‘আমার জায়গা থেকেই আমি আমার বদলা নেব’ – ভারত কুমারী রেগমী

maowomen

আমার জায়গা থেকেই আমি আমার বদলা নেব

– ভারত কুমারী রেগমী

[নারী মুক্তি/৪নং সংখ্যায় প্রকাশিত ॥ ফেব্রুয়ারি, ’০৬]

[ নিন্মোক্ত সাক্ষাতকারটি নেপালের গণযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী একজন নারী কমরেডের। নাম ভারত কুমারী রেগমী। ৫ বছর বয়সী এক শিশুর মা ও প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষিকা। বাড়ি দাইলেখ জেলার খুরশানী বাড়ি গ্রামে। ২০০১ সালে তার বয়স ২৬। ঐ বছরের ২৭ ডিসেম্বর মাঝ রাতের দিকে নিজ বাড়িতে সরকারি বাহিনীর সদস্যরা দলবেধে তাকে ধর্ষণ করে অজ্ঞান অবস্থায় রেখে যায়। এরপর সকাল ৮টার দিকে জ্ঞান ফিরলে তিনি রক্তাক্ত অবস্থায় নিজেকে আবিষ্কার করেন। স্বামী ও সমাজ কর্তৃক পরিত্যক্ত হবার ভয়ে তিনি ঐ নিষ্ঠুর ঘটনা সবার থেকে গোপন রাখার চেষ্টা করেন। কিন্তু তার স্বামী একসময় বিষয়টি জানতে পারেন এবং স্ত্রীকে পরিত্যাগ না করে চিকিৎসা করান। তাদের সম্পর্ক আরও গভীর হয়। প্রসঙ্গত স্বামী নারায়ণ শর্মাও (সন্দীপ) ছিলেন একজন বিপ্লবী। তিনি “সারা নেপালী জাতীয় ছাত্র ইউনিয়ন (বিপ্লবী)”র কেন্দ্রীয় কমিটির একজন বিকল্প সদস্য ছিলেন। তিনি ২০০২ সালের ২৩ আগস্ট দোলপায় রাজকীয় সেনাবাহিনীর গুলিতে মারা যান।
সাক্ষাতকারটি ২০০৩ সালে নেপালী পত্রিকা “জন আওয়াজ”-এ প্রকাশিত হয়েছিল। যার অংশবিশেষের বাংলা অনুবাদ প্রকাশ করে ভারতের বিপ্লবী পত্রিকা “পিপল্স মার্চ” ফেব্রুয়ারি-মার্চ,’০৫ সংখ্যায়।]

প্রশ্নঃ রাজকীয় সৈন্যবাহিনী কোথায় ও কখন আপনাকে ধর্ষণ করে ?
উত্তরঃ আমি খুরশানী গ্রামে ভাইয়ের বাড়ি থাকতাম। সেখান থেকে আমার স্কুলে যেতে সুবিধে হোত। সেদিন আমি একলাই বাড়িতে ছিলাম। একজন স্থানীয় মহিলা গোয়েন্দা (যাকে কিনা রাজকীয় সেনারা একটা কর্ডলেস টেলিফোন দিয়েছিল) সরকারি বাহিনীকে জানায় যে আমার স্বামী সেদিন আমার সঙ্গে দেখা করতে আসবে। গভীর রাতে প্রায় দুটোর সময় প্রায় চার ডজন সরকারি সৈন্য এসে বাড়ি ঘিরে ফেলেছিল এবং আমার স্বামীর সন্ধান চালিয়েছিল। কিন্তু তারা তাকে খুঁজে পায়নি। তারপরই তারা আমার শ্লীলতাহানি করতে শুরু করে।

প্রশ্নঃ ধর্ষণকারীদের কাউকে কি চিনতে পেরেছিলেন ?
উত্তরঃ না, আমি সরকারি বাহিনীর কাউকে চিনতে পারিনি। কিন্তু আমি একজন হাবিলদার ও একজন পুলিশকে চিনতে পেরেছি। তাদের আমি আগে অনেকবার দেখেছি। কিন্তু আমি তাদের নাম জানি না। সমতলভূমি থেকে একজন প্রায়শ মরিচ বিক্রির অছিলায় আমাদের ওখানে আসত। আর একজন পুলিশ যার হাতে রুকমীতে পুলিশ আক্রমণের সময় গুলি লেগেছিল। আমি অত্যন্ত ভীত ও সন্ত্রস্ত থাকায় অন্যদের দিকে তাকাতে পারিনি আর সঠিকভাবে বলতে পারবো না তারা সংখ্যায় ক’জন ছিল।

প্রশ্নঃ ঘটনাটা কীভাবে ঘটল আপনি কি সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করবেন ?
উত্তরঃ সৈন্যরা প্রথমে আমার বিছানা বালিশ ছিঁড়ে ফেলে অনুসন্ধান চালায়। তারপর তারা আমার স্বামীর (সন্দীপের) একটা ছবি বার করে এবং সেটা পুড়িয়ে ফেলে। আমি তাদের বলি ঘটনা যাই ঘটে থাকুক না কেন, ওটা আমার স্বামীর ছবি, পোড়ালে কেন? তারপরেই একজন সৈন্য আমাকে ধর্ষণ করার আদেশ দেয়। তারা আমাকে জাপটে ধরে বুটের লাথি মেরে মেঝেতে ফেলে দেয়। প্রথম সুযোগে আমি দৌড়ে পালাতে পেরেছিলাম। তারপর তাদের মধ্যে একজন আমার বুকে বুটের লাথি মারে। সেই আঘাতের পর আমি চোখে ঝাপসা দেখতে থাকি এবং আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে যাই। ছয় সাত জন ধর্ষণকারী ধর্ষণ করা অবধি আমার জ্ঞান ছিল, তারপর আমি অজ্ঞান হয়ে যাই। পরদিন সকাল আটটার সময় জ্ঞান ফিরে পাই, তখনও আমার শরীর থেকে রক্ত ঝরছিল। শরীরে এক টুকরো কাপড়ের আবরণ ছিল না। শয়তানেরা যাবার সময় ঘরবাড়ির সমস্ত দরজা-জানালা খোলা রেখে গিয়েছিল। আমি ধীরে ধীরে উঠে বসেছিলাম এবং ভান করেছিলাম যেন কিছুই হয়নি। আমার ভাইও তাই ভেবেছিল। কিন্তু আমার ভাই পরে ব্যাপারটি জানতে পেরেছিল এবং আমাকে রক্ত বন্ধ করার ইঞ্জেকশন দিয়েছিল। আমি আমার ভাইকে অনুরোধ করেছিলাম আমাকে তার ভগ্নীপতির কাছে নিয়ে যেতে। কিন্তু সে আমার শরীরের এই অবস্থায় ওখানে যেতে নিষেধ করল। কিন্তু আমি শুনিনি, সন্দীপের অপেক্ষায় ছিলাম এবং তাকে পেয়েও গেলাম। সন্দীপকে এ ব্যাপারে আমি কিছু বলিনি। আমি তাকে ভীষণ ভালবাসতাম। আমার ভয় ছিল ঘটনাটা জানতে পারলে সে আমায় না-ও গ্রহণ করতে পারে। এই ঘটনাটা জানার পর সে যদি আমার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় তাহলে আমি সব হারাবো। সেই কারণে গত তিন মাস ঘটনাটা গোপন করে গিয়েছিলাম।

প্রশ্নঃ সন্দীপ জানতে পারলো কী করে?
উত্তরঃ যদিও আমি বলতে চাইনি, কিন্তু আমার মনে হয় সৈন্যবাহিনীর কেউ অথবা অন্য কেউ যে কিনা খোলা দরজা দিয়ে ব্যাপারটা দেখেছিল, তারাই হয়তো কেউ সন্দীপকে বলে থাকবে। সন্দীপও ঘটনাটা শুনেছিল, এবং আমাকে প্রতিনিয়ত জিজ্ঞাসাবাদ করত। বহুদিন ধরে আমি এটা মিথ্যা কথা বলে এড়িয়ে গেছি। তা সত্ত্বেও সে বলেছিল, তুমি তো নিজের ইচ্ছেয় কাজটা করনি, সুতরাং আমায় খুলে বল। আমি তখন সমস্ত সত্য তার সামনে তুলে ধরলাম।

প্রশ্নঃ সন্দীপ ও তার পরিবারের লোকেরা সমস্ত ঘটনা জানার পর আপনার সঙ্গে কেমন ব্যবহার করেছিল?
উত্তরঃ আমি বুঝতে পেরেছিলাম সন্দীপ সম্বন্ধে আমার ধারণা কত ভ্রান্ত। সে আমায় গ্রহণ করল। বস্তুত আমি সমস্ত ঘটনা খুলে বলার পর সে আমাকে যত্ন ও ভালবাসায় ভরিয়ে দিল। সে বলেছিল, প্রতিশোধ নিতেই হবে, সেই কারণে সে আমাকে দলের সংগঠনে যোগ দিতে উৎসাহিত করেছিল। আমি যখন মাঝে মাঝে বিমর্ষ হয়ে পড়তাম, সে আমাকে হাসাত। সে আমাকে প্রায়শ বলতো, তুমি যদি প্রতিশোধ নিতে না পার, আমি ঠিক নেব। হায়, সেও শত্রুর হাতে মারা গেল। আমার চিকিৎসা হওয়ার পরই কেবলমাত্র তার বাবার সাথে দেখা করতে পেরেছিলাম। তার আগে পর্যন্ত আমি কারুর সাথে দেখা করেনি।

প্রশ্নঃ সন্দীপের বাবা আপনার সাথে কেমন ব্যবহার করেছিলেন ?
উত্তরঃ সন্দীপের বাবা বলেছিলেন, তুমি আমাদের পুত্রবধূ নও, তুমি আমাদের পুত্র। তুমি আমার পুত্রের জায়গা নিয়েছ। তিনি আমার প্রচুর যত্ন নিয়েছেন।

প্রশ্নঃ আপনার চিকিৎসার ব্যবস্থা কে বা কারা করেছিলেন ?
উত্তরঃ সন্দীপের সঙ্গে থাকার সময় আমি প্রায় অসুস্থই ছিলাম। ইতিমধ্যে আমি পার্টি সংগঠনের সাথে যুক্ত হয়ে পড়েছিলাম। পার্টি সংগঠনই আমার সমস্ত চিকিৎসার ব্যবস্থা করে। এখন আমি সুস্থ এবং সংগঠনের কাজ করছি।

প্রশ্নঃ সন্দীপের শহীদ হওয়ার ঘটনা শুনে আপনার মানসিক অবস্থা কেমন হয়েছিল ?
উত্তরঃ আমরা সবাই মানুষ, সুতরাং আমাদের মানবিক অনুভূতি থাকাটাই স্বাভাবিক। আমারও মানবিক অনুভূতি আছে। যদিও আমি এখন মতাদর্শগতভাবে অনেক পরিণত তবুও স্বাভাবিক মানবিক অনুভূতির কারণেই আমি আঘাত পেয়েছিলাম। ঘটনাটি শোনার পর আমি প্রায় চার-পাঁচ ঘণ্টা অজ্ঞান হয়েছিলাম। মতাদর্শ যখন অনুভূতির চেয়ে বড় হয় তখন এটা বোঝা উচিত সে কেন শহীদ হয়েছে।

প্রশ্নঃ আপনাদের বিয়ে কীভাবে হয়েছিল ?
উত্তরঃ প্রাথমিকভাবে এটা ভালবাসার বিয়ে ছিল, কিন্তু আমার ভাইয়ের অনুমতি নিয়ে প্রথাগতভাবে বিবাহ সম্পন্ন হয়েছিল।

প্রশ্নঃ আপনার মতে আপনার উপর একদিকে গণধর্ষণের আঘাত অপরদিকে শত্রুর দ্বারা আপনার স্বামী শহীদ হওয়ার ঘটনা, এর সমুচিত জবাব কী ?
উত্তরঃ বাস্তবে একমাত্র সঠিক মতাদর্শই এই গভীর আঘাতের বেদনাকে সারিয়ে তুলতে পারে। নেপাল বিপ্লবের জন্য সে সর্বহারা শ্রেণির পক্ষে সর্বদাই লড়াই করে গেছে এবং সেই কারণেই সে তার জীবন দান করেছে। আমার মতে সে ছিল এক মহান ব্যক্তিত্ব। তার আদর্শ এবং ফেলে রাখা রক্তরাঙা পথ ধরে তার বন্দুক তুলে নিয়ে লড়াইয়ের পথে এগিয়ে যেতে পারলেই আমার এই ব্যথা কমবে। অবিরাম বিপ্লবী পথে যুক্ত হয়ে এগিয়ে যেতে পারলেই আমি এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাব। আমি মনে করি আমি সাহসী হয়ে উঠেছি। যদিও আমার কিছু মানসিক দুঃখ আছে তবুও আমি বলতে পারি না যে আমি মতাদর্শগতভাবে উন্নত হব না। আমি আমার জায়গা থেকেই প্রতিশোধ নেব। আমার সিঁদুর শূন্য সিঁথি প্রত্যক্ষ করবে এক প্রভাতী সূর্যের লাল আলো। আমি খুবই আশাবাদী।

প্রশ্নঃ সারা দেশে আপনার মতো বহু নারী যারা এই ধর্ষণের শিকার তাদের উদ্দেশে আপনার বক্তব্য কী ?
উত্তরঃ যারা আমার মতো দলীয় সংগঠনে যুক্ত আছেন তাদের উদ্দেশে আমি বলবো তারা যেন সাময়িক ক্ষয়ক্ষতির জন্য স্বপ্নভঙ্গ হয়ে এগিয়ে যাওয়া থেকে থেমে না যান। আসুন আমরা সবাই সাহসী হই এবং অত্যাচার, শোষণ এবং একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে এগিয়ে যাই। আমরা যেন আমাদের ব্যক্তিগত ক্ষতিকে প্রাধান্য না দিই, দলের বিজয়ের প্রতি লক্ষ্য রাখি। শহীদ পরিবারের লোকজন যারা আজও সংগঠনে যোগদান করেননি তাদের উদ্দেশে বলি যে, যারা দেশ ও জাতির জন্য প্রাণ দিয়েছেন তারা কখনও ভুল পথ গ্রহণ করেননি। ছেলেরা পিতা-মাতার কোলহারা হয়েছে এবং বোনেরা সিঁথির সিঁদুর হারিয়েছে বলে আমরা কখনই আশাহত হব না। শহীদের রক্তের ঋণ আমরা রক্তেই শুধবো। পার্টি আজ বিরাট সাফল্য অর্জন করেছে। আমাদের প্রিয়জনদের রক্তদান বৃথা যায়নি। তাদের আত্মবলিদানের পথ ধরে যেন আমরা এগিয়ে যাই। এইভাবেই আমরা সেইসব শহীদ পরিবারের সম্মুখীন হতে পারি।

সূত্রঃ দেশে দেশে বিপ্লবী নারী সংকলন, বিপ্লবী নারী মুক্তি প্রকাশনা

Advertisements

বুর্জোয়া অধিকারের ভাবধারা থেকে মুক্তি – চ্যাং চুন-চিয়াও

zhang

বুর্জোয়া অধিকারের ভাবধারা থেকে মুক্তি

–   চ্যাং চুন-চিয়াও

(১৯৫৮)

চীনের কমিউনিস্ট পার্টি ও চীন বিপ্লবের ইতিহাস সম্পর্কে যে কারো প্রাথমিক ধারণা আছে তারা সবাই জানেন যে সৈন্যবাহিনী ও জনসাধারণের মধ্যে, অফিসার ও অধঃস্তনদের মধ্যে এবং উচ্চতর স্তর ও নিম্নতর স্তরের মধ্যে সমতা জনসাধারণের বিভিন্ন স্তরের মধ্যে সম্পর্ক রক্ষা (Handling)র ক্ষেত্রে সর্বদাই মৌলিক নীতি হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। চীনা কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বাধীন চীনা গণমুক্তি ফৌজ এবং বিপ্লবী ঘাঁটি এলাকাগুলোতে শ্রমিক ও কৃষকদের সৈন্যবাহিনীর অস্তিত্ব থেকে অস্টম রুট বাহিনী, নয়া চতুর্থ বাহিনী ও Zhang_Chunqiaoপিএলএর জন্ম পর্যন্ত এবং চিঙকাংশান থেকে মুক্ত এলাকাগুলো পর্যন্ত সকল বিপ্লবী ঘাঁটি এলাকাগুলো এই নীতি সর্বদাই দেখেছে। কমরেড মাও সেতুঙের প্রতক্ষ্য নেতৃত্বে চিঙকাঙশানের বিপ্লবী ঘাঁটি এলাকায় এই নীতি প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সিসিপি কেন্দ্রিয় কমিটির প্রতি রিপোর্টে (“চিংকাঙশানে সংগ্রাম”) কমরেড মাও সেতুঙ লেখেনঃ

লাল ফৌজের সৈন্যদের অধিকাংশই এসেছে বেতন ভোগী সৈন্যবাহিনী থেকে, কিন্তু লাল ফৌজে এসে এদের চরিত্র বদলেছে। সর্বাগ্রে লাল ফৌজ বেতন দেওয়ার প্রথার বিলোপ ঘটিয়েছে এই অনুভূতি জাগিয়ে যে তারা নিজেদের জন্য ও জনসাধারণের জন্য সংগ্রাম করছে, অন্য কারো জন্য নয়। তখন থেকে লাল ফৌজে নিয়মিত বেতন দেওয়ার ব্যবস্থা নেই বরং শস্য, রান্নাবান্নার তেল, লবণ, জ্বালানী কাঠের জন্য টাকা ও শাক শব্জি এবং সামান্য পকেট খরচ ইস্যু করা হয়…

হুনান প্রাদেশিক কমিটি সৈনিকদের বৈষয়িক অবস্থার দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে এবং একজন গড়পরতা শ্রমিক অথবা কৃষকের চেয়ে অন্ততঃ কিছুটা ভাল করার আহ্বান জানায়। প্রকৃতপক্ষে তা আরও খারাপ। শস্যের সাথে সাথে প্রত্যেকে রান্না করার তেল, লবণ, জ্বালানী কাঠ ও শাকশব্জীর জন্য পাঁচ সেন্ট এক দিনের জন্য পায়, আর এমনকি এটাও বজায় রাখা কঠিণ। অত্যধিক শীতেও আমাদের অনেক সৈনিকই এখনও কেবল দুই স্তরের পাতলা পোশাক পড়ছেন। সৌভাগ্যবশতঃ আমরা কঠোর জীবন যাপনে অভ্যস্ত। তার চেয়ে বেশী, আমাদের সকলে একই কঠোর জীবন যাপনের অংশীদার; কমান্ডার থেকে শুরু করে সকলে শস্যের পাশাপাশি রান্নার জন্য পাঁচ সেন্টের খাদ্য ভাতা পান।

পার্টির পালিত ভূমিকার পাশাপাশি যে কারণে লাল ফৌজ দরিদ্র বৈষয়িক অবস্থা এবং ঘন ঘন এমন গণতন্ত্রের অনুশীলন সত্ত্বেও এগিয়ে যেতে পেরেছে তা হল  অফিসাররা সৈনিকদের প্রহার করেনা; অফিসার ও সৈন্যরা সমান ব্যবহার পান; সৈন্যরা মুক্তভাবে সভা করতে ও কথা বলতে পারেন; তুচ্ছ আনুষ্ঠানিকতা বিলোপ করা হয়েছে; এবং হিসাব সবার কাছে উন্মুক্ত খতিয়ে দেখার জন্য। সৈন্যরা মেস ব্যবস্থা পরিচালনা করে এবং রান্না বান্নার তেল, লবণ, জ্বালানী কাঠ ও শাক শব্জির জন্য দৈনিক বরাদ্দ পাঁচ সেন্টের মধ্যে প্রত্যেকে প্রতিদিন প্রায় ছয় থেকে সাত পয়সা বাঁচিয়ে ফেলতে পারে পকেট খরচার জন্য যাকে বলে “মেস সঞ্চয়’। এসকলই সৈন্যদের বিরাট তুষ্টি প্রদান করে। নির্দিষ্টভাবে নতুন বন্দী সৈন্যরা অনুভব করে  যে আমাদের বাহিনী আর কুও মিনতাঙ বাহিনীর মধ্যে বিরাট ব্যবধান। তারা আত্মিকভাবে মুক্ত মনে করে যদিও লাল ফৌজের বৈষয়িক অবস্থা শ্বেত ফৌজের সমান নয়। শ্বেত বাহিনীতে গতকাল যেসকল সৈনিকের কোন সাহস ছিলনা আজকে লাল ফৌজে তারা খুব সাহসী; গণতন্ত্রের ফলাফল হচ্ছে এমনই। লাল ফৌজ হচ্ছে সেই চুল্লী যাতে সকল বন্দী সৈনিকেরা রূপান্তরিত হয় যখনই তারা আসে। চীনে জনসাধারণের যতখানি দরকার ঠিক ততখানিই সৈন্যবাহিনীরও গণতন্ত্র দরকার। সামন্ততান্ত্রিক ভাঁড়াটে সৈন্যদলকে খাঁটো করতে আমাদের সৈন্যবাহিনীতে গণতন্ত্র হচ্ছে একটা অস্ত্র।

আমরা যেমনটা জানি, এইসব মার্কসবাদী-লেনিনবাদী ও কমিউনিস্ট সম্পর্কসমূহ বিপ্লবী ঘাঁটি এলাকায় সম্পর্কের একটা উদাহারণ স্থাপন করে। সমতার এই কমরেডসুলভ সম্পর্ক বজায় রাখা হয়েছে সৈন্যবাহিনী ও জনসাধারণের মধ্যে, সৈন্যবাহিনী ও সরকারের মধ্যে, ক্যাডারদের মধ্যে, এবং উচ্চতর স্তর ও নিম্নতর স্তরসমূহের মধ্যে। তারা সম্পর্ক পরিচালনা করেছে অস্ত্র ও ক্ষমতার বলে নয়; বরং বোঝানো ও সত্যকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরার মাধ্যমে। গণমুক্তি বাহিনীর মতো বিপ্লবী ঘাঁটি এলাকার জনগণও একে অপরের সাথে সম্পর্ক পরিচালনা করেছে। অন্য এলাকার থেকে আসা জনগণ মুক্ত এলাকাসমূহে আসা মাত্র খুঁজে পায় যে অভ্যন্তরীণ সম্পর্ক যথাযথভঅবে পরিচালনা করার মাধ্যমে মুক্ত এলাকাসমূহের সকল জনগণ কঠিণ জীবন যাপন করার পাশাপাশি “সৌভাগ্যতঃ একই কঠোর জীবন যাপনের অংশীদার হয়েছিল”। সকলে এক সরবরাহ প্রথায় জীবন যাপন করছিল যা ছিল কমিউনিস্ট চরিত্রের। যদিও কাজের প্রয়োজনীয়তার কারণে জীবন যাপন মানে বিভিন্নতা ছিল কিন্তু পার্থক্য ব্যাপক ছিলনা। রাজনীতি ও গণলাইন সর্বত্র কর্তৃত্ব করেছে, এই কারণে শ্রমিক, কৃষক, সৈনিক, ছাত্র ও ব্যবসায়ীরা একই পরিবারের সদস্যদের মতো ঐক্যবদ্ধ ছিল; তারা শত্রুর বিরুদ্ধে কঠিণ লড়াই চালিয়েছে। আপনাদের কি এখনো মনে আছে বৃহত সৈন্যবাহিনীর সৈনিকেরা মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে কীভাবে লড়াই করেছে? গণমুক্তি বাহিনীকে সমর্থন করতে লক্ষ লক্ষ মিলিশিয়া সদস্য সৈন্যবাহিনীকে অনুসরণ করে দক্ষিণে তাদের অগ্রগমণে। সৈন্যবাহিনীর মতো একই সামরিক কমিউনিজমের জীবন তারা যাপন করে। তারা কর্তপক্ষ অথবা ধনী হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেনি। মজুরীর কোন ভাবধারা, “টুকরো মজুরী” তো দূরের কথা, তাদের মনে আসেনি। বিপ্লবে তারা যোগদান করতে এসেছে নিজেদের খাদ্য সাথে করে নিয়ে এসে। তাদের লক্ষ্য ছিল তিন প্রধান শত্রুকে উচ্ছেদ করা আর সমগ্র দেশকে মুক্ত করা।

বিপ্লবী ঘাঁটি এলাকাসমূহে, পুরুষ ও নারীরা, প্রবীণ ও নবীনরা এবং অগ্রভাগ ও পশ্চাদভাগ একই অন্তকরণ নিয়ে লড়াকু দল গঠণ করেছিল। সুসংহতভাবে এটা ছিল সামরিক কমিউনিজম যা মার্কসবাদী-লেনিনবাদী চিন্তা ও কাজের স্টাইলকে চিহ্নিত করে। মাও সেতুঙের চিন্তা ও কাজের স্টাইল লক্ষকোটি জনের মধ্যে শিকড় গাড়ল, প্রস্ফুটিত হল ও ফল দিল। কমিউনিজমের অস্ত্রে সজ্জিত আর যুদ্ধে পোড় খাওয়া সৈন্যবাহিনী ও জনগণ ছিল অপরাজেয়। চীনা বিপ্লবের ইতিহাস কি একে সম্পূর্ণভাবে জন্ম দেয়নি?

দেশব্যাপী মুক্তি অর্জনের পরেও, “সরবরাহ প্রথা”র দ্বারা চিহ্নিত সামরিক কমিউনিজমের এই জীবন ছিল খুবই জনপ্রিয়। “সরবরাহ প্রথা”য় সবাই গর্বিত হত কেননা এটা পুরোনো বিপ্লব ও কঠিন সংগ্রাম দ্বারা চিহ্নিত ছিল। কিছু বিপ্লবী তরুণও “সরবরাহ প্রথা” কামনা করেছিল যখন তারা প্রথম বিপ্লবে যোগ দেয়। তারা এটা দেখাতে চেয়েছিল যে পুরোনো কমরেডদের মতো তারাও বিপ্লবে আন্তরিকভাবে অংশ নিয়েছে। সরবরাহ প্রথার জীবনে যারা অভ্যস্ত ছিল তারা মজুরী প্রথার প্রতি লোভ করেনি। জীবনের এই প্রথা যা সমতার সম্পর্ক প্রদর্শন করেছে, তা তাদের কাছে জনপ্রিয় ছিল। কিন্তু অল্প কিছুকাল পরেই জীবনের এই প্রথা বুর্জোয়া অধিকারের ভাবধারার দ্বারা আক্রান্ত হল। বুর্জোয়া অধিকারের ভাবধারার শাঁস নিহিত রয়েছে অভিজাততন্ত্রে (Hierarchy)। বুর্জোয়া অধিকার-এর ভাবধারায় সিক্ত লোকজনের দৃষ্টিতে সরবরাহ প্রথা ছিল অনাকাঙ্খিত। তারা একে “গ্রামীণ কাজের স্টাইল” এবং “গেরিলা অভ্যাস” হিসেবে দেখেছে। বুর্জোয়াদের দ্বারা আনীত এমন বক্তব্যে আশ্চর্য কিছূ ছিলনা। কিন্তু শীঘ্রই বেশ কিছু পার্টি ক্যাডার এই ভাবধারার প্রভাবে পড়লো। তাদের মধ্যে শোনা গেল সরবরাহ প্রথার অধিক দোষত্রুটি ও সমালোচনা আর মজুরী প্রথার অধিক গুণাগুণ। এভাবে, “সরবরাহ প্রথা” প্রায় একটা খারাপ সূত্রে পরিণত হলো। কাজে উতসাহ উদ্দীপনার অভাবকে সরবরাহ প্রথার ওপর আরোপ করা হল। সরবরাহ প্রথার দোষত্রুটির  ওপর একটা দাপ্তরিক খাম আরোপ করা হল। কারখানা ও গুদামের দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক ক্ষতিকে আবারো সবররাহ প্রথার দোষত্রুটির ওপর আরোপ করা হল।  এক কথায়, যে কমিউনিস্ট সরবরাহ প্রথা চীন বিপ্লবের বিজয় নিশ্চিত করেছিল তাকে কিছু লোক মারাত্মক আক্রমণাত্মক নিন্দা জানালো যাকে অতি অবশ্যই শাস্তি দিতে হবে।

সরবরাহ প্রথার বিরুদ্ধে প্রধান যুক্তি হল যে এটা উতপাদনে উতসাহ উদ্দীপনা জাগাতে পারেনা। এর তাত্ত্বিক ভিত্তি হচ্ছে অর্থনীতিবাদীদের দ্বারা জোর দেওয়া “বৈষয়িক স্বার্থের নীতিমালা”। বলা হচ্ছে যে সামাজিক ব্যবস্থার অধীনে যেহেতু পুরোনো শ্রম বিভাজন এখনো অস্তিত্বমান, অর্থাত মানসিক ও শারিরীক শ্রমের মধ্যে, শ্রমিক ও কৃষকের মধ্যে এবং দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমের মধ্যে কিছু পার্থক্য যেহেতু এখনো বিরাজমান, শ্রমিকদের বৈষয়িক স্বার্থের মাধ্যমে উতপাদন বিকাশের নীতিকে একটা চমতকার নীতি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। বলা হচ্ছে যে “মজুরী স্কেল” ও “টুকরো মজুরী” শ্রমিকদের উদ্দীপনা জাগাতে পারে তাদের শ্রমের ফলে সর্বাধিক স্বার্থ দেখাতে এবং “সমাজতান্ত্রিক প্রতিযোগিতা”র উদ্দীপনা জাগায় কারণ উচ্চতর শ্রম উতপাদনশীলতা উচ্চতর মজুরী দাবী করে। বলা হচ্ছে যে এই প্রথা হচ্ছে “সামগ্রিকভাবে জাতীয় অর্থনীতির বৃদ্ধিতে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।” এই যুক্তি খুবই বিশ্বাসযোগ্য মনে হলেও জনপ্রিয় ভাষায় পুরোনো প্রবাদটির মতো সংক্ষেপিত “টাকায় কথা বলে”। যদি উচ্চ মজুরী ব্যবহার করা হয় “উদ্দীপনা” জাগাতে, তাহলে সমাজতন্ত্র ও কমিউনিজমকে এক পিস্ চকোলেটের মতো কেনা যাবে।

এমন একটা তত্ত্বের ব্যাপারে আমাদের কি বলার আছে?

যখন সরবরাহ প্রথা বলবত ছিল লক্ষ কোটি জনগণ কয়েক দশক ধরে সশস্ত্র সংগ্রাম চালিয়েছে, তুষারাবৃত পর্বতদেশে আরোহন করেছে, তৃণভুমি অতিক্রম করেছে এবং ২৫,০০০ লি লঙ মার্চ করেছে। সে সময় কেই বা মজুরী নিয়েছে? এটা কি বলা যাবে যে জাপ-বিরোধী যুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধ এবং মার্কিনকে প্রতিরোধ কর ও কোরিয়াকে সাহায্য কর যুদ্ধে বিজয় মজুরীর উদ্দীপনায় হয়েছিল? প্রতিটি কমিউনিস্ট মনোভাবাপন্ন ব্যক্তি অপমান বোধ করেন এমন যুক্তি শুনে। নির্মাণ কাজের কথা ধরুন। মূর্তভাবে শ্রমিকরাই, যারা উক্ত অর্থনীতিবাদীদের ভাষ্যমতে মজুরী স্তর নিয়ে সর্বাধিক উদ্বিগ্ন, মৌলিকভাবে বিপরীত মত প্রকাশ করেন। সাংহাই শ্রমিকরা লড়াই করে, প্রস্ফুটিত করে এবং বিতর্ক করে “রাজনীতিকে কমান্ডার করার বদলে অর্থকে কমান্ডার করার” এই তত্ত্ব ও মানদন্ডের বক্তব্যের উন্মোচন করেন। এই কথাগুলি ষাড়ের চোখে আঘাত করে। অবশ্যই আমরা অস্বীকার করিনা যে কমিউনিজমের প্রাথমিক পর্যায়ে সমাজতান্ত্রিক সমাজ এখনো পুরোনো সমাজের অর্থনৈতিক, নৈতিক ও মতাদর্শিক চিহ্ন বহন করে যার ওপর এটা জন্ম নিয়েছিল, যেমনটা কার্ল মার্কস কর্তৃক “গোথা কর্মসূচির সমালোচনা”য় বিবৃত হয়েছে এবং “বুর্জোয়া অধিকার”-এর বৈষম্য একবারেই বিলোপ করা যায়না। আমরা স্বীকার করি যে এই স্তরে আমরা কেবল দেখতে পারি “প্রত্যেকে দেবে সাধ্যমত, প্রত্যেকে নেবে শ্রম অনুযায়ী” নীতি, “প্রত্যেকে দেবে সাধ্যমত, প্রত্যেকে নেবে প্রয়োজনুযায়ী” নীতি নয়। কিন্তু মার্কস কি আমাদের একথা বলেছেন যে বুর্জোয়া অধিকার ও বৈষম্যের বুর্জোয়া অভিজাততন্ত্রকে ধ্বংস করা যাবেনা বরং সুসংহত করতে হবে ও বিকশিত করতে হবে? তিনি কি বলেননি যে “বৈষয়িক স্বার্থ”-র নীতিমালাকে কেবল আংশিকভাবে জোর দিতে হবে এবং কমিউনিস্ট শিক্ষাকে রাজনৈতিকভাবে, মতাদর্শিকভাবে ও নৈতিকভাবে প্রবল করতে হবে বুর্জোয়া অধিকারকে ভেঙে দিতে? এটা কেবল মার্কস নিজে অন্য কেউ নয়, এই প্রশ্নের উত্তর দেন। তাঁর “ফ্রান্সে শ্রেণী সংগ্রাম”- এ প্যারী কমিউনের অভিজ্ঞতার সার সংকলন করে তিনি প্যারী কমিউনের বীরদের গৃহীত ব্যবস্থার প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেনঃ “কমিউনের সদস্য থেকে নীচের দিকে পাবলিক সার্ভিসকে মেহনতীদের মজুরীতে কাজ করতে হয়েছে। সুদী কারবার ও রাষ্ট্রের উচ্চপদস্থদের ভাতা উচ্চপদস্থদের সমেত বিলুপ্ত করা হয়েছিল।” ভালভাবে লক্ষ্য করুন, বিশ্বে সর্বহারা শ্রেণীর প্রথম কমিউনের গৃহীত বিপ্লবী প্রথা প্যারী কমিউন সুনির্দিষ্টভাবে বুর্জোয়া অভিজাততন্ত্র ধ্বংস করেছিল এবং বৈষয়িক স্বার্থের নীতির বিলোপ করেছিল। এটা কি বলা যায় যে এই অভিজ্ঞতায় জোর দেওয়ার সময় মার্কস এবং পরে এঙ্গেলস ও লেনিন বুর্জোয়া অধিকারের কথা ভুলে গেছিলেন? এভাবে, মার্কস, এঙ্গেলস ও লেনিন সেইসব অর্থনীতিবাদীদের সেবায় নিয়োযিত হননা যারা বিশ্বাস করেন যে “টাকায় কথা বলে”। বিপরীতে লেনিন আক্রমণাত্মকভাবে বলেন, “রাষ্ট্র ও বিপ্লব”-এঃ “নির্দিষ্টভাবে এই মূর্ত বিষয়েই, রাষ্ট্রের সমস্যা নিয়ে যতদূর চিন্তা করা যায় তাতে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্ভবত, এই যে, মার্কসের চিন্তাকে সর্বাধিক পূর্ণভাবে অগ্রাহ্য করা হয়েছে।” এই অভিজ্ঞতার প্রতি দৃষ্টিপাতে, অনেক লোক একে “সেকেলে ও সরল” আখ্যা দেয়। যারা প্রকাশ্যে সরবরাহ প্রথার বিরুদ্ধে বক্তব্য দেয় ও টাকাকে কমান্ডে রাখতে চায়, তারা কি এও বলেনি যে সরবরাহ প্রথা হচ্ছে “গেরিলা স্টাইল” এবং “গ্রাম্য স্বভাব” এবং “সেকেলে”? তারাওকি মার্কসের শিক্ষাকে সম্পূর্ণভাবে ভুলে যায়নি?

অতীতের বছরগুলোর অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে “সরবরাহ প্রথা”, “গ্রামীণ স্টাইল” এবং “গেরিলা অভ্যাস”-এর ওপর আক্রমণ প্রকৃতপক্ষে সর্বহারা শ্রেণীর বিপ্লবী ট্রাডিশনের ওপর এবং সমতার ভিত্তিতে শ্রমজীবি জনগণের মধ্যকার সম্পর্ক যথাযথভাবে পরিচালনার কমিউনিস্ট নীতির ওপর আক্রমণ এবং প্রকৃতপক্ষে বৈষম্যের বুর্জোয়া অধিকারকে রক্ষার পরিকল্পনায় রচিত। সকল শোষক ও নিপীড়ক শ্রেণীসমূহ এক কঠিণ অভিজাতন্ত্র রক্ষা করে। এই কল্পকাহিনী রচনা করতে তারা দ্বিধা করেনা যে তারা “জন্মগতভাবে মানবজাতির প্রভু”। চিয়াং কাইশেক নির্লজ্জভাবে দাবী করেছিল তার “চীনের নিয়তি” তে যে সে ছিল ওয়েন ওয়াংয়ের বংশধর। একটা জীবনীচিত্র দাবী করে যে সে হচ্ছে ওয়েন ওয়াংয়ের একজন পুত্র এবং ডিউক চৌ-এর বংশধর। শিয়াও লিন কুয়াং চি তে এই গল্প একটা স্থান দাবী করে কিন্তু এটা আরো দেখায় যে চিয়াং কাইশেক ও তার গং কতটা দুশ্চিন্তাগ্রস্থ ছিল নিজেদের “সর্বোচ্চ” চীনা হিসেবে দেখাতে। সাংহাই মুতসুদ্দিরা “উচ্চশ্রেণী চীনা” হওয়াতে গর্ববোধ করতো। আহ কিউ বলেন যে “আমি পুরোনো জনাব চাওয়ের সমগোত্রীয়” এবং জনাব চাও তার গালে একটা চড় বসিয়ে দিয়ে বলেনঃ “তোমার বংশীয় নাম চাও হয় কিভাবে!” প্রাচীনকালে সামাজিক প্রতিপত্তি ছিল সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ এবং শ্রেণী ছিল সর্বাংশে গুরুত্বপূর্ণ। সবকিছু মালিকানা সত্ত্ব দ্বারা পরিচালিত ছিলঃ যা ছিল “মালিকানা সত্ত্ব” তা ছিল বৈধ। বুর্জোয়া অধিকার সর্বত্র পরিলক্ষিত হয়। যেসব লোকেরা সরবরাহ প্রথাকে এই ভিত্তিতে আক্রমণ করে যে এটা উতপাদনে উতসাহ জাগায়না images12তারা প্রকৃতপক্ষে সমতার সর্বহারা সম্পর্কের স্থলে বুর্জোয়া অভিজাততন্ত্রের “মালিকানা সত্ত্ব” বসাতে চায়। তাদের অনুসারে, এটা উতপাদনে উতসাহ উদ্দীপনা জাগাবে। বাস্তবে কি এটাই ঘটনা? সরবরাহ প্রথার ওপর আক্রমণের ফলশ্রুতিতে অতীতে যে জীবনযাত্রার মধ্যে বেশী পার্থক্য দেখা যায়নি তা আমাদের পার্টি ক্যাডারদের মধ্যে পরিবর্তিত হয়ে যায় এবং যারা কঠোর জীবন যাপনে অভ্যস্ত ছিলনা দ্রুতই ভদ্রলোকী, উচ্চ শ্রেণী চীনা ও পুরোনো জনাব চাওয়ের আচার ব্যবহার শিখে ফেললো। কিছু ক্যাডার দুঃখিত হন যখন তাদের “মাথা” হিসেবে সম্বোধন করা হয়না। এটা সত্যিই কিছূ একটার উদ্দীপনা জাগায়। কিন্তু এটা উতপাদন উদ্দীপনা জাগায়না বরং খ্যাতি ও সম্পদের জন্য লড়ার উদ্দীপনা জাগায়। এটা আবর্জনা জাগিয়ে তোলে। এটা জনগণ থেকে বিচ্ছিন্নতা জাগায়। কিছূ উপাদান শীঘ্রই বুর্জোয়া দক্ষিণপন্থী ও দুর্নীতিগ্রস্থ উপাদানে অধঃপতিত হয়। কিছু ব্যক্তি এই মত প্রকাশ করেছিল যে সরবরাহ প্রথা আলস্যকে উতসাহিত করবে। এটা প্রমাণিত হয়েছে যে বিপরীত হচ্ছে ঘটনাঃ অভিজাততন্ত্র আলস্যকে উতসাহিত করেছে। কিছু ক্যাডার স্রেফ এক ঘন্টা অতিরিক্ত শ্রম দেয়ার পর অতিরিক্ত বেতন আশা করে। সরবরাহ প্রথার অধীনে বিপ্লবী যুদ্ধে যারা সবকিছু উতসর্গ করেছিলেন, এমনকি তাদের জীবন, তারা কি বেতন দাবী করেছিল? এর চেয়ে মারাত্মক যা তা হচ্ছে এই অভ্যাস গড়ে ওঠার পর ক্যাডার ও মেহনতী জনগণের মধ্যে সম্পর্ক পরিবর্তিত হয়েছে, “তিন প্রবণতা” এবং “পাঁচ অহংকার” নেতৃত্বস্থানীয় ক্যাডারদের মধ্যে গড়ে ওঠেছে। কিছূ লোক পুরোপুরিভাবে এই শিক্ষা ভূলে গেছে যে রাজনীতিকে অবশ্যই কমান্ডে থাকতে হবে; অন্যদের সাথে অবশ্যই সমতা অনুশীলন করতে হবে, জনগণকে বুঝিয়ে আস্থা অর্জন করতে হবে, বলপ্রয়োগে নয়, এবং তাদেরকে জনগণের একজন হতে হবে। তারা এপর্যন্ত এগোয় যে যখন পার্টি কেন্দ্র জনগণের মধ্যে দ্বন্দ্বের মীমাংসা সম্পর্কে নির্দেশনা ইস্যু করলো তারা প্রতিরোধ করলো।

এর একটা পুনসংগ্রহ প্রত্যেকের জন্য গভীর শিক্ষাগত তাতপর্যসম্পন্ন। এই প্রক্রিয়ায় আমরা প্রয়োজনীয় শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি, যদিও আমরা ঠিক এই জিনিস সমর্থন করিনা ও বিরোধিতা করি এবং এমনকি যদিও আমরা বিভিন্ন প্রভাব দ্বারা আক্রান্ত।

পার্টির ট্রাডিশন হচ্ছে মার্কসবাদী-লেনিনবাদী এবং তা আমাদের পার্টি ক্যাডার ও জনগণের মধ্যে গভীরভাবে শিকর-প্রথিত। যদিও তা বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে, তা পুনপ্রতিষ্ঠা করা ততটা কঠিন নয়। এখন পার্টি কেন্দ্র ও কমরেড মাও সেতুঙের আহ্বাণে এবং শুদ্ধি অভিযানের মাধ্যমে এই ট্রাডিশন পুনপ্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। কিন্তু আমরা এখনো বলতে পারিনা যে এটা পুরোপুরিভাবে পুনপ্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। অধিকারের বুর্জোয়া ভাবধারা ও কুওমিনতাঙ কর্তৃপক্ষীয় অহংকার এখনো জনগণের মধ্যে অনুভূত হচ্ছে। কিছু লোক এখনো জনগণের মধ্যেকার দ্বন্দ্বের সঠিক মীমাংসার কর্মনীতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ চালিয়ে যাচ্ছে। এখনও আমরা দীর্ঘ ও পুনরাবৃত্তিময় সংগ্রামের মোকাবেলা করছি। কিন্তু আন্তঃসম্পর্কসমূহের পুনস্থাপনে মহান অগ্রগামী উলম্ফণের জন্য পরিস্থিতি আমাদের কাছে যতখানি অগ্রগামী উলম্ফণ দাবী করে, কমিউনিস্ট আদর্শে নিবেদিত সকল কমরেড নিশ্চিতভাবে আন্দোলনের সম্মুখসারিতে দাঁড়াতে সমর্থ হবে এবং নতুন পরিস্থিতির অধীনে আমাদের পার্টির চমতকার ট্রাডিশন পুনপ্রতিষ্ঠা ও বিকশিত করতে সক্ষম হবেন। নিশ্চিতভাবে তারা বুর্জোয়া অধিকারের ভাবধারা ভেঙে বেড়িয়ে আসতে সক্ষম হবেন, জনসাধারণের সাথে সমতার সম্পর্ককে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবেন, একটা ঐক্যবদ্ধ নিবিড় একক গঠণ করতে সক্ষম হবেন, একত্রে বসবাস ও কাজ করতে সক্ষম হবেন এবং সমাজতন্ত্র ও কমিউনিজমের জন্য একই সাধারণ সংগ্রাম করতে সক্ষম হবেন। এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ থাকতে পারে কি?


বুর্জোয়াদের বিশ্বকাপ

Brazil-v-Argentina

বুর্জোয়াদের বিশ্বকাপ

(জুলাই, ’৯০)

বিশ্বজুড়ে বিশ্বকাপের উন্মাদনা এখন থিতিয়ে এলেও বিশ্বকাপ নিয়ে পর্যালোচনা শেষ হয়নি। এদেশের জনগণের মধ্যেও এর রেশ এখনো কিছুটা রয়েছে। কঠোর জীবন সংগ্রামের সম্মুখীন ব্যাপক জনগণ রেফারীর ন্যায়-অন্যায় আলোচনা নিয়ে এ পর্যায় যখন সমাপ্ত করে আনছেন, তখন এদেশের বুর্জোয়াশ্রেণীর একাংশ ম্যারাডোনাকে এদেশে আনার প্রচার দিয়ে বিগত হয়ে যাওয়া উন্মাদনাকে চাঙ্গা করতে নতুন প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। জনগণ খেলাধুলা, শিল্প, সঙ্গীত নিয়ে মেতে ওঠেন, কারণ এগুলো তারা ভালবাসেন এবং এগুলো জীবনেরই প্রয়োজন। সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা ফুটবলকে নিয়ে মানুষ মেতে উঠবেন এটাও অসঙ্গত নয়। সাম্রাজ্যবাদী ও বুর্জোয়ারা এটা জানে বলেই আর সবকিছুর মত খেলাধুলাকেও তারা শ্রেণীর উর্ধ্বে বলে প্রচার করে তাদের নিজস্ব ধারায় জনগণকে চালিত করার চেষ্টা চালায়- যাতে সেটা বুর্জোয়া ব্যবস্থার পক্ষেই কাজ করে।
ক্রীড়া শৈলী, প্রযুক্তি, বিজ্ঞান, সুর, ছন্দ- এসবের নিজস্ব শ্রেণীচরিত্র নেই, যেমন সাহিত্য, শিল্প, রাজনীতি, অর্থনীতি- এসবের শ্রেণীচরিত্র রয়েছে। কিন্তু প্রথমোক্তগুলো কোনক্রমেই শ্রেণীর উর্ধ্বে নয়, কারণ ওগুলো প্রতিটি শ্রেণীই ব্যবহার করে তার মত করে, নিজস্ব শ্রেণী আধারে। তাই, শ্রেণী উর্ধ্ব বস্তুগত সত্য বা সকল মানুষের বস্তুগত প্রয়োজনগুলোও শ্রেণীচরিত্র ধারণ করে এই শ্রেণী বিভক্ত বিশ্ব ব্যবস্থায়, আমাদের এই সমাজে। বিশ্বকাপের ঘটনাবলী তা আবারো স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে গেল।
আমাদের দেশেও বিশ্বকাপ উন্মাদনার পাশাপাশি কেউ কেউ বিশ্বকাপ নিয়ে রাজনীতির নিন্দা করেছেন ও করছেন (যেমন- মন্ত্রী জাফর ইমামরা ম্যারাডোনাকে এদেশে এনে জনপ্রিয়তা পেতে চায়), কেউ কেউ বিশ্বকাপের বিশাল খরচেরও সমালোচনা করেছেন। কিন্তু এগুলো একতরফা ও ভাসাভাসা সমালোচনায় পর্যবসিত হতে পারে। খেলাধুলা, আমোদ-প্রমোদের জন্য সর্বহারা শ্রেণী অর্থ ব্যয় করবে না তা-তো নয়ই, বরং বুর্জোয়াদের চেয়ে অনেক ব্যাপক পরিসরেই তা করবে। সুতরাং জনগণের শ্রমঘণ্টার অপচয় অথবা অর্থ ব্যয়- শুধু এভাবেই বিষয়টাকে সমালোচনা করলে চলবে না। দেখতে হবে এই খরচটা হচ্ছে কীসের জন্য? এবং কোন শ্রেণী ও কোন দিকগুলো এতে লাভবান ও শক্তিশালী হচ্ছে? নতুবা সর্বহারা শ্রেণীকে বুর্জোয়ারা ঐ “দরিদ্র থাকার ব্যবস্থা” হিসেবে যেভাবে অপপ্রচারণা করে থাকে তাতেই আরো শক্তি যোগান দেয়া হবে।
এটা ঠিক যে, চরম দারিদ্র পীড়িত ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের এ বিশ্বে বিশ্বকাপ নিয়ে এই এলাহী কারবার, প্রায় এক হাজার কোটি ডলারের খরচ (বাংলাদেশের প্রায় ৫ বছরের বাজেটের সমান অর্থ), সেই সূত্রে আমাদের দেশেও লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ, জনগণের অর্থের এই অপচয়- যখন এ দেশে ৮০% কৃষক-শ্রমিক নিয়মিত দু’মুঠো ভাত পান না, তাকে আমাদের অবশ্যই কঠোর সমালোচনা করতে হবে। তবে এর সাথে আরো বিষয়ের উন্মোচন বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এদেশে বিশ্বকাপ নিয়ে উন্মাদনায় ভুগছে কারা? এদেশের ৯০% শ্রমিক বা কৃষক সাধারণভাবে এ উন্মাদনায় ভোগার মত মানসিক, শারীরিক, সাংস্কৃতিক, আর্থিক ও পরিবেশগত পরিস্থিতিতে নেই।
একজন গার্মেন্টস শ্রমিক কর্মক্ষেত্রে দুইবারের বেশি তিনবার প্রস্রাব করতে গেলে কর্তৃপক্ষের ধমক খান, একজন রিক্সা শ্রমিক বা কৃষক সারাদিন অমানুষিক শ্রম করার পর অপর্যাপ্ত খাবার খেয়ে রাতে মরার মত ঘুমাতে বাধ্য- সেখানে রাত ৯টা থেকে ভোর ৩টা পর্যন্ত বিশ্বকাপের এই প্রদর্শনী কাদের জন্য? সুতরাং এই অর্থ খরচ হচ্ছে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তের জন্যই- এটা খুবই স্পষ্ট। কেন তবে একজন শ্রমিক বা একজন কৃষক এই “আনন্দোৎসব”-কে সহজভাবে মেনে নেবেন?
আমাদের শাসক শ্রেণী নিছক তাদের সুবিধা ও প্রত্যক্ষ আনন্দেই এইসবের মহা আয়োজন করেছে তা নয়। তারা এই উন্মাদনা সৃষ্টি করে অত্যন্ত সচেতন রাজনৈতিক উদ্দেশে- যেমন তাদের প্রভুরা, সাম্রাজ্যবাদীরাও বিশ্বকাপের আসর বসায় তাদের শ্রেণীর প্রত্যক্ষ আনন্দ ছাড়াও সচেতন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবেই। এর মূল দিকটা হচ্ছে ব্যাপক শোষিত, নিপীড়িত জনগণকে তাদের জরুরী গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক চেতনা থেকে সরিয়ে অন্য কিছুতে ভুলিয়ে রাখা। জনগণ বিশ্বকাপ নিয়ে মেতে থাকুক, এজন্য যত টাকা ঢালা দরকার সরকার ঢালবেন, আর এই ফাঁকে তারা তাদের বাজেট ও এ জাতীয় সব অপকর্ম বিনা বাধায় পার করে নেবেন- এটাই তাদের উদ্দেশ্য, এবং সাম্রাজ্যবাদীদেরও উদ্দেশ্য এটাই।
এই চক্রান্তটা সারা বিশ্বজুড়ে সাম্রাজ্যবাদীরা ও তাদের দালালরা আজ চালাচ্ছে- আজ খেলা, কাল সিনেমা, পরশু যৌন আবেদন, তারপরে ক্রাইম- ইত্যাদি সব বিষয়ে জনগণকে মাতিয়ে রাখতে পারলেই তাদের লাভ। তাহলে নির্বিঘ্নে তাদের শোষণ কর্মটা চালিয়ে যাওয়া যাবে। আসলে অর্থনীতি-রাজনীতির মত খেলাধুলা-শিল্প-জনসেবা ইত্যাদি প্রতিটি ক্ষেত্রেও বুর্জোয়া লাইন কাজ করে, কিন্তু তাকে উদ্ঘাটন করা কঠিন। বিশেষত ব্যাপক মানুষ এসব ক্ষেত্রে বুর্জোয়া মূল্যবোধই ধারণ করে থাকেন এবং হালকা আবেগ ও তাড়নায় তারা ভেসে যান, যতক্ষণ পর্যন্ত বিপ্লবী রাজনীতিক সচেতনতা তাদেরকে সঠিক পথটা না দেখায়। তাই বিশ্বজুড়ে বুর্জোয়ারা আজ এগুলোই জনগণের সামনে তুলে ধরছে। এসব ক্ষেত্রে কিছু ব্যক্তিকে ষ্টার বানিয়ে মানুষকে ঐসব ষ্টারের ভক্ত বানানো এবং মানুষের মাঝে ঐ জাতীয় ষ্টার হবার আকাংখা গড়ে তোলাটাই বুর্জোয়াদের কাজ। বুর্জোয়ারা আজ এটা করছে এ কারণেই যে, তাদের রাজনীতি, তাদের সামাজিক আদর্শ, তাদের নেতৃত্বরা আজ ঘৃণীত, উন্মোচিত ও পরিত্যক্ত, অথবা মানুষের আগ্রহ টানতে তারা অসমর্থ- এটা তারা জানে। আর তাই এদেশেও মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্তের ঘরে ঘরে বুর্জোয়া কোন রাজনীতিক, বিজ্ঞানী, দার্শনিক বা জ্ঞানী ব্যক্তির ছবি নয়, বেশি স্থান পায় বরং মাইকেল জ্যাকসন, ইমরান খান, ম্যারাডোনা, রেখা, অমিতাভ বচ্চন, অঞ্জুঘোষ- এ জাতীয় বুর্জোয়া সমাজের শো-বয়দের ছবি।
বুর্জোয়া বিশ্ব ব্যবস্থা মানুষকে এখানেই টেনে নামিয়েছে। এবং বুর্জোয়ারা চায় মানুষ যেন রাজনীতি ও সমাজ প্রগতির মানদণ্ডে এগুলোকে বিচার করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে ষ্টারমোহ, যৌনচর্চা, অর্থলোভ আর ব্যক্তি বীরত্ববাদের ফাঁদেই আটকা পড়ে থাকে।
তাই, বিশ্বকাপের ফলে ক্রীড়ার মান বেড়েছে, বিশ্বের অনেক মানুষ শ্রেষ্ঠ ক্রীড়াশৈলী দেখার সুযোগ পেয়েছেন- এই ইতিবাচক দিকগুলো সত্ত্বেও বিশ্বকাপের আসর বিশ্ব জনগণের রাজনৈতিক চেতনাকে ভোঁতা করে দেয়ার, তাদেরকে বুর্জোয়া মূল্যবোধ ও আবেগে কলুষিত করার চক্রান্ত ছাড়া আর কিছুতেই পর্যবসিত হচ্ছে না। পশ্চিমা বিশ্বে এর অত্যন্ত কুপ্রভাব ইতিমধ্যেই প্রকাশিত হয়েছে, যা আগামীতে আরো ব্যাপক ক্ষতিকর মূর্তি নিয়ে অবধারিতভাবেই আবির্ভূত হবে- যদিনা এ মুহূর্তেই এসব প্রশ্নে প্রতিরোধী সচেতনতা গড়ে তোলা যায়।
পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী দেশে বুর্জোয়া শ্রেণী কর্তৃক শ্রমিক ও জনগণকে বিপ্লবী চেতনা থেকে দূরে রাখার প্রধানতম অস্ত্র হচ্ছে তাদের বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদ। সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোতে শ্রমিক মুক্তির জন্য প্রথম কাজটিই হচ্ছে বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদকে স্পষ্টভাবে বর্জন করা এবং “শ্রমিক শ্রেণীর কোন দেশ বা জাতি নেই”- এই আন্তর্জাতিকতাবাদী আদর্শে উদ্বুদ্ধ হওয়া। অথচ বিশ্বকাপ কী করেছে? ঠিক এর বিপরীত মতাদর্শটাই ওখানে শক্তিশালী করেছে এবং তা এবার প্রকাশিত হয়েছে অত্যন্ত জঘন্যরূপে। বিশেষত ইংল্যান্ড, জার্মানী ও হল্যান্ড- এইসব বনেদী সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর সমর্থকরা এত জঘন্য জাতীয়তাবাদী উন্মাদনার গুণ্ডামিতে মেতেছিল যে, বিশ্বজুড়ে ফুটবল মোহাচ্ছন্ন জনগণও তাকে ধিক্কার দিয়েছেন। ইতালীর মত একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রকেও গুণ্ডামি প্রতিরোধে ও নিরাপত্তা রক্ষায় অকল্পনীয় শক্তি সমাবেশ করেও হিমশিম খেতে হয়েছে। বুর্জোয়া প্রচারযন্ত্রের ফাঁক গলে বেরিয়ে আসা কিছু খবরে বোঝা যায় কি বর্বর, জাতীয়তাবাদী গুণ্ডামিতে ঐসব দেশের যুব সমাজকে মাতিয়েছে এই বিশ্বকাপ। এটা যদি আগামীতে ইউরোপ জুড়ে জঘন্যতম জাতিগত হানাহানির মতাদর্শিক প্রস্তুতি গড়ে তোলে তাতে অবাক কী?
অবাক যে হওয়া যায় না তার প্রমাণ জার্মানীর জয়লাভের পর জার্মানীতে ফ্যাসিস্ট শক্তির পেশী প্রদর্শনী- বিদেশি মাত্রই সেখানে বিজয়ানন্দের জোয়ারে আক্রান্ত হয়েছে। “জার্মান শ্রেষ্ঠ”, “দুই বিশ্বযুদ্ধ, এক বিশ্বকাপ”- এসব শ্লোগান জার্মানীর আকাশ বাতাস কলুষিত করেছে। এর মাঝেই আবার হচ্ছে বুর্জোয়া উদ্যোগে দুই জার্মানীর একত্রীকরণ। সমগ্র জার্মানীতে এসব কিছু বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদের বিষ কী পরিমাণে বাড়িয়ে তুলবে তা-কি সহজেই অনুমেয় নয়? এবং ফের আরেক হিটলার যদি এখন জার্মানীর এই মতাদর্শকে প্রতিনিধিত্ব করে পুনরায় বিশ্ব জয়ে নামতে চায় তাহলে তাকে কি বিশ্বকাপের উন্মাদনার ফসলে অভিষিক্ত না বলে উপায় থাকবে ?
এই হচ্ছে বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদের বিষ যা সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর জনগণকে “উন্নত মানব” এবং তৃতীয় বিশ্বের জনগণকে ও কালো মানুষকে “নিকৃষ্ট জীব” হিসেবে দেখতে শিখিয়েছে এবং অব্যাহতভাবে তা শিখাচ্ছে। তার প্রমাণই নগ্নভাবে প্রকাশিত হয় যখন সাম্রাজ্যবাদী শ্বেতাঙ্গ সাংবাদিক কালো আফ্রিকার ক্যামেরুনের সাফল্যে ঈর্ষা ও হিংসায় সাধারণ শালীনতাকে পর্যন্ত ভঙ্গ করে কালো খেলোয়াড়কে “জংলী” বানানোর চেষ্টায় প্রশ্ন করার ঔদ্ধত্য দেখায়-“আপনারা কি সিংহ খান?” সেই ইতালী তরুণীর বর্বর ও অশ্লীল ঘোষণাও এখানে উল্লেখ্য, আর্জেন্টিনার কাছে হেরে যাবার পর ম্যারাডোনার উদ্দেশ্যে যে বলেছিল “আমাদের খেয়ে পরে আমাদের বিরুদ্ধে শত্রুতা।”
বুর্জোয়া প্রচার যন্ত্র তাদের সমাজের দগদগে ঘা-গুলোকে রেখে-ঢেকেই নিশ্চয়ই প্রদর্শন করেছে। কিন্তু বিশ্বের বিশেষত তৃতীয় বিশ্বের ফুটবলমোদীরা এতেই হাড়ে হাড়ে প্রমাণ পেয়েছেন যে, সাম্রাজ্যবাদী বুর্জোয়ারা এই বিশ্বকাপ সংগঠিত করে ও পরিচালনা করে কতটা উগ্র জাতিদম্ভ থেকে এবং তৃতীয় বিশ্বকে তারা কী চোখে দেখে থাকে? কালো আফ্রিকার ক্যামেরুনকে জোর করে হারানো, সেমি ফাইনাল ও ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে নির্লজ্জ অবিচার, রেফারীদের নগ্ন পক্ষপাতিত্ব, তথাকথিত স্টারদের ব্যর্থতা সত্ত্বেও বুর্জোয়া প্রচারযন্ত্রের স্টারপ্রচার পদ্ধতি, টিকিটের কালোবাজারী, গুণ্ডামিকে রুখবার জন্য ঐ দেশের সদা প্রয়োজনীয় মদ বিক্রয় নিষেধ করতে বাধ্য হওয়া, হোটেলগুলোতে নগ্ন নারী দিয়ে খরিদ্দার বাগানোর কম্পিটিশন, বিজয়ের জন্য বর্বরোচিত ফাউলের ছড়াছড়ি ও ক্রমবর্ধিত লালকার্ড হলুদকার্ড, নগ্ন নারী দেহ প্রদর্শনী, কালো আফ্রিকা থেকে দু’টোর বেশি দলকে না নেয়া, অথচ এক বৃটেনেরই চারটি দলকে অনুমোদন, সর্বোপরি ফিফা কর্মকর্তাদের ফ্যাসিস্ট একনায়কসুলভ আচরণ ও আইনকানুন- এসবই বুর্জোয়ারা “নির্মল” খেলাধুলাকে কীভাবে কলুষিত করে ও করতে বাধ্য তা প্রমাণ করে।
সর্বহারা শ্রেণী বিশ্ব রঙ্গমঞ্চে বিজয়ী হিসেবে আবির্ভূত হলে এমন বিশ্ব ক্রীড়ার আয়োজন করবে না, মোটেই তা নয়। কিন্তু তা হবে এই বুর্জোয়া বর্বর জাতীয়তাবাদ, বর্ণবাদ, উপনিবেশবাদী মানসিকতা, নারীকে পণ্য বানানো, ব্যক্তি- বীরত্ববাদ, পরিচালনায় একনায়কত্ববাদ এবং শুধুমাত্র সুবিধাভোগী শ্রেণীর বিনোদন-এসব কিছু থেকে মুক্ত। বিশ্ব জনগণ নিশ্চয়ই এর চেয়ে বহুগুণ উন্নত ক্রীড়াই তখন উপভোগ করবেন, যা হবে সত্যিকারেই মানুষোচিত, মানবিক, সার্বজনীন ভ্রাতৃত্ববন্ধনে প্রাণবন্ত। বিশ্বক্রীড়া হবে বিশ্ব জনতার ঐক্য-ভ্রাতৃত্ব-বন্ধুত্বের উন্নয়ন এবং একে অন্য থেকে ক্রীড়াশৈলী শিক্ষা গ্রহণের একটি শ্রেষ্ঠ উপায়।
আর বর্তমানে বুর্জোয়ারা একে চালাচ্ছে জঘন্য জাতীয়তাবাদী হানাহানির বর্বর মতাদর্শ উস্কানোর মধ্য দিয়ে এবং সাম্রাজ্যবাদী সাদা প্রভুদের দ্বারা কালো জনগণ, তথা তৃতীয় বিশ্বের বিরুদ্ধে অন্যায়, অবিচার, নিপীড়ন, আক্রমণ, অবদমন ও তাচ্ছিল্যকে নগ্ন করে ও তাকে বাড়িয়ে তুলে।
সুতরাং বুর্জোয়া বিশ্বকাপের এই উন্মাদনাকে সচেতন সর্বহারা শ্রেণী ও বিপ্লবী বুদ্ধিজীবীদেরকে অবশ্যই বর্জন করতে হবে এবং এই খেলাকে ব্যবহার ক’রে সাম্রাজ্যবাদী ও বুর্জোয়া শাসক শ্রেণীর যে চক্রান্ত তাকে রুখতে প্রস্তুত হতে হবে।
আমরা বিশ্বকাপ চাই না, আমরা চাই বিশ্ববিপ্লব। আমরা বুর্জোয়া স্টার চাই না, আমরা চাই শ্রমিক-কৃষকের বিপ্লবের নায়ক। আমরা চাই বিশ্ব-জনগণ বিপ্লবী মতাদর্শ রাজনীতিতে সজ্জিত হোক। বিপ্ল¬বের জন্য সংগঠিত হোক।

সূত্রঃ সংস্কৃতি বিষয়ক, আন্দোলন সিরিজ ৩, আন্দোলন প্রকাশনা