ভারতের নারী গেরিলা কমরেড মসির সাক্ষাৎকার

maoist-2

ভারতের নারী গেরিলা
কমরেড মসির সাক্ষাৎকার

[কমরেড মসি, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মাওবাদী)-এর দণ্ডকারণ্য জেলার একজন প্লাটুন কমান্ডার এবং জেলা কমিটির সদস্য। তিনি এই সাক্ষাৎকারে সমাজে তার লাঞ্ছিত হবার কথা, কিভাবে তিনি পার্টির সংস্পর্শে আসলেন, তার আজকের এই অবস্থানে আসার প্রক্রিয়া সম্পর্কে বলেছেন।  মসি তার সামরিক দক্ষতার জন্য সুপরিচিত ছিলেন।  তিনি অনেক এ্যামবুশ এবং রেইড আক্রমণে অংশগ্রহণ করেন।  তার কঠোর প্রচেষ্টা তাকে সামরিক ক্ষেত্রে অগ্রভাগে নিয়ে আসে।  দণ্ডকারণ্যে এক ডজনেরও বেশি নারী কমরেড তার মত সামরিক ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।  এ সাক্ষাৎকারটি ভারতের মাওবাদী সমর্থক পত্রিকা পিপলস মার্চ-এর ডিসেম্বর, ’০৬-এ প্রকাশ হয়। ]

মসি, তার জীবন সম্পর্কেঃ
এটা ছিল ‘বি’, যিনি আমাদের গ্রামে প্রথম এসেছিলেন এবং একটি মিটিং করেছিলেন।  তিনি সমগ্র নারীদের জীবন এবং তাদের সংগ্রাম সম্পর্কে আমাদের বলেছিলেন।  তিনি অন্য দেশের এক নারী সম্পর্কেও আমাদের বলেছিলেন।  এগুলো আমার ভেতরে নতুন চিন্তার উদ্রেক করে।  আমি ভেবেছিলাম এখন যেমন আছে এর থেকে জীবন অন্যরকম হবে।
কিভাবে সে তার জোরপূর্বক বিয়ের বিরোধিতা করেছিলঃ
আমার মা মদ পান করেছিল এবং আমার বিয়ে ঠিক করেছিল (মেয়ের এবং ছেলের মা কিংবা বাবা একসাথে দেশি মদ পান করা মানে বিয়ে চূড়ান্ত।) ছেলেটি ছিল আমার চাচাতো ভাই, চাচার ছেলে। কিন্তু আমি এই বিয়েতে রাজি ছিলাম না। আমি বিয়ের জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। আমার মা আমাকে মেরেছিল। আমার দাদীমা আমাকে মেরেছিল। তারা আমাকে জোর করেছিল বিয়েতে মত দেবার জন্য।

নারী সংগঠনের মিটিং-এ যোগদানঃ
আমার বাড়িতে যখন এইসব চলছিল তখন সেখানে একটা নারী সংগঠনের মিটিং হচ্ছিল। সেই সময়ে আমি এটুকুও জানতাম না যে সংগঠনটির নাম ক্রান্তিকারী আদিবাসি মহিলা সংগঠন (কেএএমএস)। আমি শুধু এটুকু জানতাম যে এটা একটা নারীদের মিটিং। একই গ্রামে আমার এক বান্ধবী একই পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছিল। আমরা উভয়েই সিদ্ধান্ত নিলাম মিটিংয়ে আমাদের সমস্যার কথা বলার। কিন্তু আমরা বলার সাহস পাচ্ছিলাম না। ক্রমে আমরা আত্মবিশ্বাস অর্জন করলাম এবং তখন রেঞ্জ কমিটির এক সদস্যকে বললাম।
তিনি আমাদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন আমরা এই বিয়ে মেনে নিতে অথবা কেএএমএস-এ যোগদান করতে চাই কিনা। তিনি আমাদেরকে চিন্তা করতে ও একটি স্থির সিদ্ধান্ত নিতে বললেন। আমরা ভাবলাম এবং তাকে বললাম যে আমরা প্রথমে কেএএমএস-এ যোগ দিতে চাই এবং পরে পর্যায়ক্রমে আন্দোলনের কথা ভাববো।

বাড়িতে চাপ চলতেই লাগলোঃ
কিছুদিন পর আমার মা এবং আমার চাচা পুনরায় চাপ দিতে লাগলো। আমার চাচা আমাদের বাড়িতে আসলো এবং আমার মায়ের সাথে আলাপ করলো। আমি আমার চাচাকে বললাম সে আমাকে তার বাড়িতে নিয়ে গেলে আমি ঐদিনই মরবো। কিন্তু আমার মা এবং চাচা আলাপ করেই চললো। আমি অস্বস্তি বোধ করতে লাগলাম। আমি উত্তেজিত হলাম। আমি আমার মাকে এবং পরে চাচাকে আঘাত করলাম এবং বাড়ি ছেড়ে দৌড়ে পালালাম। ঐ দিন আমি এক বান্ধবীর বাড়িতে ঘুমালাম। আমার চাচা আমাদের গ্রাম ছেড়ে গেল না। সে তার গ্রামে খবর পাঠালো আসার জন্য এবং আমাকে নিয়ে যাবার জন্য। আমার ছোটবোন আমাকে এই খবর দিয়েছিল। আমার মা এবং চাচা আমাকে খুঁজতে লাগলো। সুতরাং আমি অন্য গ্রামে চলে গেলাম। আমি সাপ্তাহিক বাজারে গেলাম এবং পাখি মারার ওষুধ ‘পিটা দাওয়াই’ (ঢ়রঃঃধ ফধধিুর) কিনলাম। আমি ওষুধ নিলাম এবং বাড়িতে গেলাম। আমি সেটা আমার মাকে দেখালাম এবং তাকে বললাম যে যদি তারা আমাকে জোর করে পাঠাতে চায় তবে আমি ওষুধ খাবো এবং মরবো। আমার একগুয়েমিতে আমার মা পুনরায় চিন্তা করলো। তারা তাদের সিদ্ধান্ত তুলে নিল। আমি বেঁচে গেলাম। ছয় মাস পার হয়ে গেল। আমার বান্ধবীটি বিয়ে করলো এবং অন্য গ্রামে চলে গেল। তারপর আবার চাপ শুরু হলো। সেই সময়ে আমি কেএএমএস-এ কাজ করছি। কাজ আমাকে জীবনের প্রতি আত্মবিশ্বাস এনে দেয়। আমি স্কোয়াডে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম এবং সংশ্লিষ্ট কমরেডদেরকে জানালাম। তারা ছয় মাস সময় নিল সিদ্ধান্ত নিতে এবং আমাকে স্কোয়াডে নেয়া হলো।

আমি স্কোয়াডে যোগদান করলামঃ 
কিন্তু আমি জানতাম না কিভাবে খাপ খাওয়াতে হয়, কিভাবে কথা বলতে হয় এবং আরো কত কিছু। আমি চিন্তা করা শুরু করলাম। আমার মন আলোড়িত হতে লাগল। আমি আমার বাড়ি ত্যাগ করলাম। আমি সেই জায়গা ত্যাগ করলাম যেখানে আমার পরিবার বহু পুরুষ ধরে থেকে আসছে। আমি গভীরভাবে ভাবতে লাগলাম আমার সিদ্ধান্ত সঠিক না বেঠিক। আমি ঘুমাতে পারলাম না। আমি ভাবতে লাগলাম স্কোয়াডের জীবন কেমন হবে। চিন্তাগুলো এক মাস ধরে ঘুরে ফিরে আমাতে আসতে লাগলো। কমরেডরা আমার ভয় নিয়ে হাসাহাসি করতে লাগলো। আস্তে আস্তে এই পরিস্থি’তি আমি কাটিয়ে উঠতে লাগলাম। যখন তাদের সাথে কাজ করছিলাম তারা আমাকে জিজ্ঞাসা করলো আমি অন্য জায়গায় যাবার জন্য প্রস্তুত কিনা। আমি বললাম হ্যাঁ। আমি তাদের সাথে কিছুদিনের জন্য রইলাম। স্কোয়াড আমাকে আমার গ্রামে পাঠালো। তারা একটা মিটিংয়ের আয়োজন করলো। মিটিংয়ে অনেক লোক এসেছিল। আমার মা আমাকে ছেড়ে গেল না। সে আমার সাথে স্থিরভাবে বসে থাকলো। আমি মিটিংয়ে বক্তৃতা দিলাম। আমি গ্রামবাসীকে বললাম কেন আমি স্কোয়াডে যোগ দেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। যখন আমরা চলে যাই (তখন) আমার মা আমার জামা-কাপড় ও স্যান্ডেল পর্যন্ত নিতে দেয়নি। আমি এসব ছাড়াই চলে যাই।  আমি আর ফিরে আসিনি।

নতুন জায়গাঃ
আমি অন্য জায়গায় বদলি হলাম। কমান্ডার এবং লিডাররা আমার ব্যাপারে অনেক যত্ন নিয়েছিলেন। সবাই আমাকে ‘মাম্মি’ বলে ডাকতেন। কমান্ডার আমাকে সামরিক বিষয়াদির ব্যাপারে উৎসাহিত করেছিলেন। তিনি আমাকে ও অন্য কমরেডদেরকে সবধরনের অনুশীলন করিয়েছিলেন। একটি সামরিক ট্রেনিং ক্যাম্প পরিচালনা করা হয়েছিল। আমি এতে প্রথম হয়েছিলাম। তাই কমরেডরা আমাকে প্লাটুনে দেবার জন্য আমার স্কোয়াড কমান্ডারকে বললেন। সে অনুযায়ী আমি
ডিকে-তে (দন্ডকারণ্যতে- অনু.) অন্য এলাকায় বদলী হই।
সেই সময়ে আমি এক কমরেডকে আমার পছন্দে বিয়ে করি। সে সেই সময় প্লাটুন কমান্ডার ছিল।

প্রথম যখন আমি গুলির শব্দ শুনিঃ
আমি ভেবেছিলাম এটা গৃহ সরঞ্জাম মেরামতের শব্দ। আমি একনলা বন্দুক দিয়ে গুলি ছোঁড়া শিখেছিলাম। কিন্তু প্রথমবারের মতো আমি পুলিশ দেখে হতবুদ্ধি হয়ে পড়লাম। আমি প্রহরারত ছিলাম এবং দৌড়ে গ্রামের ভেতরে মিটিংস্থলে গেলাম এবং কমরেডদের বললাম। তারা গুলির পাল্টা জবাব দিয়েছিলেন। পরে তারা ঘটনার পর্যালোচনা করেন। তারা আমাকে বললেন আমি শুধু-শুধুই ভয় পেয়েছি এবং এই সব পরিস্থি’তিতে আমাকে যুদ্ধ করতে হবে। আমার সাথী কমরেড আমাকে উৎসাহিত করেছিলেন কিভাবে যুদ্ধ করতে হয়। এটা আমাকে অনেক ভাবিয়েছিল। আমি ভাবতে লাগলাম আমি কি আসলে ভয় পাচ্ছি, নাকি আমি কেবল ঘটনার আকস্মিকতায় ভয় পেয়েছি। এটা ছিল ছয় মাসের আরেকটি অশান্তি। যখন আমি এই প্লাটুনের সাথে ছিলাম (তখন) আমি আবারো পুলিশের মুখোমুখি হয়েছিলাম। এই সময়ে আমি ইতস্তত করিনি। আমি গুলি ছুঁঁড়লাম। এটা ছিল একটা দু’নলা বন্দুক। আমি খুশি হয়েছিলাম। তখন না পুলিশ না গুলি কোনটার সামনেই আমি ভীত ছিলাম না। আমার নিজের মধ্যে আত্মবিশ্বাস বেড়ে গিয়েছিল। এর কিছুদিন পর ডিকে-তে আরেকটি প্লাটুন গঠন করা হয় এবং আমার সঙ্গী ও আমি সেখানে বদলি হই। আমি পার্টি এরিয়া কমিটির একজন সদস্য হই।

নারীরা কিভাবে সৈন্যবাহিনীতে কাজ করেঃ
একগুচ্ছ নারী আছেন (যারা) আন্দোলনে বীরত্বের সাথে লড়াই করছেন। কিছু দ্বিধান্বিত। কিন্তু তারা অন্য ক্ষেত্রে ভালো করছেন। যখনই কোন এ্যামবুশ বা রেইড হয়, তখনই পর্যালোচনা হয়। পর্যালোচনায় আমরা সবকিছু আলোচনা করি। আমরা ত্রুটি-বিচ্যুতিসমূহ এবং সঠিক প্রণালীগুলো ইতিবাচক ও নেতিবাচক নিয়ে আলোচনা করি। এভাবে আমরা আমাদের ভুলগুলো সম্পর্কে জানতে পারি। এই প্রক্রিয়ায় আমরা সেগুলো অতিক্রম করতে চেষ্টা করি।

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাসমূহঃ
আমি অনেক এ্যামবুশ এবং রেইড-এ অংশ নিয়েছি। সবসময়ই আমি অনেক আত্মবিশ্বাস অর্জন করেছি। আমি মাইন ফাটিয়েছি। পুলিশ ষ্টেশন ঘেরাওয়ে অতর্কিত আক্রমণ টিমে আমি ছিলাম। আমি বাধাদানকারী গ্রুপেও কাজ করেছি। আমি যে কাজ করি এতে খুবই উৎসাহ বোধ করি। আমি অন্যরকম শক্তি অনুভব করি যখন রাইফেল হাতে যুদ্ধ করি। একবার আমি ভূমি মাইনরোধক গাড়ি উড়িয়েছিলাম। বিস্ফোরণের ক্ষেত্রে এটা আমাদের জন্য অনেক বড় অর্জন ছিল এবং ব্যক্তিগতভাবেও এটা ছিল একটা অর্জন। আমি মনে করি নারীদের সব ধরনের কাজে অবশ্যই উদ্যোগ নেওয়া উচিত। তাদের অবশ্যই কঠোর প্রচেষ্টা চালাতে হবে যাতে আমরা উচ্চতর পর্যায়ে নারীদের স্বতন্ত্রভাবে সংগঠিত করতে পারি। তাদের প্রয়োজন বিশেষ রাজনৈতিক এবং সামরিক শিক্ষা।

সূত্রঃ [নারী মুক্তি/৫নং সংখ্যায় প্রকাশিত ॥ ফেব্রুয়ারি, ’০৭], বিপ্লবী নারী মুক্তি প্রকাশনা

Advertisements


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s