষি সংক্রান্ত এক নতুন আইন জারি করে। এই আইনে কমিউন ভেঙ্গে দেওয়া এবং কৃষককে কমিউন ত্যাগ ও জমি বিক্রি করার অধিকার দেওয়া হয়। এই আইন জারির পর কয়েক বছরের মধ্যে ১০ লক্ষেরও বেশি কৃষক তাদের জমি হারিয়ে একেবারে পথে বসে। গরিব কৃষক যতই জমি হারাতে লাগলো ততই কুলাকদের খামারের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে লাগলো। স্তলিপিনের এই নীতির ফলে ছোটখাট ভূমির মালিক কৃষক ও গরিব কৃষকের অবস্থা পূর্বের চেয়ে আর বেশি খারাপ হলো। কুলাকদের জমি কেনা ও চাষের সাজসরঞ্জামের ব্যবস্থা করার জন্য মোটা অংকের ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হলো। এইভাবে জারতন্ত্র গ্রামের কুলাকদের স্বৈরতন্ত্রের অনুগত করে তুললো। ১৯০৭ সালের ৩ জুন জারতন্ত্রী সরকার দ্বিতীয় ডুমা ভেঙ্গে দেয়। তৃতীয় ডুমার নির্বাচন সম্পর্কে নতুন বিধান জারি করে। দ্বিতীয় ডুমার সোস্যাল ডেমোক্রাট সদস্যদের সশ্রম কারাদন্ড ও নির্বাসন দন্ডে দন্ডিত করা হয়। আর নুতন নির্বাচনী আইন এমনভাবে তৈরি করা হয় যাতে পুঁজিপতি ও জমিদার কুলাকদের সুবিধা হয়।

১৯০৫ সালের বিপ্লবের পরাজয় বিপ্লবের সহযাত্রী শিবিরে এক ধরনের ভাঙ্গন ও অধঃপতন প্রক্রিয়া শুরু হয়। বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে অধঃপতন ও অবক্ষয়ের প্রক্রিয়া বিশেষভাবে পরিলক্ষিত হয়। বিপ্লবের উত্থানকালে বুর্জোয়া শিবির থেকে যারা আন্দোলনে যোগ দেবার জন্য এসেছিল তারা প্রতিক্রিয়ার দিনগুলিতে পার্টি ত্যাগ করে। তাদের মধ্যে অনেকে বিপ্লবের প্রকাশ্য শত্রু শিবিরে যোগ দেয়। এই সময়ে মার্কসবাদকে সমালোচনা করা এবং সংশোধন করার একটা প্রচেষ্টা চলে। মার্কসবাদের সমালোচনা করা একটা ফ্যাশনে পরিণত হয়। প্রকাশ্য ও সোজাসুজি এই সমালোচনা পরিচালিত হতো না। বরং মার্কসবাদকে রক্ষা করার নামে এই ভন্ডামিপূর্ণ সমালোচনা করা হতো। এদের মধ্যে অনেকে দাবি করতো কয়েকটি মৌলিক নীতিকে বিমুক্ত করে তারা মার্কসবাদের মৌলিক উন্নতি করতে চায়। মার্কসবাদ ত্যাগী এইসব দলদ্রোহীদের উপযুক্ত জবাব দেওয়া মার্কসবাদের তত্ত্বগত ভিত্তিকে রক্ষা করা মার্কসবাদীদের পক্ষে জরুরি হয়ে পড়ে। কমরেড লেনিন ১৯০৯ সালে প্রকাশিত ‘বস্তুবাদ ও গবেষণামূলক সমালোচনা’ বই লিখে এই কর্তব্য সম্পাদন করেন; মার্কসবাদ ত্যাগী বাজারভ, বোগদানভ, লুনাচারস্কি, বেরমান, হেলফন্ড, যুশকেভিচ প্রমুখ পন্ডিতদের ভন্ডামির মুখোশ খুলে দেন।

প্রতিক্রিয়ার কালে বেআইনি পার্টি সংগঠনগুলিকে রক্ষা ও জোরদার করার জন্য বলশেভিকরা প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখে। কিন্তু একই সময়ে জনগণের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করা আর এভাবে পার্টিকে জোরদার করার জন্য প্রতিটি আইনি সুযোগ প্রত্যেকটি আইনের ফাঁক ফোকরকে সদ্ব্যবহার করার চেষ্টা করে। যে সকল আইনি সংগঠন তখনও টিকে ছিল সেই সব সংগঠনকে পার্টির গোপন সংগঠনসমূহের জন্য এক ধরনের পর্দা হিসাবে কাজে লাগায় এবং জনগণের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করার এক উপায় হিসাবে কাজে লাগায়। এই সময়ে পার্টিতে বিলোপবাদী ও অটজোভিস্টদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম জোরদার হয়। ১৯০৮ সালের ডিসেম্বর মাসে প্যারিসে আরএসএলডিপির পঞ্চম নিখিল রুশ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে কমরেড লেনিনের প্রস্তাবমতো বিলোপবাদের নিন্দা করা হয়। আরএসএলডিপি’ র সাংগঠনিক কাঠামোসমূহ তুলে দিয়ে, পার্টির কর্মসূচি রণকৌশল পরিহার করে আইনি রূপে একটি অবয়বহীন ডিলেঢালা সংস্থা স্থাপনের পরিকল্পনার নিন্দা করে প্যারিস সম্মেলন। এই সময়ে অটযোভিস্টদের প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে কমরেড লেনিনকে দৃঢ় সংগ্রাম করতে হয়। অটযোভিস্টরা রাষ্ট্রীয় ডুমা থেকে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রত্যাহার করে নেওয়ার দাবি করতে থাকে এবং নিজস্ব গ্রুপ গঠন করে এবং লেনিন ও লেনিনের কর্মপরিকল্পনার বিরোধিতা করতে থাকে। এমনকি তারা ট্রেড ইউনিয়ন ও আইনি রূপের সমিতিগুলিতে কাজ করতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করতে থাকে। কমরেড লেনিনের নেতৃত্বে ১৯০৯ সালে বলশেভিকরা অটযোভিস্টদের সংগঠন থেকে বহিষ্কার করে এবং ঘোষণা করে যে অটযোভিস্টদের সাথে তাদের কোন মিল নেই।

এই সময়ে পার্টিতে আর এক বিপদ হিসাবে সামনে আসে ট্রটস্কিবাদ। ট্রটস্কি বিলোপবাদীদের সমর্থন করেন। পরবর্তিতে ১৯১২ সালে গঠন করেন আগস্ট ব্লক। যা ছিল সমস্ত বলশেভিক বিরোধী গ্রুপগুলোর সম্মিলিত একটি গ্রুপ। বিলোপবাদ ও অটযোভিস্ট গ্রুপগুলি এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়। এই গ্রুপ লেনিন এবং বলশেভিক বিরোধী ধারাগুলির একটি জোটে পরিণত হয়। এই সময়ে বেশ কয়েকজন বলশেভিক কমরেড গ্রেফতার হয়ে যাওয়ার ফলে কেন্দ্রীয় কমিটির গঠন বিন্যাসে পরিবর্তন ঘটে। এরই সুযোগ নিয়ে লেনিনের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ১৯১০ সালের জানুয়ারি মাসে কেন্দ্রীয় কমিটির এক প্লেনাম আহুত হয়। এই প্লেনামে বলশেভিক সংবাদপত্র বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয় এবং ট্রটস্কির প্রকাশিত প্রাভদাকে আর্থিক সহায়তা প্রদানের সিদ্ধান্ত হয়। কামেনভ ট্রটস্কির সংবাদপত্রে যোগ দেন এবং জিনোভিয়েভের সাথে মিলে এটাকে পার্টির মুখপত্রে পরিণত করার চেষ্টা করেন। এই প্লেনামে লেনিনের প্রস্তাব মতো বিলোপবাদ ও অটযোভিস্ট পন্থার নিন্দা করা হয়। এই প্লেনামের পরও মেনশেভিকরা উপদলীয় তৎপরতা অব্যাহত রেখে প্লেনামের সিদ্ধান্ত কার্যকরী করে না। অবশ্য বলশেভিকরা প্লেনামের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে তাদের মুখপত্র প্রলেতারি বন্ধ করে দেয়। এই সময়ে আগস্ট ব্লককে প্রতিহত করার জন্য পার্টিকে রক্ষা ও শক্তিশালী করতে আগ্রহী অন্যান্যদের নিয়ে একটি ব্লক গঠন করে। এই ব্লকে ছিলেন লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিকরা আর প্লেখানভের নেতৃত্বে পার্টিপন্থী মেনশেভিকরা।
মেনশেভিক, বিলোপবাদী ও অটযোভিস্টদের বিরুদ্ধে আর তার সাথে ট্রটস্কিবাদীদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম বলশেভিকদের ঐক্যবদ্ধ করা এবং তাদের নিয়ে একটি স্বতন্ত্র পার্টি গঠনের জরুরি প্রয়োজনীয়তা উপস্থিত হয়। পার্টির মধ্যেকার সুবিধাবাদী বিভক্তি সৃষ্টিকারী ধারাগুলিকে উচ্ছেদ করার জন্যই নয়, শ্রমিক শ্রেণীর শক্তিগুলিকে সমাবেশিত করা এবং বিপ্লবের লক্ষ্যে একটা নতুন ঊর্ধ্বমুখী পার্টিকে প্রস্তুত করার জন্য এটা প্রয়োজন ছিল। মেনশেভিকসহ সর্বহারা শ্রেণীর প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা পূর্ণ আচরণকারী জঞ্জাল থেকে মুক্ত হতে বিলোপবাদী, সুবিধাবাদীদের পার্টি থেকে বহিষ্কার করে একটি বলশেভিক ধরনের পার্টি গড়ার প্রয়োজন হয়ে পড়ে। পাশ্চাত্যের সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক পার্টিগুলি থেকে ভিন্ন এক এক নতুন ধরনের পার্টি গড়ে তোলা, সুবিধাবাদী উপাদানসমূহ থেকে মুক্ত এবং ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে সর্বহারা শ্রেণীকে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম এমন এক পার্টি গড়ে তোলা আবশ্যক হয়ে পড়েছিল। এই সব প্রয়োজনীয়তাকে সামনে রেখেই ১৯১২ সালের জানুয়ারি মাসে প্রাগ কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ২০টিরও বেশি পার্টি সংগঠনের প্রতিনিধিরা এখানে উপস্থিত ছিলেন। এই কংগ্রেসে মেনশেভিক, বিলোপবাদী ও অটযোভিস্টদের পার্টি থেকে বাদ দেওয়া হয়। কমরেড লেনিন, স্তালিন, অর্জনিকিদজে, সভের্দলভ, স্পান্দারিয়ান এবং অন্যদের নিয়ে প্রাগ কনপারেন্স পার্টির এক বলশেভিক কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করে। কমরেড স্তালিন ও কমরেড সভের্দলভ তখন নির্বাসনে ছিলেন বলিয়া তাদের অনুপস্থিতিতেই কেন্দ্রীয় কমিটিতে নির্বাচিত করা হয়। কেন্দ্রীয় কমিটির বিকল্প সদস্য হিসাবে যারা নির্বাচিত হন তাদের মধ্যে ছিলেন কমরেড কালিনিন। রুশ দেশে বিপ্লবী কাজ পরিচালনার জন্য কমরেড স্তালিনের নেতৃত্বে সভের্দলভ, স্পান্দারিয়ান, কালিনিন এই কমরেডদের নিয়ে কেন্দ্রীয় কমিটির রুশ ব্যুরো স্থাপিত হয়। সুবিধাবাদীদের বিরুদ্ধে বলশেভিকরা যে সংগ্রাম চালায় প্রাগ কনফারেন্সে সে বিষয়ে পর্যালোচনা হয় এবং পার্টি থেকে মেনশেভিকদের বিতাড়িত করা হয়। পার্টি থেকে মেনশেভিকদের বিতাড়ন করিয়া প্রাগ কনফারেন্সে আনুষ্ঠানিকভাবে বলশেভিক পার্টির স্বতন্ত্র অস্তিত্ব উদ্বোধন করে।
১৯০৫ সালে বিপ্লবের পরাজয়ের পর সুবিধাবাদী সংশোধনবাদীরা বিপ্লবী শক্তির পুনরুত্থান নিয়ে সংশয়ে ছিল। কিন্তু অচিরেই সুবিধাবাদী সংশয়বাদীরা ভ্রান্ত প্রমাণিত হয়। প্রাগ কনফারেন্স চলাকালে শ্রমিক আন্দোলনের পুনরুত্থানের আরম্ভ লক্ষ্য করা যায়। বিপ্লবী আন্দোলনের প্রকৃত উত্থান শুরু হয় ১৯১২ সালের এপ্রিল মে মাসে। ১৯১২ সালের ৪ এপ্রিল সাইবেরিয়ার লেনা স্বর্ণখনিতে শ্রমিক ধর্মঘট চলাকালে জার সরকারের পুলিশ বাহিনী গুলি চালিয়ে পাঁচ শতাধিক শ্রমিককে হত্যা ও জখম করে। লেনা স্বর্ণখনিতে গুলি চালানোর জবাবে সেন্টপিটার্সবুর্গ, মস্কো ও অন্যান্য শিল্পকেন্দ্র অঞ্চলে সর্বহারা শ্রেণী ব্যাপক ধর্মঘট, মিছিল ও সভাসমিতি করে। শ্রমিক বিক্ষোভ আরও বৃদ্ধি পায় স্টেট ডুমাতে সোশ্যাল ডেমোক্রাটদের এক প্রশ্নের উত্তরে জারের মন্ত্রী মাকারভ উদ্ধতভাবে বলে, ‘যেমন ঘটিয়াছে, তেমন আবার ঘটিবে’। লেনা শ্রমিকদের হত্যার প্রতিবাদে যারা ধর্মঘটে যোগ দেয় তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে তিন লক্ষে পৌঁছায়। শ্রমিক শ্রেণীর বিপ্লবী মনোভাবে শঙ্কিত হইয়া লিকুইডেটরা ধর্মঘট আন্দোলনের বিরুদ্ধে প্রচারে নামিল। আর লিকুইডেটরদের মিত্র ট্রটস্কি সর্বহারা শ্রেণীর বিপ্লবী সংগ্রামের বদলে কয়েকটি অধিকার মানিয়া নিতে আহ্বান জানাইয়া দরখাস্ত লিখিয়া সেই দরখাস্ত স্টেট ডুমাতে পাঠানোর জন্য শ্রমিকদের প্রতি আহ্বান জানায়। সুবিধাবাদী আপোসকামীদের বিভিন্ন অপচেষ্টা সত্ত্বেও শ্রমিক ধর্মঘট সারা রাশিয়াতে ছড়াইয়া পড়ে। সরকারি হিসাবে ১০ লক্ষের বেশি শ্রমিক ১৯১২ সালের ধর্মঘটে যোগ দেয়। ১৯১৩ সালে ১২ লক্ষ ৭২ হাজার শ্রমিক ধর্মঘটে অংশগ্রহণ করে। আর ১৯১৪ সালে ধর্মঘটি শ্রমিকের সংখ্যা ছিল ১৫ লক্ষেরও বেশি। এই সময়ে কৃষক বিদ্রোহের বিস্তার ঘটে। সৈনিকদের মধ্যেও বিপ্লবী জাগরণ দেখা যায়।

এই সময়ে বলশেভিকরা আইনসিদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলিকে পার্টির পক্ষে আনার লক্ষ্যে ব্যাপক কর্মযজ্ঞ চালায়। পার্টি বেআইনি সংগঠন গড়ে তোলে, বেআইনি ইস্তেহার প্রকাশ করে, জনগণের মধ্যে গোপনে বিপ্লবী কাজ চালিয়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে পার্টি শ্রমিক শ্রেণীর বিভিন্ন আইনি সংগঠগুলিতে নেতৃত্বে নিশ্চিত করে। পার্টি ট্রেড ইউনিয়নগুলিকে পক্ষে টানার লক্ষ্যে পিপলস হাউস, সান্ধ্য বিদ্যলয়, ক্লাব ও আতুর মঙ্গল সমিতিগুলির ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে। এইসব আইনসঙ্গত প্রতিষ্ঠানগুলিকে পার্টির ঘাঁটিতে পরিণত করার জন্য বলশেভিকরা প্রবল সংগ্রাম করে। নিপুণভাবে আইনি ও বেআইনি কাজ মিলাইয়া বলশেভিকরা সেন্টপিটার্সবুর্গ ও মস্কো এই দুই প্রধান শহরে অধিকাংশ ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠনকে পক্ষে টানিতে সক্ষম হয়। এইভাবে আইনি সংগঠনগুলিতে বলশেভিকদের জয় ও মেনশেভিকদের সর্বত্র পরাজয় ঘটে। এই সময়ে বলশেভিকরা একদিকে আইনি সংগঠগুলিকে নিজেদের পক্ষে টানিতে সক্ষম হয় অন্যদিকে বেআইনি পার্টিকে রক্ষা করিতে ও নিজেদের সারিতে দৃঢ় শৃঙ্খলা বজায় রাখে।

ইতিমধ্যে ১৯১৪ সালে বিশ্বযুদ্ধের দামামা বেজে ওঠে। বাজার ও প্রভাব বিস্তার, বণ্টন, ভাগাভাগির প্রশ্নে পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদীরা পরস্পর বিরোধী দুই শিবিরে ভাগ হয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। এই যুদ্ধের একদিকে ব্রিটেন, ফ্রান্স, জারতান্ত্রিক রাশিয়া নিয়ে গড়ে ওঠে মিত্র জোট। পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই মিত্র জোটে যোগ দেয়। অন্যদিকে জার্মানি, অস্ট্রো-হাঙ্গেরি ও তুরস্ককে নিয়ে গঠিত হয় অক্ষজোট। এক পর্যায়ে জাপান এই অক্ষজোটে যুক্ত হয়। জারের রাশিয়া এই যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ছিল না। অন্যান্য পুঁজিবাদী দেশের তুলনায় রুশ শিল্প ছিল অনেক পশ্চাৎপদ। জমিদারি ব্যবস্থা টিকে থাকায় রুশ দেশের কৃষি ব্যবস্থাও দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের উপযোগী সুদৃঢ় অর্থনৈতিক ভিত্তি স্থাপন করতে পারেনি। যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ায় ক্ষেত্রে জারের প্রধান অবলম্বন সামন্ততান্ত্রিক জমিদারের দল ও বড় পুঁজির মালিক গোষ্ঠী। রুশ বুর্জোয়া শ্রেণী আশা করেছিল জারের স্বৈরতন্ত্রকে ব্যবহার করে নতুন দেশ ও নতুন বাজার দখল করা যাবে, সেই সাথে শ্রমিক কৃষকের বিপ্লবী আন্দোলন চূর্ণ করা সম্ভব হবে। সোশ্যালিস্ট রেভুল্যশনারি, মেনশেভিক ও পেটি বুর্জোয়া দলগুলি বর্বর জার্মানদের আক্রমণ থেকে পিতৃভূমি রক্ষার অজুহাত তুলে জারের যুদ্ধ উদ্যোগ সমর্থন করে। উদারনৈতিক বুর্জোয়ারা যুদ্ধের বিরুদ্ধে লোক দেখানো সমালোচনা করে। একমাত্র বলশেভিক পার্টি বিপ্লবী আন্তর্জাতিকতার মহান আদর্শের প্রতি আনুগত্য বজায় রাখিয়া জারের স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে, জমিদার ও পুঁজিপতিদের বিরুদ্ধে, সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালানোর মার্কসবাদী নীতির ভিত্তিতে দৃঢ় ভূমিকা অবলম্বন করে।

সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বযুদ্ধে কমরেড লেনিন ও তাঁর নেতৃত্বে বলশেভিক পার্টি যুদ্ধের বিরুদ্ধে শান্তির পক্ষে ব্যাপক তৎপরতা চালায়। তবে এই তৎপরতা অন্যান্য সোস্যাল ডেমোক্রাট কথিত বামপন্থীদের মতো শুধু প্রচার কার্যে নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখেনি। বলশেভিকরা সেই ধরনের শান্তিবাদী ছিল না। বলশেভিকদের দৃষ্টিতে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য শ্রমিক বিপ্লব করে যুদ্ধপরায়ন বুর্জোয়াদের উচ্ছেদ করতে সক্রিয় বিপ্লবী সংগ্রামের কোন বিকল্প নেই। সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের অবসান ও ন্যায়সঙ্গত শান্তিস্থাপনের পক্ষে সবচেয়ে নিশ্চিত পথ হলো সাম্রাজ্যবাদী বুর্জোয়া শ্রেণীর শাসন উচ্ছেদ। লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিকরা আওয়াজ তুলিল, সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধকে গৃহযুদ্ধে পরিণত কর। এই নীতির অর্থ হইল যুদ্ধের অবসান ঘটাতে এবং ন্যায়সঙ্গত শান্তি স্থাপন করতে সৈন্যের সাজে সজ্জিত সশস্ত্র শ্রমিক কৃষক মেহনতি মানুষ তাদের নিজ নিজ দেশের বুর্জোয়া শ্রেণীর বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করিবে এবং বুর্জোয়া শাসনকে উচ্ছেদ করিবে। বলশেভিকরা সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধে নিজ দেশের সরকারকে পরাস্ত করার নীতি অনুসরণ করে। যুদ্ধের ব্যয় বরাদ্দের বিরুদ্ধে ভোট দিয়ে, রণাঙ্গনে সৈন্যদের সাথে সৌভ্রাতৃত্ব সম্পর্ক সমর্থন করে, যুদ্ধে শ্রমিক কৃষকের বিপ্লবী কার্যক্রম সুসংহত করে, এই সমস্ত কাজকে নিজেদের দেশের সাম্রাজ্যবাদী সরকারের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানে পরিণত করতে চেষ্টা করে। কমরেড লেনিন বলেন, ‘নিজ দেশে সাম্রাজ্যবাদী সরকারের পরাজয় ঘটানোর এই নীতি কেবলমাত্র রুশ বিপ্লবীদের অনুসরণীয় নয়, সমস্ত যুদ্ধমান দেশের শ্রমিক শ্রেণীর বিপ্লবী পার্টিগুলির অবশ্যই অনুসরণীয়।’

যুদ্ধের সময়ে ১৯১৬ লেনিন সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের মর্মবস্তু উদঘাটন করতে ‘সাম্রাজ্যবাদ পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ স্তর’ গ্রন্থ লেখেন। এই বইয়ে তিনি দেখান যে, সাম্রাজ্যবাদ হলো পুঁজিতন্ত্রের এমন একটি পর্যায় যখন পুঁজিতন্ত্র ইতিপূর্বের প্রগতিশীল অবস্থা থেকে পরজীবী ক্ষয়িষ্ণু অবস্থায় রূপান্তরিত হয়ে গিয়েছে এবং দেখালেন যে, মুমূর্ষু পুঁজিবাদের রূপই হলো সাম্রাজ্যবাদ। অবশ্য এর অর্থ এই নয় পুঁজিতন্ত্র সর্বহারা বিপ্লবের আঘাত ছাড়া আপনা আপনি উচ্ছেদ হবে। পুঁজিবাদকে খতম না করে শ্রমিক বিপ্লব ঘটানো যাবে না। মুমূর্ষু পুঁজিতন্ত্র রূপে সাম্রাজ্যবাদের সংজ্ঞা নির্ণয় করে লেনিন দেখালেন যে, সাম্রাজ্যবাদ হলো সর্বহারা বিপ্লবের পূর্বাহ্ন। লেনিন দেখালেন যে, সাম্রাজ্যবাদের যুগে পুঁজিতন্ত্রের জোয়াল আরও অত্যাচারমূলক হয়ে ওঠে, সাম্রাজ্যবাদের আমলে পুঁজিতন্ত্রের বনিয়াদের বিরুদ্ধে সর্বহারা শ্রেণীর আক্রমণ বাড়তে থাকে এবং পুঁজিবাদী দেশগুলিতে বিপ্লবী অভ্যুত্থানের বিভিন্ন উপাদান জমে ওঠে।

কমরেড লেনিন এই গ্রন্থে আরও দেখান যে, সাম্রাজ্যবাদের আমলে নানা দেশে পুঁজিতন্ত্রের অসম বিকাশ এবং পুঁজিতন্ত্রের অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্বগুলি বিশেষ তীব্র হয়ে ওঠে এবং বিদেশি বাজার দখলের জন্য, মূলধন রপ্তানি করার উপযোগী ক্ষেত্রের জন্য, উপনিবেশের জন্য, কাঁচামালের উৎস দেশগুলিতে প্রভাব বিস্তারের জন্য যে সংগ্রাম তা আবার দুনিয়াকে ভাগাভাগি করার মতলবে মাঝে মাঝে সাম্রাজ্যবাদের পক্ষে যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবি হয়ে ওঠে। পুঁজিতন্ত্রের এই অসম বিকাশই সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের জনক এবং সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধই সাম্রাজ্যবাদকে শক্তিহানি করবে এবং সাম্রাজ্যবাদী ফ্রন্টের দুর্বলতম স্থানে ভাঙন ধরাবে। একস্থানে বা কয়েকটি স্থানে সাম্রাজ্যবাদী ফ্রন্টে ভাঙন ধরানো শ্রমিক শ্রেণীর পক্ষে খুবই সম্ভব। প্রথমে কয়েকটি দেশে কিংবা একটি মাত্র দেশে সমাজতন্ত্রের বিজয় সম্ভব। পুঁজিতন্ত্রের অসম বিকাশের কারণে একই সময়ে সবদেশে সমাজতন্ত্রের বিজয় অসম্ভব। সমাজতন্ত্র প্রথমে একটি দেশে বা কয়েকটি দেশে বিজয় লাভ করবে; অন্যান্য দেশে আরও কিছুকাল বুর্জোয়া ব্যবস্থা টিকে থাকবে।
পুঁজিবাদ সাম্রাজ্যবাদের সর্বোচ্চ স্তর গ্রন্থে কমরেড লেনিন সাম্রাজ্যবাদের তিনটি চরিত্র ও পাঁচটি বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেন। এই তিনটি চরিত্র হলোঃ- (১) সাম্রাজ্যবাদ হলো একচেটিয়া পুঁজিবাদ (Monopoly capitalism)। (২) সাম্রাজ্যবাদ হলো ক্ষয়িষ্ণু বা পরজীবী পুঁজিবাদ (Decaying or parasitic capitalism)। (৩) সাম্রাজ্যবাদ হলো মুমূর্ষু পুঁজিবাদ (Moribund capitalisn)।

১৮ জুন তারিখে (বর্তমান হিসাবে ১ জুলাই) ব্রিটিশ ও ফরাসি সাম্রাজ্যবাদী প্ররোচনায় অস্থায়ী সরকার যুদ্ধক্ষেত্রে নতুন আক্রমণ শুরু করার নির্দেশ দেয়। সরকারের লক্ষ্য ছিল যুদ্ধক্ষেত্রে সাফল্য লাভ করে দেশের অভ্যন্তরে শ্রমিক কৃষকের উত্থান দমন করা ও বিপ্লবকে ব্যর্থ করা। কিন্তু যুদ্ধ ফ্রন্টে রুশ সেনাবাহিনীর চরম পরাজয় ঘটে। আক্রমণ ও তার ব্যর্থতার সংবাদ রাজধানীতে পৌঁছিলে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। পেট্রোগ্রাডের শ্রমিক ও সৈনিকরা বিক্ষোভে ফাঁটিয়া পড়ে। পেট্রোগ্রাডের ভাইবর্গ জেলায় (৩ জুলাই তারিখে) স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিক্ষোভ শুরু হয়। বিক্ষোভ মিছিল থেকে সোভিয়েতের হাতে ক্ষমতা চাই এই দাবি উত্থাপিত হয়। স্বতঃস্ফূর্ত মিছিল সশস্ত্র অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। অবশ্য বলশেভিকরা তখন সশস্ত্র অভ্যুত্থানকে সমর্থন করেনি। শান্তিপূর্ণ মিছিলে সরকারের ষড়যন্ত্রে গুলিবর্ষণ করে সেনাবাহিনীর প্রতিক্রিয়াশীল অংশ। শ্রমিক ও সৈনিকদের রক্তে পেট্রোগ্রাডের রাজপথ ভাসিয়া যায়। মেনশেভিক ও সোশ্যালিস্ট রেভল্যুশনারি, বুর্জোয়া শ্রেণী ও তাদের শ্বেতরক্ষী বাহিনীর ইউনিটগুলো বলশেভিকদের ওপর ঝাঁপাইয়া পড়ে। প্রাভদাসহ বলশেভিকদের বিভিন্ন সংবাদপত্র হামলা চালাইয়া বন্ধ করিয়া দেয় এবং এই সব সংবাদপত্রের প্রেস ভাঙিয়া দেয়। প্রতিবিপ্লবী বাহিনীগুলি রেডগার্ডদের অস্ত্র ছিনাইয়া নেয়। কমরেড লেনিনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয় এবং লেনিন আত্মগোপন করেন। এই ঘটনার মধ্যে দিয়ে বুর্জোয়াদের প্রতিবিপ্লব জয়যুক্ত হয় এবং দ্বৈত ক্ষমতার অবসান ঘটে।

এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বলশেভিকরা ৬ষ্ঠ কংগ্রেসের আয়োজন করে। ১৯১৭ সালের ২৬ জুলাই থেকে ১৭ আগস্ট পর্যন্ত অতি গোপনে রুশ দেশে বলশেভিক পার্টির এই কংগ্রেস অধিবেশন বসে। প্রথম অধিবেশন বসে পেট্রোগ্রাডের নিকটস্ত ভাইবর্গ জেলায় এবং পরে নারভা গেটের নিকটস্থ একটি স্কুল বাড়িতে। কমরেড লেনিন রাজলিভ স্টেশনের পাশে একটি পোড়ো বাড়িতে আশ্রয় নেন। এই আশ্রয়স্থল থেকে তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের মারফত কংগ্রেস অধিবেশনের কাজে নেতৃত্ব দেন। এই কংগ্রেসে আলোচিত প্রধান বিষয় ছিল কেন্দ্রীয় কমিটির রাজনৈতিক রিপোর্ট ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে। এই দুই বিষয়ে কমরেড স্তালিন রিপোর্ট পেশ করেন। এই কংগ্রেসে ‘সোভিয়েতের হাতে সমস্ত ক্ষমতা চাই’ সাময়িকভাবে এই দাবি প্রত্যাহার করা হয়। ষষ্ঠ পার্টি কংগ্রেসে পার্টির নতুন নিয়ম কানুন গ্রহণ করা হয়। কংগ্রেসে সিদ্ধান্ত হয় গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার নীতির ভিত্তিতে সমস্ত পার্টি সংগঠন চলিবে। এই গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার অর্থ হলোঃ
(১) সর্বোচ্চ হইতে সর্বনিম্ন পার্টির প্রত্যেকটি পরিচালনী সংস্থা হইবে নির্বাচিত;
(২) পার্টি সংগঠনগুলি তাদের নিজ নিজ সংগঠনের কাছে নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর কাজের হিসাব জানাবে;
(৩) কঠোর পার্টি শৃঙ্খলা বজায় রাখিতে এবং যাহারা সংখ্যাল্প তাদের সংখ্যাধিক্যদের নির্দেশ মেনে চলতে হবে;
(৪) ঊর্ধ্বতন সংস্থাগুলির সিদ্ধান্ত অধস্তন সংস্থা ও সমস্ত পার্টি সভ্যকে সর্বতোভাবে পালতে করতে হবে।
সামরিক সরকারের আহ্বানে বুর্জোয়া শ্রেণী ও জমিদাররা নিজেদের শক্তিকে সুসংহত করার উদ্দেশ্যে ১২ আগস্ট তারিখে মস্কোর গ্রান্ড থিয়েটার গৃহে রাষ্ট্রপরিষদের অধিবেশন বসে। এই অধিবেশনে বুর্জোয়া, জমিদার, সেনাপতি, সামরিক কর্মকর্তা ও কসাকদের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকে। সোভিয়েতগুলির প্রতিনিধি হিসাবে মেনশেভিক ও সোশ্যালিস্ট রেভল্যুশনারিরা হাজির হয়। এই বৈঠকে উপস্থিতদের পক্ষ থেকে বলশেভিকদের দমন, সোভিয়েতগুলির উচ্ছেদের দাবি তোলা হয়। রাশিয়ার বুর্জোয়া, ব্যাঙ্কার ও জমিদারসহ প্রতিক্রিয়াশীলরা জেনারেল কর্নিলভকে সর্বতোভাবে সমর্থনের প্রতিশ্রুতি দেয়। ব্রিটেন ও ফ্রান্সের প্রতিনিধিরাও বিপ্লব দমনের দাবিতে জেনারেল কর্নিলভের কাছে ছুটতে থাকে।

জেনারেল কর্নিলভের ষড়যন্ত্র পাঁকিয়া ওঠে। কর্নিলভসহ তার সহযোগীরা গুজব রটনা করতে থাকে ২৭ আগস্ট বিপ্লবের ছয় মাস পূর্তি উপলক্ষে মস্কো ও পেট্রোগ্রাডে সামরিক অভ্যুত্থানের আয়োজন করছে বলশেভিকরা। এই কথিত অভ্যুত্থান দমনের নামে কেরেনস্কির নেতৃত্বে সাময়িক সরকার বলশেভিকদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস নীতিকে তীব্র করে। জেনারেল কর্নিলভ পেট্রোগ্রাডের অভিমুখে বিপুল সংখ্যক সেনা প্রেরণ করে। কর্নিলভের উদ্দেশ্য ছিল সোভিয়েতগুলিকে উচ্ছেদ করা এবং সামরিক একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা করা। কর্নিলভের অভিযান শুরু হওয়ার সাথে সাথেই কেরেনস্কি কর্নিলভের দিক থেকে মুখ ঘুরাইয়া নেয়।

কর্নিলভের এই বিপ্লব বিরোধী চক্রান্ত ব্যর্থ করতে বলশেভিকরা শ্রমিক ও সৈনিকদের প্রতি প্রতিরোধের আহ্বান জানায়। বলশেভিকদের আহ্বানে সাড়া দিয়া শ্রমিকরা সত্ত্বর অস্ত্র সংগ্রহ করিয়া প্রতিরোধের আয়োজন করে। পেট্রোগ্রাডের সেনাবাহিনীর মধ্যে বিপ্লবী দলগুলি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিল। পেট্রোগ্রাড শহরের চারিদিকে পরিখা খনন করিল, কাঁটাতারের বেড়া দিল, শহরে প্রবেশের রেল রাস্তা খুঁড়িয়া ফেলিল। শহর রক্ষার জন্য কন্সটাডট হইতে কয়েক হাজার সশস্ত্র নাবিক আসিয়া হাজির হইল। পেট্রোগ্রাডের উদ্দেশ্যে যে বাহিনী অগ্রসর হচ্ছিল তাদের কাছে ডেলিগেট পাঠানো হলো। এইসব ডেলিগেটরা কর্নিলভের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সৈনিকদের বুঝাতে সমর্থ হয়। এই পদক্ষেপে কর্নিলভের অভিযান চূর্ণ হয়।

কর্নিলভের বিদ্রোহের সময়ে পার্টির নির্দেশগুলিকেই শ্রমিক কৃষকরা বিনা দ্বিধায় মেনে চলে। কর্নিলভের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর প্রমাণিত হলো যে, বলশেভিক পার্টি চূড়ান্ত বিপ্লবী শক্তিতে পরিণত হয়েছে এবং তাঁরা বিপ্লব বিরোধী সকল শক্তিকে চূর্ণ করার সামর্থ অর্জন করেছে। এই ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করার ভিতর দিয়ে সোভিয়েতগুলিতে তার ব্যাপক প্রভাব পড়ে। এই ঘটনার পর থেকে শ্রমিক ও সৈনিক প্রতিনিধিদের সোভিয়েতগুলি বলশেভিকদের পক্ষে যোগ দিতে শুরু করে। কৃষক প্রতিনিধিদের সোভিয়েতগুলিও দোদুল্যমানতা পরিত্যাগ করে বলশেভিকদের পক্ষ অবলম্বন করতে থাকে। ভূমিহীন কৃষক ও গরিব কৃষকরা বুঝতে পারে একমাত্র বলশেভিকরাই যুদ্ধের বিপদ থেকে তাদের পরিত্রাণ দিতে পারে এবং জমিদারদের শক্তি চূর্ণ করে তাদের হাতে জমি তুলে দিতে পারে। সেপ্টেম্বর অক্টোবরের মধ্যে কৃষক সোভিয়েতগুলি ক্রমেই বলশেভিকদের পক্ষে যুক্ত হতে থাকে।

কর্নিলভ বিদ্রোহ পরাজয়ের পর ৩১ আগস্ট তারিখে পেট্রোগ্রাড সোভিয়েত বলশেভিকদের পক্ষে যোগ দেয়। চখাইদজের নেতৃত্বে পেট্রোগ্রাড সোভিয়েতের সভাপতিম-লী ইস্তফা দেয়। ৫ সেপ্টেম্বর তারিখে মস্কো সোভিয়েত বলশেভিকদের পক্ষে যোগদান করে। পেট্রোগ্রাড ও মস্কো সোভিয়েতের এই পরিবর্তন যুগান্তকারী তাৎপর্য বয়ে আনে। এর প্রভাবে দেশের অধিকাংশ এলাকায় শ্রমিক ও সৈনিকদের সোভিয়েতগুলি বলশেভিকদের পক্ষে একে একে যোগ দিতে থাকে। এই সময়ে বিপ্লবী অভ্যুত্থানের সফলতার জন্য যে সব পূর্বাবস্থা প্রয়োজন ছিল সেগুলি পরিণত হয়ে ওঠে। এই সময়ে আপোসপন্থী পার্টিগুলিতে ভাঙ্গন ধরে। সোশ্যালিস্ট রেভল্যুশনারি পার্টির মধ্যে ভাঙ্গনে বামপন্থী সোশ্যালিস্ট রেভল্যুশনারি পার্টি গড়ে ওঠে এবং তারা বুর্জোয়া শ্রেণীর সঙ্গে আপোস নীতির নিন্দা করে। মেনশেভিকদের মধ্যে একদল বামপন্থীর উদ্ভব ঘটে। এই সময়ে সোভিয়েতগুলির ওপর বলশেভিকদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হওয়ায়, সোভিয়েতের হাতে পূর্ণ ক্ষমতা চাই- এই দাবি আবার সামনে আনা হয়।
তবে বিপ্লব বিরোধী ষড়যন্ত্র তখনও বন্ধ হয়নি। মেনশেভিক, সোশ্যালিস্ট রেভল্যুশনারি ও আপোসপন্থীরা বিপ্লবের ক্রমবর্ধমান প্রবাহকে রোধ করার শেষ চেষ্টা চালায়। ১২ সেপ্টেম্বর তারিখে মেনশেভিক ও সোশ্যালিস্ট রেভল্যুশনারিদের উদ্যোগে এক নিখিল রুশ গণতান্ত্রিক সম্মেলনের আয়োজন করে। এই সম্মেলনে বিভিন্ন সমাজতন্ত্রী পার্টি, আপোসপন্থী সোভিয়েত, ট্রেড ইউনিয়ন, জেমস্তভো, ব্যবসা, শিল্প ও সামরিক সংস্থার প্রতিনিধিরা যোগ দেয়। এই সম্মেলন প্রাকপার্লামেন্ট নামে একটি অস্থায়ী কাউন্সিল গঠন করে। বিপ্লবের চাকাকে পিছনে ঘুরাইয়া দেওয়ার জন্য, বুর্জোয়া নিয়মতান্ত্রিকতার বিকাশ ও বিপ্লবী জনগণকে বুর্জোয়া পার্লামেন্টি মনোবৃত্তির দিকে ঠেলিয়া দেয়ার জন্য এই ষড়যন্ত্র দাঁড় করানো হয়। বলশেভিকরা এই ষড়যন্ত্র উপলব্ধি করে এই প্রাক-পার্লামেন্ট বর্জনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

১৯১৭ সালের ৭ অক্টোবর লেনিন ফিনল্যান্ড থেকে গোপনে পেট্রোগ্রাডে ফিরে আসেন এবং ১০ অক্টোবর তারিখে পার্টির কেন্ত্রীয় কমিটির এক গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশনে যোগদান করেন। এখানেই পরবর্তি কয়েক দিনের মধ্যে সশস্ত্র অভ্যুত্থান শুরু করার সিদ্ধান্ত হয়। বলশেভিক পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কামেনভ ও জিনোভিয়েভ এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে বক্তব্য রাখেন। তবে তাদের বক্তব্য কেন্দ্রীয় কমিটিতে খারিজ হয়ে যায়। আর ট্রটস্কি সরাসরি এই প্রস্তাবের বিরোধিতা না করেও একটি সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপন করেন। তিনি প্রস্তাব করেন সোভিয়েতগুলির দ্বিতীয় কংগ্রেস শুরু হওয়ার আগে যেন এই অভ্যুত্থানের আয়োজন না করা হয়। তার এই প্রস্তাবের অর্থ হতো অভ্যুত্থানের প্রচেষ্টা ফাঁস হয়ে যাওয়া, অভ্যুত্থানে বিলম্ব ঘটা ও সাময়িক সরকারকে প্রস্তুত হওয়ার সুযোগ করে দেওয়া। তাই কেন্দ্রীয় কমিটিতে এই প্রস্তাব খারিজ হয়ে যায়।

অভ্যুত্থানের জন্য বলশেভিকরা সামগ্রিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করে। অভ্যুত্থানের প্রস্তুতির জন্য বলশেভিক পার্টি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিনিধি পাঠায়। বিভিন্ন প্রদেশে অভ্যুত্থান পরিচালনা করার জন্য পার্টি বিশেষভাবে ভরশিলভ, মলোটভ, ঝেরঝিন্সকি, অর্জনিকদজে, কিরভ, কাগানোভিচ, কুইবিশেভ, ফ্রুনজে য়ারোস্লভস্কি, ঝদানভ প্রভৃতি কমরেডদের হাতে ন্যস্ত হয়। পেট্রোগ্রাড ও মস্কো সোভিয়েতে অধিকাংশ আসন বলশেভিকদের দখলে আসার পর লেনিন মত দেন, বলশেভিকদের রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করা উচিত। শ্রমিক ও সৈনিকদের সোভিয়েতের আসন্ন অধিবেশন শুরু শুরু হওয়ার দিনে এই অভ্যুত্থানের দিন ধার্য হয়। কিন্তু পেট্রোগ্রাড সোভিয়েতের এক সভায় ট্রটস্কির বক্তব্যে অভ্যুত্থান আরম্ভ করার দিনের খবর ফাঁস হয়ে যায়। উদ্ভুত পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে অভ্যুত্থান শুরুর সময় এক দিন আগাইয়া সোভিয়েতের অধিবেশন শুরুর আগের দিন পুনর্নির্ধারণ করা হয়।

একদিকে বলশেভিকদের নেতৃত্বে বিপ্লবী অভ্যুত্থানের চেষ্টা চলে, অপরদিকে বিপ্লব বিরোধিরাও দ্রুত নিজেদের সকল শক্তি সমবেত করার চেষ্টা করে। কেরেন্সকি সরকার পেট্রোগ্রাড থেকে রাজধানী মস্কোতে সরিয়ে নেওয়ার পাঁয়তারা করে এবং পেট্রোগ্রাড জার্মান সেনাবাহিনীর হাতে তুলিয়া দিয়া বিপ্লব ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র আঁটে। কিন্তু পেট্রোগ্রাডের শ্রমিক ও সৈনিকদের বিক্ষোভের মুখে কেরন্সকি এই সিদ্ধান্ত অগ্রসর করতে পারে না। ১৬ অক্টোবর কেন্দ্রীয় কমিটির এক সভা হয়। এই সভায় কমরেড স্তালিনের নেতৃত্বে অভ্যুত্থান পরিচালনার জন্য এক পার্টিকেন্দ্র নির্বাচিত হয়। ইতিমধ্যে ১৮ অক্টোবর তারিখে কামেনভ ও জিনোভিয়েভ মেনশেভিকদের পত্রিকা নোভায়া ঝিঝন এ এক বিবৃতি দিয়ে অভ্যুত্থান বিরোধিতার নামে বলশেভিকদের অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা প্রকাশ করিয়া দেয়। লেনিন একে বেঈমানী হিসাবে বর্ণনা করেন এবং জিনোভিয়েভ, কামেনভকে পার্টি থেকে বহিষ্কারের প্রস্তাব করেন।

এই প্রেক্ষাপটে কেরেন্সকি সরকার এক গোপন সভা করিয়া বলশেভিকদের বিরুদ্ধে দমন অভিযান পরিচালনার ব্যবস্থাদি সম্বন্ধে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ১৯ অক্টোবর যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে সেনা প্রত্যাহার করে পেট্রোগ্রাডে জড়ো করে। সরকার রাস্তায় রাস্তায় বহু সশস্ত্র প্রহরী মোতায়েন করে। সরকার বলশেভিক পার্টির সদর দপ্তর স্মোলনি আক্রমণ ও দখল করার এবং বলশেভিকদের পরিচালনা কেন্দ্র ধ্বংস করার পরিকল্পনা করে। ২১ অক্টোবর তারিখে বলশেভিকদের পক্ষ থেকে অভ্যুত্থানের প্রস্তুতি তদারকি করার জন্য বিপ্লবী সৈনিক সংস্থাগুলিতে কমিসার পাঠায়।
অভ্যুত্থানের খবর আগেই ফাঁস হয়ে যাওয়ায় ২৪ অক্টোবর সকালেই কেরেন্সকি সরকার বলশেভিকদের বিরুদ্ধে আক্রমণ শুরু করে। সাময়িক সরকার বলশেভিকদের মুখপত্র ‘রাবোচি পুৎ’ বন্ধ করার নির্দেশ জরি করে এবং কাগজের সম্পাদকীয় অফিস ও ছাপাখানায় সাঁজোয়া গাড়ি ছুটিয়া যায়। কমরেড স্তালিনের নির্দেশে লালরক্ষীরা সকাল দশটার মধ্যে সাঁজোয়া গাড়িগুলিকে হটাইয়া দেয়। বেলা এগারোটার দিকে সামরিক সরকারের উচ্ছেদ করার আহ্বান জানিয়ে রাবোচি পুৎ পত্রিকা প্রকাশিত হয়।

২৪ অক্টোবর রাতে লেনিন বিপ্লবের সদর দপ্তর স্মোলনিতে হাজির হন এবং স্বয়ং অভ্যুত্থান পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। শহরের কেন্দ্রস্থলে জারের উইন্টার প্যালেসে ক্যাডেট ও শক ব্যাটেলিয়নগুলির পাহারায় সামরিক সরকার ঘাঁটি করে অবস্থান করছিল। বলশেভিকদের নির্দেশে রেডগার্ড ও বিপ্লবী সৈনিকেরা এই উইন্টার প্যালেস অবরোধ করে। বলশেভিকদের পরিকল্পনা মতো যুদ্ধ জাহাজ ‘অরোরা’ থেকে উইন্টার প্যালেস লক্ষ্য করে কামানের গোলা বর্ষণের ভিতর দিয়ে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের যুগের উদ্বোধন হয়। ২৫ অক্টোবর রাতেই শ্রমিক, সৈনিক ও নাবিকরা ঝড়ের মতো আক্রমণ করিয়া উইন্টার প্যালেস দখল করে এবং অস্থায়ী সরকারের সদস্যদের গ্রেফতার করে। ২৫ অক্টোবর তারিখে ‘রুশ দেশের নাগরিকদের প্রতি’ নামে এক ইস্তেহার বলশেভিকরা প্রচার করে। এই ইস্তেহারে বলা হয়, বুর্জোয়া সাময়িক সরকারকে উৎখাত করে সোভিয়েত স্বহস্তে রাষ্ট্র ক্ষমতা তুলে নিয়েছে।

এইভাবেই পেট্রোগ্রাডে সশস্ত্র অভ্যুত্থান বিজয়মন্ডিত হয়। আর ১৯১৭ সালের ২৫ অক্টোরব (৭ নভেম্বর) রাত ১০টা ৪৫ মিনিটে স্মোলনিতে দ্বিতীয় নিখিল রুশ সোভিয়েতে কংগ্রেসের উদ্বোধন হয়। রাজধানীর রাষ্ট্রশক্তি তখন পেট্রোগ্রাড সোভিয়েতের করায়ত্ত। মেনশেভিক, দক্ষিণপন্থী সোস্যালিস্ট রেভল্যুশনারি, বুন্দিস্টরা সোভিয়েতের দ্বিতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে যোগ দিতে অস্বীকার করে। তারা কংগ্রেসের উদ্দেশ্যে এক বিবৃতি প্রদান করে, যে বিবৃতি কংগ্রেসে পাঠ করা হয়। এই বিবৃতিতে তারা সোভিয়েতের ক্ষমতা দখলকে সামরিক ষড়যন্ত্র হিসাবে বর্ণনা করে। দ্বিতীয় সোভিয়েতের কংগ্রেসের ঘোষণায় বলা হয় যে, “বিপুল সংখ্যাধিক্যে শ্রমিক সৈনিক ও কৃষকদের অনুমোদনের জোরে এবং পেট্রোগ্রাডে শ্রমিক ও সৈন্যবাহিনীর বিজয় অভ্যুত্থানের সমর্থনে কংগ্রেস নিজের হাতে রাষ্ট্র শক্তি গ্রহণ করিল।” (সূত্র ঃ বলশেভিক পার্টির ইতিহাস)।

সোভিয়েতের দ্বিতীয় কংগ্রেস ২৬ অক্টোবর শান্তি বিষয়ক নির্দেশনামা গ্রহণ করে। এই নির্দেশনামায় শান্তি বিষয়ে কথাবার্তা বলার জন্য অন্তত তিন মাস মাসের মধ্যে যুদ্ধমান দেশসমূহের সরকার ও জনগণের প্রতি আহ্বান জানায়। যুদ্ধে জড়িত তিনটি বৃহৎ রাষ্ট্র জার্মান, ফ্রান্স ও ব্রিটেনের শ্রমিক শ্রেণীর যুদ্ধ বন্ধে কার্যকরী ভূমিকা গ্রহণের আহ্বান জানায়। দ্বিতীয় সোভিয়েত কংগ্রেস ভূমি বিষয়ক নির্দেশনা প্রদান করে। এই নির্দেশনায় জমিদার, জার পরিবার, মঠ ও গির্জার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার ঘোষণা দেওয়া হয়। কৃষককে জমির খাজনা দেয়ার দায় থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। সমস্ত খনিজ সম্পদ, অরণ্য ও জলাশয় জমিদারের সম্পত্তিতে পরিণত করা হয়। দ্বিতীয় নিখিল রুশ সোভিয়েত কংগ্রেসে প্রথম সোভিয়েত সরকার গঠিত হয়। শুধু বলশেভিকদের নিয়ে ‘পিপলস কমিশারদের কাউন্সিল’ গঠিত। এই পিপলস কমিশার কাউন্সিলের সভাপতি নির্বাচিত হন কমরেড লেনিন। এইভাবে অক্টোবর বিপ্লবের মাঝ দিয়ে বলশেভিকরা রাষ্ট্র ক্ষমতা গ্রহণ করে।

কমরেড লেনিন মার্কস-এঙ্গেলসের মতবাদের বাস্তব প্রয়োগ ঘটিয়ে রুশ দেশে অক্টোবর সমাজতান্ত্রিক সম্পন্ন করেন। মহামতী মার্কস ও এঙ্গেলস তাদের বিপ্লবী মতবাদ প্রচার করেন প্রাক সাম্রাজ্যবাদের যুগে। অর্থাৎ পুঁজিবাদ যখন সাম্রাজ্যবাদের যুগে প্রবেশ করেনি, শ্রমিক শ্রেণী যখন বিপ্লবের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, শ্রমিক বিপ্লব যখন আশু ও অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠেনি, সেই সময়ে। আর কমরেড লেনিন তার কার্যকলাপ চালান সাম্রাজ্যবাদের যুগে; পুঁজিবাদ যখন সাম্রাজ্যবাদের যুগে প্রবেশ করেছে, শ্রমিক বিপ্লব যখন আশু ও অবশ্যম্ভাবী কর্তব্যে পরিণত হয়েছে সেই সময়ে। মার্কস-এঙ্গেলস যখন তাদের কার্যকলাপ চালান তখন বিশ্বব্যাপী মৌলিক দ্বন্দ্ব ছিল শ্রমের সাথে পুঁজির দ্বন্দ্ব। আর লেনিন যখন কার্যকলাপ চালান তখন সাম্রাজ্যবাদের যুগে শ্রমের সাথে পুঁজির দ্বন্দ্ব; আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্ব এবং সাম্রাজ্যবাদের দ্বারা নিপীড়িত জাতি ও জনগণের সাথে সাম্রাজ্যবাদের দ্বন্দ্ব- বিশ্বব্যাপী এই তিন মৌলিক দ্বন্দ্ব ক্রিয়াশীল থাকে। অক্টোবর বিপ্লবের ভিতর দিয়ে সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার উদ্ভব ঘটে। ধনতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার সাথে সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার দ্বন্দ্ব আরও একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব হিসাবে সামনে আসে।
লেনিনবাদের অন্যতম প্রধান ব্যাখ্যাদাতা কমরেড স্তালিন লেনিনবাদকে মার্কসবাদের আরও বিকশিত রূপ হিসাবে তুলে ধরেছেন। কমরেড স্তালিন বলেন, “লেনিনবাদ হলো সাম্রাজ্যবাদ এবং শ্রমিক বিপ্লবের যুগের মার্কসবাদ। আরও সঠিকভাবে বলতে গেলে বলতে হয় লেনিনবাদ হলো সাধারণভাবে শ্রমিক বিপ্লবের মতবাদ ও রণকৌশল এবং বিশেষভাবে এ হলো শ্রমিক শ্রেণীর একনায়কত্বের মতবাদ ও রণকৌশল। বিকশিত সাম্রাজ্যবাদের যখন জন্ম হয়নি, সর্বহারারা যখন বিপ্লবের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে, শ্রমিক বিপ্লব যখন কার্যক্ষেত্রে আশু ও অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠেনি সেই প্রাক বিপ্লব যুগে (আমরা এখানে শ্রমিক শ্রেণীর বিপ্লবের কথাই বলছি) মার্কস আর এঙ্গেলস তাদের কার্যকলাপ চালাতেন। আর মার্কস আর এঙ্গেলসের শিষ্য লেনিন তাঁর কাজ চালিয়েছেন বিকশিত সাম্রাজ্যবাদের যুগে, শ্রমিক বিপ্লবের বিকাশের যুগে- যখন শ্রমিক বিপ্লব একটি দেশে ইতিমধ্যেই জয়যুক্ত হয়েছে, বুর্জোয়া গণতন্ত্রকে চূর্ণ করে শ্রমিক শ্রেণীর গণতন্ত্রের সোভিয়েততন্ত্রের যুগের সূত্রপাত করেছে।” ( লেনিনবাদের ভিত্তি- জে.ভি.স্তালিন)।

বিশ্বব্যাপী তীব্র লড়াই সংগ্রামের প্রক্রিয়াতেই শ্রমিক বিপ্লবের মতবাদ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মার্কসবাদ-লেনিনবাদ। লেনিনের সময় থেকেই দক্ষিণপন্থী সুবিধাবাদী ও বাম হটকারী অবস্থান থেকে লেনিনবাদের বিরুদ্ধে আক্রমণ এসেছে। সংশোধনবাদী সুবিধাবাদীরা, শ্রমিক বিপ্লবের শত্রুরা এখনও ডান সুবিধাবাদী ও বাম হটকারী অবস্থান থেকে লেনিনবাদের বিরুদ্ধে আক্রমণ অব্যাহত রেখেছে। আজ শ্রমিক শ্রেণীর কাতারে বুর্জোয়া অনুপ্রবেশকারীরা লেনিনবাদকে ভূলুণ্ঠিত করে দেশে দেশে শ্রমিক বিপ্লবের সম্ভাবনাকে বিনাশ করতে চাইছে। আজ বিশ্বের দেশে দেশে শ্রমিক শ্রেণীর কর্তব্য হচ্ছে এই সব অপচেষ্টার বিরুদ্ধে দৃঢ় সংগ্রাম কমরেড লেনিনের মহান অবদানসমূহকে রক্ষা করা, লেনিনবাদের পতাকাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরে দেশে দেশে শ্রমিক বিপ্লব সম্পন্ন করা।
কমরেড লেনিনের কার্যকলাপের সময়ে কাউৎস্কি, বার্নস্তাইন, প্লেখানভ, ট্রটস্কি, কামেনভ, জিনোভিয়েভ ইত্যাদি লেনিনের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করে। কমরেড লেনিনকে এই সব নেতাদের বিরুদ্ধে তীব্র লড়াই করেই তাঁর মতবাদকে প্রতিষ্ঠিত করতে হয়, রুশ দেশে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করতে হয়। বিপ্লবের পরও লেনিন ও লেনিনবাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দেশের বুর্জোয়া শ্রেণী ও তাদের সেবক বুদ্ধিজীবীদের কুৎসা, অপপ্রচার বন্ধ হয়নি, বরং তা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। আবার সংশোধনবাদী সুবিধাবাদীদের পক্ষ থেকে মার্কসবাদ-লেনিনবাদের নামেই লেনিনবাদের বিরুদ্ধে আক্রমণ চালানো হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক পর্যায়ে আল ব্রাউডার লেনিনবাদ নামে লেনিনবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম পরিচালনা করেন। ১৯৫৩ সালে কমরেড স্তালিনের রহস্যজনক মৃত্যুর পর সোভিয়েত দেশে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে ক্রুশ্চেভ ব্রেজনেভ চক্র। তারাও স্তালিন বিরোধিতার নামে মার্কসবাদ-লেনিনবাদ বিরোধী সংশোধনবাদী সুবিধাবাদী তত্ত্বকে সামনে আনে। তারা সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টিকে একটি বুর্জোয়া পার্টিতে পরিণত করে। ক্রুশ্চেভ ব্রেজনেভ চক্রের ভূমিকায় আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনে তীব্র মতাদর্শগত বিতর্ক সৃষ্টি হয়। বিশ্বের দেশে দেশে কমিউনিস্ট পার্টিগুলোতে ভাঙনের সৃষ্টি হয়। ক্রুশ্চেভ ব্রেজনেভ চক্রের অনুসারীরা নিজেদের পার্টিকে সংশোধনবাদী সুবিধাবাদী পার্টিতে পরিণত করে।

এই সময়ে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনে আর এক সংশোধনবাদ মাও চিন্তাধারা সামনে আসে। এই সংশোধনবাদের অনুসারীরা এখন অনেকেই নিজেদের মাওবাদী হিসাবে পরিচয় দিয়ে স্বাচ্ছন্দ বোধ করছে। এখানে উল্লেখ্য যে, ১৯৪৯ সালে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে সে দেশে গণতান্ত্রিক বিপ্লবের পর মাও সেতুংয়ের নেতৃত্বে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি আর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পথে অগ্রসর হয়নি। মার্কসবাদ-লেনিনবাদকে পরিত্যাগ করে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি সমাজতন্ত্রে উত্তরণের ক্ষেত্রে লেনিনবাদ বিরোধী এক উদ্ভট তত্ত্ব হাজির করে এবং পুঁজিবাদের পথ অনুসরণ করে। দর্শনের ক্ষেত্রেও মাও সেতুং দ্বান্দ্বিক ঐতিহাসিক বস্তুবাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিহার করে মার্কসবাদ- লেনিনবাদের অনুশীলনের নামে ভাববাদকে সামনে তুলে ধরে। মাও সেতুং এর জীবিত অবস্থায় চীনের কমিউনিস্ট পার্টি একটি সংশোধনবাদী পার্টিতে পরিণত হয়। তার জীবিত অবস্থায় চীনের কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিবিপ্লবী তিনবিশ্ব তত্ত্ব প্রচার করে। এই তিনবিশ্ব তত্ত্বের প্রেক্ষিতে চীন-মার্কিনের আঁতাত এবং বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনে তার প্রভাবে বিশ্বের দেশে দেশে কমিউনিস্ট আন্দোলনে নতুন বিতর্ক ও বিভক্তির সৃষ্টি হয়। বর্তমানে চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি একটি পরিপূর্ণ বুর্জোয়া পার্টিতে পরিণত হয়েছে। সেই সাথে পুঁজিবাদী চীন সাম্রাজ্যবাদী চীনে পরিণত হওয়ার লক্ষ্যে অগ্রসর হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনে স্তালিন বিরোধী অবস্থান থেকে আর এক বিতর্ক সৃষ্টি করা হচ্ছে। লেনিন উত্তোরকালে কমরেড স্তালিন ছিলেন সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতন্ত্র বির্নিমাণের প্রধান রূপকার। এই সময় থেকেই ট্রটস্কিবাদী বাম হটকারী ও দক্ষিণপন্থী সুবিধাবাদী সংশোধনবাদী অবস্থান থেকে স্তালিন প্রশ্নে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। আর বিতর্কে রসদ জোগায় একচেটিয়া পুঁজির মালিক সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো। আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনে মাও সেতুংও স্তালিনকে নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছেন। মাও সেতুং এর নেতৃত্বে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির পলিটব্যুরো স্তালিনকে মূল্যায়ন করে বলে যে, স্তালিনের ভুলভ্রান্তি সমগ্রের শতকরা মাত্র ত্রিশ ভাগ আর কৃতিত্ব শতকরা সত্তর ভাগ। দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে কোন ব্যক্তিকে এইভাবে শতকরা হিসাবে মূল্যায়ন করা কতটা যথাযথ সে প্রশ্ন থেকেই যায়। বর্তমানে মার্কসবাদ-লেনিনবাদের নামে স্তালিনকে আক্রমণ করা হচ্ছে। এদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে স্তালিন ত্রুটিমুক্ত ছিলেন না! বেশকিছু গুরুতর ভুলভ্রান্তি তাঁর ছিল! তবে তিনি রাশিয়ায় সমাজতন্ত্রের রূপকার ইত্যাদি ইত্যাদি। আবার ট্রটস্কিবাদী অবস্থান থেকেও স্তালিনের ওপর নতুন কৌশলে আক্রমণ করা হচ্ছে। এসব হচ্ছে অতি সুকৌশলে স্তালিনের ওপর আক্রমণ তথা মার্কসবাদ-লেনিনবাদের ওপর আক্রমণ।  বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনে এ হচ্ছে অতি সুকৌশলে বিভ্রান্তি সৃষ্টির আর এক অপচেষ্টা মাত্র। এই সকল বিতর্ক বিভ্রান্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে মার্কসবাদ-লেনিনবাদের জ্ঞানভান্ডারে স্তালিনের অবদাসমূহকে রক্ষা করতে হবে।

লেখকঃ মঈনুদ্দীন সিরাজী

সূত্রঃ

13076745_715535491921699_3304914592563662269_n


ছত্তিশগড় সরকার সিপিআই(মাওবাদী) উপর নিষেধাজ্ঞার সময়সীমা বাড়িয়েছে

6776-guerillas3

অনূদিতঃ 

ছত্তিশগড় সরকার পরবর্তী বছরের জন্যে সিপিআই(মাওবাদী) এবং তার ছয়টি অঙ্গ সংগঠনের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।  এই নিষেধাজ্ঞা ছত্তিশগড় স্পেশাল পাবলিক সিকিউরিটি অ্যাক্ট ২০০৫-এর তিনটি ধারার অধীন আরোপিত হয়েছে।  TOI সঙ্গে আলাপকালে নকশাল অপারেশনস এর স্পেশাল ডিজি  ডিএম আওস্থি বলেন, “সরকার সিপিআই(মাওবাদী) এবং তার অঙ্গ সংগঠন দন্ডকারণ্য আদিবাসী কিষাণ মজুর সংঘ, ক্রান্তিকারি আদিবাসী নারী সংঘ, ক্রান্তিকারি কিষাণ কমিটি, নারী মুক্তি মঞ্চ, আরপিসি এবং জনতা সরকারকে আরও এক বছরের জন্য অবৈধ ঘোষণা করেছে।  অদূর ভবিষ্যতে নকশাল কার্যক্রম থেকে নিবৃত্ত করার জন্যেই এই কাজ করা হয়েছে।

সূত্রঃ http://timesofindia.indiatimes.com/city/raipur/Chhattisgarh-govt-extends-ban-on-CPI-Maoist/articleshow/52280925.cms