নেপালের গণযুদ্ধে নারী

04

 

নেপালের গণযুদ্ধে নারী

নেপালের কমিউনিস্ট পার্টি (মাওবাদী)’র নেতৃত্বে পরিচালিত নেপালের গণযুদ্ধ ১৯৯৬-২০০৬ সাল পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী আলোচিত ও পরিচিত। সেই গণযুদ্ধে নারীদের বিশাল ভূমিকা ছিল। মাওবাদী পার্টির নেতৃত্বাধীন গণমুক্তি বাহিনীতে (PLA) প্রায় ৪০% নারী গেরিলা ছিল। শুধু তাই নয়, উচ্চতর রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বেও ছিলেন নারী কমরেডগণ।
তৎকালীন নারী নেত্রী পার্বতী নেপালের নারীদের সমস্যা ও তাদের গণযুদ্ধে অংশগ্রহণের উপর অনেক লেখা লিখেছিলেন।  বিভিন্ন বাংলা পত্র-পত্রিকায় সেসব লেখার বেশ কিছু বাংলা অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে।  নেপালের গণযুদ্ধে নারীদের ভূমিকা সম্পর্কে যাতে সহজে বোঝা যায় সেই লক্ষ্যে লেখাগুলো থেকে সংকলিত অংশ একত্রে “নেপালের গণযুদ্ধে নারী” এই পুস্তিকাটি প্রকাশ করা হয়েছিল।  তবে এ ক্ষেত্রে কোথাও কোথাও কিছু ভাষাগত সংশোধন ও সম্পাদনা করা হয়েছিল।  “বিপ্লবী নারী মুক্তি” পুস্তিকাটি প্রকাশ করেছিল এপ্রিল, ২০০৭-এ।

ইতিহাস সম্পর্কে যাঁর সামান্য ধারণা আছে তিনি অবশ্যই জানেন যে বিশাল আকারের সামাজিক পরিবর্তনকারী জাগরণ ব্যতিরেকে নারী জাগরণ অসম্ভব।
কার্ল মার্কস

সিপিএন (মাওবাদী) কর্তৃক ১৯৯৬ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি গণযুদ্ধের সূচনা হওয়ার পর থেকে বহু নারী শহীদ হয়েছেন, বহু মহিলা সশ্রম কারাদন্ড ভোগ করছেন, নিখোঁজের সংখ্যা অসংখ্য।  ধর্ষিতা, নির্যাতিতা, অত্যাচারিতাদের সংখ্যাও অগণিত।
নেপালের পশ্চিমের জেলাগুলি রোলপা, রুকুম থেকে যে বিপ্লবের সূচনা হয়েছিল তা আজ গোটা নেপালেই দাউ দাউ করে জ্বলছে।  আর এ ঘটনাকে সরকারি বা বিদেশি প্রচার মাধ্যমগুলির হাজারো প্রচেষ্টা সত্ত্বেও চেপে রাখতে পারছে না, বরং এটাই আজ তাদের সবচেয়ে বড় শিরঃপীড়ার কারণ।
নেপালের গণযুদ্ধে নারীদের অবস্থানকে বুঝতে হলে আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে নেপাল হচ্ছে একটি আধা-সামন্ততান্ত্রিক আধা-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র যার মূল অর্থনৈতিক ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে সামন্ততন্ত্রের ওপর। নেপালের জনসংখ্যার প্রায় ৮৮ শতাংশ গ্রামে বাস করে এবং প্রায় ৮১ শতাংশ জনগণ কৃষিকর্মের সাথে যুক্ত।  সমগ্র জাতীয় উৎপাদনের (জি.এন.পি.) ৪২ শতাংশ আসে এই কৃষিক্ষেত্র থেকে।  সামন্ততান্ত্রিক ভূমি-সম্পর্কের প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো শতকরা ১০ ভাগ জমির মালিক হলো শতকরা ৬৫ ভাগ গরীব চাষীরা, আর শতকরা ১০ জন ধনী চাষীরা হলো শতকরা ৬৫ ভাগ জমির মালিক।  আর এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে লিঙ্গ বৈষম্য, পৈত্রিক সম্পত্তিতে নেপালের নারী সমাজের কোনও উত্তরাধিকার জন্মায় না।

নারীদের উপর শোষণের উৎসসমূহ

নারীদের উপর অর্থনৈতিক শোষণ
নারীদের উপর অর্থনৈতিক শোষণের শিকড় নিহিত রয়েছে সামন্ততান্ত্রিক তথা আধা-সামন্ততান্ত্রিক ক্ষুদ্র কৃষি উৎপাদন সম্পর্কের গভীরে।  পুরুষতান্ত্রিক নেপালী সমাজে নারীদের সম্পত্তির ওপর সরাসরি কোনও অধিকার নেই, গৃহস্থালির কাজ ও ক্ষেতের কাজের দ্বিগুণ বোঝা বহন করেও আইনত মহিলারা পুরুষদের সাথে সমানাধিকারের ভিত্তিতে সম্পত্তির মালিকানা থেকে বঞ্চিত।  অনুরূপভাবে জমির ওপর প্রজাসত্ত্বজনিত অধিকার থেকেও উত্তরাধিকার সূত্রে বঞ্চিত। ফলস্বরূপ তারা কোন বাণিজ্যিক লেনদেন বা ব্যাংকিং প্রক্রিয়ায় যুক্ত হতে পারে না এবং নিজেদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটাতেও অক্ষম, ফলত পুরুষদের থেকে মৌলিকভাবেই মেয়েরা পিছিয়ে পড়া অবস্থানে থাকতে বাধ্য হয়।  এর ওপরে মধ্যযুগীয় সামন্ত অবস্থিতির দরুন, যেমন তরাই অঞ্চলে দাসপ্রথা, ঋণের দায়ে তরাই ও পার্বত্য অঞ্চলে বেগার প্রথা ইত্যাদির দৌলতে নেপালি নারীরা নিরন্তর শোষণের যাঁতাকলে আটকে পড়ে।  সামন্তপ্রভুর ঘরের কাজ ও ক্ষেতের কাজ করার পরেও প্রভুদের ‘স্বেচ্ছায়’ দেহদান ও পদসেবা করতে বাধ্য হয়।  নারীদের ওপর অর্থনৈতিক শোষণ তীব্র হওয়ার অন্যতম একটি বিশেষ কারণ হলো নেপালে উৎপাদনের উপকরণের অপরিসীম পশ্চাৎপদতা।  আধুনিক উপকরণের বালাই নেই বললেই চলে।  কৃষিকাজে শ্রমের মূল উপাদান হলো কায়িক শ্রম ও পশুশ্রম; আর যন্ত্রপাতি হলো সেই মান্ধাতার আমলের কাস্তে, খোন্তা, শাবল ইত্যাদি।  গৃহস্থালির কাজে জ্বালানি, পানির অভাব তথা খামারের কাজে যন্ত্রপাতি অপ্রতুলতার কারণে কায়িক শ্রম ও বহু সময় ব্যয় মেয়েদের জীবনকে দুর্বিসহ করে তুলেছে।  আমরা সকলেই খুব ভালভাবেই জানি অসম বিকাশজনিত সমাজে যত শ্রমনির্ভর কাজ হবে তার বেশির ভাগ বোঝার ভারটাই বহন করতে হবে মেয়েদের।  যেহেতু কৃষিকাজ মূলত বৃষ্টির উপর নির্ভরশীল, তাই বৃষ্টি না হলে কাজের অভাবে প্রচ্ছন্ন বেকারের সংখ্যা আরও বেড়ে যায়। তখন পাইকারি হারে কাজের আশায় গ্রামীণ জনতা শহরের দিকে অথবা ভারতে ছোটে। আর এইভাবে তারা মহিলা ও শিশুদের উপর জমি ও গৃহস্থালির যাবতীয় কাজ চাপিয়ে দিয়ে যায়।  স্বভাবত সহজেই সিদ্ধান্ত করা যায় যে বিদ্যমান গ্রামীণ কৃষি অর্থনীতির মেরুদন্ড হলো নারী সমাজ।
যেহেতু মেয়েদের গৃহস্থালির কাজেই আটকে রাখা হয়, সেজন্য তাদের মজুরিও কম দেওয়া হয়।  সম পরিমাণ গার্হস্থ্য বা জমির কজের জন্য নারীরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পুরুষদের অর্ধেক মজুরি পায়।  শহরের মেয়েদের অবস্থাও কিছু ভাল নয়। গ্রামের নারীরা যদি পশ্চাৎপদ মধ্যযুগীয় সামন্ততান্ত্রিক শোষণের শিকার হয় তাহলে শহরের কর্মরতা মেয়েরাও শোষিত হচ্ছেন।  আধুনিক সাম্রাজ্যবাদী শোষণের ফলস্বরূপ তাঁরা অল্প মাইনে পান ও প্রায়ই যৌন নিপীড়নের শিকার হন।  যেমন পোষাক, নির্মাণ ও কার্পেট শিল্পের নারীরা আমলাতান্ত্রিক পুঁজিপতিদের মোক্ষম শিকার (এদের মদতদাতা হলো সাম্রাজ্যবাদী ও সম্প্রসারণবাদীরা)।

নারীদের উপর সামাজিক শোষণ
নারীদের উপর শোষণের কাঠামোটা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়, শিকড় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামোর মধ্যেও নিহিত রয়েছে। নারীদের উপর সামাজিক শোষণের মূল ভিত্তি হলো ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুধর্মের জাতপাতভিত্তিক সমাজব্যবস্থা, যা কিনা পুরুষতন্ত্র কায়েম করে, বিপরীতে মেয়েদের অবজ্ঞা ও অসম্মান করে। শৈশবে পিতার অধীন, যৌবনে স্বামীর অধীন এবং বার্ধক্যে পুত্রের অধীন- এটাই যেন মেয়েদের বিধিলিপি।  পৈত্রিক উত্তরাধিকার আইনের সুবাদে নেপালের সমাজে পুত্রের চাহিদা পৃথিবীর যে কোনও দেশ থেকে প্রবল। মাতৃজঠর থেকে শ্মশানযাত্রা পর্যন্ত হীনাবস্থা সমাজ-নির্ধারিত। নেপালে পুরুষের গড় আয়ু ৫৫ বছর, সে ক্ষেত্রে নারীদের গড় আয়ু ৫২ বছর। এ থেকেও সমাজে মেয়েদের অবস্থাটা পরিষ্কার। প্রসূতি মৃত্যের হারে নেপাল পৃথিবীর অন্যতম অগ্রণী দেশ, প্রতি লক্ষে ৮৭৫ জন। শিশু মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি, প্রতি দশটি শিশুর মধ্যে একটি মারা যায় বছর না ঘুরতেই। এর সাথে যোগ করুন বাল্যবিবাহ, অকাল মাতৃত্ব, ঘন ঘন সন্তান ধারণ যা মেয়েদের শরীর ও মনের স্বাস্থ্যকে ভেঙে চুরমার করে দেয়। সম্পত্তি-সম্পর্কের জন্য মেয়েদের দেখা হয় ‘পুত্রার্থে ক্রিয়তে ভার্যা’ বা ছেলে জন্মাবার মেশিন হিসেবে। মেয়েরাও বারংবার জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গর্ভধারণ করে যতক্ষণ না ছেলের জন্ম হচ্ছে, তা না হলে তার ভূ-সম্পত্তিতে অধিকার বর্তাবে না অথবা সতীনের সাথে ঘর করতে হবে। কেননা পুত্রবিহীন স্বামী দ্বিতীয়বার দার পরিগ্রহ করতে পারে, পুত্রবিহীন নারী সমাজে অপাংক্তেয় ও অবজ্ঞার বস্তু। জাতপাতভিত্তিক সমাজে হিন্দু সংস্কৃতির মাত্রা এতটাই তীব্র যে, যেসব নারীরা হিন্দু নন এবং সামন্ততান্ত্রিক সংস্কৃতির বেড়াজালে ততটা আবদ্ধ নন, তাঁরাও ‘মূল’ প্রবাহের চাপে পিষ্ট হতে বাধ্য হন।

নারীদের উপর রাজনৈতিক নিপীড়ন
পিতৃতান্ত্রিক অর্থনীতি ও সামাজিক সম্পর্কের ভিত্তিতে নেপালের নারী সামজের উপর রাজতন্ত্রী-সংসদীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত রাজনৈতিক শোষণের চিত্রটাও ভয়াবহ। একমাত্র পুরুষেরাই বংশানুক্রমে মসনদে আসীন হতে পারে, কেননা তারাই ঈশ্বরের সাক্ষাৎ প্রতিনিধি।  নারীরা কোনও অবস্থাতেই মসনদের দাবিদার হতে পারবে না।  সুতরাং রাজপাটের ক্ষেত্রে যেমন, তেমনই পরিবারের ক্ষেত্রেও পুরুষরাই শাসক, নারীরা শাসিত। তাই মহারাজাধিরাজ হলেন এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ দেহের একদিকে কায়া অপরদিকে আত্মা।  পৃথিবীর অন্যান্য বুর্জোয়া প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যেখানে নিদেনপক্ষে নারীদের পৈত্রিক সম্পত্তিতে আইনী অধিকার আছে সেখানে নেপালি নারী সমাজের সেই আইনি সুযোগটুকু বিন্দুমাত্রও নেই।  এর ফলে নারীদের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ নীতিগত দিক থেকে এক বিরাট বাধার সৃষ্টি করে। বর্তমান সংসদীয় ব্যবস্থায় নারীরা হলেন ভোট ব্যাংক তথা ভোট জোগাড়ের হাতিয়ার।  তাদের সাথে পুরুষদের সম্পর্কের ভিত্তিতে এই সংসদীয় ব্যবস্থায় যার টাকা বা মূলধন আছে তারই জয়লাভের সম্ভাবনা, আর এটাই মেয়েদের কাছে মস্ত বাধা।  নেপালে কিছু সংখ্যক নারী যাঁরা রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করছেন তাঁরা মূলত পরিচিত রাজনীতিবিদদের বিধবা স্ত্রী অথবা কন্যা।

নারী ও নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব
নেপালের নারীদের নয়া-গণতান্ত্রিক বিপ্লবে অংশগ্রহণের মূল কারণ হলো এই সংগ্রাম তাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মুক্তির পথপ্রদর্শক। আগেই আমরা উল্লেখ করেছি যে নেপালে মেয়েদের আর্থিক শোষণের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো সমাজে পুরুষদের সাথে সমানভাবে জমির ভোগদখল বা মালিকানা লাভ মেয়েরা করতে পারে না। আর নয়া-গণতান্ত্রিক বিপ্লবের মূল কেন্দ্রীয় অর্থনৈতিক বৈশিষ্ট্যই হলো কৃষি-বিপ্লব। এই ব্যবস্থায় এর সফল রূপ প্রদানের শ্লোগান হলো ‘কৃষকের হাতে জমি’। এর সাথে সাথে পুরুষ ও নারীদের অধিকার কায়েম হলে গ্রামীণ কৃষি-অর্থনীতিতে নারীদের এক তাৎপর্যপূর্ণ বিকাশ ঘটবে। এই সম্পত্তি-সম্পর্কের ভিত্তিতে শহুরে নারী-সমাজও সমভাবে উপকৃত হবেন। মেয়েরা শহরেও জমির মালিকানা পাবেন, অন্যান্য উৎপাদনের উপকরণের মালিকানাও তাঁদের করায়ত্ত হবে, যথা শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য বা কারখানা। ফলে শহরের অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণের অধিকারও তাঁরা পাবেন। আর এটাই হবে তাঁদের অর্থনৈতিক মুক্তির প্রথম ধাপ যার দ্বারা অন্যান্য সামাজিক-রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতা দূর করার জন্য লড়াই করতে তাঁরা সক্ষম হবেন।
মর্মবস্তুতে নয়া-গণতান্ত্রিক বিপ্লব হলো সামন্ততন্ত্র-বিরোধী। সুতরাং প্রথমেই এটা রাষ্ট্রের দ্বারা আরোপিত বাধ্যতামূলক ধর্মীয় বিধিনিষেধগুলিকে হটিয়ে দিয়ে একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের বাতাবরণ তৈরি করবে। ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দু সংস্কৃতির অবসানের ফলে নারীরা সংস্কৃতিগতভাবে পুরুষ প্রাধান্যের হাত থেকে অব্যাহতি পাবেন। এর ফলে কন্যা সন্তানদের আর অবজ্ঞার পাত্রী হতে হবে না বরং পরিবারেও তাঁরা পুত্র-সন্তানদের মতোই সমান সুযোগ-সুবিধা পাবেন। এই নয়া-গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সামন্ততান্ত্রিক রাজতন্ত্রের কোন স্থানই থাকতে পারে না। এই রাজতন্ত্রই হলো পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার মাধ্যমে নারীদের শাসন করার প্রতীক।
রাজনৈতিকভাবে নয়া-গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এমন একটি সমাজের ক্ষেত্র প্রস্তুত করবে যেখানে পুরুষতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে সমাজের অন্যান্য নিপীড়িত অংশগুলির সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে নারীরাও সামন্ততন্ত্র-উপনিবেশবাদ বিরোধী যুক্তমোর্চা পরিচালিত সরকারে অংশগ্রহণ করবেন। নেপালে নয়া-গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা কায়েমের জন্য নারীরা জীবন-মরণ লড়াই করবেন এটাই স্বাভাবিক।
নয়া-গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী চরিত্রের জন্য সাম্রাজ্যবাদীদের সাথে সমস্ত অসম সম্পর্কগুলির মূলোৎপাটন হবে, সাম্রাজ্যবাদী তথা সম্প্রসারণবাদী দেশসমূহের স্বার্থবাহী পতিতালয়গুলির উচ্ছেদ সাধন করবে, ফলে এক বিশাল সংখ্যক নারী মুক্তি পাবেন অর্থনৈতিক ও যৌন নিপীড়নের হাত থেকে। আর এর ফলেই এমন একটি পটভূমি তৈরি হবে যেখানে নারীদের পতিতাবৃত্তি করতে বা ভোগ্যপণ্য হতে হবে না।

নারী সংগঠনগুলির মধ্যে বিপ্লবী ধারা
নয়া-গণতান্ত্রিক বিপ্লবের মর্মবস্তুকে আত্মস্থ করার দরুন বিভিন্ন নারী সংগঠন বিশেষত ‘অল নেপালিজ উইমেন্স এসোসিয়েশন (বিপ্লবী)’ [A.N.W.A.(R)] একটি বিশেষ ধারা সৃষ্টি করেছে।
এটা পরিষ্কারভাবে বুঝতে হলে প্রথমেই আমাদের জেনে রাখা দরকার যে নেপালের নারী আন্দোলন মূলত তিনটি ধারায় বিভক্ত। দক্ষিণপন্থী ও প্রতিক্রিয়াশীল ধারা খোলাখুলি সামন্ততান্ত্রিক ও আমলা পুঁজির স্বার্থের ধারক ও বাহক। তারা নারী মুক্তির কথা মুখে বলে কিন্তু নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্রকে তারা সমর্থন করে। রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট হিন্দুধর্মের তারা একনিষ্ঠ পূজারী তথা সাম্রাজ্যবাদীদের মদদপুষ্ট এন.জি.ও./আই.এন.জি.ও.-র দ্বারা পরিচালিত কর্মকান্ডে তারা সরাসরি যুক্ত। এটা নারীদের পণ্য হিসেবে গণ্য করার বিরোধিতা করে কিন্তু ‘সুন্দরী প্রতিযোগিতা’র বিরুদ্ধে একটি শব্দও উচ্চারণ করে না। তারা বিপ্লবী হিংসার বিরুদ্ধে নিন্দা করতে এক পায়ে খাড়া, কিন্তু রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে টু শব্দটিও উচ্চারণ করে না। এরা শাসক শ্রেণির দলগুলির যেমন নেপালি কংগ্রেস, ‘সংযুক্ত মার্কসবাদী-লেনিনবাদী (ইউ-এম-এল)’ এবং ‘মার্কসবাদী-লেনিনবাদী পার্টি’র অতীব ঘনিষ্ঠ। দ্বিতীয় সংশোধনবাদী ধারার প্রবক্তারা বুলিতে বিপ্লবী কিন্তু অনুশীলন করে সংস্কারবাদ। তারা নিজেদেরকে প্রজাতন্ত্রী বলে জাহির করে কিন্তু রাজতন্ত্রী সংসদীয় ব্যবস্থার একান্ত অনুগামী। এরা তত্ত্বগতভাবে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলির কাজকর্মের বিরোধিতা করে কিন্তু এদের অনেকেই এন.জি.ও. বা আই.এন.জি.ও.-র সাথে সরাসরি যুক্ত। এরা ‘মার্শাল’, ‘ইউনিটি সেন্টার’ ইত্যাদির কাছাকাছি। তৃতীয় ধারাটি হলো বিপ্লবী ধারা। এদের প্রতিনিধিত্ব করে এ.এন.ডব্লিও.এ. (আর)- এরা সি.পি.এন. (মাওবাদী)-র ঘনিষ্ঠ। ব্যক্তিগত সম্পত্তির মালিকানার দৌলতেই যে পুরুষ-প্রাধান্য বিরাজমান এ ব্যাপারে তাঁরা একটি পরিষ্কার দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছেন। রাষ্ট্রের শ্রেণিচরিত্র সম্পর্কে তাঁদের ধারণা খুবই স্বচ্ছ। শ্রেণি শোষণ ও লিঙ্গ শোষণে রাষ্ট্রের যে একাধিপত্য জারি আছে সে ব্যাপারে তাঁরা খুবই সচেতন। তাঁরা শুধু মুখে নয়, কাজেও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলির (এন.জি.ও./আই.এন.জি.ও.) বিরুদ্ধে সক্রিয় প্রতিরোধ গড়ে তুলছেন। কেননা এই সংগঠনগুলি সাম্রাজ্যবাদী তথা সম্প্রসারণবাদীদের সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে জমি তৈরি করে যার আসল উদ্দেশ্য একাধারে প্রভুদের বাজারের বিস্তারসাধন, অপরদিকে জনগণের প্রকৃত বিপ্লবী আন্দোলনের গতিরোধ করা। ঐক্য ও সংগ্রামের নীতি অনুসরণ করে এঁরা (এ.এন.ডব্লিও.এ.- অনু) অপরাপর শক্তিগুলির সাথে বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তুলছেন, বিশেষত সামন্তবাদ বিরোধী ও উপনিবেশবাদ বিরোধী শক্তিগুলির সাথে ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচি গ্রহণ করে, যেমন সৌন্দর্য প্রতিযোগিতার বিরোধিতা এবং অশ্লীল পত্রপত্রিকা ও মদ বিক্রি’র বিরুদ্ধে সংগ্রাম মারফৎ। গণযুদ্ধের সমর্থক-দরদীদের উপর অনুষ্ঠিত নিষ্ঠুর দমন-পীড়ন, বিশেষত মহিলাদের ধর্ষণ ও নির্যাতনের পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে যে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস চলছে তার বিরুদ্ধে বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তুলতে সক্ষম হচ্ছেন। যখন অন্যরা বিপ্লবী হিংসার নিন্দায় মুখর তখন এই সংগঠনটি সশস্ত্র শক্তির বলে বিপ্লবী হিংসার দ্বারাই যে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার উপায় অবলম্বন করতে হবে সে ব্যাপারে সোচ্চার।

নেপালের গণযুদ্ধে নারীদের অংশগ্রহণ

নারীরা আকাশের অর্ধেক ধরে রেখেছে”- মাও সেতুঙ

অতীতে কেন্দ্রীভূত সামন্ততান্ত্রিক রাষ্ট্রের অধীনে যখন রাষ্ট্রের সামন্ততান্ত্রিক কার্যক্রম ছিল অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষার্ধ ও উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে, বিশেষ করে ১৮১৫ সালে দেরাদুনের নলপানির যুদ্ধে (বর্তমানে উত্তর ভারতে অবস্থিত) নেপালি নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণের নজির বিদ্যমান। এই যুদ্ধে নেপালি নারী শিশুরা পুরুষদের পাশাপাশি বৃটিশ সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধ সংগ্রামে অংশ নিয়েছিলেন। শুধু সংখ্যাতেই নয়, উন্নততর অস্ত্রের দিক থেকেও ব্রিটিশ বাহিনী নেপালি বাহিনীকে ছাপিয়ে গিয়েছিল, তৎসত্ত্বেও তিনবারের চেষ্টায় তারা শুধু সফল হয়েছিল কলঙ্গা দুর্গ দখল করতে। ব্রিটিশ বাহিনীর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল প্রচুর।
অনুরূপভাবে ১৯৪৭-৫০ পর্বে নেপালি রাণাশাহীর বিরুদ্ধে সংগ্রামে, রাণাশাহী-বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি প্রভূত পরিমাণে নারীদের সামিল করেছিলেন। অবশেষে ১৯৫০ সালে রাণাশাহীর পতন হয়। ১৯৯০ সালে গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রামেও নারীরা ব্যাপকভাবে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। ফলস্বরূপ ৩০ বছরব্যাপী স্বৈরতান্ত্রিক রাজতন্ত্রের ‘পঞ্চায়েত’-এর পতন ঘটে। এবং রাজতন্ত্রী সংসদীয় ব্যবস্থার প্রচলন হয়। যদিও এই সমস্ত সংগ্রামে পরিচিত রাজনৈতিক পরিবারের মেয়েরাই অথবা শহুরে শিক্ষিতা-মহিলারাই শহরভিত্তিক সংগ্রামের ভাগীদার ছিলেন।
শুধুমাত্র সি.পি.এন. (মাওবাদী) সূচিত গণযুদ্ধ শুরু হবার পর থেকেই তৃণমূল স্তরের নারীরা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা শুরু করেন। মূলত গ্রামীণ নারীরাই সমাবেশিত হতে থাকেন। আজকের গণযুদ্ধে তাঁরা পেশাদার গণযোদ্ধা হিসেবে পরিগণিত। আদিম অস্ত্র যেমন পাথর, কাস্তে, লাঠি যা আগের সংগ্রামগুলিতে নারীরা শত্রুর প্রতি নিক্ষেপ করতেন তার থেকে অনেক এগিয়ে আজ তাঁরা বন্দুক, রাইফেল, গান
পাউডার ব্যবহার করে সংগ্রামে অবতীর্ণ হচ্ছেন। আগে তাঁদের গণ্য করা হতো সহায়ক শক্তি হিসেবে অথবা রাজনৈতিক আন্দোলনের মজুত বাহিনী হিসেবে। দিন বদলেছে, আজ তাঁরা নেতা, গেরিলা স্কোয়াডের কমান্ডার হিসেবে সম্মিলিত বাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এই বিকাশকে অনুধাবন করতে গেলে আমাদের জানা প্রয়োজন যে নেপাল সরকারের ১৯৬০ সালের সেনা আইনের ১০নং ধারা মোতাবেক রাজকীয় সৈন্যবাহিনীতে নারীদের নিয়োগ নিষিদ্ধ। নারীদের উপর দ্বৈত শোষণের অবস্থা নিরূপণের পর সি.পি.এন. (মাওবাদী) সিদ্ধান্ত নিল, নারীদের বর্তমান করুণ অবস্থার জন্য দায়ী যে ব্যবস্থার দ্বারা তাঁরা নির্যাতিতা হচ্ছেন, তার বিরুদ্ধে তাঁদেরকে সর্বশক্তি দিয়ে সংগঠিত করেই আঘাত হানতে হবে। প্রতিটি গেরিলা স্কোয়াডে অন্তত দু’জন করে নারীকে নিয়োগ করতে হবে (একটি গেরিলা স্কোয়াডের সদস্য সংখ্যা ৯ থেকে ১১ জন)। নারী গেরিলারা রাতের বেলায় গেরিলা যোদ্ধা, দিনের বেলায় উৎপাদন ও প্রচার কার্যে নিয়োজিত। পরিস্থিতির দাবি অনুযায়ী কোথাও কোথাও সম্পূর্ণ নারী গেরিলা বাহিনীও নির্মাণ করতে হচ্ছে। অবশ্য এগুলি ব্যতিক্রমী উদাহরণ, সাধারণত এটা নিয়ম নয়। এক্ষেত্রে রোলপা’র একটি ঘটনার উল্লেখ না করলে খুবই ভুল হবে। একটি সম্পূর্ণ নারী গেরিলা বাহিনীর উদ্যোগে একজন স্বৈরাচারী নারীমাংসলোভী সামন্তপ্রভুর মৃত্যুদন্ড নারী গেরিলারা কার্যকর করেন। প্রতিটি গ্রাম ও জেলা স্তরে নারীদের সংগঠিত করা হয় তাঁদের নিজস্ব গণসংগঠনে। যেখানে বিপ্লবীদের শক্ত ঘাঁটি সেখানে গণআদালত স্থাপন করা হয়। অন্যান্য বিষয় ছাড়াও নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধেও আদালত পরিচালিত হয় এবং দোষীদের শাস্তি বিধান করে গ্রামরক্ষী বাহিনী, নারী গণসংগঠন এবং জনগণের যৌথ উদ্যোগে এই গণআদালতগুলি পরিচালিত হয়। বিধবাদের জমি তথা একক নারীদের জমি যারা হরণ করে নিয়েছে তাদের জমি এই আদালতের মাধ্যমে পুনরায় তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। অত্যাচারী, মদ্যপ তথা স্ত্রী নির্যাতনকারী স্বামীদের তথা বহু নারীর সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপনকারী ব্যক্তিদের এই গণআদালতগুলির দৌলতে স্বাভাবিক শৃঙ্খলাপূর্ণ জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। পার্বতী জেলার একটি ঘটনা খুবই কৌতূহলোদ্দীপক। একজন স্কুল শিক্ষক মেয়েদের উপযুক্ত বরের সন্ধান দেবার অছিলায় মেয়েদের উপর যৌন নিপীড়ন করতো। তাকে গণআদালতে হাজির করে কয়েক মিনিট যাবত কান ধরে ওঠ-বস করানো হয় এবং সর্বসমক্ষে অপরাধ স্বীকার করে ক্ষমা চাইতে বলা হয়। ভবিষ্যতে আবার এই ধরনের ঘটনা ঘটলে আরও কঠোর সাজা দেওয়া হবে- এই লিখিত প্রতিশ্রুতি দিয়ে তবেই সে রেহাই পায়।
যেখানে নারীরা সরাসরি গেরিলা যুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত নন, সেখানে তাঁরা গেরিলা যুদ্ধের সহায়ক শক্তি হিসেবে ভূমিকা পালন করেন। তাঁরা সংগঠক, প্রচারক, সাংস্কৃতিক কর্মী, সৈন্য সংগ্রাহক, অসুস্থ বা আহত যোদ্ধাদের পরিচর্যা, গোপন সংবাদ সংগ্রহ, পার্টি কর্মী ও যোদ্ধাদের আড়াল করা, জেলে অবস্থিত কমরেডদের সাথে সংযোগ রাখা ও তাঁদের উদ্দীপ্ত রাখা, শহীদদের পরিবারগুলির রক্ষণাবেক্ষণ এ সমস্ত ভূমিকা পালন করেন এবং স্থানীয়ভাবে গান-পাউডার তৈরি করার প্রশিক্ষণও তাঁদেরকে দেওয়া হয়।
সংস্কৃতিগত পরম্পরায় নারীরা গৃহকর্মের সাথে যুক্ত, তাই নারী কর্মীরা নতুন এলাকায় দ্রুত গৃহকর্মের মাধ্যমেই সকলের মন জয় করে নিতে পারেন এবং এইভাবে দ্রুত গণসংযোগ গড়ে তুলতে পারেন। এর ফলে পুরুষ কর্মীদের গৃহস্থের ঘরে দ্রুত আশ্রয় নিতে সুবিধা হয়। এটাও দেখা গেছে যে, যেসব অঞ্চলে স্থানীয় নারীদের সন্নিবেশিত করা গেছে সেসমস্ত অঞ্চলের লড়াইগুলিকে দীর্ঘদিনব্যাপী টিকিয়ে রাখা তথা শক্ত ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব। ঘরে-বাইরে নারীদের বহুমুখী ভূমিকার জন্য তারা বহুবিধ সমস্যার সমাধান করতে পারেন, গোপন সংবাদ সংগ্রহ থেকে শুরু করে গেরিলা যোদ্ধা ও পার্টি কেডারদের আড়াল করা সবই এই কাজের মধ্যে পড়ে।
গণযুদ্ধের প্রতি নারীদের অবিচল আস্থা একটি নজর কাড়ার মতো ব্যাপার। যদিও তারা গণযুদ্ধে অংশ নিতে তড়িঘড়ি করেন না বরং একটু বেশিসময় নেন, কিন্তু একবার সিদ্ধান্ত নিলে তাঁরা পুরুষদের চেয়ে অনেক দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেন। আত্মসমর্পণ বা রণক্ষেত্র থেকে পলায়নের ঘটনা নারীদের ক্ষেত্রে খুব কমই দেখা যায়। পার্টির গোপন তথ্য ফাঁস করার ঘটনাও নারীদের দ্বারা খুব কমই ঘটেছে। পুরুষদের তুলনায় তাঁদের অধ্যবসায় ও নিষ্ঠা অনেক বেশি (যদিও পুরুষদের তুলনায় মেয়েদের তাত্ত্বিক জ্ঞান অনেক কম)। বস্তুত এই সংগ্রাম থেকে পুরুষদের তুলনায় মেয়েদের পাওয়ার জগতটা অনেক বেশি, তাই বোধ হয় তাঁরা এত একনিষ্ঠ। নারীরা জনগণতান্ত্রিক সমাজে শুধু শ্রেণি শোষণের হাত থেকে রেহাই পাবেন তা নয়, বরং লিঙ্গ বৈষম্যের হাত থেকেও নিষ্কৃতি পাবেন। তাই দ্বিবিধ শৃংখলের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য প্রয়োজন আরও বেশি শক্তি এবং বেশি মানসিক দৃঢ়তা।

নেপালে গণযুদ্ধে নারীদের ভূমিকা কত বৈচিত্র্যসম্পন্ন তা পরিষ্কারভাবে বুঝতে সাহায্য করবে নিম্নবর্ণিত কয়েকজন নারীর বীরত্বগাথাঃ
দিলমায়া ইয়োনজানঃ ইনিই হলেন প্রথম নারীযোদ্ধা যিনি বেথান অস্ত্র দখল অভিযানে অংশগ্রহণ করে নিজের প্রাণদান করেন। একটি বোমায় যখন তিনি অগ্নিসংযোগ করছিলেন তখনই তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর শহীদত্ব চিরভাস্বর হয়ে থাকবে। তিনি ছিলেন নেপালের নির্যাতিত ও পিছিয়ে থাকা তামাং জনজাতির সদস্য।
লালি রোক্কাঃ রোলপা জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে তিনি সমাজ সেবিকা তথা স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কর্মরত অবস্থায় পুলিশ তাঁকে ধরে নিয়ে যায় এবং গুলি করে মারে। ‘অপরাধ’ তাঁর অঞ্চলে একটি এন.জি.ও. সংস্থার মুখোশ তিনি পুরোপুরিভাবে জনসমক্ষে উদঘাটন করেন।
বিন্দি চৌলগাইঃ জঙ্গলে অবস্থিত গেরিলাদের খাদ্য-সরবরাহের জন্য এই যুবতী গর্ভবতী নারীকে থানায় নিষ্ঠুর অত্যাচার চালিয়ে হত্যা করা হয়, অত্যাচারের ফলে পেটের বাচ্চা আগেই মৃত অবস্থায় মাতৃজঠর থেকে নির্গত হয়, এর কয়েকদিন পরে নির্যাতনের ফলস্বরূপ মা-ও মৃত্যুমুখে পতিত হন।
সুনসারা বুধাঃ পার্টি কর্মীর স্ত্রী। স্বামীর গোপন খবর জানার জন্য ২ বছরের শিশুর সামনেই মায়ের ওপর অকথ্য নির্যাতন করে। যখন কোন খবরই পাওয়া যাচ্ছে না তখন মায়ের সামনেই চলে ২ বছরের শিশুর ওপর নির্যাতন। এত নির্যাতনেও যখন কোন ফল পাওয়া গেল না তখন আহত ঐ শিশু সন্তানটির সামনেই নিষ্ঠুরভাবে মাকে হত্যা করলো পুলিশ পুঙ্গবরা।
কমলা ভট্টঃ একজন শিক্ষিকা এবং গোরখা জেলার এ.এন.ডব্লিউ.এ. (আর)-এর সভাপতি, গ্রামে নারীদের মধ্যে গণসাংগঠনিক কাজকর্ম সেরে ঘরে ফিরছিলেন। পথের মধ্যে সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর বিশেষ কমান্ডো ফোর্স গ্রেপ্তার করে ধর্ষণ করে এবং পরে হত্যা করে।
দেবী খাদকাঃ বর্বর ও নিষ্ঠুর রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের এক জাজ্বল্যমান নিদর্শন। পুলিশ হেফাজতে ধরে নিয়ে গিয়ে একের পর এক পুলিশ তার ওপর পাশবিক অত্যাচার করে, তাঁর যোনিদ্বার বেরিয়ে আসে। তাঁকে বারংবার ধর্ষণের কারণ হলো জেলে বন্দী ভাইয়ের ডেথ-সার্টিফিকেট কিছুতেই তাঁকে সই করানো যায়নি। আজও তিনি জীবিত এবং গণযুদ্ধে সক্রিয়।
চিনিয়া, লামা, নির্মলা দেবকোটা, মঞ্জু কুঁয়ার, এবং সভদ্রা সাপকোটা এবং এদের সঙ্গী আরও তিনজন পুরুষ সাংস্কৃতিক কর্মীকে প্রতিক্রিয়াশীল, সংশোধনবাদী ইউ.এম.এল.-এর স্থানীয় নেতাদের প্ররোচনায় পুলিশ গ্রেপ্তার করে হত্যা করে। তাঁদের ‘মস্ত অপরাধ’ প্রগতিশীল সংস্কৃতি প্রচারের মাধ্যমে তাঁরা গ্রামবাসীদের উদ্বুদ্ধ করছিলেন এবং সংগঠিত করছিলেন।
এগুলি হলো অজস্র ঘটনার কয়েকটি মাত্র। নারীদের গণধর্ষণ, হেলিকপ্টারে টহল দিতে দিতে বিপ্লবীদের শক্ত ঘাঁটিগুলিতে হঠাৎ নেমে এসে নারীদের তুলে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করে অন্যত্র ছুঁড়ে দেওয়ার খবর প্রায়ই আসছে। প্রাথমিক স্তরে দেখা যাচ্ছিল গ্রেপ্তারের পর অত্যাচার ও ধর্ষণ করে মেয়েদের ছেড়ে দিতো। কিন্তু এখন তাঁদের হত্যা করা হচ্ছে। এ থেকে বোঝা যায় প্রতিক্রিয়াশীল সশস্ত্র বাহিনীও আজ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে মেয়েদের অপরাজেয় বিপ্লবী মানসিকতার। সর্বস্তরে পাইকারীহারে নারী নির্যাতন এটাও প্রমাণ করে যে নারীরা ব্যাপকভাবে গণযুদ্ধে অশগ্রহণ করছেন বিভিন্ন রূপে ও মাত্রায়।

নারীদের রূপান্তরের ক্ষেত্রে গণযুদ্ধের ভূমিকা

গণযুদ্ধ হচ্ছে একটি সর্বাঙ্গীন যুদ্ধ”- মাও সেতুঙ

নেপালে গণযুদ্ধ শুরু হওয়ায় তার অপরিসীম প্রভাব নারী সমাজের উপর বিভিন্নভাবে প্রতিফলিত হয়ে চলেছে। প্রথমত, গণযুদ্ধ পার্টি কর্মীদের পারিবারিক জীবনে কতকগুলি মৌলিক পরিবর্তন ঘটিয়েছে। পার্টি কর্তৃক গণযুদ্ধ সূচিত হওয়ার আগে তত্ত্ব ও প্রয়োগে লিঙ্গ সংক্রান্ত বিষয়ে পরিবার তথা পরিবার-বহির্ভূত সামাজিক জীবনে অনেকগুলি দ্বন্দ্ব বিরাজমান ছিল। উদাহরণস্বরূপ পুত্র সন্তানের প্রতি অগ্রাধিকার, মেয়েদের বাল্যবিবাহ, পুরুষদের বহুবিবাহ এবং নারীদের জন্য এক বিবাহের পরামর্শ ও বাধ্যবাধকতা, সামন্ততান্ত্রিক সাংস্কৃতিক আচার যথা শুভলগ্নে ও শুভদিনে মেয়েদের উপবাস পালন, ঋতুমতী ও নিম্নবর্ণের মানুষকে অচ্ছুৎ হিসেবে গণ্য করা, ব্যক্তিগত সম্পত্তির প্রতি প্রবল আকাঙ্খাজনিত কারণে নারীদের গৃহস্থালি কাজের মধ্যেই আটকে রাখা প্রভৃতি এবং অন্যদিকে পুরুষদের সক্রিয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ ইত্যাদি বিধি চলে আসছিল। কিন্তু আজকে গণযুদ্ধ শুরু হবার পরে বহু গৃহবধু স্বামীদের হাত ধরে ঘর ছেড়ে সন্তানদের প্রতিপালনের বিকল্প ব্যবস্থা করে গণুদ্ধের ডাকে সাড়া দিচ্ছে। আবার যে সমস্ত গৃহবধুরা ঘরেই থাকবেন বলে সিদ্ধান্ত নেন তাঁরা অর্থনৈতিকভাবে অনেক বেশি স্বয়ম্ভর এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতির বাধ্যবাধকতার জন্য বহুল পরিমাণে রাজনীতি-সচেতন হয়ে উঠছেন। পার্টির তরফে নারীদের রাজনীতি সচেতন করে তোলার প্রচেষ্টা, গণযুদ্ধের ফলে রাজনৈতিক বাতাবরণের যে পরিবর্তন ঘটেছে যেমন ঘন ঘন তল্লাশি, ওয়ারেন্ট, হুমকি, অত্যাচার, এমনকি কখনও কখনও বলাৎকার তাঁদেরকে আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রতিরোধী এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতি প্রতিহিংসাপরায়ণ করে তুলেছে। আজ শিশুদেরও এই আক্রমণের হাত থেকে রেহাই নেই। অত্যাচারের ফলে তারা অল্প বয়সেই রাজনৈতিকভাবে পক্ক হয়ে উঠেছে। আজ দেখা যাচ্ছে গ্রাম প্রতিরোধ কমিটিগুলিকে শিশুরা সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করছে, সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে অংশগ্রহণ করছে, প্রচারকার্যে সাহায্য করছে এবং গোপন সংবাদ আদান-প্রদান ইত্যাদি বহুবিধ কাজই তারা প্রাণ ঢেলে করছে। যে সমস্ত এলাকায় বিপ্লবী কর্মকান্ড যথেষ্ট শক্ত ভিতের উপর দাঁড়িয়ে পরিচালিত হচ্ছে সেখানকার প্রায় সকল পুরুষই আত্মগোপন করতে বাধ্য হচ্ছেন। নারী ও শিশুদের রেখে যাচ্ছেন সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণ ও পুলিশী তান্ডবের মোকাবেলা করার জন্য। স্বভাবতই পুরুষদের অনুপস্থিতি পরিবারের আগের লিঙ্গ সম্পর্কের পরিবর্তন ঘটাচ্ছে। উদাহরণ স্বরূপ, আজকে দেখা যায় মেয়েরা কৃষি জমিতে লাঙ্গল দিচ্ছেন, যেটা ধর্মীয়ভাবে অনুমোদিত নয়। আজকে মেয়েরা ঘরের চাল ছাইছেন বা ছাদ পেটাচ্ছেন যেটা সাংস্কৃতিকভাবে অননুমোদিত। আজকে বিপ্লবী অঞ্চলের নারীরা স্বামী পুলিশের গুলিতে নিহত হলে শাস্ত্রানুযায়ী বৈধব্য অনুষ্ঠান পালন করেন না, বিপরীতে পার্টি সচেতনভাবে প্রচেষ্টা চালায় শোককে ঘৃণায় পরিণত করে স্বামী হত্যার বদলা নিতে। আজকাল সংবাদপত্রগুলিতেও এইসব বিধবাদের কাহিনী প্রকাশিত হচ্ছে।
রোলপা’র অধিবাসী সঙ্গীতা বুধা’র ঘটনাটিকে নেওয়া যাক।  ১৯৯৭ সালে পুলিশী তান্ডবে তার স্বামী শহীদ হন।  সঙ্গীতা বুধা বলছেন, বাবাকে যখন গ্রেফতার করা হয় তখন আমার বাপের বাড়ি সামলাতে সেখানেই কাজ করতে হয়েছিল, আর আজ আমার স্বামী শহীদ হবার পর আমাকে জঙ্গলে যেতে হচ্ছে স্বামীর আরব্ধ কাজ সম্পূর্ণ করতে, সাথে সাথে তাঁর হত্যাকারীদের নির্মূল করতে।
সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও নারীরা বিপুল রূপান্তর সাধন করেছে। একটি প্রতিক্রিয়াশীল হিন্দু উৎসব তীজ-কে (তীজ হলো স্বামীর মঙ্গল কামনায় আর কুমারীদের ভাল বর পাওয়ার জন্য একটি ব্রত। এই ব্রত পালনের জন্য কনের পোষাক পরে সারাদিন উপোস করে প্রকাশ্য স্থানে নৃত্যগীত পরিবেশন করতে হয়) আজ বিপ্লবী রাজনীতি প্রচারে তথা গণযুদ্ধের সপক্ষে প্রচার চালানোর কাজে এবং নেপালে রাষ্ট্রযন্ত্রের নির্মম নিষ্পেষণের বিরুদ্ধে নিয়োজিত করা গেছে।
পরিবারে পুরুষদের অনুপস্থিতি, সঙ্গে নিরন্তর পুলিশী হানা ও নির্যাতন নারীদের পারস্পরিক সহযোগিতার মেলবন্ধনে আবদ্ধ করেছে। এর ওপর পার্টি খুব গুরুত্ব সহকারে প্রচারাভিযানে নেমেছে গণসমাজভিত্তিক বাজার ব্যবস্থার প্রবর্তন, সমষ্টিগত শ্রম যেমন ‘পরমার’ (প্রথাটি হলো কয়েকটি ক্ষেতে কৃষি শ্রমিকদের অদলবদল করে শ্রমদান, এটি একটি সনাতন পদ্ধতি) বৃহৎ আকারে প্রচলন, নতুন রাস্তা নির্মাণ তথা পুরাতন রাস্তার সংস্কার, সমবেতভাবে নতুন জলাধার নির্মাণ, সমষ্টিগতভাবে পশুখাদ্য ও জ্বালানি আহরণ, নতুন নতুন চৌতারা (গণ-বিশ্রামের স্থান) নির্মাণ ইত্যাদি। রোলপা ও সালিয়ান জেলার সীমান্তে স্থানীয় গ্রামবাসীরা এই রকম একটি চৌতারা নির্মাণ করেছেন তিন মহিলা শহীদ কুমারী বুধা, সুনসারা বুধা ও সালি রোক্কার অমর স্মৃতিতে।
সমবায় প্রথায় চাষের ফলে যে সমস্ত পুরুষেরা গণযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য বাড়ি ছেড়ে চলে গেছেন, এমনকি পরিবারের ভরণপোষণের জন্য দূরবর্তী স্থানে বা শহরে চলে গেছেন কাজ করতে, সেই সমস্ত পরিবারের অশেষ উপকার হয়েছে। কোথাও কোথাও এই প্রথা প্রতিক্রিয়াশীল সামরিক বাহিনীতে কর্মরত পরিবারের লোকজনের মন গভীরভাবে জয় করে নিয়েছে।
গণবিচারের কার্যক্রম চালু হওয়ার পর নারীরা ঘরে বাইরে আরো বেশি নিরাপত্তা বোধ করছেন, কেননা স্বামীরা কোথাও কুকর্ম করলে অথবা লম্পটেরা কোথাও উৎপাত করলে গণআদালত যথাযথ শাস্তি দিচ্ছে।  নারীরা আগের থেকে অনেক বেশিকরে তাঁদের আইনী অধিকার ও নিজেদের দুর্দশা সম্পর্কে সচেতন।  বিপরীতে পুলিশের ক্রমাগত ধর্ষণ, বলাৎকার ও রাষ্ট্র কিভাবে এই ধর্ষণকারী ও গুন্ডাদের আড়াল করছে তা জনগণের কাছে এই রাষ্ট্রের শ্রেণি চরিত্র ও লিঙ্গ-আধিপত্যের চরিত্র বুঝতে আরো সাহায্য করছে, সাথে সাথে জনগণের রাজনৈতিক চেতনাও বাড়ছে।
ধর্ষিতারা আগে কলঙ্কিনী হিসেবে গণ্য হতো, কিন্তু বর্তমানে রাষ্ট্র ধর্ষণ ও খুনকে প্রায় বিধিসম্মত ব্যবস্থায় রূপান্তরিত করেছে, ফলে আগের লজ্জা ও কলঙ্কের ভাব দূর হয়ে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এক নতুন শ্রেণি ঘৃণা ও বিদ্রোহের মনোভাব তৈরি হচ্ছে।  পুলিশের যথেচ্ছ হয়রানি ও বলাৎকারের দরুন শাসক শ্রেণির ঘরের মহিলারাও রাষ্ট্রের প্রতি বিমুখ হয়ে পড়ছেন, নিপীড়িত ও নির্যাতিতরা ক্রমশ সহমর্মিতা অনুভব করছেন ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এককাট্টা হচ্ছেন।
উচ্চ লক্ষধারী তরুণ-তরুণীদের জীবনে গণযুদ্ধ একটি বিকল্প বিপ্লবী জীবনের ইশারা জাগিয়ে তুলেছে।  গ্রামীণ নারীদের জীবন একান্তই একঘেয়ে।  প্রতিদিন একই কাজের ক্লান্তিকর একঘেয়েমি। যেহেতু খুবই অল্প বয়সে তাদের বিয়ের পিঁড়িতে বসানো হয় তাই এই গতানুগতিক বিধিলিপিকে তারা অতিক্রম করতে পারে না।  যে সমস্ত উচ্চ লক্ষধারী নারী গ্রামীণ জীবনের এই শিকল ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে চান তাদের অবস্থাও ভয়াবহ, কেননা অজ্ঞতাজনিত কারণে অধিকাংশ মেয়েরাই কোনও না কোনওভাবে দালালের খপ্পরে পড়ে বাধ্য হয় পতিতালয়ে আশ্রয় নিতে, বেশির ভাগই চালান হয়ে যায় ভারতের শহরগুলির বিভিন্ন পতিতালয়ে। আনুমানিক দেড় লক্ষ নারী এইভাবে ভারতের বিভিন্ন পতিতালয়ে হীন জীবন যাপন করছে। তাছাড়া বিভিন্ন স্থানে নেপালি নারীরা খুব অল্প মাইনেতে কাজ করতে বাধ্য হয়, সেখানেও তারা বিভিন্নভাবে যৌন নিপীড়নের শিকার। নেপালি মেয়েদের এইভাবে চালান হয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেই চলেছে। কিন্তু আজ বহু মেয়েই একটি নতুন জীবনের সন্ধান পেয়েছেন। গণযুদ্ধ তাদের সামনে ছুঁড়ে দিয়েছে একটা নতুন চ্যালেঞ্জ। পুরুষদের পাশাপাশি দাঁড়িয়ে কাঁধে কাঁধ মিলেয়ে মানসিক ও শারীরিকভাবে তারাও যে সক্ষম সেটা প্রমাণ করার। সমাজ পরিত্যক্তা বহু নারী গণযুদ্ধের দৌলতে পেয়েছেন এক নতুন সম্মানজনক জীবন। স্বামী-পরিত্যক্তা, প্রতারকের পাল্লায় পড়ে কৌমার্য হারানো যেসব নারী নির্জন কোণে কালাতিপাত করছিলেন অথবা বিবাহযোগ্য অথচ বিবাহ হচ্ছে না এমন মেয়েরা, আজ বিভিন্নভাবে গণযুদ্ধকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করছেন। এই সমাজে তিলে তিলে ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুবরণ করার চাইতে তাঁদের কাছে গণযুদ্ধে জীবনদান অনেক বেশি আকর্ষণীয়।
গণযুদ্ধ জনজীবনে প্রগতিশীল ভাবধারার বীজ রোপণে সফল হয়েছে। নয়া জমানার মেয়েরা আজ চিরাচরিত প্রথায় সম্বন্ধ করে বিবাহ করতে অস্বীকার করছে। মতাদর্শগত মিল আছে এমন পুরুষের সাথে প্রেমের বন্ধনে আবদ্ধ হয়েই আজ তাঁরা বিবাহ করতে উৎসুক। তাঁরা আজ পুত্র সন্তানের জন্য মাথা খুঁড়তে রাজি নয়। বস্তুত বিপ্লবী কর্মকা-ের ক্ষেত্রে যাতে কোনওরকম প্রতিবন্ধকতা না আসে তাই আজ তারা সীমিত সংখ্যক সন্তানের জন্ম দিচ্ছে। পুরুষেরা আজ অনেক বেশি দরদ দিয়ে সহযোগিতা করছে সাংসারিক কর্মকা-ে। পার্টি পুরুষদের জন্য একবিবাহের কঠোর নির্দেশ জারি করেছে, তাই বিবাহিত পুরুষ কোনও গুপ্ত প্রণয়ে লিপ্ত একথা ফাঁস হলেই কঠিন সাজা পাচ্ছে। অনুরূপভাবে বিবাহিত নারীরা সমদোষে দুষ্ট হলে রেহাই পাচ্ছে না। বিবাহ বিচ্ছেদের উপযুক্ত কারণ থাকলে বিবাহ বিচ্ছেদে উৎসাহিত করা হয় এবং পুনরায় বিবাহের ক্ষেত্রেও কোনওরকম প্রতিবন্ধকতা আরোপ করা হয় না। এরূপ বহু পুনর্বিবাহ অনুষ্ঠিত হয়েছে। যুদ্ধে যাঁদের পতি বা পত্নী বিয়োগ হয়েছে তাঁরা অনেকে পুনর্বিবাহ করছেন। যদিও এই ধরনের ঘটনা খুব বেশি নয়, কিন্তু পার্টি এক্ষেত্রে বিধিনিষেধের বদলে উৎসাহ দান করছে। গণযুদ্ধ নারীদের মধ্যে এক সৃজনশীল শিল্প-সাহিত্যের বাতাবরণ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। এর ফলে বহু নারী এগিয়ে আসছেন তাঁদের গণযুদ্ধের অভিজ্ঞতা, পুলিশী নির্যাতন ইত্যাদি বিষয়ে স্মৃতিকথা, কবিতা, ফিচার, প্রবন্ধ তথা তাত্ত্বিক নিবন্ধ রচনা করতে এবং সংবাদপত্র ও জার্নালে এগুলি প্রকাশিত হচ্ছে।
এন.জি.ও., আই.এন.জি.ও. ইত্যাদি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলি, যেমন আমা মিলন কেন্দ্র (মায়েদের মিলন কেন্দ্র)। এদের কাজ হলো মন্দির নির্মাণ করা এবং মহিলাদের সংগঠিত করার নামে ধর্মপ্রচার করা। গণযুদ্ধ আজ সাহসভরে এদের ভ-ামী ও ভুয়া কার্যকলাপের মুখোশ উন্মোচন করতে পেরেছে।
নেপাল হচ্ছে একটি বৈচিত্র্যময় দেশ। বিভিন্ন জাতিসত্তার মধ্যে গণযুদ্ধের প্রভাব পড়েছে অপরিসীম। যেমন, ইন্দো-এরিয়ান, তিব্বতী-বার্মিজ, তথা অন্যান্য জনজাতিগুলির মধ্যেও। যেমন ইন্দো-এরিয়ান গোষ্ঠীর উপর আরোপিত ও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হিন্দু মৌলবাদী ধর্মীয় বিধিনিষেধের ফলে নারীরা ছিল অবদমিত। গণযুদ্ধ এই নারীদের শৃঙ্খল ভেঙে বেরিয়ে আসতে তথা এদের মধ্যে সুপ্ত শক্তিকে জাগিয়ে তুলছে। তিব্বতী-বামির্জ গোষ্ঠীর মেয়েরা যদিও আপেক্ষিকভাবে অনেক স্বাধীন এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে মহিলাদের স্বাধীনতাও প্রচুর, তাই গণযুদ্ধ তাদের সামনে তুলে ধরেছে এক বৈচিত্র্যময় নতুন জীবনের স্বাদ যা তারা আগে কখনও পায়নি। গণযুদ্ধ যে তাদেরকে কেবলমাত্র শ্রেণিশোষণ ও লিঙ্গবৈষম্যের যাতনা থেকে মুক্ত করছে তাই নয়, তাদের জাতিগত নিপীড়ন থেকেও মুক্ত করছে। তপশিলী জাতির মেয়েরা অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক তথা যৌন জীবনে যেভাবে শোষিত-নিপীড়িত হচ্ছিলেন গণযুদ্ধ সেক্ষেত্রে তাদের সামনে মুক্তিদূত হিসেবে হাজির। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ঘৃণায় এইসব মহিলারা আজ সোচ্চার।
নেপালের নারী-আন্দোলনে পরিমাণগত তথা গুণগতভাবে এক অভূতপূর্ব বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছে গণযুদ্ধ। এতদিন নেপালের নারী-আন্দোলনের ভারকেন্দ্র ছিল শহর, আজ নারী আন্দোলনের ভারকেন্দ্র হলো গ্রামাঞ্চল। শ্রেণিদৃষ্টিভঙ্গী মূল কথা, “ব্যাপকতম নারীদের আজ জড়ো করতে হবে”- এই দৃষ্টিভঙ্গীকে বাস্তবে রূপদান করে অতীতের নারী আন্দোলন আজ পরিবর্তিত হয়েছে এক বৈপ্লবিক গণআন্দোলনে। গণযুদ্ধের দৌলতে সর্বত্রই নারী-জাগরণের প্রভাব অপরিসীম। নারী ও শিশুদের মানবাধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে নারীদের ভূমিকা অতুলনীয়। রোলপা, রুকুম ও অন্যান্য জেলায় শুধুমাত্র ছয়জনের সাংবাদিক দল সরকারি নির্যাতনের যে পুঙ্খানুপুঙ্খ ছবি দেশি ও বিদেশি সংবাদপত্রে তুলে ধরেছেন তাতে গোটা বিশ্ব সচকিত।
গণযুদ্ধ বিভিন্ন নারী সংগঠনকে একই মঞ্চে সমবেত হতে বাধ্য করেছে (গণযুদ্ধ শুরু হবার আগে এটা ভাবাই যেতনা)। আজকে তাঁরা সম্মিলিতভাবে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস-বিরোধী বিক্ষোভ মিছিল সংগঠিত করছেন। একযোগে সৌন্দর্য প্রতিযোগিতার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ সংগঠিত করছেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাথে সংশ্লিষ্ট নারী সংগঠন একত্র হয়ে দেবী খাদকার ওপর ধর্ষণ ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে যে বিক্ষোভ সংগঠিত করেন তা অবশ্যই একটি নজির।

নারীদের সমাবেশিত করার ক্ষেত্রে গণযুদ্ধের ভূমিকা
সামগ্রিক পরিপ্রেক্ষিতে নেপালে নারী সমাজের সামনে সবচেয়ে বড় বাধা হলো সামন্ততন্ত্র। ফলস্বরূপ কমিউনিস্ট পার্টির অভ্যন্তরেও সামন্ততন্ত্রের অবশেষগুলি চোরাগোপ্তাভাবে পার্টি-কাঠামোতে ঢুকে পড়তে পারে। ফলে নারীদের তা আঘাত করে। কেননা তাদের দুইটি ফ্রন্টে লড়াই করতে হয়। একদিকে শ্রেণিবৈষম্য, অন্যদিকে লিঙ্গবৈষম্য। অনেক সময় সামন্ততান্ত্রিক কুসংস্কারের বশবর্তী হয়ে যখন বিভিন্ন কমিটি ও গেরিলা ইউনিটে নারী নেতৃত্বকে অবজ্ঞা করা হয়, তখন তা পার্টির মধ্যে খুবই সমস্যার উদ্রেক করে। এক্ষেত্রে সিপিএন (মাওবাদী)’র নীতি হলো, গণযুদ্ধে নারীদের আরও বেশি বেশি মাত্রায় সর্বস্তরে অংশগ্রহণের জন্য উৎসাহ দান করা। পাশাপাশি শহরে সাম্রাজ্যবাদীদের ব্যাপক প্রভাবজনিত কারণে নারীদের সংকীর্ণ নারীবাদী স্রোতে ভেসে যাওয়ার বিপদ আছে। এটা বিশেষভাবে প্রযোজ্য তাঁদের ক্ষেত্রে, যে সমস্ত শিক্ষিত নারীরা পরিবারের অভ্যন্তরে সামন্ততান্ত্রিক প্রভুত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে সংগ্রামে সামিল হয়েছেন। তাঁদের শ্রেণিচরিত্র অনুযায়ী তাঁরা শ্রেণিগত বিষয়ের চেয়ে লিঙ্গগত বিষয়েই জোর দিতে ইচ্ছুক। এই বিষয়ে যথার্থ সতর্কতা অবলম্বন না করলে সংস্কারবাদী অথবা দক্ষিণপন্থী ঝোঁক পার্টির মধ্যে মাথা চাঁড়া দিতে পারে। এই বিপদের হাত থেকে রেহাই পাবার ক্ষেত্রে পার্টির রক্ষাকবজ হলো নারী-আন্দোলনের নেতৃত্বে আরও বেশি মাত্রায় শ্রেণি নেতৃত্বকে টেনে আনা। পার্টির পক্ষে এটা সম্ভব কেবলমাত্র মাওয়ের নির্ধারিত গণলাইনকে যথার্থভাবে অনুশীলন করে। পার্টি যদিও নিচুতলার মানুষের গভীরে শিকড় গেড়েছে তথাপি সমস্ত রকমের সামন্ততন্ত্র ও সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী শক্তিকে শত্রুভাবাপন্ন করে তোলা চলবে না। এটাও মনে রাখতে হবে যে শ্রেণি সচেতনতার প্রয়োগের মাত্রাতিরিক্ত দোহাই দিয়ে লিঙ্গ-বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই যেন স্থগিত না হয়। সেক্ষেত্রে পার্টিতে বাম সংকীর্ণতাবাদী ঝোঁক প্রভাব বিস্তার করবে। সুতরাং পরস্পরবিরোধী এই দুই ঝোঁকের রাশ টেনে ধরতে হলে সম্পন্ন শিক্ষিতা নারীদের আরও বেশি শ্রেণি-সচেতন করে তোলা এবং গরীব নারীদের (এবং সেই সাথে পুরুষদেরও) লিঙ্গগত বৈষম্যের ব্যাপারে আরও বেশি অনুভূতিপ্রবণ হওয়া দরকার।
আমাদের অবশ্যই তত্ত্বগতভাবে এ ব্যাপারে স্বচ্ছ ধারণা রাখতে হবে যে একটি এম.এল.এম. (মালেমা) সংগঠনের মধ্যে সম্পূর্ণ পৃথকভাবে একটি নারী সংগঠনের অস্তিত্ব রাখার কারণ হলো সক্রিয় শ্রেণি-সচেতন, লিঙ্গ-বৈষম্যের ব্যাপারে স্বচ্ছ ধারণা রেখে নারীরা যাতে সংগঠক হিসেবে অন্যান্য গণসংগঠন বা স্থানীয় যুক্তফ্রন্টে
প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন।
বস্তুগতভাবে নারীদের গণযুদ্ধে অংশগ্রহণের অনেক কারণ আছে। কিন্তু আত্মগত কারণে মেয়েরা এখনও পুরুষদের থেকে পিছিয়ে আছে। দীর্ঘদিনের অধীনতা, স্বল্প শিক্ষা, বহির্জগতের ব্যাপারে অজ্ঞতা ইত্যাদি কারণেই নারীদের পশ্চাৎপদতা। সি.পি.এন. (মাওবাদী)’র জরুরি কাজ হলো তার নারী সদস্যদের আত্মগতভাবে আরও প্রশিক্ষিত করা।
গণযুদ্ধ আজ একটি নতুন সমস্যার সম্মুখীন। যুবক-যুবতীরা একত্রে আজ যুদ্ধক্ষেত্রে তথা গোপন সাংগঠনিক কাজকর্মে লিপ্ত। এমতাবস্থায় যৌন নৈতিকতার প্রশ্নটিকেও গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করতে হবে। যৌন স্বাধীনতার নামে কেউ যেন অরাজকতার শিকার না হন সে ব্যাপারে হুঁশিয়ার থাকতে হবে। অপরদিকে
সংস্কৃতির উপর সামন্ত্রতন্ত্রের প্রবল প্রভাবের জন্য যৌন স্বাধীনতা রোখার নামে কঠোর রক্ষণশীলতাও অনেক সময় চেপে বসতে পারে। পার্টি এই সমস্ত বিষয়গুলিকে নিয়ন্ত্রণের জন্য কিছু বিধিনিষেধ জারি করেছে। বস্তুত অবক্ষয়ী সামন্ততান্ত্রিক সংস্কৃতির উচ্ছেদকল্পে নতুন সাংস্কৃতিক মূল্যবোধকে উৎসাহ প্রদান করতেই হবে। আজ গণযুদ্ধ ঘাঁটি-এলাকা গড়ে তোলার মতো অবস্থায় পৌঁছেছে। তাই আজ নারীশক্তির কাজ শুধুমাত্র পুরনো সমাজকে ভাঙাই নয়, একটি নতুন প্রগতিশীল সমাজ গড়ে তোলাও। আজ সম্ভাব্য ঘাঁটি-এলাকাগুলিতে সামন্তবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী রাষ্ট্রের যে ভ্রণ গড়ে উঠেছে সেখানে সক্ষম করে গড়ে তোলার জন্য নারীদের উৎপাদনে অংশগ্রহণ করতে হবে, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও প্রশাসনিক কাজে দক্ষতা গড়ে তুলতে হবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, পার্টিস্তরে নারীদের সমস্যার সমাধান না করলে বা স্থগিত রাখলে সর্বহারা দৃষ্টিভঙ্গী অচিরেই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কেননা সমস্ত নিপীড়িত শ্রেণি ও গ্রুপগুলির মধ্যে নারীরাই বেশি নিপীড়িত। এই সম্ভাব্য বিচ্যুতি পার্টি ও তার রাজনৈতিক লাইনের অপরিসীম ক্ষতি সাধন করবে, সেটা দক্ষিণ বা বাম সংকীর্ণতাবাদের জন্ম দেবে। মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের শিক্ষাকে পার্টি-জীবনের সর্বস্তরেই প্রথম থেকে অনুপ্রবিষ্ট করতে হবে। বিশেষত অন্যায়ের বিরুদ্ধে “বিদ্রোহ করা ন্যায়সঙ্গত”- এই শ্লোগানের ভিত্তিতে নারীরা একাধারে সমাজের অভ্যন্তরে প্রচলিত সামন্ততন্ত্র, অন্যদিকে পার্টির অভ্যন্তরে দক্ষিণ বা বাম ঝোঁকের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারবেন।

উপসংহার
যুদ্ধ, বিশেষত শ্রেণিযুদ্ধ হচ্ছে নিজেই এক মহান শিক্ষক। কারণ এটা রাষ্ট্রের শ্রেণিচরিত্র সবচেয়ে পরিষ্কারভাবে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম। বিশেষভাবে নারী সমাজের কাছে সামন্ততান্ত্রিক-বুর্জোয়া রাষ্ট্রের গোষ্ঠীপতি পিতৃতান্ত্রিক স্বরূপটা খুব প্রকটভাবেই ধরা পড়ে।
নেপালের নারীরা রাষ্ট্রের শ্রেণিকাঠামো তথা গোষ্ঠীতান্ত্রিক/পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে ত্রিবিধ উপায়ে শান্তি পাচ্ছেন। তঁদের নির্যাতন, ধর্ষণ ও হননের মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
সামন্ততান্ত্রিক অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নারীরাই সবচেয়ে ভুক্তভোগী। পিছিয়ে পড়া দমনমূলক সামন্ততান্ত্রিক সংস্কৃতি (এবং শহরে বিকৃত সাম্রাজ্যবাদী সংস্কৃতি) তথা গোষ্ঠীতান্ত্রিক/পিতৃতান্ত্রিক রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে সংগ্রামজনিত কারণে নারীরা সামন্ততন্ত্র-সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের এক নির্ভরযোগ্য শক্তি। নারী সমাজ নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব থেকে সাম্যবাদে উত্তরণ পর্যন্ত সময়ব্যাপী বিপ্লবের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য শক্তি। কেননা নারী সমাজের সম্পূর্ণ মুক্তি সম্ভব নয় ব্যক্তিগত সম্পত্তির অবসান না ঘটা পর্যন্ত। আর সাম্যবাদ ব্যতিরেকে ব্যক্তিগত সম্পত্তির উচ্ছেদ সাধন অসম্ভব।
নারী সমাজ সমস্ত শ্রেণির কাছেই আজ একটি জ্বলন্ত প্রশ্ন। আজকের শ্রেণিসংগ্রামে সাম্রাজ্যবাদীরা তাদের স্থিতাবস্থা বজায় রাখার জন্য নারীদের শান্তিরক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ করতে চায়। অপরদিকে মার্কসবাদী-লেনিনবাদী-মাওবাদী শক্তিগুলি নারীদের ইস্পাতদৃঢ় করে গড়ে তুলে স্থাপন করতে চায় হিংসাত্মক বিপ্লবের প্রথম সারিতে এবং তা সেই সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে, যে সমাজব্যবস্থা তাঁদেরকে বিবিধভাবে শোষণ করেছে।
আসুন আমরা আওয়াজ তুলি, সারা দুনিয়ার খেটে খাওয়া নারীরা ঐক্যবদ্ধ হোন। আপনাদের দুইটি শৃঙ্খল ছাড়া হারাবার কিছু নেই।

সূত্রঃ দেশে দেশে বিপ্লবী নারী সংকলন, বিপ্লবী নারী মুক্তি প্রকাশনা

Advertisements


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.