“শান্তি চুক্তি”র দশ বছর পরও পাহাড়ে অশান্তি, সেনা শাসন, হত্যা-জখম-অগ্নিসংযোগ চলছেই

শান্তিবাহিনীর সদস্যরা

শান্তিবাহিনীর সদস্যরা

“শান্তি চুক্তি”র দশ বছর পরও পাহাড়ে অশান্তি
সেনা শাসন, হত্যা-জখম-অগ্নিসংযোগ চলছেই

(জুন, ২০১০)

“শান্তি চুক্তি”র দশ বছর পরও পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি আসেনি।  মহাজোট সরকার ক্ষমতায় এসে পাহাড় থেকে কিছু সেনা প্রত্যাহার করে চুক্তি বাস্তবায়নের ভড়ং দেখিয়েছে।  পাহাড়ী জনগণের একাংশ হয়তো আশান্বিতও হয়েছিলেন।   কিন্তু রাঙামাটির সাজেকের ঘটনা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছে সে আশায় গুড়ে বালি।
গত ১৯ ও ২০ফেব্রুয়ারি, ২০১০ রাতে ভূমি থেকে উচ্ছেদের লক্ষ্যে সাজেকের ক্ষুদ্র জাতিসত্তার জনগণের উপর সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে বাঙালী সেটলারদের মধ্যকার গুণ্ডারা হামলা করে।  সেনাবাহিনীর ব্রাশ ফায়ারে বুদ্ধমতি চাকমা, তার স্বামী উত্তমা চাকমা এবং লক্ষী বিজয় চাকমা নামের তিনজন ঘটনাস্থলেই নিহত হন।  ভারত জ্যোতি চাকমাসহ ২৪ জন গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন।  দুইজন নিখোঁজ হন।  সাজেক ভূমি রক্ষা কমিটির আশংকা নিখোঁজ দুইজনকে হত্যা করে লাশ গুম করা হয়েছে।  এই হামলার আগ মুহূর্তে সেনাবাহিনী আদিবাসী জনগণকে গ্রাম ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেয় এবং ব্রাশ ফায়ার করে।  এই সময় সেটলাররা বাড়ি-ঘরে লুটপাট চালায়।  এবং আগুন ধরিয়ে ১১টি গ্রামের ৫০০ ঘর-বাড়ি, ১৬টি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, ২টি মন্দির, ১টি গির্জা, একটি স্কুল, ইউএনডিপি’র কেন্দ্র জ্বালিয়ে দেয়।  তাদের হিংস্র আক্রমণ থেকে রক্ষা পায়নি বৃদ্ধ রোগী, গর্ভবতী নারী, মাতৃদুগ্ধ পানরত শিশুরা।  নিজেদের রক্ষা করতে আদিবাসী জনগণ বাধ্য হন বন্য পশুদের অভয়ারণ্যে আশ্রয় নিতে।
পরের দিন সকালে নিহতদের শেষকৃত্য সাধন, আহতদের চিকিৎসার জন্য ভস্মিভূত ঘরবাড়িতে ফিরে আসলে অগ্নিসংযোগ ও ধ্বংসযজ্ঞের দায়ভার উল্টো পাহাড়ীদের উপর চাপিয়ে দিয়ে সেনাবাহিনী পুনরায় গুলি বর্ষণ করে এবং অক্ষত থাকা বাড়ি-ঘরে আগুন দেয় এবং লুটপাট চালায়। যাকে সামনে পায় তাকেই মারধোর করে এবং গ্রেপ্তার করে। পাহাড়ী জনগণকে হত্যা-নির্যাতন না করার ‘অপরাধে’ সেনা সদস্যরা একজন এসআই-কে নির্মমভাবে প্রহার করে হাসপাতালে পাঠায়।
২৩ ফেব্রুয়ারি খাগড়াছড়িতে এই বর্বরতার বিরুদ্ধে পাহাড়ী জনগণ প্রতিবাদ সমাবেশ ও মিছিল করেন।  মিছিল থেকে ফেরার পথে প্রশাসন ও সেনাবাহিনীর মদদে গড়ে উঠা বোরকা বাহিনী প্রতিবাদকারীদের উপর হামলা করে অনেকের হাত-পা ভেঙে দেয়।  এবং সাতভেইয়াসহ আশেপাশের বেশ কিছু পাড়ায় আগুন ধরিয়ে দেয়।
সেনাবাহিনী তখন ১৪৪ ধারা জারি করে যাতে পাহাড়ী জনগণ সমবেত হতে না পারেন।  অথচ আদিবাসী জনগণের ঘর-বাড়িতে লুটপাট অগ্নিসংযোগ চলে এবং তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।  এই পৈশাচিক ফ্যাসিবাদী কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে পাহাড়ী জনগণ এবার তাদের বাৎসরিক নববর্ষ উৎসব বৈসাবী উদ্যাপন থেকে বিরত থাকেন।
* শত শত বছর যাবৎ পাহাড়ী ক্ষুদ্র জাতিসত্তার জনগণ পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ে বসবাস করে আসছেন।  এই পাহাড়ী জনগণই পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি ও অরণ্যের প্রকৃত মালিক।  এই পাহাড়ীদের ভূমি থেকে উচ্ছেদাভিযান চালাচ্ছে উগ্র বাঙালী শাসক শ্রেণী। এ কাজে তাদের প্রধানতম হাতিয়ার হলো তাদের রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনী।  এই ফ্যাসিস্ট উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়েছিল পাকিস্তান আমলে (’৬০-এর দশকে) কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর শেখ মুজিব সরকার ক্ষুদ্র জাতিসত্তাসমূহের স্বতন্ত্র জাতিগত পরিচয়কে স্বীকৃতি না দিয়ে তাদের বাঙালী হয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল।  আজকে ৩৫বছর পরও ‘শান্তির পায়রা’ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপুমনি একই সুরে বলে বেড়াচ্ছে, বাংলাদশে কোন আদিবাসী নেই, নেই কোন সেটলার।  স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে একই ভাঙা রেকর্ড বাজিয়েছে, ‘তদন্ত করে অপরাধীদের উপযুক্ত শাস্তি দেয়া হবে।’ এ ঘটনার পর কয়েক মাস পার হয়ে গেছে, তদন্ত এবং শাস্তির কোন ব্যবস্থা হয়নি। পাহাড়ে সেনা শাসন প্রতিষ্ঠাকারী বিএনপি’র চিফ হুইপ জয়নাল আবেদিন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে পাহাড় থেকে সেনা প্রত্যাহারের কারণেই এই ঘটনা ঘটেছে।  বুর্জোয়া পত্রিকাগুলো এই হামলাকে পাহাড়ী-বাঙালীর মধ্যকার সংঘর্ষ হিসেবে উপস্থাপন করেছে।  পাহাড় থেকে আদিবাসী জনগণকে উচ্ছেদে শাসক শ্রেণীর সকল গোষ্ঠীর নীতি এক।
পাহাড়ীদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ করতে উগ্র বাঙালী শাসক শ্রেণী সমতলের ভূমিহীন নিঃস্ব জনগণকে পুনর্বাসনের নামে পাহাড়ে সমবেত করে।  গত ৩৮ বছরে পাহাড়ে বাঙালী জনগণের সংখ্যা ৪% থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৯ শতাংশে।  পাহাড়ী আদিবাসীদের উচ্ছেদে রাষ্ট্র ও বুর্জোয়া শাসকশ্রেণী, তার সেনাবাহিনী লাঠিয়াল হিসেবে এই জনগণকে ব্যবহার করছে।  পাহাড়ীদের দমন-নিপীড়নের জন্য একদিকে সেনাশাসন জারি রেখেছে, অন্যদিকে গরিব বাঙালীদের তাদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছে।  পাহাড়ী-বাঙালী সংঘর্ষ বাধিয়ে পাহাড়ে সেনা শাসন অব্যাহত রাখার অজুহাত সৃষ্টি করছে।  পাহাড়ী-বাঙালীদের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি করে শাসক শ্রেণী তাদের লুটপাটের রাজত্ব চিরস্থায়ী করার অপচেষ্টা করছে।
বিগত হাসিনা সরকারের আমলে তথাকথিত ‘শান্তি চুক্তি’ হলেও পাহাড়ীদের ভূমি থেকে উচ্ছেদাভিযান বন্ধ হয়নি; বন্ধ হয়নি খুন-জখম, অপহরণ, জ্বালাও-পোড়াও নীতির।  শেখ হাসিনার ‘দিনবদলের সরকার’ও গত দেড় বছরে এ নীতির কোন ব্যতিক্রম করেনি।
পাহাড়ী ক্ষুদ্র জাতিসত্তার জনগণকে বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদ ও তার দালাল বুর্জোয়া শাসক শ্রেণীর শ্রেণী-চরিত্রকে অনুধাবন করতে হবে।  বিপ্লবী ধারা গ্রহণ করতে হবে। এজন্য ভারতের লালগড়সহ সারা ভারতে আদিবাসী জনগণের সংগ্রাম থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা অতীব জরুরী।  শ্রমিক শ্রেণী ও নিপীড়িত জনগণের মুক্তির মতবাদ মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদ ছাড়া নিপীড়িত জনগণের মুক্তি আসতে পারে না।
পাহাড়ী-বাঙালী নিপীড়িত জনগণের ঐক্যবদ্ধ বিপ্লবী সংগ্রামই পাহাড় ও সমতলের ক্ষুদ্র জাতিসত্তার আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারে।  বিকল্প কোন পথ নেই।

সূত্রঃ পাহাড় ও সমতলে আদিবাসী জাতিসত্ত্বার সংগ্রাম সম্পর্কে নিবন্ধ সংকলন, আন্দোলন প্রকাশনা

Advertisements


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s