‘অন্ধকারাচ্ছন্ন ছত্তিশগড়’ – ছত্তিশগড় নিয়ে APDR এর রিপোর্ট

nnn
apdr

ভারতবর্ষের প্রায় মাঝখানে অবস্থিত এই রাজ্যে বিগত ছয় মাস ধরে সংবাদ মাধ্যম এবং মানবাধিকার আন্দোলনের কর্মীদের ওপর বিভিন্নভাবে আক্রমণ শাণানো হচ্ছে। সাংবাদিক, আইনজীবী এবং অন্যান্য মানবাধিকার কর্মীদের অকারণ গ্রেফতার, প্রাণে মারার হুমকি, সংগঠিত প্রতিরোধের মাধ্যমে এমন অবস্থা তৈরি করা হয়েছে যাতে ওখানকার কোনোরকম খবর বাইরের জগতের কাছে না পৌছায়।

সুরক্ষা সেনাদলের বাড়াবাড়ির খবর সংগ্রহকারী স্থানীয় সাংবাদিকদের নানারকম মনগড়া অপরাধে গ্রেফতার করা হয়েছে, উপরন্তু তাদের পক্ষ অবলম্বনকারী আইনজীবীদের ভয় দেখানো হচ্ছে। সুরক্ষা আইনের মোড়কে জনগণকে নিপীড়নের আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। ধীরে ধীরে ছত্তিশগড়কে এক অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যাবার চিত্রনাট্য রচনা হচ্ছে।

রাষ্ট্রীয় অনাচারের গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ হিসাবে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর একাংশকে ব্যবহার করে তাদের দিয়ে ভয় দেখানো হচ্ছে। সামাজিক একতা মঞ্চ (সোসাল ইউনিটি ফোরাম) এবং মহিলা একতা মঞ্চ (উওমেন’স ইউনিটি ফোরাম) নামক কিছু স্থানীয় ভুঁইফোঁড় সংস্থা, রাজ্য পুলিশের সহায়তায়, সাংবাদিক এবং বিরোধী বক্তাদের ভয় দেখাচ্ছে এবং নানাভাবে উত্তক্ত করছে। এই সমস্ত গোষ্টির সদস্য হিসাবে তাদেরকেই দেখা যাচ্ছে, যাঁরা নিষিদ্ধ সালোয়া জুড়ুম রক্ষীবাহিনীর সদস্য হিসাবে একসময় পরিচিত ছিল।

এই সমস্ত ঘটনা রাজ্যের বাস্তার অঞ্চল এবং তার আশ পাশে ঘটে চলেছে। বাস্তার দীর্ঘদিন ধরেই রাষ্ট্রশক্তি এবং মাওবাদিদের শক্তি প্রদর্শনের কেন্দ্রস্থল। উভয়পক্ষের এই হিংসা এবং প্রতিহিংসার ফলে গুরুতর মানবিধাকার লঙ্ঘনের সাক্ষী এই বাস্তার। বিশেষ করে উভয়পক্ষের এই হামলায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত সেখানকার স্থানীয় আদিবাসীরা। এই যেখানে পরিস্থিতি, সেখানে সংবাদ মাধ্যম এবং গণসংগঠনের মুখ বন্ধ করার অর্থ অধিকতর হিংসাত্মক পরিস্থিতি সৃষ্টি করা এবং তা দৃষ্টিগোচরে আনতে না দেওয়া।

এখানে কিছু তথ্য উল্লেখ করা আবশ্যক

১৬ই জুলাই ২০১৫ : সাংবাদিক সোমারু নাগ গ্রেফতার। অপরাধ – মাওবাদিদের প্রতি সহানুভূতিশীল। ভারতীয় দণ্ডবিধির যে ধারাগুলি তার বিরুদ্ধে দেওয়া হয়েছে – ডাকাতি, অগ্নিসংযোগ, অপরাধ মূলক ষড়যন্ত্র এবং অস্ত্র আইন।

২৯শে সেপ্টেম্বর ২০১৫ : সাংবাদিক সন্তোষ যাদব গ্রেফতার। অপরাধ – সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের সাথে যোগাযোগ রাখা এবং তাদের সাহায্য করা। যে ধারায় অভিযুক্ত – বিশেষ জনসুরক্ষা আইন, ছত্তিশগড়। সেই সঙ্গে ভারতবর্ষের অন্যতম সন্ত্রাস দমন আইন – বেআইনি কার্যকলাপ (প্রতিরোধ) আইন।

সন্তোষ যাদব

নবভারত এবং দৈনিক ছত্তিশগড়ের পূর্বতন কর্মী। সশস্ত্র সংগঠন, ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি (মাওবাদি) নামক নিষিদ্ধ গোষ্ঠির সদস্য হিসাবে অভিযুক্ত। ইউ,এ,পি,এ এবং সি,এস,পি,এস,এ ধারাগুলিতে অভিযুক্ত। দোষী সাব্যস্ত হলে ১০বছরের সাজা।

বাস্তার জেলার দারবা নামক ছোট্ট একটি জনপদে সন্তোষ যাদবের জন্ম এবং বেড়ে ওঠা। স্কুলে পড়ার সময় তার ইচ্ছে ছিল বড় হয়ে পুলিশ অফিসার হবার। কিন্তু হয়ে গেলেন সাংবাদিক। নিজের এলাকায় মাওবাদি সংগঠন এবং পুলিশি অত্যাচারের খবর বাইরের জগতের কাছে পৌছে দেওয়াই তার মুখ্য কাজ। নবভারত এবং দৈনিক ছত্তিশগড় নামক জাতীয় এবং স্থানীয় সংবাদপত্রের সংবাদ পরিবেশক। কিন্তু রাষ্ট্রের সপক্ষে সংবাদ পরিবেশন করতে না চাওয়ার কারণে তাকে গ্রেফতার করা হয়।

২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে দরবা জঙ্গলের ভেতর মাওবাদি দমনের নামে বদ্রিমাহু গ্রামের ৫জন আদিবাসীকে রাজ্য পুলিশ গ্রেফতার করে। গ্রামবাসীদের বক্তব্য তাদের মিথ্যা মামলায় ফাসানো হয়েছে। সন্তোষ যাদব বদ্রিমাহু থেকে শুধু এই ঘটনার বিবরণ পাঠিয়েই ক্ষান্ত হননি, আদিবাসীদের জগদলপুরের আইনি সহায়তা কেন্দ্রের সাথেও যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছেন, যাতে তারা আদালতে এই গ্রেফতারির বিরোধিতা করতে পারে।

রাজ্য পুলিশের হাতে আদিবাসীদের এই নিগ্রহ সন্তোষ যাদবের সংবাদের ফলে সকলের দৃষ্টিগোচর হয়। ফলে এর কয়েকদিনের মধ্যেই পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের কারণ হিসাবে বলা হয়, ২৯শে সেপ্টেম্বর প্রতিরক্ষা বাহিনীর ওপর সশস্ত্র মাওবাদী নাশকতায় তিনি যুক্ত ছিলেন এবং সন্ত্রাস ও অপরাধ মূলক ষড়যন্ত্রে যুক্ত ছিলেন। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে খুন এবং নিষিদ্ধ মাওবাদী সংগঠন, ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি (মাওবাদি), এর সক্রিয় সদস্য হওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে ছত্তিশগড় জনসুরক্ষা আইন এবং ইউ এ পি এ ধারায় চার্জ গঠণ করা হয়েছে। এই দুটো আইনই আন্তর্জাতিক মানবিধিকার রক্ষা বিধি ও আরও অনেক আইনের পরিপন্থী। অভিযোগ প্রমাণে ১০ বছর জেল হওয়ার সম্ভাবনা।

তার পত্নী পুনম যাদব অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এর ভারতীয় শাখাকে জানান,” ওর কাজের জন্য ওকে নানারকম ভাবে ভয় দেখানো হত। আমি ওকে অনেক সাবধান করেছি, এমনকি এই কাজ ছেড়ে অন্য কোথাও কাজ খুজতেও বলেছি। কিন্তু ও বোলতো, আমি অন্যকে সাহায্য করছি, আমি কাউকে ভয় পাইনা। পুলিশ ওকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়েছে।“

সন্তোষ যাদবের আইনজীবী, ঈষা খান্ডেলয়াল, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ভারতীয় শাখাকে জানান যে, সন্তোষ যাদবকে পুলিশ মনগড়া কারণে গ্রেফতার করেছে। সাংবাদিককে লক্ষ্যবস্তু বানানোর কারণ তার পাঠানো সংবাদে আদিবাসীদের ওপর পুলিশি অত্যাচারের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা জনসমক্ষে প্রকাশিত হয়ে পড়ছিল। তিনি এও বলেন, “ ২০১৩ সাল থেকে পুলিশ ওকে উত্তক্ত করছে। একবারতো পুলিশ তাকে নিজেদের হেফাজতে নিয়ে উলঙ্গ করে অপমানিত করে। ওকে পুলিশি চর বানানোর অনেক চেষ্টা করা হয়েছে।“

“ তার একটাই অপরাধ, সে সাংবাদিকতার কাজকে ছাপিয়ে গ্রামবাসীদের আইনি সহায়তা পেতে সাহায্য করেছে। বাস্তারের পুলিশ চায়, সাংবাদিকরা কেবলমাত্র তাদের হয়েই কথা বোলবে। সন্তোষ যাদব দুদিকের কথাই তার লেখায় প্রকাশ কোরতো।“ ন্যাশনাল ডেলি পত্রিকার সাংবাদিক, রাজকুমার সোনি, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ভারতীয় শাখাকে বলেন, “ পুলিশের বোঝা উচিৎ যে, উভয়পক্ষের কথাই বলা সাংবাদিকের কাজ। মাওবাদীদের সাথে কথা বলেছে বলেই একজন সাংবাদিক মাওবাদী হয়ে যায়না।“

তিনি আরও বলেন, “ আপনি কোনো ঘটনার বিষয় পুলিশের কাছে জানতে চাইলে, পুলিশ বোলবে, আপনি দেশদ্রোহী তাই আপনাকে কোনো তথ্য দেওয়া যাবেনা।বাস্তারে মাওবাদীদের সাথে আপনি সাংবাদিক হিসাবে কালেভদ্রে একবার কথা বোলতে পারবেন ঠিক যেমন মুম্বাইয়ের সাংবাদিকরা সেখানকার শিল্পপতি, রাজনীতিবিদ বা পুলিশ আধিকারিকের সাথে কথা বলেন কোনো ঘটনার বিষয় তাদের মতামত জানার জন্য। এমন কোনো আইন আছে কি যে সাংবাদিকরা মাওবাদীদের বক্তব্য প্রকাশ করতে পারবে না !”

সোমারু নাগ

একজন আদিবাসী সাংবাদিক। যিনি বাস্তারের থেকে প্রকাশিত ‘রাজস্থান’ পত্রিকায়, আদিবাসী গ্রামে জল, বিদ্যুৎ ইত্যাদি গ্রামীন সমস্যার বিষয় খবর করতেন। সেই সঙ্গে তার খবরের একটা অংশ জুড়ে থাকতো রাজ্য পুলিশের হাতে আদিবাসীদের অযথা গ্রেফতার এবং তাদের জোর করে পুলিশের চর বানাবার চেষ্টার বিস্তারিত বিবরণ।

২০১৫ সালের ১৬ই জুলাই পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। মাওবাদী যোগ এবং তাদের সাথে ষড়যন্ত্র করে রাস্তা সারাইয়ের যন্ত্রপাতিতে আগুন লাগানোর অভিযোগ আনা হয়। তার বিরুদ্ধে ভারতীয় দন্ডবিধির অস্ত্র আইন, ডাকাতি, ইছাকৃত অগ্নিসংযোগের দ্বারা সরকারি সম্পত্তি নষ্ট এবং অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার ধারা প্রয়োগ করা হয়। তার গ্রেফতারির বিরুদ্ধে তিরথগড় গ্রামে বিশেষ গ্রামসভা ডাকা হয় এবং সেখানে সিদ্ধান্ত হয় যে, সে নির্দোষ।

‘পত্রিকা’ সংবাদপত্রের জিনেশ জৈন এর বক্তব্য, “ বাস্তারে ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। সেখানকার সাধারণ মানুষ, পুলিশ এবং মাওবাদী দুদিক থেকেই আতঙ্কগ্রস্ত। জগদলপুরের স্থানীয় সাংবাদিকরা অসহায় কারণ পুলিশের কথামতো না চললে তাদের যখন তখন পুলিশি নিগ্রহের শিকার হতে হচ্ছে। তাই সত্য ঘটনার প্রকাশ তাদের জীবন বিপন্ন করে তুলতে পারে।“

প্রভাত সিং

প্রভাত সিং ‘পত্রিকা’ নামক হিন্দি দৈনিকের স্থানীয় সংবাদদাতা ছিলেন, সেইসঙ্গে ইটিভি দান্তেওয়াড়ার হয়েও কাজ করতেন। পুলিশের দুর্নীতি, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং বিনাবিচারে হত্যাকান্ডের ঘটনা তার খবরে উঠে আসে। হোয়াট’স অ্যাপ গ্রুপে তার সম্মদ্ধে অবমাননাকর মন্তব্যের প্রতিবাদে, তিনি সামাজিক একতা মঞ্চের সদস্যদের বিরুদ্ধে ৬ই মার্চ পুলিশে অভিযোগ জানান। ১৯মার্চ তার এক নিয়োগকর্তা তারসাথে চুক্তি খারিজ করে দেয়। তার দুদিন পরে, পুলিশের উচ্চপদস্থ আধিকারিকের সম্বন্ধে ১লা মার্চ হোয়াট’স অ্যাপ গ্রুপে বিদ্রুপাত্মক মন্তব্যের জন্য পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে।

ইনফরমেশন টেকনোলজি আইনের ৬৭ এবং ৬৭এ ধারায় (ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে অশ্লীল মন্তব্য প্রকাশ ও প্রচার) অভিযোগ আনা হয়েছিল। এর আগেও তার বিরুদ্ধে প্রতারণা, ভীতি প্রদর্শন এবং পুলিশের কাজে বাধা দেওয়া ইত্যদি ধারায়ও অভিযোগ আনা হয়েছিল।

প্রভাত সিং এর অভিযোগ, বন্দি অবস্থায় পুলিশ তার ওপর অত্যাচার করে। তার আইনজীবী জিটিজ দুবের বক্তব্য, “ প্রভাত সিং কে পুলিশ তুলে নিয়ে যায় সোমবার এবং এফ আই আর ছাড়াই সম্পুর্ণ একদিন হেফাজতে রেখে দেওয়া হয়। অবশেষে মঙ্গলবার যখন তাকে আদালতে তোলা হয়, সেখানে সে বিচারককে তার প্রতি অত্যাচারের কথা বলে। তার বুকে এবং হাতে অত্যাচারের অনেক চিহ্ন তখনো বর্তমান।“

মালিনী সুব্রামানিয়াম

মালিনী সুব্রামানিয়াম অনলাইন সংবাদপত্র ‘স্ক্রল’ এ ধারাবাহিকভাবে ছত্তিশগড় পুলিশকৃত মানবাধিকার লঙ্ঘন, যৌন অত্যাচার, সাংবাদিকদের অকারণ হেনস্থা ও গ্রেফতার এবং মনগড়া মাওবাদী আত্মসমর্পণ বিষয় লিখতেন।

২০১৬র ১০ই জানুয়ারি সামাজিক একতা মঞ্চের কিছু সদস্য তার জগদলপুরের বাড়িতে গিয়ে তার বিরুদ্ধে বাস্তার এবং পুলিশের পক্ষে মানহানিকর কার্যকলাপের অভিযোগ আনে।

৭ই ফেব্রুয়ারি জনাবিশেক লোক, যাদের মধ্যে সামাজিক একতা মঞ্চের সদস্যও ছিল বলে তিনি চিনতে পেরেছিলেন, তার বাড়িতে চড়াও হয়। তার প্রতিবেশীদের তার বাড়িতে ঢিল ছুঁড়তে বলা হয় এবং তার বিরুদ্ধে শ্লোগান দেওয়া হয়, সে নাকি সশস্ত্র মাওবাদী দলের সদস্য এবং তাকে বাস্তার ছেড়ে চলে যেতে বলা হয়। সেদিন অধিক রাতে তার বাড়িতে ঢিল মারা হয় যার ফলশ্রুতিতে তার গাড়ির পিছনের কাঁচ ভেঙ্গে যায়। পরের দিন সামাজিক একতা মঞ্চ সর্বসাধারণের উদ্দেশ্যে একটা বক্তব্য প্রচার করে যাতে বাস্তারকে বিকৃতভাবে প্রদর্শিত করা এবং মাওবাদী দর্শনের প্রচারক হিসাবে তাকে তুলে ধরা হয়।

মালিনী সুব্রামানিয়াম অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ভারতীয় শাখাকে জানান যে, “ এই আক্রমণ কেবলমাত্র একজন ব্যক্তিবিশেষের প্রতি নয়, এটা একজন সাংবাদিককে বাস্তব সত্য প্রকাশ থেকে বিরত করার চেষ্টা, যা ওরা লুকোতে চায়।“ সাংবাদিকরা ইতিপূর্বে ছত্তিশগড় রেড ক্রশের আন্তর্জাতিক সংগঠণের কার্যালয়ে বসে কাজ করতেন, ২০১৩ সালে রাজ্য সরকার এক আদেশবলে এই কার্যালয় বন্ধ করে দেয়।

তার আইনজীবীর বক্তব্য অনুযায়ী, পুলিশ ৮ই ফেব্রুয়ারি তার বাড়ির ঘটনার এফ আই আর নিতে চায়নি, তাদের নাকি কোনো এক উচ্চপদস্থ আধিকারিকের থেকে এর জন্য অনুমতি নিতে হবে, যিনি সেই সময় বেড়াতে গেছেন। অবশেষে ৯ই ফেব্রুয়ারি সাংবাদিকের অনুপস্থিতিতে পুলিশ এফ আই আর নথিভুক্ত করে, যাতে কিছু অজ্ঞত পরিচয় ব্যক্তির নামে অন্যের বাড়িতে অনধিকার প্রবেশ এবং পঞ্চাশ টাকার সম্পত্তি নষ্টের অভিযোগ লিপিবদ্ধ করা হয়। এফ আই আরে ৭ই ফেব্রুয়ারির ঘটনার কোন উল্লেখ নেই, এমনকি সুব্রামানিয়াম যাদের চিনতে পেরেছিলেন বলেছিলেন তারও কোনো উল্লেখ নেই।

১৭ই ফেব্রুয়ারি পুলিশ সাংবাদিকের বাড়িওলাকে জিঞ্জাসাবাদের জন্য ডেকে পাঠায়। বাড়িওলা ফিরে এসে তাঁকে যতশীঘ্র সম্ভব বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বলে। সেইদিনই পুলিশ তাঁর গ্রহভৃত্যকে দীর্ঘক্ষন আটকে রেখে জিঞ্জাসাবাদ করে। তাঁর নিরাপত্তার কথা ভেবে স্ক্রল তাঁকে জগদলপুর ছেড়ে চলে যেতে বলে। সাংবাদিক এবং তাঁর পরিবার পরেরদিন জগদলপুর ত্যাগ করে চলে যায়।

বেলা ভাটিয়া

বেলা ভাটিয়া একজন স্বাধীন গবেষক এবং মানবাধিকার কর্মী। যিনি একবছরেরও বেশি সময় বাস্তারে থেকে কাজ করেছেন। বর্তমানে তিনি জগদলপুর থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে পারপা নামে একটা গ্রামে থাকেন। বেলা ভাটিয়া একসময় সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অফ ডেভেলপিং সোসাইটি নামক প্রখ্যাত গবেষনা সংস্থায় কাজ করতেন। সেখানেই তিনি তেলেঙ্গানার নকশাল আন্দোলন এবং বাস্তারের সালোয়া জুড়ুম আন্দোলনের বিষয় মনযোগী হন। ভারত সরকারের প্ল্যানিং কমিশন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত “ডেভেলপমেন্ট চ্যালেঞ্জেস ইন এক্সট্রিমিস্ট অ্যাফেক্টেড এরিয়া” সংগঠনে তিনি একজন বিশেষজ্ঞ সদস্য হিসেবে কাজ করেছেন।

এই গবেষক আরও কয়েকজনের সাথে মিলে, অক্টোবর ২০১৫ থেকে জানুয়ারি ২০১৬ পর্যন্ত প্রতিরক্ষা বাহিনীর অবাধ যৌন অত্যাচারের বিরুদ্ধে, আদিবাসী মেয়েদের এফ আই আর করতে সাহায্য করেছিলেন।

২০১৬ সালের ২১শে জানুয়ারি বেলা ভাটিয়া কিছু সক্রিয় কর্মীর সঙ্গে বিজাপুরে কয়েকজন আদিবাসী মহিলাকে এফ আই আর করতে সাহায্য করছিলেন। সেইসময় সেখানে ‘নকশাল পীড়িত সঙ্ঘর্ষ সমিতি’ নামে একটি দলের সদস্যরা জড়ো হয়ে তার বিরুদ্ধে শ্লোগান দেয় যে, সে নাকি প্রতিরক্ষা বাহিনীর নামে কুৎসা রটাচ্ছে। ২৯শে জানুয়ারি সেই একই দল বিজাপুরে বেলা ভাটিয়া এবং সোনি সুরির বিরিদ্ধে মিছিল করে এবং তাদের কুশপুত্তলিকা পোড়ায়। সেইসঙ্গে তাদের সতর্ক করা হয় বিজাপুরে না ফিরতে।

১৯শে ফেব্রুয়ারি পুলিশ বেলার বাড়িতে গিয়ে তার বাড়িওয়ালা এবং বাড়িওয়ালার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। গ্রাম সংসদের প্রধানকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পুলিশ তার বাড়িওয়ালাকে পরের দিন থানায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আসতে বলে। তিনদিন পরে পুলিশ আবার তার বাড়িতে আসে এবং ছবি তুলে নিয়ে যায়।

সুকমায় নাকি সশস্ত্র মাওবাদীদের পাতা ল্যান্ডমাইনে একটা আট বছরের বাচ্চার মৃত্যু ঘটেছে, তার নিন্দায় ১৮ই মার্চ মহিলা একতা মঞ্চ জগদলপুরে একটা প্রতিবাদ সভা ডেকে প্রস্তাব আনে যে, বেলা ভাটিয়া এবং মানবাধিকারের কথা বলা আইনজীবী শালিনী গেরা কে বাস্তার ছাড়তে হবে। শুধু তাই নয় তাদের আরও দাবি এদের বিরুদ্ধে ছত্তিসগড়ের বিশেষ জন নিরাপত্তা আইন প্রয়োগ করতে হবে।

২৬শে মার্চ বেলা ভাটিয়ার অনুপস্থিতিতে দলে দলে লোক তার বাড়ি গিয়ে তার বাড়িওয়ালাকে পরামর্শ দিয়ে আসে যে, তাকে যেন বাড়ি থেকে বার করে দেওয়া হয় কারণ সে নাকি নকশাল সন্ত্রাসবাদী। প্রতিবাদিরা মিছিল বার করে প্রচারপত্র বিলি করে, যাতে বলা হয়, “ মাওবাদী বেলা ভাটিয়াকে চিনে রাখুন, সে আপনাদের মধ্যে ঘাঁটি গেড়েছে।……… বেলা ভাটিয়া দেশকে ধংস করা বন্ধ কর……..বেলা ভাটিয়া বাস্তার ছাড়ো।

২৪শে মার্চ একটা খোলা চিঠিতে বেলা ভাটিয়া বলেন যে বাস্তার ছেড়ে যাবার কোনো পরিকল্পনাই তার নেই। তিনি লেখেন, “ গণতন্ত্র সেই সমাজ গড়ার লক্ষে কাজ করে যেখানে কোনো অত্যচারি বা অত্যাচারিত নেই। অর্থাৎ, সেই সমাজে সকলের কথা বলার স্বাধীনতা আছে। আমি বিশ্বাস করি আমরা বাস্তারে সেই সমাজ গড়ে তুলতে পারবো।“

ঈশা খান্ডেলয়াল এবং শালিনী গেরা

ঈশা খান্ডেলয়াল এবং শালিনী গেরা জগদলপুর আইনি সহায়তা কেন্দ্র, ‘জগলগ’ এর সদস্য। যারা ২০১৩ সাল থেকে ছত্তিসগড়ের পাঁচটি জেলার বন্দিদের বিনাপারিশ্রমিকে আইনি সহায়তা দিয়ে আসছে। তাদের বহু মক্কেল আদিবাসী সমাজের মানুষ, যাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র মাওবাদীর তকমা সেঁটে দেওয়া হয়েছে। এই আইনজীবীদের নিজস্ব অনুসন্ধানে এই তথ্য উঠে এসেছে যে, পুলিশ সামান্য কারণে আদিবাসীদের গ্রেফতার করে এবং আদালতে পেশ করার আগে দীর্ঘদিন তাদের জেলে বন্দি থাকতে হয়।

২০১৫ সালে পুলিশ জগলগের সদস্যদের জেরা করে, কারণ কোনো এক অজানা সূত্র থেকে তাদের কাছে অভিযোগ করা হয়েছিল যে, জগলগের সদস্যদের বাস্তারে আইনি কাজ করার যোগ্যতা নেই। জগলগের আইনজীবীদের যাতে কাজ করতে না পারে তার জন্য ২০১৫ অক্টোবরে বাস্তারের বার অ্যাসোসিয়েশন তাদের সাধারণ সভায় একটা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যাতে বলা হয়, রাজ্য বার কাউন্সিলের সদস্য ছাড়া অন্য কেউ জগদলপুর বিচারালয় কাজ করতে পারবে না।

৭ই ফেব্রুয়ারি মালিনী সুব্রামনিয়মকে তাঁর বাড়ি আক্রমণের ঘটনায় তাকে এফ আই আর করতে সাহায্য করেন। দুদিন পরে সামাজিক একতা মঞ্চ বক্তব্য রাখে যে তারা জগলগের বিরুদ্ধে আন্দোলন ঘোষনা করছে কারণ জগলগ নাকি সমাজসেবার নাম করে নকশালদের সাহায্য করছে।

১৭ই ফেব্রুয়ারি রাতে পুলিশ এসে আইনজীবীদের বাড়িওয়ালাকে স্থানীয় থানায় তুলে নিয়ে যায়। পরের দিন সকালে ফিরে এসে বাড়িওয়ালা আইনজীবীদের জানান যে তিনি অনন্যোপায় হয়ে তাদের বলছেন, অফিস এবং বাসস্থান সরিয়ে তার বাড়ি যেন ফাঁকা করে দেওয়া হয়। শালিনী গেরার কথায়, “পুলিশ তাকে নির্দেশ দিয়েছিল যেন দু একদিনের মধ্যেই আমরা বাড়ি ফাঁকা করে দিই।“

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ভারতীয় শাখাকে একজন পুলিশ আধিকারিক জানিয়েছিল যে, বাড়িওয়ালাকে পুলিশ সম্পুর্ণ ভিন্ন কারণে ডেকে পাঠিয়েছিল। সেইদিনই বেলার দিকে সামাজিক একতা মঞ্চ আবার জগলগের বিরুদ্ধে মাওবাদীদের রক্ষা করছে বলে জনসভায় দাবি করে। শালিনী গেরার ভাষ্যে, “ সাংবাদিক সম্মেলন করে তারা বলে, আমরা তাদের পরবর্তী লক্ষ্য কারণ আমরা রক্তপিপাসু মাওবাদীদের সমর্থন করছি। আরও অনেক অভিযোগের সাথে এও বলা হয় যে, আমরা বিদেশী মদ্যপান করি, বড়লোকি চালে চলি এবং অসামাজিক জীবনযাপন করি।“

১৯শে ফেব্রুয়ারি পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল বাস্তারে একটা সাংবাদিক সম্মেলন ডাকেন এবং জগলগের আইনজীবীদের ওপর আক্রমণের আশঙ্কার কথা ঘোষণা করেন। সেই রাতেই ঈশা খান্ডেলয়াল এবং শালিনী গেরা জগদলপুর ত্যাগ করেন।

বন্দিরা ন্যায়সঙ্গত অধিকার থেকে বঞ্চিত

জগদলপুর আইনি সহায়তা সংগঠনের অনুসন্ধানে ২০১৩ সালে জগদলপুরের বিভিন্ন জেলে বিনাবিচারে আটকে রাখা বন্দিদের ন্যায়সঙ্গত অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখার অসংখ্য ঘটনা ধরা পরে। আইনজীবীদের অনুসন্ধানে এই তথ্য উঠে আসে যে, ২০০৫ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ধান্তেওয়াড়ায় যতজন ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত হয়েছিল তাদের ৯৬ শতাংশ বেকসুর খালাস পেয়ে যায়। তা সত্ত্বেও বহু বিচারাধিন বন্দিকে দীর্ঘদিন জেলে কাটাতে হয়েছে। ২০১৩ সালে ধান্তেওয়াড়া জেলা সংশোধনাগারের প্রায় অর্ধেক বন্দি বিচার শুরুর আপেক্ষাতেই একবছরের বেশি জেলে কাটিয়ে ফেলেছে।

অনুসন্ধানে এও দেখা যাচ্ছে যে জগদলপুর, ধান্তেওয়াড়া এবং কাঁকের জেলার প্রধান সংশোধনাগারগুলি যথাক্রমে ২৬০ শতাংশ, ৩৭১ শতাংশ এবং ৪২৮ শতাংশ অতিরিক্ত বন্দিতে ভরতি। যেখানে বিচারাধীন বন্দির জাতীয় গড় ৬৭ শতাংশ সেখানে ধান্তেওয়াড়া এবং কাঁকের জেলার সংশোধনাগারগুলিতে বিচারাধীন বন্দি প্রায় ৯৭ শতাংশ যাদের অধিকাংশই নিরক্ষর আদিবাসী।

আইনজীবীরা এমন উদাহরণও পেয়েছেন যেখানে পুলিশ তথ্যপ্রমাণে কারচুপি করেছে, মাওবাদীদের সাথে গুলি বিনিময়ের সময় মাওবাদীরা তাদের সতীর্থদের নাম ধরে নাকি এতটাই উচ্চস্বরে ডাকাডাকি করছিল যে ৫০জন মাওবাদীর নাম পুলিশ জানতে পেরেছে। বেলচা এবং লাঙ্গল ধারি গ্রামবাসীদের পুলিশ অস্ত্র আইনে গ্রেফতার করেছে। কিছু কিছু অভিযুক্তের ফাইল ঘেঁটে দেখা গেছে, তাদের বিভিন্ন অপরাধে অভিযুক্ত করে বছরের পর বছর জেলে ঢুকিয়ে রাখা হয়েছে অথচ কোনো অভিযোগই শেষপর্যন্ত আদালতে প্রমাণিত হয়নি।

সোনি সুরি

সোনি সুরি আন্তর্জাতিক অ্যামনেস্টির হয়ে রাজনৈতিক বন্দি এবং আদিবাসীদের জন্য কাজ করেছেন। সোনি সুরি ও তার ভাইপো লিঙ্গারাম কোডোপি দির্ঘদিন ধরেই প্রতিরক্ষা বাহিনী এবং মাওবাদীদের হাতে ছত্তিসগড়ের মানুষের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয় সরব।

সোনি সুরি একজন শিক্ষিকা এবং লিঙ্গারাম সাংবাদিক। এসার নামক একটি নথিভুক্ত সংস্থার হয়ে তথ্য সরবরাহের অজুহাতে ২০১১ সালের অক্টোবর এবং সেপ্টেম্বর মাসে তাদেরকে পুলিশ গ্রেফতার করে। পুলিশের দাবী, মাওবাদীদের আক্রমণের হাত থেকে ব্যবসা বাঁচানোর ব্যবস্থা হিসাবে এরা এসারের থেকে টাকপয়সা সংগ্রহ করে মাওবাদীদের হাতে পৌছে দিত। ২০১৪ সাল থেকে ‘আম আদমি’ দলের সদস্য সোনি সুরি তার বিরুদ্ধে আনা ৫টা মামলায় বেকসুর খালাস পেয়েছন এবং লিঙ্গারাম এখনো পর্যন্ত দুটো মামলার একটায় খালাস পেয়েছেন।উভয়েই অভিযোগ করেছেন যে, বন্দিদশায় থাকাকালীন পুলিশ তাদের ওপর অত্যাচার চালিয়েছে। ২৯শে অক্টোবর আদালতের নির্দেশে সরকারি হাসপাতালে সোনি সুরির ডাক্তারি পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষায় তার যোনিপথে দুটি এবং পায়ুছিদ্রে একটি পাথর পাওয়া যায়, সেইসংগে তার মেরুদণ্ডে গভীর ক্ষত ধরা পড়ে।

২০১৬সালের ২০শে ফেব্রুয়ারি রাতে সোনি সুরি এক সহকর্মীর সাথে জগদলপুর থেকে ছত্তিসগড়ের গিদামে তার বাড়ি ফেরার সময় তিনজন অজানা মোটরসাইকেল আরোহী তাদের রাস্তা আটকায় এবং সোনি সুরির মুখে কিছু রসায়নিক পদার্থ ছুঁড়ে মারে। ভয়ঙ্কর যন্ত্রণার সাথে কিছক্ষনের জন্য তার দৃষ্টি সম্পুর্ণরুপে চলে যায়। প্রথমে তাকে জগদলপুরের একটা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, পরে চিকিৎসার জন্য তাকে দিল্লীর হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়।

সোনি সুরি তার আগে ‘মরদুমে’র বেআইনি হত্যাকাণ্ডের জন্য কয়েক সপ্তাহ ধরে বাস্তার পুলিশের এক অত্যন্ত উচ্চপদস্থ আধিকারিকের বিরুদ্ধে এফ আই আর করার চেষ্টা করছিলেন। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ভারতীয় শাখাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সোনি সুরি বলেন যে ২০শে ফেব্রুয়ারি আক্রমণকারীরা তাঁকে ওই চেষ্টা থেকে বিরত থাকতে হুমকি দিয়েছে।

এই ঘটনার পর ছত্তিশগড় প্রশাসন, রাজ্য পুলিশের একটা অনুসন্ধানকারী দল গঠণ করে। সোনি সুরির পরিবারের অভিযোগ এই বিশেষ অনুসন্ধানকারী দল লিঙ্গারাম এবং সোনি সুরির ভগ্নীপতি অজয় মার্কম কে জিজ্ঞাসাবাদের আছিলায় বারংবার থানায় ডেকে পাঠিয়ে চাপ দিয়ে স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা করে যে, এই আক্রমণে তাদের হাত ছিলো। ২০১৬ সালের ১০ই থেকে মার্চ থেকে তিনবার অজয় মার্কম কে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তুলে নিয়ে গিয়ে জগদলপুর পুলিশ স্টেশনে প্রায় ৩০ ঘণ্টা জেরা করা হয়। তার কথায় ওই সময় তার ওপর অকথ্য অত্যাচার করা হয়। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ভারতীয় শাখাকে তিনি জানান, “ আমাকে প্রচুর মারধর করা হয় এবং সোনি সুরির ওপর আক্রমণে আমার হাত আছে সেটা স্বীকার করার জন্য চাপ দেওয়া হয়। আমাকে মাটিতে ফেলে সারা শরীরে পায়ের জুতো দিয়ে মারা হয়।“

দীপক জয়সোয়াল

দীপক জয়সোয়াল ‘দৈনিক দৈনন্দিনীর’ সাংবাদিক হিসাবে ২০১৫ সালে ওই অঞ্চলের বিদ্যালয়ের পরীক্ষায় ব্যপক দূর্ণীতি নিয়ে অসংখ্য খবর প্রকাশ করেছিলেন। দীপক জয়সোয়াল প্রভাত সিং এর অত্যন্ত কাছের বন্ধু ছিলেন। ২৬শে মার্চ ধান্তেওয়াড়ার স্থানীয় কোর্টে প্রভাত সিং এর জামিনের আবেদন করার সময়, পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে কারণ ৭মাস আগে একটা স্কুলের অধ্যক্ষ তার বিরুদ্ধে অনধিকার হস্তক্ষেপ এবং সরকারি আধিকারিকের কাজে বাধা সৃষ্টির অভিযোগ জানিয়েছিল। স্কুল অধ্যক্ষের অভিযোগ জয়সোয়াল স্কুলের নামে মিথ্যা রিপোর্ট লেখার ভয় দেখিয়ে টাকা দাবী করে। জয়সোয়ালের আইনজীবী জিটিজ দুবের বক্তব্য, “ স্কুলের পরীক্ষায় দুর্ণীতির বিষয় তদন্ত না করে পুলিশের সেই দুর্ণীতির সংবাদদাতাকেই গ্রেফতার করছে। ঘটনার বিষয় অনুসন্ধান না করে যে খবর দিল তাকেই দোষী বলে ধরা হচ্ছে। এই যেখানে অবস্থা সেখানে সাংবাদিকরা কোন ভরসায় থাকবেন?”

আইন

ছত্তিশগড়ে সাংবাদিকদের গ্রেফতারে একটা বিষয় পরিষ্কার যে এই আইনে সরকার বিরোধি কথা বলা অপরাধ।

বেআইনি কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ আইন (ইউ এ পি এ)

১৯৬৭ সালে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ রোধের উদ্দেশ্যে এই আইন প্রণয়ন করা হয় যা ২০০৪, ২০০৮ এবং ২০১২ সালে পরিমার্জিত হয়। টাডা (টেররিস্ট এন্ড ডিসরাপ্টিভ অ্যাক্টিভিটিস প্রিভেনশন অ্যাক্ট, ১৯৮৭) নামক ভয়ঙ্কর আইন, যকে পরর্তিকালে অপ্রায়োগিক করে দেওয়া হয় এবং পোটা (প্রিভেনশন অব টেররিজম অ্যাক্ট)আইন, যা পরবর্তিকালে ব্যপক সমালোচনার মুখে তুলে নেওয়া হয়, এই দুয়ের বিভিন্ন ধারা যোগ করে এই বেআইনি কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ আইন বা আনলফুল অ্যাক্টিভিটিস প্রিভেনশন অ্যাক্ট টি তৈরি করা হয়েছে।

ইউ এ পি এ আইনের অনেকগুলি ধারা ভারতবর্ষে আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের বাধ্যবাধকতার পরিপন্থী। বিশেষত ভারত যার মুখ্য প্রবক্তা সেই সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকারের আন্তর্জাতিক সনদেরও বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে এই আইন।

এই আইনে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের সে সাধারণ সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে তা অনেকাংশেই অতিরঞ্জিত ও অনির্দিষ্ট। যেমন সংজ্ঞায় বলা হচ্ছে, ‘যে সকল কাজের দ্বারা কোনো সম্পত্তির ক্ষতি বা লোকসান বা ধংস সাধন হতে পারে বা হবে বলে মনে হয়।‘

এই আইনে কোনো সন্ত্রাসবাদী দলের সদস্য কে বা কারা তা কিভাবে নির্ধারিত হবে সে ব্যাপারে নির্দিষ্টভাবে কিছু বলা নেই। বেআইনি কাজ বোঝাতে গিয়ে অত্যাধিক বড় ব্যাখ্যা প্রণয়ন করা হয়েছে, যেমন সেই সমস্ত কার্যকলাপ যাতে দেশের সার্বভৌমত্ব বা দেশের ভুখন্ডের প্রতি যে কোনো রকমের দাবি, প্রশ্ন বা ব্যহত করার চেষ্টা অথবা যে সকল কাজের দ্বারা দেশের প্রতি অসম্মান প্রদর্শিত হয়েছে বলে মনে করা হয়।

এই আইনি সংজ্ঞা ভারতবর্ষের সংবিধান এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন দ্বারা স্বীকৃত মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, একত্রিত বা সম্মিলিত হওয়ার অধিকারকে অত্যাধিক রকম সঙ্কুচিত করে।

এই আইন বলে বিচারাধীন বন্দিকে ন্যুনতম ৩০দিন এবং অধিকতম ১৮০ দিন আটকে রাখা যায়, যা আন্তর্জাতিক মানদন্ডের অনেক বেশি। এই অনুবিধির দ্বারা ভারতবর্ষ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন লঙ্ঘন করেছে, যেখানে বলা হয়েছে যে, সমস্ত আটক বন্দিকে দ্রুত তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্বন্ধে অবহিত করতে হবে, যুক্তিসংগত সময়সীমার মধ্যে আদালতে পেশ করতে হবে অথবা ছেড়ে দিতে হবে।

এই আইনে বিচারাধীন বন্দিকে যাতে অমানবিক অত্যাচার এবং অন্যান্য হিংস্র নিষ্ঠুরতার শিকার না হতে হয় সে বিষয় স্পষ্ট করে কিছু বলা নেই। এই আইনের কোনো ধারায় গুরুতর আইনভঙ্গে অভিযুক্ত ব্যক্তির আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নেই অথচ আইনের পরিভাষায় আদালতে দোষী সাব্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত একজন ব্যক্তিকে নিরপরাধ হিসাবেই ধরতে হবে।

২০০৫ সাল থেকে মধ্য ভারতের বহু সামাজিক-রাজনৈতিক কর্মী এবং অন্যান্য মানবাধিকার আন্দোলনের কর্মীদের মিথ্যা অভিযোগে জেলে পোরা হয়েছে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পিপলস্‌ ইউনিয়ন ফর সিভিল লিবারটিস এর বিনায়ক সেন, কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়ার আদিবাসী নেতা কারতাম জোগা।

ভারতবর্ষের মানবাধিকার রক্ষা আন্দোলনকারীরা এমন অসংখ্য উদাহরণ তুলে এনেছেন যেখানে এই আইনকে অন্যায়ের হাতিয়ার করা হয়েছে। আদিবাসী এবং দলিত সমাজের মানুষকে তাদের ন্যায়সঙ্গত অধিকার থেকে বঞ্চিত করার উদ্দেশ্যে, বাক্ স্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণভাবে একত্রিত হওয়ার সাংবিধানিক স্বীকৃতিকে নস্যাৎ করে, তাদের জেলে বন্দি করার লক্ষে, মিথ্যা অভিযোগ এবং সাজানো তথ্যের ভিত্তিতে ইউ এ পি এ আইনকে যথেচ্ছ ভাবে ব্যবহার করা হয়েছে।

বহু ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার রক্ষাকারী সংগঠন এবং মানবাধিকার রক্ষাকারী সংগঠনের কর্মীদের প্রতিকূল পরিবেশের কথা ভেবে ইউনাইটেড নেশনস এর বিশেষ আধিবেশনেও এই আইন তুলে নেবার আবেদন জানানো হয়েছে।

ছত্তিশগড় স্পেশাল পাবলিক সিকিউরিটি অ্যাক্ট

২০০৫ সালে মাওবাদী সশস্ত্র দলের বিরুদ্ধে লড়াই করার উদ্দেশ্যে ছত্তিশগড় স্পেশাল পাবলিক সিকিউরিটি অ্যাক্ট এর প্রবর্তন করা হয়। এই আইনের বিভিন্ন ধারা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের প্রতি ভারতবর্ষের দায়বদ্ধতার বিরোধী।

বেআইনি কার্যকলাপের সংজ্ঞা হিসেবে এই আইনে যা বলা হয়েছে তা অতিরঞ্জিত এবং অনেকাংশেই অবাস্তব। উদাহরণ স্বরূপ, এই আইনে বলা হয়েছে ‘জনগণের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বাধা হতে পারে বলে যদি মনে হয়’ বা ‘সরকারি আধিকারিককে ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যে সাজানো হয়’ বা ‘চলতি আইন এবং প্রতিষ্ঠানকে অগ্রাহ্য করা বা অগ্রাহ্য করতে যদি উৎসাহিত করা হয়’ তবে তা আইনভঙ্গের সামিল হিসাবে বিবেচিত হবে।

বেআইনি সংগঠন এর সংজ্ঞায় সেই সমস্ত সংগঠনকে ধরা হয়েছে যারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে বেআইনি কার্যকলাপকে উৎসাহিত করে। যে কোনো সংগঠন বা ব্যক্তি যদি বেআইনি কার্যকলাপ করে বা করতে পারে বা করবার পরিকল্পনা করে তবে ৭ বছর পর্যন্ত জেল হতে পারে। বেআইনি সংগঠনের সদস্য হলেও তার ৩ বছরের জেল হতে পারে।

এই ধরণের বিস্তারিত সংজ্ঞা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের প্রতিকূল এবং ভারতীয় সংবিধান স্বীকৃত মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণভাবে একত্রিত হওয়ার বিরোধী। সন্ত্রাসবাদের খবর প্রকাশকেও ‘‘জনগণের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বাধা হতে পারে” বলে এই আইনে অভিযোগ আনা যেতে পারে।

সন্ত্রাসবাদ বা সেই সম্পর্কিত যে কোনো আইনকে সঠিক এবং নিশ্চিত হতে হয়। সন্ত্রাস দমন আইনকে উপযুক্ত এবং নির্দিষ্ট মাত্রায় প্রয়োগ করা উচিৎ। ইউনাইটেড নেশনস এর মানবাধিকার রক্ষা কমিটি আন্তর্জাতিক সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকার চুক্তিতে স্বাক্ষর কারি মুখ্য দেশ ভারতবর্ষকে এই বার্তা দিয়েছে যে আহ্বায়ক দেশ হিসেবে ভারতবর্ষকে এটা নিশ্চিত করতে হবে যে, সন্ত্রাসদমন আইনের প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রয়োজনাতিরিক্ত এমন কিছু করা চলবে না যাতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ব্যহত হতে পারে। মানবাধিকার রক্ষাকারী সংগঠনের কর্মীদের প্রতিকূল পরিবেশের কথা ভেবে ইউনাইটেড নেশনস এর বিশেষ আধিবেশনেও সি এস পি এ আইন তুলে নেবার আবেদন জানানো হয়েছে।

দমন নীতির বাস্তব চিত্র

ছত্তিশগড়ের ইতিহাসে সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীদের ওপর আক্রমণের এটাই প্রথম ঘটনা নয়। ২০০৫ থেকে ২০০৭ পর্যন্ত মানবাধিকার রক্ষা আন্দোলনের কর্মীরা একদিকে সালোয়া জুড়ুম নামক সশস্ত্র সংগঠণ এবং অন্যদিকে রক্ষীবাহিনীর দ্বারা শারীরিক নিগ্রহ, ভীতিপ্রদর্শন, হিংসা, আকারণ বন্দিদশা, অত্যচার এবং যৌন নিগ্রহের শিকার হয়েছিলেন।

২০১১ সালে সুপ্রিম কোর্ট ছত্তিশগড় রাজ্য এবং ভারত সরকারকে আদেশ দেয় যে, রাষ্ট্রীয় সাহায্যপ্রাপ্ত বেসামরিক রক্ষীবাহিনীকে ভেঙ্গে দিতে হবে ও সমস্ত অস্ত্র বাজেয়াপ্ত করতে হবে। সেইসঙ্গে ওই সংগঠনের সদস্যদের নিরাপত্তা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।

যদিও তারপরে সালোয়া জুডুমকে অন্যরূপে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা হয়েছিল। ২০১৫ সালের মে মাসে, কংগ্রেসের যে নেতার হাতে সালোয়া জুডুম তৈরি হয়েছিল তার ছেলে মাওবাদীদের প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে ‘বিকাশ সংঘর্ষ সমিতি’ (ডেভেলপমেন্ট স্ট্রাগল কমিটি) নামক সালোয়া জুডুমের মতো একটা সংগঠন তৈরি করে।

বিগত কয়েকমাস ধরে বিভিন্ন দলের স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা, আপাতদৃষ্টিতে পুলিশের সমর্থনে, কিছু সংগঠন তৈরি করেছে। সামাজিক একতা মঞ্চ সেই ধরণের একটা সংগঠন যারা খোলাখুলি সরকার বিরোধীদের ওপর চড়াও হচ্ছে। এই ধরণের সংগঠনগুলি ক্রমশঃ সরকার বিরোধীদের বিরুদ্ধে আরও বেশি আক্রমনাত্মক হয়ে উঠছে।

Advertisements

নেপালঃ চাঁদ নেতৃত্বাধীন সিপিএন(মাওবাদী)’র ডাকা বনধে জনজীবনে ব্যপক প্রভাব

Chitwan-bandh

অনূদিতঃ

গত শুক্রবার নেপালের চিতওয়ানে নিজ দলের কমরেডদের গ্রেফতারের প্রতিবাদে নেত্র বিক্রম চাঁদ নেতৃত্বাধীন সিপিএন মাওবাদী’র ডাকা ধর্মঘটে জনজীবনের উপর ব্যপক প্রভাব পড়েছে।

ভোর থেকেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মার্কেট ও দোকানপাটের লোকজন তাদের কর্মক্ষেত্র বন্ধ রাখে।  এসময় ছোট-রুটের যানবাহন রাস্তা বন্ধ করে দেয়।  চিতওয়ানের জেলা পুলিশ অফিস বলে যে, সকাল থেকেই দীর্ঘ রুটের গাড়ীগুলোকে নিরাপত্তা বাহিনী পাহাড়া দিয়ে তাদের নিজ নিজ গন্তব্যস্থলে পৌঁছে দেয়।  DPO এর এসপি বসন্ত বাহাদুর কুনোয়ার বলেন, পুলিশ এ সময় পুলচোক-লোথার এবং কুরিন্তার এলাকা থেকে গাড়ি পাহাড়া দিয়েছিল। নেত্র বিক্রম চাঁদ নেতৃত্বাধীন সিপিএন মাওবাদী ঝাপ, জুমলা এবং ধান্দিং থেকে তার ক্যাডারদের গ্রেফতারের প্রতিবাদে গতকাল মেছি এবং কারনালি অঞ্চলে এই বনধ ডেকেছিল।

সূত্রঃ  https://thehimalayantimes.com/nepal/bandh-cripples-life-chitwan/

 


ব্রাজিল: জনগণের অধিকার প্রতিরক্ষার জন্য বিপ্লবী ফ্রন্টের কমরেডদের পোস্টার

Cartaz 3 aclasseoperaria


বাংলাদেশের কৃষক ও কৃষির সমস্যা

FMS2-1427781954

বাংলাদেশের কৃষক ও কৃষির সমস্যা

বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ।  মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭০% এখনো গ্রামে থাকেন।  যদিও জাতীয় আয়ের বড় অংশ এখন আর কৃষি নয়, কিন্তু কৃষির সাথে জড়িত দেশের নিরংকুশ প্রধান অংশের জনগণ।  কৃষির সাথেই তাদের ভাগ্য জড়িয়ে রয়েছে। এমনকি যারা শহরে বিভিন্ন ধরনের পেশায় জড়িত, তারাও কৃষি ও কৃষকের সমস্যার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছেন।
শহরাঞ্চলের ৩০ লক্ষ গার্মেন্টস শ্রমিক, ৪০ লক্ষ রিক্সা ভ্যান-শ্রমিক, লক্ষ লক্ষ অন্যান্য মজুর, ফেরিওয়ালা, এমনকি সাধারণ মধ্যবিত্তদেরও বিরাট অংশ এখনো গ্রাম কেন্দ্রীকই রয়ে গেছেন। সুতরাং, এটা অনস্বীকার্য যে, গ্রাম, কৃষি ও কৃষকের মুক্তি ও উন্নয়নের উপরই সমগ্র দেশ ও জনগণের মুক্তি নিহিত।
কিন্তু বাংলাদেশের কৃষি ও কৃষকের পরিস্থিতিটা কী?
টেলিভিশনের পর্দায় কিছু সংখ্যক ভাগ্যবান কৃষক ও কৃষি-বুর্জোয়ার উন্নতির কাহিনী ছাড়া বাস্তবে ব্যাপক কৃষক জনগণের ভাগ্যের-যে কোন মৌলিক পরিবর্তন হয়নি তা প্রায় সবাই একবাক্যে স্বীকার করবেন।
বৃটিশ ও জমিদারী আমলে কৃষকের সমস্যা যে ধরনের ছিল এখন অবশ্য সেরকমটি নেই।  কিন্তু শোষণ-বঞ্চনা থেকে কৃষকের মুক্তি ঘটেনি।  খোদ কৃষকের একটা বড় অংশের হাতে তেমন একটা জমি নেই।  জোতদার, কৃষি বুর্জোয়া, ধনী কৃষক, অকৃষক শহুরে ভদ্রলোক, মাছ-মুরগী-ফল খামারের ধনী মালিক, এবং রাষ্ট্র- এদের হাতে ব্যাপক কৃষি-জমি জমা হয়ে রয়েছে।  জমির বড় অংশ চলে যাচ্ছে রাস্তা-ঘাট নির্মাণ, হাউজিং প্রজেক্ট, ইটখোলা, চিংড়ী চাষ এবং শিল্প-কারখানার নামে বড় বড় ধনী, বিদেশী সাম্রাজ্যবাদী ও ভারতীয় কোম্পানী ও তাদের রাষ্ট্রের হাতে।  জলা-পুকুর-খাল-নদী-হাওর-বাওড় প্রভৃতির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।  হাট-বাজার-নদী-ঘাট-জলাশয়-হাওর ইত্যাদির ইজারাদারী কৃষকের জীবন-জীবিকার উপর বড় বোঝা হয়ে রয়েছে।
কৃষকের উপর মহাজনী শোষণও অব্যাহত রয়েছে ভিন্ন রূপে।  আদি মহাজনের স্থান দখল করেছে এনজিওগুলো, যারা ক্ষুদ্র ঋণের নামে এক বিরাট সুদী কারবারের জাল বিছিয়ে রেখেছে সারা দেশ জুড়ে।  এভাবে কৃষকের শ্রমের ফলের একটা বড় অংশ তারা লুটে নিচ্ছে।  এর সাথে পুরনো ধরনের সুদের ব্যবসাও চলছে। ফলে কৃষক বিপদে পড়ে ঋণে জর্জরিত হচ্ছেন।  এক্ষেত্রে রাষ্ট্রও ভাগ বসাচ্ছে। ব্যাংকের ঋণ আনতে কৃষককে শতকরা ১০ থেকে ২০ ভাগ পর্যন্ত ঘুষ দিতে হচ্ছে।
কৃষকের নতুনতর সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে কৃষির উন্নয়নের নামে।  সেচ, সার, কীটনাশক, চাষ- সবকিছুতে ‘উন্নত’ প্রযুক্তি ঢুকে পড়েছে।  কিন্তু এর ফল যাচ্ছে বড় ব্যবসায়ী, এবং সাম্রাজ্যবাদী ও ভারতীয় কোম্পানীগুলোর হাতে। অন্যদিকে এর ফলে কৃষকের বেকারত্ব আরো বেড়ে গেছে।  তারা কাজের আশায় শহরে পাড়ি জমাতে বাধ্য হচ্ছেন। পুরুষেরা রিক্সা-ভ্যান চালানো, ফেরিওয়ালার কাজ, ক্ষুদে ব্যবসা বা দোকানদারী, পরিবহন শ্রমিক, নির্মাণ শ্রমিক হচ্ছেন।  বৌ-ঝিদেরকে শহরের গার্মেন্টস, বাসা-বাড়ির কাজে পাঠাতে তারা বাধ্য হচ্ছেন।  এমনকি সর্বস্বান্ত হয়ে অনেক গ্রামীণ নারী দেশে ও ভারত-পাকিস্তান-মধ্যপ্রাচ্যে পতিতাবৃত্তিতে নাম লিখাচ্ছেন; অনেক সর্বস্বান্ত কৃষক ভিক্ষাবৃত্তি বেছে নিচ্ছেন; অনেক তরুণ হাইজ্যাক, চাঁদাবাজি, মাস্তানী, চুরি-ডাকাতিতে নেমে পড়ছেন।  অনেকে জমি-জিরাত বিক্রি করে লাভের আশায় আত্মীয়-পরিজন ছেড়ে কঠোর পরিশ্রম, অবমাননা ও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন।
কৃষকের আরো বড় সমস্যা হয়েছে কৃষি বাজার-নির্ভর হয়ে পড়াতে।  কৃষি পণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে বড় বড় ব্যবসায়ীরা, যারা আওয়ামী লীগ-বিএনপি’র মত বুর্জোয়া পার্টি এবং পুলিশ-আমলাদের সহযোগিতায় ও তাদেরকে বখরা দিয়ে সিন্ডিকেট গঠন করে থাকে।  তারা কৃষকের উৎপাদিত ফসল পানির দামে কিনে নিচ্ছে এবং পরে বেশি দামে বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা কামিয়ে নিচ্ছে।  আবার কৃষি উপকরণের ব্যবসাও তারা এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করে যে, কৃষকরা বিরাটভাবে শোষিত হন।
রাষ্ট্র ও বুর্জোয়ারা কৃষির উন্নতি ও খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার বড় বড় বুলি আওড়ালে কী হবে, বাস্তবে কৃষি আরো বেশি করে বিদেশ নির্ভর হয়ে গেছে।  কৃষির উপকরণাদি আজ কৃষকের হাতের বাইরে।  আজ কৃষককে ও জনগণকে তেল, ডাল, পেঁয়াজ, চিনি, মাছ সবই বাজার থেকে কিনতে হয়, যার প্রধান/বিরাট অংশ বিদেশ থেকে আসে।  কৃষির উন্নয়নের নামে পরিবেশ, প্রকৃতি ও কৃষির এমন বিকৃতি ঘটানো হয়েছে যে, প্রাকৃতিক মাছ আজ বিলুপ্ত প্রায়; মাছে-ভাতে বাঙালি আজ বহু বিচিত্র মাছের নামটিও ভুলতে বসেছে।  ভেজাল সার ও রাসায়নিক সার ব্যবহারে জমির উর্বরা শক্তি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। হাইব্রিডের নামে ফসলের বৈচিত্র্য হারিয়ে যাচ্ছে।  নদী-খাল-পুকুর-জলাশয় ভরে যাচ্ছে।  বৃষ্টির পানি আশির্বাদের বদলে কষ্টের বন্যা ডেকে আনছে।  পানির স্তর নেমে যাচ্ছে। বনাঞ্চল ধবংস হয়ে গেছে।  পাহাড় কেটে ফেলা হয়েছে। নদীভিত্তিক যাতায়াত ও পরিবহন ব্যবস্থা বিলুপ্তির পথে। এ সবকিছুর সাথেই কৃষকের পেশা ও ভাগ্য জড়িত।
যে ভারত দেশের প্রায় সমস্ত বড় নদীর উজানে বাঁধ দিয়ে নদী-পানি-প্রকৃতি ও কৃষির সর্বনাশ করেছে, তাকে শাসকরা বলছে বন্ধুরাষ্ট্র।  বড় ধনীদের পার্টি ও রাষ্ট্রের এই ‘বন্ধু’র দেয়া ফারাক্কা, তিস্তার পর এখন টিপাইমুখ বাঁধ বাংলার মানুষের গলায় ফাঁস হয়ে ঝুলছে, আর শাসকশ্রেণীর বর্তমান আওয়ামী সরকার ভারতের এ কাজে নিঃশর্ত সহযোগিতা করে বিদেশি-দালালীর এক অনন্য নজির স্থাপন করছে।
প্রকৃতপক্ষে কৃষকের সমস্যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু নয়।  তবে কৃষি ও কৃষকের সমস্যাই সারা দেশের সমস্যাবলীর কেন্দ্রে।  তাই, কৃষকের মুক্তির উপরই দেশের সামগ্রিক মুক্তি নির্ভর করে।
কিন্তু এটা দিবালোকের মতই স্পষ্ট যে, শাসক বড় ধনী শ্রেণি, যারা বিদেশি শোষক বুর্জোয়াদের দালালী করে, তাদের ক্ষমতা ও রাষ্ট্র কৃষকের প্রকৃত মুক্তি আনতে সক্ষম নয়।  বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর বিগত ৩৯ বছর ধরে এটা প্রমাণিত হয়েছে।  পাকিস্তান আমলে পাট-চাষে কৃষকের শোষিত হওয়ার কথা বলে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছিল।  আর এখন এই বাঙালি শাসক ও তাদের বিদেশি প্রভুদের শোষণ-লুণ্ঠনে গোটা পাট-শিল্পটিই প্রায় সম্পূর্ণ ধবংস হয়ে পড়েছে।  এর কারণ হলো, কৃষক-বান্ধব কোন শ্রেণি, সরকার ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এগুলো হলো শহরকেন্দ্রীক বড় বড় ধনী ব্যবসায়ী, আমলা, বুর্জোয়া রাজনীতিবিদদের স্বার্থরক্ষাকারী। কৃষক যাতে একেবারে মরে না যায়, এবং বিদ্রোহে সামিল না হয়, সেজন্য তারা কৃষককে কিছু কিছু উপকার করার ভান দেখায়। কিন্তু এসব চুনকামে কৃষকের ও কৃষির কোন বিপ্লবী রূপান্তর ঘটবে না। কৃষকের প্রকৃত মুক্তির জন্য ব্যাপক সংখ্যাগুরু দরিদ্র কৃষককে সমাজতন্ত্রের পথে যেতে হবে; আর সেজন্য প্রথমে সকল প্রকৃত কৃষক ও দেশপ্রেমিক মানুষের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।  কৃষক রাষ্ট্রক্ষমতা পেলেই মাত্র তার নিজের মত করে কৃষিকে পুনর্গঠন করতে পারবে। যাতে কৃষক, কৃষি, ব্যাপক জনগণ ও দেশের মুক্তি আসবে। এজন্য কৃষকের ছদ্মবেশী শত্র“ বড় ধনী শ্রেণীর বুর্জোয়া পার্টিগুলোর খপ্পর থেকে তাদেরকে বেরিয়ে এসে শ্রমিক-কৃষক-সাধারণ মধ্যবিত্তের রাজনীতিকে আঁকড়ে ধরতে হবে। কৃষককে আজ এ পথেই এগিয়ে আসতে হবে।  সচেতন হতে হবে। সংগঠিত হতে হবে। লড়াই-এর ময়দানে নামতে হবে।  

সূত্রঃ  কৃষক সমস্যা ও কৃষক সংগঠন সম্পর্কে, প্রকাশকঃ কৃষক মুক্তি সংগ্রাম


মাওবাদী দম্পতি বিকাশ ও তারা’র সিআইডি হেফাজত

মাওবাদী নেতা বিকাশ (বাঁদিকে), তারা (ডানদিকে)

মাওবাদী দম্পতি বিকাশ (বাঁদিকে), তারা (ডানদিকে)

শিলদা কাণ্ডের মামলায় অভিযুক্ত মাওবাদী দম্পতি বিকাশ ও তারাকে জেরা করার জন্য সিআইডি হেফাজতের আবেদন মঞ্জুর করল ঝাড়গ্রাম আদালত। শুক্রবার ঝাড়গ্রাম প্রথম এসিজেএম আদালতের বিচারক প্রসূন ঘোষ দু’জনকেই সাতদিন সিআইডি হেফাজতে রাখার নির্দেশ দেন।

গত ২৭ মে এই মামলায় প্রথমবার বিকাশকে ঝাড়গ্রাম আদালতে হাজির করা হয়। বিকাশকে সাত দিন জেল হাজতে রাখার নির্দেশ দিয়েছিল আদালত। জেল হাজতের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরে এ দিন বিকাশকে আদালতে হাজির করার ধার্যদিন ছিল।  গত ২১ মে বিকাশের স্ত্রী তারাকে সাত বছর আগে সাঁকরাইল থানার পুরনো একটি মামলায় তেরো দিনের জন্য সিআইডি হেফাজতে রাখার নির্দেশ দিয়েছিল ঝাড়গ্রাম দ্বিতীয় এসিজএম আদালত। সিআইডি হেফাজতের মেয়াদ শেষ হওয়ায় এ দিন তারারও আদালতে হাজিরার দিন ছিল।  সরকারি কৌঁসুলি অনিল মণ্ডল জানান, তদন্তের স্বার্থে জেরা করার জন্য বিকাশ ও তারা দু’জনকেই হেফাজতে চেয়েছিল সিআইডি। বিচারক দু’জনকে সাতদিন সিআইডি হেফাজতে রাখার নির্দেশ দেন।

২০১০ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি শিলদার ইএফআর ক্যাম্পে হামলা চালায় মাওবাদীরা।  নিহত হয় ২৪ জন জওয়ান। ওই মামলার অন্যতম অভিযুক্ত হলেন বিকাশ ও তারা।


একুশ: বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদ বনাম বিপ্লবী দৃষ্টিভঙ্গি

1423933910_21

একুশ: বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদ বনাম বিপ্লবী দৃষ্টিভঙ্গি

(ফেব্রুয়ারী, ’৯৫)

(১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারী, ভাষা আন্দোলনের ‘মহান শহীদ দিবস’ হিসেবে পরিচিত।  পাকিস্তানি আমলা মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া-সামন্ত শাসক শ্রেণীর নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংগ্রামের এটি এক বিরাট মাইল ফলক।  উর্দু ভাষাকে এদেশের বাঙালী ভাষাভাষী জনগণের উপর চাপিয়ে দেয়ার বিরুদ্ধে সাহসী সংগ্রামে সেদিন পাকিস্তানি শাসকদের বুলেটে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন সালাম, বরকত, শফিক, জব্বার এই মহান বীরেরা।  আজ ১৯৯৫ সালের ফেব্রুয়ারী।  ১৯৭১ সালের পর এ দেশ থেকে বিতাড়িত হয়েছে পাকিস্তানিরা।  এখন শ্রমিক-কৃষক-জনগণের রক্ত চুষে খাচ্ছে পাকিস্তানিদের পরিবর্তে বাঙালি আমলা-মুৎসুদ্দি শাসক শ্রেণী।  আজকের এই শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে একুশকে আমরা কিভাবে দেখব তার উপরই আজকের এই লেখা। )

প্রতি বছরের ফেব্রুয়ারী মাসটি আসলেই এদেশের শাসক শ্রেণী মেতে ওঠে দেশপ্রেম ও বাঙালীত্ব’র উন্মাদনায়। ‘রমনা বটমূলে’ শখের ‘পান্তাভাত’ খাওয়াসহ বুর্জোয়া পুরুষদের ‘পাঞ্জাবী’ আর মেয়েদের ‘সাদা শাড়ী’ পড়ার ধুম পড়ে যায়। ধুম পড়ে যায় ‘শহীদ মিনার’-এ যাওয়ার, ফুল দেওয়ার। ধানমন্ডি, গুলশান, বনানী, বারিধারাসহ গণবিচ্ছিন্ন অভিজাতদের এসব দেখানো ‘বাঙালীত্ব’ কাণ্ডকারখানা এতই বেমানান যে বুর্জোয়া পেটি বুর্জোয়া কবি-সাহিত্যিকেরা পর্যন্ত এটার প্রতি কটাক্ষ সমালোচনার তীর ছুঁড়েছেন অনেকবার। তবে সে ‘সমালোচনা-মন্তব্য’ বর্তমানে একুশে ফেব্রুয়ারী পালনের যৌক্তিকতাকে ভুল প্রমাণ করে না, বরং এটাকে কিভাবে আরো আবেদনময়, অকৃত্রিম, যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য করে বুর্জোয়াদের মরা গাঙে জোয়ার আনানো যায় সমালোচনাগুলো সে সবেরই ‘প্রেসক্রিপসন’।  বলা যায়, এদেশের মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবীরা (শ্রমজীবী-কর্মজীবীরা মূলত নয়) বিরাট আকারে এই ফেব্রুয়ারী মেলায় ভেসে যায়। সেই সাথে গোপন থাকে না এই আত্মবিকৃত বুদ্ধিজীবী-শিল্পী-সাহিত্যিকদের ‘দেশপ্রেম’-এর পরিবর্তে ‘বিদেশ প্রেম’, মার্কিন-বৃটেন-ফ্রান্স-ভারত-এর সাম্রাজ্যবাদী-সম্প্রসারণবাদী গণবিরোধী বা পেটি বুর্জোয়া গণবিচ্ছিন্ন সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রতি তাদের অগাধ অনুরাগ। তাই একুশের বই মেলায় জ্যাকসন, শাহরুখ খান, সঞ্জয় দত্ত, ম্যাডোনা-মাধুরীদের পোষ্টার, সুনীল, সমরেশ মজুমদারদের উপন্যাস- এসব ধুমসে বিক্রি হয়। আগমন ঘটে জাতীয় ‘প্রেম পার্টি’র ‘পাত্রী চাই’ বিজ্ঞাপন সমৃদ্ধ নারী জাতির জন্য অবমাননাকর ক্যাপ-এর বিক্রয় ও প্রদর্শনী।  তবে এসব কিছুর মধ্যে একটি ব্যাপার খুবই লক্ষণীয় তা হচ্ছে গ্রামের গরীব-মাঝারী-ভূমিহীন-কৃষক-জেলে-তাঁতী-কামার-কুমোর যারা সংখ্যায় এদেশের সবচেয়ে বড় জনগোষ্ঠি তাদের মধ্যে একুশ উন্মাদনা নেই। শহরের রিক্সাচালক-বস্তিবাসী-গার্মেন্টস শ্রমিক-জুট-কটন মিল শ্রমিক-হকার-হোটেল-নির্মাণ শ্রমিক- এদের মধ্যে এই উন্মাদনা নেই।

কেন শ্রমিক জনসাধারণকে আজ একুশ টানতে পারে না?
একজন বুর্জোয়া-পেটি বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবী বা দার্শনিক অন্ধের মত বলবে, কারণ হচ্ছে, এদেশের জনগণ গরু-ছাগল, তাদের রাজনৈতিক সচেতনতা নেই। কিন্তু আমরা যদি বলি এটা জনগণের সঠিক রাজনৈতিক চেতনারই প্রতিফলন? নিশ্চয়ই আমাদের রাজনৈতিক জ্ঞানের স্বল্পতা নিয়ে এসব বুদ্ধিজীবীদের তখন জ্ঞানগর্ভ লেকচার-এর সীমা থাকবে না। তা না থাকুক, আমরা বরং পাল্টা প্রশ্ন করতে পারি, জনগণের সঠিক রাজনৈতিক চেতনার মাপকাঠিটি হচ্ছে সোজা বাংলায়, সেই রাজনীতিতে জনগণের স্বার্থ আছে কিনা।  ফেব্রুয়ারিতে আমরা কি দেখছি? দেখছি, কবিতা উৎসব- আর তাতে এদেশের বুর্জোয়া গণশত্রুদের সবচেয়ে সংগঠিত দল আওয়ামী-মুজিব প্রেমিকদের প্রাধান্য।  আর আরেকটি গ্রুপ হচ্ছে আওয়ামী বিরোধী বুর্জোয়া-পেটি বুর্জোয়া, যাদের কেউ বি.এন.পি., কম হলেও কেউ কেউ এরশাদের জাতীয় পার্টিভুক্ত বা প্রভাবিত। বাম নামধারী সংশোধনবাদীরা এদের পিছে পিছেই অভিন্ন শ্লোগান নিয়ে ছোটে।  তাই দেখা যায়, প্রতি বছর, একুশে ফেব্রুয়ারির মুল অনুষ্ঠান শুরু হয়, রাত বারটা এক মিনিটে মুজিব বা জিয়ার ছবি টানানো নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা-সংঘর্ষ-গোলা-গুলির মধ্য দিয়ে, যেখানে খুনোখুনির ঘটনাও বিরল নয়।  তাহলে এখন এ প্রশ্নটি করা যায়, এই সব ছবি’র সাথে গরীব জনগণের স্বার্থের সম্পর্কটা কি? ’৭১-এর পর একে একে মুজিব-জিয়া-এরশাদ সরকারসহ আজকের খালেদা জিয়া পর্যন্ত সব সরকারই ধনীদের ও বিশ্বব্যাংক, আই-এম-এফ, সাম্রাজ্যবাদ, ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের স্বার্থরক্ষক সরকার।  একই সাথে গরীব শ্রমিক-কৃষকসহ এদেশের ৯০% জনগণের ঘাড় মটকে রক্ত খাওয়া সরকার।  এরা সবাই বড় ধনী বড় আমলাদের শাসক শ্রেণীরই একেকটি অংশ, তাদেরই জাতভাই।  আবার তারা বাঙালী ও বাংলাদেশীও বটে।
তাহলে কেন রিক্সাচালক একুশ নিয়ে মাতামাতি করবে? একজন গার্মেন্টস শ্রমিক যে ১৮ ঘণ্টা কাজ করে দিনে ৫০ টাকার বেশি মজুরী পায় না, এমনকি কেউ কেউ ১৫/২০ টাকা পায়, সে কেন রক্ত চোষা গার্মেন্টস মালিকদের দল আওয়ামী লীগ-বি.এন.পি.-জাতীয় পার্টির সাবেক বা বর্তমান মন্ত্রী-এমপি-নেতাদের সাথে দাঁড়িয়ে একুশ পালন করবে ? যারা বস্তি ভাঙ্গছে এবারের শীতে একুশে সেই বস্তির বস্তিবাসীরা কেন বস্তি ভাঙ্গার বড় লোকদের সাথে খালি পায়ে একই মিছিলে এসে দাঁড়াবে।  বরং সেই বস্তিবাসী কি বড় লোকদের সবাইকে একই ‘বাঙালী’ সাজবার ষড়যন্ত্রকেই রুখে দাঁড়াবে না? গার্মেন্টস শ্রমিক ’৫২ সালের শত্রু পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠি, যারা আজ আর সামনে নেই- পরাজিত বিতাড়িত হয়েছে- তাদের বদলে সংগ্রাম করবার জন্য কি শত্র“ হিসেবে রক্তচোষা মালিকদেরই বেছে নেবে না? তারা কি মালিকদের অস্ত্র ‘একুশ’-কে পিছনে ফেলে আজকের মালিক বিরোধী শ্রেণী সংগ্রামকেই আঁকড়ে ধরবে না? এসব কারণেই আজ এটা স্পষ্ট শ্রমিক-কৃষকসহ ৯০ ভাগ ও গরীব শ্রমজীবী জনগণ যখন একুশ নিয়ে মাতামাতি না করে নির্লিপ্ত থাকেন তখন তাঁরা উন্নত রাজনৈতিক চেতনারই পরিচয় দেন।  আজ কেবল নির্লিপ্ত থাকা নয়, শাসক শ্রেণীর শ্লোগান, ‘ঘাতকদের কোন জাত নেই, শ্রেণী নেই- ঘাতক কেবল ঘাতক’-এর পরিবর্তে গরীব জনগণের শ্লোগান দেবার সময় এসেছে ঘাতক শাসক বড় বুর্জোয়া বড় আমলাদের পরাস্ত কর, উচ্ছেদ কর।  ওদের উগ্র জাতীয়তাবাদী প্রতারণার অস্ত্রকে রুখে দাঁড়াও।
আজ ‘আমি কি ভুলিতে পারি’ এই গান দিয়ে ’৫২ সালকে মনে করিয়ে দেয়া হলেও গরীব জনগণকে ভুলিয়ে দেবার চেষ্টা করা হচ্ছে, ’৯৫ সালের শোষণ-অন্যায়-নির্যাতনের কথা। তার আজকের শত্রু  বাঙালী বড় বুর্জোয়াদের কথা।  কিন্তু জনগণ এটা ভুলতে পারে না।  জনগণের চেতনা পেটি বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীদের মতো অতটা ভোতা নয়।  জনগণ আজ এ কথা বলে গর্ব বোধ করতে পারে না, আমরা সবাই বাঙালী বা বাংলাদেশী।  বরং জনগণের চেতনায় একথাটাই খোদাই করা, আমার শত্রু রক্তচোষা ঐ বাঙালী বুর্জোয়ারাই। একই সাথে আমার শত্রু মার্কিন-ভারতসহ বিদেশী বুর্জোয়ারা। অন্যদিকে সারা পৃথিবীর নির্যাতিত জনগোষ্ঠিই আমার বন্ধু। তাই সর্বহারা শ্রেণীর কোন দেশ নেই, জাতি নেই, সারা পৃথিবীতেই তাদের স্বার্থ এক- তা হচ্ছে শোষক বুর্জোয়া শ্রেণী, সাম্রাজ্যবাদকে উচ্ছেদ, তাদের এই পুরাতন দুনিয়াটাকে উচ্ছেদ করে শ্রেণীহীন এক নতুন পৃথিবী কমিউনিজমের দিকে এগিয়ে যাওয়া।

পার্বত্য চট্টগ্রামে জাতিগত নিপীড়ন, গণহত্যা বনাম একুশ 

১৪টি বড় বড় উল্লেখযোগ্য গণহত্যায় এ পর্যন্ত পাহাড়ী নির্যাতিত জাতিসত্ত্বার হত্যা করা হয়েছে ১,১৬৭ জনকে। (চিৎকার, নভেম্বর ’৯৪ দেখুন) এই গণহত্যাগুলো করেছে ’৭১-এর মুজিব বাহিনী (মুক্তি বাহিনী), ’৭১-’৭৫-এর শেখ মুজিব সরকার, জিয়া সরকার, এরশাদ সরকার এবং সাম্প্রতিক কালের খালেদা-হাসিনা-গোলাম আযমদের সংসদীয় স্বৈরাচার।  উল্লেখিত সব সরকার, তার বাহিনী, তার পাণ্ডারাই হচ্ছে বাঙালী।  অর্থাৎ আজ বাঙালী জাতিরই শোষক অংশ পাহাড়ে অন্যান্য সংখ্যালঘু জাতিসত্ত্বার উপর পাকিস্তানী বাহিনীর মতোই চালাচ্ছে গণহত্যা, গণধর্ষণ, ধ্বংসযজ্ঞ, জ্বালাও-পোড়াও, জমি-পাহাড় দখল, আর্মি শাসন, জোর করে বাঙালী ঢুকিয়ে পাহাড়ীদের সংখ্যালঘু করার জাতিগত নিপীড়ন-বর্বরতা- এ সবগুলোই। একুশের বড় সীমাবদ্ধতা এখানে ছিল, একুশ সমস্ত সংখ্যালঘু জাতিসত্ত্বাসমূহের অধিকারের পক্ষের সংগ্রাম ছিল না, একুশের একটি প্রধান শ্লোগান ছিল ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’।  এটা এমন ছিল না যে, “সকল জাতির নিজ নিজ ভাষা ব্যবহারের অধিকার চাই”। একই সাথে যে বাংলা নিয়ে আন্দোলন, সেই বাংলার কর্তৃত্ব যখন শোষক খুনী বাঙালী বুর্জোয়াদের হাতে, তখন একুশ নিয়ে মাতামাতি শাসক বুর্জোয়াদেরকে ‘দেশপ্রেমিক’ ‘বাঙালি’ হিসেবে মহিমান্বিত করবে, এটাই স্বাভাবিক। তা নিপীড়নের অস্ত্র হবে, পাহাড়ীসহ নির্যাতিত জাতিসত্ত্বার উপর।  এমনকি বাঙালী শ্রমিক-কৃষক-জনগণের উপর। পাহাড়ী জনগণের সংগ্রাম উগ্র বাঙালী জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ চপেটাঘাত। যখন বাঙালী উন্মাদনা একুশকে কেন্দ্র করে বেড়ে ওঠে- তা প্ররোচিত করে পাহাড়ীদের প্রতিবাদী কণ্ঠকে থামিয়ে দেয়ার, নিপীড়ক বাঙালী উগ্র জাতীয়তাবাদ বিরোধী যে কোন বিদ্রোহকে স্তব্ধ করার ফ্যাসিবাদকে, যে ফ্যাসিবাদ নিজেদের জাতির আত্মাভিমানকে প্রশ্রয় দিয়ে অপর দুর্বল সংখ্যালঘু জাতিসত্ত্বার উপর গণহত্যা-নিপীড়নের প্রেরণাদাতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই আজকের ‘একুশ পালনের’ উন্মাদনাকে বিরোধিতা না করে সত্যিকারভাবে নির্যাতিত পাহাড়ী জাতিসত্ত্বার পক্ষে দাঁড়ানো যাবে না। অন্যদিকে তা বাঙালী বুর্জোয়া ফ্যাসিস্টদের শ্রমিক-কৃষক-জনগণের নিপীড়নেরও হাতিয়ার হয়ে উঠেছে, যেহেতু তা রক্তচোষা শত্রুদেরকে ও বাঙালী নির্যাতিত জনগণকে ‘বাঙালী’ হিসেবে একই কাতারে ফেলছে। অথচ কি পাহাড়ী জনগণ, কি বাঙালী শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্ত সকলেরই মুক্তির জন্য আজ প্রয়োজন এই শত্রু বুর্জোয়া শ্রেণীটিকে জনগণ থেকে পৃথক করে চিহ্নিত করা, এই শ্রেণীটিকে উচ্ছেদ করে শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্ত জনগণের গণক্ষমতা প্রতিষ্ঠার জন্য বিপ্লবী সংগ্রাম চালানো, পাহাড়ী জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য উগ্র বাঙালী জাতীয়তাবাদকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়া।  সে সংগ্রামের আদর্শ মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদকে আঁকড়ে ধরতে গেলে আমাদের হতে হবে আন্তর্জাতিকতাবাদী।  শাসক বড় বুর্জোয়া-বড় আমলারা শ্রমিক-কৃষক-জনগণের প্রধান শত্রু – ওরা ভাল থাকে জনগণকে শোষণ-নির্যাতন করেই।  আবার জনগণ ভাল থাকতে পারে কেবল ওদের ধ্বংস করেই এবং সে উদ্দেশ্যে বিপ্লবী সংগ্রাম করেই।  তাই, এরা ও জনগণ একই শ্রেণীভুক্ত হতে পারে না।  এখানে স্পষ্ট দু’টি শ্রেণী, দু’টি জাত, দু’টি দেশ, দু’টি পৃথিবীর পার্থক্য।
তাদের শোষণমূলক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখবার জন্য জনগণকে ঘুম পাড়িয়ে রাখতে একুশে ফেব্রুয়ারিতে এসে যদি বুর্জোয়ারা বলে, আমরা সব বাঙালি ভাই ভাই, তবে নিপীড়িত জনগণ উত্তর করবে, না তোরা আমার ভাই না, তোরা আমার শত্রু।  তোদের ধ্বংস ছাড়া আমার মুক্তি নেই।
যদি ওরা উগ্র জাতীয়তাবাদের মদের নেশায় জনগণকে নেশাগ্রস্ত করতে বলে, আমি বাঙালী, এটাই আমার একমাত্র পরিচয় বা আমি বাঙালী, এটাই আমার একমাত্র অহংকার; একজন শ্রমিক বা গরীব কৃষক এর প্রতিবাদ করে উত্তর দেবে, বাঙালী হিসেবে আমি মোটেই আজ গর্বিত নই, কারণ বাঙালী শাসকরাই আজ পাকিস্তানীদের মতো পাহাড়ী নির্যাতিত জাতিসত্ত্বাসমূহের উপর গণহত্যা-নারী ধর্ষণ চালাচ্ছে।

‘বায়ান্ন’র ভাষা আন্দোলন ও আজকের ‘একুশে পালন’ এক কথা নয়
আজকের একুশ পালনকে এভাবে দেখার অর্থ এই নয় যে বায়ান্ন’র ভাষা আন্দোলনের মাহাত্ম্যকেই খাটো করে দেখা হচ্ছে।  বরং জনগণের সব আন্দোলনের মতো এ আন্দোলনকেও মহান আন্দোলন হিসেবেই মার্কসবাদীরা দেখবে।  কিছু কিছু সংশোধনবাদীরা বাম সংকীর্ণতা থেকে খোদ বায়ান্ন’র আন্দোলনকেই উগ্র জাতীয়তাবাদ হিসেবে দেখে বাতিল করে দেয়।  এটা স্পষ্টই মার্কসবাদ বিরোধী; এবং পক্ষান্তরে তখনকার নিপীড়ক পাকিস্তানিদেরই পক্ষে দাঁড়ানো।  ’৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকেও এরা এভাবেই দেখেছে- বিশেষত আব্দুল হক-এর নেতৃত্বাধীন বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট (এন.ডি.এফ)’রা।  এটা নিঃসন্দেহেই নিপীড়িত জাতিসত্ত্বার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো যা সংকীর্ণ গোঁড়ামীবাদ থেকে এসেছে।
আসলে আজকের এ লেখার টার্গেট বায়ান্ন’র ভাষা আন্দোলন নয়, বরং বুর্জোয়াদের আজকের একুশ পালন।  একই সাথে জনগণের জন্য একুশ পালনের অপ্রাসংগিকতা।  ইতিহাসে এমন অনেক আন্দোলন আছে মার্কসবাদীরা যাকে প্রগতিশীল ও ‘মহান’ মনে করে, কিন্তু একই সাথে বিশেষ সময়ে তা পালন করা অপ্রাসংগিক হিসেবেই ঘোষণা করে। দৃষ্টান্ত হিসেবে বলা যায়ঃ আমেরিকায় আব্রাহাম লিংকনের নেতৃত্বে আমেরিকার স্বাধীনতা সংগ্রাম। এটাকে মার্কসবাদীরা অবশ্যই ইতিবাচক হিসেবে দেখে। কিন্তু আজ আমেরিকা যখন সাম্রাজ্যবাদী, যখন আমেরিকার অস্তিত্বই হচ্ছে সারা পৃথিবীর মানব জাতির জন্য একটা বিষ ফোঁড়া- এটা উচ্ছেদ ছাড়া বিশ্ব জনগণই শৃঙ্খলিত- তখন আমেরিকার ‘জাতীয় দিবস’ পালন গুরুত্বপূর্ণ নয়।  উল্টো বরং সারা বিশ্বের নিপীড়িত জনগণের এখন প্রতিবাদের একটি প্রিয় উপায় হচ্ছে, আমেরিকার জাতীয় পতাকা পুড়িয়ে দেয়া। আজ বিশ্ব জনগণের, এমন কি আমেরিকার নিপীড়িত শ্রমিক-কালো মানুষরা, প্রায় বিলুপ্ত রেড ইন্ডিয়ানরা ক্লিনটন গংদের মতো আমেরিকার ২০০ বছরের ইতিহাস নিয়ে গর্ব করেন না, বরং এই বলে একে বাতিল করেন “২০০ বছরের আমেরিকা, ২০০ বছরের গণহত্যা-ধ্বংসযজ্ঞ”। আজ একুশ পালনের ব্যাপারটিও আমাদের সেভাবেই দেখতে হবে। আমরা সে দিবসই পালন করবো যা আজকের শ্রেণী সংগ্রামের সহায়ক হবে।  শত্রু-মিত্রকে সম্পূর্ণ পৃথক করবে এবং সমাজতন্ত্র-কমিউনিজমের সপক্ষে পরিচালিত হবে। একুশ পালনও আজ সেদিক থেকেই অপ্রাসংগিক শ্রমিক-কৃষক-জনগণের জন্য।

তাই একুশকে সামনে রেখে আজকের ঘোষণা
আজ যখন একুশ নিয়ে বাঙালী বড় বুর্জোয়াদের গণবিরোধী প্রচারণা-ষড়যন্ত্রের তোড়ে মধ্যবিত্ত-পেটি বুর্জোয়াদেরও একাংশ ভেসে যায় তখন বিপ্লবীরা চুপ থাকতে পারে না। তারা বেশি বেশি করে সামনে আনবে সাম্রাজ্যবাদ-সম্প্রসারণবাদের দালাল বাঙালী আমলা-মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া শ্রেণী ও শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্ত জনগণের শ্রেণী পার্থক্যকে। শ্রেণী সংগ্রামের আবশ্যকতাকে। আজ বড় ধনীরা যত বেশি বেশি ‘বাঙালিত্ব’ ফলাবে, তত বেশি করে জনগণকে সামনে আনতে হবে পার্বত্য চট্টগ্রামে সংখ্যালঘু জাতিসত্ত্বার প্রতি উগ্র বাঙালী জাতীয়তাবাদের নিপীড়নকে। কেবল এভাবেই একুশ পালন, এটাই আজ একুশকে দেখার একমাত্র সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি।

সূত্রঃ সংস্কৃতি বিষয়ক, আন্দোলন সিরিজ ৩, আন্দোলন প্রকাশনা