শান্তিবাহিনীর শান্তি আলোচনার প্রস্তাব বনাম পাহাড়ী জনগণের সত্যিকার মুক্তির পথ

320910_516952118336295_1550975590_n

শান্তিবাহিনীর শান্তি আলোচনার প্রস্তাব বনাম পাহাড়ী জনগণের সত্যিকার মুক্তির পথ

(সেপ্টেম্বর/’৯২)

শান্তি বাহিনীর নেতৃত্ব সম্প্রতি অস্ত্র বিরতির এক ঘোষণা দিয়েছে এবং বাংলাদেশ সরকারের সাথে আলোচনার প্রস্তাব রেখেছে। অর্থাৎ তারা আশা করছে শান্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের সংখ্যালঘু জাতিসমূহের সমস্যার সামাধান হতে পারে।
কিন্তু তারা যে বাংলাদেশ সরকারের সাথে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছে সেই পক্ষের তরফ থেকে পরিস্থিতিটা কি রকম? বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যেই ঘোষণা করেছে শান্তিবাহিনীকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা, সার্বভৌমত্ব ও অধীনতাকে মানতে হবে।  সাম্রাজ্যবাদের দালাল বাঙালী দালাল বুর্জোয়াদের এই ফ্যাসিস্ট সরকার এখনো হাজার হাজার সৈন্যকে পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের বিরুদ্ধে মোতায়েন করে রেখেছে।  পার্বত্য জনগণ অব্যাহতভাবে এই ফ্যাসিস্ট সেনাবাহিনীর হত্যা-লুণ্ঠন-ধর্ষণ-জ্বালাও-পোড়াও-উচ্ছেদ অভিযানের শিকার।  পার্বত্য ভূমিতে বাঙালীদের পুনর্বাসন এখনো বন্ধ হয়নি। এই সেদিনও লোগাং-হত্যাযজ্ঞের মতো এক বর্বর হত্যাযজ্ঞ ঘটানো হয়েছে।  রাঙামাটিতে পার্বত্য জনগণের উপর চলেছে বর্বর লুটতরাজ, নির্যাতন ও হত্যা।  বাংলাদেশের শাসক শ্রেণী ও সরকার যে বন্দুক ও বেয়নেটের নিচে পার্বত্য জনগণকে অধিকার বঞ্চিত করে রাখতে চায় তার প্রমাণ, হিল লিটারেচার ফোরাম প্রচারিত ‘রাডার’ পত্রিকা নিষিদ্ধ করা। ‘রাডার’ মাত্র দুই/তিন সংখ্যা প্রকাশ হয়েছিল এবং তাতে পার্বত্য জাতিসমূহের বিরুদ্ধে বাঙালী শাসক শ্রেণী ও তাদের ফ্যাসিস্ট সেনাবাহিনীর নিমর্মতার ক্ষুদ্র অংশ মাত্র প্রকাশ লাভ করেছিল।  কিন্তু শাসক চক্রের এতটুকুও সহ্য হয়নি।  তারা সেটাও নিষিদ্ধ করে দেয়।
এই অবস্থায় শান্তিবাহিনী নেতৃত্বের আলোচনা-প্রস্তাব পার্বত্য জনগণকে কিছু দিতে পারবে কি? ইতিহাসে এ ধরনের আত্মসমর্পণমূলক আলোচনার দৃষ্টান্ত বিরল নয়।  ১৯৭১ সালে মার্চ মাসে বাঙালী জনগণকে পাকিস্তানী শাসক চক্রের বন্দুক ও কামানের মুখে অপ্রস্তুত অবস্থায় ফেলে রেখে ক্ষমতার জন্য শেখ মুজিব ইয়াহিয়ার সাথে আলোচনায় বসেছিল। কিন্তু এর ফলেই পাক-শাসক শ্রেণীর বর্বর বাহিনী ২৫ মার্চ অপ্রস্তুত জনগণের ওপর নির্মমভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ও লক্ষ লক্ষ জনগণকে হত্যা করেছিল এবং শেখ মুজিব আত্মসমর্পণ করেছিল পাক-বাহিনীর হাতে।  সুতরাং শান্তিবাহিনীর প্রস্তাবিত আলোচনা যে পার্বত্য জনগণকে আরও নির্মম দুঃখজনক পরিণতি ছাড়া অন্য কিছু দিবে না তা স্পষ্ট।  কারণ এই আলোচনার অর্থই হচ্ছে বাংলাদেশের শাসক শ্রেণীর দাসত্বের শর্তকে মেনে নিয়ে আলোচনা।
কেন পার্বত্য চট্টগ্রামের নিপীড়িত জাতিসমূহের জনগণ সংগ্রাম করছেন? অকাতরে বুকের রক্ত ঢেলে দিচ্ছেন, সম্ভ্রম ও ইজ্জত হারাচ্ছেন? তারা সংগ্রাম করছেন সাম্রাজ্যবাদের দালাল বাঙালী বুর্জোয়া শাসক শ্রেণীর জাতীয় নিপীড়ন, পরাধীনতা, দাসত্ব, লুণ্ঠন ও বর্বরতা থেকে মুক্তি অর্জনের জন্য তথা জাতীয় মুক্তি অর্জনের জন্য। এটাই পার্বত্য জাতিসমূহের জনগণের অন্তর্নিহিত আকাংখা।  এবং এটা আজ পরিষ্কার যে, একমাত্র বৈপ্লবিক সংগ্রামের মাধ্যমে এই আকাংখার বাস্তবায়ন ঘটতে পারে।  এই সংগ্রামের পথে কোন সময় যে আলোচনা হতেই পারে না, এমন নয়।  কিন্তু সেই আলোচনা হতে পারে একমাত্র পাহাড়ী জনগণের সত্যিকার জাতীয় মুক্তি অর্জনের উদ্দেশ্যকে সফল করার জন্য। অন্য কোন উদ্দেশ্যে নয়।  এ কারণেই আজকের বাস্তবতায় আলোচনার ন্যূনতম কিছু পূর্বশর্ত হতে পারে, পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বাঙালী সেনাবাহিনী, আধা-সামরিক বাহিনীসহ সব বাহিনীর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার, সেখানে বাঙালী পুনর্বাসন সম্পূর্ণ বন্ধ, সব ধরনের নির্যাতন-হত্যাযজ্ঞ সম্পূর্ণ বন্ধ, জমির অধিগ্রহণ পরিপূর্ণ বন্ধ, ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দান ইত্যাদি। আলোচনায় বাংলাদেশের অখণ্ডতা, সার্বভৌমত্ব ও অধীনতা স্বীকার করা ইত্যাদি কোন পূর্বশর্ত চলবে না।  এসব ছাড়া যে কোন আলোচনা পাহাড়ী জনগণের জাতীয় মুক্তি অর্জনের আকাংখার বিপরীতে যেতে বাধ্য।
প্রকৃতপক্ষে শান্তিবাহিনীর অস্ত্র বিরতি ও আলোচনা সমগ্র কর্মকান্ডের সাথে যুক্ত।  শান্তিবাহিনী প্রথম থেকে তাদের সংগ্রামের জন্য পাহাড়ী জনগণের উপর নির্ভর করছে না, বরং নির্ভর করছে ভারতীয় শাসক শ্রেণীর উপর, যে শাসক শ্রেণী খোদ ভারতে নাগা, মিজো, অসমী, পাঞ্জাবী, গুর্খা, কাশ্মিরীসহ অসংখ্য জাতিসমূহকে পরাধীন করে রেখেছে এবং বর্বর হত্যাযজ্ঞ ও নিপীড়ন চালাচ্ছে।  এভাবে শান্তিবাহিনীর সংগ্রাম পাহাড়ী জনগণের সত্যিকার জাতীয় মুক্তি অর্জনের বিপরীতে ভারতীয় শাসক চক্রের চক্রান্ত ও অপতৎপরতাকে সহায়তা করছে। তারা আমেরিকাসহ সমস্ত সাম্রাজ্যবাদকে উৎখাতের সঠিক বক্তব্যও আনছে না। পাহাড়ী শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্তসহ পাহাড়ী জনগণ ও জাতিসত্তাসমূহের স্বার্থ রক্ষাকারী একটি সামগ্রিক কর্মসূচি তাদের নেই। এভাবে শান্তিবাহিনী একটি সঠিক বিপ্লবী রাজনীতিকে ধারণ করছে না। তাদের এই ভ্রান্ত রাজনীতি তাদেরকে সংগ্রাম পরিত্যাগকারী আপোষ-আলোচনার ভ্রান্ত পথে ঠেলে দিচ্ছে।
সুতরাং এই ধরনের আপোষ-আলোচনাকে অবশ্যই বিরোধিতা করতে হবে।  এবং জাতীয় মুক্তি অর্জনের লক্ষ্যে সংগ্রামের আপোষহীন পতাকাকেই ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে হবে।  এই সংগ্রাম একদিকে প্রধানভাবে যেমন জাতীয় নিপীড়ক বাঙালী দালাল বুর্জোয়া শাসক শ্রেণীর দাসত্বের শৃঙ্খলের বিরুদ্ধে চালিত হবে, তেমনি তাকে হতে হবে আমেরিকাসহ সমস্ত সাম্রাজ্যবাদ ও ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ বিরোধী। এই সংগ্রামে থাকতে হবে পাহাড়ী শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্তসহ সকল জনগণ ও পাহাড়ী সকল জাতির জাতীয় মুক্তি অর্জনের একটি যথার্থ বিপ্লবী কর্মসূচি।  এই সংগ্রামে একদিকে যেমন পাহাড়ী জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, নিজেদের শক্তির উপর নির্ভর করতে হবে, তেমনি বাঙালী শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্তের বিপ্লবী মুক্তি সংগ্রামও এতে নেতৃত্ব-প্রদানকারী বিপ্লবী শক্তি, যারা সত্যিকারভাবে পাহাড়ী জনগণের জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার তথা বিচ্ছিন্নতার অধিকারকে সমর্থন করে, তার সাথেও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। এটাই হচ্ছে পাহাড়ী জাতিসমূহের জনগণের মুক্তির সঠিক পন্থা। আজ এ পথেই এগোতে হবে।

রাডার পত্রিকা প্রকাশনা নিষিদ্ধ করার প্রতিবাদ
পাহাড়ী জনগণের উপর উগ্র বাঙালী জাতিগত নিপীড়নের বিরোধিতাকারী হিল লিটারেচার ফোরামের অনিয়মিত পত্রিকা ‘রাডার’ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে স্বৈরাচারী খালেদা সরকার। এটা বাঙালী দালাল-আমলা-মুৎসুদ্দি-বুর্জোয়া শ্রেণীর বর্তমান প্রতিভু খালেদা সরকারের পাহাড়ে হত্যা-সন্ত্রাস-জ্বালাও-পোড়াও চালিয়ে পাহাড়ী জাতিসত্তা- গুলোকে নিশ্চিহ্ন করার চক্রান্তের অংশ।  একই সাথে স্বৈরাচারী এরশাদের মতোই একই কায়দায় ‘রাডার’ পত্রিকাটির প্রকাশনা নিষিদ্ধ করে খালেদা সরকার প্রমাণ করলো- তার গণতন্ত্রের ভুয়া বেলুন ফুটো হয়ে গেছে এবং সম্পূর্ণভাবে সে এরশাদের মতোই স্বৈরাচারী।
আমরা এই স্বৈরাচারী অন্যায় ঘোষণাকে প্রতিহত করতে এগিয়ে আসতে পাহাড়ী-বাঙালী নির্বিশেষে সকল গণতান্ত্রিক ও বিপ্লবী শক্তিকে আহ্বান জানাচ্ছি।  

সূত্রঃ পাহাড় ও সমতলে আদিবাসী জাতিসত্ত্বার সংগ্রাম সম্পর্কে নিবন্ধ সংকলন, আন্দোলন প্রকাশনা

Advertisements


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s