ঔপনিবেশিক শাসনে উপমহাদেশের কৃষক বিদ্রোহের ইতিবৃত্ত

1510781_1481091348815761_7017208334635810818_n

ঔপনিবেশিক শাসনে উপমহাদেশের কৃষক বিদ্রোহের ইতিবৃত্ত

[পশ্চিম বঙ্গের একজন শ্রেণি সচেতন রাজনৈতিক লেখক স্বপন কুমার চক্রবর্তী। স্বপন কুমার চক্রবর্তীর একটি অপ্রকাশিত পান্ডুলিপির একটি কপি সেবা কর্তৃপক্ষের হাতে আসে। বর্তমান লেখাটি সেই অপ্রকাশিত পান্ডুলিপির অংশ বিশেষ। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির দখলকৃত ভারতে কৃষক জনগণ ঔপনিবেশিক শক্তির শোষণ নির্যাতন দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে যে বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম চালিয়েছেন লেখকের করমের ছোঁয়ায় তা প্রাঞ্জল হয়ে উঠেছে। এখনও যারা এদেশে সাম্রাজ্যবাদ সামন্তবাদ বিরোধী লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন এই লেখা তাদের অনুপ্রেরণার খোরাক যোগাতে পারে। এই লেখার বস্তুনিষ্ঠতা বিবেচনা করে লেখাটি প্রকাশ করা হলো- সম্পাদক, সাপ্তাহিক সেবা]

সন্নাসী/ফকির বিদ্রোহ (১৭৬৩-১৮০০)
পলাসী ষড়যন্ত্রে সিরাজের পরাজয় ইংল্যান্ডে নথিভুক্ত ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’উপমহাদেশের দুইটি গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশ- বাংলা ও বিহার দখলের পথ সুগম করে। প্রায় বিনা বাধায় বাংলা ও বিহারের স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রামীণ সমাজের সমস্ত পরিকাঠামো ধাপে ধাপে ভাঙ্গিয়া গুড়াইয়া দেওয়া হয়।

বাংলা ও বিহারে বিদেশি ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে প্রথম যে রক্তক্ষয়ী কৃষক বিদ্রোহ শুরু হয় ১৭৬৩ সালে তাহা চলমান চিল ১৮০০ সাল পর্যন্ত। উপমহাদেশের আধুনিক ইতিহাসে এই বিদ্রোহ সন্নাসী/ফকির বিদ্রোহ নামে পরিচিত। কেন বলে সন্নাসী বিদ্রোহ- এ প্রশ্নের উত্তর সুকঠিন। কারণ তৎকালীন বাংলা ও বিহারে বসবাসকারী শিক্ষিত সম্প্রদায় এতদ সংক্রান্ত কোন ইতিহাস লিখিয়া যান নাই।
এই বিদ্রোহের কারণ সম্পর্কে আমরা এ পর্যন্ত যা গবেষণা বা অনুসন্ধানে আমরা জানিয়াছি তাহা হইল ইংরেজ কর্মচারীদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে পাঠানো কিছু চিঠি, রিপোর্ট, সে সময়ের কিছু সাময়িকপত্র ইত্যাদি। পত্রাবলীগুলিতে ব্যাপক কৃষক বিদ্রোহের আভাস দেওয়া আছে এবং এই সমস্ত সশস্ত্র কৃষক যুদ্ধকে সন্নাসীদের আক্রমণ বলিয়া অধস্তন কর্তৃক ঊর্ধ্বতনকে পাঠানো পত্র, রিপোর্টে উল্লেখ আছে।
মোঘল শাসনের মধ্য ও অন্তিম ক্ষণে উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সন্নাসী ও ফকির সম্প্রদায়ের লোকেরা দলবদ্ধভাবে জমিজমা দখল বা দান হিসাবে প্রাপ্ত ভূমিতে ফসল ফলাইয়া কৃষকে পরিণত হয়। কিন্তু কৃষিকে জীবন ধারনের উপায় হিসাবে অবলম্বন করা সত্ত্বেও নিজেদের সংস্কার, পোশাক পরিচ্ছদ ত্যাগ করে নাই। বৎসরের বিভিন্ন সময় তাহারা দলবদ্ধভাবে তীর্থ ভ্রমণে নির্গত হইত। উত্তরবঙ্গ, পূর্ববঙ্গ, বিহার সর্বত্র দলবদ্ধভাবে তীর্থ ভ্রমণ ইহাদের সংস্কৃতির অঙ্গ ছিল কৃষকে রূপান্তরিত হওয়ার পরেও। ইংরেজ শাসনের আগেও কোন শাসক দলবদ্ধভাবে তীর্থ ভ্রমণে বাধা দান করে নাই। ইংরেজ শাসক ও তার দালালরা মাথাপিছু তীর্থ যাত্রীদের নামে কর আদায়ের নামে অর্থ লুণ্ঠন শুরু করে। এরা ছিল কৃষক আবার সন্নাসী ও ফকির- ভূমির খাজনা ও তীর্থ যাত্রার কর এই দুই কৌশলের শোষণ ও উৎপীড়নের যাতাকলে পিষ্ঠ হইয়া ফকির সন্নাসীরা বাঁচার অন্য কোন উপায় না থাকার জন্য বিদ্রোহের পথ বাছিয়া নেয়।

পলাশী যুদ্ধের মাত্র ৬ বছর পর অত্যাচারে উৎপীড়নে সর্বস্বান্ত হয়ে বাংলা ও বিহারের কৃষক, কর্মহারা কারিগর, ফকির সন্নাসীরা দেশ ও দেশকে বাঁচাইবার স্বার্থে সশস্ত্র বিদ্রোহের আগুন জ্বালাইয়া দিলেন। বিদেশি শোষক শাসকদের বিরুদ্ধে এই বিদ্রোহ ছিল সন্নাসী ফকির, কারিগর, কৃষকদের জীবন রক্ষার লড়াই। তৎকালীন ইংরেজ কর্মচারীদের লিখিত পত্র এবং রিপোর্টে ইহাই প্রমাণ করে যে, বিদ্রোহীরা কখনও সাধারণ কৃষকের ধন সম্পত্তি স্পর্শ করেন নাই। সন্নাসী ফকিরদের দলবল কেবলমাত্র ইংরেজ ও তার দেশীয় দোসরদের অর্থ সম্পত্তি কাড়িয়া লইতেন এবং বিত্তশালীদের নিকট হইতে কর আদায় করিয়া সশস্ত্র সংগ্রামের খরচ চালাইতেন। ইহাও উল্লেখ করা যায় বিদ্রোহের নায়কগণ সাধারণ মানুষের ওপর কোন প্রকার উৎপীড়ন না চালাইবার জন্য কঠোর নির্দেশ দিয়াছিলেন।
ওয়ারেন হেস্টিংস বিদ্রোহী কৃষক সন্নাসী ফকির বিদ্রোহ সম্পর্কে মিথ্যা প্রচার করিয়া লিখিয়াছিলেন, ‘হিন্দুস্তানের পেশাদার যাযাবর দের পেশাদারী উপদ্রব, দস্যুতা, ডাকাতি।

স্যার W.W.Hunter- Anals of rural Bengal গ্রন্থে লিখিয়াছেন বিদ্রোহীরা প্রকৃতপক্ষে বেকার হওয়া মোঘল সৈনিকের দল, এরা জমিহার, গৃহহারা, কর্মহীন, কৃষক। অন্ন, বস্ত্র, গৃহহীন কৃষক ও কর্মহীন সৈনিকরা বাঁচার শেষ রাস্তা হিসাবে বিদ্রোহকেই বাছিয়া লইয়াছিল। এই গৃহহারা সর্বহারা কৃষক সৈনিকেরা দলবদ্ধভাবে ফকির ও সন্নাসীর রূপ ধারণ করিয়া বিদ্রোহের উদ্দেশ্যে স্থানান্তরে ঘুরিত।
শুধু অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান কর্মের উদ্দেশ্যেই তাহারা সন্নাসী ফকির হইত না। সন্নাসী ফকিরবৃন্দ যেমন এই বিদ্রোহে যোগদান করিয়া যেমন সামরিক শক্তি বৃদ্ধির সহায়ক হইয়াছে, আবার অপর এক মহান উদ্দেশ্যে তারা গৃহত্যাগী, সর্বত্যাগী হইয়াছিলেন, অর্থাৎ বিদেশি শাসনের কবল হইতে দেশকে স্বাধীন করা। এই ঘটনা সত্য, ঢাকার রমনা কালীবাড়ির স্বামীজি সন্নাসীদের রণধ্বনি ‘ওঁ বন্দেমাতরম’শুনিয়া ছিলেন। এই মহান বিদ্রোহের নায়ক ছিলেন মজনু শাহ, ভবানী পাঠক, দেবী চৌধুরানী। এদের উদার আহ্বানে দ্বিতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামে শক্তি বৃদ্ধির জন্য বহু সংখ্যক সাধারণ কৃষকও এ সংগ্রামে যোগদান করেন।

মজনু শাহ ছিলেন এই সংগ্রামের প্রাণ স্বরূপ। বাংলা ও বিহারের কৃষক তাহার নামে বল ভরসা পাইতেন। ইংরেজ শাসক, তার বশংবদ অনুচরদের মজনুর নামে থরেহরি কম্প উঠিত। মজনু শাহের সংগঠনের সীমা ছিল বিহারের প্রান্ত হইতে পূর্ব বঙ্গের ময়মনসিংহ জেলা। স্বাভাবিকভাবে সম্প্রসারিত আন্দোলনের জন্য ব্যাপক সংহতি গড়ার কাজটি মজনু শাহ নিজেই করিতেন। অনেক জমিদারকেও তিনি বিদ্রোহে যোগদানের আহ্বান করিয়াছিলেন, কিন্তু তাহারা ইংরেজ শক্তির সাহায্য লইয়া বিদ্রোহকে ধ্বংসের চেষ্টা করেন।

বিদ্রোহের প্রথম পর্ব
সম্পূর্ণ গেরিলা কায়দায় ছোট ছোট দলে বিভক্ত হইয়া রাতের ঘন অন্ধকারে চারপাশ হইতে ঢাকার কুঠি বিদ্রোহীরা ঘিরিয়া ফেলিল। কলকাতার কুঠির পরেই ছিল ঢাকার কুঠি। বিদেশি ইংরেজ বণিকদের শোষণের মূল ঘাঁটি ছিল এই কুঠিগুলি। বাংলা ও বিহারের কৃষকদের সর্বস্বান্ত করা এবং নির্যাতন, ষড়যন্ত্র, অত্যাচারের শিরমনি এই কুঠিগুলি উচ্ছেদের জন্য ফকির সন্নাসীরা আগেই নিজেদের শক্তির সমাবেশ ঘটাইয়াছিল। ইংরেজ রাজশক্তির সাহায্যে বণিকরা ঢাকা ও তার আশেপাশের অঞ্চলে প্রস্তুত মহার্থ, কেলিকো, মসলিন বস্ত্র জোর করিয়া নামমাত্র মূল্যে তাঁতিদের নিকট হইতে কাড়িয়া লইত। নামমাত্র মূল্যে তাঁতিদের সহিত অল্প সময়ের মধ্যে বেশি কাপড় রপ্তানির চুক্তি করিত। সেই চুক্তি যত কাপড় সরবরাহে সক্ষম না হইলে বা চুক্তি ভঙ্গ হইলে তাঁতিকে হিং¯্র অত্যাচার বা কুঠিতে বন্দী করিয়া রাখা হইত। খুব সম্ভব কোন সন্নাসী বা ফকির নেতা এই তাঁতিদের ঐক্যবদ্ধ করে, অত্যাচার, লুণ্ঠনের কেন্দ্র ঢাকার কুঠিকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে। সন্নাসী ফকিরদের দূরদর্শিতার তুলনা নাই।

রমনা কালীবাড়ির মারাঠি স্বামীজীর বিবরণ অনুসারে ফকির সন্নাসীরা ‘বন্দে মাতারম’ ধ্বনি দিতে দিতে কুঠি আক্রমণ করে। শক্তিশালী ঢাকার কুঠিতে আগে হইতেই বহু পাইক, বরকন্দাজ, সিপাহী, কামান ইত্যাদি আত্মরক্ষার জন্য প্রস্তুত রাখিয়াছিল। কিন্তু সময়কালে কিছুই কাজে লাগিল না।

কুঠি ঘেরাও সম্পূর্ণ হইবার পর হঠাৎ বিদ্রোহীরা চতুর্দিক হইতে প্রবল আক্রমণ হানিল। অসহায় ইংরেজ লড়াই করিবার পরিবর্তে রাতের অন্ধকারে নৌকাযোগে কুঠির পিছন দিয়া পালায়ন করে। অকষ্মাৎ আক্রমণে দিশেহারা সিপাহীরা যুদ্ধ করিবার পরিবর্তে সাহেবদের পালায়নের পূর্বেই নিজেরা পালায়নের মাধ্যমে আত্মরক্ষাতে সমর্থ হয়।

রবার্ট কাইভ তখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বড়বাবু। এই ঘটনায় ক্রুদ্ধ, ক্ষুব্ধ কাইভ কাপুরুষ কুঠিয়াল র‌্যাফল লিস্টারকে বরখাস্ত করেন। হঠাৎ আক্রমণে হতভম্ব ইংরেজরা মাত্র ১ ঘণ্টায় পরাজিত ও বন্দী হয়। বিদ্রোহীরা তাদের সকল সম্পদ, টাকা, অনেক গুলি, কামান বন্দুক হস্তগত করে। ১৭৬৩ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত কুঠি বিদ্রোহীদের দখলে ছিল। মাসের শেষ দিকে ইংরেজ সেনাপতি ক্যাপ্টেন গ্রান্ট বহু সৈন্য ও অস্ত্রে সজ্জিত হইয়া ভয়নক যুদ্ধে কুঠি পুনরায় দখল করেন। পূর্ববঙ্গের বিদ্রোহীদের ওপর ইংরেজ আক্রমণের তীব্রতা বাড়িতে থাকিলে বিদ্রোহীরা উত্তর বঙ্গে সরিয়া যায়। বিদ্রোহীদের দ্বিতীয় আক্রমণ ঘটে রাজশাহীতে।

রামপুর- বোয়ালিয়ায় ইংরেজ কুঠিতে ১৭৬৩ সালের মার্চ মাসে বিদ্রোহীরা ব্যাপক আক্রমণ চালাইয়া কুঠির সমস্ত ধন সম্পদ লুণ্ঠন করেন, চলিয়া যাইবার সময় কুঠিয়াল বেনেট সাহেবকে বন্দী করিয়া পাটনা কেন্দ্রে প্রেরণ করেন, পাটনার বিদ্রোহীরা তাহাকে নির্মমভাবে হত্যা করিয়া অত্যাচারের প্রতিশোধ নেয়। ১৭৬৪ সালে পুনরায় রামপুর বোয়ালিয়ার কুঠি আক্রমণ করিয়া বিদ্রোহীরা ইংরেজ বণিক এবং স্থানীয় জমিদারদের সকল সম্পত্তি লুট করে। কোচবিহারের সেনাপতি রুদ্র নারায়ণ এবং রাজবংশের প্রকৃত দাবিদারের মধ্যে উত্তরাধিকার লইয়া প্রকৃতই গুরুতর মত পার্থক্য দেখা দেয়। রুদ্র নারায়ণ ইংরেজ ব্যবসায়ীদের নানা রকম ব্যবসায় প্রলোভন দেখাইয়া তাহাদের সাহায্য চায়। ইংরেজরা এই সুযোগ তাহাদের নিজেদের কাজে লাগাইবার কূট উদ্দেশ্যে বিপুল অস্ত্রশস্ত্রসহ লেফটেনেন্ট মরিসনের নেতৃত্বে একদল সৈন্য প্রেরণ করে। এদিকে অন্য কোন উপায় না থাকায় রাজবংশের প্রকৃত উত্তরাধিকারী ফকির সন্নাসীদের সাহায্য চায়। ইংরেজ সৈন্য কোচবিহারে পৌঁছানোর আগেই কোচবিহার দখল করিয়া নেয়।

১৭৬৬ সালে দিনহাটায় ফকির সন্নাসীদের নেতা রমানন্দ গোঁসাইয়ের বাহিনীর সাথে মরিসনের বাহিনীর প্রবল যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে বিদ্রোহীরা পশ্চাৎ অপসারণ করেন। দুই দিন পরে পুনরায় মরিসনের সহিত যুদ্ধে বিদ্রোহীরা পরাজিত হইয়া আবার সরিয়া যাইতে বাধ্য হয়। সম্মুখ যুদ্ধে জয় অসম্ভব বুঝিয়া, বিদ্রোহীরা ছোট ছোট দলে বিভক্ত হইয়া গ্রামবাসীদের সাহায্যে গেরিলা যুদ্ধের কৌশল অবলম্বন করেন। এই কৌশলে ইংরেজ শক্তি হতভম্ভ হইয়া মনে করে বিদ্রোহীরা বুঝি পরাজিত এবং ছত্রভঙ্গ হইয়া গিয়াছে। তাই ইংরেজ বাহিনী চারিদিক দিয়া বিভিন্ন গ্রামে বিদ্রোহীদের পাকড়াও করিবার উদ্দেশ্যে অভিযান চালায়। ইংরেজ সৈন্যরা গ্রামে প্রবেশ করিলে বিদ্রোহীরা তাহাদের নিকেশ করে। এইভাবে ইংরেজরা দুর্বল হইয়া গেলে ১৭৬৬ সালের আগস্ট মাসে মরিসন বাহিনীর সহিত ৪০০ বিদ্রোহীর সম্মুখ মরণপণ যুদ্ধে ইংরেজ সৈন্য সম্পূর্ণরূপে পরাজিত হইয়া ছত্রভঙ্গ হইয়া যায়।
১৭৬৭ সালে ফকির সন্নাসী বিদ্রোহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র পাটনা ও তার আশে পাশে এক বিরাট শক্তিশালী দল গঠন করিয়া মজনু শাহ ও তার দলবল ইংরেজদের পাটনার মূল কুঠি লুট করে এবং তাদের বশংবদ জমিদারবর্গের ধন সম্পদ বাজেয়াপ্ত করিয়া খাজনা আদায় বন্ধ করিয়া দেয়। বিহারের সারণ জেলায় বিদ্রোহী বাহিনীর সহিত ইংরেজ বাহিনীর এক ভীষণ যুদ্ধ হয়, বিদ্রোহীরা রশিদপুর দুর্গ দখল করে।
হিমালয়ের পাদদেশে বনজঙ্গল অধ্যুষিত অঞ্চলে বিদ্রোহীরা সমবেত হয়। সন্নাসী বিদ্রোহের প্রধান ঘাঁটি তখন উত্তরবঙ্গ। ১৭৬৬ সালে উত্তরবঙ্গের নেপাল সীমায় ইংরেজ বণিকদের প্রতিনিধি মার্টেল সাহেব কাঠ কাটিতে গিয়া দলবলসহ বিদ্রোহীদের হাতে বন্দী হয়, পরে বিচারের মাধ্যমে তার মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়।

সন্নাসী বিদ্রোহের নেতৃত্ব সিদ্ধান্ত নিলেন উত্তরবঙ্গের ইংরেজদের সমস্ত কুঠি ধূলিস্যাৎ করিয়া নিশ্চিহ্ন করিয়া দিবেন। সিদ্ধান্ত মোতাবেক ফকির সন্নাসীদের বাছাই করা বিদ্রোহীদের লইয়া মজনু শাহের নেতৃত্বে এক বিরাট দল ইংরেজ কুঠি নিশ্চিহ্ন করিবার প্রস্তুতি শুরু করিলেন। প্রথমে বিদ্রোহীরা রাজশাহী জেলার সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ কুঠিগুলি আক্রমণ করিয়া ধ্বংস করিয়া দিলেন। তারপর তাহারা দিনাজপুরের কুঠি ধ্বংস করার কাজে হাত লাগাইলেন। উত্তরবঙ্গের হাজার হাজার মিলিত কৃষক কারিগরদের মিলিত বাহিনী এই দুই জেলায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন উৎখাত করিল। বিদ্রোহীরা অতঃপর রংপুর অভিযান শুরু করিল। চর মারফত ইংরেজ বাহিনী ক্যাপ্টেন টমাস এর নেতৃত্বে একটি বিশাল বাহিনী সন্নাসী বিদ্রোহীদের ধ্বংস সাধনের উদ্দেশ্যে এক গোপন পথে যাত্রা আরম্ভ করে।

স্থানীয় জনতা এই সংবাদ বিদ্রোহী জনতার কাছে পৌঁছাইয়া দেন। ইংরেজ বাহিনী রংপুরে পৌঁছাইবার পূর্বেই বিদ্রোহীরা তাদের উচিত শিক্ষা দিতে প্রস্তুত হয়। ১৭৭২ সালে জাফরগঞ্জে উভয় বাহিনী মুখোমুখি হয়। বিদ্রোহীরা উপলব্ধি করে এই সীমিত সংখ্যক বাহিনী আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত ইংরেজ বাহিনীর মুখোমুখি লড়াইয়ের নিশ্চিত পরাজয়, তাই বিদ্রোহীরা পশ্চাৎ অপসারণ করিয়া ইংরেজ বাহিনীকে গ্রামের ভিতরে টানিয়া আনিতে প্রলুব্ধ করে। এই কৌশল সফল হয়। প্রথম আক্রমণে ইংরেজরা ভাবে বিদ্রোহীরা পরাজিত হইয়াছে, ইংরেজরা অতিরিক্ত গোলাবারুদ ব্যবহার করিল, ইহাতে বিদ্রোহীরাই লাভবান হইল। ইংরেজ বাহিনীর গোলাবারুদ নিঃশেষ হইয়া আক্রমণ নিস্তেজ হওয়ামাত্র দলবদ্ধভাবে সন্নাসীরা পালায়নপর ইংরেজ সৈন্যদের পিছু ধাওয়া করিয়া গ্রামবাসীদের সহায়তায় ও সক্রিয়তায় তাদের নিকেশ করিল। অতি বীরত্ব দেখাইতে গিয়া সেনাপতি টমাস সাহেব এই যুদ্ধে নিহত হন।

একের পর এক যুদ্ধে সন্নাসী যোদ্ধারা রাজশাহী, রংপুর, দিনাজপুর প্রভৃতি জেলার বৃহত্তর অংশে ইংরেজ কোম্পানির শাসন বিলুপ্ত করিল। এবার তারা বগুড়া জেলার দুটি কুঠি লুট ও ধবংশ করিল। পর পর কয়েকটি জেলায় সন্নাসীদের আক্রমণ ও সাফল্য লাভে ইংরেজ বণিক আতঙ্কে দিশেহারা হইয়া অধিক অভিজ্ঞ সেনাপতি ক্যাপ্টেন এডওয়ার্ডস এর নেতৃত্বে এক বিশাল সেনাবাহিনী (৮ হাজার) প্রেরণ করিল। সন্নাসীদের বাহিনী অল্প (মাত্র ৪ হাজার) থাকায় তাহারা বুদ্ধি করিয়া সম্মুখ যুদ্ধ এড়াইয়া ছোট ছোট দলে ভাগ হইয়া ওৎ পাতিয়া আক্রমণের প্রস্তুতি গ্রহণ করিল। কোচবিহার, রংপুর, দিনাজপুর, রাজশাহী, বগুড়া, জলপাইগুড়ি প্রভৃতি জায়গায় নীলকুঠি ও অন্যান্য স্থানে আক্রমণ করিয়া ইংরেজ বাহিনীকে নাস্তানাবুদ করিতে লাগিল। ব্যতিব্যস্ত ইংরেজরা বিদেশ হইতে প্রচুর সৈন্য আমদানি করিয়া একযোগে সন্নাসীদের ঘাঁটিতে তীব্র আক্রমণ হানিল।

প্রথম অবস্থায় বিদ্রোহীদের অসুবিধা হইলেও তাহার সম্মুখ যুদ্ধ এড়াইয়া গেরিলা যুদ্ধ শুরু করিল। এই সময়ে সবচেয়ে বড় যুদ্ধ সংঘটিত হইয়াছিল দিনাজপুরের বালুরঘাট অঞ্চলে। দুই পদ্ধতিতে সন্নাসীরা যুদ্ধ সংঘঠিত করিবার জন্য সমগ্র ইংরেজ শক্তি পরাজিত হইয়া ছত্রভঙ্গ হইয়া গেল। অভিজ্ঞ সেনাপতি এডওয়ার্ড বিদ্রোহীদের তরবারির আঘাতে আহত হইয়া প্রাণ ত্যাগ করিল।

একের পর এক বিদ্রোহীদের হাতে পরাজিত হইয়া বিদেশি বণিকদের মনোবল ভাঙ্গিয়া যায়। তাহারা উত্তরবঙ্গ হইতে পালায়ন ছাড়া আর অন্য কোন পথ খুঁজিয়া পাইল না। বিদ্রোহীরা উত্তরবঙ্গে নিজেদের শাসন প্রতিষ্ঠিত করিল। সম্মুখ যুদ্ধে প্রস্তুতির জন্য বিভিন্ন স্থানে দুর্গ স্থাপন করিল এবং দুর্গের অভ্যন্তরে অস্ত্রের কারখানা গড়িয়া তুলিল। স্থল যুদ্ধের প্রস্তুতির পর বিদ্রোহীদের নেতৃত্বে জলযুদ্ধের জোরদার প্রস্তুতি চলিল। এই উদ্দেশ্যে গ্রামীণ করিগর দ্বারা বহু বজরা, ছিপনৌকা তৈরি করিয়া বিভিন্ন স্থানে নৌঘাঁটি স্থাপন করা হইল। উত্তর বঙ্গ ও দক্ষিণ বঙ্গে এই সময়ে নৌপথই প্রধান, স্থলপথ বহু জায়গায় ছিলই না।

এবার বিদ্রোহীদের লক্ষ্য হইল নৌশক্তির সাহায্যে ঢাকা আক্রমণ করা। উদ্দেশ্য ইংরেজদের শোষণের হাত হইতে জাতিকে মুক্ত করা। সমস্ত নৌশক্তিকে একত্রিত করিয়া সন্নাসী বিদ্রোহীরা ঝড়ের বেগে ঢাকার দিকে আগাইয়া চলিল। কিন্তু এ সংবাদ গোপন থাকিল না। ঢাকার পথে বিদ্রোহীরা ইংরেজদের সমস্ত কুঠি লুট ও ধ্বংস করিল। গোয়ালন্দের কাছে বিদ্রোহী বাহিনী ইংরেজ শক্তির মুখোমুখি হইল। জলযুদ্ধে নিপূণ সন্নাসী বাহিনীর আক্রমণে ইংরেজদের সমস্ত বজরা ও ছিপ উত্তাল পদ্মার গর্ভে আশ্রয় লইল। আরও আগাইয়া বিদ্রোহীরা সুরক্ষিত ঢাকার ইংরেজদের কুঠি মাত্র আধা ঘণ্টার যুদ্ধে ধূলিস্যাৎ করিয়া দিল। ঢাকার কুঠির সমস্ত সৈন্য বিদ্রোহী বাহিনীর হাতে নিহত হইল। ঢাকার কুঠির বড়কর্তা প্রাণ লইয়া পালায়ন করিলেন। কুঠির সমস্ত মালামাল বিদ্রোহীরা বাজেয়াপ্ত করিল। বিভিন্ন যুদ্ধে জয়লাভ করিয়া বিদ্রোহীরা পুনরায় সম্মুখ যুদ্ধের পথে অগ্রসর হইল। তুলনায় হীনবল শত্রুর বিরুদ্ধে সম্মুখ সমর কার্যকরী। কিন্তু তুলনায় অধিক অর্থবান, শক্তিমান আধুনিক যুদ্ধ কৌশলে অগ্রসরমান শত্রুর বিরুদ্ধে কম শক্তি, প্রাচীন যুদ্ধকৌশল বৃহৎ শক্তির বিরুদ্ধে প্রয়োগ করিলে পরাজয় অবশ্যম্ভাবী। তাহা-ই ঘটিল।

কিছুদিনের জন্য ইংরেজ শক্তি বিদ্রোহীদের ওপর আক্রমণ বন্ধ রাখিয়া বৃহত্তর যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করিতে শুরু করিল। এবার আর দেশি সৈন্যের ওপর ভরসা না করিয়া ইংল্যান্ড হইতে প্রচুর প্রশিক্ষিত সৈন্য, গোলাবারুদ, কামান, বন্দুক আমদানি করিল। এ যেন বিদ্রোহীদের আক্রমণে পরাজিত শক্তির প্রতিশোধ গ্রহণের প্রস্তুতি। বাংলার বুক হইতে চিরতরে উত্তরবঙ্গকে নিশ্চিহ্ন করিবার প্রস্তুতি। প্রশিক্ষিত বিপুল সংখ্যক ইংরেজ সৈন্য প্রচুর আধুনিক অস্ত্র, গোলাবারুদ লইয়া ৫টি দলে বিভক্ত বাহিনী সন্নাসী বিদ্রোহীদের নিকেশ করিবার লক্ষ্যে অগ্রসর হইল।

পথে বেশ কয়েকবার ইংরেজ সৈন্যবাহিনীকে আক্রমণ করিয়া বিদ্রোহীরা পরাজয় বরণ করিল। বিদ্রোহী নেতা মজনু শাহ ভয়ঙ্কর সম্মুখ যুদ্ধে পরাজিত হন এবং বিহারে পালায়ন করেন। এই অভাবনীয় যুদ্ধের ফল হইল ইংরেজ সৈন্য দ্বারা গ্রাম গ্রামান্তরে কৃষক জনতার ওপর নির্মম অসহনীয় অত্যাচার। তিস্তা নদীর অপর পাড়ে অপর এক বিদ্রোহী নেতা নুরুল মোহাম্মদ পরাজিত হইলেন। তারপর করতোয়া নদীর ধারে মরণপণ যুদ্ধে বিদ্রোহী নেতা পিতম্বর ইংরেজ বাহিনীর কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন। তৎকালে সন্নাসীদের গেরিলা যুদ্ধের রণকৌশল-ই ছিল যুক্তিযুক্ত। এক্ষেত্রে সম্মুখ যুদ্ধের কৌশল অবলম্বন করায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিদ্রোহীরা পরাজিত হয়।

ইংরেজ বাহিনীর ঝটিকা আক্রমণে বিদ্রোহীরা চারিদিকে ছড়াইয়া পড়িল। ১৭৬৯ সালের ডিসেম্বর মাসে চতুর্দিকের সন্নাসী বাহিনীকে একত্রিত করিয়া বিদ্রোহী বাহিনী নেপাল সীমান্তের মোরাঙ্গ অঞ্চলে ইংরেজ সেনাপতি কিথ এর নেতৃত্বে পরিচালিত বিরাট বাহিনীর ওপর বিদ্রোহীরা আক্রমণ সংঘটিত করে। সেনাপতি কিথকে বিদ্রোহীরা হত্যা করে, অতর্কিত আক্রমণে ইংরেজ সেনা পরাজিত হইয়া ধ্বংস হয়।
দীর্ঘ সময় ধরিয়া বিরাট অঞ্চলকে কেন্দ্র করিয়া বিদ্রোহ চলার পথে কৃষকদের নিকট থেকে রাজস্ব আদায় বন্ধ হইয়া যায়। বার বার সন্নাসীদের হাতে ইংরেজদের পরাজয়ের জন্য ঔপনিবেশিক শাসক নিত্য নতুন কৌশলে উপমহাদেশের ওপর নির্মম শোষণ শাসনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার উদ্দেশ্যে ‘সুপারভাইজার’নামক একশ্রেণীর কর্মচারী নিয়োগ করার পরিকল্পনা করে। তাহাদের মূল কাজ ছিল বল প্রয়োগ করিয়া কৃষকদের নিকট থেকে খাজনা আদায় করা এবং বিদ্রোহীদের সম্পর্কে গোপন খবর সংগ্রহ করা। এই অসৎ উদ্দেশ্য সফল করার জন্য তারা দেশি জমিদার মহাজনদেরও গোয়েন্দা হিসাবে নিয়োগ করে।

বাংলা বিহারের ব্যাপক অংশে ১৭৭০ সালের মহাদুভিক্ষের তা-বনৃত্য দুই প্রদেশের প্রায় সর্বত্র অসহনীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি করিল। খাদ্যের অভাবে কোটি কোটি মানুষের প্রাণ গেল। হেস্টিংসের মতেই প্রায় দেড় কোটি, আসল সংখ্যা কেউ জানে না। অর্ধভুক্ত, অভুক্ত মানুষের দেহ শৃগাল কুকুরের খাদ্য হইল। বাঁচার শেষ চেষ্টায় দলে দলে কৃষক জনতা বিদ্রোহীদের দলে যোগ দিল।

১৭৭০-৭১ সাল নাগাত ইংরেজ শাসক বিরাট সৈন্য সমাবেশ ঘটাইয়া নতুন আক্রমণের প্রস্তুতি গ্রহণ করিতে ছিল। বিহারের পূর্নিয়া জেলায় ইংরেজ বাহিনীর সহিত বিদ্রোহীদের বেশ কয়েকটি খন্ড খন্ড সংঘর্ষ হয়। এই খন্ড যুদ্ধগুলিতে বিদ্রোহীরা সাফল্য পায় নাই। উপরন্তু ৫০০ বিদ্রোহী ইংরেজ সেনাবাহিনীর হাতে বন্দী হয়। পুনরায় বিদ্রোহীরা দিনাজপুরে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে সংগঠিত হয়ে একযোগে অত্যাচারী ধনী জমিদারদের ওপর আক্রমণ সংগঠিত করে। তাহাদের সমস্ত ধনসম্পদ লুট করিয়া দ্রুত স্থান ত্যাগ করে। প্রাণভয়ে ভীত সন্ত্রস্ত্র জমিদারদের কাতর আবেদনে ইংরেজ শাসক একটি বিরাট সশস্ত্র বাহিনী প্রেরণ করে। বিদ্রোহীরা তাহাদের নিজস্ব বাহিনী রংপুর, দিনাজপুর হইতে সংগঠিত করিয়া একটি সংঘবদ্ধ বাহিনী গড়ার প্রচেষ্টা চালায়। ১৭৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বিদ্রোহীরা ঢাকা জেলায় অভিযান চালায়। ইংরেজ শাসন উপেক্ষা করিয়া অধিকাংশ কুঠি ও জমিদারদের কাছারি লুট করে। বিদেশি ইংরেজ শাসন উপেক্ষা করিয়া জমিদারদের নিকট হইতে কর আদায় করে।

এই সময়ে বগুড়াতে বিদ্রোহীদের মহান নেতা মজনু শাহের বাহিনীর সাথে ইংরেজ বাহিনীর প্রচন্ড যুদ্ধ হয়। মজনু শাহ মহাস্থানগড়ে আশ্রয় গ্রহণ করিয়া সময় সুযোগ মতো বিহারে চলিয়া যান। মজনু শাহ নাটোরের রানী ভবানীকে একটি পত্রে আবেদন করিয়াছিলেন, ‘বিদেশি ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহীদের সাহায্য সহযোগিতা করিবার জন্য, কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী তাদের আবেদন তিনি রক্ষা করেন নাই। ১৭৭২ সালে নাটোর অঞ্চলে বিদ্রোহীদের সক্রিয়তার সংবাদ পাওয়া যায়।
১৭৭৩ সালে পুনরায় রংপুর, দিনাজপুরে ইংরেজ বাহিনীর সহিত বিদ্রোহীদের বেশ কয়েকটি যুদ্ধ সংগঠিত হইয়াছিল। এক্ষেত্রেও বিদ্রোহীরা বিশেষ সুবিধা করিতে পারে নাই। রংপুর, দিনাজপুরের বিদ্রোহীদের পরাজয়ের সংবাদে বগুড়ার বিদ্রোহীরা পুনরায় আক্রমণের প্রস্তুতি গ্রহণ করে, কিন্তু স্থানীয় জমিদাররা বিদ্রোহীদের প্রস্তাবমতো কর দিতে স্বীকার করে। কারণ ইংরেজদের স্থানীয় সৈন্যবাহিনী রণকান্ত হইবার জন্য যুদ্ধ এড়াইবার কৌশল হিসাবে নিজেদের কোষাগার হইতে দাবি মত করের টাকা দিয়া বিদ্রোহীদের বাহিনীর সহিত আপোস করিয়া লয়।

ময়মনসিংহ, ঢাকা, মধুপুরের জঙ্গলে ইংরেজ বাহিনীর সহিত বিদ্রোহীদের বেশ কয়েকটি লড়াই হইয়াছিল। ১৭৭৩ সালের ১লা মার্চের যুদ্ধে ইংরেজ বাহিনী বিদ্রোহীদের নিকট সম্পূর্ণ পরাস্ত হইয়াছিল। এই যুদ্ধে জয়ের পরে বিদ্রোহীরা দুই ভাগে ভাগ হইয়া যায়। একটি দল যশোর হইয়া কলিকাতা অভিমুখে রওনা হয়। অপর দলটি পশ্চিম বঙ্গের বিভিন্ন জেলায় ছড়াইয়া পড়ে। ইংরেজরা এই সংবাদ পাইয়া বিদ্রোহীদের ধ্বংস সাধনের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন স্থান হইতে রওনা হয়। অপরদিকে বিদ্রোহীরা এই সংবাদ পাইয়া নিজেদের গতিপথ পরিবর্তন করিয়া উত্তরবঙ্গের দিকে সরিয়া যায়। যশোরের পথে কলিকাতাগামী দলটি ইংরেজদের হঠাৎ আক্রমণে ধ্বংস হইয়া যায়।

বিদ্রোহীরা ১৭৭৩ সালের মার্চ মাসের শেষ দিকে কামান ও অন্যান্য দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হইয়া গঙ্গানদী পার হইয়া মুর্শিদাবাদ, বীরভূম জেলায় প্রবেশ করে। এই বাহিনী ব্যাপক অঞ্চল জুড়িয়া আপন প্রভাব খাটাইয়া অত্যাচারী জমিদারদের নিকট হইতে কর আদায় করে। ইংরেজদের দেশীয় সেনাবাহিনীর ওপর ভরসা বিশেষ ছিল না। নিজেদের শোষণ, শাসন আরও মজবুত, দীর্ঘ করিবার উদ্দেশ্যে বিদেশ হইতে অধিক সংখ্যায় সেনা ও অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র আমদানি করে। নতুন সংগঠিত অধিক শক্তিশালী এই ইংরেজ বাহিনীর তীব্র আক্রমণে বিদ্রোহী বাহিনীর মূল অংশ ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই সময় সন্নাসী ও ফকিরদের মধ্যে নেতৃত্ব লইয়া মতপার্থক্য সংগঠনের অভ্যন্তরে বিশৃঙ্খলা জন্ম দেয়। ফলে বেশ কিছু দিনের জন্য বিদ্রোহের অগ্রগতি স্তব্ধ হইয়া যায়।

ইংরেজ সরকার বিদ্রোহীদের এই আভ্যন্তরীণ দুর্বলতার সুযোগ পূর্ণ মাত্রায় গ্রহণ করে। বিদ্রোহীদের সদস্যরা বাংলা বিহারের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের ব্যাপকভাবে রাজস্ব লুট করিবার জন্য ইংরেজদের আর্থিক অবস্থার তখন বেহাল দশা, ব্যবসা বাণিজ্য বন্ধের উপক্রম, এমতাবস্থায় বিদ্রোহীদের সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করা ছাড়া ইংরেজদের হাতে আর কোন উপায় ছিল না। গ্রামে গ্রামে বিদেশি শক্তি ফতোয়া জারি করেÑ বিদ্রোহীদের কৃষকরা সাহায্য করিলে তাহাদের দাস হিসাবে বিক্রয় করা; আজীবন ক্রিতদাস করা; ফাঁসি দেওয়া; মৃত দেহ ঝুঁলাইয়া দেওয়া ইত্যাদি সমস্ত ব্যবস্থাই কার্যকর হইবে। হয়ও তাই। যাদের কারণে ইংরেজরা এই ব্যবস্থা নেয়, তাহারা নিজেদের মধ্যে কলহ, বিবাদ দূর করিয়া পুনরায় ঐক্যবদ্ধ হইতে শুরু করে। ওয়ারেন হেস্টিংস ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট সংবাদ পাঠাইলেন বিদ্রোহীদের নিশ্চিহ্ন করা গিয়াছে।

১৭৭৪ সালে বিদ্রোহীরা পুনরায় বিদেশি শক্তির বিরুদ্ধে সংগঠিত হইয়া লড়াই শুরু করিলেও অতীতের সেই তীব্রতা, ক্ষিপ্রতা, গতি লড়াইতে ছিল না। বিদ্রোহের আগুন নিভিতেছিল। ১৭৭৪-৭৬ সাল পর্যন্ত বিক্ষিপ্তভাবে ছোট ছোট সংঘর্ষ উত্তর ও পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন স্থানে সংগঠিত হইলেও আসল জবরদস্ত আক্রমণ শুরু হইয়াছিল ১৭৭৬ সালের শেষে। মজনু শাহ বিহার হইতে ফিরিয়া নতুন করিয়া বিদ্রোহীদের সংগঠিত করেন। শুধুমাত্র মজনু শাহের উপস্থিতির সংবাদ পাইয়া ইংরেজ সরকার তাদের সমস্ত রাজস্ব দিনাজপুর সদরে পাঠাইয়া দেয়। সুরক্ষিত স্থানে রাজস্ব রাখিবার পর আবার তার সুরক্ষায় অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করে। ১৭৭৬ সালের ১৪ই নভেম্বর মজনু বাহিনীর সহিত ইংরেজ বাহিনীর প্রচ- যুদ্ধ হয়। বেশ কিছু ইংরেজ সেনা হতাহত হয়, সেনাপতি রবার্টসন মজনু বাহিনীর গুলিতে পঙ্গু হইয়া যান, সম্মুখ যুদ্ধে জয় সম্ভব নয় বিধায় বিদ্রোহীরা গভীর জঙ্গলে সরিয়া যায়।
এই সময়ে পুনরায় সন্নাসী ও ফকিরদের আত্মকলহ সশস্ত্র রূপ ধারণ করে। ১৭৭৭ সালে মজনু বাহিনীর সহিত সন্নাসীদের সশস্ত্র সংঘর্ষ হয়। মজনুর বহু অনুচর নিহত হয়। মজনু পুনরায় উত্তর ও পূর্ববঙ্গে প্রায় ৩ বৎসর ধরিয়া নতুন করিয়া সন্নাসী ও ফকিরদের ঐক্যবদ্ধ বাহিনী গড়ার চেষ্টা করেন। অর্থের অভাব দূর করার জন্য জমিদারদের কর দিতে বাধ্য করেন ও ঢাকা, ময়মনসিংহয়ের বহু অঞ্চলে রাজস্ব লুট করেন।

১৭৮২সালে ময়মনসিংহ জেলার রেসিডেন্ট কমিশনার মজনুর উপস্থিতি টের পাইয়া মজনু শাহকে পত্র লিখিয়া অনুরোধ জানায়, যুদ্ধ না করিয়া জেলা পরিত্যাগের জন্য! মজনু অবশ্য যুদ্ধ করিতে এ এলাকায় আসেন নাই, তিনি আসিয়াছিলেন বিদ্রোহীদের ঐক্যবদ্ধ করিয়া শত্রুকে চরম আঘাত দিতে। মজনুর সাথে বিরাট বাহিনী থাকা সত্ত্বেও যুদ্ধ না করিয়া মধুপুরের দুর্গম অঞ্চল দিয়া উত্তরবঙ্গে চালিয়া যান।
ইংরেজ শক্তি পাগলের মতো মজনুর অনুসন্ধান আরম্ভ করে, ধরিতে পারিলে চরম শাস্তির পরিকল্পনা করে। ১৭৮৬ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনেক অনুচরসহ মজনু বগুড়া জেলায় উপস্থিত হয়। ইংরেজরা তাদের চর মারফত এই সংবাদ পাইয়া কলেশ্বর নামক স্থানে বিশাল সৈন্য সমাবেশ ঘটাইয়া ইংরেজরা মজনুর বাহিনীকে ঘিরিয়া ফেলে, আসন্ন বিপদ উপলব্ধি করিয়া মজনু স্বয়ং বাহিনীসহ খোলা তলোয়ার হাতে ইংরেজদের উপর ঝাঁপাইয়া পড়েন এবং ইংরেজ শক্তির ঘেরাও চূর্ণ করিয়া পালায়ন করেন। তবে এই যুদ্ধে মজনু বাহিনীর বহু সাকরেদ হতাহত হয়, মজনু স্বয়ং মারাত্মকভাবে জখম হন। মজনু বাহিনী তাহাদের আহত নেতা, সৈনিকদের লইয়া রাজশাহী, মালদাহ অতিক্রম করিয়া গঙ্গা পার হইয়া উত্তর বিহারের সীমান্তে উপস্থিত হন। মজনুর মারাত্মক আঘাত নিরাময়ের সব প্রচেষ্টা বিফল হয়। ধীরে ধীরে তার জীবন দ্বীপ নিভিতেছিল। ১৭৮৬ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষ দিকে মাখনপুর নামক এক অজানা পল্লীতে সন্নাসী ফকির বিদ্রোহের এই মহান নেতার জীবন অবসান ঘটে।

মজনুর প্রাণপণ চেষ্টা সত্ত্বেও বিভিন্ন সম্প্রদায়গুলির ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম ধারাবাহিকভাবে আর চালানো সম্ভব হইল না। ফকির সম্প্রদায় বাংলা-বিহারে সংগ্রাম চালাইলেও সন্নাসীরা সংগ্রামের মঞ্চ থেকে পশ্চাৎ অপসারণ করিল। কোন কোন সন্নাসীর দল অন্তঃকলহে রাজতন্ত্রের সহিত নিজেদের যুক্ত করিয়া বিদ্রোহের পথ পরিত্যাগ করিল। বাকিদের ইংরেজরা চরম আঘাত করিয়া ধ্বংস করিয়া দিল।
মজনুর মৃত্যুর পর তাহার শিষ্য ও ভাই মুসা শাহ অন্যান্য বিদ্রোহীদের সহযোগিতায় বিদ্রোহ চালাইয়া যান। ১৭৮৭ সালে রাজশাহীতে মুসা বাহিনীর সহিত রানী ভবানীর বাহিনীর ব্যাপক সংঘর্ষ হয়, এই সংঘর্ষে রানী ভবানীর বাহিনী চরমভাবে পরাজিত হয়। এই সালের জুন মাসে উত্তরবঙ্গের বগুড়া, ময়মনসিংহ জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ভবানী পাঠক ও দেবী চৌধুরানীর নেতৃত্বে বিদ্রোহীদের দল লাগাতার লড়াই করিয়া বিদেশি শাসন অচল করিয়া দেয়। শেষ পর্যন্ত লেঃ ব্রেনানের নেতৃত্বে এক বিরাট সৈন্যবাহিনীর অতর্কিত আক্রমণে ভবানী পাঠক ও তার অনুচররা নদীতে ঘেরাও হইয়া যান। এই ভীষণ জলযুদ্ধে ভবানী পাঠক ও তাহার প্রধান সহকারী পাঠান সেনাপতি নিহত হন। দেবী চৌধুরানী লড়াই চালাইয়া যান। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করিয়া ইংরেজদের নিয়োজিত বাঙ্গালী ম্যাজিস্ট্রেট পরবর্তিকালে বিদেশি শক্তির প্রতি চরম পরাকাষ্ঠা দেখাইয়া দেবী চৌধুরানীকে আপন কল্পনার ওপর ভিত্তি করিয়া যুদ্ধক্ষেত্র হইতে সরাইয়া দিয়া সংসার ধর্ম পালনের জন্য গৃহে পাঠাইয়া দিয়াছেন তাহার রচিত কল্প উপন্যাসের মাধ্যমে। বিদেশি শক্তির প্রতি এরূপ চরম দালালী মনে হয় নজির বিহীন। মজনু শাহের অন্যতম প্রধান দুই সহকারী চেরাগ আলী ও ফেরাগুল শাহ দিনাজপুরে ইংরেজ ও তাদের দোসর জমিদারদের বিরুদ্ধে লড়াই চালাইয়া যান। এই যুদ্ধে ফেরগুল শাহ গুলিতে আহত হন। বিদ্রোহীরা তাহাকে নিজেদের সুরক্ষিত আশ্রয়ে লইয়া যান। বিদ্রোহীদের আভ্যন্তরীণ কলহে ১৭৯২ সালের মার্চ মাসে ফেরগুল বাহিনীর সাথে সংঘর্ষে মুসা শাহ নিহত হন।

মজনুর মৃত্যুর পর বিদ্রোহের আগুন ধীরে ধীরে নির্বাপিত হইতে ছিল। মুসা শাহের মৃত্যুর পর বিদ্রোহীদের পরাজয় যেন অবধারিত-ই ছিল। সন্নাসীরা আগেই নিজেদের বিদ্রোহের পথ হইতে নিজেদের সরাইয়া লন, ব্যাপক অংশ লড়াই করিয়া শহীদ হন। মুসা শাহের মৃত্যুর পর বিদ্রোহীরা নেতৃত্বহীন হইয়া যায়। নতুন নেতৃত্ব আর গড়িয়া উঠিল না। বিহারের শোভন আলী ও বাংলার চেরাগ আলী নেতৃত্বে চিরস্থায়ী দুভিক্ষ, বিদেশি ইংরেজ ও তাদের দোসর দেশীয় জমিদারদের নিষ্ঠুর অর্থনৈতিক শোষণ এবং রাজনৈতিক উৎপীড়নের বিরুদ্ধে, কৃষক জনতার সক্রিয় সাহায্য, সহযোগিতায় এই দুই নেতা দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য লড়াই চালাইয়া যান।

লর্ড কর্ণওয়ালিস নতুন গভর্নর জেনারেল হইবার পর শাসন ব্যবস্থার কিছু সংস্কার সাধন করিয়া বিদ্রোহীদের দমন করিবার জন্য আরও আক্রমণাত্মক নিয়ম, নীতির প্রবর্তন করেন। ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে দেশীয় জমিদারদের বিদেশি শোষণ, উৎপীড়ন স্থায়ী বন্ধু বানানো হয়। দারোগা নামক এক শ্রেণীর পুলিসের পদ সৃষ্টি করিয়া গ্রামের শাসনভার তাহাদের নেতৃত্বে বিশাল সৈন্য বাহিনী দ্বারা বিদ্রোহ দমনের ব্যবস্থা করা হয়। ১৮০০ সালে বিদ্রোহের এই মহান অগ্নিশিখা নির্বাপিত হয়। বিদেশি শক্তি বাংলা ও বিহারের ধন সম্পদ লুট করিয়া ভারতীয় উপমহাদেশ গ্রাস করার প্রস্তুতি নেয়। সন্নাসী বিদ্রোহ বাংলা বিহারের তথা উপমহাদেশের প্রথম কৃষক বিদ্রোহ নামে আজও জনতার হৃদয়ে জীবন্ত।
এই বিদ্রোহের শ্রেষ্ঠ নায়ক ও নায়িকাগণের পরিচয় আমরা আজও জানিনা। বিদ্রোহের প্রধান নায়ক মজনু শাহ মহাস্থানে বসতি গড়ার আগে সম্ভবত ইউপি ও বিহারের সীমান্তের মাখনপুর গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন।

মুসা শাহ মহান বিদ্রোহী নায়ক মজনু শাহের ভাই।
চেরাগ আলী খুব সম্ভবত মহান বিদ্রোহী নায়ক মজনু শাহের পালিত পুত্র। মুসা শাহের হত্যার পর শোভান আলীর সহযোগিতায় বিদ্রোহ পরিচালনা করেন। তবে ইনিও গিরি সম্প্রদায়ের সন্নাসী মতি গিরির হাতে নিহত হন।

ভবানী পাঠক- পারিপর্শ্বিক তথ্য প্রমাণে যাহা এ পর্যন্ত জানা গিয়াছে মনে হয় সন্নাসী এই মহান নেতার আবাস ছিল রংপুর জেলার রাজাপুর গ্রামে। তবে সরকারি নথি অনুসারে ইহা প্রমাণ হয় যে, মজনু শাহের সহিত তার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তাহার দলে বহু বীর পাঠান ও বিহারি যোদ্ধা ছিল, শুধু তাহাই নহে একজন পাঠান ভবানী পাঠকের সেনাপতি ছিলেন। বাংলার স্বাধীনতার জন্য উভয়েই জীবন আহুতি দিয়াছেন।

দেবী চৌধুরানী-ছোট জমিদার, ভবানী পাঠকের সহিত একই সাথে বিদ্রোহে অংশ নেন। নৌযুদ্ধে পারদর্শী এমন বীর মহিলা সৈনিক আজও এ উপমহাদেশে অনন্য। ভবানী পাঠকের বীরগতি প্রাপ্ত হইবার পর এই মহান নারী নেত্রী বিদ্রোহের অগ্নিশিখা প্রজ্জলিত রাখিয়াছিলেন।

কৃপানাথ- ইনিও এক বিখ্যাত নায়ক। তাহার বাহিনী ছিল বিশাল। ১৭৮৯ সালে বৈকণ্ঠপুর জঙ্গল অধিকার করেন। তাহার সহযোগীর সংখ্যা ছিল ২২ জন। এই বিশাল জঙ্গলে কৃপানাথের ২২ জন সহযোগী ২২টি ঘাঁটির নেতৃত্ব করতেন। রংপুরের কালেক্টর ম্যাকডোন্যান্ড সাহেবের বিশাল সৈন্যবাহিনীর সহিত জঙ্গল যুদ্ধে কৃপানাথের বাহিনীর বিশাল ক্ষয়ক্ষতি হয়। আসন্ন বিপদ আশঙ্কায় বিদ্রোহীরা নেপাল ভুটান সীমান্তে সরিয়া যায়। খুব অল্প সময়ের মধ্যে কালেক্টর ম্যাকডোন্যান্ড ৫৪৯ জন বিদ্রোহীকে আটক করেন।

শান্ত, ধীর, অচলায়তন স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রাম সমাজের প্রচলিত সামাজিক সুব্যবস্থা যখন ইংরেজরা ভাঙ্গিয়া টুকরা টুকরা করিতেছে, নির্মম নির্লজ্জ শোষণ, উৎপীড়ন চরম পর্যায়ে- ঠিক তখনই বঙ্গ বিহারের কৃষক সমাজ তাহাদের পূর্বের কোন অভিজ্ঞতা ছাড়াই, স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই ভয়ঙ্কর বিদেশি দানবের মুখোমুখি হয়।

আমাদের স্মরণ রাখা কর্তব্য যে, ঔপনিবেশিক এই হায়নার দল সারা দুনিয়ায় যখন একের পর দেশে শোষণ, নির্যাতনের এক স্থায়ী ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত করিতেছে, স্থানীয় বিশ্বাসঘাতক, বেঈমান জমিদার শ্রেণীর সহায়তায়। আয়েতনে বিশাল এই বাংলা বিহারে স্বতঃস্ফূর্ত গণবিদ্রোহ সফল হইতে হইলে যে একাগ্রতা, আদর্শ, লক্ষ্য, কর্মপ্রণালী নেতৃত্ব, সংগঠন সর্বপরি লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা আবশ্যক, তাহার অভাব নিশ্চয়ই ছিল। আবার এও বাস্তব যে, তা ছিল সম্পূর্ণই অসম্ভব। স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রাম সমাজের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত গ্রাম সমাজে তা নিষ্প্রয়োজন। দেশ ভক্তিও ছিল লক্ষ্য ছাড়া। কোথায় বিদ্রোহীরা পৌঁছাইতে চায় তাহার কোন নিশানা ছিল না।

মজনু শাহ ও অন্যান্য বিদ্রোহী নেতারা এই বিদ্রোহকে একটি পতাকার নিচে সামিল করিবার প্রচেষ্টা চালাইলেও একাজ ছিল তাহাদের সাধ্যতীত। দেশজোড়া এই মহান বিদ্রোহের চলমান গতির সহিত পা মিলাইয়া নির্দিষ্ট স্থির লক্ষ্যে উপনীত হইবার জন্য যে দক্ষ দূরদৃষ্টি, সাংগঠনিক দৃঢ়তা অভিজ্ঞতা প্রয়োজন তা ফকির সন্নাসীদের ভিতর ছিল না। খাপছাড়া স্বতঃস্ফূর্ত বিদ্রোহের জন্য বিদ্রোহী নায়কদের আদর্শ ও লক্ষ্যের ঐক্য কখনই আমল পাই নাই। শেষ দিকে ধর্মের ব্যাপারে বিদ্রোহীদের নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের কারণে বিদ্রোহীদের মধ্যে ঐক্যের ফাটল ধরে। সারা দুনিয়ায় উপনিবেশ গড়ার লক্ষ্যে ধাবিত দানবের উন্নত যুদ্ধ কৌশলের কাছে অতীত সেকেলে হাতিয়ার ও কুশলতার কাছে বিদ্রোহীদের পরাজয় যেন অনিবার্যই ছিল।
আবার এও সত্য যে এই বিদ্রোহ বিদেশি ইংরেজ, তাদের দোষর দেশীয় জমিদার, দালালদের বাহিনীর হাতে পরাজয় বরণ করিলেও ভবিষ্যতের ইংরেজ বিরোধী দেশ মুক্তির সংগ্রামের নতুন পথের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা বানাইয়া গিয়াছে। মোঘল পাঠান শাসনকালেও অসংখ্য কৃষক বিদ্রোহ ঘটিয়াছে, যাহা ছিল নিতান্তই স্থানীয়।
ফকির সন্নাসী বিদ্রোহের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার ভিতর আমরা পাই প্রথম এই উপমহাদেশের পূর্ব অংশের বিশাল এলাকায় বিদেশি শাসকের বিরুদ্ধে সংগ্রামের এক নয়া ঠিকানা। ভবিষ্যৎ কৃষক সংগ্রামীদের শিক্ষা নিকেতন। বিদ্রোহীরা পরাজিত হইয়াছিল সত্য, তথাপি ফকির সন্নাসীদের এই মহান বিদ্রোহ আজকের উপমহাদেশে বৈপ্লবিক সংগ্রামের অগ্রদূত, একথা স্বীকারে দ্বিধা নেই।

লেখকঃ স্বপন কুমার চক্রবর্তী

সূত্রঃ

13076745_715535491921699_3304914592563662269_n

 

Advertisements


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.