বাংলাদেশের কৃষক নারীদের সমস্যা

hh

বাংলাদেশের কৃষক নারীদের সমস্যা

[“নারীমুক্তি”, ফেব্রুয়ারি, ২০০৫ থেকে সংকলিত]

 

আমাদের দেশে নারী সমস্যার কথা বলতে গেলে প্রথমেই কৃষক নারীর সমস্যার বিষয় বলতে হয়। সমাজ-সভ্যতার বিকাশের ইতিহাসে প্রথম উৎপাদন হিসেবে কৃষি উৎপাদন এবং কৃষকের উদ্ভব হয়। শুরু হয় কৃষকের সমস্যা।  নারী তার সাথে জড়িয়ে আছে সেই আদিকাল থেকে।  আমাদের বাংলাদেশ আজও কৃষি প্রধান দেশ।  দেশের শতকরা ৭০ জনই হচ্ছেন কৃষক। তার অর্ধেক নারী যারা সমাজে সবচেয়ে বেশি নিপীড়িত।

আদিম সমাজে নারী নিপীড়নের ইতিহাস দেখা যায় না।  বরং ইতিহাসে যা রয়েছে তা ছিল মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা।  যে ব্যবস্থায় নারী পুরুষ কারো দ্বারা কেউ নিপীড়িত ছিলেন না।  কারণ মাতৃতান্ত্রিক সমাজে শ্রেণী বৈষম্য ছিল না।  পুরুষের শিকার এবং নারীদের খাদ্য সংগ্রহ, সন্তান পালন দুই-ই ছিল জীবন ধারণের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ।  ফলে সামাজিক ও যৌন জীবনে নারী-পুরুষ সমানাধিকার ভোগ করতেন।  যখন থেকে সমাজে ব্যক্তিমালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তখন থেকেই  শ্রেণির উদ্ভব।  শুরু হয়েছে শ্রেণি শোষণ, দেখা দিয়েছে লিঙ্গ বৈষম্য।  এবং মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা বিলুপ্ত হয়ে গড়ে উঠে পিতৃতান্ত্রিক সমাজ।  নারী সমস্যার প্রশ্নে এঙ্গেলস বলেছেন- “মাতৃতান্ত্রিক সমাজের বিলুপ্তি নারী জাতির জন্য সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক পরাজয়।  পুরুষরা গৃহস্থালির দখলও ছিনিয়ে নেয়।  মেয়েদের মর্যাদার হানি হয়, তারা পুরুষের কামনার দাস ও সন্তান উৎপাদনের যন্ত্রে পরিণত হয়।” (পরিবার, ব্যক্তিগত মালিকানা ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি)।

মানুষের আদি উৎপাদন ব্যবস্থা কৃষিতে নারীর ভূমিকা ছিল অপরিসীম।  এমনকি কৃষি উৎপাদন নারীর আবিষ্কার বলেই ইতিহাসে স্বীকৃত।  নারীর গর্ভ ধারণ, শিশু পালন, শিশুকে দুগ্ধদান এই প্রাকৃতিক কারণেই নারীর পক্ষে পশু শিকারে যাওয়া ছিল অসুবিধাজনক।  একারণে নারী-পুরুষের মাঝে শ্রম বিভাজনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। আদিম সমাজ নারীর জন্য তুলনামূলক সহজলভ্য ফলমূল সংগ্রহের কাজটি বরাদ্দ করে।  ফল-মূলের বীজ বপন করেই নারী আবিষ্কার করে কৃষি কাজের।  পর্যায়ক্রমে কৃষি কাজের প্রসার এবং কৃষি কাজের মধ্য দিয়ে জীবিকা নির্বাহের পরিবেশ সৃষ্টি হলে নারীর পাশে পুরুষও পশু শিকার বাদ দিয়ে কৃষি কাজে নিয়োজিত হয়।

কিন্তু সমাজের এই বিকাশ সরল রেখায় আগায়নি।  আদিম সাম্যবাদী সমাজের এক পর্যায়ে মানুষের বিভিন্ন গোষ্ঠির মধ্যে ভূ-খণ্ডগত স্বার্থ নিয়ে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়।  স্বার্থকেন্দ্রীক শুরু হয় প্রতিপক্ষ দুই দলের মধ্যে যুদ্ধ-বিগ্রহ। বিজয়ীরা সম্পদের মালিক বনে যায়, পরাজিতরা হয় বন্দী, পরিণত হয় দাসে।  এই দাসদের মালিকও হয় ভূ-সম্পদের মালিকরাই। সম্পদের মালিকরাই হয় সমাজপতি।  তারাই নারীদের কৃষি উৎপাদন থেকে বিচ্ছিন্ন করে ঘরে গৃহস্থি কাজে নিয়োগ করে, পুরুষের ভোগের সামগ্রী এবং সন্তান উৎপাদনের যন্ত্রে পরিণত করে।  কালক্রমে শ্রেণি শোষণ নারী শোষণকে ‘বৈধ’ করার জন্যই সম্পদের মালিক সমাজপতিরা বিভিন্ন আইন, নিয়ম প্রণয়ন করে, গড়ে তোলে তাদের স্বার্থের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিচার ব্যবস্থা।  তাদের প্রণীত আইন মানানোর ব্যবস্থা হিসেবে গড়ে তোলে সশস্ত্র বাহিনী।  সৃষ্টি হয় রাষ্ট্র। সীমানা নির্ধারণ হয় রাষ্ট্রীয় ভূ-খণ্ডের। যুগে যুগে পুরুষদের দ্বারা বিভিন্ন ধর্মের আবির্ভাব।  সব ধর্মই নারী ও শ্রেণি শোষণমূলক ব্যবস্থাকেই নীতিসম্মত করে তোলে এবং জনমনে গেঁথে দেয় ঈশ্বরের আদেশ বলে।

ফলে পুরুষতন্ত্র আধিপত্য বিস্তার করে সমাজের সর্বস্তরে।  পুরুষরা নারীদের  তাদের অধীনস্ত করে এবং ধীরে ধীরে পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের সর্বময় ক্ষমতা দখল করে।  এবং নারীদের তারা নিজেদের প্রয়োজন ও স্বার্থ অনুযায়ী ব্যবহার করার সুযোগ পায়।  নারী শ্রমিক ও নারী এই দ্বৈত শোষণের শিকার হয়।

সমাজের শ্রেণি দ্বন্দ্বের ফলে সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তন হয়েছে- দাস সমাজ থেকে সামন্ততান্ত্রিক সমাজে, সামন্ততান্ত্রিক সমাজ থেকে পুঁজিবাদে, পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ বিকাশ সাম্রাজ্যবাদে।  কিন্তু কোন সমাজেই কৃষক নারীর পরাজিত জীবনে নিপীড়নের হাতিয়ার পরুষতন্ত্র ও শ্রেণি শোষণ বিলুপ্ত হয়নি। ক্ষুদে বুর্জোয়া উচ্চমধ্যবিত্ত নারীদের কিছু উন্নয়ন (বৈষয়িক) হলেও কৃষক নারীর অবস্থা মধ্যযুগীয় পর্যায়েই রয়ে গেছে।  পুঁজিবাদী সমাজেও পুরুষতন্ত্র ও শ্রেণি শোষণ হাত ধরাধরি করে এগিয়ে চলেছে সমানতালে।  সমাজতান্ত্রিক রাশিয়া ও চীন নারীদের এই  দ্বৈত শোষণ থেকে মুক্ত করলেও পুঁজিবাদের পুনরুত্থান পুনরায় সেসব দেশের নারীদের অধিকার কেড়ে নিয়েছে।

তাই একুশ শতকে দাঁড়িয়ে আমরা আজ দেখছি সাম্রাজ্যবাদের বিশ্বায়নের অধীন দারিদ্র্য বিমোচন, নারীর উন্নয়নের ডামাডোলের মাঝে বাংলাদেশের কৃষক নারীর করুণ চিত্র।

সাম্রাজ্যবাদ আজ ঢাক-ঢোল পিটাচ্ছে নারীদের উৎপাদনে অংশগ্রহণের ও নারীর উন্নয়নের জন্য। কিন্তু আমরা দেখছি বাংলাদেশের দরিদ্র কৃষক নারীরা পুঁজিবাদের ডামাঢোলে নয়, সংসারের আর্থিক অনটন ঘুচাতেই তারা বহুকাল আগ থেকেই বাড়ির বাইরে গিয়ে ধনী-জোতদারদের বাড়িতে কৃষি কাজ করে উপার্জন করেন।  ৬০-এর দশক থেকে দরিদ্র নারীরা সরাসরি কৃষি উৎপাদনে যুক্ত হয়ে পড়েছেন।  বীজতলা থেকে বীছন তোলা, ক্ষেতের আগাছা পরিস্কার করা, ধানকাটা, বহন, মাড়াই করা, পানি সেচের যন্ত্র চালু করা, সব্জি ক্ষেত থেকে শাক-সব্জি তুলে আনা ইত্যাদি।  এগুলো তারা করে শ্রমিক হিসেবে ধনী-জোতদারদের ক্ষেত-খামারে মজুরির বিনিময়ে। ঘরে গৃহস্থি কাজের পাশাপাশি গৃহপালিত পশু-পাখি পালনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।  পশু-পাখির খাদ্য দরিদ্র কৃষক নারীরাই সংগ্রহ করে থাকেন।  এমনকি মাঠে তারা গরু-ছাগলও চড়ান।

কিন্তু কৃষক মজুর নারীরা কৃষি কাজের মজুরি পান পুরুষ মজুরদের চেয়ে বহু কম।  কৃষি উৎপাদনে দরিদ্র নারীদের মঝে আদিবাসী বা ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বার নারীরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন।  কিন্তু বাঙালী হিন্দু-মুসলিম নারীও জীবনের প্রয়েজনে পুরুষতান্ত্রিক, ধর্মীয় মূল্যবোধ অনেকটা ভেঙে ফেলতে বাধ্য হয়েছেন। ক্ষেতের কাজ ছাড়াও দরিদ্র নারীরা বিভিন্ন ধরনের উৎপাদনমূলক কাজে অংশ নিচ্ছেন- যেমন কুটির শিল্পের কাজ, বিড়ি কারখানার কাজ, ধানকলের কাজ, মাটি কাটা, ছোট ছোট ব্যবসা ইত্যাদি করে সংসারে অর্থের যোগান দেন।

ঘরে বাইরে এতসব কাজ করা সত্ত্বেও পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর কাজকে উৎপাদনশীল কাজ হিসেবে গণ্য করা হয় না।  স্বামী তাদের ভরণ-পোষণ করছে এমন মূল্যবোধই সমাজে আজও প্রতিষ্ঠিত।  বরং নারীর উৎপাদনমূলক কাজকে অমর্যাদাকর কাজ হিসেবেই সমাজ দেখে।  এ কারণেই ধনী কৃষক পরিবারের মেয়েদের ঘর-গৃহস্থি কাজ ছাড়া ক্ষেতের কাজ করতে দেয়া হয় না। পুরুষতান্ত্রিক নিয়মগুলোকে ধনী কৃষক নারীদের আরো কঠোরভাবে পালন করতে হয় এবং তারা স্বামীদের উপর বেশি নির্ভরশীল থাকতে বাধ্য হচ্ছেন।  যদিও এই নারীরাও উদয়স্ত গৃহস্থি কাজের মধ্য দিয়ে পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

দরিদ্র নারীরা শ্রমের ন্যায্য মজুরি পান না।  ধনী কৃষক বা জোতদার নারীদের মজুরিও পুরুষ মজুরদের চেয়ে কম। ধনীরা সস্তা শ্রম শোষণের পাশাপাশি নারীদের নারী হিসেবেও শোষণ করে বিভিন্ন প্রলোভনে ফেলে।

সামন্ত সমাজে নারী সম্পর্কে পুরুষতান্ত্রিক ধ্যান-ধারণা গড়ে তুলেছিল যে নারীরা প্রকৃতিগতভাবে দুর্বল ও নিম্নমানের এবং মাতৃত্ব ও গৃহস্থালি কাজই তাদের উপযুক্ত ও স্বাভাবিক স্থান।  কৃষি কাজসহ সব ধরনের কাজেই নারী পারদর্শিতার পরিচয় দেয়া সত্ত্বেও উপরোক্ত মূল্যবোধ সমাজ থেকে ঝেটিয়ে বিদেয় করছে না পুরুষতন্ত্রের রক্ষক শাসক পুঁজিপতিরা।

দরিদ্র নারীদের উপার্জিত অর্থ পরিবারের অভাব মিটাতে ব্যয় হয়ে যায়; কিন্তু ধনী পরিবারে তা নয়। কিন্তু ধনী-গরীব নির্বিশেষে নারীরা স্বামীর সংসারে সম্পদের মালিক হতে পারেন না, যদি-না স্বামীরা স্বেচ্ছায় স্ত্রীদের সম্পত্তি প্রদান করে।  স্বামীর মৃত্যুর পর মুসলিম নারী স্বামীর সমস্ত সম্পদের এক-অষ্টমাংশের মালিকানা পান।  মুসলিম নারী বাবার সম্পত্তি পান ভাইয়ের অর্ধেক।  হিন্দু নারীরা তাও পান না।  বাবার সম্পত্তি মেয়েরা সাধারণত নিজের করে নেন না- কৃষক নারীদের বেড়াতে যাবার বা বিপদে আশ্রয় পাবার একটিমাত্র জায়গা বাবার বাড়িতে ভাইদের আপ্যায়ন থেকে বঞ্চিত হবার ভয়ে। কিন্তু কোন কোন স্বামী স্ত্রীকে বাবার সম্পদ আনতে বাধ্য করে।  কৃষক নারী এই সম্পদও নিজের প্রয়োজনে নিজের ইচ্ছায় ব্যয় করতে পারেন না বরং স্বামীর হাতে তুলে দিতে বাধ্য থাকেন।  আজও কৃষক নারী সম্পদের মালিক হতে না পেরে শৈশবে পিতা, যৌবনে স্বামী এবং বৃদ্ধকালে ছেলের উপর নির্ভরশীল থাকতে বাধ্য হন।  দরিদ্র কৃষক নারীরা বৃদ্ধকালেও ছেলের উপর নির্ভর করতে পারেন না।  কারণ পুঁজিবাদের কঠোর শ্রম শোষণে বিবাহিত ছেলে স্ত্রী-সন্তানদের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব পালনে হিমশিম খান।  ফলে বৃদ্ধ মা-বাবার দায়িত্ব অনেক ক্ষেত্রেই তারা নিতে পারেন না।  এ কারণে বৃদ্ধ বয়সেও মা-বাবাকে কোন না কোন শ্রম করে খেতে হয়।  শ্রমে অক্ষম হলে বা উপযুক্ত শ্রমের অভাবে ভিক্ষাবৃত্তি করেও জীবন-যাপন করেন।  সরকার যে বয়স্ক ভাতার প্রচার দিচ্ছে তা নামমাত্র এবং কেবল টিভি-ক্যামেরায়ই প্রদর্শিত।  যতটুকুবা বাস্তবায়িত হচ্ছে তা লক্ষ লক্ষ দরিদ্র বৃদ্ধার জন্য সাগরে বিন্দুমাত্র।  শাসক শ্রেণীর দুর্নীতিপরায়ণ চরিত্র তাও যথার্থ প্রয়োগ করতে অক্ষম।

জমি-সম্পদের মালিকানা থেকে বঞ্চিত করে আজও মধ্যযুগীয় সামন্ততান্ত্রিক নিয়মে কৃষক নারীকে বিয়ের মাধ্যমে স্বামীর পরিবারে পুনর্বাসন করা হচ্ছে।  দেনমোহরানা নামে স্ত্রী কেনার সামন্ততান্ত্রিক নীতি আজও সসম্মানে বিদ্যমান রেখেছে।  আধুনিক পুঁজিবাদী শোষণ আরেক ধাপ নারী শোষণের মাত্রা যুক্ত করে যৌতুক প্রথার প্রচলন করেছে।  শাসক শ্রেণি ঘুষ ছাড়া জনগণকে কোন চাকুরী দেয় না।  তেমনি যৌতুক নামের ঘুষ ছাড়া পুরুষের ঘরে নারীর গৃহদাসীর কর্মসংস্থান হয় না।  পুঁজিবাদ-পরুষতন্ত্র দরিদ্র কৃষক পিতাকে অবশিষ্ট একখণ্ড জমি, না হয় পালিত গরু-ছাগল বিক্রি করে কনের বিয়ের যৌতুক যোগাতে বাধ্য হন।  এমন কিছু না থাকলে বাড়ি-বাড়ি ভিক্ষা করে বা ধনী আত্মীয়-স্বজনের দ্বারস্থ হয়ে যৌতুকের টাকা যোগাড় করে মেয়ে বিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন দরিদ্র পিতা। তারপরও স্বামীর সংসারে কৃষক নারীর দুরবস্থার কোন পরিবর্তন নেই।  স্বামীর এবং তার পরিবারের সবার আদেশ-নির্দেশ পালনই কৃষক নারীর কর্তব্য বলেই সমাজ স্বীকৃত।  স্বামীর নির্দেশ ছাড়া অন্য কাজ তো দূরের কথা বাবার বাড়ি যাওয়ার ক্ষমতাও তাদের থাকে না।  স্বামীর সংসারে সব কাজ করে সবাইকে খুশি রাখাই নারীর দায়িত্ব- এ ধারণা সমাজে আজও বদ্ধমূল।  এর ব্যতিক্রম ঘটলে শুরু হয় লাঞ্ছনা-গঞ্জনা।  সামাজিক-রাজনৈতিক কাজে যোগদান তো দূরের কথা।  ১৯২৫ সালে অর্জিত নারীর ভোটাধিকার কৃষক নারী আজও স্বাধীনভাবে প্রয়োগ করতে সক্ষম নন।  স্বামীর নির্ধারিত ব্যক্তিকেই ভোট দিতে হয়।

বিয়ের ক্ষেত্রেও কৃষক নারীদের পছন্দ করার অধিকার নেই।  অবিবাহিত নারী-পুরুষদের একত্রে চলাফেরা মেলামেশা সমাজে স্বীকৃত নয় বরং দৃষ্টিকটু। ফলে বর-কনে পছন্দ করার বিষয়টি অভিভাবকদের বিষয়, পুরুষতান্ত্রিক এই মূল্যবোধ আজও প্রচলিত।  ফলে কৃষক নারীকে অভিভাবকদের পছন্দ মতই বিয়ে করতে হয়। যৌন প্রশ্নেও কৃষক নারীর কোন স্বাধীনতা নেই।  স্বামীর  প্রয়োজনে স্ত্রী দেহদানে বাধ্য এমন ধারণাই সমাজে প্রচলিত।  নারীর যৌন ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে গুরুত্ব দেয়া হয় না।  যৌন অধিকার প্রশ্নেও সচেতনতার অভাব রয়েছে।

সন্তান ধারণ বা জন্ম নিয়ন্ত্রণ প্রশ্নে পুরুষরাই সাধারণত সিদ্ধান্ত নেয়।  জন্ম নিয়ন্ত্রণ প্রশ্নে বহু কৃষক পরিবারে মধ্যযুগীয় ধ্যান-ধারণা আজও বদ্ধমূল।  যেমনঃ জন্মনিয়ন্ত্রণ পাপের কাজ। আল্লাহ মুখ দেবেন তো আহারও (খাদ্য) দেবেন ইত্যাদি।  ফলে এখনও অনেক কৃষক নারীকেই বছর বছর সন্তান জন্ম দিতে হচ্ছে। যারা জন্ম নিয়ন্ত্রণ করছেন তাদের মাঝে স্ত্রীদেরই খাবার বড়ি খেতে হয়, ইনজেকশন বা লাইগেশন ব্যবস্থা নিতে হয়।  পুরুষরা সাধারণত ব্যবস্থা নিতে চান না বা প্রয়োজন মনে করেন না যেন বিষয়টি শুধুই নারীদের।

সম্পত্তিতে ব্যক্তিমালিকানার উত্তরাধিকার নিশ্চিত করতে অর্থাৎ বংশ পরম্পরায় মালিকানা হস্তান্তরের জন্য নারীকে এক স্বামীতে সন্তুষ্ট রাখার এবং পুরুষের জন্য যৌন স্বাধীনতার পুরুষতান্ত্রিক বিধান আজও সমাজে প্রতিষ্ঠিত। পুরুষের স্বেচ্ছাচারিতার পাশাপাশি নারীকে ধৈর্য-সহনশীল ও ত্যাগের শিক্ষায় শিক্ষিত করে।  ধর্মীয় ও সামাজিক মতে পুরুষের একাধিক স্ত্রী রাখার মধ্যযুগীয় বিধান আজও সমাজে প্রচলিত।  ফলে অনেক কৃষক স্বামী একত্রে একধিক স্ত্রী রাখে।  স্বামীদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোন কাজ করতে গেলে বা যৌন বিষয়ে অবাধ্য হলে বা স্বামীর কাজে প্রতিবাদ করলে কৃষক নারীকে শারীরিক নির্যাতন সহ্য করতে হয় এবং গালাগাল শুনতে হয়।  বহুবিধ কারণেই তাদের স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক বন্ধুত্বমূলক না হয়ে হয় প্রভু ও ভৃত্যের সম্পর্ক।

বিবাহ বিচ্ছেদ প্রশ্নেও তালাক দেয়াটা পুরুষের জন্য যত সহজ নারীর জন্য ততটা নয়।  নারী স্বামী তালাক দিলে তা হয় সমাজের চোখে অবমাননাকর।  ফলে দ্বিতীয় বিয়ে করা নারীর জন্য দুঃসাধ্য। স্বামীর সংসার ছাড়া সমাজে নারীর অবস্থান আরো অমর্যাদাকর ও নিপীড়নমূলক।  ফলে বিয়ে করাই নারীর জন্য অপরিহার্য কাজ হয়ে দাঁড়ায়। দ্বিতীয় বর ভালো হবে তার অনিশ্চয়তা, সন্তানদের মঙ্গলার্থে কৃষক নারী স্বামীর শত অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করে স্বামীর সংসারে অভিশপ্ত জীবনকে মেনে নেন অদৃষ্টের লিখন বলে।

উপরে আলোচিত হাজারো সমস্যা হচ্ছে সমাজে শ্রেণি শোষণের হাতিয়ার পুরুষতন্ত্র ও ধর্মীয় মূল্যবোধের কারণে। যা শাসক পুঁজিপতি শ্রেণি জিইয়ে রেখেছে তাদের শোষণমূলক ব্যবস্থার স্বার্থে। পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদ নারী উন্নয়নের নামে নতুন নতুন শোষণ ব্যবস্থা চালু করে ডজন ডজন এন.জি.ও. দরিদ্র কৃষক নারীদের ঋণের জালে আবদ্ধ করে কোটি কোটি টাকার মুনাফা লুটছে।  এরা নারীদের সংগঠিত করে দারিদ্র্য বিমোচন, নারীর আত্মনির্ভরশীলতা তথা নারীমুক্তির স্বপ্ন দেখায়।  এ ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে সাম্রাজ্যবাদ-পুঁজিবাদ দরিদ্র জনগণের জীবনযাত্রার মান কিছুটা উন্নয়ন করে তাদের শোষণমূলক ব্যবস্থাকে সহনীয় করে তুলতে এবং বিপ্লবের বাধা হিসেবে সংস্কারমূলক কাজকে সামনে নিয়ে এসেছে।  সাম্রাজ্যবাদের ক্ষুদ্র ঋণ প্রকল্প বাস্তবে নারীদের ভাগ্য যে পরিবর্তন করছে না তা পরিস্কার।

প্রতিবছর চৈত্র ও কার্তিক মাসে দরিদ্র নারীরা স্বামী-সন্তান নিয়ে অনাহারে-অর্ধাহারে কাটান। অন্যদিকে দরিদ্র কৃষক পরিবারের তরুণী নারীরা কাজের সন্ধানে বড় বড় শহরগুলোতে ভিড় জমান এবং সাম্রাজ্যবাদ নির্ভর গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন কলকারখানায় এবং বাসা-বাড়িতে কাজ, ইটভাঙা, রাজমিস্ত্রির যোগালির কাজ করে বা জিনিসপত্র ফেরি করে জীবন ধারণ করেন। সাম্রাজ্যবাদী ঋণ ব্যবস্থায় ২/৪ জনের অবস্থার যে পরিবর্তন হচ্ছে না তা নয়- কিন্তু এটা সাধারন চিত্র নয়, হবারও নয়। এন.জি.ও.দের ঋণ ব্যবস্থা হচ্ছে শোষণমূলক ব্যবস্থা। এ ব্যবস্থায় ব্যাপক জনগণের সম্পদ গড়ে উঠতে পারে না।  বরং শোষণের জালে দরিদ্র জনগণকে আষ্টে-পৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে শোষণমূলক ব্যবস্থাকে চিরস্থায়ী করার দূরভিসন্ধি নিয়েই সাম্রাজ্যবাদ এন.জি,ও.গুলো পরিচালিত করছে। এদেশে ব্র্যাক, প্রশিকা, গ্রামীণ ব্যাংক, কারিতাস, আশা ইত্যাদি এন.জি.ও.গুলো হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদ দ্বারা পরিচালিত।  যাদের পরিকল্পনা সুদূরপ্রসারী। এন.জি.ও.গুলো ক্ষদ্র ঋণের মধ্য দিয়ে উৎপাদনে নামিয়ে নারীদের সস্তা শ্রম লুট করে কোটি-কোটি টাকার পাহাড় গড়ছে। অন্যদিকে নারীমুক্তির শত্রু সাম্রাজ্যবাদ এবং তার দালাল আমলা-পুঁজিপতিকে আড়াল করছে।  যারা সামন্তবাদ তথা পুরুষতন্ত্র ও ধর্মীয় মূল্যবোধকে রক্ষা করছে তাদের শ্রেণীগত স্বার্থে।

এন.জি.ও. নারী সংগঠনগুলো পুরুষতন্ত্রের কিছু কিছু বিরোধিতা করলেও সামগ্রিকভাবে নারীর শত্র“দের চিহ্নিত ও বিরোধিতা করে না।  এই সব নারী সংগঠনের নেতৃত্বে রয়েছে নারীমুক্তির শত্রু-শ্রেণির নারীরা।  যারা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে দরিদ্র জনগণকে শোষণ করে দুর্নীতিপরায়ণ বিলাসবহুল জীবন-যাপন করে।  তাদের নারীমুক্তির কথা প্রতারণা ছাড়া ভিন্ন কিছু নয়।

সুতরাং সত্যিকার নারীমুক্তি আন্দোলনে নেতৃত্ব দিবে শ্রেণি শোষণে জর্জরিত শ্রমিক ও দরিদ্র কৃষক নারীরা।  যারা নিপীড়িত জনগণের বিপ্লবী রাজনীতিতে একাত্ম হয়ে শ্রেণিশত্রু  সাম্রাজ্যবাদের দালাল আমলা-মুৎসুদ্দি পুঁজিবাদ এবং পুরুষতান্ত্রিক মূল্যবোধকে শিকড়সহ উপড়ে ফেলবে।  প্রতিষ্ঠিত করবে একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা।  যে ব্যবস্থায় নারী প্রতিটি ক্ষেত্রে সমানাধিকার নিয়ে দাঁড়াতে পারবে। পারবে আত্মমর্যাদাশীল মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে।  পারবে রান্নাঘর থেকে বের হয়ে মানব সমাজের কল্যাণে সামাজিক-রাজনৈতিক কাজে যোগ দিতে। ভূমিকা রাখবে শোষণহীন সমাজ- সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদ বিনির্মাণে।  

Advertisements


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.