তুরস্কের মাওবাদী কমিউনিস্ট পার্টির(MKP) ১ম সামরিক সম্মেলনের সফল সমাপ্তি

গতকাল তুরস্কের মাওবাদী কমিউনিস্ট পার্টি(MKP) কেন্দ্রীয় কমিটির সামরিক কমিশন পিপলস লিবারেশন আর্মি (HKO) এর ১ম সামরিক সম্মেলন সফল সমাপ্তির ঘোষণা করেছে।

13330893_201342823592509_7388880832645806950_n

 

Turkish language summary of press statement

Advertisements

সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসী রণনীতি ও তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিপদ

imperialism

সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসী রণনীতি ও তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিপদ

সমগ্র পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সবচেয়ে তীব্র ও গভীর অর্থনৈতিক মন্দা ৮ বছরে পড়ে এ পর্যায়ে দীর্ঘস্থায়ী হয়ে মহামন্দার দিকে ধাবিত হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী কার্যকর তিন মৌলিক দ্বন্দ্ব তীব্রতর হয়ে একদিকে যুদ্ধ তথা বিশ্বযুদ্ধ এবং বিপ্লব তথা বিশ্ব বিপ্লবের সম্ভাবনা আরো বৃদ্ধি করে চলেছে। অসমান বিকাশের নিয়মানুযায়ী পুঁজি ও শক্তি অনুপাতে বাজার ও প্রভাব বলয় পুনর্বণ্টনকে কেন্দ্র করে সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত, মুদ্রাযুদ্ধ, স্থানিক-আঞ্চলিক যুদ্ধ বিস্তৃততর হয়ে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিপদ বৃদ্ধি করে চলেছে। এ প্রেক্ষাপটে একক পরাশক্তি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নেতৃত্বে পাশ্চাত্যের সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর ‘নিরাপত্তা রণনীতি’তথা আগ্রাসী যুদ্ধ রণনীতি এবং প্রতিপক্ষ হিসেবে সামনে সাম্রাজ্যবাদী রাশিয়া ও বৃহৎ সাম্রাজ্যবাদী শক্তিতে পরিণত হওয়ার লক্ষ্যে অগ্রসরমান পুঁজিবাদী চীনের ‘নিরাপত্তা রণনীতি’বিশ্লেষণ তুলে ধরা হল।

যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা রণনীতি-২০১৫

একক পরাশক্তি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ তার অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক প্রাধান্য নেতৃত্ব, কর্তৃত্ব, আধিপত্য বজায় রাখার লক্ষ্যকে সামনে রেখে বিগত ২০১০ সালের জাতীয় নিরাপত্তা রণনীতির ধারাবাহিকতায় ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা রণনীতি-২০১৫ ঘোষণা করে। ৬ অধ্যায়ে বিভক্ত ৩৫ পৃষ্ঠার দলিলে একক পরাশক্তি হিসেবে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের শক্তি অবনতিশীল হলেও তার নেতৃত্ব, কর্তৃত্ব, আধিপত্য রক্ষার মূল লক্ষ্য তুলে ধরে আগ্রাসী ‘একপাক্ষিকতাবাদ (Unilaterism)’ ও ‘ব্যাতিক্রমবাদ (Exceptionalism)’কে অব্যাহত রেখে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে ‘প্রিএম্পটিভ যুদ্ধ’(Pre-emptive) অর্থাৎ যখন যেখানে যা কিছু ইচ্ছা সেখানেই আগ্রাসন চালানোর রণনীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হয়। ২০০৭ সালের ডিসেম্বরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সূচিত মন্দা ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে বৈশ্বিক মন্দায় পরিণত হওয়ার পর ৮ বছরে পড়লেও যুক্তরাষ্ট্র তা কাটাতে ব্যর্থ হলেও স্বীয় অর্থনীতির সাফাই গাওয়ার অপপ্রয়াস চালায়। বৈশ্বিক মন্দা থেকে বের হতে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী আগ্রাসী যুদ্ধ ছড়িয়ে দেওয়ার কার্যক্রমকে ঢেকে রাখার অপতৎপরতা চালাচ্ছে। অসম বিকাশের নিয়মে পুঁজি ও শক্তি অনুপাতে বাজার ও প্রভাব বলয় পূনর্বণ্টন নিয়ে বাণিজ্য যুদ্ধ, মুদ্রাযুদ্ধ, স্থানিক ও আঞ্চলিক যুদ্ধ তথা বিশ্বযুদ্ধের বিপদ বৃদ্ধির বাস্তবতাকে ঢেকে রেখে বিশ্ব শ্রমিক শ্রেণী ও জনগণকে বিভ্রান্ত করছে।

মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ইউরোপকে নিয়ে ন্যাটোকে বৈশ্বিক আগ্রাসনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। দলিলে যুদ্ধের বিভিন্ন রূপের ধারাবাহিকতায় সাইবার যুদ্ধকে সামনে আনা হয়। প্রতিপক্ষদের মোকাবেলায় জলে, স্থলে, অন্তরীক্ষে প্রচলিত, পারমাণবিক যুদ্ধসহ অত্যাধুনিক সকল ধরনের সমরাস্ত্র প্রতিযোগিতা তীব্রতর করে চলেছে। মহাকাশ নিরাপত্তা, বিমান ও নৌ নিরাপত্তায় তাদের প্রাধান্য বজায় রাখার জন্য তীব্র অস্ত্র প্রতিযোগিতা চালাচ্ছে। সাথে সাথে টিটিআইপি ও টিপিপি গ্রহণ করে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে তাদের প্রধান্য বজায় রাখতে চাইছে। বিশ্বব্যাপী জ্বালানির উৎস দখল ও নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত রাখার সাথে সাথে রাশিয়ার উপর ইউরোপের জ্বালানি নির্ভরতা কমানোর দিকনির্দেশ করা হয়। এ প্রেক্ষিতে ইউরোপে তাদের ‘পূর্বমূখী সম্প্রসারণ’(Expansion towards east) মোকাবেলায় শক্তি সঞ্চয় করে সাম্রাজ্যবাদী রাশিয়া তার হারানো স্বর্গ পুনরুদ্ধার করার লক্ষ্যে অগ্রসর হওয়ায় ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্ব-সংঘাত আঞ্চলিক যুদ্ধ বিস্তৃত হয়ে বিশ্বযুদ্ধের বিপদ সামনে আসছে। এ প্রেক্ষিতে দ্বিতীয় শীতল যুদ্ধের (2nd Cold war) কথাবার্তা সামনে আনা হচ্ছে। রাশিয়াকে আক্রমণের লক্ষ্য নির্ধারণ করে একদিকে রাশিয়ার উপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারি এবং রাশিয়ার চারপাশের দেশগুলোতে ব্যাপক সমরসজ্জা ও মহড়া অনুষ্ঠিত করছে। ১৫ মে থেকে ৫ জুন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও রুমানিয়া ১,৫০০ সেনার ‘অপারেশন আটলান্টিক রিজলভ্’-এর অংশ হিসেবে “সার্ভিস-১৫” নামক মহড়া রুমানিয়ায় অনুষ্ঠিত করে। ১৯ মে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে জার্মানিতে ন্যাটোর ১৩ দেশীয় ৪,৭০০ সেনার সামরিক মহড়া অনুষ্ঠিত হয়। মার্কিন পরিকল্পনায় ন্যাটো বহির্ভূত সুইডেনসহ নরডিক দেশগুলোকে মার্কিন নেতৃত্বে ন্যাটোর সামরিক তৎপরতায় সমন্বিত করে ন্যাটোভুক্ত করার প্রয়াস চালানো হচ্ছে। ইউরোপে মার্কিন মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ডেনমার্ক অংশগ্রহণ করার কথা বললে তা থেকে বিরত রাখার জন্য রাশিয়া ডেনমার্ককে হুমকি প্রদর্শন করে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য মাকিন সাম্রাজ্যবাদ ইরান, উত্তর কোরিয়ার মত ‘সন্ত্রাসী রাষ্ট্রে’র মিসাইল আক্রমণ থেকে ইউরোপকে রক্ষা করার নামে কার্যত রাশিয়া বিরোধী মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলে। ন্যাটো নরওয়েতে যৌথ যুদ্ধকেন্দ্র মহড়া চালায়। যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্ক ২৬ মে থেকে সিরিয়ার বিদ্রোহীদের ‘প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র সজ্জিতকরণ কর্মসূচি’কার্যকর করা শুরু করে। এর মোকাবেলায় রাশিয়াও কৃষ্ণ সাগর, বাল্টিক সাগর, উত্তর সাগর, আর্কটিক মহাসাগর, ভূমধ্যসাগরসহ মেক্সিকো উপসাগর ইত্যাদি অঞ্চলে পাল্টা কার্যক্রম সম্প্রসারিত করছে। রাশিয়া ইউরোপকে পক্ষে টানার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোয় মার্কিন নেতৃত্বে পাশ্চাত্যের দেশগুলোর মহড়াসহ ইউক্রেন, মলদোভা ও জর্জিয়াকে ন্যাটোভুক্ত করার পাঁয়তারা মোকাবেলায় রাশিয়া পাল্টা পদক্ষেপ নিয়ে চলেছে। এ প্রক্ষিতে মলদোভার ট্রান্সনেসট্রিয়াকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

প্রতিপক্ষ সাম্রাজ্যবাদী রাশিয়া ও পুঁজিবাদী চীনকে মোকাবেলায় এশিয়া-প্যসিফিক অঞ্চলে ‘রিব্যালান্সিং টু এশিয়া এন্ড প্যাসিফিক’ রণনীতি সামনে রেখে তৎপরতা জোরদার করার কথা বলা হয়। এ ক্ষেত্রে তাদের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে বৃহৎ সাম্রাজ্যবাদী শক্তিতে পরিণত হওয়ার লক্ষ্যে অগ্রসরমান পুঁজিবাদী চীনের ক্রমবর্ধমান শক্তিকে ঠেকানো ও বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি সম্পন্ন এ অঞ্চলে তাদের প্রধান্যকে বজায় রাখা। এ পরিপ্রেক্ষিতে তারা তাদের সমরসজ্জা পুনর্বিন্যস্ত করে নৌবাহিনীর ৬০% এতদঞ্চলে মোতায়েন করে। তারা জাপানকে ভিত্তি করে এবং ভারতকে ‘দন্ডের খিল’(Linch pin) হিসেবে কাজে লাগিয়ে অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর ইত্যাদিকে সমাবেশিত করছে।

নয়াঔপনিবেশিক-আধাসামন্তবাদী ভারতকে পক্ষে টানতে আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী প্রতিযোগিতার প্রক্রিয়ায় চীনের পাল্টা ভারসাম্য হিসেবে মার্কিন ‘রিব্যালাসিং টু এশিয়া-প্যাসিফিক’ (Rebalance to Asia-pacific) রণনীতির সাথে ভারতের ‘এক্ট টু এশিয়া’ (Act to Asia) ধারণাকে সমন্বিত করার বক্তব্য তুলে ধরা হচ্ছে। দ্বীপের মালিকানা নিয়ে চীনের সাথে প্রতিবেশী দেশগুলোর দ্বন্দ্বকে কাজে লাগিয়ে ব্যাপক সমরসজ্জা, সামরিক মহড়া ও কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তারা আসিয়ান (ASEAN), পূর্ব এশিয়া সামিট (EAS), এপেক (APEC)কে কাজে লাগাতে সচেষ্ট রয়েছে। উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ঠেকানোর নামে তারা কার্যত চীনবিরোধী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলছে। এতদঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে নিয়ন্ত্রণে তারা চীনকে বাদ দিয়ে প্যাসিফিক অঞ্চলের ১২টি দেশকে নিয়ে টিপিপি করতে সচেষ্ট রয়েছে। দলিলে এ সকল দিক আলোকপাত করা হয়।

তেল ও জ্বালানি সমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা নিয়ন্ত্রণে তারা নতুন কৌশলে অগ্রসর হচ্ছে। ২০০৩ সালে ইরাক এবং ২০১১ সালে লিবিয়া আগ্রাসন ও দখলের মধ্যদিয়ে তাদের লক্ষ্য পুরোপুরি অর্জিত না হওয়ায় নিজেদের আগ্রাসী অবস্থান শক্তিশালী করতে এবং প্রতিপক্ষ সাম্রাজ্যবাদীদের কোণঠাসা করতে সন্ত্রাসবাদ বিরোধী যুদ্ধের নামে পূর্বের আল-কায়দার ধারাবাহিকতায় নতুন কৌশলে বর্তমানে তাদেরই সৃষ্ট আইএস বিরোধী যুদ্ধের নামে একদিকে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের আগুনকে বিস্তৃত করছে অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ‘ভাগ করে শাসন কর’কৌশল সামনে এনে বৈরুত থেকে শুরু করে বাগদাদ পর্যন্ত শিয়া-সুন্নি বিরোধকে উস্কে দিচ্ছে ও কাজে লাগাচ্ছে। ইরানকে নিয়ন্ত্রণে সামরিক আগ্রাসনের প্রক্রিয়ার পাশাপাশি নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য ও জার্মানী (পি-৫+১)’কে নিয়ে আলোচনার প্রক্রিয়া চালাচ্ছে। আরব দালাল সৌদি আরবের নেতৃত্বে ‘উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ’(জিসিসি) দেশগুলোকে শক্তিশালী করতে সচেষ্ট। এ প্রেক্ষিতে ইরান সমর্থিত ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহীরা রাজধানী নিয়ন্ত্রণ নিলে যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবকে দিয়ে তাদের নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠার তৎপরতায় সৌদি নেতৃত্বে ১০টি আরব দেশের জোটের ব্যাপক বোমা বর্ষণে যুদ্ধ তৎপরতায় পরিণত হয়। এ প্রেক্ষিতে তারা আরব দেশগুলোর যৌথ সেনাবাহিনী গঠন প্রক্রিয়া অগ্রসর করে।

আফগানিস্তান থেকে মার্কিন নেতৃত্বে ন্যাটো সেনা অপসারণের প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র বশংবদ আশরাফ ঘানি সরকারের সাথে ‘দ্বিপাক্ষিক রণনীতিগত চুক্তি’(BSA-Bi-lataral streategic agreement) স্বাক্ষরের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটিসমূহ নিয়ন্ত্রণে প্রায় ১০ হাজার মার্কিন সেনা অবস্থানের বৈধতা দানের প্রয়াস চালায়। আফগানিস্তানে মার্কিন সৈন্যদের অবস্থান আরো ২ বছরের জন্য বর্ধিত করা হয়। এ প্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্র ফ্রন্ট লাইন রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানকে আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী টানাপোড়েন সত্ত্বেও কাজে লাগাতে সামরিক সাহায্য প্রদান অব্যাহত রাখে।

বিপুল খনিজ, বনজ ও প্রাকৃতিক সম্পদে পরিপূর্ণ এবং প্রবৃদ্ধির দ্বিতীয় সম্ভাবনাময় অঞ্চল হিসেবে আফ্রিকার রণনীতিগত গুরুত্ব তুলে ধরা হয় দলিলে। এ প্রেক্ষিতে সুদান, দক্ষিণ সুদান, কঙ্গো, মধ্যআফ্রিকা, সোমালিয়া, নাইজেরিয়া ও সাহেল অঞ্চলে চলমান দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও যুদ্ধে মার্কিন তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। আফ্রিকা নিয়ন্ত্রণে গড়ে তোলা হয়েছে আফ্রিকান কমান্ড (AFRICOM)। প্রতিপক্ষের প্রতিযোগিতায় আমেরিকাও আফ্রিকায় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি করে চলেছে। ইবোলা, এইচআইভি, এইডস, ম্যালেরিয়া ইতাদির বিরুদ্ধে তৎপরতার নামে মার্কিন সেনাবাহিনীর তৎপরতা লক্ষণীয়।

দক্ষিণ আমেরিকা তথা ল্যাটিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্র তার হারানো অবস্থান পুনরুদ্ধারে নতুন কৌশলে অগ্রসর হচ্ছে। দক্ষিণ আমেরিকার অধিকাংশ দেশের মার্কিন বিরোধিতা প্রশমনে এবং কিউবাকে বলপ্রয়োগে পক্ষে আনতে না পেরে তার বিরুদ্ধে জারি করা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে স্বীয় প্রভাব বৃদ্ধিতে তৎপরতা চালাচ্ছে। ২০১৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর দু’দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ঘোষণা, ২০১৫ সালের ১০ ও ১১ এপ্রিলে পানামার রাজধানী পানামা সিটিতে অনুষ্ঠিত আমেরিকানদের ৭ম শীর্ষ সম্মেলনে ওবামা-রাউল বৈঠকে উভয় দেশের রাজধানীতে দূতাবাস খোলার সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ায় জুন মাসের শেষে যুক্তরাষ্ট্র-কিউবার মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী ১৯ জুলাই উভয় দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপিত হয়।

বৈশ্বিক মন্দা থেকে উদ্ধারের কথা বলে যুক্তরাষ্ট্রের একচেটিয়া বুর্জোয়াদের ব্যাংক-বিমা, শিল্প রক্ষায় একের পর এক উদ্ধার কর্মসূচি গ্রহণের নামে সঙ্কটের বোঝা আরো বেশি বেশি করে চাপিয়ে দিচ্ছে শ্রমিকশ্রেণী ও জনগণের ওপর। গণতন্ত্র, মানবাধিকার, ব্যক্তি স্বাধীনতা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহীতা ইত্যাদি বুলি আউড়ালেও বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের নামে কেড়ে নেওয়া হচ্ছে মার্কিন জনগণের সীমিত গণতান্ত্রিক অধিকার, সন্ত্রাসবাদ বিরোধী আইনসহ বিভিন্ন কালা কানুনের শৃঙ্খলে বেধে ফেলছে যুক্তরাষ্ট্রের জনগণকে। হোমল্যান্ড সিকিউরিটিসহ বিভিন্ন দমন-পীড়নমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে ও শক্তিশালী করে শ্রমিকশ্রেণী ও জনগণের আন্দোলন-সংগ্রাম, বিদ্রোহ-বিপ্লবকে ধ্বংস করার লক্ষ্যে সচেষ্ট রয়েছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যুক্তরাষ্ট্রে মোট ১৬টি গোয়েন্দা সংস্থা কার্যকরী রয়েছে। এভাবে ফ্যসিবাদী প্রবণতা বৃদ্ধি করে চলেছে। একচেটিয়া পুঁজির শোষণ-লুন্ঠন তীব্রতর করার স্বার্থে শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে বর্ণবৈষম্যবাদ তীব্রতর করার অপপ্রয়াস চালানো হচ্ছে। তবে কৃষ্ণাঙ্গদের গুলি করে হত্যার সাম্প্রতিক কতিপয় ঘটনার বিরুদ্ধে কৃষ্ণাঙ্গ-শ্বেতাঙ্গ জনগণের ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম উল্লেখযোগ্য ও তৎপর্যপূর্ণ।

ন্যাটোর ২৬তম শীর্ষ সম্মেলন

মার্কিন আগ্রাসী রণনীতিতে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ন্যাটোর ভূমিকা ও তাৎপর্য বিশ্লেষণ করার জন্য বিগত ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনের উপর আলোকপাত করা হলো। ২০১৪ সালের ৪ ও ৫ সেপ্টেম্বর যুক্তরাজ্যের ওয়েলসে মার্কিন নেতৃত্বে ন্যাটো জোটের শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই শীর্ষ সম্মেলন এমন এক সময় অনুষ্ঠিত হয় যখন ইউক্রেন সঙ্কট ও যুদ্ধকে কেন্দ্র করে সাম্রাজ্যবাদী রাশিয়ার সাথে মার্কিনের নেতৃত্বে পাশ্চাত্যের সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর দ্বন্দ্ব-সংঘাত তীব্রতর হয়ে আঞ্চলিক যুদ্ধ ও বিশ্বযুদ্ধের বিপদ বৃদ্ধি করে। তাছাড়া বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সঙ্কট ও মন্দা আঁকাবাঁকা গতিপথে গভীরতর ও ব্যাপকতর হয়ে মহামন্দার দিকে ধাবিত হচ্ছে। এ থেকে পরিত্রাণ লাভে একক পরাশক্তি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নেতৃত্বে আগ্রাসী যুদ্ধকে আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া যুদ্ধের ধারাবাহিকতায় আরো বিস্তৃত করে ন্যাটোকে বৈশ্বিক আগ্রাসনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। মধ্যপ্রাচ্যেসহ এতদাঞ্চলে মার্কিন আগ্রাসী পরিকল্পনা ও কর্মকান্ড আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্ব ও জনগণের সংগ্রামের ফলে আশানারূপ ফলাফল আনতে না পারায় মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ নতুন কৌশলে তার আগ্রাসী তৎপরতা, ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত অগ্রসর করতে সচেষ্ট হয়। এ প্রেক্ষিতে ইসলামিক রাষ্ট্র তথা খেলাফত প্রতিষ্ঠা করে তাদেরই সৃষ্ট আইএস তথা জঙ্গি দমনের নামে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের কথা বলে তাদের আগ্রাসী তৎপরতা চালানোর প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত হয় এই ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলন।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নেতৃত্বে ন্যাটো এবং সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের নেতৃত্বে ওয়ারশ জোট মুখোমুখি থাকার প্রেক্ষাপটে ১৯৯১ সালে পরাশক্তি হিসেবে সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের পতনের মধ্যদিয়ে দ্বিমেরু বিশ্ব (Biopolar) এবং শীতল যুদ্ধ (Cold war) অবসানের কথা বলা হয়। সে সময় শীতল যুদ্ধের বক্তব্যে তারা সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন ও সামাজিক সাম্রাজ্যবাদী সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যকার মৌলিক পার্থক্যকে আড়াল করে বিশ্ব শ্রমিকশ্রেণী ও জনগণকে বিভ্রান্ত করার প্রয়াস চালায়। একক পরাশক্তি হিসেবে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ সামনে আসে এবং এক কেন্দ্রীক (Unipolar)) বিশ্বব্যবস্থার বক্তব্য তুলে ধরে। পরাশক্তি হিসেবে সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের পতনের মধ্যদিয়ে ওয়ারস্ সামরিক জোট ভেঙ্গে গেলেও মার্কিন নেতৃত্বে পশ্চিমাদের ন্যাটো জোট শুধু অব্যাহতই রাখা হয় না বরং এটাকে বৈশ্বিক আগ্রাসনের হাতিয়ার হিসেবে পরিণত করা হয়।

একক পরাশক্তি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ন্যাটো জোটকে অব্যাহত রেখে এর ভূমিকাকে আরো বিস্তৃত করে। এই লক্ষ্যে ধারাবাহিকভাবে ন্যাটোর শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত করে স্বীয় স্বার্থ হাসিলে পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে রণনীতিগত পরিকল্পনা গ্রহণ ও তা বাস্তবায়নে বিভিন্ন পদপে গ্রহণ করে চলে। এ প্রেক্ষিতে ১৯৯১ সালে পরাশক্তি হিসেবে সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের পতনের পর ন্যাটোর পূর্বমূখী সম্প্রসারণ নীতি (Expansion towards east) প্রেক্ষিতে ১৯৯৪ সালে ব্রাসেলস্ শীর্ষ সম্মেলনে গ্রহণ করা হয় ‘শান্তির জন্য অংশীদারিত্ব’(Partnership for peace) নামক পরিকল্পনা যার ভিতর অন্তর্ভূক্ত থাকে মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোসহ সোভিয়েত ইউনিয়নের সাবেক ইউরোপীয় প্রজান্ত্রগুলোকে ধাপে ধাপে ন্যাটো সদস্যভুক্ত করা। ন্যাটো ১৯৯৫ সালে বসনিয়া-হার্জোগভিনিয়া এবং ১৯৯৯ সালে কসোভো যুদ্ধের নামে সার্বিয়ায় বিমান হামলা ও বোমা বর্ষণ করে। ১৯৯৭ সালে মাদ্রিদ শীর্ষ সম্মেলনে পূর্ব ইউরোপের পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি এবং চেক প্রজাতন্ত্রকে ন্যাটোর সদস্যপদ প্রদান করা হয়। কসভোতে কেএফওআর (KFOR) নামক ন্যটোর সামরিক বাহিনীকে নিয়োজিত করে। ১৯৯৯ সালে ন্যাটোর ৫০তম বার্ষিকীতে ওয়াশিংটন শীর্ষ সম্মেলনে ‘সংঘর্ষ ঠেকানো এবং সঙ্কট ব্যবস্থাপনা’র (Prevent Conflict & crisis management) উপর জোর প্রদান করে মৈত্রীর রণনীতিগত ধারণা গ্রহণ করা হয়। তাছাড়া ‘একুশ শতকের রণনীতিগত ধারণা’শীর্ষক একটি দলিল গ্রহণ করা হয়। এতে বলা হয়, ‘‘ন্যাটো একটি বৈশ্বিক সামরিক সংগঠন।”২০০১ সালে আফগান যুদ্ধে মার্কিন নেতৃত্বে ন্যাটো বাহিনী অংশগ্রহণ করে এবং ২০০৩ সালে ন্যাটো আইসাফ (ISAF) বাহিনীর কমান্ড গ্রহণ করে। ইউরোপের বাইরে ন্যাটো বাহিনীর এই প্রথম নিয়োগ। ২০০২ সালে প্রাগ শীর্ষ সম্মেলনে ন্যাটোর Response force গঠন করা হয়। উত্তর ইউরোপের বাল্টিক দেশ লিথুনিয়া, ল্যাটভিয়া ও এস্তোনিয়া এবং পূর্ব ইউরোপের স্লোভেনিয়া, শ্লোভাকিয়া, বুলগেরিয়া ও রুমানিয়া মোট ৭টি দেশকে ন্যাটোভুক্ত করা হয়। ২০০৩ সালে মার্কিন নেতৃত্বে ইউরোপের কতিপয় দেশ ইরাক আগ্রাসন ও দখল কার্যকরী করে। জার্মান-ফ্রান্সের নেতৃত্বে ইউরোপের একাংশ এতে অংশগ্রহণ করে না। ২০০৪ সালে মার্কিন চাপে ন্যাটো ইরাকে প্রশিণ মিশন গঠন করে। ২০০৬ সালে রিগা শীর্ষ সম্মেলনে জ্বালানি নিরাপত্তা ইস্যু গুরুত্ব পায়। ২০০৮ সালে বুখারেষ্ট শীর্ষ সম্মেলনে ক্রোশিয়া ও আলবেনিয়াকে ন্যাটোভুক্তির সিদ্ধান্ত নিয়ে তা ২০০৯ সালে কার্যকরী করা হয়। ২০১০ সালে লিসবনে ২৪তম শীর্ষ সম্মেলনে পরবর্তী ১০ বছরের ‘‘নতুন রণনীতিগত ধারণা”(New stratigic concept) গৃহীত হয়। এই শীর্ষ সম্মেলনে গৃহীত রণনীতিতে ৩টি মূল করণীয় তথা ‘যৌথ প্রতিরা ও নিবৃতকরণ’(collective defence deterrence), ‘সঙ্কট ব্যবস্থাপনা’(crisis management) এবং ‘সহযোগিতামূলক নিরাপত্তা’(cooperative security) সামনে রাখা হয়। ন্যাটোর কমান্ড কাঠামোতে সংস্কার সাধন করা হয়। ইউরোপে নতুন মিসাইল প্রতিরা ব্যবস্থা (New missile defence system) পরিকল্পনার কথা বলা হয়। ২০১৪ সালের মধ্যে আফগানিস্তান থেকে যোদ্ধা সেনা (Combat solders) ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে ‘এনডিউরিং অংশীদারিত্ব চুক্তি’ (Enduring partnership agreement) করা হয়। আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতির সাথে সাথে আধুনিক যুদ্ধে তার প্রয়োগ করার প্রেক্ষিতে সাইবার যুদ্ধের বিষয়টি সামনে আসে। এ ক্ষেত্রে আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী প্রতিযোগিতা পরিকল্পনায় সাইবার যুদ্ধের বিষয়ে গুরুত্ব প্রদান করা হয়।

২০১২ সালের ২০ ও ২১ মে যুক্তরাষ্ট্রের চিকাগোতে অনুষ্ঠিত হয় মার্কিন নেতৃত্বে ন্যাটো জোটের ২৫তম শীর্ষ সম্মেলন। এই সম্মেলনে ২০১০ সালে লিসবনে গৃহীত রণনীতিগত ধারণাকে উর্দ্ধে তুলে ধরে বর্তমান জটিল নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ এবং আর্থিক অসুবিধার মুখে তাদের শক্তি ও কাঠামোকে খাপ খাওয়ানোর কথা বলা হয়। এটাকে ‘স্মার্ট ডিফেন্স দৃষ্টিভঙ্গি’(Smart defence outlook) বলা হচ্ছে। এই সম্মেলনে আফগানিস্তান, কসোভোসহ অন্যত্র তাদের পরিকল্পনা নির্ধারণ করা হয়। ব্যালেস্টিক মিসাইল ও পারমাণবিক অস্ত্র, সন্ত্রাসবাদ, সাইবার আক্রমণ ইত্যাদি মোকাবেলার পরিকল্পনা গ্রহণ করার কথা বলা হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তরকালে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক শিবির ধ্বংস করা ও বিপ্লব ঠেকানো এবং সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসী যুদ্ধ চালানোর লক্ষ্যে ১৯৪৯ সালের ৪ এপ্রিল ১২টি সদস্য রাষ্ট্র নিয়ে ন্যাটো প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৫৬ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নে পুঁজিবাদ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়ে পরবর্তিতে সামাজিক সাম্রাজ্যবাদে পরিণত হয়। ১৯৮৯ সালের সদস্য সংখ্যা ১৬টি থেকে পূর্ণ সদস্য বৃদ্ধি পেতে পেতে ন্যাটোর সদস্য বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ২৮টি দেশে। পূর্ণ সদস্য ছাড়াও ন্যাটো বিভিন্ন কৌশল, রূপ ও প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন দেশকে ন্যাটোর সাথে সম্পর্কিত রাখে। এর মধ্যে রয়েছে ন্যাটো অংশীদারের রূপ। যেমন- ‘শান্তির জন্য অংশীদারিত্ব’কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত ২২টি দেশ। তাছাড়া ভূমধ্যসাগরীয় উত্তর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের ৮টি দেশ নিয়ে গঠিত সংস্থা ‘মেডিটেরিয়ান ডায়লগ’-এর সাথে ন্যাটো বিভিন্ন কৌশলে সম্পর্ক রাখে। ‘ইস্তামবুল সহযোগিতা উদ্যোগ’নামক সংস্থার অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোর সাথে ন্যাটো বিভিন্ন রূপে, বিভিন্ন কৌশলে সম্পর্ক গড়ে তুলতে সচেষ্ট। মার্কিনের নেতৃত্বে ন্যাটোর সাথে জিসিসির অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোর সম্পর্ক রয়েছে। জর্ডান ও মরোক্ক জিসিসিতে ঢোকার জন্য আবেদন করেছে। তাছাড়া ২০১২ সালে গঠিত ‘বিশ্বব্যাপী অংশীদার’ (Partners across the Globe)-এ ১২টি দেশকে প্রাথমিক সদস্য করা হয়। ন্যাটো সদস্য ও অংশীদার মিলিয়ে মোট দেশের সংখ্যা ৭০টি বলে বলা হচ্ছে। যা বিশ্বের একতৃতীয়াংশ।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ২৬তম ন্যাটো সম্মেলনে যোগদানের পথে এস্তোনিয়ার রাজধানী তালিন সফর করেন। সেখানে তিনি বাল্টিক ৩টি দেশ এস্তোনিয়া, ল্যাটভিয়া ও লিথুনিয়ার রাষ্ট্র প্রধানদের সাথে বৈঠক করেন। বৈঠকে তিনি ন্যাটো সদস্য বাল্টিক দেশগুলোকে রক্ষা করার জন্য ন্যাটো সনদের ৫ নং ধারা উল্লেখ করে তাদের উপর আক্রমণ হলে মার্কিন নেতৃত্বে ন্যাটো তাদের রক্ষায় ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন। এরপর তিনি ওয়েলস্ ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে যোগদান করেন। এই শীর্ষ সম্মেলনে ন্যাটোর ২৮টি দেশের সরকার ও রাষ্ট্র প্রধান ছাড়াও ন্যাটোর সাথে বিভিন্ন রূপে সম্পর্কিত ৬০টি দেশের কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকেন।

৪ ও ৫ সেপ্টেম্বর দু’দিনের ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে ১১৩-দফা ওয়েলস্ ঘোষণা প্রদান করা হয়। এই শীর্ষ সম্মেলনে সবচেয়ে সামনে আনা হয় ইউক্রেন সঙ্কট প্রশ্ন। তাদের মতে, ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার আগ্রাসী কার্যকলাপ ইউরোপ সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে মৌলিকভাবে চ্যালেঞ্জ করেছে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় তারা যত দ্রুত সম্ভব একটি ‘যৌথ দ্রুত মোতায়েনযোগ্য বাহিনী’গঠনের ঘোষণা প্রদান করে। এই বাহিনীর সদর দপ্তর পূর্ব ইউরোপের কোন একটি দেশে করা হবে। স্থল, নৌ ও আকাশে এই বহিনীকে অত্যাধুনিক অস্ত্রে সুসজ্জিত করা হবে যাতে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দ্রুত ভূমিকা নিতে পারে। পূর্ব ইউরোপের কোন এক দেশে এই বাহিনীর সদর দপ্তর করার কথা বলা হয়। এই বহিনী ‘অতি উচ্চ প্রস্তুতি সম্পন্ন টাক্স ফোসর্’(VJTF- Vary high readyness joint task force) যা হবে ন্যাটোর সামগ্রিক মোতায়েনযোগ্য বাহিনী (NRF)-এর অংশ। ইউরোপে ন্যাটোর ঘাঁটি এবং যুদ্ধবিমানের চলাচল বৃদ্ধি করে কৃষ্ণ সাগর, বাল্টিক সাগরসহ এতদঞ্চলে সামরিক মহড়া বৃদ্ধি করা হয়। ইউক্রেন ন্যাটোর সদস্য নয় বলে ন্যাটোর ওয়াশিংটন চুক্তির ৫-ধারা তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য না হওয়ায় ইউক্রেনের সেনাবাহিনীকে আরো অস্ত্রশস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়ে আরো আধুনিক ও শক্তিশালী করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য ৫-ধারা অনুযায়ী ন্যাটোর কোন দেশ আক্রান্ত হলে সমগ্র ন্যাটো আক্রান্ত হয়েছে বলে বিবেচিত হয় সে অনুযায়ী সম্মিলিত পাল্টা আক্রমণ করার বিধান রয়েছে। এ প্রেক্ষিতে বাল্টিক বা পূর্ব ইউরোপের কোন দেশ আক্রান্ত হলে সমগ্র ন্যাটো যুদ্ধে নেমে আঞ্চলিক যুদ্ধ বেধে বিশ্বযুদ্ধের দিকে অগ্রসর হওয়ার বিপদ থাকে।

ন্যাটো ইউক্রেন, বাল্টিক দেশসমূহ ও পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর বাস্তবতায় যুদ্ধ পরিচালনায় ‘হাইব্রিড যুদ্ধ’(Hybrid Warfare)-এর হুমকির কথা বলছে যাতে অন্তর্ভুক্ত থাকে প্রকাশ্য ও গোপন, আধাসামরিক এবং বেসামরিক দিকসহ ব্যাপক সমন্বিত বিষয়। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ন্যাটোর এবারের শীর্ষ সম্মেলনে ন্যাটো-রাশিয়া যৌথ পরিষদের বৈঠকের জন্য রাশিয়াকে আমন্ত্রণ জানানো হয় না। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য ১৯৯৮ সাল থেকে ‘ন্যাটো-রাশিয়া ফাউন্ডিং এক্ট’ ও ‘রোম বিবৃতি’র ভিত্তিতে ন্যাটো-রাশিয়া পরিষদ গঠিত হয় এবং ধারাবাহিকভাবে তার বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও এবারে ন্যাটো সম্মেলনে সে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় না। কারণ ইউক্রেন সঙ্কটের ফলে ন্যাটো রাশিয়ার সাথে সকল প্রায়োগিক সামরিক ও বেসামরিক সহযোগিতা স্থগিত করে। তবে যোগাযোগের রাজনৈতিক মাধ্যম খোলা থাকার কথা বলা হয়। ফলশ্রুতিতে উভয়পক্ষের মধ্যে অস্ত্র প্রতিযোগিতা ও পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ তীব্রতর হয়। মার্কিনের মিসাইল ডিফেন্স ও সামরিক মহড়ার পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে রাশিয়া তার বিভিন্ন ধরনের মিসাইল ও আকাশ প্রতিরক্ষা কমান্ড গড়াসহ পারমাণবিক অস্ত্রের ভা-ারে নতুন ধরনের পরমাণু বোমা সংযোজন, জলে, স্থলে, আকাশে ব্যাপক সামরিক মহড়া সংগঠিত করে। মার্কিনের নেতৃত্বে ইউরোপের ধারাবাহিক অর্থনৈতিক অবরোধের পাল্টা পদক্ষেপ গ্রহণ করে। প্রতিপক্ষের আরোপিত অবরোধে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা খাত ও অস্ত্র ব্যবসায় প্রভাব পড়ে। জার্মানি রাশিয়ায় প্রতিরক্ষা প্রকল্প সহয়তা স্থগিত করে। ফ্রান্স মিসট্রেল শ্রেণীর ৪টি যুদ্ধ জাহাজ সরবরাহে রুশ অর্ডার আটকে দেয়। ন্যাটোকে মোকাবেলায় রাশিয়া তার সমরনীতি ও রণনীতিতে পরিবর্তনের ঘোষণা দেয়।

এই শীর্ষ সম্মেলনে ন্যাটো তার সামরিক শক্তি বৃদ্ধিতে প্রতিরক্ষা বাজেটে ব্যয় বৃদ্ধির ঘোষণা দেয়। এ প্রেক্ষিতে ন্যাটেভুক্ত প্রতিটি দেশের জিডিপির কমপক্ষে ২% সামরিক খাতে ব্যয় করার কথা বলে। যার মধ্যে ২০% প্রতিরক্ষা যন্ত্রপাতি এবং গবেষণা ও উন্নয়নে ব্যয় করার দিকনির্দেশ থাকে। ন্যাটো ইউক্রেন ও জর্জিয়াকে ন্যাটোভুক্ত করতে চাইলে রাশিয়া তার কঠোর বিরোধিতা করায় ন্যাটো কৌশলে ধাপে ধাপে অগ্রসর হচ্ছে।

ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট পেত্রো পোরেশেঙ্ক অংশগ্রহণ করায় ন্যাটো-ইউক্রেন যৌথ বিবৃতি প্রচারিত হয়। ন্যাটোকে সম্প্রসারিত করার লক্ষ্যে আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, জর্জিয়া, মলদোভাকে পক্ষে টানার পরিকল্পনা গৃহীত হয়। ন্যাটো-ইরাক অংশীদারিত্বকে অগ্রসর করার কথা বলা হয়। তথাকথিত ইসলামি রাষ্ট্র (IS)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধের ডাক দেওয়া হয়। মার্কিন ও পাশ্চাতের সৃষ্ট আইএসকে সামনে রেখে নতুন কৌশলে তাদের আগ্রাসী যুদ্ধ পরিকল্পনাকে ঢেকে রাখার অপপ্রয়াস চালানো হয়। সিরিয়ায় বোমাবর্ষণ সম্প্রসারণ করার নামে প্রতিপক্ষ রাশিয়ার দালাল আসাদ সরকারকে উৎখাত করার লক্ষ্যকে আড়াল করা হয়। সম্মেলনে মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্যএশিয়া, ইরান, আফগানিস্তান, আফ্রিকার মালি, বলকান অঞ্চলের কসোভো, দূরপ্রাচ্যের উত্তর কোরিয়া ইত্যাদি দেশ সম্পর্কে ন্যাটোর পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। ন্যাটো আবখাজিয়া ও দক্ষিণ ওসেটিয়াকে জর্জিয়াকে ফেরত দেওয়ার কথা বলে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য সাম্রাজ্যবাদী রাশিয়া তার শক্তি সঞ্চয়ের পর ২০০৮ সালে মার্কিন নেতৃত্বে পাশ্চাত্যের সাম্রাজ্যবাদী পরিকল্পনায় জর্জিয়ার অভিযান মোকাবেলা করার পরিণতিতে উক্ত দেশ দুটি ‘স্বাধীন রাষ্ট্রে’পরিণত হয়। ২০১৪ সালে আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করার পরিকল্পনার মধ্যে ১০ হাজার সেনা ও ঘাঁটি রেখে আফগান সরকারের সাথে ৩০ সেপ্টেম্বর ‘দ্বিপাক্ষিক নিরাপত্তা চুক্তি’(BSA-Bilateral security agreement) স্বাক্ষর করা হয়। ২০১২ সালে চিকাগোতে অনুষ্ঠিত ন্যাটোর ২৫তম শীর্ষ সম্মেলনে ২০২০ সাল পর্যন্ত পরিকল্পনা বহাল রেখে তা কার্যকর করার কথা বলা হয়। ন্যাটোর যৌথ প্রতিরক্ষার মূল কর্তব্যের অংশ হিসেবে বর্ধিত সাইবার প্রতিরক্ষা পলিসি তথা সাইবার যুদ্ধকে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করা হয়। চিকাগো সম্মেলনে গৃহীত ‘স্মার্ট প্রতিরক্ষা উদ্যোগ’কে অগ্রসর করার আহ্বান জানানো হয়। তাছাড়া দূরনিয়ন্ত্রিত আকাশ নিরাপত্তা/প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়। বর্তমান যুদ্ধে ড্রোনের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার প্রণিধানযোগ্য। ২০১৬ সালে সমন্বিত, যৌথ অভিযানকারী বাহিনী প্রতিষ্ঠা করার ঘোষণা দেওয়া হয়। ২১ শতকে সমুদ্র এলাকার ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব বেড়ে যাওয়ায় সামগ্রিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। রাসায়নিক, জৈবিক, বিকিরণ, পারমাণবিক (CBRM-Chemical, Biological, Radiological, Nuclear) হুমকির কথা বলে সমন্বিত যৌথ সিবিআরএম প্রতিরক্ষা টাক্স ফোর্স গঠনের কথা বলা হয়। ২০১৬ সালে পোল্যান্ডে ন্যাটোর ২৭তম শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়।

জাপান-যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষার সহযোগিতা

২৭ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীগণ জাপান-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ‘নতুন গাইড লাইন’চুক্তি স্বাক্ষর করে। ১৯৯৭ সালের গাইড লাইন উন্নীত করে এই ‘নতুন গাইড লাইন’চুক্তি করা হয়। এই চুক্তি জাপানের আত্মরক্ষার্থেই শুধু নয় বরং জাপান-যুক্তরাষ্ট্রের প্রেক্ষিতে পরিপূরক ভূমিকা নিবে বলে বলা হয়। জাপান-যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সহযোগিতার নতুন গাইড লাইনে ৭টি অধ্যায় রয়েছে। সেগুলো হলো ১) গাইড লাইনের লক্ষ্য; ২) মৌলিক ক্ষেত্র ও নীতি; ৩) স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে/অবস্থায় সহযোগিতা; ৪) জাপানের বিরুদ্ধে সশস্ত্র আক্রমণ মোকাবেলার কার্যক্রম; ৫) জাপানের শান্তি ও নিরাপত্তার উপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখে এমন পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের ঘটনাবলীর ক্ষেত্রে সহযোগিতা; ৬) গাইড লাইন অনুসারে কার্যকর প্রতিরক্ষা সহযোগিতার দ্বিপাক্ষিক কর্মসূচি এবং ৭) গাইড লাইনের সময় মত ও যথাযথ পুনর্মূলায়ন। বিশ্ব পরিসরে জাপানকে তুলে ধরা: গোয়েন্দা পর্যবেক্ষণ ও তথ্যানুসন্ধান এবং সাইবার স্পেস ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা; প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি উৎপাদন ও উন্নয়নে বর্ধিত সহযোগিতা ইত্যাদি দিকগুলো ধরা হয়। যুক্তরাষ্ট্র, জাপানে মনুষ্যবিহীন মহাকাশযান ‘গ্লোবাল হক’জাপানি মিজওয়া বিমান ঘাঁটি থেকে উড্ডয়ন করে যা পর্যায়ক্রমে চলতে থাকবে। ব্যালেস্টিক মিসাইল হুমকি ঠেকাতে ডিসেম্বর’১৪-এ জাপানে নতুন রাডার স্থাপনের পর অতিরিক্ত মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পাঠানো হচ্ছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য উত্তর কোরিয়ার মিসাইল আক্রমণের কথা বলা হলেও আদতে এর মূল লক্ষ্য হল চীন। ওকিনহাওয়া ও গুয়ামে মার্কিন সেনাবাহিনী এবং ফুটেনমায় মার্কিন বিমান ঘাঁটি পুনর্বিন্যস্ত করা হচ্ছে। সাম্রাজ্যবাদী জাপান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর ‘শান্তিবাদী সংবিধান’ পাল্টিয়ে অত্যাধুনিক, সুসজ্জিত সেনাবাহিনী গঠন, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীতে অংশগ্রহণসহ বিদেশে সেনাবাহিনী প্রেরণ, অস্ত্র উৎপাদন ও অস্ত্র রফতানি তৎপরতা বৃদ্ধি করাসহ মার্কিন নেতৃত্বে এশিয়া-প্যাসিফিক আগ্রাসী রণনীতিতে কার্যকর ভূমিকা পালন করছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য জাপানের ওকিনহাওয়াতে মার্কিন ৭ম নৌবহরের সদর দপ্তর।

রাশিয়ার নতুন প্রতিরক্ষা মতবাদ

ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে মার্কিন নেতৃত্বে ইউরোপকে সমন্বিত করে ন্যাটোর সামরিক রণনীতি মোকাবেলায় সাম্রাজ্যবাদী রাশিয়া নতুন সামরিক মতবাদ সামনে আনে। এই মতবাদে রাশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর বৃহত্তম হুমকি হিসেবে ন্যাটোর সম্প্রসারণকে দায়ী করা হয়। এর পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে রুশ সেনা মোতায়ন করা, সমগ্র সমাজের বর্ধিত সামরিকীকরণ, ব্রিকস দেশসমূহ ও ল্যাটিন আমেরিকার কয়েকটি দেশের সাথে সামরিক সহযোগিতাকে সামনে আনা হয়। নতুন প্রতিরক্ষা মতবাদে পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে সামরিক হুমকির চরিত্রের পরিবর্তনের কথা বলা হয়। যা ইউক্রেন পরিস্থিতি এবং উত্তর আফ্রিকা, সিরিয়া, ইরাক, আফগানিস্তানের ঘটনাবলীতে পরিলক্ষিত হয়। রিপোর্টে জাতিসংঘের গুরুত্ব এবং ‘ইউরোপের নিরাপত্তা সহযোগিতা সংস্থা’(OSCE)’র সাথে রাশিয়ার সহযোগিতা করার ইচ্ছার কথা বলা হয়। পারমাণবিক বা প্রচলিত অস্ত্রেই হোক রাশিয়া আক্রান্ত হয়ে অস্তিত্বের হুমকিতে পড়লে রাশিয়ার প্রি-এম্পটিভ পারমাণবিক আঘাত হানার অধিকার বজায় রাখার কথা বলা হয়। চীন, বেলারুশ, কাজাখস্তানসহ রাশিয়ার মিত্রদের উপর সামরিক আক্রমণ হলে রাশিয়া সামরিক হস্তক্ষেপের অধিকার বজায় রাখার কথা বলে। রিপোর্টে সন্ত্রাসবাদ বিরোধী যুদ্ধের উপর আলোকপাত করা হয়। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সামরিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি এবং সামরিক শক্তি ব্যবহারে পরিস্থিতি তুলে ধরে রাশিয়ার মূল সামরিক হুমকিগুলো বর্ণনা করা হয়। রিপোর্টে যুদ্ধকালীন অর্থনীতির প্রস্তাব করা হয়। ক্রিমিয়ার রণনীতিগত গুরুত্বের কারণে স্থলবাহিনী ও কৃষ্ণ সাগরীয় নৌবহরকে আরো উন্নত ও আধুনিকীকরণ করা এবং আর্কটিকে রাশিয়ার ক্ষমতা বৃদ্ধির কথা বলা হয়। ২০১৩ সালে প্রেসিডেন্ট পুতিন প্রদত্ত সামরিক সংস্কার কর্মসূচি কার্যকরী করা এবং সামরিক অস্ত্র সজ্জিতকরণ বিষয়ে ২০১৬ থেকে ২০২৫ সালের জন্য নতুন কর্মসূচি প্রণয়নের আহ্বান জানানো হয়। রাশিয়ার নাগরিকদের সামরিক দেশপ্রেমিক শিক্ষায় শিক্ষিতকরণ এবং প্রত্যেক নাগরিককে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করার দিক সামনে আনা হয়। সামরিক সংঘাত প্রশমন ও প্রতিরোধের প্রধান কর্তব্য হিসেবে দলিলে ব্রিকস, মধ্যএশিয়া এবং ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে বর্ধিত সামরিক সহযোগিতা করার কথা বলা হয়। রাশিয়ার দক্ষিণ ওসেটিয়া ও আবখাজিয়ার সাথে সম্পর্ক জোরদার করে। সোভিয়েত পরবর্তী সময়ে এতদঞ্চলে অনেক নৃ-গোষ্ঠী ও জাতীয় সংঘাত রয়েছে যাকে যে কোন সময় প্ররোচিত করে ন্যাটোর সাথে রাশিয়ার সরাসরি সংঘর্ষের বিপদ সৃষ্টি করার পরিস্থিতি রয়েছে। সিসটোর সদস্য ও পর্যবেক্ষক দেশগুলোকে শক্তিশালী করা এবং সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা (SCO) ও ওএসসিই (OSCE)’র সাথে সহযোগিতা বৃদ্ধি করার কথা বলা হয়। এ সময়ে ইউক্রেন কোন পক্ষের সামরিক জোটে যোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত পার্লামেন্টে বাতিল করে ভবিষ্যতে ন্যাটাভুক্ত হওয়ার পথ প্রশস্ত করায় রাশিয়ার উদ্বেগ বৃদ্ধি পায়। ইউক্রেনকে অধুনিক অস্ত্রে সুসজ্জিত করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশ প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র প্রেরণ করে চলেছে। ১৬ মে ইউক্রেন পার্লামেন্ট বিদেশি ঋণের কিস্তি পরিশোধ স্থগিত করার মোরাটোরিয়াম ঘোষণা করায় রাশিয়া তা প্রত্যাখান করে।

১৬-১৭ এপ্রিল আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার উপরে ৪র্থ মস্কো কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়। এতে ৭৯টি দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রী, সামরিক প্রতিনিধি দল এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার কয়েকজন প্রধান উপস্থিত থাকেন। এই সম্মেলনে রাশিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী সার্গেই সইগু এবং রাশিয়ার সেনাপ্রধান ভ্যালেরি গেরাসিমভ বিশ্ব নিরাপত্তার প্রধান প্রধান হুমকি এবং তা মোকাবেলায় সহযোগিতার সম্ভাব্য ক্ষেত্র নিয়ে তাদের বক্তব্য প্রদান করেন। এই সম্মেলনে গতবারের মত এবারেও ন্যাটো ও ইউরোপের দেশগুলো অংশগ্রহণ করে না।

একক পরাশক্তি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নেতৃত্বে পাশ্চাত্যের সাম্রাজ্যবাদীদের প্রতিপক্ষ সাম্রাজ্যবাদী রাশিয়া জলে, স্থলে, অন্তরীক্ষে ব্যাপক অস্ত্র প্রতিযোগিতা চালিয়ে যাচ্ছে। এ প্রেক্ষিতে রাশিয়া ২০১৫ সালে মহাকাশ সেনাবাহিনী গঠনের ঘোষণা দেয়। বর্তমানে একটি মাত্র মহাকাশ স্টেশন আইএসএস-এ যাতায়াতে মার্কিন স্যাটেল যান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিকল্প হিসেবে সামনে থাকে রাশিয়ার সুয়্যাজ রকেট। যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপে মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া অগ্রসর করে চললে রাশিয়া পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে কালিনিনগ্রাদে ইস্কান্দার মিসাইল স্থাপন করা ছাড়াও আইসিবিএম বিধ্বংসী মিসাইল উদ্ভাবন করে। তাছাড়া মহাকাশে উপগ্রহ অস্ত্র বানানোর কথা শোনা যায়। রাশিয়া ও চীনকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ন্যাটোর ব্যাপক সামরিক মহড়ার পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে রাশিয়া কৃষ্ণ সাগর, বাল্টিক সাগর, উত্তর সাগর, ভূমধ্যসাগরে পাল্টা মহড়া করা ছাড়াও যুক্তরাষ্টের নিকটবর্তী এলাকায় রণনীতিগত দূরপাল্লার বোমারু বিমান উড়ানো, মেক্সিকো উপসাগরে রাশিয়ার স্টিলথ্ সাবমেরিনের চলাচল লক্ষণীয়। রাশিয়া ল্যাটিন আমেরিকায় ভেনিজুয়েলাসহ সিলাকের কয়েকটি দেশের সাথে যৌথ সামরিক মহড়া সংগঠিত করে। কিউবায় রাশিয়ার যুদ্ধ জাহাজ ভেড়া, রুশ ঘাঁটি নবায়ন করা; ইরানকে অত্যাধুনিক এস-৩০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রদানের ঘোষণা; চীনের সাথে প্রশান্ত মহাসাগরে যৌথ মহড়ার ধারাবাহিকতায় ভূমধ্যসাগরে যৌথ নৌমহড়া; চীনকে অত্যাধুনিক এসইউ-৩৫ যুদ্ধবিমান এবং এস-৪০০ মিসাইল প্রদানের ঘোষণা; অত্যাধুনিক আর্মাটা ট্যাংক, সকল মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করতে সক্ষম আইসিবিএম প্রদর্শন; মধ্য-এশিয়ার তাজিকস্তান ও কিরঘিজস্তানে সামরিক ঘাঁটি; ভিয়েতনাম ‘কামরান বে’সামরিক ঘাঁটি রাশিয়াকে ব্যবহার করতে দেওয়া উল্লেখযোগ্য।

চীনের নতুন প্রতিরক্ষা রণনীতি

বৃহৎ সাম্রাজ্যবাদী শক্তিতে পরিণত হওয়ার লক্ষ্যে অগ্রসরমান পুঁজিবাদী চীন অর্থনৈতিক ক্ষেত্রের পাশাপাশি রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তার শক্তি বৃদ্ধি করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অধিকতর ভূমিকা গ্রহণ করে চলেছে। পুঁজি ও শক্তি অনুপাতে বাজার ও প্রভাব বলয় পুনর্বণ্টনের লক্ষ্যে একক পরাশক্তি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে মোকাবেলায় সাম্রাজ্যবাদী রাশিয়ার সাথে সমন্বিত হয়ে পাল্টা পদক্ষেপ অগ্রসর করে চলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ‘এশিয়া প্যাসিফিক রণনীতি’এবং ‘রিব্যালান্সিং টু এশিয়া’মোকাবেলায় চীন তার স্থল, নৌ ও বিমান বাহিনীসহ সাইবার যুদ্ধাস্ত্র এবং সকল যুদ্ধাস্ত্রের আধুনিকীকরণ করে চলেছে। বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম সামরিক ব্যয়, ‘স্ট্রিং অফ পার্ল’ রণনীতি, ‘দুই মহাসাগর’ রণনীতি, আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী বাহিনীতে চীনা সেনাবাহিনীর অংশগ্রহণ ও তৎপরতা বৃদ্ধি, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে চীনা নৌবাহিনীর সফর এবং ক্রমবর্ধমান দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সামরিক মহড়া ইত্যাদির ধারাবাহিকতায় ২০১৫ সালের ২৬ মে চীন তার নতুন সামরিক রণনীতি সম্বলিত শ্বেতপত্র প্রকাশ করে। ১৯৯৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত চীন ৯টি প্রতিরক্ষা শ্বেতপত্র প্রকাশ করে। এবারের শ্বেপত্রে ২০ পৃষ্ঠায় ৬টি অধ্যায় নিয়ে এই দলিল প্রণীত হয়। অধ্যায়গুলো হচ্ছে- ১) জাতীয় নিরাপত্তা পরিস্থিতি; ২) চীনা সশস্ত্র বাহিনীর উদ্দেশ্য এবং রণনীতিগত কর্তব্য; ৩) সক্রিয় প্রতিরক্ষার রণনীতিগত গাইড লাইন; ৪) চীনা সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলা ও উন্নয়ন করা; ৫) সামরিক সংগ্রামের জন্য প্রস্তুতি এবং ৬) সামরিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা। বর্তমানে শ্বেতপত্রের মাধ্যমে চীন যে সামরিক রণনীতি প্রকাশ করছে তা অনেক সামগ্রিক।

এই সম্মেলনে দক্ষিণ চীন সাগরে চীন কর্তৃক মাটি ভরাট করে কৃত্রিম দ্বীপ নির্মাণকে কেন্দ্র করে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে তীব্র মতপার্থক্য ও সামরিক সংঘাতের বিপজ্জনক পরিস্থিতি তুলে ধরে দক্ষিণ চীন সাগরে যুক্তরাষ্ট্রকে নাক না গলানোর জন্য সতর্ক করে। দলিলে ৩টি বিষয়ের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। বিষয় ৩টি হচ্ছে- সামরিক বাহিনীর জন্য রাজনৈতিক কাঠামোর নতুন উপলব্ধি; বর্ধিত নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব; চীনা গণমুক্তি বাহিনীকে বিশ্ব পরিসরে তুলে ধরা। বর্তমানে বিশ্বের ৬০টিরও বেশি দেশের সাথে চীনের “রণনীতিগত অংশীদারিত্ব”বা অনুরূপ সম্পর্ক রয়েছে। চীনা সেনাবাহিনী অধুনিকীকরণের প্রেক্ষিতে ‘নিকটবর্তী সমুদ্র প্রতিরক্ষা’থেকে ‘নিকটবর্তী সমুদ্র প্রতিরক্ষা এবং দূরবর্তী সমুদ্র রক্ষা’কে সমন্বিত করার দিকনির্দেশ করা হয়। চীন স্বল্প, মাঝারী ও দূরপাল্লাসহ মহাকাশে সাইবার তৎপরতা চালাচ্ছে। চীন তার বিমানবাহী রণতরী কর্মসূচি অগ্রসর করে চলেছে। চীনের বিমানবাহী রণতরী বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ও উপগ্রহ বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিপক্ষের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাড়িয়েছে।

‘চীন আধুনিক সমাজতান্ত্রিক দেশ’, ‘জনযুদ্ধের বিস্তারিত ব্যাখ্যা, “সক্রিয় আত্মরক্ষা সামরিক রণনীতিগত গাইড লাইন”ইত্যাদি বুলি আউড়ালেও তাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে, পুঁজিবাদী চীনকে সাম্রাজ্যবাদী চীনে পরিণত করে বাজার ও প্রভাব বলয় পুনর্বণ্টনের লক্ষ্যে ‘চীনা স্বপ্ন’বাস্তবায়ন করা। “সিল্ক রুট”ও “মেরিটাইম সিল্ক রোড”কর্মসূচি বিচ্ছিন্ন কোন বিষয় নয় বরং এর সাথে অর্থনৈতিক দিক ছাড়াও রাজনৈতিক ও সামরিক দিকেরও সম্পর্ক রয়েছে। দলিলে মার্কিন নেতৃত্বে ‘এক কেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা’র বিরুদ্ধে ‘বহুকেন্দ্রিক বিশ্ব ব্যবস্থা’সামনে আনা হয়। বিশ্বের অর্থনৈতিক ও রণনীতিগত ভরকেন্দ্র ক্রমাগত এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে চলে আসা এবং সে প্রেক্ষিতে মার্কিনের ‘রিব্যালান্সিং রণনীতি’ও মার্কিনের ‘এতদঞ্চলে তার সামরিক উপস্থিতি ও সামরিক জোট’; জাপানের প্রেক্ষিতে তার সামরিক ও নিরাপত্তা পলিসি পরিবর্তন; চীনের দ্বীপসমূহে তাদের সামরিক উপস্থিতি; দক্ষিণ চীন সাগরে বহির্শক্তি তথা মার্কিনের হস্তক্ষেপ ও সামরিক তৎপরতা মোকাবেলা করার বিষয় সামনে এনে চীনের সামরিক রণনীতি বিন্যাস করা হয়। কোরিয় উপদ্বীপ, উত্তর-পূর্ব এশিয়ায় অস্থিতিশীলতা, অনিশ্চয়তা, আঞ্চলিক সন্ত্রাসবাদ, বিচ্ছিন্নতাবাদ ও উগ্রবাদ, তাইওয়ান ইস্যু ইত্যাদি প্রশ্ন সামনে এনে তা মোকাবেলায় চীনের অবস্থান তুলে ধরা হয়।

সামরিক বিষয় অস্ত্র ও যুদ্ধের ক্ষেত্রে অত্যাধুনিক প্রযুক্তিসহ দূরপাল্লার নিখুত, স্মাটর্, স্টিলথ্, মনুষ্যবিহীন অস্ত্রশস্ত্র, দূর-মহাকাশে ও সাইবার ক্ষেত্রে তথ্য-প্রযুক্তি যুদ্ধ ইত্যাদি বিষয়কে সামনে এনে ‘সামরিক ক্ষেত্রে বিশ্ব বিপ্লব’-এর তত্ত্ব নাম অভিহিত করে সামনে আনে। এভাবে বিশ্ব শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্বে যুদ্ধ তথা বিশ্বযুদ্ধের উৎস সাম্রাজ্যবাদকে উৎখাত করার জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব ও সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব তথা বিশ্ববিপ্লব সম্পন্ন করার কর্তব্যকে আড়াল করে আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ ও প্রতিরক্ষা রণনীতি সামনে এনে সামরিক শক্তির পুনর্বিন্যাস ঘটানো হচ্ছে। চীনও সে পথে অগ্রসর হচ্ছে। এই দলিলে ২০২১ সালের মধ্যে চীনে সকল দিক থেকে মোটামুটি সমৃদ্ধশালী একটি সমাজ প্রতিষ্ঠার এবং ২০৪৯ সালের মধ্যে একটি ‘আধুনিক সমাজতান্ত্রিক দেশ’গড়ার চীনা স্বপ্ন বাস্তবায়নে সশস্ত্র বাহিনীর রণনীতিগত ভূমিকা পালনের যে কথা বলা হচ্ছে প্রকৃতপক্ষে তা পুঁজিবাদী চীনকে সাম্রাজ্যবাদী চীনে পরিণত করা ছাড়া আর কিছু নয়।

শ্বেতপত্রে, ‘জাতীয় নিরাপত্তা, আভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক নিরাপত্তা ভারসাম্য, দেশের ও নাগরিক নিরাপত্তা, ঐতিহ্যিক ও অ-ঐতিহ্যিক নিরাপত্তা, ন্যূনতম জীবনধারণ ও উন্নয়ন নিরাপত্তা, চীনের নিজস্ব নিরাপত্তা এবং বিশ্বের সাধারণ নিরাপত্তার যে সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা’র যে আহ্বান জানানো হয়েছে তার মধ্যদিয়ে একদিকে চীনের পুঁজিপতিদের শোষণ-লুণ্ঠন এবং তাদের স্বার্থ রক্ষাকারী সরকার ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার বিরুদ্ধে শ্রমিক-কৃষক-জনগণের আন্দোলন-সংগ্রাম, বিদ্রোহ-বিপ্লব ঠেকানো সাথে সাথে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাজার ও প্রভাব বলয় পুনর্বণ্টনের আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী প্রতিযোগিতা-প্রতিদ্বন্দ্বিতা, যুদ্ধ-বিগ্রহ, বিশ্বযুদ্ধের প্রস্তুতিকে সামনে আনা হয়েছে। এ সত্যকে ঢেকে রাখার জন্য নানান বুলির আড়ালে প্রকৃত সত্যকে ঢেকে রাখার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে। এ প্রেক্ষিতে চীনা সেনাবাহিনীর ৮টি করণীয় তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে সামরিক হুমকি মোকাবেলাসহ নতুন নতুন ক্ষেত্রে চীনের নিরাপত্তা রক্ষা; বিদেশে চীনের স্বার্থ রক্ষা; রণনীতিগত নিবৃতকরণ ও পাল্টা পারমাণবিক আক্রমণ; বিচ্ছিন্নতাবাদ, সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলা; জরুরি উদ্ধার ও বিপর্যয় মোকাবেলা; আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সহযোগিতা ইত্যাদি। চীনের কমিউনিস্ট পার্টির সামরিক রণনীতিগত ধারণার অন্তর্বস্তু হিসেবে ‘সক্রিয় প্রতিরক্ষার রণনীতিগত ধারণা’কে তুলে ধরা হয়। চীনে শ্রমিকশ্রেণীর পার্টির নেতৃত্বে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ বা জনযুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৪৯ সালে সাম্রাজ্যবাদ-সামন্তবাদকে উৎখাত করে জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করে। কিন্তু চীনের কমিউনিস্ট পার্টি মার্কসবাদ-লেনিনবাদের মৌলিক নীতি থেকে বিচ্যুতি তথা সংশোধনবাদী মাও সেতুং চিন্তাধারার প্রভাবে চীন সর্বহারা একনায়কত্বাধীন সমাজতন্ত্রের দিকে না যেয়ে পুঁজিবাদের পথ ধরে। এ প্রক্রিয়ায় পূর্বের ধারাবাহিকতায় ১৯৯৩ সালে চীনের নতুন যুগের সামরিক রণনীতিগত গাইড লাইন প্রণয়ন করা হয়। যাতে আধুনিক প্রযুক্তি বিশেষ করে উচ্চ প্রযুক্তির পরিস্থিতিতে স্থানীয় যুদ্ধে জয়লাভ করাকে সামরিক সংগ্রামের প্রস্তুতির মৌলিক বিষয় হিসেবে তুলে ধরা হয়।

পরবর্তীকালে তথ্যায়নকরণকৃত (Informationisation) পরিস্থিতিতে স্থানীয় যুদ্ধের বিষয়টি সামনে আনা হয়। এই প্রক্রিয়ায় তারা সামরিক যুদ্ধের প্রস্তুতির মৌলিক বিষয় হিসেবে সমুদ্রে সামরিক প্রস্তুতি ও সামরিক সংগ্রামকে তুলে ধরে তথ্যায়নকরণকৃত যুদ্ধে জয়লাভের কথা বলা হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য ‘সমুদ্রকে ছাড়িয়ে স্থলযুদ্ধের ঐতিহ্যিক মানসিকতাকে অবশ্য পরিত্যাগ করা ….’; একটি আধুনিক নৌ সামরিক শক্তির ‘কাঠামো’ গড়ে তোলা; গণমুক্তি বাহিনীর সামর্থ বৃদ্ধি করে নিবৃতকরণ ও পাল্টা আক্রমণসহ ‘উন্মুক্ত সমুদ্র রক্ষা’ করা ইত্যাদি কথা বলা হয়। নৌবাহিনী ‘নীজ সমুদ্র প্রতিরক্ষা’র (Offshore water defence) সাথে ‘উন্মুক্ত সমুদ্র’(Open Sea) রক্ষাকে সমুন্বিত করার উপর ক্রমশ জোর দেওয়া হয়। এ জন্য সমন্বিত, দক্ষ, বহু কার্যক্রম বিশিষ্ট লড়াকু নৌবাহিনীর কাঠামো গড়ে তোলার কথা বলা হয়। তাছাড়া আকাশে ও মহাকাশে প্রতিরক্ষা এবং আক্রমণ সামর্থ বাড়ানো; বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষমতা বাড়ানো; মিসাইল আক্রমণ ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা; পারমাণবিক ও প্রচলিত ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা ইত্যাদি দিক তুলে ধরা হয়। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় মহাকাশ প্রাধান্য পাচ্ছে। তাছাড়া বলা হয়, জাতীয় প্রতিরক্ষার নতুন ক্ষেত্র এবং অর্থনৈতিক ও সমাজিক উন্নয়নে নতুন খুটি হয়ে পড়েছে সাইবার স্পেস। সামরিক নিরাপত্তায় যা আরো সামনে এসেছে। এ লক্ষ্যে চীন সাইবার বাহিনী গঠন ত্বরান্বিত করছে। স্থলবাহিনী আধুনিকীকরণ, তথ্যায়নকরণ, রাজনীতিকরণ ইত্যাদি করার কথা বলা হয়। সামরিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতার নামে প্রতিপক্ষকে মোকাবেলায় বিভিন্ন রূপের সংস্থা গঠন করছে। এ প্রেক্ষিতে এসসিও-র‌্যাটস, রাশিয়ার সাথে রণনীতিগত সামরিক মৈত্রীর প্রেক্ষিতে সিস্-সিসটো, র‌্যাটস-সিসটো, সিকা, এডিএমএম+, এশিয়া আঞ্চলিক ফোরাম (ARF), সাংরি-লা ডায়ালগ (SLD), জাকার্তা ইন্টারন্যশনাল ডিফেন্স ডায়লগ (JIDD) ইত্যাদিতে অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য। জনযুদ্ধের ধারণাকে আরো সমৃদ্ধ করার প্রেক্ষিতে যুদ্ধে মানবিক সম্পদ সমাবেশিত করার থেকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উপর জোর প্রদান করা হয়। এভাবে চীনের বুর্জোয়াদের স্বার্থরক্ষাকারী কমিউনিস্ট নামধারী পার্টি জনগণই যুদ্ধের নির্ধারক উপাদান সে বক্তব্য পরিত্যাগ করে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির তথা অস্ত্রশস্ত্রের উপর নির্ভর করার প্রতিক্রিয়াশীল সামরিক ধারণাকে আরো নগ্নভাবে সামনে আনে।

সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসী যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন দেশের প্রতিরক্ষা তথা যুদ্ধ রণনীতির সামগ্রিক পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, একক পরাশক্তি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ অধগতি সত্ত্বেও বিশ্বব্যাপী তার আধিপত্য, নেতৃত্ব, কর্তৃত্ব, প্রাধান্য বজায় রাখতে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামরিক তথা সামগ্রিক আগ্রাসী পরিকল্পনা কার্যকর করে চলেছে। পুঁজিবাদের অসম বিকাশের নিয়মানুযায়ী পুঁজি ও শক্তির অনুপাত পরিবর্তিত হয়ে চলায় বাজার ও প্রভাব বলয় পুনর্বণ্টনকে কেন্দ্র করে আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী শক্তি সম্পর্কে বিন্যাস-পুনর্বিন্যাস, মেরুকরণ-পুনর্মেরুকরণের প্রক্রিয়ায় মার্কিনের প্রতিপক্ষ হিসেবে বর্তমানে সাম্রাজ্যবাদী রাশিয়া ও পুঁজিবাদী চীন সামনে এসেছে। বৈশ্বিক মন্দা থেকে পরিত্রাণ লাভে সাম্রাজ্যবাদীরা আগ্রাসী যুদ্ধকে বিস্তৃত করে চলেছে। একক পরাশক্তি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নেতৃত্বে পাশ্চাত্য আগ্রাসী যুদ্ধ, আগ্রাসন ও দখল বিস্তৃত করা, প্রতিপক্ষকে মোকাবেলা করা, সর্বোপরি বিপ্লব ঠেকানোর প্রধান সামরিক হাতিয়ার হিসেবে ন্যাটোকে ব্যবহার ও অগ্রসর করে চলেছে। এ প্রেক্ষিতে তারা ২০০১, ২০০৩ ও ২০১১ সালে যথাক্রমে আফগানিস্তান, ইরাক ও লিবিয়ায় আগ্রাসন ও দখল করার প্রক্রিয়ায় সম্প্রতি তাদেরই সৃষ্ট ইসলামী রাষ্ট্র ও জঙ্গি দমনের নামে নতুন কৌশলে ও রূপে আগ্রাসী কার্যক্রম পরিচালনা করছে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ রাশিয়া ও চীনকে মোকাবেলায় ইউরোপে মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলে, ন্যাটোর পূর্বমুখী সম্প্রসারণ করে রাশিয়ার সীমান্তে অগ্রসর হওয়া, রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেন সঙ্কট ও যুদ্ধকে সম্প্রসারিত করার সাথে সাথে এশিয়া-প্যাসিফিক রণনীতি কার্যকরী করার প্রক্রিয়ায় এতদঞ্চলে তার সমরসজ্জা ও সমরশক্তি সমাবেশিত করে চলেছে। ইন্দো-প্যাসিফিক করিডোর গড়ে তোলা তাছাড়া টিটিআইপি (TTIP) ও টিপিপি (TPP) গড়ে তোলার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তারা বাজার সম্প্রসারণের লক্ষ্যে পদক্ষেপ নিয়ে চলেছে। এর পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে রাশিয়া ও চীন সিস-সিসটো (CIS-CSTO), এসসিও-র‌্যাটস্ (SCO-RATS), ইউরেশীয় ইউনিয়ন ইত্যাদি গড়ে তুলে এবং ব্রিকসের নতুন উন্নয়ন ব্যাংকসহ ব্রিকস্ (BRICS), সিকা (CICA) ইত্যাদি গড়ে তুলে ও কাজে লাগিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। রাশিয়া নিকটবর্তী রণনীতি (Near abroad)সহ মহাসাগরে ও অন্তরীক্ষে সামরিক তৎপরতা সম্প্রসারিত করে এবং ক্রিমিয়াকে রুশভূক্ত করাসহ তার “হারানো স্বর্গ” ফিরে পেতে চাইছে। রাশিয়া বিদেশে তার সামরিক বাহিনীর তৎপরতা চালানোর প্রেক্ষিতে সিরিয়ায় আইএস বিরোধী বিমান ও মিসাইল আক্রমণ বিস্তৃত করে। পুঁজিবাদী চীন বৃহৎ সাম্রাজ্যবাদী শক্তিতে পরিণত হওয়ার লক্ষ্যে ‘সাংহাই চেতনা’, ‘নতুন সিল্ক রুট’ ও ‘মেরিটাইম সিল্ক রোড’ তথা ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রুট’, ‘এশীয় অবকাঠামো উন্নয়ন ব্যাংক’ (এআইআইবি), ‘সাংহাই তহবিল’ আধুনিক নৌ-বিমান-স্থল-সাইবার ও মহাকাশ বাহিনী গড়ে তোলার নামে অগ্রসর হচ্ছে। এইভাবে আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও যুদ্ধ বিস্তৃত হয়ে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিপদ বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে।

লেখকঃ রাহাত হাসান

সূত্রঃ

13315308_727208037421111_2297551597827689140_n