যে প্রেক্ষাপটে অক্টোবর বিপ্লব

Ussr_Day_of_the_October_Revolution_1938

 

যে প্রেক্ষাপটে অক্টোবর বিপ্লব

 

১৯১৭ খিষ্টাব্দের রুশদেশে নভেম্বর বিপ্লব মানব সমাজের ইতিহাসে সবথেকে বড় সামাজিক বিপ্লব। পুরানো পঞ্জিকার হিসাবে এটাকে অক্টোবর বিপ্লবও বলা হয়। ফরাসি বিপ্লবসহ অন্যান্য বিপ্লবগুলো এক ধরনের শোষণের উচ্ছেদ ঘটিয়ে আর এক ধরনের শোষণ, এক ধরনের বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে আর এক ধরনের বৈষম্য প্রতিষ্ঠা করেছিল। রুশ অক্টোবর বিপ্লবের লক্ষ্য ছিল মানব সমাজ থেকে সকল প্রকার শোষণ ও বৈষম্যের চির অবসান ঘটানো। এ ধরনের বিপ্লব মানব সমাজে এটাই প্রথম। অবশ্য এর আগে ফ্রান্সের প্যারিস শহরে প্যারি কমিউন নামে একটা বিপ্লব হয়েছিল যে বিপ্লবের লক্ষ্য ছিল মানব জাতির ওপর চেপে বসা সকল নিপীড়ন ও বৈষম্যের অবসান ঘটানো। ১৮৭১ সালের ১৮ মার্চ থেকে ২৮ মে পর্যন্ত ছিল এই বিপ্লবের স্থায়িত্বকাল। বিশ্বের প্রথম প্রলেতারীয় (সর্বহারা শ্রেণি) বিপ্লব ও শ্রমিক শ্রেণির সরকারকে শোষক শ্রেণি উচ্ছেদ করেছিল অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে। অতএব রুশ নভেম্বর বিপ্লবই ছিল শোষণ বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রথম সফল বিপ্লব। সাম্যভিত্তিক মানবিক সমাজের যে স্বপ্ন মানুষ যুগ যুগ ধরে লালন করে আসছিল তার রূপায়নই ছিল এই বিপ্লবের লক্ষ্য। শোষণ বৈষম্যের যন্ত্রণায় আর্তনাদরত অমানবিক সমাজ ব্যবস্থাকে উচ্ছেদ করাই ছিল এর লক্ষ্য। রুশ দেশে অক্টোবর বিপ্লব কী কী করেছিল তার মূল্যায়ন করার সময়ে এই বিপ্লব কী কী করতে চেয়েছিল তাকেও বিবেচনায় রাখা উচিত।

নতুন পঞ্জিকা অনুসারে ১৯১৭ সালের মার্চে (১২ মার্চ) রাশিয়ায় বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন হয়। জার রাজতন্ত্রের পতন ঘটে। একই দিন উত্থান ঘটে শ্রমিক ও সৈনিক প্রতিনিধিদের পেট্রোগ্রাড সোভিয়েত। পুরানো পঞ্জিকার হিসাবে (তখন রাশিয়ায় প্রচলিত) এটাকে ফেব্রুয়ারি বিপ্লব বলা হয়। এই বিপ্লবের ফলে এক সাথে দ’ুটো সংস্থার উদ্ভব ঘটে। একটা হলো বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক সরকার, আরেকটি হলো শ্রমিক ও সৈনিক প্রতিনিধিদের পেট্রোগ্রাড সোভিয়েত। উল্লেখ্য যে তখন রাশিয়ার রাজধানী ছিল পেট্রোগ্রাড। এটা যেন অনেকটা একটা রাজতন্ত্রী সরকারের পতনের ফলে এক সাথে বুর্জোয়া ও সর্বহারাদের দুটি সরকারের উদ্ভব। দু’টি সরকারের উদ্ভবের ঘটনা ইতিহাসে অভূতপূর্ব। মূলত শ্রমিক ও সৈনিক প্রতিনিধিদের সোভিয়েতের উদ্ভবের মধ্যেই নিহিত ছিল রুশ দেশে নভেম্বর বিপ্লবের ভিত্তি।

এ সম্পর্কে লেনিন লিখেছেন, ‘আমাদের বিপ্লব সৃষ্টি করেছে দ্বৈত ক্ষমতা, এই হলো তার খুবই লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য। এই ঘটনাটিকে সর্বাগ্রে উপলব্ধি করতে হবে, এটা না বুঝলে আমরা এগোতে পারবো না। দ্বৈত ক্ষমতার কথা আগে কেউ ভাবেনি, ভাবতে পারতোও না। এই দ্বৈত ক্ষমতাটা কি? বুর্জোয়াদের সাময়িক সরকারের পাশাপাশি দেখা দিয়েছে আর একটা সরকার, সেটা এখন অবধি দুর্বল, প্রারম্ভিক, কিন্তু নিঃসন্দেহে একটা সরকার, যার প্রকৃত অস্তিত্ব রয়েছে বাড়ছে- শ্রমিক এবং সৈনিক প্রতিনিধিদের সোভিয়েতগুলি। ….এটা প্রলেতারীয়েত এবং সৈনিকের উর্দি পরা কৃষকদের নিয়ে গঠিত।’ লেনিনের মতে শ্রমিক কৃষকের অসাধারণ সৃজনী ক্ষমতা স্বতঃস্ফূর্তভাবে সোভিয়েতগুলো সৃষ্টি না করলে নভেম্বর বিপ্লব সম্ভব হতো না।
মার্চ বিপ্লবের ফলে শ্রমিক ও সৈনিকদের পেট্রোগ্রাড সোভিয়েত রাশিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংস্থায় পরিণত হয়। গণতন্ত্রের পথে দ্রুত অগ্রযাত্রার প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে এই সংস্থা বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক সাময়িক সরকারকে মেনে নেয়। দুমা সাময়িক কমিটি এবং সোভিয়েত কার্যকরী কমিটি যৌথভাবে কিছু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়। এসব ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে কারাগারে ও নির্বাসনে থাকা সকল রাজনৈতিক নেতা কর্মীর প্রতি সাধারণ ক্ষমা; মতামত প্রকাশ, বক্তৃতা ও সংবাদপত্র প্রকাশ এবং ধর্মঘট করার স্বাধীনতা, সমাবেশ করার স্বাধীনতা, সর্বজনীন গোপন ভোটের ভিত্তিতে নির্বাচনের ব্যবস্থা; যুদ্ধরত না থাকা অবস্থায় সেনাবাহিনীও সংগঠন ও রাজনীতি করার অধিকার লাভ ইত্যাদি।

সেনাবাহিনীর রাজনীতি করার অধিকার লাভ একটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। বুর্জোয়া অস্থায়ী সরকারের যুদ্ধমন্ত্রী কেরেন্সকি সোলজার্স চার্টার্স জারি করেছিলেন। এর ফলে সৈনিকেরা সাধারণ নাগরিকদের মতো সকল বিষয়ে সমান অধিকার প্রাপ্ত হয়। তারা স্বাধীনভাবে মতামত প্রকাশ, যুদ্ধে নিয়োজিত না থাকা অবস্থায় অসামরিক পোশাক পরিধান, রাজনৈতিক দলে সম্পৃক্ত হওয়া ইত্যাদি অধিকার লাভ করে। অফিসারদের প্রতি সৈনিকদের অভিবাদনের প্রথা এবং শারীরিক দন্ড বিধানের ব্যবস্থা রহিত করা হয়। প্রাণদন্ডের বিধানও বাতিল করা হয়। পাশাপাশি শ্রমিক ও সৈনিকদের সোভিয়েত এক ঘোষণা প্রচার করে। এই ঘোষণার ফলে সাধারণ সৈনিকেরা তাদের অফিসারদের নির্বাচনের অধিকার লাভ করে। অস্ত্রশস্ত্র সৈনিকদের হাতেই থাকবে এবং সেনাদলের পর্যবেক্ষণের ভার সৈনিক সমিতির ওপর ন্যস্ত করা হয়। এই ঘোষণার ফলে সাধারণ সৈনিক ও তাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে কোন পার্থক্য থাকলো না।

মার্চ বিপ্লবের সময়ে লেনিন রাশিয়ায় ছিলেন না। বিপ্লবের পর তিনি দেশে ফেরেন। বিপ্লবের পর গৃহীত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাবলির ফলাফল সম্পর্কে লেনিন ১৯১৭ সালের ২০ এপ্রিল প্রাভদা পত্রিকায় রাশিয়াকে সবচেয়ে মুক্ত গণতন্ত্রের দেশ বলে উল্লেখ করেন। এ ধরনের অবাধ গণতন্ত্রের পরিপূর্ণ সদ্ব্যবহার করে লেনিনের নেতৃত্বাধীন বলশেভিক পার্টি। বিশেষ করে সেনাবাহিনীর মধ্যে সংগঠন করা ও রাজনৈতিক আদর্শ প্রচারের সুযোগ তারা লুফে নেয়। সেনাবাহিনীর মধ্যে বলশেভিকদের সংগঠন ছিল নভেম্বর বিপ্লবের মূল ভিত্তি। এ সম্পর্কে লেনিন লিখেছিলেন, ‘আমাদের সঙ্গে ছিল সৈন্যবাহিনীর প্রায় অর্ধেক, লোকসংখ্যায় তা ছিল অন্তত এক কোটি।’ নভেম্বর বিপ্লবকে ভালভাবে বুঝতে হলে অন্তত এই কথাটি মনে রাখা দরকার।

তবে বিশ্বের সবথেকে অবাধ গণতন্ত্রের স্থায়িত্ব ছিল খুবই কম। ৫ জুলাই থেকে বুর্জোয়াদের অস্থায়ী সরকার গণতন্ত্রের ওপর হামলা শুরু। ৬ জুলাই লেনিনসহ কয়েকজন শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে জারি করা হয় গ্রেফতারী পরোয়ানা। লেনিন আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হলেন। লেনিনকে বলা হলো জার্মানির দালাল। অথচ তখন রাশিয়ার সাথে জার্মানির যুদ্ধ চলছিল। লেনিনকে গ্রেফতারের জন্য অভিযান চলছিল। তবে লেনিনকে গ্রেফতারের জন্য বুর্জোয়া সরকারের সর্বাত্মক চেষ্টা ব্যর্থ হয়। ২৬ জুলাই থেকে ৩ আগস্ট পর্যন্ত পেট্রোগ্রাডে অনুষ্ঠিত হয় বলশেভিক পার্টির ৬ষ্ঠ কংগ্রেস। আত্মগোপনে থাকায় লেনিন এই কংগ্রেসে উপস্থিত হতে পারেন নাই। তবে তার লেখা প্রবন্ধ ও থিসিসগুলো হয় কংগ্রেসে আলোচনা ও সিদ্ধান্তের মূল ভিত্তি। কংগ্রেসে সর্বসম্মতিক্রমে লেনিনকে বলশেভিক পার্টির নেতা নির্বাচিত করা হয়। সারা দেশ জুড়ে বলশেভিকদের বিরুদ্ধে দমন অভিযান চলছিল বিধায় এই কংগ্রেসের খবর গোপন রাখতে হয়েছিল। কংগ্রেস সশস্ত্র অভ্যুত্থানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ট্রটস্কিকে বলশেভিক পার্টিতে গ্রহণ করা হয়।

এই সময়ে নিরাপত্তার স্বার্থে লেনিন গোপনে ফিনল্যান্ডে অবস্থান করেন। ইতোমধ্যে কেরেন্সকি অস্থায়ী বুর্জোয়া সরকারের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব প্রাপ্ত হন (জুলাই)। তিনি জেনারেল কর্নিলভকে সেনাবাহিনীর প্রধান নিয়োগ করেন। কর্নিলভ ঘোষণা করেন (আগস্ট), ‘লেনিন যাদের নেতা সেই জার্মান গুপ্তচর সমর্থকদের এখনই নির্মূল করতে হবে; শ্রমিক ও সৈনিক প্রতিনিধিদের সোভিয়েত এখনই ভেঙে দিতে হবে। যাতে তারা আর একত্রিত হতে না পারে।’ এক পর্যায়ে কর্নিলভ কেরেন্সকি সরকারের বিরুদ্ধে সামরিক অভ্যুত্থান সংগঠিত করার চেষ্টা করেন। তবে সেই অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং কর্নিলভকে গ্রেফতার করা হয়। কর্নিলভের অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার ফলে সরকার ও সেনাবাহিনীর অবস্থা আরও দুর্বল হয়ে পড়ে।

কর্নিলভ যেদিন গ্রেফতার হন সেদিন অর্থাৎ ১৩ সেপ্টেম্বর (নতুন পঞ্জিকা অনুসারে) পেট্রোগ্রাড সোভিয়েতে [এত দিন যেখানে মেনশেভিক ও সোশালিস্ট রেভেল্যুশনারি নিয়ন্ত্রণ ছিল] বলশেভিকদের পক্ষে একটি প্রস্তাব পাশ হয়। পেট্রোগ্রাড সোভিয়েত বলশেভিকদের পক্ষে যোগদান করে। এর পাঁচ দিন পর মস্কো সোভিয়েতও বলশেভিকদের পক্ষে যোগদান করে। এর পর অন্যান্য শহরের সোভিয়েতগুলো ক্রমে ক্রমে একই পথ অবলম্বন করে বলশেভিকদের পক্ষে যোগদান করে। এর আগে জুলাই মাসে অস্থায়ী সরকার বলশেভিকদের ওপর দমন পীড়ন শুরু করলে তাদের অবস্থা সঙ্কটে পড়ে। এবার বলশেভিকদের অবস্থার দ্রুত উন্নতি শুরু হয়। কর্নিলভ ঘটনার পর তাজা বাতাস বলশেভিকদের পালে হাওয়া লেগে তাদের যেন সামনে নিয়ে এলো। লেনিন লিখেছেন, ‘শ্রমিক ও সৈনিকদের সোভিয়েতে সংখ্যাধিক্য লাভ করায় রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করতে পারে বলশেভিকরা এবং তারা অবশ্যই রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করবে। উভয় রাজধানীতে শ্রমিক ও সৈনিক প্রতিনিধিদের সোভিয়েতে বলশেভিকরা সংখ্যাধিক্য লাভ করেছে। …. পেট্রোগ্রাড ও মস্কোতে অবিলম্বে ক্ষমতা দখল করতে হবে।’

অক্টোবরে লেনিন দেশে ফিরে আসেন [পুরাতন পঞ্জিকা অনুসারে]। ১০ অক্টোবর বলশেভিক পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির গোপন অধিবেশনে সশস্ত্র অভ্যুত্থানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন লেনিন। এর ছয় দিন পর কেন্দ্রীয় কমিটির আর একটি অধিবেশন হয় কালিনিনের সভাপতিত্বে। লেনিন এতে সশস্ত্র অভ্যুত্থানের পক্ষে বক্তব্য রাখেন। ওই অধিবেশনে সশস্ত্র অভ্যুত্থানের পক্ষে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। কেন্দ্রীয় কমিটি পেট্রোগ্রাড সোভিয়েতে গঠন করে বৈপ্লবিক সামরিক কমিটি। পেট্রোগ্রাড সোভিয়েতের সভাপতি ছিলেন ট্রটস্কি।

৭ নভেম্বর ১৯১৭ বলশেভিক পার্টি পেট্রোগ্রাডে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কেরেন্সকি পালায়ন করেন। এই সশস্ত্র বিপ্লবে কোন রক্তপাত হয়নি। রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের পর লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিকরা সরকার গঠন করে। বুর্জোয়াদের বহুল ব্যবহৃত গতানুগতিক মন্ত্রিসভা শব্দটি লেনিন বর্জন করেন। তিনি তার মন্ত্রিসভার নামকরণ করেন ‘পিপলস কমিশার্স’। তিনি হন এর সভাপতি।

বলশেভিক পার্টি ক্ষমতা দখলের সাথে সাথে একটা ঘোষণা জারি করে। তা হলো; রাশিয়ার নাগরিকদের প্রতি! সাময়িক সরকার ক্ষমতাচ্যুৎ। রাষ্ট্র ক্ষমতা শ্রমিক ও সৈনিক প্রতিনিধিদের পেট্রোগ্রাড সোভিয়েতের সংস্থা- সামরিক বিপ্লবী কমিটির হস্তগত, পেট্রোগ্রাড প্রলেতারিয়েত ও গ্যারিসনের নেতৃত্ব করছে এই কমিটি। জনগণ যে অভীষ্টের জন্য লড়েছিল; অবিলম্বে গণতান্ত্রিক শান্তির প্রস্তাব, জমির ওপর জমিদারি স্বত্বের অবসান; উৎপাদনের ওপর শ্রমিকের নিয়ন্ত্রণ সোভিয়েত সরকার গঠন সেই লক্ষ্য নিশ্চিতভাবে অর্জিত হয়েছে। শ্রমিক সৈনিক ও কৃষকদের বিপ্লব জিন্দাবাদ।

সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে বলশেভিক পার্টির সংগঠন থাকায় ক্ষমতা দখলের ক্ষেত্রে সশস্ত্র বাহিনীই ৭ নভেম্বর মূল ভূমিকা পালন করে। এ জন্য জন রিড তাঁর ‘দুনিয়া কাপানো দশ দিন’ বইতে নভেম্বর বিপ্লবকে বলশেভিক ক্যুদেতা বলেও উল্লেখ করেছেন। নভেম্বর বিপ্লব ভালভাবে বুঝতে হলে সশস্ত্র বাহিনীর এই ভূমিকা বোঝা দরকার।

বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীরা সোভিয়েতকে এত ঘৃণা করতো যে, শ্রমিক ও সৈনিক প্রতিনিধিদের সোভিয়েতকে বলতো ‘কুকুর প্রতিনিধিদের সোভিয়েত’। আলবার্ট রিচ উইলিয়মস লিখেছেন, ‘বলশেভিক পার্টির শতকরা ৯৬ জন ছিলেন শ্রমজীবী। সরাসরি শ্রমিকের জীবন থেকে আসেন নাই এমন সব বুদ্ধিজীবীও অবশ্য পার্টিতে ছিলেন। তবে লেনিন আর ট্রটস্কি দুঃখকষ্টের জীবনের এত কাছাকাছি ছিলেন যে, গরিব মানুষের ভাব ভাবনার কথা তাঁদের জানা ছিল।’

নভেম্বর বিপ্লব যখন সম্পন্ন হয় তখনও প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলছিল। এই যুদ্ধে লক্ষ লক্ষ মানুষ নিহত হয়েছে। অসংখ্য মানুষকে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর ফলে কলকারখানা ও কৃষিতে কাজের মানুষের অভাব দেখা দিয়েছে। অস্ত্রশস্ত্রের অভাব, মন্ত্রীদের দুর্নীতি, রাষ্ট্র যন্ত্রের বিশৃঙ্খল অবস্থা, জারের দরবারে মূর্খ রাজপুটিনের অপ্রতিহত প্রভাব ইত্যাদির ফলে রাশিয়ায় ঘনিয়ে আসে এক ভয়াবহ সঙ্কট। যুদ্ধেও জারের সৈন্যবাহিনীর হার হচ্ছিল। এই ব্যাপক অরাজক অবস্থার আসল চাপটা পড়েছিল রাশিয়ার শ্রমিক ও কৃষকদের ওপর। বলতে গেলে জারের শাসন ব্যবস্থা নিজ থেকেই ভেঙে পড়েছিল। শান্তির জন্য মানুষ ব্যাকুল হয়ে পড়েছিল। এই পরিস্থিতিতেই রাশিয়াতে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব সংঘটিত হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণে উদ্ভুত পরিস্থিতি এই বিপ্লবের সহায়ক ভূমিকা পালন করে। বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব মানুষের শান্তির আকাক্সক্ষা পূরণে ব্যর্থ হয়েছিল। জারের আমলে শুরু হওয়া সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বযুদ্ধ অব্যাহত রাখে বুর্জোয়া সরকার। অথচ রাশিয়ার মানুষের চাওয়া ছিল যুদ্ধের অবসান। এই পরিস্থিতি নভেম্বর বিপ্লবের প্রেক্ষাপট সৃষ্টি করে দেয়।

একটা দেশে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন হলে সে দেশে বিপ্লবের পরবর্তি স্তর হয় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব। তাই রাশিয়ায় তখন থেকে শুরু হয়েছিল সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের স্তর। ভারতের সুব্রত বল লিখেছেন, ‘সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের স্তর শুরু হওয়া, সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব শুরু হওয়া এবং সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের সামাজিক দায়িত্বসমূহ শুরু হওয়া এক জিনিস নয়। সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের স্তরের সূচনা নির্ধারিত হয় বুর্জোয়া শ্রেণির রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল দ্বারা, আর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের সূচনা নির্ধারিত হয় শ্রমিক শ্রেণির একচ্ছত্র ক্ষমতা কায়েমের দ্বারা [শ্রমিক শ্রেণির সেই সরকার কখন সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের সামাজিক দায়িত্বসমূহের রূপায়ন শুরু করতে পারছে তার দ্বারা নয়]। যদিও কৃষি প্রধান রাশিয়ার বিস্তীর্ণ গ্রামাঞ্চলে ১৯১৭ সালের নভেম্বর বিপ্লবের ফলে সর্বশ্রেণির কৃষকের যৌথ ক্ষমতা কায়েম হয়েছিল এবং যদিও দীর্ঘ এক বছর যাবৎ গ্রামের বিপ্লব বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক স্তরের সীমা অতিক্রম করেনি। তবু যেহেতু শ্রমিক শ্রেণি একচ্ছত্রভাবে রাশিয়ায় কেন্দ্রীয় অর্থাৎ নির্ধারক ক্ষমতা দখল করে নিতে পেরেছিল, তাই বলা হয় যে অক্টোবর বিপ্লব ছিল সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব বা সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের সূচনা।’

নভেম্বর বিপ্লবের সময়ে রাশিয়া ছিল কৃষি প্রধান দেশ। জনসাধারণের ৮০ শতাংশ ছিল কৃষক। কৃষকের সমস্যার সমাধান ছাড়া দেশের উন্নতি ছিল অসম্ভব। কৃষি ছিল অত্যন্ত পশ্চাৎপদ এবং তাতে ভূমিদাস প্রথার চিহ্নিত সামন্তবাদী অবশেষসমূহ বিদ্যমান ছিল। গ্রামাঞ্চলে বিদ্যমান ক্ষুদ্র পণ্য উৎপাদন ইউনিটগুলো ছিল সমাজতন্ত্র বিনির্মাণের বাধা। এক কথায় রাশিয়া তখন ছিল চাষাদের দেশ। পুরো দেশটাই ছিল এই অবস্থার প্রভাবাধীন। হয়তো এই জন্যই সৈনিকদের বলা হতো উর্দি পরা কৃষক অর্থাৎ সামরিক পোশাক পরলেও তারা কৃষক। একইভাবে শিল্প শ্রমিকদের নতুন প্রজন্মের অধিকাংশই ছিল কারখানার পোশাকে কৃষক। ই.এইস.কারের মতে, কৃষকদের একটা ধূসর পুঞ্জ রাতারাতি পরিবর্তিত হয়েছে কারখানা শ্রমিকদের ধূসর পুঞ্জে।’রাশিয়ার এই ব্যাপক পশ্চাৎপদতা থেকে উদ্ভুত কয়েকটি কারণ নভেম্বর বিপ্লবের বিজয়কে এগিয়ে দিয়েছে। নভেম্বর যে কর্তব্যের সম্মুখীন হয় তা ছিল অপেক্ষাকৃত দুর্বল এবং কম সংগঠিত বুর্জোয়া শ্রেণিকে উৎখাত করা। দ্বিতীয়ত লেনিনের ভাষায়, ‘রাশিয়ার পশ্চাৎপদতা এক অদ্ভুত উপায়ে সর্বহারার বুর্জোয়া বিরোধী বিপ্লবকে কৃষকের জমিদার বিরোধী বিপ্লবের সঙ্গে মিশিয়ে দেয়।’

কৃষকদেরকে কারখানায় ঢুকিয়ে তাদের ওপর কারখানা শৃঙ্খলা আরোপ করায় তাদের সাথে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের শ্রেণি বিরোধ উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলোর তুলনায় বেশি হওয়াই স্বাভাবিক। ই.এইস. কারের মতে, ‘পাশ্চাত্যের অগ্রসর প্রলেতারিয়েতের চেয়ে দুর্বল পশ্চাৎপদ রুশ প্রলেতারিয়েত প্রলেতারীয় বিপ্লবের জন্য বেশি উর্বরভূমি যোগান দিয়েছে।’এর ফলে বিপ্লবের জন্য আত্মগত প্রয়াস অর্থাৎ ওপর থেকে বিপ্লবের (সংগঠন কর্তৃক বিপ্লবের প্রয়াস) পাশাপাশি নিচু থেকে বিপ্লবের (সাধারণ শ্রমিকদের বিপ্লবের চেষ্টা) পরিস্থিতিও সৃষ্টি হয়। অন্যভাবে ব্যাখ্যা করলে বলা যায় শোষিত নিপীড়িত শ্রেণি কর্তৃক ন্যায়বিচার ও সাম্যের দাবিতে আন্দোলনের ব্যাপারটাই (নিচু থেকে বিপ্লব) বিপ্লবের জন্য যথেষ্ট নয়; শোষক নিপীড়কদের মধ্যে সঙ্কটেরও প্রয়োজন রয়েছে। নভেম্বর বিপ্লবের সময়ে এই দুই পরিস্থিতি বিদ্যমান ছিল। শোষিত-নিপীড়িতদের পক্ষ থেকে শোষিত-নিপীড়িত হতে না চাওয়া অর্থাৎ শোষণের জোয়াল ফেলে দেওয়ার প্রয়াস এবং শোষক-নিপীড়কের পক্ষে শোষণ-নিপীড়ন চালিয়ে যেতে অক্ষমতা বিপ্লবী পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। যে দেশে জনগণের শতকরা ৮০ জন কৃষক সেদেশে ভূমি সমস্যা যে একটা জ্বলন্ত সমস্যা তা বলাই বাহুল্য। কৃষিতে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের চরিত্রের পরিবর্তন সাধনের কোন পদক্ষেপ-ই নেয়নি অস্থায়ী বুর্জোয়া সরকার। এ জন্য বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক ধরনের অনেক কাজই করতে হয়েছে বলশেভিক সরকারকে। অবশ্য বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের আর্থ সামাজিক দায়িত্বগুলোর রূপায়ন সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। তবে অস্থায়ী বুর্জোয়া সরকার কাজগুলো শুরুই করে নাই। এন.এম. বরোদিন তাঁর ‘ওয়ান ম্যান ইন হিজ টাইম’এ সময়ের একটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন। বরিসভ নামক এক রুশ রাজনীতিক বলেন, ‘গরিব কৃষকরা কী তাদের জমি পেয়েছে? না খনি শ্রমিকরা কী খনিগুলির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণের অধিকার লাভ করেছে? না। আমরা অবশ্যই তাদেরকে (বুর্জোয়া সরকার ও রাষ্ট্র যন্ত্রকে) ঝেঁটিয়ে দূর করবো। আমরা অবশ্যই এ সব কীটপতঙ্গকে তাদের সব কিছুসহ ধ্বংস করবো এবং তাদের ধ্বংস স্তূপের ওপর গরিবদের প্রজাতন্ত্র গড়ে তুলবো।’ধনীদের রাজত্বের অবসান ঘটিয়ে গরিবদের রাজত্ব কায়েমের একটা আকাক্সক্ষা তখন রাশিয়ার জনগণের মধ্যে বিরাজমান ছিল। এটাও নভেম্বর বিপ্লবের অনুকূল একটা বিষয় ছিল।

১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব হওয়ার মাত্র আট মাসের মধ্যে সমাজতন্ত্রের জন্য অবস্থা পরিপক্ক হওয়া খুব স্বাভাবিক ছিল না। এ যেন আট মাসের মধ্যে একটা নবজাতকের যুবকে পরিণত হওয়া; যে বোঝা বহন করার জন্য যুবকের প্রয়োজন সে বোঝা নবজাতক কিভাবে বহন করবে? নভেম্বর বিপ্লবের ভিত্তিতে এই দুর্বলতা ছিল। এ জন্য লেনিন আর্থ সামাজিক দায়িত্বগুলো সম্পাদনের দিক থেকে নভেম্বর বিপ্লবকে অনেকটা বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব বলে উল্লেখ করেছিলেন। লেনিন একবার বলেছিলেন, ‘১৯১৭ সালের অক্টোবরে আমরা ক্ষমতা দখল করি সমগ্র কৃষক সম্প্রদায়ের সঙ্গে একত্রে। এ ছিল একটা বুর্জোয়া বিপ্লব, কেননা গ্রামাঞ্চলে তখনও অবারিত হয়নি। আগে বলেছি গ্রামাঞ্চলে সত্যিকার প্রলেতারীয় বিপ্লব শুরু হয় মাত্র ১৯১৮ সালের গ্রীষ্মে। এ বিপ্লবকে জাগিয়ে তুলতে না পারলে আমাদের কাজ থাকতো অসম্পূর্ণ। অবশ্য ১৯১৭ সালের বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের পর লেনিন লিখেছিলেন যে রাশিয়াতে সমাজতন্ত্র রাতারাতি প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। তিনি লিখেছিলেন, এখনই সমাজতন্ত্র প্রবর্তন নয়, আসন্ন বিপর্যয় ও দুর্ভিক্ষকে ঠেকাবার জন্য অবিলম্বে জরুরি বৈপ্লবিক ব্যবস্থাগুলো বাস্তবায়ন হচ্ছে এই মুহূর্তের করণীয়।’

সত্যিকার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে প্রতিষ্ঠিত হয় শ্রমিক শ্রেণির সরকার তথা সর্বহারা শ্রেণির একনায়কত্ব। ৭ নভেম্বর ১৯১৭ লেনিনের নেতৃত্বে যে সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়, লেনিন তাকে ‘শ্রমিক কৃষকের সরকার’বলে ঘোষণা করেন। যে দেশের ৮০ শতাংশ মানুষ কৃষক সে দেশে এমন না করে উপায় ছিল না। যাহোক শান্তির জন্য মানুষের ব্যাকুলতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে লেনিন ৮ নভেম্বর ঘোষণা করেন শান্তির ডিক্রি। এতে তিনি ন্যায়সঙ্গত ও গণতান্ত্রিক শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য আলাপ আলোচনা শুরু করতে সমস্ত যুদ্ধমান জাতি ও তাদের সরকারগুলোর প্রতি আহ্বান জানান। নভেম্বর বিপ্লবের প্রথম কথাই হলো শান্তি চাই। এরপর একই দিন তিনি ঘোষণা করেন ভূমি সংক্রান্ত ডিক্রি। এতে তিনি কোন খেসারত ছাড়াই জমিতে জমিদারের মালিকানা বিলুপ্ত ঘোষণা করেন। এখন থেকে বাজেয়াপ্ত করা জমিসহ সকল ভূমির মালিক হবে সমগ্র জনগণ। উল্লেখ্য জমিদারি জমির সাথে সেগুলোর সমস্ত পশুসম্পদ, সরঞ্জাম, ঘরবাড়ি ও সেগুলোর সাথে সংশ্লিষ্ট সব কিছু বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল। জমিতে ব্যক্তিগত মালিকানার লোপ করা হয়। নিজেদের শ্রমে যতটুকু জমি চাষ করা সম্ভব কৃষক পাবে শুধু ততটুকু জমি; মজুর খাটানো নিষিদ্ধ। কৃষি সমস্যার সমাধানের লক্ষ্যে এই ডিক্রিতে বিস্তারিত কর্মসূচি রয়েছে। ৯ নভেম্বর শ্রমিকের নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে খসড়া প্রবিধান ঘোষণা করেন লেনিন। যেসব প্রতিষ্ঠানে শ্রমিক আর কর্মচারীর সংখ্যা পাঁচের কম নয়, সেসব প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ব্যবস্থায় শ্রমিকের নিয়ন্ত্রণ চালুর ঘোষণা দেওয়া হয় এতে। এ লক্ষ্যে এ প্রবিধানে বিস্তারিত কর্মসূচি রয়েছে। এই হলো নভেম্বর বিপ্লব। ১৯১৭ সালের ৭ নভেম্বরের বিপ্লব ছিল রক্তপাতহীন। কিন্তু উৎখাত হওয়া শাসক শোষক শ্রেণি পরবর্তি সময়ে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ শুরু করে। এতে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়। বিদেশি সাম্রাজ্যবাদীদের মদতপুষ্ট এই শাসক শোষক শ্রেণি অবশেষে চূড়ান্তভাবে পরাজিত হয়।

লেখকঃ আবদুল মন্নান

 

সূত্রঃ 

13076745_715535491921699_3304914592563662269_n

Advertisements


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s