পশ্চিমবঙ্গে উন্নয়নের ভাঁওতাবাজির বিরুদ্ধে ও কাজের দাবীতে পথে নামছে নকশালপন্থীরা

13256516_1759226684301159_3572783470398351108_n (1)

কারখানা খোল, আত্মমর্যাদার সাথে কাজের অধিকার নিশ্চিত কর।

আমাদের মন্ত্রীমশাইদের নাকি রাতের ঘুম উড়ে গিয়েছে বেকার যুবকদের ভবিষ্যৎ আর উন্নয়নের চিন্তায়। তাইতো তারা নাওয়া খাওয়া ফেলে বিলাস বহুল বিমানে চেপে এদেশ ওদেশ ঘুরে বড় বড় পুঁজিপতিদের পায়ে ধরে বিনিয়োগ করার আবেদন জানান।  সবই নাকি উন্নয়ন আর কর্ম সংস্থানের স্বার্থে। একদিকে আমরা দেখেছি যে সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম, নোনা ডাঙ্গা সহ বহু জায়গায় কৃষকে তার জমি এবং গরিব বস্তিবাসীকে তার বাসস্থান থেকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে।  অন্য দিকে একের পর এক চালু কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।  আর শিল্পায়ন এর জন্য অধিগৃহীত কৃষি জমি বা বন্ধ কারখানার জমিতে গড়ে উঠছে আবাসন, শপিং মল, পার্ক ইত্যাদি, হিন্দ মোটর কারখানা, জয়া ইলেক্ট্রনিক্স, চাঁদমনি চা বাগান সহ এরকম বহু উদাহরন আমরা চোখের সামনে দেখতে পাই।

জুট মিল বন্ধ হওয়ার কথা নয় ।প্লাস্টিকের দূষণ নিয়ে উদ্বিগ্ন আজ গোটা পৃথিবী, ভারত সরকারও প্লাস্টিকের দূষণের বিরুদ্ধে প্রচার চালিয়ে থাকে।  তবে কেন জুট মিল গুলো বন্ধ হচ্ছে? জুটের কি বাজার নেই? জুট মিল বন্ধ হচ্ছে তার কারণ ভারতের অন্যতম বড় পুঁজিপতি রিলাইয়েন্স গোষ্ঠীর মালিক আম্বানি বাবুরা পলিমারের ব্যাবসা ফেঁদে বসে আছেন।

কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে কার ক্ষতি? মালিক এবং তার দালালরা প্রচার করে শ্রমিকরা নাকি কাজ করেনা, তাদের নাকি লোকসানে চলছে! তবুও আমরা দেখি কারখানা ঠিকই চলে, মালিকের সম্পত্তি বেড়ে যায়। তারপর কোন একদিন শ্রমিক কর্মচারীর পাওনা, পিএফ এর টাকা আত্মসাৎ করে মালিক কারখানা লক আউট করে চলে যান, তারপর কারখানার জমিতে আবাসন, শপিং মল ইত্যাদি বানিয়ে অনেক টাকা কামান।  সরকার মালিককে ধরে না, অথচ শ্রমিকরা এর প্রতিবাদে আন্দোলন করলে পুলিশ লাঠি পেটা করে, আর পুঁজিপতিদের খবরের কাগজ বলে পশ্চিমবঙ্গে কর্ম সংস্কৃতি নেই, শ্রমিকদের জন্যই নাকি কারখানা বন্ধ হচ্ছে!

কাজ হারিয়ে শ্রমিকরা, বেকার যুবকরা কোনরকমে ট্রেনে গান গেয়ে, হকারি করে, আচার, ধূপ ইত্যাদি বিক্রি করে বা বাধ্য হয়ে অপরাধ মূলক কাজে যুক্ত হয়ে কোন রকমে জীবন ধারন করছে।  পুঁজিপতি এবং তাদের দালালরা সমাজের লুম্পেনিকরন ঘটাচ্ছে।

একদিকে পুঁজিপতিদের নির্দেশিত অর্থনৈতিক নীতির জন্যই মানুষ বেকার হচ্ছে, অন্যদিকে এই বেকারীকে অজুহাত করে শিল্পায়নের গল্প বলে কৃষক, বস্তিবাসীকে উচ্ছেদ করে আরেক দফা জীবিকা হরণ হচ্ছে, এবং ভারতের সংবিধানে শ্রমিক কর্মচারীদের পক্ষে যেটুকু আইন ছিল সেটুকুকেও তুলে দিয়ে শ্রমিক কর্মচারীদের মালিকের দাসে পরিণত করার চক্রান্ত চলছে, বেসরকারি কারখানা রেল সহ সমস্ত ক্ষেত্রে স্থায়ী কর্মী নিয়োগ কমিয়ে দিয়ে কন্ট্রাক্টচুয়াল লেবার নিয়োগ করে শ্রমিক কর্মচারীর আইনী অধিকার হরণ করা হচ্ছে, এমনকি শ্রমিকের চিকিৎসা পরিসেবার উপর নেমে এসেছে আক্রমন, নারী শ্রমিকদের মেলেনা সম কাজে সম মজুরি।  তাই প্রশ্ন ওঠে যে ডান-বাম বা রাম বিভিন্ন ধরনের সরকারগুলো বিদেশি পুঁজিপতিদের তোষামোদ করার যে নীতি নিয়েছে তার সাথে সংখ্যা গরিষ্ঠ মানুষের কর্ম সংস্থান, উন্নয়নের আদৌ কোন সম্পর্ক আছে কিনা?

শ্রমিক-কৃষক-ছাত্র-যুব সহ সমস্ত গনতন্ত্র প্রিয় মানুষদের এটা একসাথে বলা উচিৎ যে কর্মসংস্থান, উন্নয়ন কোন পুঁজিপতি বা নেতা মন্ত্রীর দয়ার বিষয় নয়। আত্মমর্যাদার সাথে উন্নয়ন, কর্মসংস্থান আমাদের অধিকার।

পশ্চিমবঙ্গে কম বেশি ৬৭ হাজার কল কারখানা বন্ধ।  আমরা একবার কল্পনা করতে পারি যে কারখানা তৈরির নামে নতুন করে কৃষক বা বস্তিবাসীকে উচ্ছেদ না করে, বন্ধ কারখানা জমিতে আবাসন তৈরি না করে যদি বন্ধ কারখানা চালু যায় বা বন্ধ কারখানার জমিতে নতুন শিল্প গড়ে তোলা যায় তবে কত জন ছাঁটাই শ্রমিক, বেকার যুবকের কর্ম সংস্থান নিশ্চিত করা যাবে !

আমরা মনে করি যে কর্মসংস্থান, উন্নয়ন কোন পুঁজিপতি বা নেতা মন্ত্রীর দয়ার বিষয় নয়। আত্মমর্যাদার সাথে উন্নয়ন,কর্মসংস্থান আমাদের অধিকার।

আমরা দেখতে পাচ্ছি গেরুয়া ফ্যাসিস্টরা “দেশ প্রেমের” নামাবলি গায়ে দিয়ে একের পর এক শ্রমিক কৃষক ছাত্র পরিবেশ বিরোধী আইন তৈরি করছে বড়বড় পুঁজিপতিদের স্বার্থে, আমরা জানি যে শহীদ ভগত সিং মনে করতেন শুধু ব্রিটিশ সাহেবদের তাড়ালেই হবেনা, যতদিন মেহনতি মানুষের উপর পুঁজিপতিদের শোষণ চলবে ততদিন আমাদের লড়াই চালাতে হবে।

আমাদের দাবি:

শিল্পায়নের নামে কৃষকের জমি দখল বন্ধ কর,

বন্ধ কারখানার জমিতে আবাসন নয় শিল্প গড়,

আত্মমর্যাদার সাথে সবার জীবিকার অধিকার সুনিশ্চিত কর ।

 

সংগ্রামী শ্রমিক মঞ্চ

বিপ্লবী যুব লীগ

ইউনাইটেড স্টুডেন্টস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট

এর পক্ষে সৌম্য মণ্ডল(৭৮৯০৩১৫৬২৬) কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত

 

Advertisements

প্রশ্নবিদ্ধ উন্নয়নের রাজনৈতিক অর্থনীতি

PoliticalEconomyConcentrationImage

প্রশ্নবিদ্ধ উন্নয়নের রাজনৈতিক অর্থনীতি

সামষ্টিক অর্থনীতির ইংরেজি প্রতিশব্দ ম্যাক্রো-ইকোনমিকস। কোনো দেশের মোট উৎপাদন বা জিডিপি, জাতীয় উৎপাদন বা জিএনপি, মোট চাহিদা, মোট জোগান, মোট নিয়োগ, সুদের হার, মজুরি হার প্রভৃতি সামষ্টিক অর্থনীতির আলোচিত বিষয়। অপরদিকে ব্যষ্টিক অর্থনীতির ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো মাইক্রো-ইকোনমিকস। এটি অর্থনীতির অংশবিশেষ আলোচনা। যেখানে একটি ফার্ম বা একটি ব্যবসার সম্পূর্ণ পৃথকভাবে আলোচনা করা হয়। সাধারণ মানুষ অর্থনীতিকে বিচার করেন জীবন-জীবিকার মাপকাঠি দিয়ে। কোনো দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ‘জীবন-জীবিকা’হলো সে দেশের রাজনৈতিক অর্থনীতির সামষ্টিক বা ব্যষ্টিক প্রতিফলন। যার মাধ্যমে দৃশ্যমান হয় রাষ্ট্র ও সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার। এটি সামষ্টিক ও ব্যষ্টিক অর্থনীতির গতি-প্রকৃতির অন্যতম পরিমাপকও। তাই শুধু সূচক নির্ভরতা নয়, ব্যাপক মানুষের প্রাত্যহিক জীবন-জীবিকার প্রতি গভীর পর্যবেক্ষণই সমকালীন অর্থনীতি সম্পর্কে উপযুক্ত ধারণা দিতে পারে। এ মাপকাঠিতে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক গতি-প্রকৃতি বুঝতে হলে প্রথমেই জানতে হবে, বাংলাদেশে-কী ধরনের রাজনৈতিক শক্তি নেতৃত্ব করছে? বাংলাদেশ-কী বাজার অর্থনীতি অনুসরণ করছে? নাকি কখনো জিয়া, কখনো এরশাদ, কখনো বা খালেদা কিংবা হাসিনা মডেল অনুসরণ করছে! বাংলাদেশের অর্থনীতির মডেল নিরূপণে সাধারণ মানুষের দৃশ্যমান জীবন-জীবিকাকে পরিমাপক হিসেবে দাঁড় করাতে চাই এ লেখায়।

উন্নয়নের দৃশ্যায়নে বাংলাদেশের শাসক শ্রেণী কখনো এশিয়ার জাপান, মালয়েশিয়া, কখনো সিঙ্গাপুর, কখনো তাইওয়ান, কখনো বা চীনকে দৃষ্টান্ত হিসেবে সামনে এনেছে। কিন্তু এ দেশের জনগণ আজও জানেন না, তাদের উন্নত আর্থিক ভবিষ্যতের যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছে বিভিন্ন সরকার, তার দার্শনিক-রাজনৈতিক ভিত্তি কী?

প্রচলিত বাজার অর্থনীতির মডেলে এ সমাজের একজন ক্রেতা-ভোক্তা বা উৎপাদক হিসেবে পক্ষগুলোর প্রাত্যহিক আচরণটি কেমন? বাজার অর্থনীতিতে উৎপাদক ও ভোক্তার স্বার্থ সমুন্নত রাখতে হয়। আভ্যন্তরীণ বাজার সম্প্রসারণে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে হয়। আর্ন্তজাতিক বাজার ঠিক রাখতে মান সম্পন্ন ও প্রতিযোগিতামূলক দরে পণ্য সরবরাহ করতে হয়। উভয়ক্ষেত্রে সচেতন ও সক্ষম ভোক্তাশ্রেণীর প্রয়োজন হয়। পণ্য উৎপাদন, মান সংরক্ষণ ও বাজারজাতের উপযুক্ত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হয়। একচেটিয়া, ভেজাল, ফাটকা কারবার ঠেকানোর কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হয়। কেনাবেচার সম্পর্ককে অঙ্গীকারবদ্ধ, বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য সম্পর্কতে পরিণত করতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশে প্রচলিত বাজার ব্যবস্থায় কী তা বিদ্যমান?

যেসব ভোক্তা সরকারি বড় কর্মকর্তা, তাদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বড় কর্মকর্তা ভোক্তাদের অভিজ্ঞতার কিছুটা মিল থাকতে পারে। কিন্তু বাদবাকী কোটি কোটি ক্রেতা-ভোক্তা ও ক্ষুদ্র উৎপাদক মানুষের প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতা তো প্রায় একই। এ নিয়ে বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি সংস্থার কিছু গবেষণা হয়তো আছে। কিন্তু তা তো প্রতিনিধিত্বকারী কিছু নয়। তাই বলে এসব যে, আমরা জানতে পারিনা তাও নয়। বাংলাদেশের দরিদ্র কৃষক-ক্ষেতমজুর, মুটে, রিকশা চালক, শ্রমিক-কর্মচারী, সরকারি-বেসরকারি পেশাজীবী, ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তা, কারখানা মালিক, রাষ্ট্র পরিচালক এদের সবারই চাহিদাগত অবস্থান পৃথক। ভোক্তা হিসেবে এদের কার ক্রয়ক্ষমতা কেমন তা আমরা সহজেই অনুমান করতে পারি। এই ক্রয় ক্ষমতা শুধুই যে সংশ্লিষ্ট কর্মজীবী-পেশাজীবীর বৈধ জীবিকাপ্রসূত, তা নয়। বরং রাজনৈতিক-প্রশাসনিক-সামাজিক ক্ষেত্রে ভোক্তা নাগরিকের অবস্থান, বৈধ-অবৈধ প্রভাব প্রতিপত্তিও তার জন্য অতিরিক্ত আয় বা ভোগের সুযোগ সৃষ্টি করে। সে জন্যই বাংলাদেশের রাজনৈতিক অর্থনীতির নিয়ন্ত্রক-সমর্থক শক্তিই এখানকার প্রধান ভোক্তা নাগরিক হিসেবে সব সময় দৃশ্যপটে অবস্থান করে। সামষ্টিক অর্থনীতিতে ভোক্তার ক্রয় ক্ষমতার সঙ্গে চাহিদা ও যোগানেরও একটি সামঞ্জস্য লক্ষ্য করা যায়। ক্রয় ক্ষমতা বাড়লে ভোগের চাহিদা বাড়ে, আর চাহিদা বৃদ্ধির অবশ্যম্ভাবী ফল হিসেবে ভোগ্যপণ্যের যোগান বৃদ্ধি পায়। যা শিল্প উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখে। এ হিসাবে বাংলাদেশের সাড়ে সতের কোটি মানুষের প্রাত্যহিক ভোগ্যপণ্য চাহিদা একেবারে কম নয়। কিন্তু ক্রয়ক্ষমতা না থাকায় জনসংখ্যার খুব ছোট একটি অংশই ঘুরেফিরে ভোগ্যপণ্যসহ অন্যান্য পণ্যের বাজারে একমাত্র ক্রেতা। জনসংখ্যার বড় অংশ ভোগ্যপণ্যসহ অন্যান্য পণ্যের বাজারে কেবলই দর্শক-শ্রোতা। কিন্তু দর্শক-শ্রোতা দিয়ে তো কোনো বাজারের সম্প্রসারণ হয়না। তাদেরকে কাজ দিয়ে, মজুরি দিয়ে সক্ষম ভোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে হয়। এই কাজটি বেসরকারি উদ্যোক্তারা সব সময় করেন না, বাজারও স্বয়ংক্রিয়ভাবে তা করতে পারে না। ফলে উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে এ কাজটি করতে হয় রাষ্ট্র ও সরকার ব্যবস্থাকে। এটি শুধুই কোনো ধারণা নয়, ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ জন মেনার্ড কেইনসের আবিস্কৃত সূত্রের সারকথাও। কেইনসের এই সূত্রটি কাজে লাগিয়েই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর ক্ষয়িষ্ণু বিশ্বপুঁজিবাদী অর্থনীতি আজও টিকে রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে যেখানে সামন্তীয় (পুরনো আমলের উৎপাদন সম্পর্ক) অবশেষগুলো এখনো অপসারিত হয়নি, সেখানে এ নীতি বাস্তবে কতটা কার্যকর? তাই ভোক্তা হিসেবে বাজার অর্থনীতির চেয়েও অন্য যে সূতোয় বাঁধা পড়েছেন এখানকার মানুষ তার নাম লুটেরা-আমলা-মুৎসুদ্দি নির্ভর রাজনৈতিক অর্থনীতি। যার উপর ভর করে এখানকার শাসকরা ক্ষয়িষ্ণু পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব অর্থনীতির সুবিধা নিয়ে বাজার প্রক্রিয়ায় এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখাতে চাইছে মানুষকে। কিন্তু এ প্রক্রিয়ায় সমাজের সব মানুষকে নিয়ে এগিয়ে যাওয়া যে সম্ভব নয়, তা ইতোমধ্যে বাংলাদেশসহ বিশ্বের পুঁজিবাদী দেশগুলোতে কম-বেশি প্রতীয়মান হয়েছে। ফলে শাসকদের দেখানো স্বপ্নের সঙ্গে বাস্তবের সংযোগ ঘটছে খুবই কম।

আমরা বাংলাদেশিরা একই ভূখন্ডের মানুষ, রাষ্ট্র ও সরকার ব্যবস্থাও একই। অথচ লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, আমাদের সতের কোটি মানুষের বেশিরভাগের সঙ্গে অল্প কিছু মানুষের জীবন যাপনের বৈপরীত্ব বড়ই অদ্ভুত। এই অদ্ভুতুড়ে পরিস্থিতি কোনো ঐশ্বরিক অবদান নয়, এখানকার রাজনৈতিক অর্থনীতিরই ধারাবাহিক প্রতিফলন। অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে লুটেরা ধনিক-বান্ধব রাজনীতি আমাদের সমাজে এমন এক দুর্ভেদ্য বৈপরীত্যের দেয়াল তৈরি করেছে যে, আমরা কম আয়ের মানুষেরা বুঝতেই পারিনা, আমরা আসলে কোন দেশে বসবাস করছি। এটি-কী সেই বাংলাদেশ, যে বাংলাদেশকে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে ঘোষণা করেছে বিশ্বব্যাংক? এটি কী সেই বাংলাদেশ! যে দেশের সংবিধানে প্রত্যেকটি মানুষের মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা দেওয়া রয়েছে? যেখানকার রাজধানী ঢাকাসহ প্রধান শহরগুলোতে দামি কার, জিপ ও বিলাস বহুল ফ্লাটের সারি? বিপনীবিতানগুলো চোখ ধাঁধানো সাজসজ্জা আর মুষ্টিমেয় মেদবহুল নারী-পুরুষদের পদভারে ভারাক্রান্ত? এটি কী সেই বাংলাদেশ, যেখানকার বেশিরভাগ মানুষ উদয়-অস্ত হাড়ভাঙ্গা শ্রম দিয়ে চলে শুধু বেঁচে থাকার জন্য? যেখানে কোটি কোটি মানুষ এখনও ফুটপাতে-বস্তিতে বসবাস করে?

প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার সঙ্গে যুদ্ধ করে জয় লাভেই অভ্যস্ত এ দেশের হত-দরিদ্র মানুষ। অথচ অর্থনৈতিক মুক্তির প্রশ্নে, নিদারুণ রাজনৈতিক পরাজয় মেনে নিয়ে, সমাজ ও রাষ্ট্রের শাসন দন্ডটি বার বার তুলে দিচ্ছে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির এ দেশীয় অনুচর একটি ক্ষয়িষ্ণু দুর্বৃত্ত পুঁজিপতি শ্রেণীর হাতে। যারা ঔপনিবেশিক সূত্রে প্রাপ্ত বিদ্যমান শোষণমূলক ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার হীন স্বার্থেই শাসন দন্ডটি করায়ত্ত করে রাজনৈতিক ছলচাতুরীর মাধ্যমে গণতন্ত্রের বুলি আওড়াচ্ছে।

কিন্তু আমরা কী কখনোই ভাবিনা যে, বাংলাদেশের আলো ঝলমল শহরে ভালোভাবে বেঁচে থাকার ঠাঁই কেন মেলে না আমাদের? প্রত্যন্ত গ্রামের রুক্ষ ভূমি, দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল কিংবা ঝঞ্জাময় উপকূলীয় জনপদেও কেন আমরা টিকে থাকতে পারি না? শহুরে ভাসমান মজুর-শ্রমিক হলেই-কী, আমরা স্বস্তি-শান্তি পাই? তা-তো নয়। তাহলে কৃষক-শ্রমিক বা ভাসমান পেশাজীবী হিসেবে স্বদেশে আমাদের মর্যাদা কোথায়? কেনই বা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে অর্থনৈতিক বৈষম্য, শোষণ-বঞ্চনা ও অপমান সইতে হচ্ছে আমাদের? এর সমাধান কোথায়?

দুই
বিভিন্ন হিসাবে বাংলাদেশের জনসংখ্যা বর্তমানে (২০১৫) সাড়ে সতের কোটি প্রায়। এ জনসংখ্যার উল্লেখযোগ্য অংশ এখনও দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। সাম্প্রতিক এক পরিসংখ্যানে জানানো হয়েছে, দেশের ৩ কোটি ৮৫ লাখ লোক দরিদ্র। যার মধ্যে ১ কোটি ৫৭ লাখ মানুষ অতিদরিদ্র যা মোট জনগোষ্ঠীর ১০ দশমিক ৬৪ শতাংশ। যারা প্রাত্যহিক ১ দশমিক ২৫ মার্কিন ডলারের কম আয় করছে। (২০০৫ সালের মূল্য স্তর অনুযায়ী মাথাপিছু ১.২৫ ডলারের কম আয়ের মানুষ)। এ ছাড়া রয়েছে বিপুল সংখ্যক কর্মক্ষম বেকার ও ছদ্মবেকার নারী-পুরুষ, অক্ষম-প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠী। এ অবস্থায় গত ২০ অক্টোবর(২০১৫) চূড়ান্ত করা হয়েছে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা। এতে আগামী ৫ বছরের মধ্যে ৩১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রাক্কলন করা হয়েছে। যার ৭৭ দশমিক ৩ শতাংশই আসবে বেসরকারি খাত থেকে। আর ২২ দশমিক ৭ ভাগ আসবে সরকারি খাত থেকে। পরিকল্পনায় গড়ে প্রতিবছর ৭ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া দারিদ্র্যের বর্তমান হার ২৪ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৮ দশমিক ৬ ভাগে আনার লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়। সামাজিক সুরক্ষা খাতে জিডিপ’র ২ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ থেকে ভাগ বাড়িয়ে ২০২০ সালে ২ দশমিক ৩০ শতাংশে উন্নীত করার কথা ঘোষণা করা হয়েছে এতে। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, ‘প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিতকরণ, নাগরিকের ক্ষমতায়ন।’কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে প্রবৃদ্ধি বাড়লেই-কী দরিদ্র মানুষের ক্ষমতায়ন সম্ভব?

অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা পরিমাপ করার জন্য হরহামেশা যেসব পরিমাপক ব্যবহার করা হয়, তাহলো- জিডিপি, মূল্যস্ফীতি, দারিদ্র্য, কর্মসংস্থান, ভোগ, বিনিয়োগ, সঞ্চয়, রিজার্ভ প্রভৃতি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এসব পরিমাপক কী আমাদের দেশের শ্রমিক-কৃষকসহ গরিব মানুষের বাস্তব জীবন সম্পর্কে সঠিক তথ্য ও নির্দেশনা দেয়? বা এসব পরিমাপের ভিত্তিতে যে অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ করা হচ্ছে, তা-কী প্রকৃত অর্থে দেশে সুষম অর্থনৈতিক বণ্টন বা সামাজিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় কাজে লাগে? কোনো রকমের গবেষণা ছাড়া, বিগত চার দশকের সাধারণ পর্যবেক্ষণ ও দৃশ্যমান বাস্তবতা থেকেও এ প্রশ্নের উত্তর হবে, না-বাচক। কেননা বাংলাদেশে অর্থনৈতিক বৈষম্য এতটাই প্রকট যে, প্রতিদিনের অভিজ্ঞতাই আমাদেরকে প্রশ্নের উত্তরটি সহজে খুঁজে নিতে সহায়তা করে।

তিন
বাংলাদেশের উন্নয়ন-দর্শনে কী ধরণের মডেল অনুসৃত হচ্ছে? শাসকশ্রেণী-কী আদৌ কোনো মডেল অনুসরণ করছে, না-কি বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ, ডব্লিউটিও, দাতাদেশসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার ইচ্ছা-অনিচ্ছাই এখানকার মডেল! বিশ্বব্যাংকের নির্দেশনায়, বাংলাদেশে কাঠামোগত সমন্বয় কর্মসূচি বা ‘স্ট্রাকচারাল অ্যাডজাস্টমেন্ট প্রোগ্রাম’পরিচালিত হচ্ছে সেই আশি দশক থেকে। পশ্চাদপদ আর্থ-সামাজিক কাঠামোর কথিত সংস্কারের কথা বলে সামঞ্জস্য তৈরির যে প্রচেষ্টা চলছে বিগত কয়েক দশক ধরে; তার ফলাফল নিশ্চয়ই পুনর্মূল্যায়নের দাবি রাখে। কথিত সংস্কার প্রক্রিয়ার সঙ্গে সমন্বিতভাবে চালু করা হয়েছিল, দারিদ্র্য বিমোচন কৌশলপত্র বা পিআরএসপি। দারিদ্র্য বিমোচনের এই কৌশলপত্রকে দফায় দফায় পরিবর্তনও করা হয়েছিল বিভিন্ন সরকারের আমলে। দারিদ্র্য প্রশমনের জন্য জাতিসংঘ কর্তৃক ২০০০ সালে ‘মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল- এমডিজি’বা সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। যাতে ২০১৫ সালের মধ্যে দারিদ্র্য গ্রহণযোগ্য স্তরে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এমডিজি’র আটটি লক্ষ্য ছিল- ক্ষুধা ও দারিদ্র্য নির্মূল, সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত, লিঙ্গ সমতা এবং নারীর ক্ষমতায়ন, শিশু মৃত্যুহার কমানো, মাতৃস্বাস্থ্যের উন্নয়ন, এইচআইভি/এইডস- ম্যালেরিয়া এবং অন্যান্য রোগব্যাধি দমন, পরিবেশগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিতকরণ এবং বিশ্বব্যাপী উন্নয়ন অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা। জাতিসংঘ কর্তৃক ইতোমধ্যে এমডিজি বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে ঘোষণা করে, নতুন করে এসডিজি বা সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল নির্ধারণ করা হয়েছে। যার উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয়েছে, টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা। এসডিজি’র প্রধান লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে দারিদ্র্যের হার শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনা। এসডিজি’তে রাখা হয়েছে ১৭টি এজেন্ডা। বাংলাদেশসহ বিশ্বের ১৫০ রাষ্ট্রপ্রধান নিজ নিজ দেশে এসডিজি বাস্তবায়নে অঙ্গীকার করেছেন। অন্যদিকে কর্মপরিকল্পনার সঙ্গে একমত পোষণ করেছে ১৯৩টি দেশ।

প্রশ্ন হলো, তাহলে এতদিন যেসব উন্নয়ন হয়েছে বলে প্রচার করা হচ্ছিল, তা-যে মোটেও টেকসই কিছু হয়নি, বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ-ডব্লিউটিওসহ তাদের সহযোগী শাসক-আমলা-দালালদের নতুন কর্মসূচির মাধ্যমেই-কী তা প্রমাণিত হয় না।

চার
বাংলাদেশে যেসব সংস্কার ও দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি চলছে, তাতে গরিব মানুষ কতটা উপকৃত হয়েছেন? কৃষিখাতে সামন্তীয়-মহাজনী ব্যবস্থা উচ্ছেদ করে উৎপাদন-বণ্টন ব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার-কী শাসকরা করেছে? দরিদ্র কৃষকরা কী এখন আধুনিক চাষাবাদের সুযোগ পাচ্ছেন? জমির অধিকার, প্রকৃতি বান্ধব সার-বীজ-কীটনাশক, কলের লাঙল, চাষের অর্থ প্রভৃতি উপকরণ-কী গ্রামীণ কৃষকের হাতে সুলভে পৌঁছেছে? ফসল উৎপাদন ও বাজারজাতের মাধ্যমে কৃষকের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করা কী সম্ভব হয়েছে? গ্রাম ও শহরের কোটি কোটি ভূমিহীন পরিবার-কী আবাসন ও কৃষি জমির অধিকার পেয়েছেন? ক্ষুদ্র জাতি-গোষ্ঠীর মানুষরা-কী সমান নাগরিক মর্যাদা ও আর্থিক নিশ্চয়তা পান? যে কোনো অর্থনৈতিক সংস্কারে সফলতা অর্জনের ক্ষেত্রে এসব-যে, একবারেই মৌলিক প্রশ্ন।

এ ছাড়া আইএমএফের পরামর্শে ওই সময় থেকে ব্যাংক-বিমা, আর্থিক খাতসহ ব্যবসা-বাণিজ্য নীতির কথিত সংস্কার, কল-কারখানা বেসরকারিকরণ ও আমদানি উদারীকরণ, বাংলাদেশি টাকার ভাসমান বিনিময় হার চালু, সম্প্রসারণশীল মুদ্রানীতি ও পুঁজিবাজারের অটোমেশনসহ বহুমুখী সংস্কার পদক্ষেপের কথা আমরা বহুবার শুনেছি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কথিত সংস্কারের মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতে কী খেলাপী ঋণ বা অবলোপন ঋণ কমেছে? বীমা খাতের অবৈধ কমিশন, প্রতারণা, ভুয়া দায় পরিশোধ বন্ধ বা প্রকৃত দায় শোধের অঙ্গীকার-কী বাস্তবায়িত হয়েছে? বাণিজ্যিক ব্যাংক বা ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক খাতের অনিয়ম, ফাটকা কারবার-কী বন্ধ হয়েছে?

শেয়ার বাজারের নীতি-কৌশল ও কাঠামোগত সংস্কার-কী ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদেরকে পুঁজির নিরাপত্তা দিচ্ছে? পুঁজি বাজারে কী গুজব নির্ভর বিনিয়োগ বন্ধ রয়েছে? অসাধু বাজার খেলোয়াড়েরা কী এখন নিষ্ক্রিয়?

সরকারি শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানসমূহে ঢালাও বেসরকারিকরণ, শ্রমিক ছাঁটাই, লে-অফ, লে-আউট, গোল্ডেন হ্যন্ডশেক প্রভৃতি তৎপরতার মাধ্যমে কতটা গতিশীল হয়েছে? বেসরকারি খাতে কর্পোরেট সুশাসন-কী বাস্তবে কিছু আছে? চেম্বার অব কমার্সসহ ব্যবসায়ী সমিতিগুলো কী সাধারণ ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষা করছে? সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও কল কারখানায়- কী শ্রম আইন মেনে চলা হচ্ছে?

এ প্রক্রিয়ায় সরকারি-আধাসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা ভোক্তা বা জনবান্ধব হয়েছে? আইন-বিচার-প্রশাসন ও স্থানীয় সরকার প্রভৃতি ক্ষেত্রে যে নীতি-কাঠামোগত সংস্কার চলছে, তা কী শ্রমিক-কৃষকসহ গরিব মানুষের প্রতি সামাজিক ও প্রশাসনিক ন্যায়বোধ নিশ্চিত করেছে? এসব প্রতিষ্ঠানে গরিব মানুষের অভিগম্যতা সৃষ্টি হয়েছে? রাজনৈতিক সংগঠন সংস্কারের কতদূর বাস্তবায়িত হয়েছে? গণতন্ত্রের বুলি আওড়ানো বড় বড় দলগুলোর বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা কী গণতান্ত্রিক পন্থায় নির্বাচিত হন? দলগুলোর তহবিল সংগ্রহ ও ব্যয় প্রক্রিয়া কী স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক?

দেশের শ্রমিক-কৃষকসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের পেশাজীবী মানুষেরা-কী তাদের শ্রেণী-পেশাগত অধিকার বাস্তবায়নে স্বাধীনভাবে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন? জনগণের ন্যূনতম গণতান্ত্রিক ও মানবিক অধিকারটুকুর প্রতি শাসকরা কী সম্মান দেখাচ্ছে?

ভাটি অঞ্চলের গরিব মানুষেরা কী স্বাভাবিক জীবন-যাপনের সুযোগ পান? চরাঞ্চলের দরিদ্র কৃষক ও জেলেদের অবস্থাই বা-কী? চা শ্রমিকরা কী এখনও দৈনিক ৭০টাকা মজুরীতেই জীবন বাঁচান? হোটেল-রেষ্টুরেন্ট-বেকারি শিল্পে-কী শ্রম আইন বলবত আছে? আসবাব ও পাদুকা শিল্পের শ্রমিকরা-কী নিয়মিত সঠিক মজুরি পান? পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের চাকুরী, মজুরি ও জীবনের নিরাপত্তা কী নিশ্চিত হয়েছে? পাটকল শ্রমিকদের অবস্থা কী? মৎস্য প্রক্রিয়াকরণসহ বিভিন্ন খাতের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে কী শ্রম আইন কার্যকর? মজুরি ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ বা লিঙ্গ বৈষম্য কী এখনো বিদ্যমান? কাজের পরিবেশ ও জীবন মান নিয়ে সকল স্তরের শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি মানুষ কী সন্তুষ্ট? দরিদ্র শিশু-কিশোর-তরুণ-যুবকরা কী তাদের মৌলিক নাগরিক অধিকার ভোগ করতে পারছে? কন্যাশিশু, কিশোরী-তরুণী ও যুব নারীদের অর্থনৈতিক-সামাজিক নিরাপত্তা কী নিশ্চিত?

আমরা লক্ষ্য করছি, অন্যায্য পরিস্থিতির শিকার হয়ে পতিতাবৃত্তিসহ নানাবিধ অসামাজিক তৎপরতায় লিপ্ত রয়েছেন লাখ-লাখ নারী-পুরুষ। পাটকল শ্রমিকরা কাজ ও মজুরির দাবিতে রাজপথে নেমে আসছেন। পোশাক শ্রমিকদের নামমাত্র মজুরিতে শ্রম দিতে বাধ্য করা হচ্ছে। হোটেল-রেষ্টুরেন্ট-বেকারি, ইমারত-আসবাব-পাদুকাসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে ন্যূনতম মজুরিসহ অন্যান্য শ্রম আইন মানা হয় না। মানবেতর জীবন যাপন করছেন চা শ্রমিকরা। শহুরে বিভিন্ন পেশার ভাসমান শ্রমিকদের কাজ-মজুরি-জীবন কোনটিরই নিরাপত্তা নেই। মৎস্য প্রক্রিয়াকরণ ও চামড়া শিল্পের শ্রমিকদের জীবন যাপন বড়ই করুণ। প্রকাশনা শিল্পের শ্রমিকদের প্রতিনিয়তই ঘিরে ধরে অনিশ্চয়তা। লাইট ফিটিংস-হালকা প্রকৌশল শিল্পে ঘুরপাক খাচ্ছে লাখ লাখ শিশু-কিশোরের বন্দী জীবন। সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ের শিকার হয়ে মাদকাসক্তি-ছিনতাই-চাঁদাবাজি-সন্ত্রাসসহ নানাবিধ অসামাজিক তৎপরতায় জড়িয়ে পড়ছে কিশোর-তরুণরা। পেটের দায়ে বিরূপ পরিবেশে অমানবিক শ্রম দিতে বাধ্য হচ্ছে লাখ লাখ শিশু। প্রশ্ন হলো, প্রচলিত অর্থনৈতিক নীতিতে এরা কী কখনো সমাজের মূলধারায় একাত্ম হওয়ার সুযোগ পাবেন?

এছাড়া অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের সঙ্গে শিক্ষা-সংস্কৃতি-বিনোদন-চিন্তন প্রভৃতি ক্ষেত্রে যে সঙ্গতিপূর্ণ সংস্কার ও উন্নয়ন দরকার ছিল, তারই বা প্রকৃত অবস্থা কী?
গরিব মানুষের সন্তানরা কী উপযুক্ত শিক্ষা, সুস্থ সংস্কৃতি ও নির্মল বিনোদনের সুযোগ পান? বুদ্ধিজীবী, লেখক-প্রকাশকরা কী জনগণ ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষার প্রয়োজনে স্বাধীন চিন্তার প্রকাশ ও প্রচারে সক্ষম? জাতির বিবেক হিসেবে পরিচিত সাংবাদিকেরা কী জাতীয় স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করেন? এসবও একেবারেই মৌলিক প্রশ্ন যে কোনো সংস্কার কার্যক্রমে সাফল্য অর্জনের ক্ষেত্রে। সর্বোপরি প্রশ্ন হলো, আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের অভিজ্ঞতা কী-বলে? সংস্কারে জনগণের সমর্থন ও স্বীকৃতি পেতে হলে এসব প্রশ্নের সঠিক উত্তরের প্রয়োজন নিশ্চয়ই রয়েছে। কিন্তু উল্লেখিত প্রশ্নগুলোর অবতারণা করতে সক্ষম, কোনো রাজনৈতিক, সামাজিক প্রতিষ্ঠান বা গণমানুষের শক্তি সংঘ-কী এখনো অবশিষ্ট আছে?

পাঁচ
বাংলাদেশে আর্থ-সামাজিক সংস্কারের দোহাই দিয়ে কথিত পুঁজিবাদী মডেল অনুসরণে বাজারমুখী অর্থনৈতিক নীতির প্রাধান্য আমরা দেখছি সেই আশি দশক থেকে। মুক্তবাজার অর্থনীতির কথা বলে বেসরকারি খাতের নিয়ম নীতিহীন সম্প্রসারণ ও অবাধ আমদানি-রপ্তানির সুযোগ তখন থেকে শুরু হয়ে বিভিন্ন রূপে আবর্তিত হয়েছে। বাজারমুখী সংস্কার ও উন্নয়নের নামে এখানে গত কয়েক দশক ধরে যা চলছে, তা হল সরকারি কলকারখানা-প্রতিষ্ঠান বেসরকারিকরণের নামে রাষ্ট্রীয় সম্পদের ঢালাও লুণ্ঠন কার্যক্রম। যা পাকিস্তান আমলে বিদ্যমান নয়াঔপনিবেশিক আধা-সামন্তবাদী অর্থনীতির ধারাবাহিকতা হলেও, বাংলাদেশ সংস্করণে এসে তীব্র লুটেরা চরিত্র লাভ করেছে। যে কারণে দুর্নীতিতে পর পর তিনবার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরবও(!) অর্জন করেছিল বাংলাদেশ। বর্তমান বৈশ্বিক বিবেচনায় সেই শীর্ষ অবস্থানটি না থাকলেও, এটি মনে করার কোনো কারণ নেই যে, বাংলাদেশে দুর্নীতি কমে গেছে। বরং এভাবেই রাষ্ট্রায়ত্ত খাতে সীমাহীন ঘুষ-দুর্নীতি-লুণ্ঠন, বেসরকারি খাতে শোষণ-নির্যাতন, অনিয়ম-দখল, চাঁদাবাজি-মাস্তানি, রাজস্ব ফাঁকি, ভেজাল পণ্য বাজারজাত, সোনা ও মাদক পাচার, অবৈধ বাণিজ্যসহ, বিভিন্ন অনৈতিক সুযোগ-সুবিধা দিয়ে পুঁজি সঞ্চয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশে একটি নতুন পুঁজিপতি শ্রেণী তৈরি করা হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন নতুন ব্যাংক-বীমার অনুমোদন, অবকাঠামো নির্মাণ, সরকারি ভূমি লিজ, ঠিকাদারী, আমদানি-রপ্তানির লাইসেন্স প্রভৃতির যথেচ্ছাচার করে এই শ্রেণীর আকার সম্প্রসারণ করার জোর প্রচেষ্টা চলছে। যার ফলে এমন এক পুঁজিপতি শ্রেণীর অস্তিত্ব আমরা লক্ষ্য করছি- দেশপ্রেম, জাতীয়স্বার্থ ও জনস্বার্থ রক্ষার প্রশ্নে যারা সর্বদা পিছু হটতেই অভ্যস্ত। এভাবে সীমিত সম্পদ ও সামর্থ্যের ভাগবাটোয়ারার মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি সুবিধাভোগী বিশেষ শ্রেণীর কাছে জিম্মি করে রাখা হয়েছে। আর এদের প্রয়োজনেই সংস্কার ও উন্নয়নের নামে দুর্নীতি-লুটপাটের নতুন নতুন কৌশল উদ্ভাবনের দৃষ্টান্ত দেখা গেছে। আবার অপরাধ ও দুর্নীতি দমনের নামেও বিভিন্ন ধরনের পক্ষপাতদুষ্ট, প্রদর্শনীমূলক ও প্রতারণাসর্বস্ব, প্রতিপক্ষ দমনের প্রশাসনিক অভিযান আমরা লক্ষ্য করেছি। কিন্তু তাতে অপরাধ-দুর্নীতি এতটুকু কমেছে? বরং সামগ্রিকভাবে অপরাধ প্রবণতা এতোই সর্বগ্রাসী চেহারা নিয়ে উপস্থিত হয়েছে যে, নৈতিকতা-সততা-দায়িত্বশীলতার সামাজিক বন্ধনগুলো প্রায় ধসে পড়েছে। ফলে ‘উন্নয়ন’ বলতে এখানে নীতি নির্ধারক, কমিশনভোগী, সরবরাহকারী, কার্যনির্বাহক এবং বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষের যোগসাজশে শত শত কোটি টাকা লোপাটের আনুষ্ঠানিকতাই মুখ্য বিষয় হয়ে উঠেছে। এখানে উন্নয়ন এবং দুর্নীতি সমার্থক শব্দ। সরকারি জমি, পুকুর-জলাশয়, খাল-বিল-নদী অবৈধভাবে দখল ও ভরাট করার মাধ্যমে বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণও এখানে ‘উন্নয়ন’। সাধারণ মানুষের অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা ও আবাসন প্রাপ্তির মৌলিক অধিকারকে জিম্মি করে সীমাহীন মুনাফা লুটার অবাধ কর্মকান্ডও এখানে ‘উন্নয়ন’হিসেবেই স্বীকৃত ও প্রদর্শিত। এসবই আবার সফল প্রকল্প হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের মতো সাম্রাজ্যবাদী সংস্থাগুলোর কাছে। উন্নয়নের কথা বলেই বিগত চার দশকে এখানে গড়ে উঠেছে দু’সহস্রাধিক বেসরকারি সংস্থা বা এনজিও। উন্নয়নের এই ফেরিওয়ালারা প্রথমদিকে নিজেদেরকে অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ঘোষণা করলেও, দরিদ্র জনগণের উপর শোষণ-নির্যাতন চালিয়ে ইতোমধ্যে হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক বনে গেছে। গ্রামীণ ব্যাংক, ব্র্যাক, আশাসহ বড় বড় বেসরকারি সংস্থাগুলো পণ্যবাজারে এখন দেশীয় করপোরেট ও বিদেশি বহুজাতিক সংস্থাগুলোর মতোই প্রতিযোগিতা করে। অথচ এসব সংস্থার কাছ থেকে নেয়া ঋণের উচ্চ সুদ পরিশোধ করতে গিয়ে নিঃস্ব থেকে আরো নিঃস্ব হয়েছেন গরিব মানুষ।

আর শুধু বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাই নয়, আত্মকর্মসংস্থানের প্রলোভনে আইটিসিএল, যুবক, ডেসটিনিসহ শত শত প্রতিষ্ঠানের প্রতারণামূলক কর্মকান্ডের মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে লাখ লাখ নারী-পুরুষকে নিঃস্ব করা হয়েছে বিগত কয়েক দশকে। কৃত্রিম মুনাফা ও সম্পদ দেখিয়ে বিভিন্ন দেশি-বিদেশি কোম্পানি কর্তৃক পুঁজি বাজারে শেয়ার ছেড়ে হাতিয়ে নেয়া হয়েছে আরো হাজার হাজার কোটি টাকা। শেয়ার বাজারে কারসাজির মাধ্যমে দফায় দফায় কয়েক হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের। পরিসংখ্যান বলছে, অব্যাহত অপরাধ, দুর্নীতি ও দুর্র্বত্তায়নের মাধ্যমে সম্পদ পুঞ্জিভূত করে বিত্তশালী শ্রেণীর প্রসার ঘটানোর চেষ্টা সাম্প্রতিক সময়ে এসে যথেষ্ট পরিণতি লাভ করেছে। আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থা ক্রেডিট সুসির সাম্প্রতিক এক জরিপের ফলাফলে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে গত ১৫ বছরে মানুষের সম্পদ বেড়েছে তিনগুণ; আর প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকদের হাতে থাকা সম্পদের পরিমাণ বেড়ে হয়েছে দ্বিগুণের বেশি। ক্রেডিট সুসির তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালে বাংলাদেশের মোট প্রাপ্ত বয়স্ক নাগরিকের সংখ্যা ছিল ৭ কোটি ২৬ লাখের বেশি। আর ২০১৫ সালের মাঝামাঝি এসে তা ১০ কোটি ৭২ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। ২০০০ সালে বাংলাদেশের মানুষের হাতে ৭৮ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ সম্পদ ছিল। ১৫ বছরের মাথায় যা বেড়ে হয়েছে ২৩৭ বিলিয়ন। এদের মধ্যে ১২ লাখ বাংলাদেশিকে ‘মধ্যবিত্ত’হিসেবে চিহ্নিত করেছে ক্রেডিট সুসি, যাদের প্রত্যেকের হাতে অন্তত ১৭ হাজার ৮৮৬ ডলারের সম্পদ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ বছরে বাংলাদেশে পূর্ণবয়স্ক জনগোষ্ঠীর মাথাপিছু সম্পদ ১০৬৯ ডলার থেকে বেড়ে ২২০১ ডলার হয়েছে। এর মধ্যে আর্থিক সম্পদের পরিমাণ গড়ে ৪৪১ ডলার থেকে বেড়ে ৭৯৫ ডলার হয়েছে। আর স্থাবর সম্পদের পরিমাণ ৬৫২ ডলার থেকে বেড়ে হয়েছে ১৪৭০ ডলার।

প্রশ্ন হলো, বিশেষ শ্রেণীর হাতে সম্পদের এই সঞ্চয়ন-কী সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পেরেছে? আমাদের জন-সমাজের দিকে চোখমেলে তাকালে, এ প্রশ্নের উত্তর তো না-বাচকই হচ্ছে।

ছয়
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান-বিআইডিএস গত ৫ নভেম্বর(২০১৫) প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলেছে, দেশের সাড়ে তিন কোটি মানুষ এখন মধ্যবিত্ত। প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা পরিচালক বিনায়ক সেন বলেন, ‘মধ্যবিত্ত শ্রেণী নির্ধারণে সর্বজনস্বীকৃত কোনো সংজ্ঞা নেই। পিপিপি (ক্রয় ক্ষমতার সাম্য) অনুযায়ী সাধারণত কারো দৈনিক আয় ২ ডলার থেকে ৩ ডলার হলে সে মধ্যশ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। আর ৩ থেকে ৪ ডলারের মধ্যে হলে উচ্চ মধ্যবিত্তের অন্তর্ভুক্ত হবে। এ হিসাবে ১৯৯০ সালে বাংলাদেশে যেখানে ৯ ভাগ জনগোষ্ঠী মধ্যবিত্ত ছিল, ২০১০ সাল পর্যন্ত এ সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি বেড়ে ২০ ভাগে দাঁড়িয়েছে। এ হার ২০২৫ সালে ২৫ ভাগ ও ২০৩৩ সালে ৩৩ ভাগ হবে।’গবেষণা পরিচালক বিনায়ক সেন প্রথম আলোকে বলেছেন, ২০১৫ সালে এসে মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠী সাড়ে ২২ শতাংশ হবে। বিআইডিএস এও বলেছে, আন্তর্জাতিকভাবে এ হিসাবটি স্বীকৃত। গবেষণাটি হয়েছে ঢাকা শহরের ১২টি এলাকায় ৮০৯টি নমুনার ভিত্তিতে।

বিআইডিএস-এর এই গবেষণা প্রতিবেদন সত্যি ধরে ৩ কোটি মানুষের দৈনিক আয় ৩-৪ ডলার অনুযায়ী হিসাব করলে যে চিত্র বেরিয়ে আসে তা-কী আসলেই স্বচ্ছল মধ্যবিত্তের? ২০১০ সালের ৩০ ডিসেম্বরে বাংলাদেশ ব্যাংকের দর অনুযায়ী প্রতি মার্কিন ডলার ছিল ৭০টাকা ৭৫ পয়সা। সে হিসাবে প্রতিদিন ৪ ডলার আয়কারী ব্যক্তির মোট আয় দাঁড়ায় ২৮৩ টাকা। ওই বছরের আনুমানিক ৬শতাংশ মূল্যস্ফীতি ধরে ১৮ টাকা বিয়োগ করলে ৪ জনের পরিবারে প্রকৃত আয় দাঁড়াবে (২৮৩-১৮) মোট ২৬৫ টাকা। পরিবারটির বাসাভাড়া বাবদ দৈনিক ন্যুনতম ১৫০ টাকা বাদ দিলে অবশিষ্ট থাকে(২৬৫-১৫০) মোট ১১৫টাকা। দুই শিশু ও বাবা-মাসহ চারজনের প্রতি বেলা খাবার ও অন্যান্য ব্যয়ের জন্য তাদের অবশিষ্ট থাকে (১১৫/৩) মোট ৩৮.৩৩ টাকা। এবার যদি ঢাকার সংশ্লিষ্ট জরিপ এলাকার কোনো রিকশাচালককে জিজ্ঞাসা করা হয়, ওই বছর শুধু খাবার খেতে এক দিনে তার ব্যয় কত ছিল, তাহলে যে অঙ্ক বলবে তা নিশ্চয়ই ৩৮.৩৩ টাকার চেয়ে বেশি হবে।
আর এই হিসাবটি পশ্চিমা কোনো দেশের প্রেক্ষাপটে করলে নিশ্চিত ভিমরি খাওয়ার উপক্রম হবে। কারণ প্রাত্যহিক ৪ ডলার আয় করে ওইসব দেশে দরিদ্রদেরও টিকে থাকার সুযোগ নেই। তাই বিআইডিএস তাদের গবেষণাকে আন্তর্জাতিক মানের দাবি করলেও বাস্তবে এটি যে অন্তঃসারশূন্য, তা সাধারণ মানুষও বুঝতে সক্ষম। তা ছাড়া এই গবেষণায় যে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বর্ণনা উঠে এসেছে এরা কেউই কিন্তু কৃষক নন। তাহলে এককালের বাংলাদেশের কৃষি নির্ভর সমাজের কৃষকদের অবস্থা কী? আর জিডিপি’তে কৃষি বহির্ভূত খাতের অংশ বৃদ্ধির যে প্রচেষ্টা চলছে, সে প্রক্রিয়াটি কী পরিকল্পিতভাবে গ্রামীণ জোতদার-টাউট কর্তৃক কৃষি থেকে কৃষক উচ্ছেদ?

তাছাড়া বেসরকারিকরণ প্রক্রিয়ায় লুণ্ঠন-অনিয়ম, প্রতারণা ও দুর্নীতির মাধ্যমে যে নতুন বিত্তশালী শ্রেণীর সম্প্রসারণ ঘটানো হলো, এদের মাধ্যমে নতুন মধ্যবিত্তশ্রেণী কতটা উপকৃত হচ্ছে? অভিজ্ঞতা বলছে, নিজেদের লোভে-লাভে অপরাধ-প্রতারণা, চাঁদাবাজি-মাস্তানি, খুন-জখম, মাদক ও নারী পাচার, শোষণ-নির্যাতন-দখলসহ এমন কোনো অপকর্ম নেই, যার সঙ্গে এই বিত্তশালী শ্রেণীর মানুষ যুক্ত হচ্ছেন না। বিশেষ করে ফসলি জমি, খাল-বিল-জলাশয়-সৈকত-নদী-নালা দখল করে, তার দাম কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেখিয়ে ব্যাংক ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রে যে সাফল্য প্রদর্শন করেছে এই দুর্বৃত্ত শ্রেণী, তা এক কথায় ‘অভাবনীয়’। শ্রম ক্ষেত্রে যে শোষণ-বঞ্চনা, অনিয়ম, নৈরাজ্যকে সঙ্গী করে কল-কারখানা ও উৎপাদন প্রতিষ্ঠানের সম্প্রসারণ ঘটানো হয়েছে, তাও এক কথায় ‘অভূতপূর্ব’। বলা দরকার এই বিত্তশালী শ্রেণীই নিজেদের স্বার্থে সমাজে সকল ধরনের দুর্নীতি-অনিয়ম-দস্যুপনা জিইয়ে রেখেছে। যার সংক্রমণ ঘটেছে কথিত নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যেও।

আর এভাবে লাখ লাখ লুটেরাদের অঢেল সম্পদের বদৌলতে কোটি কোটি জনগণের মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি প্রদর্শনে সরকার আক্ষরিক অর্থে সাফল্য অর্জন করেছে বটে। কিন্তু তাতে গরিব-মধ্যবিত্ত সাধারণ মানুষের লাভ কী এই যে, তারা কোনোমতে জীবনতো বাঁচিয়ে রেখেছেন!
মার্কিন টিভি চ্যানেল সিএনএন ‘ইন্সটিটিউট ফর গ্লোবাল লেবার অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস’-এর গবেষণা থেকে হিসেব করে দেখিয়েছে, নিউইয়র্কে বাংলাদেশের পোশাক যে দামে বিক্রি হয় তার শতকরা ৬০ ভাগই পায় সে দেশের বায়ার ও বিখ্যাত ব্র্যান্ড বিক্রেতারা, উৎপাদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যাদের কোনো সম্পর্ক নেই। বাকি ৪০ ভাগের মধ্যে উৎপাদন প্যাকেজ ও পরিবহন খরচ এবং মালিকের মুনাফা অন্তর্ভূক্ত। শ্রমিকের মজুরি একেবারে তলায়, যা শতকরা ১ ভাগেরও কম।

এই তথ্য জানান দিচ্ছে, বাংলাদেশে শোষণ-লুণ্ঠনের সুবিধাভোগী শুধু এ দেশের শিল্প মালিকরাই নয়, পোশাক শিল্পের ক্রেতা দেশগুলোর ধনী মালিকরাও। একদিকে শ্রমিকদের এই নিম্নস্তরের মজুরিতে কাজ করতে বাধ্য করছে সরকার ও দেশি-বিদেশি মালিকদের গোপন আঁতাত। অন্যদিকে শাসকরা দেশি-বিদেশি ব্যাপক শোষণ লুণ্ঠনের সঙ্গে নিজেদের বেতন-বোনাস বাড়িয়ে নিয়ে আয়ের ক্ষেত্রে আকাশ-পাতাল বৈষম্য তৈরি করেছে। আবার শাসকদের ঘাড়ে বসে মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা ধনী দেশগুলো ‘দাতা’বা ‘উন্নয়ন সহযোগী’র ছদ্মাবরণে বাংলাদেশে ‘গরিবের বন্ধু’হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে তাদের শোষণ-লুণ্ঠনের স্বার্থে বিভিন্ন তৎপরতা চালাচ্ছে। অথচ এমডিজি বাস্তবায়নের পরামর্শ দিলেও নির্ধারিত সময়ে প্রতিশ্রুত অর্থ সাহায্য দিতেও ব্যর্থ হয়েছিল বেশিরভাগ দাতা দেশ।

আমরা দেখছি, বর্তমানে রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের প্রধান শহরগুলোতে বেসরকারি খাতে বিপুলসংখ্যক প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস-জিপের ব্যবহার, বিপনী বিতান, বিলাস বহুল ফ্লাট, বেসরকারি হাসপাতাল, পর্যটন, হোটেল, রেষ্টুরেণ্ট, সুপার শপ, বিনোদন পার্ক ও বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছে। একইসঙ্গে এসব খাতে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে বিশাল এক সামর্থবান ভোক্তাশ্রেণী। যা সম্প্রসারিত পুঁজিপতি শ্রেণীর বিত্তবৈভবকেই তুলে ধরছে। কিন্তু এসব বিত্তবৈভব কী দারিদ্র্য ও বৈষম্য কমাতে সহায়তা করছে?

সাত
বাংলাদেশের শিল্পখাতে তৈরি পোশাক (ওভেন ও নিট), হিমায়িত খাদ্য, পাটপণ্য, চামড়া, কাঁচাপাট, রাসায়নিক দ্রব্য, ওষুধ শিল্প, প্লাস্টিক শিল্প, পাদুকা শিল্প, আসবাব শিল্প, চিংড়ী, হস্তজাত শিল্পসহ অন্যান্য প্রায় ১৯৮ খাতের রপ্তানিমুখী কার্যক্রম রয়েছে। কিন্তু রপ্তানি আয়ের প্রায় নব্বইভাগই আসে একমাত্র পোশাক শিল্প থেকে। আবার রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানিতেই ব্যয় হয় এ খাতের রপ্তানি আয়ের বেশিরভাগ অর্থ। এ ছাড়া এসব খাতের রপ্তানি অঙ্কের বিপরীতে সরকারি প্রণোদনা বাবদ প্রতিবছরই শত শত কোটি টাকা ব্যয় করা হচ্ছে। আবার রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চল বা ইপিজেডগুলোর পণ্য রপ্তানির উপরও বিভিন্ন ধরনের ছাড় দিয়ে বিদেশি বিনিয়োগ আর্কষণ ও ধরে রাখার কসরত চলছে। তবুও বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক ব্যবসায় পরিবেশ সূচকে বাংলাদেশের ১৭৪ তম অবস্থানের যে চিত্র উঠে এসেছে তা ব্যবসার জন্য মোটেই ইতিবাচক নয়। সরকারের অনুমতি, ভূমির সংস্থান, মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ, অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্প ঋণ কিংবা সুদের হার কোনোটিই শিল্প-বাণিজ্য সম্প্রসারণের অনুকূল নয়। তবুও এখানে ব্যবসা টিকিয়ে রাখার বা টিকে থাকার মূলে রয়েছে দরিদ্র মানুষের সহজলভ্য সস্তা শ্রম ও বিভিন্ন কায়দায় কর ও রাজস্ব ফাঁকির সুযোগ। ফলে প্রতিবছরের বাজেটে সামগ্রিক উন্নয়ন (অর্থনৈতিক-সামাজিক-রাজনৈতিক) টেকসই করার কথা বলা হলেও বাস্তবে তা সম্ভব হচ্ছে না।

একইসঙ্গে বিদ্যুৎ, রেল, সড়ক, স্থল ও নৌ বন্দর কাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্র আরো প্রসারিত করার কথা বলা হলেও বাস্তবে এ সব উন্নয়নের পুরোভাগে- জাতীয় ও জনস্বার্থ গুরুত্ব পাচ্ছে না। কৃষি খাতে ধান-চাল উৎপাদনে উদ্বৃত্তের কথা প্রচার করা হলেও বাস্তবে প্রতি বছরই চাল আমদানি করতে হচ্ছে। এ ছাড়া চিনি, লবণ, ভোজ্যতেল, পেয়াজ-রসুন, হলুদ, গম, ডাল, ফলসহ নানাবিধ কৃষিপণ্যের অবাধ আমদানি তো রয়েছেই।
কার্যকর উদ্যোগের অভাবে দুর্বল গণপরিবহন ব্যবস্থা, রুগ্ন স্বাস্থ্য-চিকিৎসা খাত, লোকসানি শিল্প-কারখানা, স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসার ভঙ্গুর শিক্ষা ব্যবস্থা, দালাল-ফড়িয়া ভিত্তিক পণ্য বাজারজাত কার্যক্রম পোক্ত আসন গেঁড়ে বসেছে। রেল যোগাযোগ এখনও সেই ব্রিটিশ শাসনামলের পর্যায়ে রয়েছে। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে রেল ব্যবস্থার আরো সঙ্কোচন ঘটেছে। আরো করুণ অবস্থা বিরাজ করছে নৌ-যোগাযোগের ক্ষেত্রে। ফলে বাণিজ্য সম্প্রসারণে বড় বড় বুলি আওড়ালেও কার্যত জিডিপি’র সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠছে না। ফলে স্বল্প সংখ্যক গণপরিবহণে গাদাগাদি করে ব্যাপক নিম্ন আয়ের মানুষের নিরুপায় ভ্রমণের চিত্র, জাতীয় দুর্ভোগেরই প্রামাণ্যচিত্র হিসেবে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে সড়কে ও নৌপথে চাঁদাবাজি, ডাকাতি, যানজট, নদী ভরাট প্রভৃতি নিত্য বাধা হিসেবে উপস্থিত হচ্ছে। সার্বজনীন ভোক্তা বাজারের বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছে ভেজালপণ্য, বিষময় কৃষি-মৎস্য-পোল্ট্রি, ফল-ফলাদিতে ফরমালিন যুক্তকরাসহ বহুমুখী অপরাধ সংঘটন ও চতুর্মুখী প্রতারণার উন্মুক্ত ক্ষেত্র। চারিদিকে নকল ও বিদেশি নিম্নমানের পণ্যের অজস্র দোকানপাট, চতুর ফেরিওয়ালা, প্রতারক উদ্যোক্তা-ব্যবসায়ী, ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়, দূষণ আর তোষণের বেহায়াবৃত্তিময় পরিবেশ। যা লুটেরা-দুর্বৃত্ত পরিবেষ্টিত দুর্নীতি ও অপরাধমূলক অর্থনৈতিক-বাণিজ্যিক কর্মকান্ডেরই বহিঃপ্রকাশ।

আট
অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, কোনো সরকারি-বেসরকারি খাত যখন উন্নয়নের কর্মপরিকল্পনা পেশ করে, তখনই নতুন করে ভুক্তভোগী হয় কিছু মানুষ। কারো জমি, কারো জীবিকা, কারো জলাশয়, কারো জন্মগত ও সাংবিধানিক অধিকার হরণ করে যে কথিত উন্নয়ন কর্মকান্ড চলে, তা জন্ম দেয় নতুন ধরণের নিঃস্ব-রিক্ত মানুষের। এভাবে একদিকে যখন কথিত উন্নয়ন চলছে, তখন অন্যদিকে ঘটছে নীরব নিঃস্বকরণ। এই নিঃস্বকরণ প্রক্রিয়ার শিকার মূলত তারাই, যাদের আর্থিক-সামাজিক-প্রশাসনিক অভিগম্যতা অত্যন্ত নিম্নপর্যায়ে। এ প্রক্রিয়ায় সর্বস্ব হারিয়ে নতুন করে দরিদ্রের খাতায় যারা নাম লেখাচ্ছেন, তারা যে কোনো মতে আবার আগের পর্যায়ে উঠতে পারছেন, তা-তো নয়। তাই এদের কেউ বেঁচে থাকার তাগিদে অপরাধ কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ছে, আবার কেউ পাচার হয়ে যাচ্ছে স্বচ্ছল জীবনের প্রলোভনে। ফলে এমনই এক জটিল আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে বাংলাদেশের উন্নয়ন, যা শ্রমিক-কৃষকসহ নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনে অভিশাপ না আশীর্বাদ সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। একদিকে ধারাবাহিক মূল্যস্ফীতির চাপ অন্যদিকে দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তা-ব্যবসায়ী ছদ্মবেশী দুর্বৃত্ত-প্রতারকদের কবলে পড়ে ক্রমে নিঃশেষ হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। আর দেশের সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্রের সহায়তায় বিদ্যমান অপশাসন ব্যবস্থাকে দীর্ঘস্থায়ী করার অপচেষ্টা চলছে। দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নের সুবিধাভোগী কথিত শিক্ষিত যে শ্রেণীটির উপর নির্ভর করে শাসকশ্রেণী কর্তৃক জাতীয় মুক্তি ও স্বাধীনতা রক্ষার প্রদর্শনী চলছে; এরা প্রকৃত পক্ষে জাতীয় স্বার্থ বিকিয়ে দিয়েই সম্পদের ভান্ডার গড়ে তুলেছে। অপরাধ-দুর্নীতি নির্ভর এদের দুর্বল শ্রেণীভিত্তি টলটলায়মান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কোন মতে। সম্পদের মালিকানায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাসহ প্রকৃত আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিলে, এই সুযোগ সন্ধানী অবক্ষয়ী-স্ফীত শ্রেণী ব্যবস্থাটির নড়বড়ে ভিত ধসে পড়তে বাধ্য।

লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, নব্য শ্রেণী ব্যবস্থাটি সম্প্রসারণ করতে গত কয়েক দশক থেকেই বাংলাদেশের জাতীয় বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়া হয়েছে। বিশেষ করে জমি এবং ফ্লাটে বিনিয়োগ যে কোনো ধরনের প্রশ্নের উর্ধ্বে রাখা হয়েছে। গ্যাস-বিদ্যুতে ভর্তুকীর সুফল, বিদেশি সাহায্য-অনুদান, কৃষি ও শিল্পখাতের হাজার হাজার কোটি টাকা ভতুর্কীর সুফলও বিভিন্ন কৌশলে এরাই আত্মসাৎ করছে। অন্যান্য খাতেও যে নিয়ম-নীতি অনুসৃত হয়েছে, তা মোটেই নয়। বরং কোম্পানি গঠন, মজুরি, শ্রম আইন এবং শ্রমিক নিয়োগের বিধি-বিধানের প্রয়োগ অকার্যকর রেখে লুটেরা মালিক শ্রেণীকে একচেটিয়া শোষণের সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। বিনিময়ে ক্ষমতাসীন সরকারগুলো পেয়েছে গোষ্ঠীস্বার্থে লুণ্ঠন-অনাচার চালু রাখার নিরঙ্কুশ সমর্থন। সম্প্রসারিত এই পুঁজিপতি শ্রেণীর চুইয়ে পড়া সম্পদে দরিদ্র মানুষের আর্থিক উন্নয়নও ঘটছে খুবই কম। এদের মাত্রাতিরিক্ত ভোগ-বিলাস, ঘন ঘন বিদেশ সফর, নিজস্ব প্রয়োজন ও পরিধির সঙ্গে সঙ্গতিহীন ভোগ লিপ্সা এই শ্রেণীর মানুষকে করেছে দেশ ও জনগণের প্রতি নির্লিপ্ত ও হীনবোধ সর্বস্ব।

দেখা যাচ্ছে, সাধারণ মানুষের উপর এই শোষণ-লুণ্ঠন চাপিয়ে দিতে গিয়ে এখানকার শাসকরা হারিয়ে ফেলেছে প্রথাগত সকল নীতি নৈতিকতাও। ফলে আর্থিকভাবে ফুলে ফেঁপে উঠলেও নব্য শাসক শ্রেণীর মানস কাঠামো হয়েছে বড়ই নড়বড়ে। যা শাসকশ্রেণীকে ব্যাপক জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ভীতসন্ত্রস্ত, পলায়নপর সর্বভূক এক দানব শক্তি হিসেবে প্রকাশ করছে। অন্যদিকে ঐতিহাসিক পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও রীতি-নীতি পালনের অক্ষমতা, অধিপতি শাসক হিসেবে এদের অস্তিত্বকে করছে প্রশ্নবিদ্ধ। তাই আকৃতিতে দানব হলেও, প্রকৃতিতে মুষিকের মতোই সদা শঙ্কিত এই শাসক শ্রেণী। শুধু শাসকশ্রেণীর লোকদের জীবনের নিরাপত্তাই নয়, লুণ্ঠনকৃত সম্পদের নিরাপত্তার শঙ্কায়ও এরা বড়ই অস্থির। পরিসংখ্যান বলছে, শাসকগোষ্ঠীর বিভিন্ন অংশ অনেক আগে থেকেই নিজেদের শিকড় প্রোথিত করার চেষ্টা করছে ওইসব দেশগুলোয়, যারা যে কোনো সম্ভাব্য বিপদের মুখে এদেরকে আশ্রয় দিতে বদ্ধপরিকর। বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এ তালিকায় সুইজারল্যান্ড, ভারত, আমেরিকা, ক্যানাডা, ব্রিটেন, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, অষ্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া প্রভৃতি দেশ রয়েছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ভিত্তিক গবেষণা ও পরামর্শ প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি-জিএফআই এর মতে, বাংলাদেশসহ অন্যান্য উদীয়মান অর্থনীতির প্রতিটি দেশ থেকে প্রতি বছর ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ অর্থ অবৈধ পথে পাচার করা হয় উন্নত দেশগুলোতে। যে সব অর্থের উৎস হলো, নিজ দেশে অপরাধ, দুর্নীতি ও কর ফাঁকি। পাচারকৃত এসব অর্থ এসব দেশের প্রাপ্ত প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ ও বৈদেশিক সাহায্যের চেয়েও বেশি।

নয়
বিশেষভাবে লক্ষণীয়, ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসিত সমাজ ব্যবস্থায় লর্ড কর্নওয়ালিশ কর্তৃক যেভাবে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত দিয়ে আজ্ঞাবহ জমিদার শ্রেণীর সৃষ্টি করা হয়েছিল, আজকের বাংলাদেশে অনেকটা সেভাবেই শোষণ-লুণ্ঠন, ঘুষ-দুর্নীতি-প্রতারণা ও নির্যাতনের সুযোগ দিয়ে নতুন এক পুঁজিপতি শ্রেণীর সৃষ্টি করা হয়েছে। যারা নিজেদের পুঁজির স্বার্থে মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীদেশগুলোর অবাধ শোষণ-লুণ্ঠনের পক্ষে খুঁটি হিসেবে বাংলাদেশে কাজ করছে।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, বাংলাদেশের জ্ঞানী-বুদ্ধিজীবী ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত কিছু মানুষ নিজ দেশে উদ্যোক্তা-শিল্পপতিদের ছদ্মাবরণে এই দস্যুবৃত্তি ও অবাধ শোষণ-লুণ্ঠনকে কার্ল মার্কস বর্ণিত পুঁজির আদিম সঞ্চয়ন হিসেবে মূল্যায়ন করতে দ্বিধা করেন না। তারা এটি ভাবেন না যে, যারা নিজ দেশে বিভিন্ন ধরনের অপরাধ-দুর্নীতি সংঘটনের মাধ্যমে পুঁজির মালিক হন, তাদের পক্ষে আর যাই হোক জনস্বার্থে এবং জাতীয় স্বার্থে ভুমিকা রাখা সম্ভব হয় না। কেউ সে কসরত করলেও তা যে একেবারেই লোক দেখানো বা প্রদর্শনীর ব্যাপার মাত্র, তা বুঝার জন্যও পন্ডিত হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। কিন্তু এ দেশের কথিত পন্ডিতেরা কার্ল মার্কসের সেই ব্যাখ্যার দোহাই দিয়েই দস্যুবৃত্তিকে উন্নয়ন বৃত্তির প্রলেপ দিতে আদাজল খেয়ে মাঠে রয়েছেন। যার ফলে বাংলাদেশের আর্থ সামাজিক কাঠামোর সংস্কার, উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে লুটেরা-দুর্বৃত্ত মালিকদেরই প্রাধান্য বজায় থাকছে। তারা নতুন নতুন খাতে উন্নয়ন ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের নামে হাতিয়ে নিচ্ছে জনগণের হাজার হাজার কোটি টাকা।

এটি অবশ্যই স্মর্তব্য যে, ইংল্যান্ডের তৎকালীন ধণিকশ্রেণী আদিপুঁজি সংগ্রহে শুধু নিজদেশের কৃষকদেরই নিঃশেষ করেনি, তারা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মতো আরো কোম্পানির সহযোগীতায় সারা পৃথিবী জুড়েই শোষণ-নির্যাতন ও লুণ্ঠন চালিয়েছিল। যার ফলে তুলনামূলক স্বল্প সময়ে শিল্প-বাণিজ্য সমৃদ্ধ ইংল্যান্ডের আত্মপ্রকাশ সম্ভব হয়েছিল। আজকের আমেরিকা, আফ্রিকাসহ বিশ্বের দেশে দেশে ইংল্যান্ডের ধণিকশ্রেণীর সে সব লুণ্ঠনযজ্ঞ ইতিহাস হয়ে রয়েছে। আজ একই কায়দায় মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নেতৃত্বে বিশ্বায়নের নামে বিশ্বব্যাপী চলছে নয়া ঔপনিবেশিক শোষণ ও লুণ্ঠনযজ্ঞ।

এই বাংলার সহস্র বছরের ইতিহাসে শক, হুন, মগ, পাঠান, মুঘল, ইংরেজসহ কত জাতি-গোষ্ঠী-যে এখানে ত্রাতা হিসেবে আর্বিভূত হয়ে শাসক হিসেবে শোষণ-লুণ্ঠন চালিয়েছে তা প্রজন্ম পরম্পরায় আজও ইতিহাস হয়ে রয়েছে। ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষে সর্বশেষ যাদের প্রতিনিধিত্ব করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তারা ছিল আজকের মার্কিন সাম্রাজ্যবাদেরই দোসর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ। যাদের শোষণ-লুণ্ঠন ও অপশাসনের বিরুদ্ধে অসংখ্য কৃষক-শ্রমিক বিদ্রোহসহ সিপাহী বিদ্রোহ, সন্যাস বিদ্রোহ, সাঁওতাল বিদ্রোহ, নানকার, তে-ভাগার কৃষক বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছিল এ উপমহাদেশে। যাদের প্রতিরোধ করতে ব্রিটিশ ভারতে অসংখ্য সশস্ত্র আন্দোলন গড়ে তোলা হয়েছিল। জীবন দিয়েছিলেন ক্ষুদিরাম, প্রফুল্ল চাকী, প্রীতিলতাসহ অসংখ্য হিন্দু-মুসলিম বিপ্লবী নেতা-কর্মী।

কিন্তু তাদের জীবন দানকে ব্যর্থ প্রতিপন্ন করতেই ব্রিটিশ পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে উঠেছিল জমিদারশ্রেণী আশ্রিত কংগ্রেস-মুসলিম লীগের মতো আজ্ঞাবহ রাজনৈতিক দল। ১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তানের স্বাধীনতা দেওয়ার নামে এদের হাতে ক্ষমতা অর্পণ করেই প্রত্যক্ষভাবে বিদায় নেয় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ। এভাবে ভারত-পাকিস্তান নামে যে দু’টি রাষ্ট্র সৃষ্টি করে, সেখানেও নিস্তার পাননি বাংলার মানুষ। পাকিস্তান আমলে বাঙালিরা পাট, চা, চামড়াসহ অন্যান্য পণ্য রপ্তানি করে সিংহভাগ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করলেও, তা ব্যয় হতো ধনিক গোষ্ঠীর স্বার্থে। এভাবে বৈষম্যের পাহাড় তৈরি করে পাকিস্তানে যে ২২টি পরিবার সর্বাধিক ধন সম্পদের মালিক হয়, তাদের অধিকাংশই এ ভুখন্ডের(পূর্ব-পাকিস্তান) মানুষ ছিল না।  এই ২২ পরিবারের হাতে ছিল পাকিস্তানের বেসরকারি বিনিয়োগের ৮৭ভাগ, শিল্প সম্পদের ৬০ভাগ, ব্যাংক সম্পদের ৮০ ভাগ ও বীমা সম্পদের ৭৫ ভাগ। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান থেকে পৃথক হয়ে নয়া ঔপনিবেশিক আধা সামন্তবাদী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর যে শ্রেণীটি শাসক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে তারা ছিল যে কোনোভাবে পুঁজিপতি শ্রেণীর কাতারে উঠতে উদগ্রীব। ফলে পশ্চিম পাকিস্তানীদের ফেলে যাওয়া সম্পদ রাষ্ট্রীয়করণের নামে ঢালাওভাবে শোষণ-লুণ্ঠন-দখল কার্যক্রম সূচিত হয়েছিল। এ প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন হাত ঘুরে পাকিস্তান আমলের সে সব সম্পদের মালিক এখন স্বদেশী লুটেরা ধনী পরিবারগুলো। আজ বাংলাদেশের বেশিরভাগ সম্পদের মালিক ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ পরিবার।

প্রশ্ন হলো যে অন্যায্য বণ্টন ব্যবস্থা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আত্মপ্রকাশ, প্রচলিত ব্যবস্থায় তা কী দূর করা সম্ভব হয়েছে? এর একটিই মাত্র উত্তর আছে, তা হলো- ‘না’।

বরং নতুন বাংলায় লুটেরা-আমলা-দালাল-ব্যবসায়ী, মহাজনী শোষণ-লুণ্ঠন, বৈষম্য-নির্যাতন আরো তীব্রতর হয়েছে। কিন্তু উপযুক্ত রাজনৈতিক শক্তির অনুপস্থিতিতে এ সব শোষণ-লুণ্ঠনের কার্যকর প্রতিবাদ জানানো সম্ভব হচ্ছে না। কোথাও সংগঠিত হওয়ার আঁচ পেলেই প্রশাসনিক দমন নির্যাতন চালিয়ে তা অঙ্কুরে বিনষ্ট করে দেয়া হচ্ছে। সার্বিক শৃঙ্খলা রক্ষায় ভীতি ও আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি করে শোষিত-বঞ্চিত মানুষের ক্ষোভ-বিক্ষোভ দমন করা হচ্ছে। যাদের শ্রমে-ঘামে জিডিপি-জিএনপি বাড়ে, পোশাক শিল্প শীর্ষে উঠে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২৭ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়, অন্যায্য সম্পদ বণ্টনে তাদেরকে নিঃশেষ করা হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, যে শোষণমূলক বৈষম্যের অর্থনীতি আমরা ভারত-পাকিস্তান থেকে উত্তরাধিকার সুত্রে পেয়েছিলাম, গত চার দশকের বাংলাদেশেও সেটিই হ্রষ্ট-পুষ্ট হয়েছে। প্রশ্ন হলো, সম্পদ বণ্টনে এই বৈষম্যপূর্ণ ব্যবস্থা রক্ষা করে তার পরিপালন-পরিবর্ধনই-কী ছিল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য! নাকি আগের ব্যবস্থাটির বিলোপ সাধন করে অর্থনৈতিক-সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার দাবি ছিল? বোধ করি, এখানেও বড় ধরনের ফাঁক রেখেছে বাংলাদেশের প্রতারক শাসক শ্রেণী। এ জন্যই বাংলাদেশের সংবিধানের আদি রূপটিকে বার বার কাটাছেঁড়া করে নানান রূপ দিয়েও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে তা অকার্যকর করে রাখা হয়েছে। আর নাগরিকের অর্থনৈতিক মুক্তির বিষয়টিকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে নব্য পুঁজিপতিশ্রেণীর শোষণ-লুণ্ঠনজাত উচ্ছিষ্টের উপর। এই ‘উচ্ছিষ্ট’ভক্ষণ করে যারা মধ্যবিত্ত পর্যায়ে উঠেছেন বলে বিভিন্ন গবেষণায় বলা হচ্ছে, তাদের সংখ্যাও কিন্তু মোট জনসংখ্যার তুলনায় বেশি নয়।

তাই, বিশ্বব্যাংক বা জাতিসংঘের তরফ থেকে বাংলাদেশকে কী অভিধা দেওয়া হলো, সেটি দেশের বেশিরভাগ মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয় নয়। বরং গুরুত্বপূর্ণ হলো, নিজের দেশ সম্পর্কে অধিকার বঞ্চিত মানুষের অভিব্যক্তিটি কেমন-সেটি। প্রবৃদ্ধির সম্পদ ক্ষুধা নিবারণে ক্ষুধার্ত মানুষের কোনো কাজে লাগে কি-না, সেটিই হলো আজকের প্রশ্ন। বছর বছর অর্জিত প্রবৃদ্ধির সম্পদ, দেশেই থাকছে, না বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে, সেটিও এক বড় প্রশ্ন বটে! আর প্রশ্ন হলো, শ্রমিক-কৃষকের হাড়ভাঙ্গা শ্রমে বছর বছর যে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হচ্ছে, তার সুষম বণ্টন কেন হচ্ছে না?

ভুলে গেলে চলবে না, বাংলাদেশের উন্নয়ন এ দেশের খেটে খাওয়া মানুষেরই পরিশ্রমের ফসল। এখানকার কথিত নায়ক-খলনায়ক বা তাদের তল্পীবাজদের রাজনৈতিক সার্কাস নয়। তাই দেশের প্রকৃত উন্নয়ন মানেই, কৃষক-শ্রমিকসহ সকল খেটে খাওয়া মানুষের জীবনযাত্রার উন্নয়ন। তাদের জীবনে স্বস্তি, শান্তি ও সার্বিক স্বচ্ছলতার নিশ্চয়তা। বাংলাদেশ, কেবল ১২ লাখ লুণ্ঠনজীবী উদ্যোক্তা-ব্যবসায়ী বা ৫০ হাজার দুর্বৃত্ত পুঁজিপতির স্বর্গরাজ্য নয়। একই সঙ্গে এটি গণমানুষের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার প্রতিষ্ঠার মরণপণ সংগ্রামের দেশও। যে সংগ্রাম প্রত্যেকটি মানুষের উন্নত ও স্বচ্ছল জীবনের নিশ্চয়তা দেওয়ার লক্ষ্যে পরিচালিত।

লেখকঃ জামিল হোসেন

সূত্রঃ

13076745_715535491921699_3304914592563662269_n


ঝাড়খণ্ডে গত ১৫০ দিনে ৩৫টি যানবাহনে মাওবাদীদের অগ্নিসংযোগ

Maoists-torch-v31914

অনূদিতঃ

বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট এবং অবকাঠামো উন্নয়নে রাজ্য সরকারের প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করতে মাওবাদীরা ঝাড়খন্ডে গত পাঁচ মাসের মধ্যে ৩৫টি গাড়ীতে অগ্নিসংযোগ করেছে।  মাওবাদী গেরিলাদের এই  হিংস্র আক্রমণ নির্মাণ কাজে জড়িত ঠিকাদার মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।

আধাসামরিক বাহিনীর সাহায্যে রাজ্য পুলিশ মাওবাদীদের অনেক বাংকার ধ্বংস এবং রাজ্যের বিভিন্ন অংশে মাওবাদীদের পুঁতে রাখা ২০০০ এর অধিক ল্যান্ডমাইন উদ্ধার করেছে।

পুলিশ, গত এক বছরে মাওবাদী গেরিলাদের মেরুদন্ডে আঘাত করার দাবি করলেও, কিন্তু লেভি আদায় এবং যানবাহন আগুন দিয়ে গেরিলারা তাদের শক্তিশালী উপস্থিতি জানান দিয়েছে।

সূত্রঃ http://zeenews.india.com/news/jharkhand/jharkhand-maoists-torch-35-vehicles-in-150-days-contractors-panic_1888896.html


‘জনগণের মৌলিক অধিকার’ নিয়ে তেলেঙ্গানা গণতান্ত্রিক ফোরামের(TDF) জনসভা

13226682_10153672191022939_8230122382974030520_n

13230226_10153672191557939_1998412026334484945_n

13245468_10153672184052939_3638458631491874431_n

13256146_10153672190347939_3422162956449895820_n

13263911_10153672187927939_3583144195071494518_n


ম্যাকিবাকাঃ ফিলিপিনো বিপ্লবী নারী আন্দোলন

hqdefault

ম্যাকিবাকাঃ ফিলিপিনো বিপ্লবী নারী আন্দোলন

স্পেনীয় ও মার্কিন উপনিবেশ, জাপানি ফ্যাসিস্ট আক্রমণ এবং স্থানীয় সামন্ত শোষণের বিরুদ্ধে ফিলিপিনো নারীদের অস্ত্র হাতে নেবার ইতিহাস গৌরবময়।  পুরুষের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তারাও যুদ্ধ করেছে, ত্যাগ স্বীকার করেছে অনেক। স্পেনীয় উপনিবেশ বিরোধী সংগ্রামে গ্যাবরিয়েলা (Gabreila) জীবন দেয়।  তাঁর সে আত্মত্যাগ আজো ফিলিপিনো নারীদেরকে বিপ্লবী সংগ্রামে উৎসাহিত করে।  কিন্তু আজকে জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লবের সশস্ত্র বাহিনীতে নারীরা যে ক্রমবর্ধিতহারে যোগ দিচ্ছে ফিলিপাইনের ইতিহাসে তার নজির নেই। বিপ্লবের সৈনিক হিসেবে নারীরা এখন গেরিলা ঘাঁটিতে, গ্রামে রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠায়, সংগঠনের দায়িত্বপূর্ণ পদে, নীতি নির্ধারণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।  নারী গেরিলা ও কৃষক নারীদের দেখা যায় সভায়। অফিস-আদালত ও মিলিটারি ক্যাম্পমুখী মিছিলে।  নারী শ্রমিকেরা যোগ দেয় সড়ক অবরোধ করতে।  র‌্যালির অগ্রভাগে থাকে সাধারণ নারীরা।  তারা সরকারি নির্মূল বাহিনীর বিরুদ্ধে বাড়ির চারপাশে ব্যারিকেড সৃষ্টি করে। সংখ্যালঘু নারীরা, পিঠে শিশু সন্তান নিয়ে, সরকারি ও বহুজাতিক উন্নয়ন প্রকল্পের স্বার্থে ভিটেমাটি উচ্ছেদের প্রতিবাদ জানায়।
এই নারীদের সংগঠিত করেছে ম্যাকিবাকা (MAKIBAKA)।  ’৭০এর দশকে মার্কোস সামরিক শাসনের দমন-নির্যাতনের মধ্যে ম্যাকিবাকা একটি গোপন নতুন বিপ্লবী নারী সংগঠন হিসেবে জন্মলাভ করে।  এর প্রধান কাজ জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লবে নারীদের অংশগ্রহণ বাস্তবায়নে গণমুক্তি বাহিনীর (NPA) সশস্ত্র প্রচার ইউনিট, গণবাহিনী ও সশস্ত্র গেরিলা ইউনিটে নারীদের বৃহত্তম অংশ, বিশেষ করে কৃষক নারী ও শ্রমিকদের নিয়োগ করা। ‘পুরুষরা বেশি ক্ষমতাবান’ এই গতানুগতিক ধারণাকে চুরমার করে ম্যাকিবাকা সামরিক কাজে নারীদের ক্ষমতা ও শক্তির প্রয়োাগ নিশ্চিত করে। তারা কৃষক নারীদের ভিতরে নিজেরা জমির মালিক হবার আকাঙ্খা সৃষ্টি করে এবং নারী শ্রমিকদেরকে কাজে উপযুক্ত পরিবেশের কর্মসূচি দিয়ে তাদেরকে আন্দোলন-সংগ্রামে আকৃষ্ট করে।
উপনিবেশপূর্ব ফিলিপাইনে নারীদের অনেক বেশি অধিকার ও স্বাধীনতা ছিল।  তাদের বিবাহ বিচ্ছেদের অধিকার ছিল এবং তারা দেশীয় জন্মনিয়ন্ত্রণের উপকরণ ব্যবহার করতে পারত।  স্পেনীয় উপনিবেশবাদ তাদের সে অধিকার কেড়ে নিয়ে তাদেরকে আরো পিছনে ঠেলে দেয়।  সামন্ত শাসন তাদের ওপরে আরো ভারী বোঝা চাপায়। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ নারীদেরকে পুরুষের যৌনসামগ্রী ও ভোগ্যবস্তুতে পরিণত করে পুরুষতান্ত্রিক মূল্যবোধকে আরো মজবুত করে।  তাই, ম্যাকিবাকার কাছে নারী নির্যাতন মূল সামাজিক দ্বন্দ্ব থেকে পৃথক নয়।  আজকের আধা ঔপনিবেশিক-আধা সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যেই নারী নির্যাতনের কারণ নিহিত।   এজন্যে যতদিন না নারীরা দেশের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবন থেকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও তাদের দেশীয় এজেন্টদের উৎখাত করার বিপ্লবী সশস্ত্র সংগ্রামে অংশগ্রহণ করবে ততদিন তারা ধর্ষিতা ও নির্যাতিতা হতে থাকবে।  বিপ্লবী সশস্ত্র সংগ্রামে অংশগ্রহণের এই প্রক্রিয়াই দেশকে নিপীড়ন নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষার প্রক্রিয়া।  ফিলিপাইনে নারীরা নিজেদের মুক্তির জন্যে ঐ প্রক্রিয়ার ভিত্তি রচনা করেছে।  রাজনীতিতে অংশগ্রহণ দিয়েই তারা পুরুষ শাসন ও পুরুষ কর্তৃত্বের শৃঙ্খল ভাঙ্গতে পারবে যা তাদেরকে সব জায়গায় আটকে রেখেছে। , নারী হিসেবে তাদেরকে ও কেবল ‘দেশকে নয়’ নিজেদের সবাইকে মুক্ত করার জন্যে লড়তে হবে।
ম্যাকিবাকা মনে করে, পুরুষতান্ত্রিক সমাজে পুরুষরা সবকিছুর মত আন্দোলন-সংগ্রামেও কর্তৃত্ব করে।  তাই, নারীদেরকে ‘রাজনৈতিক’ করে তোলার জন্যে তাদের সংগ্রামের পৃথক ক্ষেত্র প্রয়োজন।  প্রয়োজন ভিন্ন ফোরামের যেখানে ব্যাপক রাজনৈতিক বিষয়বস্তু মাতৃত্ব, সন্তানপালন ইত্যাদি বিষয় আলোচনা হবে। ম্যাকিবাকা মনে করে পুরুষতন্ত্র বিরোধী সংগ্রামে, সংগ্রামের ভেতরে ও বাইরে, শিক্ষা সংগ্রামের একটি প্রধান অঙ্গ। পুরুষতান্ত্রিক অহমিকাকে আঘাত করেই সচেতনতা তৈরি করতে হবে।  ম্যাকিবাকার একজন নেতা কোনি লেডেসমি (Coni ledesme) বলেন, একটি বাস্তব সমস্যা হ’ল দুঃখজনকভাবে সংগঠনের নিপীড়িত নারীরা এখন পর্যন্ত লজ্জা ও নিরাপত্তার অভাবের দরুন তাৎক্ষণিকভাবে বেরিয়ে আসতে পারছে না। বেরুতে পারলেই তারা পুরুষ কর্মীদের পুরুষতান্ত্রিক সমস্যাগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারবে।
ম্যাকিবাকার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা নেতা লোরিনা ব্যারোস (Lorina Baros) নতুন নারী’র প্রতিনিধিত্ব করে পুরুষতন্ত্রের বন্ধন ও শৃঙ্খল থেকে বেরিয়ে এসে, বিপ্লবের জন্যে জীবনযাপন ও জীবন বিসর্জন দেন।  ’৭০-এ ফিলিপাইন বিশ্ববিদ্যালয়ে মার্কোস দুঃশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়লে ছাত্রী হিসাবে তিনি তাতে সক্রিয়ভাবে কাজ করেন।  ’৭২-এ সামরিক শাসন জারি হলে তিনি বাধ্য হয়ে আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যান।  এই সময়ে তিনি গ্রেফতার হন।  তিনি যখন কারাগারে তখন তার স্বামী আন্দোলনের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে শত্রুর কাছে আত্মসমর্পণ করে।  লোরিনা কারাগার থেকে পালিয়ে এসে তার স্বামীর এলাকার বিপ্লবী দায়িত্ব পালন করেন।  এক সময় ফিলিপাইনের রাষ্ট্রীয় বাহিনী (AFP) লোরিনার শেলটার ঘেরাও করলে লোরিনা যুদ্ধ করে শত্রুর অবরোধ ভেঙ্গে সহযোদ্ধাদের পালাবার পথ যখন নিশ্চিত করেন তখনই তিনি শত্রুর হাতে নিহত হন।  তার এই অবিস্মরণীয় ত্যাগ, আপোষহীন সংগ্রামী চেতনা ও দৃঢ় অঙ্গীকার অসংখ্য নারীদের বিপ্লবী সংগ্রামে যোগ দিতে উদ্বুদ্ধ করে। সামরিক শাসক মার্কোস ধর্মঘট নিষিদ্ধ করলে ডিস্টিলারি কারখানার নারী শ্রমিকরাই প্রথম এই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে।  তারা ‘চার্চ লেবার সেন্টারে’ জমায়েত হয়ে তাদের শোচনীয় অবস্থা সম্পর্কে আলাপ-আলোচনা করে, এবং একদিন প্রকাশ্য দুপুর বেলায় কারখানায় জোর করে ঢুকে পড়ে শ্রমিকদেরকে সাধারণ ধর্মঘটের আহ্বান জানান। এতে ক্ষুব্ধ সরকারের সেনাবাহিনী ঐ নারীদের ঘরবাড়ি তল্লাসী করে গণহারে তাদের গ্রফতার করে।  এই গ্রেফতারের প্রতিবাদে অনেক স্থানে বেপরোয়া ধর্মঘট পালিত হয়। ফলে সরকার বাধ্য হয় ঐ আইন বাতিল করতে। গড়ে উঠতে থাকে গণমুক্তি বাহিনীর বিশাল আকার।
কিন্তু ’৮০ দশকে দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের বিরোধী একটি ধারা দ্রুত বিজয়ের স্বপ্নে বিভোর হয়ে নারীদেরকে সামরিক কাজের বাইরে রাখার লাইন নিয়ে আসে। তাদের সে লাইন গৃহীত হলে নারী আন্দোলনের মারাত্মক ক্ষতি হয়। সশস্ত্র সংগ্রাম থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় নারীদের সাহসিকতা নারী মুক্তির জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।  শহরে সশস্ত্র যুদ্ধ হলে গণতান্ত্রিক নারী সংগঠনগুলোর ভূমিকা যুদ্ধের সহায়তামূলক কাজে রূপান্তরিত হয়।  কিন্তু রাষ্ট্রীয় বাহিনী আকস্মিক হামলা চালিয়ে বউ-ঝি সহ সন্দেহভাজন বিদ্রোহী নারীদের বন্দী করে। এতে নারী আন্দোলনের গতি স্থবির হয়।  এই সময় উচ্চ আমলাতান্ত্রিক শ্রেণির সাহায্যপুষ্ট এনজিওগুলো সমাজ পরিবর্তনের ধ্বজা ধরে আসে। জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও এনজিওগুলো লিঙ্গ ভিত্তিক অর্থাৎ ‘নারী-পুরুষের পার্থক্যকে’ শ্রেণিবহির্ভূত বিষয় হিসাবে গণ্য করে ‘শ্রেণি’ সংজ্ঞার বিকৃতি ঘটায়।  তারা আপোস ও সংস্কারের লক্ষ্যে ‘সমাজতান্ত্রিক নারীবাদের’ নামে ‘বুর্জোয়া নারীবাদ’কে চালিয়ে দিয়ে বিপ্লবী আন্দোলনের মাঝে বিভ্রান্তি ছড়ায়। ‘নারী সম্প্রদায়ের’ ধুয়ো তুলে ‘শ্রেণি বিভাজনকে’ আড়াল করে। তার জ্বলন্ত প্রমাণ পাওয়া যায় কোরি এ্যাকুইনোকে একজন নারী ও উদার গণতান্ত্রিক হিসাবে ধরে তার শাসনের প্রথম ছয় মাস তাকে তাদের সমর্থন প্রদানের মাধ্যমে।  পরে গ্যাবরিয়েলার (GABRIELA) গণতান্ত্রিক নারী ফোরাম ব্যানারে বিপ্লবী নারী আন্দোলন নারী আন্দোলনের প্রতিবিপ্লবী ধারাকে পরাস্ত করে সশস্ত্র সংগ্রামে নারীদের অংশগ্রহণের ধারাকে প্রবাহিত করতে সক্ষম হয়।
ম্যাকিবাকা বিশ্ব সুন্দরী প্রতিযোগতিার বিরুদ্ধে তার জোরালো প্রতিবাদ সংগঠিত করে এক প্যারালাল অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।  তারা নারীদেরকে ‘মিস বেকার’ ও ‘মিস দারিদ্র’ খেতাবে ভূষিত করে দ্রুত জনগোষ্ঠীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে নেয়।  তারা বৈশ্বীকরণের বিনাশ প্রক্রিয়া ২০০০ সালের মধ্যে রামোস সরকারের ধ্বংসাত্মক কর্মসূচি, বহুজাতিক লগিং এ্যান্ড মাইনিং কোম্পানিগুলির স্বার্থে বনভূমি উজাড়কালে সেনাবাহিনীর বোমা নিক্ষেপের বিরোধিতায়, মুক্ত বাণিজ্যিক এলাকায় যৌনপীড়ন, কুমারীত্ব পরীক্ষা, কাজের শর্তের বিরুদ্ধে ধর্মঘট পালন এবং APEC গঠনের গণপ্রতিরোধ, মিছিল ও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিতেও সাহসী ভূমিকা রেখেছে।
ফিলিপাইনে যে সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও আমলা পুঁজিবাদ দীর্ঘদিন জনগণকে শোষণের জোয়ালে বেঁধে রেখেছে তা উৎখাতের যে জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লবের ধারা প্রবাহিত হচ্ছে ম্যাকিবাকার আন্দোলন তার এক অখ- অংশ। ম্যাকিবাকা মনে করে, এই সংগ্রাম কেবল পুরুষদের নয় বরং অনেক বেশি নারীদের।  কারণ তারাই ঐ ব্যবস্থা দ্বারা বেশি শোষিত ও নির্যাতিত এবং জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লবের পথ বেয়ে পুরুষতান্ত্রিক সমাজকাঠামো ভাঙ্গার মধ্য দিয়ে তারাই বেশি লাভবান হবে।  এই হিসাবে অন্যান্য আন্দোলনের সাথে পার্থক্য ও সমন্বয় সৃষ্টি করে ম্যাকিবাকা তাদের নির্দিষ্ট দাবি ও কর্মসূচির ভিত্তিতে সংগ্রাম এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তারা সফলতার সাথে বিপ্লবী কর্মসূচিতে নারী প্রশ্ন স্থাপন করতে এবং এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে বিপ্লবী সচেতনতা একটি সাধারণ মাত্রায় উন্নীত করতে পেরেছে।

lorena barros

সূত্রঃ লেখাটি পিপলস রেজিস্ট্যান্স, অক্টোবর-ডিসেম্বর, ১৯৯৬ থেকে ভাষান্তরিত এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক পত্রিকা সমাজ চেতনা’র ৫/১২/’৯৭-এ প্রকাশিত নারী প্রশ্ন ও নারীমুক্তি কলাম থেকে নেয়া।  লেখক সাজ্জাদ হাফিজ।


গণমুক্তির গানের দলের সাধারণ সম্পাদক ফারহানা হক শামা ও সদস্য আকিব এর মুক্তির দাবীতে সোচ্চার হোন!

13247872_939407439526261_574807154542753326_o


কৃষক সংগঠন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কতিপয় সমস্যা

কৃষক

কৃষক সংগঠন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কতিপয় সমস্যা

আমাদের দেশে বিপ্লবী ধারায় কৃষকদের কোন গণসংগঠন নেই।  বড় ধনীদের পার্টি আওয়ামী লীগ, বিএনপি প্রভৃতি তাদের ভোটের রাজনীতির স্বার্থে কৃষকদের নামকাওয়াস্তে সংগঠন রাখে, যেগুলো কৃষকদের কোনরকম স্বার্থকেই প্রতিনিধিত্ব করে না।  অন্যদিকে কিছু কিছু এনজিও কৃষকদেরকে সংগঠিত করে থাকে তাদেরকে কৃষকের স্বার্থে সমাজ পরিবর্তনের বিপ্লব থেকে দূরে রাখবার পরিকল্পিত উদ্দেশ্যে।  এদের বাইরে বিভিন্ন বামপন্থী ধারার পার্টির নেতৃত্বে যেসব কৃষক সংগঠন রয়েছে সেগুলো হচ্ছে দাবি-দাওয়া ভিত্তিক সংস্কারবাদী কৃষক সংগঠন।  যে সংগঠনগুলো কৃষকদের সামগ্রিক মুক্তির কোন বিপ্লবী কর্মসূচি না এনে চলতি কিছু দাবিদাওয়াকে শুধু তুলে ধরে।
এই সব সংগঠন পরিচালিত হয় শহরকে কেন্দ্রে রেখে।  যে কারণে তেভাগা-হাজং বিদ্রোহের পর মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্ত কিছু কৃষক আন্দোলন ছাড়া আমাদের দেশে গ্রাম-ভিত্তিক বড় ধরনের কোন কৃষক আন্দোলন গড়ে উঠেনি।
“কৃষক মুক্তি সংগ্রাম” গঠন করা হয়েছে কৃষকদের সার্বিক মুক্তির লক্ষ্যকে কেন্দ্রে রেখে।  আমাদের লক্ষ্য গ্রামকেন্দ্রীক কৃষক সংগঠন ও কৃষক আন্দোলন গড়ে তোলা।  যাকে শহরের সাথে অবশ্যই যুক্ত থাকতে হবে, কিন্তু যার ভিত্তি হবে গ্রাম, এবং গ্রামকেন্দ্রীক পরিচালনা।  যেজন্য এই সংগঠনের অফিস উপজেলা-জেলা সদরের চেয়ে গ্রামভিত্তিক গড়ে তুলতে হবে।  সংগঠকগণও প্রধানত গ্রামে কৃষকদের উপর নির্ভর করে পারস্পরিক যোগাযোগসহ কার্যক্রম পরিচালনা করবেন।
ইতিমধ্যেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তের গ্রামাঞ্চলে কৃষকদের মধ্যে আমাদের সংগঠনের প্রাথমিক ধরনের চ্যানেল/সংযোগ/সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে উঠেছে।  কোথাও কোথাও তা একটি পর্যায়ে বিকশিত হয়ে কিভাবে তাকে আরো এগিয়ে নেয়া হবে তা নিয়ে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছে ও হচ্ছে।  এখানে সেইসব সমস্যাকে মাথায় রেখে কিছু আলোচনা করা হচ্ছে।
আমাদের সংগঠকগণ কৃষকদের সংগঠিত করতে গিয়ে দেশে অনুশীলিত প্রচলিত ধারার আশু দাবিদাওয়ার ভিত্তিতে আগানোর চেষ্টা করেন। সেটা কৃষকদেরকে বুঝানো সহজও বটে। তাতে সংগঠনের কিছুটা বিকাশও হয়। কিন্তু তারপর তা একই বৃত্তে ঘুরতে থাকে।  নতুন বিপ্লবী রাজনীতি, অর্থাৎ কৃষকদের সামগ্রিক মুক্তির কর্মসূচি নিয়ে আসা ছাড়া এই বৃত্ত থেকে বেরুনো সম্ভব নয়।
আমাদের দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা, তথা কৃষি অবস্থা সনাতনী স্থানীয়-ভিত্তিক সামন্তীয় ব্যবস্থায় নেই। অন্যদিকে তা স্বাধীন পুঁজিবাদী ব্যবস্থা হিসেবেও গড়ে ওঠেনি।  এখানে এখন সাম্রাজ্যবাদ নির্ভর কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে।  ফলে কৃষকের শ্রমের ফল বিভিন্ন উপায়ে ও বিভিন্ন ধরনের হাত ঘুরে সাম্রাজ্যবাদ- সম্প্রসারণবাদ ও তাদের দালাল বড় ধনীদের ঘরেই জমা হচ্ছে।  তার ভাগ পাচ্ছে মফস্বল-কেন্দ্রীক তাদের দালালেরা, যারা ব্যবস্থার স্থানীয় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।
সাম্রাজ্যবাদ নির্ভর এই উৎপাদন ব্যবস্থা কিভাবে আমাদের কৃষকদের ও কৃষির প্রকৃত উন্নয়নের প্রতিবন্ধক তা কৃষকদের মাঝে কাজ করতে হলে তাদের কাছে বিশ্লেষণ করতে হবে এবং তা থেকে মুক্তির কর্মসূচি আনতে হবে। কৃষকদেরকে বুঝাতে হবে আধুনিক পদ্ধতিতে চাষের ফলে আগের তুলনায় বেশি ফসল উৎপাদন হলেও কৃষক তার উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করে উৎপাদন খরচ তুলতে পারছে না কেন।
এক্ষেত্রে আমাদের সংগঠকগণ সাম্রাজ্যবাদ-সম্প্রসারণবাদের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নকে সামনে অনেন ঠিকই, কিন্তু একইসাথে এ থেকে যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সৃষ্টি হয়েছে এবং সে প্রশ্নে যে পাল্টা বিপ্লবী অর্থনৈতিক কর্মসূচি আনতে হবে তা সঠিকভাবে তাদের আলোচনায় আসে না বা আসলেও জোর কম পড়ে।
বিশ্লেষণ করতে হবে কৃষকদের উন্নয়নের নামে কিভাবে সমগ্র কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থাকে সাম্রাজ্যবাদ নির্ভরশীল করে তোলা হয়েছে। এই উৎপাদন ব্যবস্থা ভেঙে কিভাবে বিপ্লবীকরণ করতে হবে সেই বিপ্লবী কৃষি কর্মসূচি তুলে ধরতে হবে।
যেসব অঞ্চলে আঁখ, তামাক, মৎস্য, চিংড়ী প্রভৃতি খামার পদ্ধতি গড়ে উঠেছে তাকে বিশ্লেষণ করে সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি আনতে হবে।
খাসজমি প্রকৃত ভূমিহীনদের মাঝে বণ্টন, “খোদ কৃষকের হাতে জমি”- এই নীতির ভিত্তিতে বিপ্লবী ভূমি-সংস্কার, জলাভূমি মৎস্যজীবীদের মালিকানায় বা অধিকারে আনা, সুদী শোষণ উচ্ছেদের লক্ষ্যে তার শোষণ কমানো, ইজারা প্রথার উচ্ছেদসহ সামন্তবাদ বিরোধী কর্মসূচি তুলে ধরতে হবে।
জমির মালিকানার প্রশ্নে নারী-পুরুষের মধ্যে যে বৈষম্য তা দূর করে জমিতে সমঅধিকারের বিষয় আনতে হবে।
এছাড়া সমতল ও পাহাড়ে আদিবাসী কৃষক জনগণ যারা বছরের পর বছর জমি/ভিটেবাড়ী ভোগ করলেও তাদেরকে মালিকানা দেয়া হয়নি তা তুলে ধরতে হবে।

সংগঠন গড়ে উঠবে কি প্রক্রিয়ায়? তার কাঠামো কী হবে?
এ ক্ষেত্রেও প্রচলিত প্রশাসনিক কাঠামাকে অনুসরণের প্রবণতা দেখা যায়।  আমাদের সংগঠন সম্পূর্ণ নতুন ধরনের। তাই, এই সংগঠন গড়ার প্রক্রিয়া ও কাঠামোও নতুন।  প্রথমে ৩/৫/৭…….জনকে নিয়ে গ্রুপ গঠন করে এই নতুন রাজনীতির শিক্ষা নিতে হবে।  তারপর কমিটি গঠনের পদক্ষেপ নেয়া যায়। সে কমিটি হবে প্রশাসনিক কাঠামো এবং সংগঠনের লক্ষ্য ও আত্মগত অবস্থার ভিত্তিতে সৃজনশীল সমন্বয় সাধন করে।
শহর-বন্দরকেন্দ্রীক মিটিং করার পুরনো পদ্ধতির বদলে পাড়া বৈঠক/গ্রাম বৈঠক/উঠান বৈঠক/হাটসভা/বাজারসভা প্রভৃতি চালু করতে হবে।  এসব সভা করার ক্ষেত্রে কৃষকগণ কখন কাজ থেকে অবসর থাকেন তা বিবেচনায় আনতে হবে।
সংগঠন পরিচালনার জন্য অর্থের প্রয়োজন।  এজন্য সদস্যদের চাঁদা ছাড়া মৌসুমী ফসল সাহায্য, হাট-বাজারে গণসাহায্যসহ বিভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করা যায়।
দেশব্যাপী কৃষক সংগঠনের বহু সংখ্যক এলাকা গড়ার পাশাপাশি কিছু কিছু অঞ্চলে লাগাতার ও বিস্তৃত কৃষক এলাকা গড়ে তুলতে হবে।  এই ধরনের অঞ্চলে পারস্পরিক সংযোগ-সমন্বয়ের জন্য সার্বক্ষণিক সংগঠক গড়ে তোলা জরুরি হয়ে পড়েছে।
সংগঠন-সংগ্রাম বিকাশের প্রক্রিয়ায় গণশত্রুরাও সক্রিয় হয়ে ওঠে। এই সমস্যা মোকাবেলার জন্য তরুণ-যুব কৃষকদের নিয়ে কৃষক আত্মরক্ষী দল গঠনের লক্ষ রাখতে হবে।
এখানে কিছু বিষয়ে দৃষ্টি দেয়া হয়েছে মাত্র। বাস্তব অনুশীলন থেকে উত্থাপিত সমস্যাবলী নিয়ে সংগঠকদের মধ্যে পারস্পরিক মত বিনিময় ও অব্যাহত আলোচনা-পর্যালোচনা চালাতে হবে। এই প্রক্রিয়ায় কৃষক সংগঠন ও কৃষক আন্দোলন গড়ার মূর্ত সাংগঠনিক লাইন গড়ে উঠবে।

সূত্রঃ কৃষক সমস্যা ও কৃষক সংগঠন সম্পর্কে, কৃষক মুক্তি সংগ্রাম কর্তৃক প্রকাশিত