লালগড়ে কৃষক আন্দোলন

4

লালগড়ে কৃষক আন্দোলন

সাম্প্রতিককালে ভারতের পশ্চিমবাংলায় লালগড়ের কৃষক আন্দোলন সবচাইতে সাড়া জাগানো ঘটনা। এই কৃষক আন্দোলন “লালগড় কৃষক আন্দোলন” নামে পরিচিত হলেও মূলত তা লালগড় তথা জঙ্গলমহলের কৃষক আন্দোলন। পশ্চিম মেদিনিপুর, বাঁকুড়া এবং পুরুলিয়া জেলা নিয়ে জঙ্গলমহল।  এই আান্দোলন পরিচালিত হচ্ছে ভারতের মাওবাদী পার্টির প্রভাবিত “জনসাধারণের কমিটি” দ্বারা।
এক হিসেবে লালগড়ের কৃষক আন্দোলন শুরু হয়েছিল এক ভিন্ন প্রসঙ্গে।  এটা শুরু হয় ৫ নভেম্বর, ২০০৮ তারিখে পুলিশের অমানবিক বর্বরতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে।  একই সাথে এটা অত্র অঞ্চলের জনগণ তথা আদিবাসীদের বহু পুরাতন বঞ্চনা, অপমানকর অবস্থার বিরুদ্ধে এবং তাদের আত্মসম্মান ও অধিকার আদায়ের সংগ্রাম।  অন্যদিকে কেউ যদি মনে করে, ২ নভেম্বর, ২০০৮ তারিখে পশ্চিমবাংলার মুখ্যমন্ত্রীর উপর মাওবাদী গেরিলাদের মাইন আক্রমণ এর অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে, সেটাও ঠিক।  ঐদিন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ভারতীয় শিল্পগোষ্ঠী জিন্দাল গ্রুপের শালবনী ইস্পাত কারখানা উদ্বোধন করতে গিয়েছিলেন।  সেই হিসেবে বলা যায়, এটা মুৎসুদ্দি বুর্জোয়াদের স্বার্থে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল তথা শিল্প স্থাপনের জন্য কৃষকের জমি দখলের বিরুদ্ধে আন্দোলনও বটে।
লালগড়ের আন্দোলনকে দমনের জন্য ১৮ জুন, ’০৯ থেকে ভারতীয় প্রতিক্রিয়াশীল রাষ্ট্রীয় যৌথ বাহিনী “অপারেশন লালগড়” নামে অভিযান শুরু করে।  কিন্তু তা ব্যর্থ হয়।  যদিও তারা ‘জনগণের কমিটি’র নেতা ছত্রধর মাহাতোকে সাংবাদিক সেজে সাক্ষাতকারের কথা বলে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়, কিন্তু এতে আন্দোলন উচ্চতর পর্যায়ে উপনীত হয়।  কমিটি “গণমিলিশিয়া” গঠনের ঘোষণা দেয়।  ২৭ অক্টোবর, ’০৯-এ সাঁওতাল বিদ্রোহের মহান শহীদ সিধু, কানু’র নামে তারা “সিধু-কানু গণমিলিশিয়া” গঠন করে সশস্ত্র প্রতিরোধ সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন।
আদিবাসী জনগণের আন্দোলন ও মাওবাদী গণযুদ্ধকে দমন করতে ব্যর্থ হয়ে এখন রাষ্ট্র নিজ জনগণের বিরুদ্ধে এক সর্বাত্মক যুদ্ধ ঘোষণা করেছে।  “অপারেশন গ্রিন হাণ্ট” নামে তারা লক্ষাধিক বিভিন্ন বাহিনী লালগড়সহ ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে নামিয়ে দিয়েছে।  কিন্তু লালগড়ের কৃষকসহ ভারতের নিপীড়িত কৃষক ও আদিবাসী জনগণ এই বর্বর অভিযানকে ব্যর্থ করে দেয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
লালগড় আন্দোলনের প্রত্যেকটি পর্যায়ের রয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য।  এটা শুধুমাত্র জমি দখলের বিরুদ্ধে আন্দোলন অথবা আদিবাসীদের অধিকার আদায় বা আদিবাসী জনগণের উপর পরিচালিত বহু পুরাতন অপমানকর অবস্থার বিরুদ্ধে আন্দোলনই নয়, বরং তার চাইতেও অনেক বেশি।  এই আন্দোলনের একটি অন্যতম দিক হচ্ছে জনগণের জন্য কল্যাণকর উন্নয়নের নতুন মডেল।
এই উন্নয়ন মডেলের কর্মসূচি হচ্ছে বৈদেশিক পুঁজি এবং প্রযুক্তি প্রত্যাখ্যান করা, স্বনির্ভরতা, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং সম্পত্তির ন্যায়সঙ্গত বণ্টন, খোদ কৃষকের হাতে জমি বিতরণ, জনগণের উদ্যোগ এবং স্বেচ্ছাশ্রমের উপর নির্ভর করে গ্রামীণ এলাকায় সর্বাত্মক উন্নয়ন এবং অর্থনীতি, সমাজ, সংস্কৃতি এবং রাজনীতির উপর বৈদেশিক প্রভাব এবং নিয়ন্ত্রণকে উচ্ছেদ করা।
ভ্রণাকারে হলেও জঙ্গলমহলে তথা লালগড়ে এসবের উদ্যোগ নেয়া শুরু হয়েছে।  এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য “পুলিশী নির্যাতনের বিরোধী জনসাধারণের কমিটি” গঠনের পরপরই গ্রাম কমিটি প্রতিষ্ঠা করা হয়।  এই কমিটিতে রয়েছে ৫ জন পুরুষ এবং ৫ জন নারী সদস্য।  যারা পারস্পরিক আলোচনার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।  এছাড়াও গ্রাম কমিটির রয়েছে নারী শাখা এবং যুব শাখা।   নারী শাখা হচ্ছে সম্পূর্ণ নতুন, যা নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়নের দৃষ্টান্ত।
ভ্রণাকারে হলেও কমিটি কর্তৃক সূচীত উন্নয়ন কর্মসূচির কিছু উপাদান নীচে উল্লেখ করা হলো-
. কৃষি ও জমি বিতরণঃ কমিটি বনের জমির উপর ভূমিহীন আদিবাসীদের পর্যাপ্ত সেচ সুবিধাসহ জমির অধিকার সংরক্ষণ করে এবং বহুজাতিক বীজ সংস্থাসমূহের আমন্ত্রণ জানানোর নীতির বিপরীতে বনের ছাই বা গোবরের সার ব্যবহার করে বীজ উৎপাদনের জন্য “বীজ সমবায়” প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হচ্ছে জমি বিতরণ। কমিটি ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে পরিবার প্রতি ১ বিঘা, কম জমির মালিক কৃষক পরিবারকে ১৫ কাঠা জমি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
. সেচঃ শুকনো জঙ্গলমহল এলাকায় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ খুবই কম। বর্ষাকাল শেষ হওয়ার পর জমিতে পানি সেচের জন্য সরকার ঝাড়খণ্ডের ময়ূরভঞ্জ থেকে মেদনিপুর শহর পর্যন্ত খাল খনন করেছে। কিন্তু নির্মাণ ত্রুটির জন্য খাল সারা বছরই শুকনো থাকে এবং জমিতে পানি দেয়ার পাইপের মুখ বন্ধ থাকে।  তাই কমিটি পানি সংরক্ষণের জন্য ছোট ছোট ড্যাম তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছে যাতে বর্ষা মৌসুমে এবং প্রাকৃতিক ঝর্ণার পানি সংরক্ষণ করে জমিতে সেচ দেয়া যায়। তেমনি এক ড্যাম তৈরি করা হচ্ছে বোহারডাঙ্গা গ্রামে।
. গণ-আদালতঃ প্রচলিত বিচার ব্যবস্থা শাসক শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষা করে।  তাই লালগড়ে “জনসাধারণের কমিটি” গণআদালত প্রতিষ্ঠা করেছে।  এখানে জনসাধারণের উপস্থিতিতে এবং তাদের মতামতের ভিত্তিতে বিচারকার্য সমাধা করা হয়।
. রাস্তা নির্মাণঃ লালগড় তথা জঙ্গলমহল অঞ্চলে রাস্তাঘাট নেই বললেই চলে।  যা-ও আছে সেগুলোও বর্ষা মৌসুমে পিচ্ছিল-কর্দমাক্ত হওয়ায় চলাচলের অনুপযুক্ত হয়ে পড়ে।  বস্তুত বর্ষাকালে অত্র অঞ্চল বহির্বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এমতাবস্থায় কমিটির উদ্যোগে স্থানীয় অধিবাসীদের স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য লাল সুড়কী দিয়ে রাস্তা নির্মাণ করেছে এবং করছে। রাস্তাগুলো নির্মাণ করা হয়েছে কোরেঙাপাড়া, শালডাঙা, বাহারডাঙা, পাপুরিয়া দারিগোড়াসহ অন্যান্য গ্রামে।
. পানি এবং স্বাস্থ্য সুবিধা প্রদানঃ শুকনো এবং ঊষর লালগড় অঞ্চলে খাওয়ার পানি এবং সেচের পানি পাওয়া খুবই কঠিন।  তাই কমিটি পানি সরবরাহের জন্য মিনি নলকূপ এবং ভূগর্ভস্থ পাম্প বসানোর উদ্যোগ নিয়েছে এবং জনগণ সেচ সুবিধার জন্য স্বেচ্ছাশ্রম দিচ্ছে।  অন্যদিকে জঙ্গলমহলের সমগ্র অঞ্চলে চিকিৎসা ব্যবস্থা খুবই নগণ্য।  তাই কমিটি উদ্যোগ নিয়ে কান্তাপাহাড়ী, বেলপাহাড়ী ও চাকডোবায় “গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র” স্থাপন করেছে।  সেগুলোতে ছিল এ্যাম্বুলেন্স এবং কলকাতা থেকে আগত একদল ডাক্তার।  সেখানে প্রতিদিন প্রায় ১৫০০ জন রোগী চিকিৎসার জন্য আসত।  স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলো বর্তমানে যৌথবাহিনীর ক্যাম্প হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
এছাড়াও শিক্ষা-সংস্কৃতি-সামাজিক সচেতনতা, পরিবেশ দূষণের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রাম ইত্যাদি কর্মসূচি বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে।
এখন লালগড়ের কৃষক আন্দোলন শুধুমাত্র জঙ্গলমহল অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নয়।  এর প্রেরণা এবং প্রভাব ভারতের অন্যান্য রাজ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে।  এছাড়াও এই আন্দোলন পৃথিবীর অন্যান্য দেশের গণতান্ত্রিক এবং শান্তিপ্রিয়, স্বাধীনতাকামী জনগণ প্রতিরোধের এক নতুন প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করেছে এবং করছে।  এই আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি গড়ে উঠছে পশ্চিমবাংলার শহরাঞ্চলে এবং অন্যান্য রাজ্যে।  একইসাথে যুক্তরাজ্য, গ্রিসসহ অন্যান্য রাষ্ট্রে এর সমর্থনে গণজমায়েত, জনসভা, সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
বাংলাদেশের কৃষকদেরও এই আন্দোলন থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য এগিয়ে যাওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই।  

 

সূত্রঃ কৃষক সমস্যা ও কৃষক সংগঠন সম্পর্কে, কৃষক মুক্তি সংগ্রাম কর্তৃক প্রকাশিত

Advertisements


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s