ছত্তিসগড়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে সংঘর্ষে নারী নকশাল নিহত

নিহত নকশাল নারী 'মাদকাম হিদ্মে'

নিহত নকশাল নারী ‘মাদকাম হিদ্মে’

ছত্তিসগড়ের সুকুমা জেলা পুলিশ বলছে, গতকাল কোন্তা থানার গোর্খা গ্রামের পার্শ্ববর্তী জঙ্গলে স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (এসটিএফ) এবং জেলা রিজার্ভ গ্রুপ (DRG) এর একটি যৌথ দলের সাথে নকশালদের সংঘর্ষে একজন নারী নকশাল নিহত হয়েছে।  ঘটনাস্থল থেকে একটি বন্দুক উদ্ধার করা হয়।

নিরাপত্তা বাহিনী নকশাল বিরোধী অভিযানে গেলে নকশালদের সাথে সংঘর্ষের একপর্যায়ে নকশালরা সরে পড়লে ওই নকশাল নারীর মৃতদেহ ও একটি বন্দুক পাওয়া যায়।

নিহত নকশাল নারীকে ‘মাদকাম হিদ্মে’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।   তিনি কিস্তারাম এলাকা ৮ নং প্লাটুন সদস্য।

শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত, ওই অঞ্চলে অপারেশন চলছিল বলে পুলিশের এসপি ইন্দিরা কল্যাণ এলেসেলা পিটিআইকে জানায়।

সূত্রঃ http://eprahaar.in/woman-naxal-killed-in-face-off-with-security-forces-in-cgarh/

 

Advertisements

মাওবাদী নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের গোয়েন্দাদের গালগল্প ফাঁস, প্রমাদ গুনছে পুলিশ

মাওবাদী নেতা বিকাশ (বাঁদিকে), তারা (ডানদিকে)

মাওবাদী নেতা বিকাশ (বাঁদিকে), তারা (ডানদিকে)

কাঁধে তাদের একে ফর্টি সেভেন।  জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াচ্ছে।  চেষ্টা করছে সংগঠনকে ঢেলে সাজার।

এমনটাই বলা হচ্ছিল গোয়েন্দা-রিপোর্টে।  এক-আধ বার নয়, অসংখ্য বার।  এবং চার বছর ধরে।  অথচ যাদের সম্পর্কে রিপোর্ট, বাস্তবে সেই দম্পতি তখন জঙ্গলের বহু দূরে।  এক মফস্সল শহরে স্বামী অসুস্থ, স্ত্রী দিনমজুরি করছেন। জঙ্গিপনার সঙ্গে সংস্রবই নেই!

‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ মাওবাদী দম্পতি বিকাশ-তারার গতিবিধি সংক্রান্ত ‘ইনটেলিজেন্স ইনপুটে’ এ ভাবেই গরুকে শুধু গাছে চড়ানো নয়, একেবারে আকাশে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। এপ্রিলের গোড়ায় দু’জনে গ্রেফতার হওয়ার পরে তাদের জবানবন্দি যাচাই করে ব্যাপারটা টের পেয়ে রাজ্য পুলিশের শীর্ষ কর্তাদের চোখ কপালে।  তাঁরা মেনে নিচ্ছেন, এতে গোটা রাজ্য তথা দেশের অন্যত্র নিরাপত্তা যথেষ্ট ঝুঁকির মুখে পড়তে পারত।

পুলিশকর্তারা বলছেন, মাওবাদী রাজ্য কমিটির সদস্য বিকাশই লালগড় আন্দোলন পর্বে গণ মিলিশিয়া গঠনে প্রধান ভূমিকা নিয়েছিল।  অথচ চার-চারটে বছর ধরে তার সম্পর্কে পরের পর অবাস্তব তথ্য পেশ করে গিয়েছে গোয়েন্দা-বিভাগ।  ঘটনাচক্রে বিকাশ তখন অসুস্থ হয়ে পড়েছিল।  নচেৎ যে কোনও কিছু ঘটাতে পারত।  ‘‘ভাগ্যিস তদ্দিনে ওরা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে।  বিকাশ-তারা তখন রাজ্যের অন্যত্র বা ভিন রাজ্যে নাশকতা করলে তো মুখ লুকোনোর জায়গা থাকত না!’’— মন্তব্য এক পুলিশকর্তার।

এমতাবস্থায় ওঁদের ধারণা, হয় বিকাশ-তারার গতিবিধি সম্পর্কে গোয়েন্দাদের কাছে ভুল তথ্য ছিল, কিংবা বিন্দুবিসর্গ জানা ছিল না।  আর সেই ব্যর্থতাকে ঢাকা দিয়ে ‘সোর্স মানি’ তোলার তাগিদে মনগড়া ‘ইনপুট’ সযত্নে পরিবেশন করা হয়েছে।  প্রসঙ্গত, সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা-তথ্যের সিংহভাগ আইবি’র জোগানো।  মাওবাদী দমনে নিয়োজিত বিশেষ বাহিনী ‘সিআইএফ’ সূত্রের দাবি: চার বছরে বিকাশ-তারা সম্পর্কে অন্তত পঞ্চাশটি ‘ইনপুট’ আইবি দিয়েছে।  সিআইএফ একাধিক বার জানিয়েছিল, সেগুলোর সঙ্গে তাদের খবর মিলছে না।  কিন্তু আইবি পাত্তা দেয়নি।

আজ, সোমবার মুখ্যমন্ত্রিত্বের দ্বিতীয় ইনিংসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জেলা সফর শুরু করছেন জঙ্গলমহল দিয়ে।  তবু সেখানে গোয়েন্দা-তথ্য সংগ্রহে ব্যর্থতার অভিযোগটি ঘিরে হুলস্থুল পড়েছে। অভ্যন্তরীণ তদন্তে নেমেছেন আইবি-কর্তৃপক্ষ, রাজ্য পুলিশের তদানীন্তন ডিজি জিএমপি রেড্ডির নির্দেশে। রেড্ডি ৩১ মে অবসর নিয়েছেন।  রবিবার যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘‘বাহিনীর ঘরোয়া বিষয়। মন্তব্য করব না।’’ আইবি’র এক শীর্ষ কর্তার অবশ্য ব্যাখ্যা, ‘‘অল্প কিছু তথ্যে ভুল হয়েছিল।  সোর্সরা বিকাশ-তারার স্কোয়াডের লোকজনকে দেখে ধরে নিয়েছিল, ওরাও ওখানে আছে।’’

কর্তা যা-ই বলুন, পুলিশের অন্দরমহলের ইঙ্গিত, কিছু ক্ষেত্রে বাস্তবে সোর্সের অস্তিত্ব নেই।  কোথাও আবার সোর্স-ই ভুলভাল তথ্য দিয়েছে।  কী রকম?

সিআইএফ-সূত্রের খবর: গত ২ এপ্রিল লালবাজারের এসটিএফের হাতে ধরা পড়ে বিকাশ-তারা। জেরায় জানা যায়, ২০১১-র শেষাশেষি, কিষেণজি নিহত হওয়ার আগেই অসুস্থতার কারণে বিকাশ বসে গিয়েছিল।  স্ত্রীও সংগঠন থেকে সরে আসে।  অথচ ২০১১-র শেষ থেকে ২০১৫-র মাঝামাঝি— প্রায় চার বছরে মূলত আইবি’র ‘ইনটেলিজেন্স ইনপুটে’ অজস্র বার বলা হয়েছে, ওই দম্পতি জঙ্গলমহলে ঘুরে বেড়াচ্ছে একে ফর্টি সেভেন, ইনস্যাসে সজ্জিত হয়ে।  কখনও তাদের দেখা গিয়েছে বেলপাহাড়িতে, কখনও সারেঙ্গায়, কখনও বা লালগড়ে।  কোথাও সঙ্গে সাত-আট জন, কোথাও দশ-বারো জনের মাওবাদী স্কোয়াড!

‘‘কিন্তু ওরা ধরা পড়তেই সব ফাঁস হয়ে গিয়েছে।’’— বলছেন এক পুলিশকর্তা।  জানা গিয়েছে, ২০১২-য় বিকাশের শিরদাঁড়ায় বড় অস্ত্রোপচার হয় চন্দননগরের এক নার্সিংহোমে।  সেই ইস্তক তার ভারী জিনিস তোলা, নিচু হওয়া বারণ। কোমরে বেল্ট পরে থাকতে হয়।  অপারেশনের পরে বিকাশ যখন শয্যাশায়ী, স্ত্রী শুশ্রূষায় ব্যস্ত, তখনও জঙ্গলমহলে তাদের ‘সশস্ত্র’ গতিবিধির খবর দিয়েছেন গোয়েন্দারা! এক অফিসারের কথায়, ‘‘এ অনেকটা ভূতের মতো।  ধরে আনতে লাগে না।  শুধু অমুক গাছের তলায় দেখেছি বললেই গায়ে কাঁটা দেয়।’’

ঠিক এই কায়দাতেই জঙ্গলমহলের বিভিন্ন জায়গায় বিকাশ-তারার কাল্পনিক অবস্থান দেখিয়ে টাকা লোটা হয়েছে বলে পুলিশকর্তাদের একাংশের অভিযোগ।  এখন খতিয়ে দেখা হচ্ছে, কোন গোয়েন্দার কোন চর (সোর্স) তথ্যগুলি দিয়েছে। ইচ্ছে করে দিয়েছে, নাকি ভুলবশত।  সর্বোপরি সেই সব সোর্স আদৌ আছে, নাকি স্রেফ কাগজে-কলমে তাদের অস্তিত্ব দেখিয়ে ‘সোর্স মানি’ বাবদ মাসে মাসে টাকা তুলে নেওয়া হচ্ছে।  এ হেন প্রবণতা চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে বড় বিপর্যয় ঘনাবে বলে আশঙ্কাও প্রকাশ করছে রাজ্যে পুলিশের শীর্ষ মহল।

এই প্রেক্ষাপটে সিআইএফের তদানীন্তন ডিজি সিভি মুরলীধর গত মাসে ডিজি’কে চিঠি দিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি জানতে চান, ইনপুটের নমুনা এমন হলে গোয়েন্দা শাখা রাখার অর্থ কী? ‘‘যাঁরা ইনপুট দিয়েছেন, দায় তাঁদেরই বইতে হবে।’’— সাফ লিখেছিলেন সিআইএফ প্রধান। এর ভিত্তিতে আইবি’র তৎকালীন ডিজি রাজ কানোজিয়াকে চিঠি দেন তদানীন্তন ডিজি রেড্ডি। বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুতর হিসেবে অভিহিত করে ডিজি লেখেন, দীর্ঘ দিন ধরে দেওয়া ভুল তথ্যগুলো গোয়েন্দাদের বিশ্বাসযোগ্যতাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

সূত্রঃ http://www.anandabazar.com/state/detective-department-have-the-wrong-information-about-maoists-says-police-1.409766#


নেপালঃ Ncell এর মোবাইল টাওয়ারে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ২ মাওবাদী নেতা আটক

13062016015514110620160745131-1000x0-1000x0

অনূদিতঃ

গতকাল সকালে নেপালের ম্যাগদি জেলার বেনি পৌরসভায় Ncell মোবাইল টাওয়ারে অগ্নিসংযোগের হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগে জেলার দুই মাওবাদী নেতাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

নেত্র বিক্রম চাঁদ নেতৃত্বাধীন সিপিএন মাওবাদী দলের সঙ্গে যুক্ত লালু কিষাণ ওরফে আকাশ এবং পাদাম পুন ওরফে ফিল্টারকে এ সময় জেলা সদর থেকে গ্রেফতার করা হয়।

এর আগে, বেনি পৌরসভা -4 এর বাঞ্ছারেদিল এ দেশের বেসরকারি খাতের শীর্ষ টেলিযোগাযোগ কোম্পানীর টাওয়ারে অগ্নিসংযোগ করা হয়।  পুলিশ দাবি করেছে যে, চাঁদ নেতৃত্বাধীন দল শনিবার সন্ধ্যায় অগ্নিসংযোগের এই হামলা চালিয়েছে।  ঘটনায়, একটি জেনারেটর ধংস হয়ে যায়।  এর আগে, আরেক মাওবাদী নেতা গোপাল শর্মাকে রোববার মামলার তদন্ত জন্য আটক করা হয়।

সূত্রঃ http://thehimalayantimes.com/nepal/2-maoist-leaders-held-ncell-tower-arson-myagdi/


তুর্কি সেনাদের বিরুদ্ধে ল্যান্ড মাইন হামলায় দায়দায়িত্ব স্বীকার করেছে বিপ্লবী HBDH

HBDH

HBDH

গত ১১ই জুন তুরস্কের হাতায় এর ইস্কেন্দেরুনে বিপ্লবীদের যৌথ সংগঠন HBDH এর গেরিলা সদস্যদের পুঁতে রাখা ল্যান্ড মাইন বিস্ফোরণে ফ্যাসিস্ট সশস্ত্র বাহিনীর একজন অফিসার গুরুতর জখম হয়।   


ওসমানীয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে সিপিআই(মাওবাদী)’র সামরিক সদস্য ‘কমরেড বিবেক’ এর স্মরণসভা

গত বছর তেলেঙ্গানা পুলিশ কর্তৃক নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা সিপিআই(মাওবাদী)-র সামরিক সদস্য ‘বিবেক কোদামাগুন্ডিয়া’ এর স্মরণ সভার ছবি

13413744_639599892859234_6513880626459038253_n

13417453_639599399525950_783785150662289655_n

13417491_639599412859282_6646415415009014526_n

13432242_639599192859304_2641096686428168326_n

13445566_639599402859283_3774618042827702796_n

13450256_639599762859247_4838930662497435601_n


হাসিনা সরকারের ‘নয়া’ শিক্ষানীতিঃ নতুন বোতলে পুরনো মদ

শিক্ষা

হাসিনা সরকারের ‘নয়া’ শিক্ষানীতিঃ নতুন বোতলে পুরনো মদ

(নভেম্বর, ২০০৯)

উদারনৈতিক বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীদের দৌড় যে কতদূর হতে পারে সেটা হাসিনা সরকারের গঠিত শিক্ষা কমিটির প্রস্তাবিত শিক্ষানীতিটি পর্যালোচনা করলেই বোঝা যাবে।  অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত এই শিক্ষা কমিটিতে ছিলেন অধ্যাপক জাফর ইকবাল, অর্থনীতিবিদ খলিকুজ্জামানসহ বেশ কিছু নামকরা বুদ্ধিজীবী।  সন্দেহ নেই তারা হাসিনা-আওয়ামী লীগের প্রতি অনুগত।  নতুবা তাদেরকে আওয়ামী লীগের মত একটি সংকীর্ণ দলবাজ পার্টি এই কমিটিতে গ্রহণ করতো না।  তথাপি এই বুদ্ধিজীবীদের কারও কারও কিছুটা উদারনৈতিক পরিচয় সমাজে রয়েছে; এমনকি কেউ কেউ কিছুটা বাম বলেও পরিচিত।  কিন্তু সারমর্মে তারা যে চিন্তা-চেতনায় বুর্জোয়া চরিত্রেরই অধিকারী, যা আমাদের মত দেশে মূলত প্রতিক্রিয়াশীল চরিত্র ধারণ করে রয়েছে সেটা আবারও প্রমাণিত হলো।  শিক্ষা নীতির নামে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর কম দলিল পেশ করা হয়নি।  বিশেষত আওয়ামী লীগের সরকারগুলো এক একটি শিক্ষা নীতির প্রস্তাব করেছে এবং তাকে মহা প্রগতিশীল বলে হৈ-হট্টগোল করে বাজার মাত করতে চেয়েছে।  এবারও তার অন্যথা হচ্ছে না। কমিটি যে শিক্ষা নীতিটি শিক্ষা মন্ত্রীর কাছে প্রস্তাব করেছিল সেটি শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে ‘চূড়ান্ত খসড়া’ আকারে সেপ্টেম্বর,’০৯-এ পেশ করেছে।  একটু প্রগতিশীল গণমুখী ও গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে প্রস্তাবটি পড়লে বোঝা কষ্টকর নয় যে, এটি শিক্ষা ক্ষেত্রে বিদ্যমান মৌলিক প্রতিক্রিয়াশীল ব্যবস্থাটি অব্যাহত রেখে এর কিছু কাঠামোগত সংস্কারের প্রস্তাব মাত্র।  যেহেতু বর্তমান পরিসরে প্রস্তাবিত শিক্ষানীতিটির উপর বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ নেই, তাই, মৌলিক প্রশ্নগুলোকে শুধু আমরা এখানে কিছুটা আলোচনা করবো।
এদেশের প্রগতিশীল ছাত্র-শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবী সমাজ এবং প্রগতিশীল রাজনৈতিক শক্তিসমূহ সেই পাকিস্তান আমল থেকে একটি গণমুখী প্রগতিশীল শিক্ষানীতির জন্য সংগ্রাম করে আসছেন।  এর মৌলিক কিছু বৈশিষ্ট্য হলো বৈষম্যহীনতা, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণমুখিনতা, সাম্রাজ্যবাদবিরোধিতা প্রভৃতি।  কারণ, এসবের অনুপস্থিতি এবং বিপরীত নীতির ভিত্তিতে শিক্ষা ব্যবস্থাটি পরিচালিত হচ্ছে বলেই সকল প্রগতিশীল শক্তি একে প্রতিক্রিয়াশীল বলে চিহ্নিত করে থাকেন এবং এ কারণেই এর পরিবর্তনের প্রশ্নটি উঠেছে।
* প্রথমত প্রস্তাবিত শিক্ষানীতির রাজনৈতিক ভিত্তিটা কী? আপাত দৃষ্টিতে দেখা যাচ্ছে তার স্পষ্ট কোন রাজনীতি নেই। তবে বিমূর্তভাবে দেশপ্রেম, প্রগতি, স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ, অসাম্প্রদায়িকতা- এসব কিছু কথাবার্তা এতে রয়েছে।  এর অর্থ হলো, শাসক শ্রেণীর নিজেদের মধ্যে এসব প্রশ্নে পলিসিগত যে ঝগড়াঝাটি রয়েছে সে সবকে এড়িয়ে তারা একটা নিরপেক্ষ ভাব দেখাতে চাচ্ছে।  কিন্তু মূলত শাসক প্রতিক্রিয়াশীল বুর্জোয়া শ্রেণীর রাজনীতি ও দৃষ্টিভঙ্গিকে, বিশেষত আওয়ামী ধারার রাজনীতিকে, প্রস্তাবিত শিক্ষানীতিটির নেতৃত্বকারী আদর্শ হিসেবে চালাতে চাচ্ছে।  তাই, এটা বলাই বাহুল্য যে, এখন বিশেষত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাক্রমকে আওয়ামী রাজনীতির চেতনা থেকে ইতিহাসের বিকৃত ও মিথ্যা ব্যাখ্যা, আওয়ামী প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির আলোচনা দিয়ে ভর্তি করা হবে।
স্বভাবতই এই শিক্ষানীতিতে আমরা সাম্রাজ্যবাদ, সম্প্রসারণবাদ, পুঁজিবাদ- এসবের কোন দৃঢ় বিরোধিতা দূরের কথা, কোন আলোচনাই দেখছি না।  তারা একদিকে বলছেন সংবিধানকে তারা উর্ধে তুলে ধরছেন, অন্যদিকে তারা কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের কথা বলছেন।  কল্যাণমুখী রাষ্ট্র বুর্জোয়া রাষ্ট্রের একটি সংস্করণেরই নাম। অথচ সংবিধানের ’৭২-সাল সংস্করণে মানুষকে ধোঁকা দেবার জন্য হলেও সমাজতন্ত্রের কথা ছিল।  আর বর্তমান এরশাদীয় সংবিধানে রয়েছে রাষ্ট্রধর্ম ইসলামের কথা।  এই অধ্যাপকবৃন্দ কোন সংবিধানের কথা বলছেন? জামাতসহ ধর্মীয় দলগুলো-তো যথার্থই বলছে যে, প্রস্তাবিত শিক্ষানীতিটি রাষ্ট্রধর্ম ইসলামের সংবিধান লংঘন করেছে, কারণ, তারা প্রাথমিক স্তরের (৮ম শ্রেণী পর্যন্ত) পরে ধর্ম শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক আর রাখেনি, যাকিনা আগে ১০-ম শ্রেণী পর্যন্ত ছিল। ফলে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম যতদিন রয়েছে, ততদিন ধর্মশিক্ষাকে মাধ্যমিক স্তরে বাধ্যতামূলক মান থেকে উঠিয়ে দেয়াটা বর্তমান সংবিধানের সাথে অসামঞ্জস্যই বটে।
বাস্তবে বর্তমান সংবিধানটি অসাম্প্রদায়িক নয়, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী-তো নয়ই। তাই, সংবিধানের প্রতি অনুগত থেকে কীভাবে কোন দেশপ্রেমিক, গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল শিক্ষানীতি তৈরি করা সম্ভব?
* সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা না থাকলে তার দালাল বড় বুর্জোয়া শ্রেণী, যারা চরম প্রতিক্রিয়াশীল, এবং এদেশের জাতি ও জনগণের আসল শত্রু, যারা বিগত প্রায় চল্লিশ বছর ধরে এদেশের শাসন ক্ষমতায় আসীন থেকে জনগণের চরম দুর্গতির কারণ হয়ে রয়েছে, তাদেরও বিরোধিতা সম্ভব নয়।  স্বভাবতই সমাজের চরম অন্যায় শ্রেণী বৈষম্যকে তারা রেখে দিতে বাধ্য।  ফলে তা থেকে উদ্ভূত বিদ্যমান প্রতিক্রিয়াশীল শিক্ষানীতির বৈষম্যনীতি সবই তারা বজায় রেখেছেন।  তিন ধারার শিক্ষা, যথা- সাধারণ, মাদ্রাসা ও ইংরাজী মাধ্যম- সবই পূর্বের মতই রয়ে গেছে। তারা এদেশীয় শিক্ষায় সাম্রাজ্যবাদের অনুপ্রবেশ হিসেবে বজায় থাকা উচ্চ শ্রেণীর ও-লেবেল, এ-লেবেল বজায় রেখেছেন।  তারা সরকারী বেসরকারী ব্যবস্থার বৈষম্যকে বজায় রেখেছে। বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল- যা উচ্চশিক্ষায় চরম শ্রেণী বৈষম্যের একটি প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত তাকে বজায় রেখেছেন। অর্থাৎ, বৈষম্যের সবই থাকছে আগের মত।  একটি প্রগতিশীল শিক্ষানীতির প্রথম প্রদক্ষেপটিই হতে হবে বিভিন্ন ধারার শিক্ষা বাতিল করা এবং সর্বত্র এক ধারার শিক্ষা চালু করা। শিক্ষাকে অবিলম্বে জাতীয়করণ করা। এটা ব্যতীত সমাজের বৈষম্য শুধু বজায় থাকবে তা নয়, শিক্ষা ব্যবস্থাটি নিজেই তাকে আরো বাড়িয়ে তুলবে।  প্রস্তাবিত শিক্ষানীতিটি তাকেই নতুন করে অনুমোদন করেছে।
* তারা একদিকে অসাম্প্রদায়িক শিক্ষা নীতির কথা বলছে, অন্যদিকে মাদ্রাসা শিক্ষাকে অব্যাহত রাখছে।  শুধু তাই নয়, তারা সাধারণ শিক্ষার মধ্যেও পূর্বকার ধর্মীয় শিক্ষাকে রেখে দিয়েছে। শুধুমাত্র নবম ও দশম শ্রেণীতে একে বাধ্যতামূলকের বদলে ঐচ্ছিক করাটা কোনক্রমেই কোন উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নয়।  এটা এক দিকে প্রগতিশীল মানুষকে প্রতারণা করছে, অন্যদিকে ধর্মীয় মৌলবাদী ও ধর্ম-ব্যবসায়ীদের উস্কে দিচ্ছে।  প্রগতিশীল ও প্রকৃত গণতান্ত্রিক একটি সমাজে রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে অবশ্যই পৃথক করতে হবে।  শিক্ষা হলো যার প্রধানতম ক্ষেত্র। ধর্মশিক্ষা ব্যক্তিগত এখতিয়ারেই শুধু থাকতে পারে। তা না হলে ধর্মনিরপেক্ষ ও অসাম্প্রদায়িক কোন নীতি হতে পারে না।  আওয়ামী লীগ ধর্মনিরপেক্ষ বলতে চারটি প্রধান ধর্মের সহ-অবস্থানমূলক সাম্প্রদায়িক নীতিকে বোঝাতে চায় যা একটি ভণ্ডামি ব্যতীত আর কিছু নয়।  তাই, দেখা যাচ্ছে, আওয়ামী লীগ বিএনপি-জামাতের চেয়ে কোন অংশেই প্রগতিশীল নয়, অসাম্প্রদায়িক নয়; শুধু ধর্ম শিক্ষায় তারা দুই ক্লাশ পিছিয়ে।
* আওয়ামী লীগ অসাম্প্রদায়িকতার পাশাপাশি বাংলাভাষা প্রেমের গলাবাজী করেও বহু লোককে বিভ্রান্ত করছে।  এই শিক্ষানীতিতে সর্বস্তরে শিক্ষার মাধ্যমকে বাংলা করা হয়নি।  বরং যারা চায় তারা ইংরেজী মাধ্যমও রাখতে পারবে বলে বাংলা-বিরোধী ব্যবস্থাটিকেও খুশি রেখেছে।  ইংরেজি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জন্য, জ্ঞান-বিজ্ঞানের বৃহৎ জগতে প্রবেশের জন্য ইংরেজী শেখার গুরুত্ব রয়েছে।  কিন্তু’ সেটা প্রথম শ্রেণী থেকে বাধ্যতামূলক করা কেন? প্রথম শ্রেণীতে শিশুরা যখন মাত্র বাংলা ভাষা ও অংক শেখার নতুন এক জগতে প্রবেশ করে তখনই বিদেশী একটি ভাষা চাপিয়ে দেবার কী লক্ষ্য থাকতে পারে? ৫ম শ্রেণী পর্যন্ত আসতেই শতকরা ৫০ ভাগ শিশু পড়ালেখা ছেড়ে দেয়।  বাকি ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝ থেকেও শতকরা ৪০ জন মাধ্যমিক (১০ম শ্রেণী) পর্যন্ত আসতেই পড়ালেখা ছেড়ে দেয়। প্রাথমিক পর্যন্ত লেখাপড়া জানা শিক্ষার্থী কৃষক, শ্রমিক, শ্রমজীবী জীবনে থাকতেই বাধ্য হচ্ছে।  তাদের ইংরেজী জানা কেন জরুরী হবে? পৃথিবীর যতগুলো জাতি আজ উন্নত বলে বিবেচিত তারা (ইংরেজীভাষীরা বাদে) কেউ ইংরেজী শিখিয়ে জাতিকে উন্নত করেনি, বরং তারা ইংরেজী না শিখেই উন্নত। খোদ ইংল্যান্ড আমেরিকায় প্রথম শ্রেণীতেই এমন একটি বিদেশী ভাষা শিশুদের উপর চাপিয়ে দেবার দৃষ্টান্ত রয়েছে কি? প্রশ্নটা হচ্ছে ইংরেজীসহ বিদেশী ভাষা শেখার গুরুত্বটা কীভাবে দিতে হবে।  ইংরেজী শিক্ষাটা সম্পূর্ণভাবেই বিশেষ শিক্ষার বিষয়।  উচ্চতর শিক্ষায় যারা যাবে তাদের একাংশের ইংরেজী প্রয়োজন হবে, যা বিশেষ শিক্ষা হিসেবেই তারা শিখবে।  শুধু ইংরেজীই নয়, দক্ষিণ এশীয় অঞ্চল ও বিশ্বের অন্যান্য জায়গায় ঐতিহাসিক বিশেষ যোগাযোগের জন্য হিন্দী, উর্দু, ফার্সি, এবং আরবী ভাষা শিক্ষাটা খুবই জরুরী। আজকের বিশ্বে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও বাণিজ্যকে মাথায় রাখলে ইংরেজীর সাথে চীনা, জার্মানী, ফ্রেঞ্চ, স্প্যানিশ- এসব ভাষা শিক্ষারও বিশেষ গুরুত্ব থাকবে।  নতুন শিক্ষানীতি মনে করছে এবং জাতিকে মনে করাচ্ছে যে, প্রতিটি শিশুর ইংরেজী শেখা যেন উন্নয়নের এক পূর্বশর্ত। এটা সাম্রাজ্যবাদের দালালীর নির্জলা একটি ঔপনিবেশিক নীতি ও মানসিকতার প্রকাশ ছাড়া আর কিছু নয়।
* অথচ সেই গুরুত্বে সাধারণ বিজ্ঞান শেখার গুরুত্বটা দেয়া হয়নি।
বিজ্ঞান শেখা দরকার বিজ্ঞানসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি বিকাশের জন্যও।  তাই, এটা থাকা উচিত প্রথম শ্রেণী থেকেই।  অথচ বিজ্ঞান তারা শুরু করছে ৬ষ্ঠ শ্রেণী থেকে।  বরং বিজ্ঞানের বদলে তারা তথ্য প্রযুক্তিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
তথ্য প্রযুক্তিকে কেন তারা এভাবে প্রথম শ্রেণী থেকেই প্রায় চাপিয়ে দিচ্ছে? কম্পিউটার নিশ্চয়ই প্রয়োজন, যেমন কিনা সকল আধুনিক প্রযুক্তিই শিখতে হবে একটি আধুনিক সমাজ গড়ার জন্য।  কিন্তু কম্পিউটার একটি বিশেষ জ্ঞান, যা বিশেষ শিক্ষার মধ্যে পড়ে।  সমস্ত জাতিকে কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ বানানোর বুদ্ধিটা মোটেই কোন বিজ্ঞানসম্মত চিন্তা নয়। সাধারণ ব্যবহারের জন্য যে কম্পিউটার জ্ঞান দরকার সেটা খুব সাধারণ ট্রেনিং সেন্টারের মাধ্যমেই সাধারণ শিক্ষিত জনগোষ্ঠীকে খুব অল্প সময়েই শেখানো সম্ভব।  শুধু তাই নয়, বাধ্যতামূলক কম্পিউটার শেখার এই প্রস্তাবনা শিক্ষার বৈষম্যকে গুরুতরভাবে বাড়িয়ে দেবে। গ্রামাঞ্চলে প্রতিটি স্কুলে পর্যাপ্ত কম্পিউটার সরবরাহ করা এখনো একটি সুদূরপ্রসারী কল্পনা।  অথচ এখনই শহরের স্বচ্ছল ও উচ্চবিত্তদের প্রতিটি ঘরে একাধিক কম্পিউটার রয়েছে। কম্পিউটারে কাজ করতে অভ্যস্ত প্রতিটি লোকই জানেন যে, ব্যক্তিগত কম্পিউটার থাকা আর না থাকার মাঝে এ সংক্রান্ত দক্ষতা অর্জনের ক্ষেত্রে কতটা পার্থক্য হতে পারে।  কম্পিউটার শিক্ষার গুরুত্ব যেভাবে দেয়া হচ্ছে তা স্রেফ সাম্রাজ্যবাদী কম্পিউটার কোম্পানীগুলো ও সেসবের দেশীয় দালাল আমদানীকারকদের স্বার্থ সেবা ছাড়া আর কিছু নয়।
* কম্পিউটার শিক্ষার উপর এতটা গুরুত্ব যখন দেয়া হচ্ছে, যা থেকে শুধু উচ্চবিত্তদের সন্তানরাই লাভবান হবে, এবং ভাল রেজাল্ট ও উচ্চশিক্ষা আরো বেশি ক’রে তাদের করায়ত্ত হয়ে পড়বে, এবং সাম্রাজ্যবাদী কোম্পানী ও তাদের দালালদের পকেট ফুলে উঠবে, তখন কিন্তু কৃষি শিক্ষার উপর গুরুত্বটা দেয়া হয়নি বললেই চলে। অথচ বাংলাদেশ একটি কৃষি প্রধান দেশ। এখানে কৃষি শিক্ষা প্রথম থেকেই বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত নয়কি? কৃষির জন্য ও কৃষি-ভিত্তিক শিল্প-প্রযুক্তির গুরুত্ব প্রস্তাবিত শিক্ষানীতিতে নেই বললেই চলে।
* বুর্জোয়া রাষ্ট্র মুখে সমতার কথা বলে, আর বাস্তবে নিজ শ্রেণী থেকেই উচ্চশিক্ষার্থীদের চয়ন করার পদ্ধতি নিয়ে থাকে, যা এই শিক্ষানীতিও করেছে।  যারা মেধাবী তারাই শুধু উচ্চশিক্ষায় যাবে- এটা একটা শ্রেণী বৈষম্যমূলক বুর্জোয়া নীতি, যা শ্রেণী বৈষম্য আরো বাড়িয়ে তোলে মাত্র।  সাধারণভাবেই কৃষক-শ্রমিক-দরিদ্র-সাধারণ মধ্যবিত্তদের সন্তানরা বড় ধরনের প্রতিকূল অবস্থায় পড়ালেখা করে।  ফলে উচ্চবিত্ত ও শহুরে স্বচ্ছল পরিবারের সন্তানদের সাথে যখন একই মানদণ্ডে তাদের মূল্যায়ন করা হয়, তখনই একটা বড় বৈষম্য ও অন্যায় করা হয়।  প্রগতিশীল শিক্ষানীতি একে পরিবর্তন করতে বাধ্য।  সাধারণ জনগণ থেকে উঠে আসা ও গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা কীভাবে উচ্চশিক্ষা, বিশেষত কৃষি, চিকিৎসা, প্রকৌশল ইত্যাদিতে বিশেষ সুযোগ পাবে তার ব্যবস্থা থাকতেই হবে।  একইভাবে বৃত্তির ক্ষেত্রে একই নীতি দ্বারা চালিত হতে হবে।  নতুবা তা এক গুরুতর অন্যায়কে ধারণ করবে যা প্রচলিত নীতি ও মূল্যবোধ ধারণ করে রয়েছে।  প্রস্তাবিত শিক্ষানীতি একেই বজায় রেখেছে।  সুতরাং সব বিচারেই এই শিক্ষানীতি কোন দিক থেকেই নতুন কিছু নয়।  পুরনো ব্যবস্থাকেই এটা কিছু নতুন রূপ দিতে চাচ্ছে মাত্র।
* এই শিক্ষানীতিতে কাঠামোগত সংস্কারের যেসব প্রস্তাব রয়েছে সেগুলোর বিচার ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়।  বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবটি হলো- প্রাথমিককে ৫ম শ্রেণীর বদলে ৮ম শ্রেণী পর্যন্ত করা, আর এসএসসি উঠিয়ে দিয়ে মাধ্যমিককে ৯ম থেকে ১২শ্রেণী পর্যন্ত করা।  এছাড়া স্নাতককে ৪বছর করা। এসবে শিক্ষা সংকোচন বরং বাড়বে বলেই ধারণা করা যায়, যাতে কৃষক-শ্রমিকের সন্তানদের পক্ষে উপরে উঠে আসাটা আরো দুরূহ হবে।  তারা মূলত স্বল্পশিক্ষিত শ্রমিক, টেকনিশিয়ান ও কেরানী হয়েই গড়ে উঠবে।  তবে বিল্ডিং ঘর ও অন্যান্য মালামালের কন্ট্রাক্টরীতে আওয়ামী নেতাদের পকেট ভরার একটা সুযোগ এতে হবে বটে।
– প্রস্তাবনায় ইতিবাচক সংস্কারের অনেক বিমূর্ত কথাবার্তা রয়েছে যা প্রায় সব দেশে সব সরকারের সব নীতিতেই থাকে। এগুলোর অনেকগুলো কাগজেই থেকে যাবে।  কিছু কিছু কার্যকর হলেও সেগুলো বিশেষ কোন পরিবর্তন শিক্ষা-ব্যবস্থায় আনবে না। সমাজের বৈষম্য, শোষণ, অজ্ঞানতা, অশিক্ষা, মূল্যবোধ এবং বুর্জোয়া ও সাম্রাজ্যবাদীদের মুনাফা তৈরিতে তা কোন ব্যাঘাত ঘটাবে না। কারণ, শিক্ষানীতির মূল জায়গাগুলো- যে সম্বন্ধে আমরা উপরে আলোচনা করেছি, সেসব ক্ষেত্রে মৌলিক পরিবর্তন ছাড়া জনগণের স্বার্থানুসারী ও প্রগতিশীল কোন শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে না।  তাই, একটি প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী, সমাজতন্ত্রমুখীন শিক্ষানীতির জন্য সংগ্রামকে আমাদের আরো জোরালোভাবে অব্যাহত রাখতে হবে।

সূত্রঃ সংস্কৃতি বিষয়ক, আন্দোলন সিরিজ ৩, আন্দোলন প্রকাশনা


শান্তিবাহিনীর শান্তি আলোচনার প্রস্তাব বনাম পাহাড়ী জনগণের সত্যিকার মুক্তির পথ

320910_516952118336295_1550975590_n

শান্তিবাহিনীর শান্তি আলোচনার প্রস্তাব বনাম পাহাড়ী জনগণের সত্যিকার মুক্তির পথ

(সেপ্টেম্বর/’৯২)

শান্তি বাহিনীর নেতৃত্ব সম্প্রতি অস্ত্র বিরতির এক ঘোষণা দিয়েছে এবং বাংলাদেশ সরকারের সাথে আলোচনার প্রস্তাব রেখেছে। অর্থাৎ তারা আশা করছে শান্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের সংখ্যালঘু জাতিসমূহের সমস্যার সামাধান হতে পারে।
কিন্তু তারা যে বাংলাদেশ সরকারের সাথে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছে সেই পক্ষের তরফ থেকে পরিস্থিতিটা কি রকম? বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যেই ঘোষণা করেছে শান্তিবাহিনীকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা, সার্বভৌমত্ব ও অধীনতাকে মানতে হবে।  সাম্রাজ্যবাদের দালাল বাঙালী দালাল বুর্জোয়াদের এই ফ্যাসিস্ট সরকার এখনো হাজার হাজার সৈন্যকে পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের বিরুদ্ধে মোতায়েন করে রেখেছে।  পার্বত্য জনগণ অব্যাহতভাবে এই ফ্যাসিস্ট সেনাবাহিনীর হত্যা-লুণ্ঠন-ধর্ষণ-জ্বালাও-পোড়াও-উচ্ছেদ অভিযানের শিকার।  পার্বত্য ভূমিতে বাঙালীদের পুনর্বাসন এখনো বন্ধ হয়নি। এই সেদিনও লোগাং-হত্যাযজ্ঞের মতো এক বর্বর হত্যাযজ্ঞ ঘটানো হয়েছে।  রাঙামাটিতে পার্বত্য জনগণের উপর চলেছে বর্বর লুটতরাজ, নির্যাতন ও হত্যা।  বাংলাদেশের শাসক শ্রেণী ও সরকার যে বন্দুক ও বেয়নেটের নিচে পার্বত্য জনগণকে অধিকার বঞ্চিত করে রাখতে চায় তার প্রমাণ, হিল লিটারেচার ফোরাম প্রচারিত ‘রাডার’ পত্রিকা নিষিদ্ধ করা। ‘রাডার’ মাত্র দুই/তিন সংখ্যা প্রকাশ হয়েছিল এবং তাতে পার্বত্য জাতিসমূহের বিরুদ্ধে বাঙালী শাসক শ্রেণী ও তাদের ফ্যাসিস্ট সেনাবাহিনীর নিমর্মতার ক্ষুদ্র অংশ মাত্র প্রকাশ লাভ করেছিল।  কিন্তু শাসক চক্রের এতটুকুও সহ্য হয়নি।  তারা সেটাও নিষিদ্ধ করে দেয়।
এই অবস্থায় শান্তিবাহিনী নেতৃত্বের আলোচনা-প্রস্তাব পার্বত্য জনগণকে কিছু দিতে পারবে কি? ইতিহাসে এ ধরনের আত্মসমর্পণমূলক আলোচনার দৃষ্টান্ত বিরল নয়।  ১৯৭১ সালে মার্চ মাসে বাঙালী জনগণকে পাকিস্তানী শাসক চক্রের বন্দুক ও কামানের মুখে অপ্রস্তুত অবস্থায় ফেলে রেখে ক্ষমতার জন্য শেখ মুজিব ইয়াহিয়ার সাথে আলোচনায় বসেছিল। কিন্তু এর ফলেই পাক-শাসক শ্রেণীর বর্বর বাহিনী ২৫ মার্চ অপ্রস্তুত জনগণের ওপর নির্মমভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ও লক্ষ লক্ষ জনগণকে হত্যা করেছিল এবং শেখ মুজিব আত্মসমর্পণ করেছিল পাক-বাহিনীর হাতে।  সুতরাং শান্তিবাহিনীর প্রস্তাবিত আলোচনা যে পার্বত্য জনগণকে আরও নির্মম দুঃখজনক পরিণতি ছাড়া অন্য কিছু দিবে না তা স্পষ্ট।  কারণ এই আলোচনার অর্থই হচ্ছে বাংলাদেশের শাসক শ্রেণীর দাসত্বের শর্তকে মেনে নিয়ে আলোচনা।
কেন পার্বত্য চট্টগ্রামের নিপীড়িত জাতিসমূহের জনগণ সংগ্রাম করছেন? অকাতরে বুকের রক্ত ঢেলে দিচ্ছেন, সম্ভ্রম ও ইজ্জত হারাচ্ছেন? তারা সংগ্রাম করছেন সাম্রাজ্যবাদের দালাল বাঙালী বুর্জোয়া শাসক শ্রেণীর জাতীয় নিপীড়ন, পরাধীনতা, দাসত্ব, লুণ্ঠন ও বর্বরতা থেকে মুক্তি অর্জনের জন্য তথা জাতীয় মুক্তি অর্জনের জন্য। এটাই পার্বত্য জাতিসমূহের জনগণের অন্তর্নিহিত আকাংখা।  এবং এটা আজ পরিষ্কার যে, একমাত্র বৈপ্লবিক সংগ্রামের মাধ্যমে এই আকাংখার বাস্তবায়ন ঘটতে পারে।  এই সংগ্রামের পথে কোন সময় যে আলোচনা হতেই পারে না, এমন নয়।  কিন্তু সেই আলোচনা হতে পারে একমাত্র পাহাড়ী জনগণের সত্যিকার জাতীয় মুক্তি অর্জনের উদ্দেশ্যকে সফল করার জন্য। অন্য কোন উদ্দেশ্যে নয়।  এ কারণেই আজকের বাস্তবতায় আলোচনার ন্যূনতম কিছু পূর্বশর্ত হতে পারে, পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বাঙালী সেনাবাহিনী, আধা-সামরিক বাহিনীসহ সব বাহিনীর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার, সেখানে বাঙালী পুনর্বাসন সম্পূর্ণ বন্ধ, সব ধরনের নির্যাতন-হত্যাযজ্ঞ সম্পূর্ণ বন্ধ, জমির অধিগ্রহণ পরিপূর্ণ বন্ধ, ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দান ইত্যাদি। আলোচনায় বাংলাদেশের অখণ্ডতা, সার্বভৌমত্ব ও অধীনতা স্বীকার করা ইত্যাদি কোন পূর্বশর্ত চলবে না।  এসব ছাড়া যে কোন আলোচনা পাহাড়ী জনগণের জাতীয় মুক্তি অর্জনের আকাংখার বিপরীতে যেতে বাধ্য।
প্রকৃতপক্ষে শান্তিবাহিনীর অস্ত্র বিরতি ও আলোচনা সমগ্র কর্মকান্ডের সাথে যুক্ত।  শান্তিবাহিনী প্রথম থেকে তাদের সংগ্রামের জন্য পাহাড়ী জনগণের উপর নির্ভর করছে না, বরং নির্ভর করছে ভারতীয় শাসক শ্রেণীর উপর, যে শাসক শ্রেণী খোদ ভারতে নাগা, মিজো, অসমী, পাঞ্জাবী, গুর্খা, কাশ্মিরীসহ অসংখ্য জাতিসমূহকে পরাধীন করে রেখেছে এবং বর্বর হত্যাযজ্ঞ ও নিপীড়ন চালাচ্ছে।  এভাবে শান্তিবাহিনীর সংগ্রাম পাহাড়ী জনগণের সত্যিকার জাতীয় মুক্তি অর্জনের বিপরীতে ভারতীয় শাসক চক্রের চক্রান্ত ও অপতৎপরতাকে সহায়তা করছে। তারা আমেরিকাসহ সমস্ত সাম্রাজ্যবাদকে উৎখাতের সঠিক বক্তব্যও আনছে না। পাহাড়ী শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্তসহ পাহাড়ী জনগণ ও জাতিসত্তাসমূহের স্বার্থ রক্ষাকারী একটি সামগ্রিক কর্মসূচি তাদের নেই। এভাবে শান্তিবাহিনী একটি সঠিক বিপ্লবী রাজনীতিকে ধারণ করছে না। তাদের এই ভ্রান্ত রাজনীতি তাদেরকে সংগ্রাম পরিত্যাগকারী আপোষ-আলোচনার ভ্রান্ত পথে ঠেলে দিচ্ছে।
সুতরাং এই ধরনের আপোষ-আলোচনাকে অবশ্যই বিরোধিতা করতে হবে।  এবং জাতীয় মুক্তি অর্জনের লক্ষ্যে সংগ্রামের আপোষহীন পতাকাকেই ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে হবে।  এই সংগ্রাম একদিকে প্রধানভাবে যেমন জাতীয় নিপীড়ক বাঙালী দালাল বুর্জোয়া শাসক শ্রেণীর দাসত্বের শৃঙ্খলের বিরুদ্ধে চালিত হবে, তেমনি তাকে হতে হবে আমেরিকাসহ সমস্ত সাম্রাজ্যবাদ ও ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ বিরোধী। এই সংগ্রামে থাকতে হবে পাহাড়ী শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্তসহ সকল জনগণ ও পাহাড়ী সকল জাতির জাতীয় মুক্তি অর্জনের একটি যথার্থ বিপ্লবী কর্মসূচি।  এই সংগ্রামে একদিকে যেমন পাহাড়ী জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, নিজেদের শক্তির উপর নির্ভর করতে হবে, তেমনি বাঙালী শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্তের বিপ্লবী মুক্তি সংগ্রামও এতে নেতৃত্ব-প্রদানকারী বিপ্লবী শক্তি, যারা সত্যিকারভাবে পাহাড়ী জনগণের জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার তথা বিচ্ছিন্নতার অধিকারকে সমর্থন করে, তার সাথেও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। এটাই হচ্ছে পাহাড়ী জাতিসমূহের জনগণের মুক্তির সঠিক পন্থা। আজ এ পথেই এগোতে হবে।

রাডার পত্রিকা প্রকাশনা নিষিদ্ধ করার প্রতিবাদ
পাহাড়ী জনগণের উপর উগ্র বাঙালী জাতিগত নিপীড়নের বিরোধিতাকারী হিল লিটারেচার ফোরামের অনিয়মিত পত্রিকা ‘রাডার’ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে স্বৈরাচারী খালেদা সরকার। এটা বাঙালী দালাল-আমলা-মুৎসুদ্দি-বুর্জোয়া শ্রেণীর বর্তমান প্রতিভু খালেদা সরকারের পাহাড়ে হত্যা-সন্ত্রাস-জ্বালাও-পোড়াও চালিয়ে পাহাড়ী জাতিসত্তা- গুলোকে নিশ্চিহ্ন করার চক্রান্তের অংশ।  একই সাথে স্বৈরাচারী এরশাদের মতোই একই কায়দায় ‘রাডার’ পত্রিকাটির প্রকাশনা নিষিদ্ধ করে খালেদা সরকার প্রমাণ করলো- তার গণতন্ত্রের ভুয়া বেলুন ফুটো হয়ে গেছে এবং সম্পূর্ণভাবে সে এরশাদের মতোই স্বৈরাচারী।
আমরা এই স্বৈরাচারী অন্যায় ঘোষণাকে প্রতিহত করতে এগিয়ে আসতে পাহাড়ী-বাঙালী নির্বিশেষে সকল গণতান্ত্রিক ও বিপ্লবী শক্তিকে আহ্বান জানাচ্ছি।  

সূত্রঃ পাহাড় ও সমতলে আদিবাসী জাতিসত্ত্বার সংগ্রাম সম্পর্কে নিবন্ধ সংকলন, আন্দোলন প্রকাশনা