ইউ.পি.ডি.এফ. কি পাহাড়ী জনগণের জাতিগত মুক্তির বিপ্লবী সংগঠন হতে পেরেছে?

UPDF-logo1

ইউ.পি.ডি.এফ. কি পাহাড়ী জনগণের জাতিগত মুক্তির বিপ্লবী সংগঠন হতে পেরেছে?

(এপ্রিল/’৯৯)

ইউনাইটেড পিপলস্ ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউ.পি.ডি.এফ.) পার্বত্য শান্তি চুক্তি বিরোধী পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ, পাহাড়ী গণপরিষদ, হিল উইমেন্স ফেডারেশন সমন্বয়ে গড়ে ওঠা নতুন সংগঠন।  গত ২৫ ও ২৬ ডিসেম্বর ‘৯৮ সংগঠন তিনটি এক পার্টি-প্রস্তুতি সম্মেলনের মাধ্যমে এই ফ্রন্টের নাম ঘোষণা করা হয়।  পাহাড়ী জনগণের মুক্তি আন্দোলনের সাথে বিশ্বাসঘাতকতাপূর্ণ শান্তি চুক্তি ও শান্তি বাহিনীর আত্মসমর্পণের বিরুদ্ধে পাহাড়ী জনগণের ব্যাপক অংশের বিদ্রোহ ও বিপ্লবী আকাংখারই প্রকাশ এই সম্মেলন।
উগ্র বাঙালী জাতীয়তাবাদের বর্তমান নাটের গুরু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে পাহাড়ী জাতিগত বিশ্বাসঘাতক জনসংহতি সমিতি নেতা সন্তু লারমা ও তার শান্তি বাহিনীর আত্মসমর্পণের সময়ও সংগ্রামী পাহাড়ী জাতিসত্তাগুলোর জনগণের বিদ্রোহ ঢাকা পড়েনি। ইয়াহিয়া-মুজিবের গোল টেবিল বৈঠকের অনুরূপ হাসিনা-সন্তু লারমার পার্বত্য শান্তি চুক্তির আনন্দ বিহারকে সেদিন ধূলিসাৎ করেছে আত্মসমর্পণ বিরোধী পাহাড়ী যুবক-যুবতীদের শ্লোগান, ব্যানার, ফেস্টুন, কালো পতাকা প্রদর্শন। দুই যুগেরও অধিককাল ব্যাপী সংঘটিত লোগাং, লংগদু, নানিয়ারচরসহ অসংখ্য গণহত্যা, সংগ্রামী পাহাড়ী নেত্রী কল্পনা চাকমার সম্ভাব্য গুম-খুন, অজস্র পাহাড়ী নারী ধর্ষণ, সমতল থেকে বাঙালী জনগণ এনে আর্মী প্রহরায় পাহাড়ীদের জমি-জিরাত দখল, তার মাধ্যমে পাহাড়ী-বাঙালী সংঘর্ষ বাধানো, বনভূমি উজার করা, কাপ্তাই বাঁধের মাধ্যমে নামমাত্র ক্ষতিপূরণ দিয়ে হাজার হাজার একর আবাদী জমি ধ্বংস- এসব পাহাড়ী জনগণ ভোলেননি। পাহাড়ী জনগণ এটা ভালই বুঝেছেন, বাঘ আর হরিণের একই বনে অবস্থান- কখনোই শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ নয়।
গণহত্যাকারী বাহিনী, বাঙালী সেটলারদের পাহাড়ে রেখে শান্তি- সেটা দুঃস্বপ্ন মাত্র। তাই পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে উগ্র বাঙালী জাতীয়তাবাদী- আমলা-মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া শাসক শ্রেণী, তাদের শাসন-শোষণের সকল শক্তিকে বিপ্লবী লড়াইয়ে উচ্ছেদের মাধ্যমে কেবল পাহাড়ী জনগণ অর্জন করতে পারেন তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার তথা বিচ্ছিন্নতার অধিকারসহ স্বায়ত্তশাসন।
কিন্তু ইউ.পি.ডি.এফ-এর কর্মসূচিতে আমরা কি দেখতে পাই? “…….. এই পার্টি দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে” (ইউ.পি.ডি.এফ.-এর প্রেস বিজ্ঞপ্তি)।
পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনী মোতায়েন, বাঙালী পুনর্বাসন, দীর্ঘকালের গণহত্যা-ধর্ষণ-নিপীড়নের হোতা বাংলাদেশের শাসক-শোষক শ্রেণী তাদের সকল অপকর্মের যুক্তি হিসেবে এটাকেই ব্যবহার করে থাকে। আজ ‘বাঙালীদের অধিকার ভূলুণ্ঠিত হয়েছে’ বলে উগ্র বাঙালী জাতীয়তাবাদী বিএনপি, জামাত, পার্বত্য গণপরিষদরা পাহাড়ী জনগণের বিরুদ্ধে সংগ্রামে নেমেছে ঠিক এই যুক্তিতেই। কিন্তু পাহাড়ী ১৪টি জাতিসত্তার কাছে এ প্রশ্নটি সামনে আসে না। বরং আসে তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার, আসে তাদের নিপীড়নকারী সাম্রাজ্যবাদ-সম্প্রসারণবাদের দালাল বাঙালী আমলা-মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া শ্রেণীকে ও তাদের নিপীড়নের যন্ত্রগুলোকে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে উচ্ছেদের প্রশ্নে। এ প্রশ্নে উপরোক্ত প্রেস বিজ্ঞপ্তি বা ঘোষণায় কোন কথা নেই। বাস্তবে পাহাড়ী জনগণসহ যে কোন নিপীড়িত জাতির জাতীয় মুক্তির জন্য নিুতম কর্মসূচি হচ্ছে আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের কর্মসূচি। এর অর্থ হচ্ছে বিচ্ছিন্নতার অধিকারসহ স্বায়ত্তশাসন। জাতীয় নিপীড়ক রাষ্ট্রের অধীনস্থতায় দেশের অখণ্ডতা রক্ষা, আর ‘বিচ্ছিন্নতার অধিকার’ হচ্ছে দু’টো বিপরীতমুখী কর্মসূচি। এভাবে ইউ.পি.ডি.এফ. বিচ্ছিন্নতার অধিকারের মূল কর্মসূচিকে বর্জন করেছে। এটার সরল অর্থ হচ্ছে ইউ.পি.ডি.এফ. জাতিগত মুক্তির প্রশ্নে আসল জায়গাটাকেই জাতীয় নিপীড়ক রাষ্ট্রকে ছাড় দিয়ে বসেছে।

“সংবিধানে পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং দেশের অন্যান্য অঞ্চলে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিসত্তাসমূহের স্বীকৃতি দানের জন্য আন্দোলন-সংগ্রাম করবে।”
এ উক্তি নবগঠিত এই সংগঠনের জাতীয় নিপীড়ক রাষ্ট্রের অধীনে সংস্কারবাদী চরিত্রকে তুলে ধরে। বর্তমান সংবিধান জাতীয় নিপীড়ক রাষ্ট্র ব্যবস্থারই অংশ। নিপীড়ক ব্যবস্থা উচ্ছেদের বিপ্লবী লাইনের পরিবর্তে সংবিধান সংশোধনের এ জাতীয় ‘সংসদীয় বিতর্ক’ স্টাইলের দাবি কোন বিপ্লবী দিশা দিতে পারে না। আর সেটা শেষ পর্যন্ত জে.এস.এস.-এর পরিণতির দিকেই যেতে বাধ্য, যা ধারণ করতে ব্যর্থ পাহাড়ী জনগণের আত্মত্যাগ ও সংগ্রামের সুদীর্ঘ গৌরবময় ঐতিহ্যকে।
তাদের ঘোষণায় সাম্রাজ্যবাদ, ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ, পার্বত্য চট্টগ্রামে কর্মরত সাম্রাজ্যবাদী সংস্থাসমূহ (এনজিও) উচ্ছেদের প্রশ্নে কোন স্পষ্ট ঘোষণা নেই। অথচ পাহাড়ী জনগণের পরিপূর্ণ মুক্তির জন্য এইসব জাতীয় নিপীড়ক বহিঃশত্রুদের উচ্ছেদের কর্মসূচি ছাড়া তা এগুতে পারে না। জে.এস.এস.-এরও অন্যতম সমস্যা ছিল এটা। আজ এখন পর্যন্ত ইউ.পি.ডি.এফ. রয়ে গেছে সেই একই বৃত্তে।
তারা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কথা বলেছেন। কিন্তু সেই ‘গণতান্ত্রিক’ ব্যবস্থা কেমন হবে, কাকে উচ্ছেদ করতে হবে, কোন শ্রেণীর নেতৃত্বে, কোন কোন শ্রেণীর ক্ষমতা কায়েম করতে হবে, মূল কর্মসূচিগুলো কি কি হবে- সেসব বিষয় তারা স্পষ্ট করেননি। এই অস্পষ্টতা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রত্যাশী পাহাড়ী জনগণকে ধোঁয়াশায় আচ্ছন্ন করে রাখবে। এবং তারা গণতন্ত্রের নামে বিভ্রান্ত হয়ে প্রতিক্রিয়াশীল বুর্জোয়াদের ভোটবাজি রাজনীতির খপ্পরে পড়বেন।
পাহাড়ী জনগণের আশু কর্মসূচি বা দাবির মাঝে অবশ্যই থাকতে হবে-
– পুনর্বাসিত বাঙালীদের পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে ফিরিয়ে নাও, সমতলে তাদের পুনর্বাসন কর।
– পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে নিপীড়ক বাঙালী উগ্র জাতীয়তাবাদী সকল বাহিনীকে গুটিয়ে নাও- ইত্যাদি।
কিন্তু ইউ.পি.ডি.এফ. তার যে সম্মেলন-পরবর্তী ঘোষণা-কর্মসূচি ও প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে, তার ভিতরে স্পষ্টভাবে এগুলো নেই। এভাবে ইউ.পি.ডি.এফ. পাহাড়ী জনগণের আশু জরুরী দাবির প্রশ্নেও আপোষের ও ধোঁয়াশার পথ নিয়েছে।

ইউ,পি.ডি.এফ. তার ‘ঘোষণা’য় পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রশ্নে কিছু বাম প্রগতিশীল শক্তির বিবৃতি প্রদান ছাড়া পাহাড়ী জনগণ প্রশ্নে দেশব্যাপী কোন সংগ্রাম হয়নি বলে উল্লেখ করেছেন (তাদের সম্মেলন-পরবর্তী ঘোষণা দ্রষ্টব্য)।
এখানে একটি উজ্জ্বল সংগ্রামের ইতিহাস ধামাচাপা পড়েছে। ’৭৩-’৭৪-এ কমরেড সিরাজ সিকদারের নেতৃত্বে পার্বত্য চট্টগ্রামে এক বিরাট বাহিনী তৈরি হয়েছিল এবং শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্ত জনগণের গণক্ষমতা তথা নয়াগণতান্ত্রিক বিপ্লবের লক্ষ্যে পাহাড়ী-বাঙালী নির্বিশেষে সারাদেশের জনগণকে নিয়ে সংগ্রামের বাস্তব পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল। তার সফলতা-ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন থাকতেই পারে, কিন্তু পাহাড়ী জনগণের সংগ্রামের ইতিহাসে তা এক উল্লেখযোগ্য বিপ্লবী সংগ্রামের দৃষ্টান্ত, তা পুরো পার্বত্য চট্টগ্রামের যত ক্ষুদ্র অংশ জুড়েই ঘটুক না কেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন বিপ্লবী শক্তি পাহাড়ী জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রশ্নে আরো সুস্পষ্ট বক্তব্য আনেন। বিপ্লবী শ্রমিক আন্দোলন-বিপ্লবী ছাত্র আন্দোলন এবং সংগঠনদ্বয়ের মুখপত্র ‘আন্দোলন’ পাহাড়ী জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারসহ বিভিন্ন প্রশ্নে অব্যাহতভাবে বিপ্লবী রাজনীতি ও আশু দাবিনামা ঊর্ধ্বে তুলে ধরছে। যেমন পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে উগ্র বাঙালী সরকারের সেনাবাহিনী এবং পুনর্বাসিত বাঙালীদের ফেরত আনার বিপ্লবী দাবিসমূহ। সত্যিকারের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হলে ইউ.পি.ডি.এফ.-কে এই ঐতিহাসিক বাস্তবতাকে ধারণ করতে হবে এবং এ ধরনের উদ্যোগকে সর্বাত্মকভাবে সহায়তা করতে হবে। কিন্তু ইউ.পি.ডি.এফ.-এর ঘোষণা তা করতে পারেনি।

এভাবে পাহাড়ী জনগণ জাতিগত মুক্তির জন্য তাদের প্রতিদিনকার স্বপ্ন মহান আত্মবলিদান, বিপুল সাহস নিয়ে যে নেতৃত্বকারী বিপ্লবী সংগঠনের জন্য পথ চেয়ে বসে আছেন ইউ.পি.ডি.এফ. তার কর্মসূচিতে, তার চরিত্রে সে জায়গায় নিজেকে দাঁড় করাতে পারেনি। তাই পাহাড়ী জনগণের প্রকৃত মুক্তির জন্য নিবেদিত বন্ধুদের প্রতি আহ্বান- আপনারা পেটি-বুর্জোয়া সংস্কারবাদী ও জাতীয় মুক্তির প্রশ্নে আপোষবাদী লাইন পরিহার করে পাহাড়ী জনগণের সত্যিকার আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার বিপ্লবী পথে আসুন। সমতলের প্রকৃত বিপ্লবী, প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক শক্তি আপনাদের সাথে থাকবেন।

সূত্রঃ পাহাড় ও সমতলে আদিবাসী জাতিসত্ত্বার সংগ্রাম সম্পর্কে নিবন্ধ সংকলন, আন্দোলন প্রকাশনা

Advertisements


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s