ইরানি নারী বিপ্লবীর সাক্ষাৎকার

Revolution_Bahman_Enghelab-57-13

ইরানি নারী বিপ্লবীর সাক্ষাৎকার

ভিন্নধর্মী বিশ্বব্যবস্থার লক্ষে সংগ্রামী সাহসিকতা, দূরদৃষ্টি এবং দৃঢ়তার এক উপখ্যান

[এ শতাব্দীর প্রথমদিকের এক ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবসে আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রের লস্ এঞ্জেলেস শহরে আয়োজিত এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে ‘এস’ নামক একজন ইরানি নারী অংশগ্রহণ করেন।  আমেরিকার মাওবাদী সাংবাদিক মাইকেল স্লেট তার কাছ থেকে নিচের সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন।  লস্ এঞ্জেলেসে ছাত্র জীবনে অধ্যয়নরত অবস্থায় এই ইরানি নারী কমরেডের বিপ্লবী অভিজ্ঞতার যাত্রা শুরু হয়েছিল।  তখন ইরানে শাহ্ রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত।
ইরানি বিপ্লব যখন শাহ’কে ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদ করেছিল তখন বিপ্লবের চূড়ান্ত লক্ষে এগিয়ে যাওয়ার জন্যে ইরানে ফিরে যাওয়া সহস্র ইরানি ছাত্রছাত্রীদের সাথে তিনিও সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিলেন।  যে বিপ্লবের উত্তাপে প্রতিক্রিয়াশীল ইরানি ইসলামী প্রজাতন্ত্র দুমড়ে মুচড়ে সংকুচিত হয়ে পড়েছিল।  বছরব্যাপী চলমান বিপ্লবী সংগ্রামে তার অংশগ্রহণ, কারাবরণ এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে আজ তিনি বিপ্লবী কমিউনিস্ট সংগঠনের অন্তর্ভুক্ত সংগ্রামী নারী- তার বর্ণিত এই কাহিনী ভিন্নধর্মী বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষে সাহসিকতা, দূরদৃষ্টি এবং দৃঢ়তার সংগ্রামী চেতনাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরে। ]

মাইকেল স্লেটঃ প্রথমে আপনার পরিচিতি দিয়েই শুরু করুন।  আপনি কোথা থেকে এসেছেন, আপনার পরিবার কেমন ছিল এবং যখন আপনি ইরানে ছিলেন তখন কি করতেন।
এসঃ প্রতিক্রিয়াশীল নারীবিদ্বেষী ইসলামী শাসনের অধীনে বসবাসরত অগণিত নারীদের জীবনের মতই আমার জীবনের কাহিনী।  সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বের সাথে সংযুক্ত মৌলবাদী ব্যবস্থার সারমর্ম সম্পর্কে সচেতনতা সত্ত্বেও আমি নির্যাতনের শিকার হয়ে এসেছি এবং এ ধরনের শাসন-ব্যবস্থার অধীনে একজনকে যে ধরনের অবস্থার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তা আমাকেও যেতে হয়েছে।  অন্যান্য নারীদের উপর চালিত নির্যাতনের অভিজ্ঞতার মতই আমার অভিজ্ঞতা।
প্রায় ৩২ বছর পূর্বে আমি আমার পরিবারের সাথে, যে পরিবারটি রাজনৈতিক আদলে গড়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র শাহ্’র শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল- যুক্তরাষ্ট্রে চলে এসে পড়াশুনা শুরু করেছিলাম।  আমি যখন আসি তখন আমি মাধ্যমিক স্কুলের ছাত্রী এবং সান্তা-মনিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশুনা শুরু করি।  তারপর আমি এ্যারোস্পেসের মেজরের কাছে যাই, এ্যারোস্পেসের জন্যে কলেজে আবেদন করি।  কিন্তু রাজনৈতিক তৎপরতায় সক্রিয়তার কারণে এবং এখানেই সময় দেয়ার কারণে কলেজ অব্যাহত রাখতে আর সক্ষম হইনি।

মাইকেল স্লেটঃ কিভাবে আপনি রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছিলেন?
এসঃ ১৯৭৬ সালে যখন আমি এখানে আসি- আমরা তখন ইংরেজি ভাষা শিক্ষার ক্লাশে তালিকাভুক্ত ছিলাম।  ওটাকে সম্ভবত আই.এস.সি. বলা হত।  সেখানে ছাত্র সংগঠনের অনেক প্রতিনিধিবৃন্দ ক্লাসে এসে তাদের দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়ে আলোচনা করত।  এভাবে আমরা তাদের সাথে এবং তারা যা করতো তার সাথে পরিচিত হলাম।  এবং এভাবে আমরা তাদের সাথে জড়িত হয়ে পড়ি।

মাইকেল স্লেটঃ এটা খুবই ভাল, খুবই প্রশান্তির, সত্যিই। যাইহোক যখন তাদের সাথে আপনি সম্পৃক্ত হলেন তখন কী ঘটেছিল? আপনি কী করতে লাগলেন?
এসঃ প্রথম যে সভায় আমি অংশগ্রহণ করি তার আলোচ্য বিষয় ছিল ইরানের তুদেহ পার্টি এবং ফেদাই পার্টি (ইরানের অন্য বাম সংগঠনসমূহ) সম্পর্কে কি ভাবছি, কিভাবে ভাবছি এবং সশস্ত্র সংগ্রাম ও সশস্ত্র লড়াই সম্পর্কে মতামত এবং ভাবনা।  উল্লেখিত আলোচ্য বিষয়ের প্রতি আমি আগ্রহী হয়ে পড়ি, আমি সভায় অংশগ্রহণ করি এবং সভায় উত্থাপিত আলোচনার প্রতি অত্যন্ত আকৃষ্ট হয়ে উঠি। এবং এভাবেই পুুরো দলের সম্পর্কে আমি আগ্রহী হয়ে যাই।

মাইকেল স্লেটঃ ইরানি ছাত্র সংঘ- ইরানি ছাত্রদের দলটি, খুব শক্তিশালী দল ছিল, যেসব কর্মসূচি জনগণের সামনে তারা তুলে ধরত এবং যে পথে তারা ইরানিদের সংগঠিত করত- সে বিচারেই শুধু নয়, বরং, খোদ যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের মধ্যেও তার যে প্রভাব পড়েছিল সে প্রেক্ষিতেও। বিপ্লবী আন্দোলনের ক্ষেত্র তৈরি করতে এটা সহায়তা করেছিল। সত্যিকার অর্থে যা দেখা গেছে, ইরানের ছাত্র-জনতা শাহের বিরুদ্ধে রাজপথে বিক্ষোভ প্রদর্শন করছে এটা দেখা যাওয়া এবং যা ঘটছিল তাকে নিয়ে আসাটা প্রকৃতই কিছু অর্থ প্রকাশ করে- শুধু তাই নয়, এখানেও সংগ্রামকে বয়ে নিয়ে আসে।
আমাদেরকে বলুন- এখানের রাজপথে সংগ্রাম কেমন হচ্ছিল।
এসঃ প্রথমত, দলটির যে জিনিসটি আমাকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করেছিল তাহল বিপ্লবী নৈতিকতা এবং কীভাবে তারা নিজেদেরকে বিপ্লবী হিসেবে চালিত করতো।  তাছাড়া প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠকে সংগঠন কর্তৃক পরিচালিত “বস্তুবাদ এবং দ্বান্দ্বিকতা” বিষয়ক আলোচনায় আমি উপস্থিত ছিলাম।  সেই থেকে সে দলের প্রতি এবং আদর্শের প্রতি আমি বেশ আগ্রহী হয়ে উঠেছিলাম।

মাইকেল স্লেটঃ যাই হোক, আপনার পরিবার এখানেই ছিল।  আপনি বিপ্লবী কর্মকান্ড চালিয়েছিলেন। এবং আপনার সকল ইচ্ছা ও উদ্দেশ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছিলেন।  কিন্তু এক পর্যায়ে আপনি ইরানে ফিরে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।  কেন? যখন সেখানে ফিরে গিয়েছিলেন তখন আপনি কি প্রত্যাশা করেছিলেন?
এসঃ যে চেতনা আমাকে সেখানে নিয়েছিল তা ছিল ইরানে ঘটমান এই পরিবর্তনের প্রতি আমার দায়বোধ।  আমি দায়বোধ অনুভব করেছি ইরানের জনগণের প্রতি, যারা পরিবর্তনের এই সমগ্র প্রক্রিয়াটির সূচনা করেছিলেন।  এটা ছিল অন্যতম প্রধান কারণ যেজন্য আমি ভেবেছিলাম আমার ফিরে যাওয়া উচিত।  অন্য আরেকটি বিষয় হচ্ছে, আমি সর্বহারা শ্রেণির নেতৃত্বের ওপর আস্থাশীল ছিলাম।  আমি ভেবেছিলাম যে, যদি আমরা সেখানে ফিরে যাই তাহলে জনসাধারণকে দিকনির্দেশনা দিতে বা পরিচালনা করতে পারব।  এবং ঘটমান পরিবর্তনে কোন না কোনভাবে অবদান রাখতে পারব।

মাইকেল স্লেটঃ ফিরে গিয়ে আপনি কী দেখলেন? তৎকালীন ইরানের বাস্তবতা কেমন ছিল? তখন মাত্র শাহ্’র পতন হয়েছে।  যখন আপনি ইরান ত্যাগ করেছিলেন তখন ছিল সাভাক ও শাহ্ এবং ভয়াবহ এক অবস্থা।  আপনি ফিরে গিয়ে কী দেখলেন? পরিস্থিতি কেমন ছিল?
এসঃ ফিরে গিয়ে আমি খুব মুক্ত এক পরিবেশ দেখেছি।  রাজনৈতিকভাবে ভীষণ প্রগতিশীল পরিবেশ।  সমগ্র শহর জুড়েই জনগণের মুক্ত আলোচনা শোনা গেছে।  একে অপরের সাথে বিতর্ক করছে।  যখন আমি ফিরে গেলাম তখন অত্যন্ত প্রাণবন্ত ও মুক্ত এক পরিবেশ বিদ্যমান ছিল।

মাইকেল স্লেটঃ এ রকম পরিবেশ কি শুধু তেহরানেই ছিল নাকি সমগ্র দেশ জুড়েই?
এসঃ এটা সত্য যে প্রগতির হাওয়া তেহরানে ছেয়ে গিয়েছিল।  কিন্তু দেশ জুড়েই অনেক পরিবার রাজনৈতিক তৎপরতায় যুক্ত ছিল এবং ঘরে-বাইরে সর্বত্র তর্ক-বিতর্ক চলছিল। বিতর্ক সাধারণভাবে চলছিল যাদের মধ্যে, তাদের একদিকে ছিল ধার্মিক ব্যক্তিদের গ্রুপ, যারা শাহ্ বিরুদ্ধে ছিল এবং যারা চলমান বিপ্লবকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করছিল; এবং অন্যদিকে ছিল বামপন্থীরা, কমিউনিস্টরা, যারা ধার্মিকদের যুক্তি তর্ক দিয়ে বোঝাতে চাইত যে তারা ভুল পথে চলছেন।

মাইকেল স্লেটঃ আপনার ভূমিকা কোথায় ছিল? সেখানে থেকে আপনি কি করেছিলেন?
এসঃ আমি ফিরে গিয়ে দর্শন, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিষয়ে এখানে যা শিখেছিলাম তাথেকে আমার জ্ঞানকে জনগণের সাথে মিলাতে চেষ্টা করেছিলাম। আমি প্রাণবন্ত আলোচনা করতে চেষ্টা করতাম। এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যে আলোচনাগুলো হতো সেখানে আমি যা শিখেছিলাম তা আলোচনা করতে যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিলাম।

মাইকেল স্লেটঃ এ রকম তৎপরতা কতদিন অব্যাহত ছিল এবং কখন থেকে এটা বদলাতে শুরু করলো?
এসঃ বিপ্লবের দশদিনের মধ্যেই হিজাবের ধারণার বিরুদ্ধে নারীদের একটা বিদ্রোহ শুরু হয়েছিল।  এবং এর কিছু পর উত্তর ইরানে কুর্দিস্তানের কুর্দিদের উপর দমন-নির্যাতন শুরু হয়েছিল। তারপরও পুরো দেশ জুুড়ে অনেক মুক্ত পরিবেশ বিপ্লবের দুই বছর পরও বহমান ছিল।  ঐ বছরগুলোতে প্রতিবেশী এক শ্রমিকের ঘরে আমাদের একটি বই-এর টেবিল ছিল।  এরকম একটি টেবিলের দায়িত্বে আমি ছিলাম।  সেখানে থেকে আমরা জনগণের সাথে আলোচনা বিতর্ক করতাম। আমাদের জিনিষপত্র তাদেরকে দেখাতাম, আমাদের বইপত্রসহ অনেক কিছুই তাদের দেখাতাম এবং কথা বলতাম।তখনকার ইসলামী দল হিজবুল্লার সাথে আমাদের দৈনিক সংঘর্ষ হত।  কখনো শারীরিকভাবে, কখনো-বা মৌখিক।  তারা আমাদের কখনো মারধর করত, কখনো বা আমাদের পত্রিকা এবং বিভিন্ন উপাদান সমূহ, আমাদের টেবিল ছিনিয়ে নিত। এবং দৈহিক লড়াই করত।
আমরা দেখেছি তাদের পরনে কোন ইউনিফর্ম থাকত না।  তারা স্বাভাবিক মানুষের মতই ছিল; কিন্তু এটা সবাই জানতো যে তারা সরাসরি সরকারের মদদপুষ্ট সংগঠিত দল।

মাইকেল স্লেটঃ এ ধরনের লোকদের সাথে এ ধরনের লড়াই কতদিন বজায় ছিল? আপনারা কখন নিশ্চিত হয়েছিলেন যে- খোমেনি তার শাসন ব্যবস্থাকে সুসংহত করা শুরু করেছে?
এসঃ প্রথমত, এ ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছিল এটা যারাই দেখতে শুরু করেছেন, তারা প্রত্যেকেই ব্যাপক প্রতিবাদ গড়ে তুলেছিলেন, যা সংঘর্ষে পরিণত হয়- বিশেষত সেসব গ্রুপের সাথে, যারা বিপ্লবে অবদান রেখেছিল। সামরিক বাহিনীর দ্বারা গুলিও হচ্ছিল, তারা প্রতিবাদ-বিক্ষোভে কিছু মানুষের উপর গুলি করেছিল। এবং প্রতিবাদ এক পর্যায়ে জঙ্গীত্বে পরিণত হয়েছিল, এটা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ ছিল না- প্রতিবাদ-বিক্ষোভের সময় সংঘর্ষ বেধে যাওয়ার কারণে। তখন জুনের মাঝামাঝি।  প্রতিবাদ-বিক্ষোভের অব্যবহিত পরে সবগুলো দলকে দমন করা হলো এবং বিভিন্ন মহল থেকে যে বিতর্ক চলছিল তাকে।  তারা সবকিছু বন্ধ করে দিল এবং তার পর থেকে পরিবেশ একদম বদ্ধ হয়ে গেল।

মাইকেল স্লেটঃ তখন আপনি কী করলেন?
এসঃ আমরা একটি গোপন দল হিসেবে নিজেদেরকে সংগঠিত করার প্রচেষ্টা চালাই।  এবং আর কখনো আমরা প্রকাশ্য হইনি।  আলোচনা বা যে কোন কর্মকান্ডের সময় আমাদেরকে সর্বদাই গোপন থাকতে হতো।  কখনোই প্রকাশ্যে এ ধরনের কাজ করতে পারতাম না।
সংগঠন দুই অংশে বিভক্ত হয়ে গেল।  এক অংশ অমলে চলমান সংগ্রামের দায়িত্বে ছিল।  এটার নাম ছিল সারবেদারান। এটাই তাকে (আমল বিদ্রোহকে)১ সংগঠিত করেছিল এবং তাকে কার্যকর করেছিল।  আমি নেপথ্যে সার্বিক কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা করতাম।

মাইকেল স্লেটঃ অমল অভ্যুত্থানের প্রভাব সম্পর্কে ব্যাখ্যা করে বলবেন কি?
এসঃ অভ্যুত্থান যে অঞ্চলে হয়েছিল সেখানকার জনগণের সামনে সংগঠিত ঘটনা প্রবাহ দ্বারা তারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছিল।  তারা বিপ্লবী নীতিমালা এবং বিপ্লবী মতাদর্শের সাথে পরিচিতি লাভ করেছিল।  এটা জনগণকে মাওবাদী তত্ত্ব সম্পর্কে এবং এই সংগ্রাম তারা যেভাবে চালিয়েছিল সে সম্পর্কে অধিকতর সচেতন করে তোলে। অন্যান্য অঞ্চল থেকে উত্তরাঞ্চল কিছুটা বিচ্ছিন্ন ছিল এবং সেখানে বেশি কিছু হচ্ছিল না।  কিন্তু যখন এটা (আমল অভ্যুত্থান) ঘটলো তখন তা এই জনগণকে এরকম রাজনৈতিক তৎপরতার ব্যাপারে ব্যাপক আকৃষ্ট করে তুলেছিল।  দেশের অন্যান্য অংশে যা ঘটছিল তার সাথে এটা তাদেরকে অধিকতর যুক্ত করেছিল।

মাইকেল স্লেটঃ অবশেষে রাষ্ট্রীয় দমনে বিদ্রোহ ব্যর্থ হয়েছিল। জনগণ এবং বিপ্লবীদের বিরুদ্ধে পরে তারা কী পদক্ষেপ নিয়েছিল?
এসঃ সংগঠনের পরিকল্পনা শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছিল এবং যারা এ অভ্যুত্থানে অংশ নিয়েছিল তাদের সবাইকে হত্যা করা হয়।  কিন্তু তারপর জনগণের উপর এর প্রভাব এতই ছিল যে, জনগণ তাদেরকে সর্বদা বীরের মতই স্মরণে রেখেছে। এ অভ্যুত্থানের স্বরূপ সত্যিই বিরল। জনগণ এরকম সাহসিকতা আগে কখনো প্রত্যক্ষ করেনি। তারা তাদেরকে স্মরণ করে। এবং পুরো অভ্যুত্থানটি জনগণের স্মৃতিতে অম্লান হয়ে রয়েছে।  জনগণ প্রতিটি বিপ্লবী, যারা এতে অংশ নিয়েছিল, তাদেরকে বীরের মত সর্বদা মনে রেখেছিল।

মাইকেল স্লেটঃ দমন কি বৃদ্ধি পেয়েছিল? আপনার ভাগ্যে কী ঘটেছিল?
এসঃ আপনি ঠিকই বলেছেন, দমন বৃদ্ধি পেয়েছিল। মানুষ গোপনে থাকার চেষ্টা করেছিল, এবং গোপনে থেকে রাজনৈতিক তৎপরতা চালাতে চেষ্টা করত, নিজেদের আড়াল করে রাখত, এবং প্রকাশ্যে আসত না। তখন আমার কোলে দু’মাসের শিশু বাচ্চা। আমি খুব একটা কাজে জড়াতে পারিনি। আমি যা করতে পারতাম তা হলো, বাড়িতে বসে থাকা, আর খবরের জন্য অপেক্ষা করা। কী ঘটেছে তা জানার জন্য অপেক্ষা করা।

মাইকেল স্লেটঃ অমল অভ্যুত্থানে অপনার স্বামী কি বেঁচে ছিলেন?
এসঃ হ্যাঁ….

মাইকেল স্লেটঃ অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে-তো আপনি বাড়িতে ছিলেন। আপনি কি আর কোন সন্তান প্রসব করেছিলেন?
এসঃ হ্যাঁ, অমল অভ্যুত্থানের পর আমার কন্যার বয়স ছিল দেড় বছর, এবং পুত্রের বয়স ছিল ২ মাস।

মাইকের স্লেটঃ কীভাবে আপনি গ্রেপ্তার হয়েছিলেন? অমল অভ্যুত্থানের কতদিন পর আপনি গ্রেপ্তার হয়েছিলেন?
এসঃ আট মাস পর। আমি তখন নিজের বাড়িতে। তারা ঘর ভেঙ্গে ঢুকে শিশুদেরকে আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়। তাদেরকে আমার থেকে দূরে সরিয়ে নেয়। তারা আমার দিকে গর্জন করে বলে যে, তদন্তের জন্য আমাকে যেতে হবে।

মাইকেল স্লেটঃ এবং আপনার স্বামীও কি গ্রেপ্তার হয়েছিলেন?
এসঃ আমার গ্রেপ্তারের চার মাস পূর্বেই সে গ্রেপ্তার হয়েছিল।

মাইকেল স্লেটঃ আপনার স্বামীর প্রতি তারা কি অভিযোগ এনেছিল?
এসঃ যেহেতু তিনি তাত্ত্বিক মানসম্পন্ন ছিলেন, এবং অভ্যুত্থানটিকে যে-তত্ত্বাবলী পরিচালনা করেছিল তাতে তিনি খুবই শিক্ষিত ছিলেন, এবং তারা বলেছিল যে, তার এই তত্ত্বাবলী ছিল এবং সে এর শিক্ষার অংশটা চালাতো, তাই তাকে আরো বেশি ও আরো বড় অপরাধে অভিযুক্ত করা হয়েছিল, তাদের চেয়েও বেশি, যারা অভ্যুত্থানে অংশ নিয়েছিল। এবং তাকে মৃত্যুদন্ডাদেশ দেয়া হয়েছিল।

মাইকেল স্লেটঃ এর চারমাস পর তারা আপনার বাড়িতে এসেছিল। কী ঘটেছিল পুনরায় বলুনতো ?
এসঃ আমার স্বামীকে যে-জেলে রাখা হয়েছিল, আমাকে সেখানে নিয়ে যাওয়া হল। এবং যখন আমাকে সেখানে নেয়া হল, তখন এক মিনিটের জন্য আমার স্বামীর কণ্ঠ আমার কানে ভেসে আসল, সেই মুহূর্তে তার কণ্ঠ শুনতে পেয়ে এবং সে বেঁচে আছে দেখে আনন্দে আমার মন ভরে উঠেছিল। অতঃপর আমাকে একটি সেলে আট মাস আটকে রাখা হয়েছিল।  জনমানব-বিচ্ছিন্ন ছিল সেই সেল।

মাইকেল স্লেটঃ আপনার বিরুদ্ধে তারা কী অভিযোগ এনেছিল?
এসঃ তারা ধারণা করেছিল যে যেহেতু আমার স্বামী সংগঠনের একজন বড় নেতা, সে হিসেবে আমিও হয়তো তেমন উচ্চতর স্তরের কোন নেতৃত্ব। এবং বহুভাবে আমিও তাতে ভূমিকা রেখেছি। আমাকে বলা হল যে, এর জন্য আমাকেও মৃত্যুদ- দেয়া হবে। সে সময় তারা প্রত্যেক সংগঠনের প্রধান উচ্চস্তরদের নামের তালিকা তৈরি করেছিল, কারা কারা নেতা, কারা কোন গ্রুপের অধীনে, কোন নেতৃত্বের অধীনে ছিল- সব। সে তালিকায় আমার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের কোন তথ্য প্রমাণ তারা পায়নি, কারণ আমি গ্রেপ্তারের পূর্বে ৮ মাস পর্যন্ত আমার সন্তানদের নিয়ে বাড়িতে ছিলাম। তাই তারা যে আমাকে বলেছিল সে অনুযায়ী আমার মৃত্যুদণ্ডাদেশ হলো না।

মাইকেল স্লেটঃ আপনাকে কী দণ্ড দেয়া হয়েছিল?
এসঃ তারা আমাকে যে প্রধান দণ্ডটা দিয়েছিল তাহলো, তারা আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল আমার কোন ধর্ম আছে কিনা এবং আমি বললাম আমার কোন ধর্ম নেই।  এবং শুধু এ জন্যেই আমাকে ১০ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছিল।

মাইকেল স্লেটঃ  কারাগারে প্রশাসন কর্র্র্র্তৃক আপনার সাথে কেমন আচরণ করা হয়েছিল?
এসঃ  নির্জন কারাবাসের পরিবেশ অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর নোংরা ছিল এবং সেখানে পুষ্টিকর (খাদ্য) ছিল না বললেই চলে যাতে প্রকৃতপক্ষে আমাদের বেঁচে থাকা সম্ভব হতে পারে। এবং যাদেরকে নির্যাতন (দৈহিক) করা হতো, তাদের চিৎকার-আর্তনাদ আমরা প্রতিনিয়ত শুনতে পেতাম।
প্রতিদিন সকালে চোখ বাঁধা অবস্থায় আমাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তারা নিয়ে যেত এবং জিজ্ঞাসাবাদের অফিসে নিয়ে আমাদেরকে লাথি ঘুষিসহ মারধর করতো, তারা যা শুনতে চাইতো তা বলার জন্য। এবং সেখানে অন্যান্য লোকেরা, যাদের উপর নির্যাতন হয়েছে, তাদেরকে আমাদের পায়ের কাছে হামাগুড়ি দিতে বাধ্য করা হতো, যাতে আমরা আমাদের উপরও সেরকম করা হবে ভেবে ভয় পাই।
যেহেতু আমি নামাজ পড়তে অস্বীকার করেছিলাম এবং আমি বলেছিলাম যে, আমার কোন ধর্ম নেই, সে কারণে আমাকে এক নির্জন সেলে রাখা হয়েছিল এবং অন্যান্যদেরকে পাবলিক সেলে রাখা হয়েছিল।  আমাকে নির্জন একাকী রাখা হয়েছিল, কিন্তু যেহেতু তাদেরকে দেয়ার মত নতুন কোন তথ্য আমার কাছে ছিল না, তাই আমাকে আর জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি। আমাকে নির্যাতন করেনি, কারণ বাস্তবেই তাদের কাছে নতুন কোন তথ্য দেওয়ার মতো কিছুই আমার জানা ছিল না। তারপরও আমাকে নির্জন একাকী সেলে রাখা হয়েছিল। তথাপি আমাকে এমন এক স্থানেই রাখা হয়েছিল যেখান থেকে আমার বাবার আর্তচিৎকার শুনতে পেতাম, যখন তাকে নির্মমভাবে চাবুক মারা হতো। আমার বাবাকেও একই স্থানে রাখা হয়েছিল। অমল অভ্যুত্থানে তিনি ভূমিকা রেখেছিলেন। তিনি বহু বিভিন্নভাবে তাদেরকে যথেষ্ট সহযোগিতা করেছিলেন। তাকেও সেখানে রাখা হয়েছিল এবং প্রতিদিন তাকে চাবুক মারা হত। তাকে প্রচ- নির্যাতনের ভেতর দিয়ে যেতে হয়। এবং আমাকে অব্যাহতভাবে এমন অবস্থায় রাখা হতো যাতে আমি তার চিৎকার শুনতে পারি। এবং তারা আমার মাকে কীভাবে নির্যাতন করতো- তারা তার প্রতি চিৎকার করতো এবং আমাকে যেখানে রাখা হয়েছিল তার কাছাকাছি কোথাও থেকে প্রতিদিন তাকে গালাগালি দিত যাতে আমি শুনতে পাই এবং মানসিকভাবে নিপীড়িত হই।

মাইকেল স্লেটঃ আপনার মা-বাবার (ভাগ্যে) কী ঘটেছিল? তারা কি বেঁচে ছিলেন?
এসঃ যেসব লোকের সাথে আমার মা বাবা কাজ করত এবং যেসব
নেতৃবৃন্দকে তারা সহযোগিতা করেছিল, তারা কেউই নির্যাতনে ভেঙ্গে পড়েনি, এবং গ্রুপগুলোতে যারা ছিল তাদের কারও সম্পর্কেই কোন কিছু তারা বলেনি। তাই, সরকার তাদের বিরুদ্ধে কিছু করেনি, আমার মা-বাবার বিরুদ্ধে কোন শক্ত কিছু পায়নি।  তাই, ৩ বছর পর তারা উভয়েই ছাড়া পেয়ে যান।

মাইকেল স্লেটঃ আপনি বলেছিলেন জেলখানাতে প্রথম আসার সময় আপনি আপনার স্বামীর কণ্ঠ শুনতে পেয়েছিলেন। তিনি কতদিন জেলে ছিলেন, ফের কখনো কি তার সাথে দেখা হয়েছিল?
এসঃ আমাকে জেলে নেয়ার ৮ মাস পর, আমার স্বামীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পূর্বে তারা তাঁর সাথে আমার সাক্ষাতের অনুমতি দেয়। সেটাই ছিল তার সাথে আমার শেষ দেখা।

মাইকেল স্লেটঃ জেলে আপনি কতদিন ছিলেন ?
এসঃ তিন বছর।

মাইকেল স্লেটঃ ৮ মাস পর আপনার স্বামীর মৃত্যুদ-ের পর তারা আপনাকে পাবলিক সেলে রাখে। তারা কি আপনাকে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করার চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছিল? তারা কি আপনাকে নামাজ পড়তে বাধ্য করারও চেষ্টা অব্যাহত রেখেছিল?
এসঃ সেখানকার অনেক নারীই নামাজ পড়তে অস্বীকার করেছিল। যখন আমরা নামাজ পড়তে অস্বীকার করলাম, তখন আমাদেরকে একটি নির্জন কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। ওটা ছিল ৬নং কক্ষ, অন্যান্য কারা কক্ষ থেকে ওটা ছিল সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। ওটা ছিল অনেকটা কোয়ারেন্টাইনের মত, সেখানে আমাদের রাখা হয়েছিল। আমাদের সাথে এমন আচরণ করা হয়েছিল যেন আমরা মানুষ নই। যেন আমরা ছিলাম অন্য কোন প্রাণী, যেমন, কুকুর। এমনকি যখন আমরা হাত ধুতে চেয়েছি তখন ইসলামী ধারণা মতে যেহেতু আমরা নাস্তিক, যেহেতু তাদের ধর্ম আমাদের নয়, সুতরাং আমরা হচ্ছি বর্জ্য পদার্থের মত নোংরা।

মাইকেল স্লেটঃ তিন বছর পর আপনি জেল থেকে মুক্ত হয়েছিলেন। ছাড়া পেয়ে আপনি কোথায় উঠেছিলেন?
এসঃ আমার শ্বশুর ও শ্বাশুড়ী- যারা সে সময় আমার সন্তানদেরকে দেখাশুনা করতেন, তারা জেলখানার বাইরে আমার জন্যে অপেক্ষা করছিলেন। সে সময়ে সংস্কৃতি এবং পরিবেশগত দিক দিয়ে যে অবস্থা চলছিল সেকারণে বাস্তবে আমার ক্ষেত্রে যা ঘটলো তাহলো- আমি ইসলামী শাসন ব্যবস্থার জেল থেকে মুক্তি পেলাম বটে, কিন্তু আমাকে মুক্ত হয়ে পুনরায় শ্বশুরালয়ের অন্য এক আলংকারিক কারাগারে প্রবেশ করতে হয়েছিল।

মাইকেল স্লেটঃ একটু ব্যাখ্যা করে বলুন ওটা কেমন ছিল? আপনার গ্রেপ্তার-উত্তর এবং গ্রেপ্তার-পরবর্তী দেশীয় পরিস্থিতির কোন পরিবর্তন হয়েছিল? সেটা কেমন ছিল?
এসঃ সকল বিপ্লবী শক্তিকে দমনের মাধ্যমে খোমেনী’র সরকার জনমনে বিপ্লবী শক্তির বিরুদ্ধে এতই ভীতি এবং ঘৃণা সৃষ্টি করেছিল যাতে আমরা এমনকি সমাজ কর্তৃকও সমাদৃত হতে পারিনি। আমরা জনগণ থেকে স্বাগত জানানোর অনুভূতি পাইনি, কারণ, তাদের মাঝে এতই ভয় ঢুকেছিল যে, বিপ্লবী বা বিপ্লবী মতাদর্শে যেকোন কাজে নিয়োজিত কোন গ্রুপের প্রতি নিদারুণ ভয় কাজ করত। জনগণ তাদের প্রতি রীতিমত অবজ্ঞা পোষণ করতো।
এ ধরনের প্রতিকূল পরিস্থিতিতে এতটা অবজ্ঞার মুখোমুখি হওয়া সত্ত্বেও বাড়িতে আমার সন্তানদেরকে নিয়ে অব্যাহতভাবে বিপ্লবী সংগীত গেয়ে, এবং এ ধরনের সংগ্রামের আনন্দকে প্রকাশ করে পরিবেশকে প্রাণবন্ত করার চেষ্টা করতাম। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ওখানকার প্রচলিত পুরুষতান্ত্রিক সংস্কৃতি মানুষ ধারণ করতো বিধায় আমার স্বামীর পরিবার দ্বারা বাড়িতেও আমাকে দমিত হতে হয়েছিল। এমনকি আমার পরিবারের এই ক্ষুদে সমাজেও আরেকটি পরিবর্তন আনতে বেশি কিছু করতে আমি পারিনি।

মাইকেল স্লেটঃ আপনি যে বলছেন পুরুষতান্ত্রিক পরিবেশ সেটা কেমন ছিল? আপনার মতো একজন নারীর জন্য এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে বাস করাটা কী অর্থ বহন করে?
এসঃ আমি যা বোঝতে চেয়েছি তার একটা দৃষ্টান্ত দেই- যেহেতু আমি গৃহবধু ছিলাম, তাই কালো পোষাক পরার জন্য দশ বছর আমাকে তিরস্কার করা হয়েছিল; নিজস্ব কোন মতামত প্রকাশ না করার জন্য বকাঝকা করা হয়েছে; আমার আশপাশে যাতে কোন বন্ধুবান্ধব না থাকে, আমার প্রতি সহানুভূতি জানাতে পারে এমন কারো সাথে যাতে কথা বলতে না পারি সেজন্য আমাকে দোষারোপ করা হতো। আমাকে গৃহাভ্যন্তরে পুরে রাখা হয়েছিল, বাড়ির কাজ করতে বলা হয়েছিল। এমনকি আমার সন্তানদেরকে যত্ন নেওয়ারও কোন অধিকার ছিল না। আমার স্বামীর পরিবারের থেকে পৃথক কারো সাথেই কোন সম্পর্ক গড়তে পারিনি। দশ বছর আমি সেখানে ছিলাম, আমি ভাবলাম আমার মনোবিজ্ঞান অধ্যয়ন করা উচিত। সে সময়ে আমার নিজেকে নিয়ে, আমার মানসিক অবস্থা নিয়ে, আমার মানসিক পরিস্থিতি নিয়ে কী করা উচিত তার জন্য, কীভাবে আমি আমার স্বাধীনতা ও আত্মবিশ্বাস ফিরে পেতে পারি সেজন্য, আমার শক্তিকে পুনরুদ্ধারের জন্য, আমার চরিত্রকে পুনর্গঠনের জন্য আমি এইসব ধারণার উপর কাজ করার চেষ্টা করতাম। এই প্রচেষ্টায় যখন আমি সফল হলাম, তখন আমি তাদের বাড়ি ছেড়ে চলে আসি- ১০ বছর পর।

মাইকেল স্লেটঃ আপনার শ্বশুরালয় ছেড়ে কোথায় গিয়েছিলেন?
এসঃ আমার বাবার কিছু সম্পত্তি ছিল যেটা মোটেই বাসযোগ্য ছিল না। সেখানে ভূগর্ভস্থ একটা ঘর ছিল এবং আমি সেখানেই থাকতাম। এ অবস্থায় আমার এক পারিবারিক বন্ধু আমাকে একটা চাকুরী জুটিয়ে দিয়েছিল যার বেতন ছিল অত্যন্ত অল্প।

মাইকেল স্লেটঃ এভাবে আপনি কতদিন ছিলেন?
এসঃ আমি একজন কমরেডের সাথে দেখা করি। সে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ছিল না। কিন্তু সে আমাকে কিছু মনোবৈজ্ঞানিক ক্লাস নিতে ও আত্ম-উপলব্ধিমূলক গ্রুপ পেতে সাহায্য করেছিল এবং আত্ম-উপলব্ধিকারী দলের সাথে যুক্ত করতে সহায়তা করেছিল। আমি তাদের সাথে জড়িত হলাম এবং এরকম একটি দলের একজন নারী আমার প্রতি খুবই যত্নশীল ছিলেন। ঐ নারী কমরেড আমাকে একটি চাকরী পেতে সহায়তা করেন, যেখানে অতীত ইতিহাস পরীক্ষার প্রয়োজন পড়ে না। তা না হলে চাকরী পাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। কিন্তু তিনি ঐ চাকরী পেতে আমাকে সহায়তা করেন এবং এভাবে আমি ঐ ভূগর্ভস্থ ঘর থেকে বাইরে বেরুতে পেরেছিলাম।

মাইকেল স্লেটঃ কতদিন পর ইরান থেকে চলে এসেছিলেন? ঐ ভাল চাকরী পাওয়ার পর কি কিছুদিন কাজ করেছিলেন? নাকি এর পরপরই ইরান ত্যাগ করেছিলেন?
এসঃ প্রায় ১ বছর সে পেশায় কাজ করেছি। কারণ জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার ১০/১১ বছর পর পর্যন্ত দেশ ত্যাগ করা আমার জন্য নিষেধ ছিল। আমার কোন পাসপোর্ট না থাকায় আমি দেশ ছাড়তে পারিনি। আমি সেখানে কাজ করে যেতে থাকি। এর কিছুদিন পর আমি পাসপোর্টের জন্য আবেদন করায় তারা আমাকে এককালীন পাসপোর্ট দিল। এটা আমি দেশ ছাড়ার জন্য মাত্র একবার ব্যবহার করতে পারবো এবং দেশে ফিরেই সেটা তাদেরকে জমা দিতে হবে। এভাবেই আমি মুক্ত হওয়ার প্রায় ১২ বছর পর ইরান ত্যাগ করেছিলাম।
দেশ ত্যাগ করার জন্য ভিসা প্রাপ্তির একমাত্র সম্ভাব্য কারণ ছিল যে আমার একটা চাকরী ছিল। আমার তথ্য প্রমাণাদি ছিল যে, আমি এজন্য খরচ নির্বাহ করতে পারবো এবং ইরানে বসবাসরত আমার দু’টো সন্তানও ছিল এবং এটা কিছূ প্রামাণ্য তথ্য দেয় যার উপর ভিত্তি করে ভিসা প্রদান নিশ্চিত করা হয়েছিল। ভিসার মেয়াদ ছিল মাত্র ১ মাস।
জার্মানি যাওয়ার পর সঠিক কোন সংগঠনের সন্ধান আমি তখনো পাইনি। যেখানে আমার ধারণাগুলো নিয়ে, মার্কসবাদী-লেনিনবাদী-মাওবাদী ধারণাগুলো নিয়ে আমি সংযুক্ত হতে পারি। যেখানেই যাই, সেখানেই বিতর্ক আলোচনা চালাতে থাকি। ইরান বিপ্লব এবং এখানে সংগঠনের কাছ থেকে যে মতাদর্শ আমি আত্মস্থ করেছিলাম সে অবস্থান থেকে আমি সর্বদা এই ধারণাগুলোকে এগিয়ে দিতাম, কিন্তু সে ব্যাপারে সহানুভূতিসম্পন্ন সেরকম কোন সংগঠনের সন্ধান পাইনি।
আমাকে আমার একমাত্র যে বিশ্বাস আশা জোগাতো তাহলো, আমি সর্বদা জানতাম ও সর্বদা নিশ্চিত ছিলাম যে এই মতাদর্শই হচ্ছে মুক্তির একমাত্র পথ। এবং এখন পাঁচ বছর হয়েছে যখন পুনরায় সঠিক দল, ইরানের কমিউনিস্ট পার্টি (মালেমা)’র সন্ধান পেয়েছি। এর সাথে আমি জড়িত হয়েছি এবং পুনরায় রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছি।

মাইকেল স্লেটঃ ১৯৯৫ সালে আপনি ইরান ত্যাগ করেছিলেন। আজকের ইরানের পরিস্থিতি সম্পর্কে বলুন, এখনকার নিপীড়নের রূপটি কেমন?
এসঃ আমি মনে করি, প্রথমত, একটি বৈশিষ্ট্য প্রত্যেক ইরানি নারী, হউক সে রাজনৈতিক নারী বা ধর্ম চেতনার নারী, ধারণ করে। তাদের প্রত্যেকের মধ্যেই বিরাজমান নিপীড়ন বা তাদেরকে দাবিয়ে রাখে এমন বিষয়ের বিরুদ্ধে এক ধরনের বিরুদ্ধতা/বিরক্তি প্রকাশিত হয়। এমনকি যেসব নারী ধার্মিক বা ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ আছে তারাও এসবের বিরুদ্ধে গভীর বিরক্তি/ঘৃণা প্রকাশ করে থাকেন। যে প্রধান সমস্যাগুলোর সম্মুখীন সমগ্র নারীরা হচ্ছেন তাহলো, সমাজের আইন-কানুন নারীদের বিরুদ্ধে, সেগুলো হলো নারী-বিরোধী আইন যা সরকার চাপিয়ে দিয়েছে, এবং
দ্বিতীয়ত অগণিত নারী যে অবস্থায় বাস করছেন তার কোন বিকল্প তারা দেখছেননা।

মাইকেল স্লেটঃ আপনি কোন ধরনের আইনের কথা বলছেন?
এসঃ আইন-কানুুুুনের মধ্যে যেমন, নারীরা তাদের সন্তানদেরকে রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারে না। স্বামীর অনুমতি ছাড়া বেড়াতে যেতে পারে না, বিদেশ যেতে পারে না। সার্বিক ব্যবস্থা এমনভাবেই সাজানো আছে যেখানে গোটা নারী সমাজ পুরুষতন্ত্র দ্বারা আবদ্ধ।

মাইকেল স্লেটঃ ‘সম্মানরক্ষা হত্যা’র স্বরূপ কেমন? এ ধরনের ঘটনা কি ইরানে সচরাচর ঘটে?
এসঃ আধুনিক শহরাঞ্চলে তেমন দেখা যায় না, কিন্তু প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে এটা খুবই প্রচলিত এবং এ ধরনের ঘটনা খবরে প্রচার করা হয়। খবরে হয় তারা একে ‘সম্মানরক্ষা হত্যা’ বলে, নতুবা বলে যে, একজন নারী আত্মহত্যা করেছে।

মাইকেল স্লেটঃ প্রেমঘটিত ঘটনা বা বিবাহ-পূর্ব যৌন সম্পর্ক স্থাপনের বিষয়গুলো কি এ ধরনের সম্মানরক্ষা হত্যাকান্ড’র অন্তর্ভুক্ত? এ ধরনের পরিস্থিতিতে নারীদের কি হয়? তাদেরকে কি হত্যা করা হয়?
এসঃ এ ধরনের হত্যাকাণ্ড ঘটানোর জন্য একজন বাবা বা ভাই’র তাদের বোন, স্ত্রী বা মাকে সন্দেহ করাই যথেষ্ট। নিছক সন্দেহ করাটাই তাদের জন্য যথেষ্ট। এবং এর পেছনে কোন বাস্তব ভিত্তি না থাকলেও সন্দেহ হলেই তারা এগিয়ে গিয়ে হত্যাকা- ঘটাতে পারে এবং এ ধরনের ঘটনার জন্য কোন আইনানুগ পদ্ধতির প্রক্রিয়া নেই। তারা নিজেরাই এ ধরনের ঘটনা ঘটায়। এবং এগুলো ঘটে চলে। কোন পদ্ধতির ভিতর দিয়ে এগুলো এগোয় না।

মাইকেল স্লেটঃ এ ধরনের ঘটনায় রাষ্ট্র কি কোন ভূমিকা নেয়?
এসঃ পরোক্ষভাবে রাষ্ট্র কর্তৃক প্রচারিত ইসলামী মূল্যবোধ, চেতনাকে মদদ দিয়ে রাষ্ট্র এ ধরনের তৎপরতাকে উৎসাহিত করে অথবা সে ধরনের আইন পুরুষদের দ্বারা এ ধরনের হত্যাকা- ঘটানো সম্ভব করে তোলে।

মাইকেল স্লেটঃ শরীয়াহ আইন বলতে যা বোঝায় এটাকি তাই?
এসঃ শরীয়াহ আইন মূলত হলো কিভাবে নারীরা ইরানের ইসলামী নেতৃত্বকে মূল্যায়ন করবে বা যে আইন তারা পাশ করে সেগুলোকে মূল্যায়ন করবে আল্লাহর পবিত্র আইন হিসেবে। এবং এমন ধারণাতে মদদদান যা হলো, যদি কোন নারী তার স্বামীর আদেশ-নিষেধ অমান্য করে সে সম্পর্কে করণীয় বিষয়ে। যদিও অনেক নারীই লড়াই করে, এমনকি ব্যক্তিগত স্তরেও, আইনী বাধা উপেক্ষা করে, তাদের পরিবারে, ব্যক্তিগত জীবনের ফাঁক-ফোকরে বা সমাজের বৃহত্তর পরিসরে। তবে হাতে গোণা কিছু নারী আছে যারা প্রচলিত আইন মেনে চলে, এবং এ ধরনের নারীরা সরকারের মদদে মৌলবাদী ধারণাকে ধারণ করে। এবং এই নারীরা যেহেতু পূর্ণ হিজাব পরিধান করে এবং এধরনের শরিয়াহ আইনের বাধ্য থাকে, তাই তাদেরকে শাস্তি দেয়ার প্রশ্ন ওঠে না।

মাইকেল স্লেটঃ আপনি বলেছেন এই শাসনব্যবস্থা একটি নারী বিদ্বেষী শাসনব্যবস্থা। এ কথা দ্বারা আপনি কী বোাঝাতে চান?
এসঃ আমি বোঝাতে চাই যে, তারা দেশে এখন যেসব আইন পাশ করেছে ও চাপিয়ে দিয়েছে তা সমাজের পুরুষদের সুযোগ-সুবিধার জন্য গঠিত। এবং এই আইন স্পষ্টত যে বিষয়টিকে তুলে ধরে তা হল পুরুষ কর্তৃক সৃষ্ট সমাজের সকল বিধি-নিষেধকে নারীদের মেনে চলতে হবে। নারীদেরকে তাদের কর্মক্ষেত্রে বা ব্যক্তিজীবনে, গৃহে ও সাধারণভাবে সমাজে পুরুষদের মান্য করতে হবে ও তাদের প্রতি আনুগত্য দেখাতে হবে, যেখানেই সে যাক বা যা-ই করুক না কেন। এ ধরনের আইন-কানুন মূলত এই যে, সমাজে পুরুষ যা কিছু আদেশ করেন তাই একজন নারীকে মেনে চলতে হবে।

মাইকেল স্লেটঃ এখনো কি অনেক নারীই গ্রেপ্তার হচ্ছেন, তাদেরকে জেলে ঢুকানো হচ্ছে?
এসঃ হ্যাঁ, এ ধরনের ঘটনা প্রত্যহ ঘটে, যেকোন ধরনের অজুহাতে তারা ২৪ ঘণ্টা বা ৪৮ ঘণ্টার জন্য আটক করে এবং তারপর সাধারণত ধর্ষণ করে অথবা অন্য কোন উপায়ে আহত অবস্থায় বা চাবুকের আঘাতে জর্জরিত করে ছেড়ে দেয়া হয়। বা কাউকে দীর্ঘ সময়ের জন্য আটকে রাখা হয়, যেখানে তাদের পরিবারের কেউ জানে না যে, সে কোথায় গেছে বা কি করছে।

মাইকেল স্লেটঃ  আপনি বলেছেন নারীরা প্রতিরোধ করেন, কখনো গৃহে ক্ষুদ্র পরিসরে, কখনো বৃহৎ পরিসরে। আমাদের বলুন প্রতিরোধের স্বরূপ ঠিক কেমন?
এসঃ প্রধান যে গ্রুপটি অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে প্রতিরোধ করে তারা অধিকাংশই ছাত্রী, তারা শহরের প্রাণকেন্দ্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য ছাত্রদেরকে সাথে নিয়ে বিক্ষোভ গড়ে তোলে, তারা শান্তিপূর্ণভাবেও অনেক বিক্ষোভের পরিকল্পনা করে, আবার অনেক বিক্ষোভ সংঘর্ষে রূপ নেয়। এ ছাত্র-ছাত্রীদের অনেককে গ্রেপ্তার করা হয় এবং জেলে ঢুকানো হয়- কোনরকম দন্ড প্রদান ছাড়াই, অথবা কেন তাদেরকে বন্দী রাখা হয়েছে, কখন তারা মুক্তি পাচ্ছে এরকম কোন সংবাদ তাদের পরিবারে দেয়া হয় না।
মাত্র এক সপ্তাহ আগের একটি ছাত্র বিক্ষোভের উদাহরণ দিচ্ছি- পারসিয়ান নয়া বছর শুরু হওয়ার পূর্বে ছাত্র-ছাত্রীরা প্রধান শহরের উপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল। তাদের একটা ঐতিহ্য হচ্ছে নতুন বছরে জনগণ বিচিত্র প্রতীক দিয়ে একটি পুরো টেবিল সাজায়, বিভিন্ন ধরনের চারা গাছ বা বীজ থাকে যা তাদের জীবিকা বা সাধারণভাবে জীবনের প্রতীককে বোঝায়। এর মধ্যে একটি প্রতীক হচ্ছে মাছ। তারা ছোট মাছ কিনে একটি মগের মধ্যে ঢুকিয়ে টেবিলে রাখে। যে কাজটি ছাত্ররা করেছিল তা হল, প্রায় পুরো শহরে কালো মাছসহ তারা হেঁটে যাচ্ছিল, তার সাথে একটি অতিশয় বিপ্লবী কবিতা লাগিয়ে পথচারীদের কাছে প্রদর্শন করতে থাকে। “ছোট কালো মাছ” নামক একটি গল্প প্রচলিত আছে। লিখেছেন ইরানের বিপ্লবী লেখক সামাদ বাইরাঙ্গী, গল্পটি একটি ছোট কাল মাছকে নিয়ে। মাছটি ভ্রমণ করছে। সে প্রতিকীকরণ করেছে- একজন বিপ্লবী তরুণ ছাত্রকে, যে কখনো দাঁড়ায় না, সর্বদা প্রতিরোধ করে, সর্বদা লড়াই-এ নিজেকে নিয়োজিত রাখে এবং যদিও খুবই ছোট এক নদীতে মাছটি বাস করে, তা সত্ত্বেও সে তার ভ্রমণ অব্যাহত রাখছে এবং সে মহাসাগরের সন্ধান পায় ও অন্যান্য মাছের সাথে যুক্ত হয় এবং সে এই পুরো প্রক্রিয়া থেকে নিজেকে কখনো বিরত রাখে না।

মাইকেল স্লেটঃ নারীদের উপর নিপীড়নকে ঘিরে এই অভিযানে৩ আপনি জড়িত হয়েছেন ইরানের শাসনব্যবস্থা ও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ- উভয়কে বিরোধিতার জন্য। এই অভিযান সম্পর্কে আমাদেরকে কিছু বলবেন কি?
এসঃ বিপ্লবের পরবর্তী বছরগুলোতে নারীরা বুঝতে পেরেছে যে, যেকোন প্রতিশ্রুত, বা যা তারা আনতে চেয়েছে সেরকম পরিবর্তনের কাজে, প্রত্যক্ষভাবে হস্তক্ষেপ না করলে বা তার সাথে সহযোগিতার জন্য উদ্যোগ না নিলে কোন পরিবর্তন আসবে না। এবং আমরা জানি যে, এমনকি সমাজতন্ত্রও কখনো কায়েম হবে না যদি এই পরিবর্তন আনতে নারীরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা না রাখে। আমরা বিশ্বাস করি যে, সমাজতন্ত্র এবং নারী আন্দোলন একে অপরের পরিপূরক।

মাইকেল স্লেটঃ জনগণের সামনে দু’টি মাত্র পথ দেখানো হচ্ছে- ইসলামী মৌলবাদী বিপ্লব বা গণতন্ত্রের জন্য মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী লড়াই- এর যেকোন একটিতে অংশ নেয়া। এ ক্ষেত্রে আপনাদের মতামত কী, এ ব্যাপারে ইরানের জনগণ কী ভাবছে? বিষয়টি কি আপনি অন্যভাবে বলবেন, ইরানের জনগণের কেমন সাড়া পাওয়া যাচ্ছে?
এসঃ আমরা অচল হয়ে যাওয়া এ উভয় শাসন ব্যবস্থার প্রকৃত চেহারাকে উন্মোচন করার চেষ্টা করি, এবং আমরা জনগণের মাঝে বিকল্প তৃতীয় একটি মেরুকরণের চেহারা তুলে ধরার প্রচেষ্টা চালাই, যা জনগণের কাছে রয়েছে, এবং এই বিকল্প, দুই ধরনের অচল শাসনব্যবস্থার উভয়টিকে বাতিল করে, এবং এটা নিজের ভাগ্য নিজেই নিয়ন্ত্রণ করে, একটি তৃতীয় মেরুকরণ, যা যুদ্ধের বিরুদ্ধে, এবং জনগণের মাঝে যত ক্ষুদ্র আকারেই তা থাক না কেন। আমাদের আরো বৃহৎ বিকল্প পরিসরে একে বিকশিত করতে আরো আরো জনগণকে অন্তর্ভুক্ত করবে এবং আমাদের দেখাতে হবে যে এটাই হচ্ছে একমাত্র উপায়- ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বেধে যাওয়ার পূর্বে আমাদের যুদ্ধ-বিরোধী বিশ্বাসকে আরো বেশি প্রচার করতে হবে। আমরা এই বিকল্প অবস্থানটি ইরানের জনগণকে, বিশেষত নারীদেরকে দেখাতে চাই। কিন্তু যে সংগঠনগুলো ইসলামী শাসন ব্যবস্থার কোন না কোন সংস্কারের জন্য জনগণকে প্রলুব্ধ করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে, আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে শুধুমাত্র উভয় শাসনব্যবস্থার প্রকৃত চেহারাকে উন্মোচন করাই নয়- বরং এই সংস্কারবাদী দলগুলোর চেহারাও উন্মোচন করা, দেখানো যে, তাদের মতাদর্শ কোথায় নিয়ে যাবে এবং দেখাতে হবে যে, এগুলো ইরানের বিপ্লবে আগেও ঘটেছিল, সে সকল পথও বিফলে যাবে।
আমি শুধু উল্লেখ করতে চাই, যখন গত মাসে আমি এখানে এসেছিলাম, আমি অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছি, অনেক হাইস্কুলেও। ওখানকার তরুণদের আবেগ উচ্ছ্বাস প্রত্যক্ষ করে সত্যিই আমি খুবই আনন্দিত হয়েছি। আমি অবলোকন করেছি বিপ্লবের জন্য, নতুন বিশ্ব গড়ার লক্ষে পরিবর্তন আনয়নের জন্য শেখার প্রতি তাদের আবেগ আগ্রহবোধ। নিজেকে বিপ্লবী পথে এগিয়ে নেয়ার জন্য এসব ঘটনা আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে। আমি এতই শক্তি অর্জন করেছি এবং এমন অনেক কিছু শিখেছি যে আমি জানি যখন আমি এসেছিলাম তার চেয়ে অধিক শক্তি নিয়ে আমি জার্মানিতে ফিরে যাবো- একটি উন্নততর বিশ্ব গড়ার অধিকতর আশাবাদ নিয়ে।

মাইকেল স্লেটঃ এখানকার উচ্চ বিদ্যালয়ের ক্লাসগুলোতে আপনার কিছু অভিজ্ঞতার কথা ও কী ঘটেছিল তার গল্প বলুন।
এসঃ এগুলো (প্রশ্নশিট হস্তান্তর) হলো প্রশ্নাবলীর কিছু দৃষ্টান্ত, যেগুলো ইরান এবং বিপ্লব সম্পর্কে ওয়াট্ হাইস্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরা আমাদেরকে করেছিল । ইরানের নারী এবং তরুণীদের পরিস্থিতি সম্পর্কে।

মাইকেল স্লেটঃ (পাঠরত) সাধারণ পরিবারগুলোর গঠন কী? গৃহে কি দায়িত্ব পালন করতে হয়? কত স্তর পর্যন্ত নারী শিক্ষার সুযোগ দেয়া হয়? তারা কি আপনার কাছে জানতে চেয়েছে, ইরানে একজন বিপ্লবী নারীকে কেমন হতে হবে?
এসঃ ওয়াট্স হাইস্কুলের তিনজন ছাত্রীর সাথে আমি ছবি তুলেছিলাম। যে গাছটি কাটা হয়েছিল তার ইস্যুতে তারা সত্যিই খুব আগ্রহী ছিল। এ কারণে তারা ছিল খুবই আবেগপ্রবণ।  তারা আমার কাছে প্রশ্ন করে চলেছিল, কিভাবে একজন মানুষ বিপ্লবী হতে পারে, কিভাবে একজন নিজেকে যুক্ত করার জন্য বিপ্লবী সংগঠন গড়তে পারে এবং বিপ্লবীরা যা করে সেরকম কাজ করতে পারে।

মাইকের স্লেটঃ ছাত্র-ছাত্রীরা আপনার কাহিনী শুনে কিভাবে সাড়া দিয়েছিল? কারণ আপনার কাহিনী অত্যন্ত শক্তিশালী, এবং আমি নিশ্চিত এ ধরনের কাহিনী তারা পূর্বে কখনো শুনেনি।
এসঃ তারা প্রকৃতই আমার প্রতি সহানুভূতি দেখিয়েছে এবং আমার কথা তারা বিশ্বাস করেছে, বিশেষত আফ্রো-আমেরিকান ছাত্র-ছাত্রীরা। কারণ তাদের সমাজে তারা নিজেরাই এ ধরনের সংগ্রাম করেছে এবং সেখানে এগুলো তারা দেখেছে। এবং তাদের নিজ সমাজে তাদের প্রতি এমন আচরণই করা হয়েছে। তারা সত্যিই আমার প্রতি সহমর্মিতা দেখিয়েছে, আরো অনেক কিছু জানতে চেয়েছে এবং যথেষ্ট সহানুভূতি ও আগ্রহ দেখিয়েছে।

মাইকেল স্লেটঃ আপনার এসব অভিজ্ঞতার একটি আমাদেরকে বলুন, যা আপনি সবচেয়ে বেশি মনে রাখবেন।
এসঃ ৮ মার্চের মিছিলটি নিজেই। এতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সমাবেশ আমি দেখেছি এবং বিভিন্ন গ্রুপের উপস্থিতিও সেখানে ছিল। অনেক আমেরিকান, বহু আফ্রো-আমেরিকান এবং অনেক ধরনের মানুষ উপস্থিত হয়েছিলেন যারা এ দিবসকে কেন্দ্র করে অংশগ্রহণ করেছিলেন, একে সমর্থন করেছিলেন। বিশাল জনসমাবেশ না হওয়া সত্ত্বেও- এটা ছিল অনেক উচ্চ গুণসম্পন্ন এবং ঐ দিবসটি সত্যিই আমি উপভোগ করেছিলাম। ঐ দিন যা দেখেছি তা থেকে আমি উপলব্ধি করেছি যে, যদি আমরা একে অপরের পাশে, একে অপরের সাথে ঐক্য গড়তে না পারি তাহলে আমরা আমাদের চূড়ান্ত লক্ষে পোঁছতে পারব না।

সূত্রঃ  দেশে দেশে বিপ্লবী নারী সংকলন, বিপ্লবী নারী মুক্তি প্রকাশনা

Advertisements


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s