হাসিনা সরকারের ‘নয়া’ শিক্ষানীতিঃ নতুন বোতলে পুরনো মদ

শিক্ষা

হাসিনা সরকারের ‘নয়া’ শিক্ষানীতিঃ নতুন বোতলে পুরনো মদ

(নভেম্বর, ২০০৯)

উদারনৈতিক বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীদের দৌড় যে কতদূর হতে পারে সেটা হাসিনা সরকারের গঠিত শিক্ষা কমিটির প্রস্তাবিত শিক্ষানীতিটি পর্যালোচনা করলেই বোঝা যাবে।  অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত এই শিক্ষা কমিটিতে ছিলেন অধ্যাপক জাফর ইকবাল, অর্থনীতিবিদ খলিকুজ্জামানসহ বেশ কিছু নামকরা বুদ্ধিজীবী।  সন্দেহ নেই তারা হাসিনা-আওয়ামী লীগের প্রতি অনুগত।  নতুবা তাদেরকে আওয়ামী লীগের মত একটি সংকীর্ণ দলবাজ পার্টি এই কমিটিতে গ্রহণ করতো না।  তথাপি এই বুদ্ধিজীবীদের কারও কারও কিছুটা উদারনৈতিক পরিচয় সমাজে রয়েছে; এমনকি কেউ কেউ কিছুটা বাম বলেও পরিচিত।  কিন্তু সারমর্মে তারা যে চিন্তা-চেতনায় বুর্জোয়া চরিত্রেরই অধিকারী, যা আমাদের মত দেশে মূলত প্রতিক্রিয়াশীল চরিত্র ধারণ করে রয়েছে সেটা আবারও প্রমাণিত হলো।  শিক্ষা নীতির নামে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর কম দলিল পেশ করা হয়নি।  বিশেষত আওয়ামী লীগের সরকারগুলো এক একটি শিক্ষা নীতির প্রস্তাব করেছে এবং তাকে মহা প্রগতিশীল বলে হৈ-হট্টগোল করে বাজার মাত করতে চেয়েছে।  এবারও তার অন্যথা হচ্ছে না। কমিটি যে শিক্ষা নীতিটি শিক্ষা মন্ত্রীর কাছে প্রস্তাব করেছিল সেটি শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে ‘চূড়ান্ত খসড়া’ আকারে সেপ্টেম্বর,’০৯-এ পেশ করেছে।  একটু প্রগতিশীল গণমুখী ও গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে প্রস্তাবটি পড়লে বোঝা কষ্টকর নয় যে, এটি শিক্ষা ক্ষেত্রে বিদ্যমান মৌলিক প্রতিক্রিয়াশীল ব্যবস্থাটি অব্যাহত রেখে এর কিছু কাঠামোগত সংস্কারের প্রস্তাব মাত্র।  যেহেতু বর্তমান পরিসরে প্রস্তাবিত শিক্ষানীতিটির উপর বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ নেই, তাই, মৌলিক প্রশ্নগুলোকে শুধু আমরা এখানে কিছুটা আলোচনা করবো।
এদেশের প্রগতিশীল ছাত্র-শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবী সমাজ এবং প্রগতিশীল রাজনৈতিক শক্তিসমূহ সেই পাকিস্তান আমল থেকে একটি গণমুখী প্রগতিশীল শিক্ষানীতির জন্য সংগ্রাম করে আসছেন।  এর মৌলিক কিছু বৈশিষ্ট্য হলো বৈষম্যহীনতা, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণমুখিনতা, সাম্রাজ্যবাদবিরোধিতা প্রভৃতি।  কারণ, এসবের অনুপস্থিতি এবং বিপরীত নীতির ভিত্তিতে শিক্ষা ব্যবস্থাটি পরিচালিত হচ্ছে বলেই সকল প্রগতিশীল শক্তি একে প্রতিক্রিয়াশীল বলে চিহ্নিত করে থাকেন এবং এ কারণেই এর পরিবর্তনের প্রশ্নটি উঠেছে।
* প্রথমত প্রস্তাবিত শিক্ষানীতির রাজনৈতিক ভিত্তিটা কী? আপাত দৃষ্টিতে দেখা যাচ্ছে তার স্পষ্ট কোন রাজনীতি নেই। তবে বিমূর্তভাবে দেশপ্রেম, প্রগতি, স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ, অসাম্প্রদায়িকতা- এসব কিছু কথাবার্তা এতে রয়েছে।  এর অর্থ হলো, শাসক শ্রেণীর নিজেদের মধ্যে এসব প্রশ্নে পলিসিগত যে ঝগড়াঝাটি রয়েছে সে সবকে এড়িয়ে তারা একটা নিরপেক্ষ ভাব দেখাতে চাচ্ছে।  কিন্তু মূলত শাসক প্রতিক্রিয়াশীল বুর্জোয়া শ্রেণীর রাজনীতি ও দৃষ্টিভঙ্গিকে, বিশেষত আওয়ামী ধারার রাজনীতিকে, প্রস্তাবিত শিক্ষানীতিটির নেতৃত্বকারী আদর্শ হিসেবে চালাতে চাচ্ছে।  তাই, এটা বলাই বাহুল্য যে, এখন বিশেষত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাক্রমকে আওয়ামী রাজনীতির চেতনা থেকে ইতিহাসের বিকৃত ও মিথ্যা ব্যাখ্যা, আওয়ামী প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির আলোচনা দিয়ে ভর্তি করা হবে।
স্বভাবতই এই শিক্ষানীতিতে আমরা সাম্রাজ্যবাদ, সম্প্রসারণবাদ, পুঁজিবাদ- এসবের কোন দৃঢ় বিরোধিতা দূরের কথা, কোন আলোচনাই দেখছি না।  তারা একদিকে বলছেন সংবিধানকে তারা উর্ধে তুলে ধরছেন, অন্যদিকে তারা কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের কথা বলছেন।  কল্যাণমুখী রাষ্ট্র বুর্জোয়া রাষ্ট্রের একটি সংস্করণেরই নাম। অথচ সংবিধানের ’৭২-সাল সংস্করণে মানুষকে ধোঁকা দেবার জন্য হলেও সমাজতন্ত্রের কথা ছিল।  আর বর্তমান এরশাদীয় সংবিধানে রয়েছে রাষ্ট্রধর্ম ইসলামের কথা।  এই অধ্যাপকবৃন্দ কোন সংবিধানের কথা বলছেন? জামাতসহ ধর্মীয় দলগুলো-তো যথার্থই বলছে যে, প্রস্তাবিত শিক্ষানীতিটি রাষ্ট্রধর্ম ইসলামের সংবিধান লংঘন করেছে, কারণ, তারা প্রাথমিক স্তরের (৮ম শ্রেণী পর্যন্ত) পরে ধর্ম শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক আর রাখেনি, যাকিনা আগে ১০-ম শ্রেণী পর্যন্ত ছিল। ফলে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম যতদিন রয়েছে, ততদিন ধর্মশিক্ষাকে মাধ্যমিক স্তরে বাধ্যতামূলক মান থেকে উঠিয়ে দেয়াটা বর্তমান সংবিধানের সাথে অসামঞ্জস্যই বটে।
বাস্তবে বর্তমান সংবিধানটি অসাম্প্রদায়িক নয়, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী-তো নয়ই। তাই, সংবিধানের প্রতি অনুগত থেকে কীভাবে কোন দেশপ্রেমিক, গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল শিক্ষানীতি তৈরি করা সম্ভব?
* সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা না থাকলে তার দালাল বড় বুর্জোয়া শ্রেণী, যারা চরম প্রতিক্রিয়াশীল, এবং এদেশের জাতি ও জনগণের আসল শত্রু, যারা বিগত প্রায় চল্লিশ বছর ধরে এদেশের শাসন ক্ষমতায় আসীন থেকে জনগণের চরম দুর্গতির কারণ হয়ে রয়েছে, তাদেরও বিরোধিতা সম্ভব নয়।  স্বভাবতই সমাজের চরম অন্যায় শ্রেণী বৈষম্যকে তারা রেখে দিতে বাধ্য।  ফলে তা থেকে উদ্ভূত বিদ্যমান প্রতিক্রিয়াশীল শিক্ষানীতির বৈষম্যনীতি সবই তারা বজায় রেখেছেন।  তিন ধারার শিক্ষা, যথা- সাধারণ, মাদ্রাসা ও ইংরাজী মাধ্যম- সবই পূর্বের মতই রয়ে গেছে। তারা এদেশীয় শিক্ষায় সাম্রাজ্যবাদের অনুপ্রবেশ হিসেবে বজায় থাকা উচ্চ শ্রেণীর ও-লেবেল, এ-লেবেল বজায় রেখেছেন।  তারা সরকারী বেসরকারী ব্যবস্থার বৈষম্যকে বজায় রেখেছে। বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল- যা উচ্চশিক্ষায় চরম শ্রেণী বৈষম্যের একটি প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত তাকে বজায় রেখেছেন। অর্থাৎ, বৈষম্যের সবই থাকছে আগের মত।  একটি প্রগতিশীল শিক্ষানীতির প্রথম প্রদক্ষেপটিই হতে হবে বিভিন্ন ধারার শিক্ষা বাতিল করা এবং সর্বত্র এক ধারার শিক্ষা চালু করা। শিক্ষাকে অবিলম্বে জাতীয়করণ করা। এটা ব্যতীত সমাজের বৈষম্য শুধু বজায় থাকবে তা নয়, শিক্ষা ব্যবস্থাটি নিজেই তাকে আরো বাড়িয়ে তুলবে।  প্রস্তাবিত শিক্ষানীতিটি তাকেই নতুন করে অনুমোদন করেছে।
* তারা একদিকে অসাম্প্রদায়িক শিক্ষা নীতির কথা বলছে, অন্যদিকে মাদ্রাসা শিক্ষাকে অব্যাহত রাখছে।  শুধু তাই নয়, তারা সাধারণ শিক্ষার মধ্যেও পূর্বকার ধর্মীয় শিক্ষাকে রেখে দিয়েছে। শুধুমাত্র নবম ও দশম শ্রেণীতে একে বাধ্যতামূলকের বদলে ঐচ্ছিক করাটা কোনক্রমেই কোন উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নয়।  এটা এক দিকে প্রগতিশীল মানুষকে প্রতারণা করছে, অন্যদিকে ধর্মীয় মৌলবাদী ও ধর্ম-ব্যবসায়ীদের উস্কে দিচ্ছে।  প্রগতিশীল ও প্রকৃত গণতান্ত্রিক একটি সমাজে রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে অবশ্যই পৃথক করতে হবে।  শিক্ষা হলো যার প্রধানতম ক্ষেত্র। ধর্মশিক্ষা ব্যক্তিগত এখতিয়ারেই শুধু থাকতে পারে। তা না হলে ধর্মনিরপেক্ষ ও অসাম্প্রদায়িক কোন নীতি হতে পারে না।  আওয়ামী লীগ ধর্মনিরপেক্ষ বলতে চারটি প্রধান ধর্মের সহ-অবস্থানমূলক সাম্প্রদায়িক নীতিকে বোঝাতে চায় যা একটি ভণ্ডামি ব্যতীত আর কিছু নয়।  তাই, দেখা যাচ্ছে, আওয়ামী লীগ বিএনপি-জামাতের চেয়ে কোন অংশেই প্রগতিশীল নয়, অসাম্প্রদায়িক নয়; শুধু ধর্ম শিক্ষায় তারা দুই ক্লাশ পিছিয়ে।
* আওয়ামী লীগ অসাম্প্রদায়িকতার পাশাপাশি বাংলাভাষা প্রেমের গলাবাজী করেও বহু লোককে বিভ্রান্ত করছে।  এই শিক্ষানীতিতে সর্বস্তরে শিক্ষার মাধ্যমকে বাংলা করা হয়নি।  বরং যারা চায় তারা ইংরেজী মাধ্যমও রাখতে পারবে বলে বাংলা-বিরোধী ব্যবস্থাটিকেও খুশি রেখেছে।  ইংরেজি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জন্য, জ্ঞান-বিজ্ঞানের বৃহৎ জগতে প্রবেশের জন্য ইংরেজী শেখার গুরুত্ব রয়েছে।  কিন্তু’ সেটা প্রথম শ্রেণী থেকে বাধ্যতামূলক করা কেন? প্রথম শ্রেণীতে শিশুরা যখন মাত্র বাংলা ভাষা ও অংক শেখার নতুন এক জগতে প্রবেশ করে তখনই বিদেশী একটি ভাষা চাপিয়ে দেবার কী লক্ষ্য থাকতে পারে? ৫ম শ্রেণী পর্যন্ত আসতেই শতকরা ৫০ ভাগ শিশু পড়ালেখা ছেড়ে দেয়।  বাকি ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝ থেকেও শতকরা ৪০ জন মাধ্যমিক (১০ম শ্রেণী) পর্যন্ত আসতেই পড়ালেখা ছেড়ে দেয়। প্রাথমিক পর্যন্ত লেখাপড়া জানা শিক্ষার্থী কৃষক, শ্রমিক, শ্রমজীবী জীবনে থাকতেই বাধ্য হচ্ছে।  তাদের ইংরেজী জানা কেন জরুরী হবে? পৃথিবীর যতগুলো জাতি আজ উন্নত বলে বিবেচিত তারা (ইংরেজীভাষীরা বাদে) কেউ ইংরেজী শিখিয়ে জাতিকে উন্নত করেনি, বরং তারা ইংরেজী না শিখেই উন্নত। খোদ ইংল্যান্ড আমেরিকায় প্রথম শ্রেণীতেই এমন একটি বিদেশী ভাষা শিশুদের উপর চাপিয়ে দেবার দৃষ্টান্ত রয়েছে কি? প্রশ্নটা হচ্ছে ইংরেজীসহ বিদেশী ভাষা শেখার গুরুত্বটা কীভাবে দিতে হবে।  ইংরেজী শিক্ষাটা সম্পূর্ণভাবেই বিশেষ শিক্ষার বিষয়।  উচ্চতর শিক্ষায় যারা যাবে তাদের একাংশের ইংরেজী প্রয়োজন হবে, যা বিশেষ শিক্ষা হিসেবেই তারা শিখবে।  শুধু ইংরেজীই নয়, দক্ষিণ এশীয় অঞ্চল ও বিশ্বের অন্যান্য জায়গায় ঐতিহাসিক বিশেষ যোগাযোগের জন্য হিন্দী, উর্দু, ফার্সি, এবং আরবী ভাষা শিক্ষাটা খুবই জরুরী। আজকের বিশ্বে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও বাণিজ্যকে মাথায় রাখলে ইংরেজীর সাথে চীনা, জার্মানী, ফ্রেঞ্চ, স্প্যানিশ- এসব ভাষা শিক্ষারও বিশেষ গুরুত্ব থাকবে।  নতুন শিক্ষানীতি মনে করছে এবং জাতিকে মনে করাচ্ছে যে, প্রতিটি শিশুর ইংরেজী শেখা যেন উন্নয়নের এক পূর্বশর্ত। এটা সাম্রাজ্যবাদের দালালীর নির্জলা একটি ঔপনিবেশিক নীতি ও মানসিকতার প্রকাশ ছাড়া আর কিছু নয়।
* অথচ সেই গুরুত্বে সাধারণ বিজ্ঞান শেখার গুরুত্বটা দেয়া হয়নি।
বিজ্ঞান শেখা দরকার বিজ্ঞানসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি বিকাশের জন্যও।  তাই, এটা থাকা উচিত প্রথম শ্রেণী থেকেই।  অথচ বিজ্ঞান তারা শুরু করছে ৬ষ্ঠ শ্রেণী থেকে।  বরং বিজ্ঞানের বদলে তারা তথ্য প্রযুক্তিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
তথ্য প্রযুক্তিকে কেন তারা এভাবে প্রথম শ্রেণী থেকেই প্রায় চাপিয়ে দিচ্ছে? কম্পিউটার নিশ্চয়ই প্রয়োজন, যেমন কিনা সকল আধুনিক প্রযুক্তিই শিখতে হবে একটি আধুনিক সমাজ গড়ার জন্য।  কিন্তু কম্পিউটার একটি বিশেষ জ্ঞান, যা বিশেষ শিক্ষার মধ্যে পড়ে।  সমস্ত জাতিকে কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ বানানোর বুদ্ধিটা মোটেই কোন বিজ্ঞানসম্মত চিন্তা নয়। সাধারণ ব্যবহারের জন্য যে কম্পিউটার জ্ঞান দরকার সেটা খুব সাধারণ ট্রেনিং সেন্টারের মাধ্যমেই সাধারণ শিক্ষিত জনগোষ্ঠীকে খুব অল্প সময়েই শেখানো সম্ভব।  শুধু তাই নয়, বাধ্যতামূলক কম্পিউটার শেখার এই প্রস্তাবনা শিক্ষার বৈষম্যকে গুরুতরভাবে বাড়িয়ে দেবে। গ্রামাঞ্চলে প্রতিটি স্কুলে পর্যাপ্ত কম্পিউটার সরবরাহ করা এখনো একটি সুদূরপ্রসারী কল্পনা।  অথচ এখনই শহরের স্বচ্ছল ও উচ্চবিত্তদের প্রতিটি ঘরে একাধিক কম্পিউটার রয়েছে। কম্পিউটারে কাজ করতে অভ্যস্ত প্রতিটি লোকই জানেন যে, ব্যক্তিগত কম্পিউটার থাকা আর না থাকার মাঝে এ সংক্রান্ত দক্ষতা অর্জনের ক্ষেত্রে কতটা পার্থক্য হতে পারে।  কম্পিউটার শিক্ষার গুরুত্ব যেভাবে দেয়া হচ্ছে তা স্রেফ সাম্রাজ্যবাদী কম্পিউটার কোম্পানীগুলো ও সেসবের দেশীয় দালাল আমদানীকারকদের স্বার্থ সেবা ছাড়া আর কিছু নয়।
* কম্পিউটার শিক্ষার উপর এতটা গুরুত্ব যখন দেয়া হচ্ছে, যা থেকে শুধু উচ্চবিত্তদের সন্তানরাই লাভবান হবে, এবং ভাল রেজাল্ট ও উচ্চশিক্ষা আরো বেশি ক’রে তাদের করায়ত্ত হয়ে পড়বে, এবং সাম্রাজ্যবাদী কোম্পানী ও তাদের দালালদের পকেট ফুলে উঠবে, তখন কিন্তু কৃষি শিক্ষার উপর গুরুত্বটা দেয়া হয়নি বললেই চলে। অথচ বাংলাদেশ একটি কৃষি প্রধান দেশ। এখানে কৃষি শিক্ষা প্রথম থেকেই বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত নয়কি? কৃষির জন্য ও কৃষি-ভিত্তিক শিল্প-প্রযুক্তির গুরুত্ব প্রস্তাবিত শিক্ষানীতিতে নেই বললেই চলে।
* বুর্জোয়া রাষ্ট্র মুখে সমতার কথা বলে, আর বাস্তবে নিজ শ্রেণী থেকেই উচ্চশিক্ষার্থীদের চয়ন করার পদ্ধতি নিয়ে থাকে, যা এই শিক্ষানীতিও করেছে।  যারা মেধাবী তারাই শুধু উচ্চশিক্ষায় যাবে- এটা একটা শ্রেণী বৈষম্যমূলক বুর্জোয়া নীতি, যা শ্রেণী বৈষম্য আরো বাড়িয়ে তোলে মাত্র।  সাধারণভাবেই কৃষক-শ্রমিক-দরিদ্র-সাধারণ মধ্যবিত্তদের সন্তানরা বড় ধরনের প্রতিকূল অবস্থায় পড়ালেখা করে।  ফলে উচ্চবিত্ত ও শহুরে স্বচ্ছল পরিবারের সন্তানদের সাথে যখন একই মানদণ্ডে তাদের মূল্যায়ন করা হয়, তখনই একটা বড় বৈষম্য ও অন্যায় করা হয়।  প্রগতিশীল শিক্ষানীতি একে পরিবর্তন করতে বাধ্য।  সাধারণ জনগণ থেকে উঠে আসা ও গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা কীভাবে উচ্চশিক্ষা, বিশেষত কৃষি, চিকিৎসা, প্রকৌশল ইত্যাদিতে বিশেষ সুযোগ পাবে তার ব্যবস্থা থাকতেই হবে।  একইভাবে বৃত্তির ক্ষেত্রে একই নীতি দ্বারা চালিত হতে হবে।  নতুবা তা এক গুরুতর অন্যায়কে ধারণ করবে যা প্রচলিত নীতি ও মূল্যবোধ ধারণ করে রয়েছে।  প্রস্তাবিত শিক্ষানীতি একেই বজায় রেখেছে।  সুতরাং সব বিচারেই এই শিক্ষানীতি কোন দিক থেকেই নতুন কিছু নয়।  পুরনো ব্যবস্থাকেই এটা কিছু নতুন রূপ দিতে চাচ্ছে মাত্র।
* এই শিক্ষানীতিতে কাঠামোগত সংস্কারের যেসব প্রস্তাব রয়েছে সেগুলোর বিচার ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়।  বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবটি হলো- প্রাথমিককে ৫ম শ্রেণীর বদলে ৮ম শ্রেণী পর্যন্ত করা, আর এসএসসি উঠিয়ে দিয়ে মাধ্যমিককে ৯ম থেকে ১২শ্রেণী পর্যন্ত করা।  এছাড়া স্নাতককে ৪বছর করা। এসবে শিক্ষা সংকোচন বরং বাড়বে বলেই ধারণা করা যায়, যাতে কৃষক-শ্রমিকের সন্তানদের পক্ষে উপরে উঠে আসাটা আরো দুরূহ হবে।  তারা মূলত স্বল্পশিক্ষিত শ্রমিক, টেকনিশিয়ান ও কেরানী হয়েই গড়ে উঠবে।  তবে বিল্ডিং ঘর ও অন্যান্য মালামালের কন্ট্রাক্টরীতে আওয়ামী নেতাদের পকেট ভরার একটা সুযোগ এতে হবে বটে।
– প্রস্তাবনায় ইতিবাচক সংস্কারের অনেক বিমূর্ত কথাবার্তা রয়েছে যা প্রায় সব দেশে সব সরকারের সব নীতিতেই থাকে। এগুলোর অনেকগুলো কাগজেই থেকে যাবে।  কিছু কিছু কার্যকর হলেও সেগুলো বিশেষ কোন পরিবর্তন শিক্ষা-ব্যবস্থায় আনবে না। সমাজের বৈষম্য, শোষণ, অজ্ঞানতা, অশিক্ষা, মূল্যবোধ এবং বুর্জোয়া ও সাম্রাজ্যবাদীদের মুনাফা তৈরিতে তা কোন ব্যাঘাত ঘটাবে না। কারণ, শিক্ষানীতির মূল জায়গাগুলো- যে সম্বন্ধে আমরা উপরে আলোচনা করেছি, সেসব ক্ষেত্রে মৌলিক পরিবর্তন ছাড়া জনগণের স্বার্থানুসারী ও প্রগতিশীল কোন শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে না।  তাই, একটি প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী, সমাজতন্ত্রমুখীন শিক্ষানীতির জন্য সংগ্রামকে আমাদের আরো জোরালোভাবে অব্যাহত রাখতে হবে।

সূত্রঃ সংস্কৃতি বিষয়ক, আন্দোলন সিরিজ ৩, আন্দোলন প্রকাশনা

Advertisements


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s