মহান মাওবাদী নেতা ও পেরুর কমিউনিস্ট পার্টির চেয়ারম্যান কমরেড গনজালো’র গদ্য কবিতা প্রসঙ্গে

abimael

গনসালো কি কবিতা লিখেছেন?

না, তবে তিনি পেরুর কমিউনিস্ট পার্টির বিখ্যাত কিছু পাঠ লিখেছেন খুবই উচ্চ স্তরের কাব্যিক গদ্যসম্পন্ন। সবচেয়ে বিখ্যাত হচ্ছে “১৯৮০তে সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু কর”, সংক্ষেপে “আইএলএ-৮০”।

পতাকা”, ১৯৮০ থেকে কিছু অংশ:

“আমরা সবাই সেই ঝড়ের প্রতি নিবেদিত; বাতাস পাতা উড়িয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বীজ থেকে যায়। ১৯২৭-এ এক বিরাট ঝড় পেরুর কমিউনিস্ট পার্টি (পিসিপি) সৃষ্টিতে চালিত করেছে। সেই পার্টি এক ঝড়ের মধ্যে প্রবেশ করেছে, সব কিছুই বিস্ফোরিত হবে। অনেক দিন আমরা একটা মেরুকেন্দ্র হতে আকাঙ্খিত, এখন সময় এসেছে। আমরা যে পথ গ্রহণ করছি তা সঠিক, এবং যে সকল সমস্যা আমরা মোকাবেলা করি তা সমাধান হবে।

আজকে পতাকাকে স্বীকার করার দিন, কিন্তু আমাদেরটা একটা লাল পতাকা, একটা মূর্ত, হাতুড়ি ও কাস্তে খচিত। আমাদের পতাকা হচ্ছে পরম লাল; যারা বিদ্রোহ করে তাদের সবারই লাল পতাকা আছে।”

আইএলএ-৮০ থেকে:

“আমরা কমিউনিস্টরা এক নির্দিষ্ট ধাতের, এক বিশেষ জিনিস, আমরা কমিউনিস্টরা সবকিছুর জন্য তৈরি এবং আমরা জানি কোন জিনিসকে লড়তে হবে। আমরা ইতিমধ্যেই একে লড়েছি, কালকেও তাকে লড়বো।আগামীকাল যেমোকাবেলা হবে আজ তা শিশু, এটা কঠিনতর হবে, কিন্তু তারপর আমরা অতীতের দ্বারা পোড় খাব যেমনটা আজকে আমরা এগিয়ে নিচ্ছি। আমরা বিপ্লবের আগুণে আমাদের আত্মাকে পুড়িয়ে নেব, এটাই একমাত্র অগ্নিশিখা যা আমাদের সামনে এগিয়ে নিতে সক্ষম।

আমাদের প্রচুর আশাবাদ দরকার এবং তার একটা কারণ রয়েছে। আমরা আগামীর প্রস্তুতকারক। আমরা শ্রেণীর অপরাজেয় বিজয়ের পথপ্রদর্শক গ্যারিসন। তাই, আমরা আশাবাদী।

আমরা প্রাকৃতিকভাবেই উদ্দীপনাময়। আমরা আমাদের শ্রেণীর মতাদর্শের দ্বারা পূর্ণ: মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওসেতুঙ চিন্তাধারা। আমরা শ্রেণীর জীবন যাপন করি। আমরা এর বীরত্বব্যাঞ্জক কর্মে অংশ নেই। আমাদের জনগণের রক্ত আমাদের মধ্যে বাহিত ও ফুটন্ত।

আমরা শক্তিমত্ত স্পন্দিত রক্তের মত। আসুন অভঙ্গুর লোহা ‍ও ইস্পাতকে গ্রহণ করি, শ্রেণীকে গ্রহণ করি, একে মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাও চিন্তাধারার চির জ্বাজল্যমান আলোর সাথে মিশিয়ে ফেলি।

উদ্দীপনা মানে দেবতাদের শক্তিতে অংশ নেয়া বোঝায়; তাই আমরা উদ্দীপনায় ভরপুর। আমরা অংশ নে্ই বাস্তব দুনিয়ার স্বর্গীয়তায়: জনগণ, শ্রেণী, মার্কসবাদ ও বিপ্লব। তাই আমাদের আছে অক্লান্ত উদ্যম। তাই আমাদের রয়েছে শক্তি, আশাবাদ আর উদ্দীপনায় ভরা সজীবতা।

১৯৮৮-এর সাক্ষাতকারে এই বিপ্লবী স্টাইলের লেখা সম্পর্কে গনসালো ব্যাখ্যা করেন:

“আমি বলব, অনেক সময় রাজনীতিতে আপনাকে এখানে যেতে হবে, যাতে ভাবাবেগ, গভীর অনুভূতি আমাদের প্রতিজ্ঞাকে শক্তিশালী করতে পারে।এমন সময়, তারা যেমন বলে, হৃদয় কথা বলে এবং আমি বিশ্বাস করি যুদ্ধের জন্য যে বিপ্লবী আবেগ দরকার তা নিজেকে প্রকাশ করে। এর সাহিত্যমুল্য কী আছে তা আমি জানিনা।”

কবিতা সম্পর্কে ১৯৮৮-এর সাক্ষাতকারে তিনি আরো উল্লেখ করেন:

“একসময় সঙ্কলিত বিশ্ব কবিতা সার্ভে করছিলাম। আমি এটা আগেও অধ্যযন করেছি-বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্রন্থাগারে কিছু রচনা ছিল যাতে আমার প্রবেশ ছিল। আমি কবিতা পছন্দ করি। চেয়ারম্যান মাওয়ের অন্যতম একটি দিক হচ্ছে এটা-যাকে আমি প্রশংসা করি। তিনি ছিলেন একজন অসাধারণ কবি। পেরুভিয়ান কবিতার ক্ষেত্রে ভ্যাল্লেখো আমার কাছে প্রিয়। হ্যাঁ, তিনি আমাদের, এবং পাশাপাশি, তিনি ছিলেন একজন কমিউনিস্ট।


ফিলিপাইনে মাওবাদীদের পৃথক হামলায় ৩ পুলিশ নিহত, আহত ২

ফিলিপাইনের মাওবাদী গেরিলাদের একটি ইউনিট

ফিলিপাইনের মাওবাদী গেরিলাদের একটি ইউনিট

অনূদিতঃ

গত রবিবার সকালে মাসবেত প্রদেশের বিকোল অঞ্চলে, মাওবাদী নিউ পিপলস আর্মি(এনপিএ)-র লাল যোদ্ধারা পুলিশের গাড়ী লক্ষ্য করে একটি মাইন বিস্ফোরণের পর গেরিলারা পুলিশের এই গাড়ির উপর স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়ে হামলা চালায়, এতে এক পুলিশ নিহত ও দুই জন আহত হয়েছে।

এই অতর্কিত হামলার, মাত্র দুই দিন আগে বিকোল সোরসোগোন অঞ্চলে কমিউনিস্ট গেরিলাদের আরেকটি হামলা হয়। এতে নিউ পিপলস আর্মি একটি মোটর সাইকেল উপর হামলা চালিয়ে ২ পুলিশকে হত্যা করে।

সূত্রঃ http://odiodeclase.blogspot.com/2016/06/filipinas-emboscadas-de-la-guerrilla.html


এক মাসে ধর্মবাদী লাঞ্চনার শিকার শিক্ষক, হত্যার শিকার হোমিও চিকিৎসক, বৌদ্ধ ভিক্ষু, খৃষ্টান দোকানী ও পুলিশের স্ত্রী

ধর্মবাদীরা ১৪মে ২০১৬ বান্দরবানের নাইক্ষংছড়ির বাইশারী ইউনিয়নে বৌদ্ধভিক্ষু মং শু উকে হত্যা করে।

ধর্মবাদীরা ১৪মে ২০১৬ বান্দরবানের নাইক্ষংছড়ির বাইশারী ইউনিয়নে বৌদ্ধভিক্ষু মং শু উকে হত্যা করে।

এক মাসে ধর্মবাদী লাঞ্চনার শিকার শিক্ষক, হত্যার শিকার হোমিও চিকিৎসক, বৌদ্ধ ভিক্ষু, খৃষ্টান দোকানী ও পুলিশের স্ত্রী

নারায়নগঞ্জের পিয়ার সাত্তার লতিফ হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে ইসলাম ধর্মের বিরুদ্ধে কটুক্তির অভিযোগ এনে তথাকথিত ইস্কুল কমিটির প্রতিক্রিয়াশীলরা তাদের গডফাদারদের মাধ্যমে চরম লাঞ্চনা দেয় ও নির্যাতন চালায় গত ১৩ মে ২০১৬। এর বিরুদ্ধে সারাদেশে আন্দোলন শুরু হলে হাইকোর্ট রুল জারি করে। তথাকথিত তদন্ত কমিটি যে রিপোর্ট দেয় তা হাইকোর্ট ছুড়ে ফেলে দিয়েছে। নতুন করে তদন্ত করতে বলা হয়েছে।সরকার এখনো তাদের গডফাদার সেলিম ওসমানকে গ্রেফতার করেনি যেকিনা তাদের তথাকথিত সংসদের সদস্য।

আওয়ামী লীগের বিটিম জাতীয় পার্টির এই সেলিম ওসমানের আরেক ভাই হচ্ছে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য্ শামিম ওসমান।  স্থানীয় আওয়ামী লীগের লোকেরা অব্যাহতভাবে উক্ত শিক্ষককে হুমকি ধমকি দিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, হেফাজত ইসলাম ইত্যাদি দল জনগণের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে ষড়যন্ত্র ও তৎপরতা চালাচ্ছে। বাংলাদেশের স্কুলগুলো স্থানীয় প্রতিক্রিয়াশীল সামন্ত ধর্মবাদী, বুর্জোয়া গডফাদারদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। তথাকথিত কমিটিগুলো এরা গঠন করে। এরা প্রতিদিন প্রতি মুহুর্ত শিক্ষক-ছাত্র-ছাত্রীদের ধর্মবাদী ও সর্বপ্রকার লাঞ্চনা দিচ্ছে।  অনেক শিক্ষক তাদের হাতের পুতুল হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

প্রতিক্রিয়াশীলদের গডফাদার পরিবার

নারায়নগঞ্জের ব্যবসা বানিজ্য, চুরি ডাকাতি, দুর্নীতি, রাহাজানি, খুন ধর্ষণ, মাদকের সিংহভাগ এই গডফাদার ওসমান পরিবারের নিয়ন্ত্রণে। এরাই সাম্প্রতিককালে সাত খুনের মত ভয়ংকর সব হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে।  বিএনপি-জামাত-আলীগ সমেত এরাই ২৪ জুলাই ১৯৯৯তে টানবাজারের পতিতাপল্লীক উচ্ছেদ করেছিল—যা ছিল বাংলাদেশের বৃহত্তম পতিতালয়।  সহস্র সহস্র যৌনকর্মী ভাসমান অবস্থায় পতিত হয় যা ছিল এক মানবিক বিপর্যয়। সম্প্রতি টাঙ্গাইলেও একই ঘটনা ঘটেছে, উভয় ঘটনা ঘটিয়েছে গডফাদার পরিবার, ধর্মবাদ ও সরকার। নারায়নগঞ্জে শামিম উসমানেরা আর টাঙ্গাইলের আওয়ামী লীগ গডফাদার খান পরিবার এইসকল পতিতাপল্লি উচ্ছেদ করে কোটি কোটি টাকা মূল্যের জমি সম্পত্তি দখল করে।  এখান থেকে তারা সর্বদাই চাঁদাবাজি করত। মাদক ব্যবসা তারা নিয়ন্ত্রণ করে।  একইভাবে সারা দেশের বিভিন্ন স্থানে এই ধরণের গডফাদারেরা যৌনপল্লী উচ্ছেদের প্র্চেষ্টা চালায় ধর্মবাদীদের নিয়ে।

কথিত আছে এই নারায়নগঞ্জীয় গডফাদার পরিবারের বড় ছেলে প্রাক্তন জাতীয় পার্টি এমপি প্রয়াত নাসিম উসমানের ছেলে অয়ন ওসমান প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক কর্মী কিশোর ত্বকীকে হত্যা করে। শামিম উসমানের লোকেরা সাত জন প্রতিদ্বন্দ্বীকেও হত্যা করে—যা সাত খুন নাম পরিচিত হয়। পৌর কাউন্সিলর নুরুল ইসলামের মাধ্যমে তারা ছয় কোটি টাকা র‍্যাবের কর্মকর্তাদের দিয়ে তাদের দ্বারা এ হত্যাকান্ড ঘটায়। ২০১৪ সালের ১৭ এপ্রিল র‍্যাব ১১ এর কিছু কর্মকর্তা নারায়নগঞ্জের শহর থেকে পৌর কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম, আইনজীবি চন্দনসহ উক্ত ৭ জনকে হত্যা করে।  ৩ দিন পর লাশ শীতলক্ষা নদীতে পাওয়া যায়।

ধর্মবাদীরা ১৪মে ২০১৬ বান্দরবানের নাইক্ষংছড়ির বাইশারী ইউনিয়নে বৌদ্ধভিক্ষু মং শু উকে হত্যা করে।

২০মে ২০১৬ ধর্মবাদীরা কুষ্টিয়ার বটতৈল এলাকায় ছানোয়ার রহমান নামে এক হোমিও চিকিৎসকে হত্যা করেছে যে ছিল বাউল মতাবলম্বী আর প্রতি সপ্তাহে সে বহু রোগীকে বিনামূল্যে চিকিৎসা দিত।

৬মে ২০১৬ রাজশাহীর তানোরে পবা উপজেলা নিবাসী শহীদুল্লাহ নামের এক সুফী মতাবলম্বীকে হত্যা করা হয়েছে।

২০১৩ সালের ২১ ডিসেম্বর ঢাকার গোপীবাগে নিজ বাসায় সুফি মতাবলম্বী লুৎফর রহমান রহমান ফারুক, তার বড় ছেলে সারোয়ার ইসলাম ফারুক, শাহীন, মঞ্জুরুল আলম, মজিবর ও রাসেল ভুঁইয়া ধর্মবাদীদের হাতে নিহত হয়।

২০১৪ সালের ২৭ আগষ্ট ঢাকার পূর্ব রাজাবাজারে ভাড়া বাসায় খুন হন টেলিভিশন উপস্থাপক নুরুল ইসলাম ফারুকী।  ফারুকী ছিল এক প্রকার সুফী মতাবলম্বী।

২০১৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর চট্রগ্রামের বায়েজিদে লেংটা মামার মাজারের ‘পীর’ রহমত উল্লাহ প্রকাশ লেংটা মামা আর খাদেম আব্দুল কাদেরকে হত্যা করে ধর্মবাদীরা।

২০১৫ সালের ৫ অক্টোবর ঢাকার বাড্ডায় নিজ বাড়ীতে খুন হন সুফিবাদী খিজির খান। তিনি পূর্বে প্রকৌশলি হিসেবে পিডিবির চেয়ারম্যান ছিলেন।

সর্বশেষ ৫ জুন ২০১৬ নাটোরের বড়াইগ্রামে মিশনপল্লীতে খৃষ্টান মুদি দোকানী সুনীল গোমেজ খুন হয়েছেন। ধর্মবাদীরা গনহত্যার অভিযানের অংশ হিসবে কাপুরুষোচিত ভাবে তাকে হত্যা করে।ভিন্ন ধর্মাবলম্বী হওয়ার কারণে পশুরা তাকে হত্যা করেছে। এলাকার খৃষ্টান সম্প্রদায়সহ জনগণ এ ঘটনার প্রতিবাদে মানব বন্ধন ও সমাবেশ করছেন।

একই দিনে চট্রগ্রামে পুলিশের এসপি বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা আক্তারকে খুন করেছে ধর্মবাদীরা। পুলিশের উক্ত এসপি ধর্মবাদী বিভিন্ন গোষ্ঠী বিরোধী পুলিশী অভিযানে সক্রিয় ছিল ও রাষ্ট্রীয় অনেক পুরস্কার প্রাপ্ত। তার সাথে বিরোধের জন্য তার পরিবারের সদস্য-এক নারী-কে হত্যা করার মত জঘন্য কাজ ধর্মবাদী-ফ্যাসিবাদী পশুরাই কেবল করতে পারে।

বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে ইতিমধ্যে মার্কিন ও ভারত প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে।  মার্কিন ও ভারতীয় হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পেয়েছে।

সামন্তবাদী ব্যবস্থার আগ্রাসন হিসেবে জনগণের জন্য এ পরিস্থিতি বিরাট হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। এ সামন্ত ব্যবস্থা আমলাতান্ত্রিক বুর্জোয়াদের দ্বারা পালিত হচ্ছে। সারা দুনিয়ায় সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থা ক্ষয়িষ্ণু। কিন্তু এ ব্যবস্থা ক্ষয়িষ্ণু পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সাথে যোগসাজশে মরণ কামড় বসাচ্ছে যা তাদের পরিত্রাণ এনে দেবেনা। এ প্রশ্নে জনগণের হস্তক্ষেপ জরুরী। এদেরকে তাদের উৎসমেত উৎপাটন না করলে এরা মধ্যযুগের মত কোটি কোটি মানুষ হত্যা করবে – যা মধ্যপ্রাচ্যে ইতিমধ্যেই তারা করেছে ও করছে। সর্বশেষ আইএস ধর্মবাদী পাশবিক গোষ্ঠীটি চতুর্দিক থেকে ঘেরাও হয়ে পড়ে ভয়ংকর  মার খাচ্ছে।তাদের মদদদাতা তুরস্ক ও সৌদি সম্প্রসারণবাদীরা আর তাদের রক্ষা করতে পারছেনা। কিন্তু সামন্ততন্ত্র ধ্বংস না হওয়া অবধি এরা বারবার জন্ম নেবে তালেবান, আল কায়দা, আইএস ইত্যকার ভিন্ন ভিন্ন নামে। বাংলাদেশের জনগণকে বাঁচতে হবে। ধর্মবাদের উৎস সামন্তবাদ আর এর আশ্রয় ও প্রশ্রয়দাতা সাম্রাজ্যবাদ ও আমলাতান্তিরক পুঁজিবাদকে নির্মূল করতে হবে। জনগণকে এর বিরুদ্ধে পরিকল্পিত লড়াই চালাতে হবে। প্রতিক্রিয়াশীলদের ধ্বংস অনিবার্য।□ 

লেখকঃ হাসন লাল


হিজড়া জনগোষ্ঠীর সংগ্রাম: শোষণ উচ্ছেদের সংগ্রামের সাথে একীভূত

0,,18054870_304,00

হিজড়া জনগোষ্ঠীর সংগ্রাম: শোষণ উচ্ছেদের সংগ্রামের সাথে একীভূত

জন্মের পর বাবা-মায়ের দেয়া নাম ছিল হামিদুর। স্বাভাবিক একজন ছেলে শিশু হিসেবেই জন্ম হামিদুরের। কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে ছেলেমি বৈশিষ্ট্য থেকে মেয়েলী বৈশিষ্ট্যর প্রকাশ ঘটতে থাকে তার মধ্যে। ৭/৮ বছর বয়সে এসে সবার নজরে আসে মেয়েলী আচার আচরণ ও বৈশিষ্ট্য হামিদুরের মাঝে প্রকট। ধীরে ধীরে হামিদও বুঝতে পারে সে অন্য ছেলেদের মত না। বরঞ্চ পাড়ার অন্য ছেলেরাই বিভিন্নভাবে তাকে উত্যক্ত করেই বুঝিয়ে দিলো- ছেলে হয়েও হামিদুর যেনো একটা মেয়ে মানুষ। জীনগত কারণে এটা চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হয়ে গেলেও, হামিদুরের বাপ-ভাইয়ের কাছে গেলো এটা অপমান, অপবাদ ও অভিযোগ আকারে। পরিণতিতে হামিদুরের কপালে নেমে আসলো বিভিন্ন লাঞ্চনা ও শারীরিক নির্যাতনসহ এক অমানবিক ও দুঃসহ পরিস্থিতি। এ অসহ্য পরিস্থিতি সহ্য করতে না পেরে একদিন সবার অগোচরে হামিদুর পাড়ি জমায় এক অজানা দুনিয়ায়। যেমন যাবার সময় ফেলে যায় নিজ গ্রাম, বাড়ি, পিতা-মাতা, ভাই-বোন এমনকি হামিদুর নামক তার নামটিও। লিমা নামে হামিদুর এখন অন্য দুনিয়ার অন্য মানুষ, অন্য জীবন। ‘অভাগা যে দিকে চায়, সাগর শুকিয়ে যায়’- ঘরেই যার ঠাঁয় হয় না, বাহির তাকে গ্রহণ করবে কেন? কিন্তু বিধির লিখনীতে, একবার যে ঘর ছাড়ে সে আর ঘরে ফেরে না- লিমাও সে প্রতিজ্ঞা করলো। বরঞ্চ নিয়তির কাছে নিজেকে সঁপে দেয়াতে একটু প্রশান্তি মিললো, কোত্থেকে যেনো বুকে এসে ভর করলো একরাশ সাহসও। পাড়ার ছেলেদের উত্যক্ত্যের ভয়ে এতদিন যে ঘর থেকে বাইরে যেত না, এবার বাইরের উত্যক্তকারীদের তাড়িয়ে ঘরের ভেতর নেয়ার পালা দ্রোহী লিমার। গৃহত্যাগী লিমা ছন্নছাড়া জীবনে পড়ে মুখোমুখি নিদারুণ কষ্ট আর থাকা-খাওয়ার এক অনিশ্চয়তা। কোনোদিন খাবার জোটে তো কোনোদিন উপোসে দিন পাড়ি দেয়া। জীবনের দাবি মানেই এক নিশ্চিত জীবন চাওয়া। সেই নিশ্চিত জীবনের সন্ধানেই আজ থেকে প্রায় দেড় যুগ আগে লিমা আশ্রয় নিলো গাজীপুর অঞ্চলের এক গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে। হায় কপাল! প্রকৃতি যেখানে উপহাস করেছে লিঙ্গ নির্ধারণে, গার্মেন্টস কর্মীরাও কেন বা অস্বাভাবিক লিঙ্গের আগন্তুকের কাছ থেকে বিনোদন নিবে না? কিন্তু পুঁজিতো আরো নির্মম, রসিকতা-বিনোদন পুঁজির ধাঁতে নেই। পুঁজি জানে কেবল মুনাফা। যে আগন্তুক মুনাফার মানব যন্ত্রগুলিকে মনোযোগের বিচ্যুতি ঘটায় এমন আগন্তুককে কোন যুক্তিতে (!) প্রশ্রয় দিবে পুঁজির মালিক? সুতরাং এখানেও লিমার আর আশ্রয় হলো না। আবারও রওনা দিতে হল নিয়তির কাঁধে চড়ে অনিশ্চিত জীবনযাত্রায়। পরিবার-পরিজন-প্রতিবেশী এসব হতে বহুদূর। নিজের জীবনের একমাত্র দাবিদার যখন নিজেই, তখন পরোয়া কিসের যেনো তেনো করে জীবন চালিয়ে নেয়ার? বাসে ট্রেনে রাস্তায় যেখানে যেমন করে হোক পথচারীর পকেট থেকে টাকা আদায়, বাজারে দোকানির কাছ থেকে যেমন করে হোক দ্রব্যাদি আদায়- জীবন চালাতে এসব শিখেই নিতে হবে। তাই লিমাও এবার শিখে নিলো। কিন্তু সমাজ ও মানুষের তৈরি যে শ্রেণিবিভাগ, যে বিভাগের নিচের সারিতে ঠেলে দেয় লিমাদের। আর এই ভদ্রলোকের (!) সমাজে লিমাদের যেখানে অচ্ছুত হতে হয় তাদের এহেন জীবন চালানোর জন্য, সে জীবনের প্রতি লিমারও ঘৃণা হয়। এভাবে বেঁচে থাকাটা সম্মানের নয়, মানুষের নয়। তবে বিকল্প কি পথ খোলা আছে মানুষ হয়েও ঠিক মানুষ না প্রান্তিক মানুষ লিমাদের জন্য? কারণ লিমারা যে স্বাভাবিক নারীও না, পুরুষও না। তারা যে অন্য মানুষ! লোকে যাদের বলে হিজড়া।

হিজড়া শব্দটি এসেছে আরবি হিজরত বা হিজরি শব্দ থেকে। যার আভিধানিক অর্থ পরিবর্তন বা migrate বা transfer. হিজড়া শব্দটির ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো হার্মাফ্রোডাইট (hermaphrodite), যার আভিধানিক অর্থ হলো উভয়লিঙ্গ। ইংরেজিতে একে ট্রান্সজেন্ডার (Transgender) বলে। হেলিনিস্টিক যুগের গ্রিক পুরাণের দুটি চরিত্র হার্মেস এবং আফ্রোদিতি থেকে হার্মাফ্রোডাইট শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে। গ্রিক পুরাণে বর্ণিত আছে, একদা হার্মেস ও আফ্রোদিতি দম্পতির সুদর্শন পুত্র হার্মাফ্রোদিতাসের প্রেমে পড়ে যায় ঝরণার উপদেবী। সেই উপদেবী দেবতার কাছে প্রার্থনা করে- সে যেনো চিরতরে হার্মাফ্রোদিতাসের সঙ্গে একীভূত হতে পারে। অবশেষে দেবতা তার প্রার্থনা মঞ্জুর করলে সে দুজনের সংমিশ্রণে একজন অর্ধ-পুরুষ ও অর্ধ-নারী সত্তাতে রুপান্তরিত হয়ে যায়।

হিজড়া সন্তান জন্ম হওয়ার কারণ হিসেবে আধুনিক জেনেটিক্স বা চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতে হিজড়া হলো সেক্স ক্রোমোজোমের ত্রুটিপূর্ণ বিন্যাস (chromosal aberration) বা জীনজনিত জন্মগত যৌন প্রতিবন্ধি ব্যক্তি। যাদের জন্ম পরবর্তী সঠিক লিঙ্গ নির্ধারণে জটিলতা দেখা দেয়। প্রকৃতির নিয়মেই সুস্থ ও প্রাপ্তবয়স্ক একজন পুরুষের শুক্রাশয়ে (অ-কোষ) প্রতিনিয়তই শুক্রাণু তৈরি হয় এবং একজন মহিলার ডিম্বাশয় থেকে সাধারণত প্রতি ২৮ দিন অন্তর অন্তর একটা করে ডিম্বাণু তৈরি হয়। ডিপ্লয়েড ক্রোমোজোম (২n) বিশিষ্ট আদি জননকোষ থেকে পর্যায়ক্রমিকভাবে মাইটোসিস ও মিয়োসিসকোষ বিভাজনের মাধ্যমে স্পার্মাটোজেনেসিস এবং ওজেনেসিস প্রক্রিয়ায় হ্যাপ্লয়েড ক্রোমোজোম (n) বিশিষ্ট শুক্রাণু এবং ডিম্বাণু তৈরি হয়। সাধারণত ডিম্বাণু এক ধরনের সেক্স ক্রোমোজোম (x) বিশিষ্ট হলেও শুক্রাণু দু’ধরনের হতে পারে- হয়তো x নয়তো y সেক্স ক্রোমোজোম বিশিষ্ট। যখন x ক্রোমোজোম বিশিষ্ট শুক্রাণু দ্বারা ডিম্বাণু (x) নিষিক্ত হয়ে xx ক্রোমোজোম বিশিষ্ট জাইগোট তৈরি হয় তখন সেই জাইগোট থেকে কন্যা শিশুর জন্ম হয়। পক্ষান্তরে y ক্রোমোজোমবিশিষ্ট শুক্রাণু দ্বারা ডিম্বাণু (x) নিষিক্ত হয়ে যে জাইগোট (xy) তৈরি হয় তা থেকে ছেলে শিশুর জন্ম হয়। কিন্তু xx ক্রোমোজোম বিশিষ্ট জাইগোট থেকে সৃষ্ট ভ্রুণের কন্যা শিশুতে পরিণত হওয়া যতটা স্বাভাবিক xy ক্রোমোজোম বিশিষ্ট জাইগোট থেকে সৃষ্ট ভ্রুণের ছেলে শিশুতে পরিণত হওয়া ততটা স্বাভাবিক নয়। কেননা xy ক্রোমোজোম বিশিষ্ট জাইগোট থেকে সৃষ্ট ভ্রুণটি কন্যা ভ্রুণ হিসেবেই বৃদ্ধি পেতে থাকে যতক্ষণ না পর্যন্ত y ক্রোমোজোমের SRY(sex determining region of Y chromosome) জিন সক্রিয় না হয়ে উঠে। প্রায় ৪ সপ্তাহ পর এমব্রায়োনিক গোনাডের মেডুলা হতে অ-কোষ তৈরিতে SRY wRb TDF ( testis determining factor)কে নির্দেশ প্রদান করে। এ অ-কোষ টেস্টোস্টেরন এবং এন্টিমোলারিয়ান ডাক্ট হরমোন নিঃসরণের মাধ্যমে ভ্রুণটিকে পরিপুর্ণ ছেলে শিশুতে পরিণত করে। কিন্তু SRY জিনের অনুপস্থিতি বা নিস্ক্রিয়তায় এমব্রায়োনিক গোনাডের মেডুলা অ-কোষে পরিণত হওয়ার পরিবর্তে কর্টেক্স ডিম্বাশয়ে পরিণত হয়। আর এ ডিম্বাশয় ইস্ট্রোজেন উৎপাদন করে, যা মেয়েলী বৈশিষ্ট্য প্রকাশে অন্যতম ভূমিকা পালন করে।

এছাড়া বিপত্তি ঘটে ঠিক তখনই, যখন ওজেনেসিস প্রক্রিয়ায় অস্বাভাবিক মিয়োসিস কোষ বিভাজনের মাধ্যমে সেক্স ক্রোমোজোমের অবিচ্ছেদ্যতার (Nondisjunction) ফলে অসম বিন্যাসবিশিষ্ট অস্বাভাবিক ডিম্বাণু (x’’x’’অথবা x’’o’’) তৈরি হয়। আর এসব অস্বাভাবিক ডিম্বাণু স্বাভাবিক শুক্রাণু দ্বারা নিষিক্ত হলেও সেক্স ক্রোমোজোমের বিভিন্ন অস্বাভাবিক বিন্যাস বিশিষ্ট জাইগোট (xxy, xxx ev xo) তৈরি হতে পারে। এসব অস্বাভাবিক ক্রোমোজোম বিন্যাসের প্রভাবে ছেলে শিশুর দেহে পরিপূর্ণ অ-কোষ এবং মেয়ে শিশুর দেহে ডিম্বকোষ তৈরি হয় না, বা অসম্পূর্ণ অ-কোষ বা ডিম্বকোষ বা দুটোই তৈরি হয়। ফলশ্রুতিতে এসব শিশুরা যখন প্রাপ্ত বয়স্ক হয়, তখন তাদের দেহে পর্যাপ্ত সেক্স হরমোন (টেস্টোস্টেরন বা ইস্ট্রোজেন) নিঃসরণ হয় না। আর তারাই বন্ধ্যাত্বের অভিশাপ নিয় আমাদের সমাজে অভিশপ্ত হিজড়া নামে পরিচিতি পায়।

প্রতি ২০০০ জনের মধ্যে xxy ক্রোমোজোম বিন্যাস বিশিষ্ট একজন ছেলে শিশু জন্ম হতে পারে, যাদের পুরুষ জননাঙ্গ থাকলেও শুক্রাণু তৈরি হয় না। কারো কারো ক্ষেত্রে স্তনযুগল বড় হতে পারে। তাদের ভালভাবে দাঁড়িগোঁফ গজায় না, মেয়েলি আচরণ করতেই তারা বেশি পছন্দ করে। তবে তারা স্বাভাবিক বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন এবং অপেক্ষাকৃত লম্বা আকৃতির হয়ে থাকে। চিকিৎসাশাস্ত্রে এ ধরনের সমস্যা klinefelter’s syndrome নামে পরিচিত। অপরদিকে প্রতি ১৫০০ জন শিশুর মধ্যে xxx ক্রোমোজোম বিশিষ্ট একজন কন্যা শিশু জন্ম হতে পারে। এ ধরনের কন্যা শিশুরা লম্বা ও হালকা গড়নের হয় এবং এরা প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার পরেও ডিম্বাণু তৈরি করতে পারে না। এ ধরনের অস্বাভাবিকতাকে triple X syndrome বলে। আর XO ক্রোমোজোম বিন্যাস বিশিষ্ট কন্যা শিশুরা দেখতে খাটো গড়নের হয়। পরিপূর্ণ জননাঙ্গ তৈরি হয় না। এ ধরনের বৈশিষ্ট্য turner syndrome নামে পরিচিত। (সূত্র: ড. আব্দুল গাফফার মিয়া, পোস্ট ডক্টোরাল, রিসার্চ ফেলো ল্যাবরেটরি অব এনিমেল রিপ্রোডাকশন, সিডনি ইউনিভার্সিটি) ।

পৃথিবীতে চার ধরনের হিজড়া দেখা যায় : ক) যারা দেখতে পুরুষের মতো কিন্তু মানসিকভাবে নারী স্বভাবের তাদেরকে বলা হয় ‘অকুয়া’। খ) কিছু হিজড়া দেখতে নারীর মতো কিন্তু মানসিকভাবে পুরুষ স্বভাবের তাদেরকে বলা হয় ‘জেনানা’। গ) কিছু হিজড়া রয়েছে যারা উভয়লিঙ্গ বিশিষ্ট বা লিঙ্গহীন। আরবিতে ‘খুনসা মুশকিল’ বলা হয় এদেরকে। ঘ) আরেক প্রকারের হিজড়া রয়েছে যাদেরকে কৃত্রিমভাবে যৌনক্ষমতা নষ্ট করে হিজড়া বানানো হয়। এদেরকে ‘খোঁজা’ বলা হয়। বিভিন্ন বিশেষজ্ঞদের মতে, ছোট বয়সেই যদি বাবা মা তাদের লৈঙ্গিক ত্রুটি নিয়ে জন্মানো বাচ্চাটাকে চিকিৎসা করায় তাহলে তারা সুস্থ স্বাভাবিক একজন নারী বা পুরুষের জীবন পেতে পারে। কিন্তু ব্যক্তি উদ্যোগে বেশির ভাগ মানুষের চিকিৎসা করানোর সামর্থ্য নেই। অথচ সরকারি কোন উদ্যোগও এক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হয়নি। কখনো শোনা যায়নি, সরকার হিজড়াদের জন্য বাৎসরিক বাজেটে কোন অর্থ বরাদ্দ করেছে। অথবা তাদেরকে একটি সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে দিতে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বরং দেখা যায়, তাদের প্রতি বিদ্যমান রাষ্ট্র ব্যবস্থার অত্যন্ত অবহেলা ও দায়িত্বহীনতাকে। যার ফল স্বরূপ এই শ্রেণিটি গড়ে উঠে বিকৃত মানসিকতা নিয়ে এবং পেটের তাগিদে জড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন অপরাধমূলক কার্যক্রমে। গ্রামে কিংবা শহরে প্রায়শই হিজড়াদের দেখা মেলে। তবে কোন মানুষই প্রত্যাশা করে না তার সাথে কোন হিজড়ার দেখা হোক। কেননা কোন সঙ্কেত ছাড়াই তারা এমন কোন কা- করে বসতে পারে যা সুস্থ মানসিকতার মানুষকে শুধু বিব্রতই করে না, আতঙ্কিতও করে। রাস্তার দোকানদার, বাসের ড্রাইভার, পথচারী কিংবা ঘরের লোকজন হিজড়ার কথা শুনলে ভয়ে আর শঙ্কায় তটস্থ হয়ে পড়ে। কেননা দোকানের মালামাল হাতিয়ে নেয়া, গাড়ি ভাড়া না দিয়েই নেমে পড়া কিংবা বাসায় ঢুকে ছোট বাচ্চা থাকলে তাকে কোলে তুলে জোর জবরদস্তি করে টাকা আদায় করে নেয়া তাদের নিত্য নৈমিত্তিক কাজ। কোথাও কোথাও হিজড়ারা বিভিন্ন দোকানপাট থেকে প্রকাশ্যে চাঁদাবাজিও করে। কেউ কেউ পতিতাবৃত্তির মতো কাজে লিপ্ত হয়েও জীবিকা চালায়। বিভিন্ন অনুসন্ধানে দেখা যায়- হিজড়াদের মধ্যে বিভিন্ন গ্রুপ রয়েছে। একেক গ্রুপের অধীনে রয়েছে অনেকগুলো করে হিজড়া। এইসব গ্রুপের লিডাররা যৌথভাবে ঠিক করে কারা কোন এলাকাতে কাজ করবে। কাজ বলতে বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে ছল্লা (টাকা) তোলা। হিজড়াদের এই বাস্তবতায় অনেকেই হিজড়াদের উপর বিরক্ত। বরং দেখা যায় হিজড়া শব্দটি শুনলেই কেউ কেউ নাক সিটকানো শুরু করে দেয়। এদেরকে অচ্ছুত ভাবে। এদের অশোভন আচরণ ও কর্মকান্ডের ফলে প্রচলিত সমাজের কথিত সভ্য (!) মানুষেরা মনে করেন, ওদের সমাজটা ভিন্ন।

হিজড়াদের নিয়ে বিভিন্ন তৎপরতা চলছে এমন পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, নেপাল ও পাকিস্তানের মতো আমাদের দেশেও হিজড়াদের তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার কথা বলা হচ্ছে। এই দাবির পক্ষাবলম্বনকারীরা মনে করছেন, নারী-পুরুষের বাইরে ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের জায়গাতে তারা কিছুটা সুযোগ পাবেন। আবার অনেকে মনে করেন, স্বীকৃতির পাশাপাশি বিভিন্ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হলে তারা সামাজিক সুবিধাগুলো গ্রহণ করতে পারবে। তৃতীয় লিঙ্গ মানে হলো একজন হিজড়া যে অবস্থাতে আছে তার কোন পরিবর্তনের দরকার নেই। সে নারী পুরুষের মাঝামাঝি বৈশিষ্ট্য নিয়েই জীবন যাপন করবে। মানুষের একটি নতুন ধারা হবে তারা। আগে মানুষ ছিল নারী-পুরুষ দুই ভাগে বিভক্ত আর এখন একটি নতুন ধারা যুক্ত হবে। তা হলো ‘তৃতীয় লিঙ্গ’। কিন্তু এই লিঙ্গের স্বীকৃতিতেই কী জীবনের মুক্তি? জীবনের জন্য প্রয়োজন অন্তত মৌলিক অধিকারগুলির নিশ্চয়তা।

হিজড়াদের সাথে কথা বলে জানা যায়, হিজড়াদের অধিকার রক্ষায় কোন বিশেষ আইনি ব্যবস্থা নেই। প্রতিনিয়তই তারা বৈষম্যের শিকার। প্রতিকূল পরিবেশ ও অনুকূল সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির অভাবে শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এই জনগোষ্ঠী। সমাজের অসুস্থ দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তারা বাসস্থানের মতো অতি প্রয়োজনীয় একটি মৌলিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত। চরম অস্বাস্থ্যকর ঘিঞ্জি এলাকায় গাদাগাদি করে তারা বসবাস করছে। ফলে বিভিন্ন অসুখ বিসুখ তাদের শরীরে বাসা বাঁধছে। চিকিৎসকরা বলেন, অস্বাস্থ্যকর জীবন যাপন তাদেরকে আরো অসুস্থ করে তুলছে। বিভিন্ন যৌনবাহিত রোগ এবং ভয়াবহ এইডস/এইচআইভি আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনাও বেশি এই জনগোষ্ঠীর। চিকিৎসা, শিক্ষা, নিরাপত্তা, বিনোদন এমনকি ভোট প্রদানের অধিকার আদায়ে জনপ্রতিনিধিরাও তাদেরকে এড়িয়ে চলেন দায়িত্বহীনভাবে। হিজড়া হওয়ার কারণে তাদেরকে কেউ চাকুরীও দিতে চায় না। ফলে চরম অভাব অনটনে দিনাতিপাত করছে তারা। দলবেঁধে ছল্লা তোলার টাকারও বেশির ভাগ খরচ হয় সাজগোজ আর গুরুকে দিয়ে। নিরাপত্তার জন্য তারা নিজেদের মধ্যে প্রচলিত ভাষা ব্যবহার করেও জন্মত্রুটি নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ অনৈতিক আচরণ থেকে রক্ষা পান না। তাই হিজড়াদের মানবেতর জীবন যাপনে অবগত প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিরাও বলেন, “আমাদের দেশের ন্যায় বৈষম্যমূলক হিজড়া সমাজব্যবস্থা পৃথিবীর আর কোন দেশে নাই।” অন্যান্য দেশের হিজড়ারা তাদের পরিবারের সঙ্গেই বসবাস করে থাকে। আমাদের দেশের হিজড়াদের সহযোগিতা করার জন্য প্রতিষ্ঠা পায়নি উল্লেখযোগ্য কোন আইন সহযোগিতা কেন্দ্রও। এছাড়া ব্যাংক একাউন্ট খুলতে গ্যারান্টার না পাওয়া, জীবন বীমা, পাসপোর্ট, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অসহযোগিতা এবং স্থায়ী ঠিকানা নিরূপণে তারা চরমভাবে বাধাগ্রস্থ হয়। ফলে প্রচলিত সমাজ ও রাষ্ট্রে বিভিন্নভাব বঞ্চিত ও উত্যক্ত্যের শিকার হয়ে তারা হিংসাত্মক হয়ে উঠে। এভাবে সমাজ ও রাষ্ট্রের খামখেয়ালিপনায় এবং অব্যবস্থাপনায় পারিবারিক সামাজিক বৈষম্যের শিকার হয়ে আলাদা হয়ে পড়া অনেক হিজড়া বাঁচার তাগিদে যৌনপেশা, চোরাচালান ও মাদক ব্যবসার মতো নিষিদ্ধ পেশাতেও জড়িয়ে পড়ছে। যাদেরকে ব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় আনুকূল্যে মাদক ব্যবসায়ী, চোরাচালানকারীরা দেশ ও সমাজের ভয়ানক ক্ষতি সাধন করছে। অথচ এই সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের দাবি এ সমস্ত অপরাধমূলক পেশায় যাতে না জড়াতে হয় তার জন্য সরকার খাস জমি বরাদ্দ করে হিজড়া ভিলেজ প্রকল্পের মাধ্যমে তাদের আবাসনের ব্যবস্থা এবং কর্মসংস্থান করে পুনর্বাসন করা। হিজড়া নেতাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, পাকিস্তান আমল থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত হিজড়াদের নির্র্দিষ্টহারে ভাতা দেয়ার প্রচলন ছিল। পরিবহন ভাড়া, চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল এবং বিনোদনের জন্য সিনেমা হল ফ্রি ছিল। আর বর্তমান সময়ে এসে সবই কেড়ে নেয়া হয়েছে। এই সম্প্রদায়ের অভিযোগ, এ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ- বিএনপি- জামায়াত- জাতীয় পার্টি যত সরকারই এসেছে কোন সরকারই তাদের সমস্যা ও সঙ্কটের সমাধানে উদ্যোগী ও আন্তরিক হয়নি। সমাজের অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মত তারাও নির্যাতিত, বঞ্চিত ও নিষ্পেষিত হচ্ছে। প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা বরাবরই অবহেলা ও অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখেছে তাদের। তাই তারা মনে করে সমাজের অন্যান্য দলিত, অচ্ছুত জাতির মত তারাও এই সমাজে শোষক শাসক গোষ্ঠীর নির্যাতন- শোষণের শিকার। ফলে প্রচলিত রাষ্ট্র ও সমাজ এই নির্যাতিত সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করে না, তাদের স্বার্থ রক্ষা করতে পারে না। তাদের স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজন প্রচলিত শোষণমূলক সমাজের অবসান। অচ্ছুত, দলিত, শোষিত, বঞ্চিত মানুষেরাই যে সমাজ বিনির্মাণ করবে। সুতরাং হিজড়া জনগোষ্ঠীর সংগ্রাম সমস্ত শোষিত মানুষের শোষণ উচ্ছেদের সংগ্রামের সাথে একীভূত।

লেখকঃ সুদীপ্ত


‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ সাম্রাজ্যবাদের স্বীকৃতিতে জনগণের কোন স্বার্থ নেই

21-February-Ekushey-Wallpaper-rootsbd.com-13

‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ সাম্রাজ্যবাদের স্বীকৃতিতে জনগণের কোন স্বার্থ নেই

(ফেব্রুয়ারি, ২০০০)

সম্প্রতি জাতিসংঘ ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করেছে।  এ ঘোষণার পর এদেশের শাসকশ্রেণীর বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদী অংশ ও বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীরা একে এদেশের জনগণের সংগ্রামের বিশ্ব স্বীকৃতি বলে খুব ঢাক- ঢোল পেটাচ্ছে।  শাসক আওয়ামী সরকার আরো এক ধাপ এগিয়ে একে নিজেদের কৃতিত্ব বলে জাহির করছে।
বিশ্ব-জনগণের স্বীকৃতি, আর জাতিসংঘের স্বীকৃতি এক কথা নয়। বর্তমানে জাতিসংঘ হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদীদের নেতৃত্বে তাদের ও বিশ্বজুড়ে তার দালাল গণবিরোধী শাসকদের সমন্বয়ে গঠিত, সামাজ্যবাদের স্বার্থের পাহারাদার একটি সংস্থা। আজকের বিশ্বে জাতিসংঘের তৎপরতা হচ্ছে প্রধানত সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের তৎপরতা। সুতরাং ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে জাতিসংঘ যে স্বীকৃতি দিয়েছে তাকে সাম্রাজ্যবাদের দেয়া স্বীকৃতি বললে খুব একটা বাড়িয়ে বলা হবে না।
’৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি যে ভাষা আন্দোলন এদেশে হয়েছিল তা নিঃসন্দেহেই ছিল একটা ন্যায্য, বীরোচিত ও মহান সংগ্রাম- যা তৎকালীন জাতীয় নিপীড়নকারী প্রতিক্রিয়াশীল পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠীকে গুরুতর আঘাত হেনেছিল। বাস্তবে এই ভাষা আন্দোলন ছিল এদেশের নিপীড়িত জাতি-জনগণের জাতীয় মুক্তি আকাঙ্খারই একটি প্রকাশ। কিন্তু এ আন্দোলন একদিকে যেমন ছিল ন্যায়সঙ্গত ও মহান, অন্যদিকে এতে ছিল গুরুতর সীমাবদ্ধতা। এই আন্দোলন সামগ্রিক জাতীয় মুক্তির জন্য বিপ্লবী সংগ্রামের অধীনে পরিচালিত না হয়ে একটা ইস্যুভিত্তিক সংগ্রাম আকারে চালিত হয়। এটা জাতীয় নিপীড়নের বৃহত্তর শত্রু সাম্রাজ্যবাদকে চিহ্নিত করেনি, বরং শুধুমাত্র আশু জাতীয় নিপীড়নকারী পাকিস্তানী ষড়যন্ত্রকেই আঘাত করেছিল। এভাবে এই সংগ্রাম তার তৎকালীন ন্যায্যতা ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব সত্ত্বেও একটি সামগ্রিক জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম, তথা একটি বিপ্লবী সংগ্রামের অংশ হয়ে ওঠেনি।  এ কারণেই এ সংগ্রামের ঐতিহাসিক গুরুত্ব (পাকিস্তানি জাতীয় নিপীড়নকে বিরোধিতা করা) পার হয়ে যাবার পর সাম্রাজ্যবাদের দালাল প্রতিক্রিয়াশীল বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদীরা একে আজ নিজেদের পকেটে পুরতে সক্ষম হয়েছে।
কিন্তু, এ সত্ত্বেও, এ সংগ্রাম যখন ছিল জীবন্ত এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাহসী বিদ্রোহ, তখন আর সব সংগ্রামের মতই এই বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদীরা তাতে সবচেয়ে পশ্চাৎপদ ভূমিকা রেখেছিল।  বাস্তবে সে সময়ে এই আন্দোলনে তৎকালীন আঃ লীগের বুর্জোয়া প্রতিক্রিয়াশীল অংশ (শেখ মুজিব ও সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বাধীন অংশ) তেমন কোন জোরালো ভূমিকা রাখেনি।  বরং এতে উদ্যোগী ও নেতৃত্বে ছিলেন তৎকালীন বামপন্থী তরুণ ও কমিউনিস্ট ভাবাপন্ন প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদগণ। অথচ আজ আওয়ামী লীগ ও তার দালাল বুদ্ধিজীবীরা এই প্রকৃত ইতিহাসকেই পাল্টে দিতে চাচ্ছে। এমনকি শেখ মুজিব নাকি এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিল …..এমন ডাহা মিথ্যা বক্তব্যও তারা প্রচার করছে! ৭১ সালের পর ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনের সংগ্রামী ও প্রগতিশীল অস্তিত্ব ফুরিয়ে যায়- এ আন্দোলনের উপরে উল্লিখিত সীমাবদ্ধতার কারণেই। ভাষা আন্দোলনের সারবস্তুগত আকাঙ্খা- প্রকৃত জাতীয় মুক্তির আকাঙ্খা- এখনো পূর্ণমাত্রায় জীবন্ত থাকলেও উপরোক্ত কারণেই ’৭১-এর পর ভাষা আন্দোলনের আনুষ্ঠানিকতা প্রতিক্রিয়াশীল বাঙালী বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।
এরা নিজেরা প্রকৃত জাতীয় মুক্তির মূল শত্রু সাম্রাজ্যবাদের দালাল। এদেশের রাজনীতি-অর্থনীতির মূল ক্ষেত্রগুলোসহ শিক্ষা-শিল্প-সংস্কৃতিরও প্রতিটি ক্ষেত্রে এদের দেশদ্রোহী চরিত্রের প্রকাশ অতি নগ্ন।  পাকিস্তানী তীব্র জাতীয় নিপীড়নের সময়কালের চেয়েও অনেক ব্যাপকভাবে এখন বিজাতীয় ভাষা ইংরেজীকে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে এদেশের কোমল শিশুদের থেকে শুরু করে শিক্ষার সর্বক্ষেত্রে।  ইংরেজী মাধ্যমের স্কুল-কলেজ এখন রাজধানী ছাড়িয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে।  এর উপর বিজাতীয় আরেকটি ভাষা আরবীকেও একেবারে নিুশ্রেণীর শিক্ষার্থীদের উপর চাপানোর ষড়যন্ত্র চলছে। সাম্রাজ্যবাদী-সম্প্রসারণবাদী জাতিবিরোধী, প্রগতিবিরোধী সংস্কৃতি, সিনেমা, ডিস এন্টেনা, টিভি, পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে দেশজুড়ে ক্যানসারের মত।  এ সবই একুশের চেতনার বিরোধী। এসবের মূল কারণ হচ্ছে, এদেশের শাসকরা পাকিস্তানের চেয়ে অনেক বড় জাতীয় নিপীড়ক সাম্রাজ্যবাদের দালাল, ’৭১-এর রাজাকার বা একুশের ভাষা আন্দোলনের শত্রুদের মতই জাতীয় বেঈমান।
অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরে সংখ্যালঘু জাতিসত্ত্বাগুলোর উপর এরা তীব্র জাতিগত নিপীড়ন চালাচ্ছে- যার একটি রূপ হচ্ছে তাদের ভাষা-সংস্কৃতির উপর হামলা চালানো। সর্বোপরি এরা ক্ষুদে জাতিসমূহের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের সংগ্রামকে পুলিশ-আর্মি দিয়ে হত্যা করছে।
অথচ এই জাতিদ্রোহী শাসকশ্রেণী ও তাদের প্রত্যক্ষ/পরোক্ষ দালাল বুদ্ধিজীবীরা আজ একুশের বড় কর্তা হয়ে বসেছে। আর তাকে মদদ দিয়ে আকাশে তুলছে তাদের বিজাতীয় প্রভু, এদেশে ভাষা-সংস্কৃতি-জাতীয় বিকাশের শত্রুরা ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ ঘোষণা করে।  সুতরাং এদের এই ভণ্ডামির উন্মোচন ও বিরুদ্ধাচরণেই নিহিত রয়েছে ২১-এর সংগ্রামী ও জাতীয় মুক্তির প্রকৃত তাৎপর্যকে উর্ধ্বে তুলে ধরা।
* সাম্রাজ্যবাদীরা এ সত্য খুব ভালভাবেই বোঝে যে, এই শাসকশ্রেণীর ২১-এর চেতনা তাদের জন্য কোন বিপদ নয়। বরং এটা তাদের স্বার্থের উপযুক্ত। এ কারণেই তারা এই আন্দোলনের দীর্ঘ প্রায় অর্ধ শতাব্দীকাল পরে এবং তার সংগ্রামী অস্তিত্ব ফুরিয়ে যাবার ৩০ বছর পরে যখন প্রতিক্রিয়াশীল বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদীরা একে একটি মৃত আনুষ্ঠানিকতা ও জাতীয় শত্রুদের হাতিয়ারে পরিণত করেছে তখন তাকে স্বীকৃতি দিয়েছে। তাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী জাতীয় বিপ্লবী সংগ্রামকে বিপথগামী ক’রে বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদী পথে তাকে চালানো- যাকে সাম্রাজ্যবাদের পক্ষে পথভ্রষ্ট করা ও কিনে ফেলা খুবই সহজ। ’৭১ সালে এদেশে তারা এটাই করেছিল।  পরে দক্ষিণ আফ্রিকা, প্যালেষ্টাইন ও আজ পূর্ব তিমুরে এবং অন্যত্র এটাই তারা করেছে ও করছে।
* এদেশের (ও অন্য সকল নিপীড়িত দেশের) ব্যাপক জনগণের ভাষা-সংস্কৃতির বিকাশ, তথা জাতীয় মুক্তির স্বার্থ আজ নিহিত রয়েছে সাম্রাজ্যবাদী শোষণ-নিপীড়ন উচ্ছেদের সংগ্রামে। যদিও কোন কোন জাতিসত্ত্বার ক্ষেত্রে এর পাশাপশি আশু জাতীয় শত্রু হিসেবে অন্য শক্তিশালী জাতির বুর্জোয়া শাসকশ্রেণীর জাতীয় নিপীড়নও রয়েছে- যাকে উচ্ছেদ করতে হবে।
সাম্রাজ্যবাদের দালাল জাতীয় বিশ্বাসঘাতক আমলা-বুর্জোয়া শাসক শ্রেণীর পক্ষ থেকে নিজ নিজ ভাষাকে তুলে ধরার বক্তব্য একদিকে ভণ্ডামি, অন্যদিকে প্রতিক্রিয়াশীল বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদকে শক্তিশালী করা- যা কিনা প্রকৃত জাতীয় মুক্তিকেই বিরোধিতা করে এবং নিজ দেশে ক্ষুদে জাতিসমূহের ভাষা-সংস্কৃতি-জাতীয় মুক্তির উপর নিপীড়ন/দমন চালায়।
তাই, প্রকৃত জাতীয় মুক্তির সংগ্রামকে আজ ভাষার অধিকারের প্রশ্নকে সাথে নিয়ে সাম্রাজ্যবাদের উচ্ছেদ, তথা নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের সাথে যুক্ত করতে হবে। আর, এ কর্তব্যের অপরিহার্য অংশ হচ্ছে ‘ভাষা দিবস’-এর নামে গণশত্রু ও জাতীয় বিশ্বাসঘাতক শাসকশ্রেণী ও তাদের প্রভু সাম্রাজ্যবাদীদের চক্রান্তের মুখোশ উন্মোচন করা। নিপীড়িত জনগণের প্রয়োজন নিজ ভাষা-সংস্কৃতি বিকাশের, তথা জাতীয় মুক্তির পথে মূল শত্রু সাম্রাজ্যবাদ (ও অন্য সকল জাতীয় নিপীড়ক) উচ্ছেদের বিপ্লবী সংগ্রামের জীবন্ত কর্মযজ্ঞ; ‘আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস’-এর নামে জাতীয় শত্রুদের ভণ্ডামি, চক্রান্ত ও আনুষ্ঠানিকতাবাদী মৃত উৎসব নয়।

সূত্রঃ সংস্কৃতি বিষয়ক, আন্দোলন সিরিজ ৩, আন্দোলন প্রকাশনা


খাগড়াছড়ি মহাসম্মেলন: শান্তি আলোচনা-প্রশাসনিক সমাধান বনাম পাহাড়ী জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার

larma-lrg20151202200326

খাগড়াছড়ি মহাসম্মেলন: শান্তি আলোচনা-প্রশাসনিক সমাধান বনাম পাহাড়ী জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার

(মে/’৯৪)

গত ৯ এপ্রিল ’৯৪ অনুষ্ঠিত হলো ‘পাহাড়ী গণপরিষদ’-এর উদ্যোগে পার্বত্য চট্টগ্রামে খাগড়াছড়ি মহাসম্মেলন। পাহাড়ী গণপরিষদ, ছাত্র পরিষদসহ পাহাড়ী নেতৃবৃন্দ ছাড়াও বিভিন্ন মার্কসবাদী দাবিদার দলসমূহ, বুর্জোয়া মানবাধিকারবাদীসহ সাতজন বক্তা সমতল থেকে আমন্ত্রিত হয়ে উক্ত মহাসমাবেশে বক্তব্য রেখেছেন। বিপ্লবী শ্রমিক আন্দোলন ও বিপ্লবী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে একজন প্রতিনিধিও এই মহাসমাবেশে বক্তব্য রেখেছেন। মহাসমাবেশের উদ্যোক্তাদের মূল শ্লোগান ছিল ‘স্বায়ত্তশাসনই একমাত্র সমাধান।’ উপস্থিত বিভিন্ন জাতীয় সংগঠন এবং পাহাড়ী নেতৃবৃন্দের সমস্ত আলোচনায় দুইটি পথের কথা উল্লেখিত হয় পাহাড়ী জনগণের জাতিগত মুক্তির প্রশ্নে . . . . . . .
একটি হচ্ছেঃ সরকারী প্রতিনিধি দলের সাথে ‘জনসংহতি সমিতি’র আলোচনা, বাঙালী শাসক-বুর্জোয়া শ্রেণীর সংসদ। এসবের মাধ্যমে আইন প্রণয়ন সাংবিধানিক তথা প্রশাসনিক সমাধান।
আরেকটি পথ হচ্ছেঃ পাহাড়ী জাতিসত্তাসমূহের জনগণের সংগ্রামের পথে প্রকৃত জাতিগত আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার তথা প্রকৃত রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জন- দুইটি পথ সম্পূূর্ণ পরস্পর বিরোধী।

বিপুল উদ্দীপনা, সংগ্রামের দৃঢ় প্রত্যয় পাহাড়ী কৃষক-ছাত্র-জনগণের হৃদয়ে

৯ তারিখ সকালে আমরা যখন সম্মেলন স্থলে পৌঁছলাম, পাহাড়ী ছাত্র-জনগণ ও নেতৃবৃন্দ শ্লোগান দিয়ে আমাদেরকে স্বাগত জানালেন।  ঢাকা থেকে ওয়ার্কার্স পার্টি, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী জোট, জাসদের কেন্দ্রীয় নেতারা এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ কমিটির আহ্বায়ক মানবাধিকারবাদী ব্যারিস্টার লুৎফর রহমান শাহ্জাহান আগের দিনই খাগড়াছড়ি পৌঁছেছেন।  দুই হাজারেরও অধিক পাহাড়ী ছাত্র-ছাত্রী, শ্রমজীবী-পেশাজীবী জুম চাষীর উৎসাহী অংশগ্রহণ লক্ষণীয়।  এদের প্রায় সকলেরই হৃদয়ের যে আকাংখাটি চোখে-মুখে ফুটে উঠেছিল তা হলো সংগ্রামের দৃঢ় প্রত্যয় এবং সঠিক পথ পাবার অনুসন্ধিৎসা।  তারা বক্তাদের বক্তব্য শুনেছেন অভাবনীয় মনোযোগের সাথে। কিন্তু কি তাদের মুক্তির সেই পথ!! যা জানবার জন্য আবাল-বৃদ্ধ-বণিতার এই উৎকণ্ঠা?

শান্তি বৈঠক ও একই সাথে নানিয়ারচর গণহত্যা!
মহাসম্মেলনে যে প্রশ্নটি গুরুত্ব সহকারে এসেছে তা হচ্ছে সরকারী কমিটির সাথে জনসংহতির আলোচনা।  ১০ এপ্রিল লোগাং হত্যাদিবস উপলক্ষে প্রখর রৌদ্রের ভিতর হাজার হাজার পাহাড়ীর সমাবেশে উপস্থাপক জনৈক ছাত্র নেতা বলছিলেন, এই আলোচনা আসলে আমাদের কিছুই দিতে পারেনি।  এটা পাহাড়ীদের উপর নিরাপদে হত্যা-নির্যাতন চালানোর লক্ষ্যে সময় ক্ষেপণ মাত্র। সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের নেতা জগজিৎ বড়ুয়া ও এই সরকারী ষড়যন্ত্রের বিরোধিতা করে লোগাং-এ বক্তব্য রেখেছেন।  আন্দোলন পত্রিকার গত সংখ্যায় এই শান্তি আলোচনার মধ্যেই কীভাবে ঠাণ্ডা মাথায় নানিয়ারচরে বর্বোরোচিত হত্যাকান্ডে পাহাড়ী জনগণের রক্তে রঞ্জিত হয়েছে তা বর্ণনা করা হয়েছে।  এখন পাহাড়ীদের সংগ্রামের সামনে এ প্রশ্নটা খুবই স্পষ্ট আকারেই আসছেঃ তাদেরকে খুন-লুটপাট-ধর্ষণ করবার জন্য উগ্র বাঙালী বড় ধনী শাসক শ্রেণীর আর্মী রয়েছে, বাঙালী পুনর্বাসনের মাধ্যমে অব্যাহত রয়েছে পাহাড়ীদের পার্বত্য চট্টগ্রামে সংখ্যালঘু করার ও তাদের জাতিগত অস্তিত্ব বিলুপ্ত করার প্রক্রিয়া, সে অবস্থায় এই শান্তি আলোচনায় কি তাদের সমাধান?  অবশ্য বাঙালী উগ্র জাতীয়তাবাদী সরকারী প্রতিনিধি দলের অন্যতম সদস্য রাশেদ খান মেননের দল ওয়ার্কার্স পার্টির প্রতিনিধি তার বক্তব্যে এই শান্তি আলোচনাকে সমর্থন করেছে।
পাহাড়ী জনগণের মধ্যে হতাশা ছড়াতে প্রচার চলছে- কোন্দিন এদেশে বিপ্লব হবে ততোদিনে পাহাড়ীরা বিলুপ্ত হয়ে যাবে, তাই সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে যা পাওয়া যায়- তাই ভালো। এমন প্রচারও চলছে, পাহাড়ী জনগণ নাকি সংগ্রাম করতে করতে ক্লান্ত। তাই শান্তি আলোচনায় তারা একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন।
কিন্তু পাহাড়ে যে চিত্র দেখা গেল তা এই মতের সম্পূর্ণ বিপরীত। পাহাড়ী জনগণ তাদের প্রকৃত মুক্তির জন্য তার শেষ রক্ত বিন্দু পর্যন্ত দিতে প্রস্তুত। আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের কিছুই হয়নি; রাজাকার পার্বত্য জেলা পরিষদের মাধ্যমে নয়, তিনজন পাহাড়ী এমপি (আওয়ামী লীগের টিকিটে)-কে ভোট দিয়ে নয়, এমনকি সর্বশেষ সরকারী কমিটির সাথে আলোচনায়ও নয়, যখন চলছে আলোচনা ও কথিত যুদ্ধ বিরতি তখনই ঘটছে নানিয়ারচরের বর্বোরোচিত হত্যা। শান্তি-স্থিতি প্রতিষ্ঠার কথা বলা হলেও প্রতিদিন নতুন নতুন বাঙালী পুনর্বাসন করে বেশি বেশি অশান্তি ঘটানো হচ্ছে। আর্মী ক্যাম্পের সম্প্রসারণ চলছে। এমনকি রাজনৈতিক সমাধানের নামে ভারত থেকে ফেরত আসা পাহাড়ী শরণার্থীদের রাখা হয়েছে মানবেতর উদ্বাস্তু করে। আসলে এই তথাকথিত ‘শান্তি’ হচ্ছে বাঙালী নিপীড়ক বুর্জোয়া শাসক শ্রেণীর জন্য শান্তি। যেন তারা কোন বাধা ছাড়া নির্বিঘ্নে পাহাড়ীদের হত্যা-ধর্ষণ-নির্যাতন-জমি দখল-উচ্ছেদ করতে পারে।  পাহাড়ীদের জন্য এটা হচ্ছে প্রতিরোধ ছাড়া মৃত্যুর শান্তিকে মেনে নেয়া।
এভাবে দেখা যায়, উগ্র বাঙালী সরকার ও বড় ধনী শাসক শ্রেণীর সাথে আলোচনা, দাবি এ সবকিছুই নিষ্ফল। এবং এসব কিছু করে পাহাড়ী জনগণের অবস্থার বিন্দুমাত্র উন্নতি হয়নি।  বরং নতুন করে আক্রমণের লক্ষ্যে পাহাড়ী জনগণকে সংগ্রাম থেকে নিষ্ক্রিয় করার সরকারী চক্রান্ত এগিয়ে চলছে।

তিনজন পাহাড়ী এমপি’র বিতর্কিত ভূমিকা এবং উগ্র বাঙালী জাতীয়তাবাদী প্রাধান্যপুষ্ট জাতীয় সংসদ।
কি দেবে এই গণবিরোধী সংসদ?
পাহাড়ী গণ পরিষদ, পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের উপর সারির নেতৃবৃন্দ বাঙালী নিপীড়কদের সাথে স্রোতে ভেসে বলেছেন, ‘বর্তমানের গণতান্ত্রিক সরকার’ ‘গণতান্ত্রিক সংসদ’ ইত্যাদি। কিন্তু আসলে কি? এটা পাহাড়ী জনগণের দিক থেকে যেমন, তেমনি নির্যাতিত বাঙালী শ্রমিক-কৃষক মেহনতি জনগণের কাছে স্পষ্ট যে, এই সংসদ নির্যাতিতদের বন্ধু নয় বরং নির্যাতক, শোষকদেরই আস্তানা।  এরা স্বৈরাচারী। এরা মার্কিনসহ সাম্রাজ্যবাদ ও ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের দালাল আমলা-মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া শ্রেণীর প্রতিনিধি।  এই কারণেই এরা সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব ব্যাংক, আইএমএফ-এর নির্দেশে লক্ষ লক্ষ কর্মচারী ছাঁটাই করে, কোটি কোটি দরিদ্র কৃষককে করে সর্বস্বান্ত।  উচ্ছেদ করে হকার, বস্তিবাসী, রিক্সাচালকদের। সমতলে এদের শোষণ-নিপীড়নের পাশাপাশি পাহড়ে এরা উগ্র বাঙালী বা বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদী নিপীড়নের হোতা। আর্মীরা যে পাহাড়ে হত্যা-ধর্ষণ-তান্ডবলীলা চালায়, তাতে এদেরই প্রত্যক্ষ অনুমোদন রয়েছে।  ফলে এটা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, এই সংসদের আরেকটি চরিত্র হচ্ছে এটা উগ্র বাঙালী জাতীয়তাবাদী। তাই এরা পাহাড়ী জনগণের উপর নিপীড়ন চালাতে বাধ্য। আজ পার্বত্য চট্টগ্রামে এত গণহত্যা-ধর্ষণ-নিপীড়ন- তারপরেও কেন পাহাড় থেকে নির্বাচিত তিনজন এমপি ন্যূনতম কোন প্রতিবাদ করেননি, বিক্ষোভে ফেটে পড়েননি, পদত্যাগ করা তো দূরে থাক, পদত্যাগের হুমকিও দেননি। সেটা সংসদের চরিত্র থেকেই স্পষ্ট। অধিকার সংরক্ষণ কমিটির নেতা ব্যারিষ্টার লুৎফর সাহেব পাহাড়ী এম.পি.দের এই ভূমিকার নিন্দা করেছেন বটে, একই সাথে আশাবাদী তিনি যদি পাহাড়ী এম.পি.রা এ ব্যাপারে সোচ্চার হতেন বা ভবিষ্যতে সে রকম সোচ্চার এম.পি.দের নির্বাচিত করা যায় তবে নাকি একটা ভাল ফলাফল পাওয়া যাবে। ব্যারিষ্টার শাহ্জাহান সাহেবের এ আশাবাদ বাস্তবে হবার নয়, কারণ নিপীড়ক বাঙালী বড় ধনীদের সংসদ নিপীড়িত পাহাড়ী সংখ্যালঘুদের নিপীড়ন করতে পারে। নিপীড়ন বন্ধ করতে কখনই পারে না।  এটা নিপীড়নেরই যন্ত্র; যতদিন তা চালু থাকবে তা নিপীড়ন করবেই।  এদের কাছে এটা আশা করার অর্থ বাঘের কাছে হরিণের নিরাপত্তা আশা করা।

প্রকৃত জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার বনাম স্বায়ত্তশাসনের বর্তমান প্রস্তাবসমূহ্ ॥
সংশোধিত ৫ দফা, গণপরিষদের ৭ দফাঃ
এই একটি ব্যাপারে স্পষ্ট করে বলার সাহস (নাকি উগ্র বাঙালী জাতীয়তাবাদী স্বার্থের প্রতি টান) এদেশের বুর্জোয়া বা সংশোধনবাদী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রায় কারোরই নেই।  সেটা হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রামে যা চলছে তা হচ্ছে উগ্র জাতিগত নিপীড়ন।  সেই নিপীড়নের হোতা উগ্র বাঙালী আমলা-মুৎসুদ্দি-বুর্জোয়া শাসকশ্রেণী, তাদের রাষ্ট্রযন্ত্র, নিপীড়নের সরাসরি মাধ্যম হচ্ছে তাদের সশস্ত্র সেনাবাহিনী।  প্রক্রিয়া হচ্ছে সেনাবাহিনী দিয়ে গণহত্যা-ধর্ষণ-উচ্ছেদ-দেশছাড়া করা। বাঙালী পুনর্বাসনের মাধ্যমে পাহাড়ীদের খোদ পাহাড়েই সংখ্যালঘু করে ধীরে ধীরে জাতিসত্তাসমূহকে নিশ্চিহ্ন করা। বাঙালী-পাহাড়ী সাধারণ জনগণের ভিতর বৈরিতা সৃষ্টি করা।  জাতিগত নিপীড়ন-শোষণের অবসানের জন্য প্রয়োজন পাহাড়ী শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্ত এবং জাতীয় মুক্তির পক্ষের ধনীদের যৌথ গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ক্ষমতা।  তার জন্য প্রথম দাবি বাঙালী সেনাবাহিনী প্রত্যাহার, বাঙালী পুনর্বাসন বন্ধ, পুনর্বাসিতদের ফেরত আনা।  পাহাড়ী শ্রমিক-কৃষক জনগণের নিজ জাতিকে নিয়ন্ত্রণ ও নিজেদের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সমস্ত রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রদান।  এটাই হচ্ছে প্রকৃত আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার, এ জন্য প্রয়োজন পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বাঙালী আমলা-মুৎসুদ্দি-বুর্জোয়া শ্রেণীর শাসন- শোষণের পরিপূর্ণ উচ্ছেদ।
পাহাড়ী গণপরিষদ, জনসংহতি সমিতির দাবিনামার দিকে তাকিয়ে দেখা যাক। গণপরিষদ মহাসম্মেলন, ’৯৪ উপলক্ষে তাদের বক্তব্যে যে সাতদফা দাবিনামা পেশ করেছে তার প্রথম নম্বরেই এভাবে লেখা আছে- “. . . . . . . . সাংবিধানিক গ্যারান্টিসহ স্বায়ত্তশাসন প্রদানের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ী জাতিসত্তাসমূহের স্বাতন্ত্র্য, অস্তিত্ব রক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।”
এখানে সাংবিধানিক গ্যারান্টিসহ স্বায়ত্তশাসন প্রদানের ব্যাপারটি কি? সাংবিধানিক গ্যারান্টি কার কাছে চাওয়া হচ্ছে? অস্তিত্ব রক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে- এ দাবিটা কার কাছে? বুঝতে বাকি থাকে না যে, উগ্র বাঙালী সরকার ও শাসক শ্রেণীর কাছে এই দাবি। আসলে এ ধরনের দাবি থেকে যা বেরিয়ে আসে তা হচ্ছে কাশ্মীর, পাঞ্জাব, আসাম, তামিলনাড়– এসব জাতিকে ভারত যতটা আইনী “স্বায়ত্তশাসন” দিয়েছে এ দাবি ঠিক ততটাই। এই কথিত স্বায়ত্তশাসন-যে প্রকৃত জাতিসত্তাসমূহের নিজস্ব ক্ষমতা নয় তার প্রমাণ জাতিসমূহের কারাগার ভারতের নিপীড়ক সরকার সামান্য পান থেকে চুন খসলেই এক কলমের খোঁচায় কেন্দ্রীয় শাসন জারি করে, আর্মী পাঠিয়ে চালায় গণহত্যা-দমন। এবং সেটা তারা সংবিধান সম্মতভাবেই করে থাকে। ভারতে এসব নিপীড়িত জাতিসত্তা-যে মুক্তি পায়নি প্রতিদিন তাদের তীব্র সংগ্রামই তা প্রমাণ করছে। আজ তথাকথিত পার্বত্য জেলা পরিষদ উঠিয়ে নিয়ে যদি বাংলাদেশ সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামে একটা মুখ্যমন্ত্রী রাজ্যসভা করার অনুমতি দেয় তাতেই কি জে.এস.এস. এবং পার্বত্য গণপরিষদ খুশি? আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার রক্তাক্ত সংগ্রামে নিয়োজিত পাহাড়ী ছাত্র শ্রমিক কৃষক মেহনতি জনগণকে এটা পরিষ্কারভাবে বুঝতে হবে যে, এই রকম স্বায়ত্তশাসন অর্জিত হলে পাহাড়ের বড় বড় ধনী ও দালাল মধ্যবিত্তদের একাংশই মাত্র ক্ষমতা পাবে। জনগণের উপর নিপীড়ন তাতে কমবেই না, এমনকি জাতিগত নিপীড়ন আরো ভিন্ন চেহারায় ভয়ংকরভাবে নেমে আসবে।  এ ধরনের কোন সমাধান মেনে নেয়া হলে তা হবে লোগাং, নানিয়ারচর, লংগদু, পানছড়িসহ অসংখ্য গণহত্যার শহীদ পাহাড়ীদের রক্তের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা। ফলত “সাংবিধানিক গ্যারান্টি” বলে যে দাবি তুলে ধরা হয়েছে এটা নিপীড়নের অধীনেই কিছু একটা সমস্যার সমাধান মাত্র।  পাহাড়ের বড় ধনীরা ও দালাল মধ্যবিত্তরা শুধু নিজেদের সংকীর্ণ স্বার্থে এ দাবি তুলে ধরেছে- আর পাহাড়ী শ্রমিক-কৃষক-সাধারণ জনগণকে ভাঁওতা দিচ্ছে এই বলে যে, এতে নাকি জাতীয় মুক্তি হবে। পাহাড়ী গণপরিষদের উক্ত বক্তব্যের ৪নং দাবিনামায় রয়েছে ‘সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামকে বেসামরিকীকরণ করতে হবে এবং সেনাক্যাম্প বন্ধ করতে হবে’- এটা পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে উগ্র বাঙালী জাতীয়তাবাদী সেনাবাহিনী প্রত্যাহারের ন্যায্য দাবি থেকে এক ধাপ পিছু হটে আসা। কেবল বেসামরিকীকরণ, আর ব্যারাকে ফিরিয়ে আনাই সফলতা নয়, সমস্যা হচ্ছে ঐ সেনাবাহিনী ও তার ব্যারাককেই ওখান থেকে সরানো।
আজ পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ী জাতিসমূহের জাতিগত নিপীড়ন-শোষণ-অবসানের পথ থেকে সরে না আসা বরং আরও সঠিক পথে সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যাবার প্রশ্ন্।  তাই শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্ব ও মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদ-এর আদর্শে এগিয়ে আসতে হবে পাহাড়ী যুবকদের, প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীদের ও সকল শ্রমজীবী পাহাড়ীকে।  কারণ আজকের জাতিগত সমস্যার সাম্রাজ্যবাদী সমাধান যে সব আমরা দেখছি ফিলিস্তিনে, একদিকে হোয়াইট হাউজে বুর্জোয়া নেতৃত্ব আরাফাত গংদের বিশ্বাসঘাতকতা, ‘সীমিত স্বায়ত্তশাাসন’- অন্যদিকে হেবরনে ফিলিস্তিনিদের উপর গণহত্যা; সাদা বুর্জোয়া ডি ক্লার্কের সাথে কালো বুর্জোয়া ম্যান্ডেলার আঁতাত, আরেকদিকে প্রতিদিন শত শত কালো আফ্রিকানের হত্যা-নিপীড়ন। তাই দেখা যায়, প্রথম দিকে যতটাই-বা সংগ্রামী থাকে, পেটিবুর্জোয়া-বুর্জোয়া নেতৃত্ব, ধীরে ধীরে তারা সাম্রাজ্যবাদ ও শাসক জাতিরই পদানত হয়ে পড়ে।  বিপ্লবী সর্বহারা শ্রেণীর নেতৃত্ব ও মাওবাদ ছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামের সংগ্রাম তাই আজকের জায়গা থেকে আর সামনে এগুতে পারবে না।
মাওবাদী অগ্রসর ধারা ছাড়া আজ আত্মনির্ভরশীলভাবে লড়াই এবং পাহাড়ে পুনর্বাসিত দরিদ্র শ্রমজীবী বাঙালীসহ সমতলের বাঙালী শ্রমিক-কৃষকের সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বাঙালী নিপীড়ক আমলা-মুৎসুদ্দি-বুর্জোয়া শ্রেণীর আস্তানায় আঘাত হানা যাবে না।  বরং তা বেশি বেশি জাতিগত সংকীর্ণতায় গিয়ে জাতিতে জাতিতে হিংস্রতার প্রকাশ ঘটাবে।  উপর থেকে শাসক বুর্জোয়া শ্রেণী (বাঙালী ও পাহাড়ী উভয় অংশের) তার সালিসদারী করে নিজেদের ফায়দা লুটবে, নিজেদের সুবিধামত ক্ষমতা-সম্পদ ভাগাভাগি করবে। যা পাহাড়ী জনগণের আজকের মরণপণ সংগ্রামের লক্ষ্য হতে পারে না কোনক্রমেই।

সূত্রঃ পাহাড় ও সমতলে আদিবাসী জাতিসত্ত্বার সংগ্রাম সম্পর্কে নিবন্ধ সংকলন, আন্দোলন প্রকাশনা


ঝিনাইদহে ‘পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টি’র সদস্য গ্রেপ্তার

 সূত্রঃ http://bangla.bdnews24.com/samagrabangladesh/article1163594.bdnews