একুশ: বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদ বনাম বিপ্লবী দৃষ্টিভঙ্গি

1423933910_21

একুশ: বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদ বনাম বিপ্লবী দৃষ্টিভঙ্গি

(ফেব্রুয়ারী, ’৯৫)

(১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারী, ভাষা আন্দোলনের ‘মহান শহীদ দিবস’ হিসেবে পরিচিত।  পাকিস্তানি আমলা মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া-সামন্ত শাসক শ্রেণীর নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংগ্রামের এটি এক বিরাট মাইল ফলক।  উর্দু ভাষাকে এদেশের বাঙালী ভাষাভাষী জনগণের উপর চাপিয়ে দেয়ার বিরুদ্ধে সাহসী সংগ্রামে সেদিন পাকিস্তানি শাসকদের বুলেটে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন সালাম, বরকত, শফিক, জব্বার এই মহান বীরেরা।  আজ ১৯৯৫ সালের ফেব্রুয়ারী।  ১৯৭১ সালের পর এ দেশ থেকে বিতাড়িত হয়েছে পাকিস্তানিরা।  এখন শ্রমিক-কৃষক-জনগণের রক্ত চুষে খাচ্ছে পাকিস্তানিদের পরিবর্তে বাঙালি আমলা-মুৎসুদ্দি শাসক শ্রেণী।  আজকের এই শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে একুশকে আমরা কিভাবে দেখব তার উপরই আজকের এই লেখা। )

প্রতি বছরের ফেব্রুয়ারী মাসটি আসলেই এদেশের শাসক শ্রেণী মেতে ওঠে দেশপ্রেম ও বাঙালীত্ব’র উন্মাদনায়। ‘রমনা বটমূলে’ শখের ‘পান্তাভাত’ খাওয়াসহ বুর্জোয়া পুরুষদের ‘পাঞ্জাবী’ আর মেয়েদের ‘সাদা শাড়ী’ পড়ার ধুম পড়ে যায়। ধুম পড়ে যায় ‘শহীদ মিনার’-এ যাওয়ার, ফুল দেওয়ার। ধানমন্ডি, গুলশান, বনানী, বারিধারাসহ গণবিচ্ছিন্ন অভিজাতদের এসব দেখানো ‘বাঙালীত্ব’ কাণ্ডকারখানা এতই বেমানান যে বুর্জোয়া পেটি বুর্জোয়া কবি-সাহিত্যিকেরা পর্যন্ত এটার প্রতি কটাক্ষ সমালোচনার তীর ছুঁড়েছেন অনেকবার। তবে সে ‘সমালোচনা-মন্তব্য’ বর্তমানে একুশে ফেব্রুয়ারী পালনের যৌক্তিকতাকে ভুল প্রমাণ করে না, বরং এটাকে কিভাবে আরো আবেদনময়, অকৃত্রিম, যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য করে বুর্জোয়াদের মরা গাঙে জোয়ার আনানো যায় সমালোচনাগুলো সে সবেরই ‘প্রেসক্রিপসন’।  বলা যায়, এদেশের মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবীরা (শ্রমজীবী-কর্মজীবীরা মূলত নয়) বিরাট আকারে এই ফেব্রুয়ারী মেলায় ভেসে যায়। সেই সাথে গোপন থাকে না এই আত্মবিকৃত বুদ্ধিজীবী-শিল্পী-সাহিত্যিকদের ‘দেশপ্রেম’-এর পরিবর্তে ‘বিদেশ প্রেম’, মার্কিন-বৃটেন-ফ্রান্স-ভারত-এর সাম্রাজ্যবাদী-সম্প্রসারণবাদী গণবিরোধী বা পেটি বুর্জোয়া গণবিচ্ছিন্ন সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রতি তাদের অগাধ অনুরাগ। তাই একুশের বই মেলায় জ্যাকসন, শাহরুখ খান, সঞ্জয় দত্ত, ম্যাডোনা-মাধুরীদের পোষ্টার, সুনীল, সমরেশ মজুমদারদের উপন্যাস- এসব ধুমসে বিক্রি হয়। আগমন ঘটে জাতীয় ‘প্রেম পার্টি’র ‘পাত্রী চাই’ বিজ্ঞাপন সমৃদ্ধ নারী জাতির জন্য অবমাননাকর ক্যাপ-এর বিক্রয় ও প্রদর্শনী।  তবে এসব কিছুর মধ্যে একটি ব্যাপার খুবই লক্ষণীয় তা হচ্ছে গ্রামের গরীব-মাঝারী-ভূমিহীন-কৃষক-জেলে-তাঁতী-কামার-কুমোর যারা সংখ্যায় এদেশের সবচেয়ে বড় জনগোষ্ঠি তাদের মধ্যে একুশ উন্মাদনা নেই। শহরের রিক্সাচালক-বস্তিবাসী-গার্মেন্টস শ্রমিক-জুট-কটন মিল শ্রমিক-হকার-হোটেল-নির্মাণ শ্রমিক- এদের মধ্যে এই উন্মাদনা নেই।

কেন শ্রমিক জনসাধারণকে আজ একুশ টানতে পারে না?
একজন বুর্জোয়া-পেটি বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবী বা দার্শনিক অন্ধের মত বলবে, কারণ হচ্ছে, এদেশের জনগণ গরু-ছাগল, তাদের রাজনৈতিক সচেতনতা নেই। কিন্তু আমরা যদি বলি এটা জনগণের সঠিক রাজনৈতিক চেতনারই প্রতিফলন? নিশ্চয়ই আমাদের রাজনৈতিক জ্ঞানের স্বল্পতা নিয়ে এসব বুদ্ধিজীবীদের তখন জ্ঞানগর্ভ লেকচার-এর সীমা থাকবে না। তা না থাকুক, আমরা বরং পাল্টা প্রশ্ন করতে পারি, জনগণের সঠিক রাজনৈতিক চেতনার মাপকাঠিটি হচ্ছে সোজা বাংলায়, সেই রাজনীতিতে জনগণের স্বার্থ আছে কিনা।  ফেব্রুয়ারিতে আমরা কি দেখছি? দেখছি, কবিতা উৎসব- আর তাতে এদেশের বুর্জোয়া গণশত্রুদের সবচেয়ে সংগঠিত দল আওয়ামী-মুজিব প্রেমিকদের প্রাধান্য।  আর আরেকটি গ্রুপ হচ্ছে আওয়ামী বিরোধী বুর্জোয়া-পেটি বুর্জোয়া, যাদের কেউ বি.এন.পি., কম হলেও কেউ কেউ এরশাদের জাতীয় পার্টিভুক্ত বা প্রভাবিত। বাম নামধারী সংশোধনবাদীরা এদের পিছে পিছেই অভিন্ন শ্লোগান নিয়ে ছোটে।  তাই দেখা যায়, প্রতি বছর, একুশে ফেব্রুয়ারির মুল অনুষ্ঠান শুরু হয়, রাত বারটা এক মিনিটে মুজিব বা জিয়ার ছবি টানানো নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা-সংঘর্ষ-গোলা-গুলির মধ্য দিয়ে, যেখানে খুনোখুনির ঘটনাও বিরল নয়।  তাহলে এখন এ প্রশ্নটি করা যায়, এই সব ছবি’র সাথে গরীব জনগণের স্বার্থের সম্পর্কটা কি? ’৭১-এর পর একে একে মুজিব-জিয়া-এরশাদ সরকারসহ আজকের খালেদা জিয়া পর্যন্ত সব সরকারই ধনীদের ও বিশ্বব্যাংক, আই-এম-এফ, সাম্রাজ্যবাদ, ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের স্বার্থরক্ষক সরকার।  একই সাথে গরীব শ্রমিক-কৃষকসহ এদেশের ৯০% জনগণের ঘাড় মটকে রক্ত খাওয়া সরকার।  এরা সবাই বড় ধনী বড় আমলাদের শাসক শ্রেণীরই একেকটি অংশ, তাদেরই জাতভাই।  আবার তারা বাঙালী ও বাংলাদেশীও বটে।
তাহলে কেন রিক্সাচালক একুশ নিয়ে মাতামাতি করবে? একজন গার্মেন্টস শ্রমিক যে ১৮ ঘণ্টা কাজ করে দিনে ৫০ টাকার বেশি মজুরী পায় না, এমনকি কেউ কেউ ১৫/২০ টাকা পায়, সে কেন রক্ত চোষা গার্মেন্টস মালিকদের দল আওয়ামী লীগ-বি.এন.পি.-জাতীয় পার্টির সাবেক বা বর্তমান মন্ত্রী-এমপি-নেতাদের সাথে দাঁড়িয়ে একুশ পালন করবে ? যারা বস্তি ভাঙ্গছে এবারের শীতে একুশে সেই বস্তির বস্তিবাসীরা কেন বস্তি ভাঙ্গার বড় লোকদের সাথে খালি পায়ে একই মিছিলে এসে দাঁড়াবে।  বরং সেই বস্তিবাসী কি বড় লোকদের সবাইকে একই ‘বাঙালী’ সাজবার ষড়যন্ত্রকেই রুখে দাঁড়াবে না? গার্মেন্টস শ্রমিক ’৫২ সালের শত্রু পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠি, যারা আজ আর সামনে নেই- পরাজিত বিতাড়িত হয়েছে- তাদের বদলে সংগ্রাম করবার জন্য কি শত্র“ হিসেবে রক্তচোষা মালিকদেরই বেছে নেবে না? তারা কি মালিকদের অস্ত্র ‘একুশ’-কে পিছনে ফেলে আজকের মালিক বিরোধী শ্রেণী সংগ্রামকেই আঁকড়ে ধরবে না? এসব কারণেই আজ এটা স্পষ্ট শ্রমিক-কৃষকসহ ৯০ ভাগ ও গরীব শ্রমজীবী জনগণ যখন একুশ নিয়ে মাতামাতি না করে নির্লিপ্ত থাকেন তখন তাঁরা উন্নত রাজনৈতিক চেতনারই পরিচয় দেন।  আজ কেবল নির্লিপ্ত থাকা নয়, শাসক শ্রেণীর শ্লোগান, ‘ঘাতকদের কোন জাত নেই, শ্রেণী নেই- ঘাতক কেবল ঘাতক’-এর পরিবর্তে গরীব জনগণের শ্লোগান দেবার সময় এসেছে ঘাতক শাসক বড় বুর্জোয়া বড় আমলাদের পরাস্ত কর, উচ্ছেদ কর।  ওদের উগ্র জাতীয়তাবাদী প্রতারণার অস্ত্রকে রুখে দাঁড়াও।
আজ ‘আমি কি ভুলিতে পারি’ এই গান দিয়ে ’৫২ সালকে মনে করিয়ে দেয়া হলেও গরীব জনগণকে ভুলিয়ে দেবার চেষ্টা করা হচ্ছে, ’৯৫ সালের শোষণ-অন্যায়-নির্যাতনের কথা। তার আজকের শত্রু  বাঙালী বড় বুর্জোয়াদের কথা।  কিন্তু জনগণ এটা ভুলতে পারে না।  জনগণের চেতনা পেটি বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীদের মতো অতটা ভোতা নয়।  জনগণ আজ এ কথা বলে গর্ব বোধ করতে পারে না, আমরা সবাই বাঙালী বা বাংলাদেশী।  বরং জনগণের চেতনায় একথাটাই খোদাই করা, আমার শত্রু রক্তচোষা ঐ বাঙালী বুর্জোয়ারাই। একই সাথে আমার শত্রু মার্কিন-ভারতসহ বিদেশী বুর্জোয়ারা। অন্যদিকে সারা পৃথিবীর নির্যাতিত জনগোষ্ঠিই আমার বন্ধু। তাই সর্বহারা শ্রেণীর কোন দেশ নেই, জাতি নেই, সারা পৃথিবীতেই তাদের স্বার্থ এক- তা হচ্ছে শোষক বুর্জোয়া শ্রেণী, সাম্রাজ্যবাদকে উচ্ছেদ, তাদের এই পুরাতন দুনিয়াটাকে উচ্ছেদ করে শ্রেণীহীন এক নতুন পৃথিবী কমিউনিজমের দিকে এগিয়ে যাওয়া।

পার্বত্য চট্টগ্রামে জাতিগত নিপীড়ন, গণহত্যা বনাম একুশ 

১৪টি বড় বড় উল্লেখযোগ্য গণহত্যায় এ পর্যন্ত পাহাড়ী নির্যাতিত জাতিসত্ত্বার হত্যা করা হয়েছে ১,১৬৭ জনকে। (চিৎকার, নভেম্বর ’৯৪ দেখুন) এই গণহত্যাগুলো করেছে ’৭১-এর মুজিব বাহিনী (মুক্তি বাহিনী), ’৭১-’৭৫-এর শেখ মুজিব সরকার, জিয়া সরকার, এরশাদ সরকার এবং সাম্প্রতিক কালের খালেদা-হাসিনা-গোলাম আযমদের সংসদীয় স্বৈরাচার।  উল্লেখিত সব সরকার, তার বাহিনী, তার পাণ্ডারাই হচ্ছে বাঙালী।  অর্থাৎ আজ বাঙালী জাতিরই শোষক অংশ পাহাড়ে অন্যান্য সংখ্যালঘু জাতিসত্ত্বার উপর পাকিস্তানী বাহিনীর মতোই চালাচ্ছে গণহত্যা, গণধর্ষণ, ধ্বংসযজ্ঞ, জ্বালাও-পোড়াও, জমি-পাহাড় দখল, আর্মি শাসন, জোর করে বাঙালী ঢুকিয়ে পাহাড়ীদের সংখ্যালঘু করার জাতিগত নিপীড়ন-বর্বরতা- এ সবগুলোই। একুশের বড় সীমাবদ্ধতা এখানে ছিল, একুশ সমস্ত সংখ্যালঘু জাতিসত্ত্বাসমূহের অধিকারের পক্ষের সংগ্রাম ছিল না, একুশের একটি প্রধান শ্লোগান ছিল ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’।  এটা এমন ছিল না যে, “সকল জাতির নিজ নিজ ভাষা ব্যবহারের অধিকার চাই”। একই সাথে যে বাংলা নিয়ে আন্দোলন, সেই বাংলার কর্তৃত্ব যখন শোষক খুনী বাঙালী বুর্জোয়াদের হাতে, তখন একুশ নিয়ে মাতামাতি শাসক বুর্জোয়াদেরকে ‘দেশপ্রেমিক’ ‘বাঙালি’ হিসেবে মহিমান্বিত করবে, এটাই স্বাভাবিক। তা নিপীড়নের অস্ত্র হবে, পাহাড়ীসহ নির্যাতিত জাতিসত্ত্বার উপর।  এমনকি বাঙালী শ্রমিক-কৃষক-জনগণের উপর। পাহাড়ী জনগণের সংগ্রাম উগ্র বাঙালী জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ চপেটাঘাত। যখন বাঙালী উন্মাদনা একুশকে কেন্দ্র করে বেড়ে ওঠে- তা প্ররোচিত করে পাহাড়ীদের প্রতিবাদী কণ্ঠকে থামিয়ে দেয়ার, নিপীড়ক বাঙালী উগ্র জাতীয়তাবাদ বিরোধী যে কোন বিদ্রোহকে স্তব্ধ করার ফ্যাসিবাদকে, যে ফ্যাসিবাদ নিজেদের জাতির আত্মাভিমানকে প্রশ্রয় দিয়ে অপর দুর্বল সংখ্যালঘু জাতিসত্ত্বার উপর গণহত্যা-নিপীড়নের প্রেরণাদাতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই আজকের ‘একুশ পালনের’ উন্মাদনাকে বিরোধিতা না করে সত্যিকারভাবে নির্যাতিত পাহাড়ী জাতিসত্ত্বার পক্ষে দাঁড়ানো যাবে না। অন্যদিকে তা বাঙালী বুর্জোয়া ফ্যাসিস্টদের শ্রমিক-কৃষক-জনগণের নিপীড়নেরও হাতিয়ার হয়ে উঠেছে, যেহেতু তা রক্তচোষা শত্রুদেরকে ও বাঙালী নির্যাতিত জনগণকে ‘বাঙালী’ হিসেবে একই কাতারে ফেলছে। অথচ কি পাহাড়ী জনগণ, কি বাঙালী শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্ত সকলেরই মুক্তির জন্য আজ প্রয়োজন এই শত্রু বুর্জোয়া শ্রেণীটিকে জনগণ থেকে পৃথক করে চিহ্নিত করা, এই শ্রেণীটিকে উচ্ছেদ করে শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্ত জনগণের গণক্ষমতা প্রতিষ্ঠার জন্য বিপ্লবী সংগ্রাম চালানো, পাহাড়ী জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য উগ্র বাঙালী জাতীয়তাবাদকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়া।  সে সংগ্রামের আদর্শ মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদকে আঁকড়ে ধরতে গেলে আমাদের হতে হবে আন্তর্জাতিকতাবাদী।  শাসক বড় বুর্জোয়া-বড় আমলারা শ্রমিক-কৃষক-জনগণের প্রধান শত্রু – ওরা ভাল থাকে জনগণকে শোষণ-নির্যাতন করেই।  আবার জনগণ ভাল থাকতে পারে কেবল ওদের ধ্বংস করেই এবং সে উদ্দেশ্যে বিপ্লবী সংগ্রাম করেই।  তাই, এরা ও জনগণ একই শ্রেণীভুক্ত হতে পারে না।  এখানে স্পষ্ট দু’টি শ্রেণী, দু’টি জাত, দু’টি দেশ, দু’টি পৃথিবীর পার্থক্য।
তাদের শোষণমূলক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখবার জন্য জনগণকে ঘুম পাড়িয়ে রাখতে একুশে ফেব্রুয়ারিতে এসে যদি বুর্জোয়ারা বলে, আমরা সব বাঙালি ভাই ভাই, তবে নিপীড়িত জনগণ উত্তর করবে, না তোরা আমার ভাই না, তোরা আমার শত্রু।  তোদের ধ্বংস ছাড়া আমার মুক্তি নেই।
যদি ওরা উগ্র জাতীয়তাবাদের মদের নেশায় জনগণকে নেশাগ্রস্ত করতে বলে, আমি বাঙালী, এটাই আমার একমাত্র পরিচয় বা আমি বাঙালী, এটাই আমার একমাত্র অহংকার; একজন শ্রমিক বা গরীব কৃষক এর প্রতিবাদ করে উত্তর দেবে, বাঙালী হিসেবে আমি মোটেই আজ গর্বিত নই, কারণ বাঙালী শাসকরাই আজ পাকিস্তানীদের মতো পাহাড়ী নির্যাতিত জাতিসত্ত্বাসমূহের উপর গণহত্যা-নারী ধর্ষণ চালাচ্ছে।

‘বায়ান্ন’র ভাষা আন্দোলন ও আজকের ‘একুশে পালন’ এক কথা নয়
আজকের একুশ পালনকে এভাবে দেখার অর্থ এই নয় যে বায়ান্ন’র ভাষা আন্দোলনের মাহাত্ম্যকেই খাটো করে দেখা হচ্ছে।  বরং জনগণের সব আন্দোলনের মতো এ আন্দোলনকেও মহান আন্দোলন হিসেবেই মার্কসবাদীরা দেখবে।  কিছু কিছু সংশোধনবাদীরা বাম সংকীর্ণতা থেকে খোদ বায়ান্ন’র আন্দোলনকেই উগ্র জাতীয়তাবাদ হিসেবে দেখে বাতিল করে দেয়।  এটা স্পষ্টই মার্কসবাদ বিরোধী; এবং পক্ষান্তরে তখনকার নিপীড়ক পাকিস্তানিদেরই পক্ষে দাঁড়ানো।  ’৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকেও এরা এভাবেই দেখেছে- বিশেষত আব্দুল হক-এর নেতৃত্বাধীন বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট (এন.ডি.এফ)’রা।  এটা নিঃসন্দেহেই নিপীড়িত জাতিসত্ত্বার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো যা সংকীর্ণ গোঁড়ামীবাদ থেকে এসেছে।
আসলে আজকের এ লেখার টার্গেট বায়ান্ন’র ভাষা আন্দোলন নয়, বরং বুর্জোয়াদের আজকের একুশ পালন।  একই সাথে জনগণের জন্য একুশ পালনের অপ্রাসংগিকতা।  ইতিহাসে এমন অনেক আন্দোলন আছে মার্কসবাদীরা যাকে প্রগতিশীল ও ‘মহান’ মনে করে, কিন্তু একই সাথে বিশেষ সময়ে তা পালন করা অপ্রাসংগিক হিসেবেই ঘোষণা করে। দৃষ্টান্ত হিসেবে বলা যায়ঃ আমেরিকায় আব্রাহাম লিংকনের নেতৃত্বে আমেরিকার স্বাধীনতা সংগ্রাম। এটাকে মার্কসবাদীরা অবশ্যই ইতিবাচক হিসেবে দেখে। কিন্তু আজ আমেরিকা যখন সাম্রাজ্যবাদী, যখন আমেরিকার অস্তিত্বই হচ্ছে সারা পৃথিবীর মানব জাতির জন্য একটা বিষ ফোঁড়া- এটা উচ্ছেদ ছাড়া বিশ্ব জনগণই শৃঙ্খলিত- তখন আমেরিকার ‘জাতীয় দিবস’ পালন গুরুত্বপূর্ণ নয়।  উল্টো বরং সারা বিশ্বের নিপীড়িত জনগণের এখন প্রতিবাদের একটি প্রিয় উপায় হচ্ছে, আমেরিকার জাতীয় পতাকা পুড়িয়ে দেয়া। আজ বিশ্ব জনগণের, এমন কি আমেরিকার নিপীড়িত শ্রমিক-কালো মানুষরা, প্রায় বিলুপ্ত রেড ইন্ডিয়ানরা ক্লিনটন গংদের মতো আমেরিকার ২০০ বছরের ইতিহাস নিয়ে গর্ব করেন না, বরং এই বলে একে বাতিল করেন “২০০ বছরের আমেরিকা, ২০০ বছরের গণহত্যা-ধ্বংসযজ্ঞ”। আজ একুশ পালনের ব্যাপারটিও আমাদের সেভাবেই দেখতে হবে। আমরা সে দিবসই পালন করবো যা আজকের শ্রেণী সংগ্রামের সহায়ক হবে।  শত্রু-মিত্রকে সম্পূর্ণ পৃথক করবে এবং সমাজতন্ত্র-কমিউনিজমের সপক্ষে পরিচালিত হবে। একুশ পালনও আজ সেদিক থেকেই অপ্রাসংগিক শ্রমিক-কৃষক-জনগণের জন্য।

তাই একুশকে সামনে রেখে আজকের ঘোষণা
আজ যখন একুশ নিয়ে বাঙালী বড় বুর্জোয়াদের গণবিরোধী প্রচারণা-ষড়যন্ত্রের তোড়ে মধ্যবিত্ত-পেটি বুর্জোয়াদেরও একাংশ ভেসে যায় তখন বিপ্লবীরা চুপ থাকতে পারে না। তারা বেশি বেশি করে সামনে আনবে সাম্রাজ্যবাদ-সম্প্রসারণবাদের দালাল বাঙালী আমলা-মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া শ্রেণী ও শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্ত জনগণের শ্রেণী পার্থক্যকে। শ্রেণী সংগ্রামের আবশ্যকতাকে। আজ বড় ধনীরা যত বেশি বেশি ‘বাঙালিত্ব’ ফলাবে, তত বেশি করে জনগণকে সামনে আনতে হবে পার্বত্য চট্টগ্রামে সংখ্যালঘু জাতিসত্ত্বার প্রতি উগ্র বাঙালী জাতীয়তাবাদের নিপীড়নকে। কেবল এভাবেই একুশ পালন, এটাই আজ একুশকে দেখার একমাত্র সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি।

সূত্রঃ সংস্কৃতি বিষয়ক, আন্দোলন সিরিজ ৩, আন্দোলন প্রকাশনা

Advertisements


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s