২৫শে মেঃ ৪৯তম ঐতিহাসিক নকশাল বাড়ী দিবস পালন করুন!

nnn

Advertisements

লংগদু’র গণহত্যাঃ একটি বিপ্লবী দৃষ্টিভঙ্গি

01-Mallya-Massacre-1992

লংগদু’র গণহত্যাঃ একটি বিপ্লবী দৃষ্টিভঙ্গি

পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালী প্রতিক্রিয়াশীল শাসক শ্রেণী ও ফ্যাসিস্ট সরকারী বাহিনীর হত্যাযজ্ঞ ও নির্যাতনের আরেকটি ঘটনা

(এপ্রিল/’৯০)

“এমন মানুষ গোনা যাবে যারা সরকারী আর্মীর নির্যাতনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, কিন্তু এটা গুণে শেষ করা কঠিন যে কতজন খুন-জখম-গ্রেপ্তার-হয়রানি ও এভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে”- পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কে একজন পাহাড়ী ছাত্রের মন্তব্য এটা। আর এটাই হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রামের আজকের বাস্তবতা। পার্বত্য চট্টগ্রামের ১০টি ক্ষুদ্র জাতিসত্তার সমন্বয়ে গঠিত জনগণের উপর বাঙালী শাসক শ্রেণী- মুৎসুদ্দি-বুর্জোয়া ও সামন্তদের ফ্যাসিস্ট সরকার ও তার ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রযন্ত্রের উগ্র জাতীয়তাবাদী নিপীড়নের হিংস্র চেহারা এমন এক রূপ লাভ করেছে যার সাথে কেবল ’৭১ সালে পাক-বাহিনীর বাঙালীদের উপর পরিচালিত নৃশংসতারই তুলনা চলে।  শাসক শ্রেণী ও প্রতিক্রিয়াশীল নিপীড়কদের প্রচারযন্ত্র- রেডিও, টিভি, ইত্তেফাক, ইনকিলাব, বাংলার বাণীর মতো সংবাদপত্রগুলি ভুলেও কখনো নিপীড়িতদের পক্ষে যেতে পারে এমন কোনো সংবাদ পরিবেশন করে না। তবে নিপীড়িত জনতার সংগ্রামের বিরুদ্ধে সকল প্রকার কুৎসা অপপ্রচার করা এদের স্বভাব। পার্বত্য চট্টগ্রামের সংগ্রাম সম্পর্কে এরা সেটাই যে করে এসেছে তার প্রমাণ হ’ল পার্বত্য চট্টগ্রামে লংগদু উপজেলায় ’৮৯ সালের ৪ঠা মে তারিখে সংঘটিত গণহত্যা। লংগদু হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ঢাকায় হাজার হাজার পাহাড়ী ছাত্রের শোক মিছিল, প্রেসক্লাবে দেশী-বিদেশী সাংবাদিকদের সামনে তাদের বক্তব্য- এসব কিছুই সমতল ভূমির একজন মানুষও জানতে পারেননি তথাকথিত “জাতীয়” পত্র-পত্রিকাগুলো থেকে। রেডিও, টিভি তো দূরেই থাকুক।  শুধু ’৮৯ সালের লংগদুতেই নয়, ইতিপূর্বেও এ ধরনের গণহত্যা ও ধ্বংসলীলা চালিয়েছে উগ্র জাতীয়তাবাদী বাঙালী শাসক শ্রেণীর হাতিয়ার ফ্যাসিস্ট সেনাবাহিনী।  এর মাঝে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ ও পাইকারী নির্যাতনের বিশেষ ঘটনাগুলো ঘটে ১৯৭১ সালে পানছড়ি ও কুর্কি চারায়, ১৯৮০-তে কাউখালীতে, ১৯৮৪ সালে ভূষণছড়ায়, ১৯৮৬ সালে পানছড়ি-দিঘীনালা-মাটিরাঙায় ও ১৯৮৮ সালে বাঘাইছড়ি (কাশলং)-এ।
বাংলাদেশ সরকারের দালাল লংগদু উপজেলা চেয়ারম্যান আঃ রশিদকে গত বছরের ৪ঠা মে তারিখে অজ্ঞাত পরিচয় আততায়ীরা হত্যা করে।  এই ঘটনাটির সুযোগ গ্রহণ করে স্থানীয় আর্মী ক্যাম্পের কমান্ডার মেজর জাকিরের নেতৃত্বে স্থানীয় বাঙালী প্রতিক্রিয়াশীলরা পাহাড়ী জনগণের উপর উন্মত্তভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে।  তারা মিসেস নমিতা চাকমার তিন মাসের শিশু কন্যা, ৭০/৭৫ বছরের বৃদ্ধ-বৃদ্ধাসহ ৩২ জন নারী-পুরুষ-বৃদ্ধ-শিশুকে নির্বিচারে হত্যা করে; মারাত্মকভাবে আহত করে অনেককে।  এই বর্বর অভিযানে ধ্বংস করা হয় নয়টি গ্রামের জুম্ম জনগণের সর্বস্ব।  পুড়িয়ে দেয়া হয় এক হাজার এগারটি ঘর, দু’টি স্কুল ও ৬টি ধর্মীয় মন্দির। পাহাড়ী জনগণ আজ এমন এক পর্যায়ে রয়েছে যে নিজ জন্মভূমিতে পরিচয়পত্র ছাড়া ঢুকতে পারে না।
এই হলো সরলপ্রাণ সংগ্রামী পাহাড়ী জাতিসত্তার জুম্ম জনগণের কাছে “গণতান্ত্রিক” বাংলাদেশ সরকার ও তার সেনাবাহিনীর চেহারা। কি অপরাধে এই ভয়াবহ দমন অভিযান? অপরাধ একটাই, তারা এই উগ্র জাতীয়তাবাদী বাঙালী শোষক ও শাসকদের ফ্যাসিস্ট নিপীড়ন থেকে মুক্তি চান, তারা তাদের জাতির উপর বাঙালী শোষকদের শোষণের অবসান চান, যুগ যুগ ধরে নিজস্ব বাসভূমি বলে পরিচিত পার্বত্য এলাকায় তারা জোরপূর্বক বসতকারী বাঙালীদের দ্বারা উচ্ছেদ হবার হুমকির অবসান চান। কিন্তু পাহাড়ী জনগণের এই ন্যায়সঙ্গত ক্ষোভকে পুঁজি করে সাহায্যের নামে এই জাতিসত্তার দিকে থাবা মেলে দিচ্ছে আরেক নিপীড়নকারী ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ- যারা শিখ, তামিল, গুর্খা, কাশ্মিরীসহ অনেক নিপীড়িত জাতির অস্তিত্ব বিলোপের চেষ্টায় নিয়োজিত। ভারতীয় সম্প্রসারণবাদীদের ষড়যন্ত্র-চক্রান্তের কারণেই পাহাড়ী জনগণের ন্যায্য সংগ্রাম বিপথে চালিত হচ্ছে।
বাঙালী শ্রমিক-কৃষক-বিপ্লবী বুদ্ধিজীবী ও সকল নিপীড়িত জনগণের দায়িত্ব হচ্ছে পাহাড়ী জনগণের ওপর শাসক শ্রেণী ও রাষ্ট্রযন্ত্রের শোষণ-নির্যাতনের প্রতিবাদ করা এবং পাহাড়ী জনগণের ন্যায্য সংগ্রামের পক্ষে দাঁড়ানো। কারণ একই শাসক-শোষক শ্রেণী, তাদের প্রভু মার্কিন-রুশ-ভারত এবং তাদের রাষ্ট্রযন্ত্র পুলিশ-মিলিটারি, আইন-প্রশাসন বাঙালী নিপীড়িত জনতারও শত্রু।  বাঙালী শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্ত জনগণের মুক্তির জন্য একই শত্রুর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে হচ্ছে ও হবে।  তাই পাহাড়ী ও বাঙালী নিপীড়িত জনগণের মুক্তি সংগ্রাম পরস্পরের মিত্র। লংগদু গণহত্যাসহ পার্বত্য চট্টগ্রামে সংঘঠিত সকল হত্যাযজ্ঞ ধ্বংসলীলা এবং বর্বর মধ্যযুগীয় নিপীড়ন-নির্যাতনের আমরা তীব্র নিন্দা করি।  আমরা আহ্বান জানাই, পাহাড়ী ও বাঙালী নিপীড়িত জনগণের যুক্ত সংগ্রামের।  যে সংগ্রাম মাওবাদের আদর্শে শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বে পরিচালিত হলেই শুধুমাত্র বর্বর ফ্যাসিস্ট অত্যাচারী এই শত্রুকে পরাজিত করতে পারবে।

সূত্রঃ পাহাড় ও সমতলে আদিবাসী জাতিসত্ত্বার সংগ্রাম সম্পর্কে নিবন্ধ সংকলন, আন্দোলন প্রকাশনা


মহান চীন বিপ্লবের নেত্রীঃ কমরেড মাদাম চিয়াং চিং

মাদাম চিয়াং চিং

 

মহান চীন বিপ্লবের নেত্রী

মাদাম চিয়াং চিং

পশ্চাৎপদ সামন্ততান্ত্রিক চীনা কৃষক নারীরা যখন শোষণ-নিপীড়নে অতিষ্ঠ হয়ে পুনর্জন্মে কুকুর হয়ে জন্মগ্রহণ করতে চাইতেন সেই পশ্চাৎপদ সমাজে সানতু প্রদেশের এক শ্রমজীবী পরিবারে ১৯১৪ সালে কমরেড চিয়াং চিং জন্মগ্রহণ করেন।
শৈশব থেকে দারিদ্র্য ও অনাহারে বেড়ে ওঠা চিয়াং চিং প্রথমে ক্ষুধা নিবারণের জন্য একটি নাট্যদলে যোগদান করেন এবং পরবর্তীতে রাজধানী পিকিং চলে আসেন।  এখানেই তার জীবনের মোড় পরিবর্তন হতে শুরু করে, যখন কিনা জাপানি সাম্রাজ্যবাদীরা মাঞ্চুরিয়া দখল করে নেয়।  ১৯৩১ সালে তিনি কমিউনিস্ট পার্টি দ্বারা পরিচালিত বামপন্থী নাট্যদলে যোগদান করেন। এবং ১৯৩৩ সালে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন।  কমরেড চিয়াং চিং-এর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তেমন না থাকলেও এ সময় তিনি মার্কসবাদ-লেনিনবাদের ওপর প্রচুর অধ্যয়ন করেন।  লাইব্রেরিতে চাকরিরত অবস্থায় সমাজবিজ্ঞানের উপর ব্যাপক পড়াশোনা ও গবেষণা করেন।
১৯৩৩-এর বসন্তে তাকে সাংহাইতে নিয়োগ করা হলো, যখন কিনা মাও-লাইনের প্রধান রাজনৈতিক বিরোধী ওয়াং মিং ও তার শহরকেন্দ্রিক লাইনের প্রভাবে পার্টি কাঠামো ধ্বংসপ্রায় এবং সুবিধাবাদ ছড়িয়ে পড়েছিল।  চিয়াং চিং সাংহাইতে প্রথম কাজ শুরু করেন মঞ্চ অভিনেত্রী হিসাবে।  এখানে তিনি কয়েকটি প্রগতিশীল নাটক মঞ্চস্থ করেন।  এতে দরিদ্র শ্রেণির জনগণের মাঝে ব্যাপক সাড়া পড়ে যায়।  একইসাথে তিনি নারী শ্রমিকদের মাঝেও কাজ করেন।  শ্রমিকদেরকে তিনি সচেতন করে তোলেন যে কীভাবে বৃটিশ ও জাপানি মালিকানাধীন কাপড়ের মিল ও সিগারেটের কারখানাগুলোতে শ্রমচুক্তির দুরবস্থা চলছে।  এখান থেকেই তিনি শত্রুর হাতে গ্রেফতার হন। আট মাস জেল খেটে তিনি জেলরক্ষীদের বোকা বানিয়ে পালিয়ে আসেন।
চিয়াং চিং যখন দেখেন যে, ২/৪টি চলচ্চিত্র বাদে সমস্ত চলচ্চিত্র পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রতিক্রিয়াশীল কেন্দ্র হলিউড দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, তখন তিনি আওয়াজ তোলেনঃ “জাতীয় বিপ্লবের জন্য জনগণের সাহিত্য”।  শিল্পকলার ক্ষেত্রে কমরেড মাও এই আওয়াজকে অনুমোদন করেন।  সাংহাই শহর জাপানিরা আক্রমণ করলে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির অষ্টম রুট বাহিনীতে তিনি যোগ দেন এবং ৩০০ মাইল পাহাড় পায়ে হেঁটে ইয়েনানে পৌঁছান।
১৯৩৮ সালের শেষের দিকে চিয়াং চিং মাও-এর সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।  পরবর্তীতে তাদের একটি কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণ করে।
এর পরবর্তী বছরগুলোতে চিয়াং চিং চীনা পার্টিতে একাগ্রচিত্তে কাজ করেছেন এবং শত্রুর বিরুদ্ধে মাও-এর পাশে থেকে লড়াই করেছেন। ১৯৪৯ সালে চীনা পার্টি ক্ষমতায় এলে তথা সর্বহারা শ্রেণির নেতৃত্বাধীন রাষ্ট্রক্ষমতা কায়েম হলে কমরেড চিয়াং চিং সাংহাইতে ভূমি সংস্কার কর্মসূচিতে সরাসরি অংশগ্রহণ করেন।  এ ক্ষেত্রেও তিনি নারীদেরকে অসম ভূমি, খারাপ ও পতিত ভূমি দেয়ার পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে ব্যাপক সংগ্রাম পরিচালনা করেন।  ১৯৫০ সালে চিয়াং চিং-এর গবেষণা ও অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল হিসাবে পশ্চাৎপদ চীনা নারীদের জন্য চীনা পার্টিতে সরকারিভাবে বিবাহ সংস্কার, স্বামী নির্বাচন, নারীদের তালাক দেয়ার অধিকার আইন গৃহীত হয়।
৬০-এর দশকের পূর্ব পর্যন্ত তিনি চীনা শিল্পকলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।  প্রতিক্রিয়াশীল শিল্পকলাতে তিনি আমূল বিপ্লবী রূপান্তর ঘটাতে সক্ষম হন।
১৯৬৬ থেকে ’৭৬ এই দশ বছর মাও-এর নেতৃত্বে পরিচালিত মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবে তিনি ছিলেন মাও-এর পাশে অন্যতম বলিষ্ঠ নেতৃত্ব।  চীনা কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যকার ঘাপটি মেরে থাকা বুর্জোয়া মতাদর্শধারীরা যদিওবা শর্তারোপ করেছিল চিয়াং চিং সরকারি কোন পদে অধিষ্ঠিত হতে পারবেন না।  কিন্তু চিয়াং চিং তার যোগ্যতা ও মাও-এর লাইনের প্রতি আনুগত্যতায় ঐ বুর্জোয়া পথগামীদের জবাব দিয়েছেন যখন তিনি ’৬৯ ও ’৭৩ সালে নবম ও দশম পার্টি কংগ্রেসে পলিটব্যুরোর সদস্য নির্বাচিত হন।
১৯৭৬ সালে ৯ সেপ্টেম্বর মাও সেতুঙ-এর মৃত্যুর পর মাও সেতুঙ-এর চিন্তাধারাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরা ও অব্যাহতভাবে সাংস্কৃতিক বিপ্লব চালিয়ে যাওয়ার তত্ত্ব শক্ত হাতে তুলে ধরলে এক মাসের মাথায় অক্টোবরে মাও-এর আদর্শ বর্জনকারী তেং-হুয়া চক্র ক্যু-দেতা করে চীনা পার্টি ও রাষ্ট্রের সমস্ত ক্ষমতা দখল করে।  তারা চিয়াং চিংসহ সাংস্কৃতিক বিপ্লবে মাও-এর প্রধান চার সহযোগী নেতৃত্বকে মিথ্যা অভিযোগে অভিযুক্ত করে বন্দী করে।  এই ভণ্ডরা ’৭৬ সালের তিয়েন-আন-মেন স্কোয়ারের দাঙ্গায় নগ্নভাবে উসকানি দিয়েছিল।  তারাই আবার এই দাঙ্গার জন্য চিয়াং চিং-কে অভিযুক্ত করে।
সংশোধনবাদী চক্র মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পতাকা বহনকারী মহান নেত্রী চিয়াং চিংকে ‘কুচক্রী’ আখ্যা দিয়ে মাও-লাইন তুলে ধরার নামে মাও-এর লাইনের প্রতি এক সর্বব্যাপী আক্রমণ চালায়। ’৮০/ ’৮১ সালব্যাপী এ প্রহসনমূলক বিচার চলে।  তেং চক্র আদালতে তার দোষ স্বীকার করতে বললে চিয়াং চিং বলেন, আদালতে আমি যদি কিছু স্বীকার করি তাহলে আমি বলবো ’৬৬ থেকে ’৭৬ এই দশ বছর সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে মরণপণ সংগ্রাম করেছি এবং তা মাও-এর নেতৃত্বেই।  আমি যা করেছি মাও তা সমর্থন করেছেন।

প্রসিকিউটর চিয়াং চিং-এর মৃত্যুদণ্ডের আবেদন করলে চিয়াং চিং দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, চেয়ারম্যান মাও একজন সেরা নারী কমরেডের মাঝে ৫টি গুণের সমাবেশ দেখতে চাইতেন-

. পার্টি থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার ভয়ে কখনও ভীত হয়ো না;

. যে পদে অধিষ্ঠিত হয়েছো সেখান থেকে চ্যুত হওয়ার ভয় পেয়ো না;

. বিবাহ বিচ্ছেদকে ভয় পেয়ো না;

. কারারুদ্ধ হতে হলেও ভীত হয়ো না;

. ফাঁসীর দড়িতে ঝুলতে হলেও তা হাসিমুখে বরণ করে নিও।

মহান মাও-এর এই পাঁচটি নির্দেশের চারটি আমি ইতিমধ্যেই পালন করেছি।  পঞ্চমটি বরণ করার জন্য আমি প্রস্তুত হয়েই আছি।  তিনি তেং-হুয়া চক্রের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে বলেন- তোমাদের সাহস থাকলে তিয়েন-আন-মেন স্কোয়ারে দশ লক্ষ জনগণের সামনে আমাকে ফাঁসি দাও।
দুই বছরেরও অধিক সময় বিচার চলার পর ’৮৩ সালে চিয়াং চিং-কে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়।
’৯০ সালে তেং চক্র প্রচার দেয় যে, চিয়াং চিং আত্মহত্যা করেছেন।
তেং চক্রের এই মিথ্যা প্রচারে বিশ্বের মাওবাদী পার্টি ও সংগঠনগুলো চিয়াং চিংকে বন্দী অবস্থায় হত্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায় এবং সংশোধনবাদী তেং চক্রের বিরুদ্ধে ধিক্কার জানায়।
বিশ্বের মাওবাদী কমিউনিস্ট বিপ্লবী আন্দোলনের ইতিহাসে এক মহিয়সী নেত্রীর নাম মাদাম চিয়াং চিং।

সূত্রঃ [নারী মুক্তি, ১নং সংখ্যায় প্রকাশিত ॥ ফেব্রুয়ারি, ’০৩], দেশে দেশে বিপ্লবী নারী সংকলন, বিপ্লবী নারী মুক্তি প্রকাশনা


লালগড়ে কৃষক আন্দোলন

4

লালগড়ে কৃষক আন্দোলন

সাম্প্রতিককালে ভারতের পশ্চিমবাংলায় লালগড়ের কৃষক আন্দোলন সবচাইতে সাড়া জাগানো ঘটনা। এই কৃষক আন্দোলন “লালগড় কৃষক আন্দোলন” নামে পরিচিত হলেও মূলত তা লালগড় তথা জঙ্গলমহলের কৃষক আন্দোলন। পশ্চিম মেদিনিপুর, বাঁকুড়া এবং পুরুলিয়া জেলা নিয়ে জঙ্গলমহল।  এই আান্দোলন পরিচালিত হচ্ছে ভারতের মাওবাদী পার্টির প্রভাবিত “জনসাধারণের কমিটি” দ্বারা।
এক হিসেবে লালগড়ের কৃষক আন্দোলন শুরু হয়েছিল এক ভিন্ন প্রসঙ্গে।  এটা শুরু হয় ৫ নভেম্বর, ২০০৮ তারিখে পুলিশের অমানবিক বর্বরতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে।  একই সাথে এটা অত্র অঞ্চলের জনগণ তথা আদিবাসীদের বহু পুরাতন বঞ্চনা, অপমানকর অবস্থার বিরুদ্ধে এবং তাদের আত্মসম্মান ও অধিকার আদায়ের সংগ্রাম।  অন্যদিকে কেউ যদি মনে করে, ২ নভেম্বর, ২০০৮ তারিখে পশ্চিমবাংলার মুখ্যমন্ত্রীর উপর মাওবাদী গেরিলাদের মাইন আক্রমণ এর অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে, সেটাও ঠিক।  ঐদিন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ভারতীয় শিল্পগোষ্ঠী জিন্দাল গ্রুপের শালবনী ইস্পাত কারখানা উদ্বোধন করতে গিয়েছিলেন।  সেই হিসেবে বলা যায়, এটা মুৎসুদ্দি বুর্জোয়াদের স্বার্থে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল তথা শিল্প স্থাপনের জন্য কৃষকের জমি দখলের বিরুদ্ধে আন্দোলনও বটে।
লালগড়ের আন্দোলনকে দমনের জন্য ১৮ জুন, ’০৯ থেকে ভারতীয় প্রতিক্রিয়াশীল রাষ্ট্রীয় যৌথ বাহিনী “অপারেশন লালগড়” নামে অভিযান শুরু করে।  কিন্তু তা ব্যর্থ হয়।  যদিও তারা ‘জনগণের কমিটি’র নেতা ছত্রধর মাহাতোকে সাংবাদিক সেজে সাক্ষাতকারের কথা বলে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়, কিন্তু এতে আন্দোলন উচ্চতর পর্যায়ে উপনীত হয়।  কমিটি “গণমিলিশিয়া” গঠনের ঘোষণা দেয়।  ২৭ অক্টোবর, ’০৯-এ সাঁওতাল বিদ্রোহের মহান শহীদ সিধু, কানু’র নামে তারা “সিধু-কানু গণমিলিশিয়া” গঠন করে সশস্ত্র প্রতিরোধ সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন।
আদিবাসী জনগণের আন্দোলন ও মাওবাদী গণযুদ্ধকে দমন করতে ব্যর্থ হয়ে এখন রাষ্ট্র নিজ জনগণের বিরুদ্ধে এক সর্বাত্মক যুদ্ধ ঘোষণা করেছে।  “অপারেশন গ্রিন হাণ্ট” নামে তারা লক্ষাধিক বিভিন্ন বাহিনী লালগড়সহ ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে নামিয়ে দিয়েছে।  কিন্তু লালগড়ের কৃষকসহ ভারতের নিপীড়িত কৃষক ও আদিবাসী জনগণ এই বর্বর অভিযানকে ব্যর্থ করে দেয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
লালগড় আন্দোলনের প্রত্যেকটি পর্যায়ের রয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য।  এটা শুধুমাত্র জমি দখলের বিরুদ্ধে আন্দোলন অথবা আদিবাসীদের অধিকার আদায় বা আদিবাসী জনগণের উপর পরিচালিত বহু পুরাতন অপমানকর অবস্থার বিরুদ্ধে আন্দোলনই নয়, বরং তার চাইতেও অনেক বেশি।  এই আন্দোলনের একটি অন্যতম দিক হচ্ছে জনগণের জন্য কল্যাণকর উন্নয়নের নতুন মডেল।
এই উন্নয়ন মডেলের কর্মসূচি হচ্ছে বৈদেশিক পুঁজি এবং প্রযুক্তি প্রত্যাখ্যান করা, স্বনির্ভরতা, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং সম্পত্তির ন্যায়সঙ্গত বণ্টন, খোদ কৃষকের হাতে জমি বিতরণ, জনগণের উদ্যোগ এবং স্বেচ্ছাশ্রমের উপর নির্ভর করে গ্রামীণ এলাকায় সর্বাত্মক উন্নয়ন এবং অর্থনীতি, সমাজ, সংস্কৃতি এবং রাজনীতির উপর বৈদেশিক প্রভাব এবং নিয়ন্ত্রণকে উচ্ছেদ করা।
ভ্রণাকারে হলেও জঙ্গলমহলে তথা লালগড়ে এসবের উদ্যোগ নেয়া শুরু হয়েছে।  এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য “পুলিশী নির্যাতনের বিরোধী জনসাধারণের কমিটি” গঠনের পরপরই গ্রাম কমিটি প্রতিষ্ঠা করা হয়।  এই কমিটিতে রয়েছে ৫ জন পুরুষ এবং ৫ জন নারী সদস্য।  যারা পারস্পরিক আলোচনার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।  এছাড়াও গ্রাম কমিটির রয়েছে নারী শাখা এবং যুব শাখা।   নারী শাখা হচ্ছে সম্পূর্ণ নতুন, যা নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়নের দৃষ্টান্ত।
ভ্রণাকারে হলেও কমিটি কর্তৃক সূচীত উন্নয়ন কর্মসূচির কিছু উপাদান নীচে উল্লেখ করা হলো-
. কৃষি ও জমি বিতরণঃ কমিটি বনের জমির উপর ভূমিহীন আদিবাসীদের পর্যাপ্ত সেচ সুবিধাসহ জমির অধিকার সংরক্ষণ করে এবং বহুজাতিক বীজ সংস্থাসমূহের আমন্ত্রণ জানানোর নীতির বিপরীতে বনের ছাই বা গোবরের সার ব্যবহার করে বীজ উৎপাদনের জন্য “বীজ সমবায়” প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হচ্ছে জমি বিতরণ। কমিটি ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে পরিবার প্রতি ১ বিঘা, কম জমির মালিক কৃষক পরিবারকে ১৫ কাঠা জমি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
. সেচঃ শুকনো জঙ্গলমহল এলাকায় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ খুবই কম। বর্ষাকাল শেষ হওয়ার পর জমিতে পানি সেচের জন্য সরকার ঝাড়খণ্ডের ময়ূরভঞ্জ থেকে মেদনিপুর শহর পর্যন্ত খাল খনন করেছে। কিন্তু নির্মাণ ত্রুটির জন্য খাল সারা বছরই শুকনো থাকে এবং জমিতে পানি দেয়ার পাইপের মুখ বন্ধ থাকে।  তাই কমিটি পানি সংরক্ষণের জন্য ছোট ছোট ড্যাম তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছে যাতে বর্ষা মৌসুমে এবং প্রাকৃতিক ঝর্ণার পানি সংরক্ষণ করে জমিতে সেচ দেয়া যায়। তেমনি এক ড্যাম তৈরি করা হচ্ছে বোহারডাঙ্গা গ্রামে।
. গণ-আদালতঃ প্রচলিত বিচার ব্যবস্থা শাসক শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষা করে।  তাই লালগড়ে “জনসাধারণের কমিটি” গণআদালত প্রতিষ্ঠা করেছে।  এখানে জনসাধারণের উপস্থিতিতে এবং তাদের মতামতের ভিত্তিতে বিচারকার্য সমাধা করা হয়।
. রাস্তা নির্মাণঃ লালগড় তথা জঙ্গলমহল অঞ্চলে রাস্তাঘাট নেই বললেই চলে।  যা-ও আছে সেগুলোও বর্ষা মৌসুমে পিচ্ছিল-কর্দমাক্ত হওয়ায় চলাচলের অনুপযুক্ত হয়ে পড়ে।  বস্তুত বর্ষাকালে অত্র অঞ্চল বহির্বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এমতাবস্থায় কমিটির উদ্যোগে স্থানীয় অধিবাসীদের স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য লাল সুড়কী দিয়ে রাস্তা নির্মাণ করেছে এবং করছে। রাস্তাগুলো নির্মাণ করা হয়েছে কোরেঙাপাড়া, শালডাঙা, বাহারডাঙা, পাপুরিয়া দারিগোড়াসহ অন্যান্য গ্রামে।
. পানি এবং স্বাস্থ্য সুবিধা প্রদানঃ শুকনো এবং ঊষর লালগড় অঞ্চলে খাওয়ার পানি এবং সেচের পানি পাওয়া খুবই কঠিন।  তাই কমিটি পানি সরবরাহের জন্য মিনি নলকূপ এবং ভূগর্ভস্থ পাম্প বসানোর উদ্যোগ নিয়েছে এবং জনগণ সেচ সুবিধার জন্য স্বেচ্ছাশ্রম দিচ্ছে।  অন্যদিকে জঙ্গলমহলের সমগ্র অঞ্চলে চিকিৎসা ব্যবস্থা খুবই নগণ্য।  তাই কমিটি উদ্যোগ নিয়ে কান্তাপাহাড়ী, বেলপাহাড়ী ও চাকডোবায় “গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র” স্থাপন করেছে।  সেগুলোতে ছিল এ্যাম্বুলেন্স এবং কলকাতা থেকে আগত একদল ডাক্তার।  সেখানে প্রতিদিন প্রায় ১৫০০ জন রোগী চিকিৎসার জন্য আসত।  স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলো বর্তমানে যৌথবাহিনীর ক্যাম্প হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
এছাড়াও শিক্ষা-সংস্কৃতি-সামাজিক সচেতনতা, পরিবেশ দূষণের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রাম ইত্যাদি কর্মসূচি বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে।
এখন লালগড়ের কৃষক আন্দোলন শুধুমাত্র জঙ্গলমহল অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নয়।  এর প্রেরণা এবং প্রভাব ভারতের অন্যান্য রাজ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে।  এছাড়াও এই আন্দোলন পৃথিবীর অন্যান্য দেশের গণতান্ত্রিক এবং শান্তিপ্রিয়, স্বাধীনতাকামী জনগণ প্রতিরোধের এক নতুন প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করেছে এবং করছে।  এই আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি গড়ে উঠছে পশ্চিমবাংলার শহরাঞ্চলে এবং অন্যান্য রাজ্যে।  একইসাথে যুক্তরাজ্য, গ্রিসসহ অন্যান্য রাষ্ট্রে এর সমর্থনে গণজমায়েত, জনসভা, সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
বাংলাদেশের কৃষকদেরও এই আন্দোলন থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য এগিয়ে যাওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই।  

 

সূত্রঃ কৃষক সমস্যা ও কৃষক সংগঠন সম্পর্কে, কৃষক মুক্তি সংগ্রাম কর্তৃক প্রকাশিত