রাঙামাটিতে আবার জ্বালাও-পোড়াও নিশ্চিহ্নকরণ বর্বর নীতির বাস্তবায়ন চলছে

36_4

রাঙামাটিতে আবার জ্বালাও-পোড়াও নিশ্চিহ্নকরণ বর্বর নীতির বাস্তবায়ন চলছে

(জুলাই/’৯২)

পার্বত্য চট্টগ্রামের সবুজ বনভূমি কেন জ্বলছে? কেন পার্বত্য চট্টগ্রামকে ২০ বছর যাবত সেনাবাহিনীর বুটের তলায় রাখা হয়েছে? সেনাবাহিনীকে কেন হানাদারের ভূমিকায় সেখানে লেলিয়ে দেওয়া হয়েছে?
সারা পার্বত্য চট্টগ্রাম এখন একটি বধ্যভূমি।  এই বধ্যভূমির জল্লাদ কারা? যারা পার্বত্য চট্টগ্রামে গণহত্যা-জ্বালাও-পোড়াও চালিয়ে যাবার পরও সংসদের আসনে বসে ‘দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়েছে’ বলে গালগল্প মারছে এবং এই তথাকথিত ‘গণতন্ত্র’কে রক্ষার জন্য চিৎকার করছে তারা সবাই পার্বত্য চট্টগ্রামের গণহত্যার অপরাধে অপরাধী। এরা হচ্ছে খালেদার সরকার, সেনাবাহিনী ও বাঙালী আমলা-মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া শ্রেণীটি।
১০ এপ্রিল লোগাং গণহত্যা (১২ শত নিরস্ত্র পাহাড়ীকে এখানে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়) ও জ্বালাও-পোড়াও ধ্বংসযজ্ঞের মাত্র ৪০ দিনের মাথায় ২০ মে রাঙামাটিতে আবার ২ শত বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। বহু লোককে জখম করা হয়েছে, পাহাড়ী মা-বোনদের কাপড় খুলে নিয়ে বাঙালীত্ব ফলিয়ে বর্বর উল্লাস করা হয়েছে। এসব মধ্যযুগীয় বর্বরতাকে যুক্তিযুক্ত ও ন্যায়সঙ্গত দেখানোর জন্য উল্টো পাহাড়ী জনগণকেই দায়ী করে পত্রিকায় বিবৃতি দিয়ে বিচার দাবি, শান্তি প্রতিষ্ঠার দাবি করা হয়েছে।  রাঙামাটি, লোগাং-এর ফ্যাসিস্ট বর্বরতার মতো আরো কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ করা যেতে পারে। মাত্র অল্প কিছুদিন আগেই কাউখালী উপজেলার ছোটডলু পাড়ায় একইভাবে ৩৬টি বাড়ি, ১টি বৌদ্ধ মন্দির জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে, ৭ জনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। গুরুতর আহত একজন বৌদ্ধ ভিক্ষুকে সেনাবাহিনী চিকিৎসার কথা বলে নিয়ে গিয়ে নিখোঁজ করেছে।  ’৯২-এর ২৩ মে পানছড়িতে ২৩টি বাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে।  এর পূর্বে ’৮০ সালে কাউখালিতে আরো বড় ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছিল।  বাঙ্গিপাড়া, কচুখালি, বেতছড়ি, কাচখালি, শামুকিয়া, হারাঙ্গীপাড়াসহ ১৬/১৭টি গ্রামে ৪ হাজার বাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছিল।  এবং ১৫০ জনকে হত্যা করা হয়েছিল।  এই জ্বালাও-পোড়াও-এর সাথে সমানতালে চলছে গণধর্ষণ।  কিশোরী-যুবতীরা হচ্ছে ওখানে এখন হরিলুটের বস্তু। ধর্ষণের পরও রেহাই নেই তাদের। ধর্ষিত হওয়ার পর নিয়মিত সেনাক্যাম্পে হাজিরা দিতে হচ্ছে। [বিস্তারিত তথ্যের জন্য ‘রাডার’ পত্রিকা দেখুন। ]
এমন মধ্যযুগীয় বর্বতার অসংখ্য ঘটনা রয়েছে উল্লেখ করার মতো।  এক কথায় পার্বত্য চট্টগ্রামে হত্যা-ধর্ষণ জ্বালাও-পোড়াও এখন প্রতিদিনের সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে।  যে কোন অজুহাতে তা ঘটছে।  রাঙামাটির ২ শত বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়ার জন্য এই বাঙালী ফ্যাসিস্টদের একটি মাত্র অুজহাত খুঁজে পাওয়ার লক্ষ্য ছিল।

একটি ছুতোয় নিষিদ্ধ করে দেওয়া 

খালেদার সরকার একটি ষড়যন্ত্র কার্যকরী করতে গিয়ে রাঙামাটিতে এই বর্বরতা চালিয়েছে।  পত্র-পত্রিকা ও বিভিন্ন তথ্যেই ষড়যন্ত্রের বিষয়টি প্রকাশিত হয়।  পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ নামক সংগঠনটি পাহাড়ী ছাত্রদের একটি সংগঠন। এই সংগঠনটি পাহাড়ী জনগণের জাতীয় সংগ্রামের পক্ষে সংগ্রামরত।  তাদের উপর উগ্র বাঙালী জাতিগত নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংগঠনটি প্রচার-সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে।  ২০ মে রাঙামাটিতে সংগঠনটির ৩য় প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর অনুষ্ঠান ছিল। এই অনুষ্ঠানে আক্রমণের প্রক্রিয়াতেই ২ শত বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। সরকার পূর্ব থেকেই এই সংগঠনটিকে আইনগতভাবে নিষিদ্ধ করার ষড়যন্ত্র চালিয়ে আসছিল এবং এজন্য বিভিন্ন অজুহাতও খুঁজছিল। এই ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যেই ২০ মে ছাত্র পরিষদের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীকে টার্গেট করা হয়েছিল।  ২০ মে জ্বালাও-পোড়াওকারীদের দ্বারা পাহাড়ী ছাত্র পরিষদকে নিষিদ্ধ করার দাবি উত্থাপনেও এই ষড়যন্ত্রটি আরো স্পষ্ট হয়েছে।

কারা নেতৃত্ব দিয়েছে?
২০ মে রাঙামাটিতে জ্বালাও-পোড়াও ধ্বংসযজ্ঞে কারা নেতৃত্ব দিয়েছে তা আর গোপন থাকেনি। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় নাম-পরিচয়সহ প্রকাশিত হয়েছে।
সেনাবাহিনীর কর্তা ব্যক্তিরা, বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জামাত-শিবির যৌথভাবে এতে নেতৃত্বদান করেছে। এদের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে ছাত্র ইউনিয়ন (সিপিবি), ইত্তেফাক পত্রিকার স্থানীয় প্রতিনিধি, দৈনিক গিরিদর্পণের মালিকসহ স্থানীয় প্রতিক্রিয়াশীল অংশ ও রাঙামাটি প্রশাসন।  স্থানীয় বিএনপি সভাপতি নাজিম উদ্দিনের বাসাতেই ঐ বর্বরতার নীল নক্সা তৈরি হয়।  ১৭, ১৮ ও ১৯ মে তারিখে উল্লিখিত দল ও ব্যক্তি প্রতিনিধিদের যৌথ মিটিং-এ সিদ্ধান্ত হয় ছাত্র পরিষদের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর অনুষ্ঠানকে বানচাল ও আক্রমণ করার। এই আক্রমণ পরিচালনার জন্য এই দলগুলোর নেতৃত্বে তথাকথিত সর্বদলীয় ছাত্রঐক্যও গঠন করা হয়েছিল। এরাই পরে সরকারের কাছে স্মারকলিপি দিয়ে ছাত্র পরিষদকে নিষিদ্ধ করার দাবি পেশ করেছে।  আক্রমণ পরিচালনার জন্য পূর্ব থেকেই বিভিন্ন এলাকা থেকে ভাড়া করা মাস্তান-দাঙ্গাবাজদের লঞ্চ ভর্তি করে বিএনপি নেতার বাড়িতে সমাবেশিত করা হয়েছিল। সেখানে তাদের গরু জবাই করে ভূরিভোজও দেওয়া হয়েছিল।  শুধু কি তাই, জ্বালাও-পোড়াও অভিযানটি পরিচালনার জন্য মাইকের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছিল।  এবং আক্রমণের সময় ও পরে মাইকে সাম্প্রদায়িক উসকানী দিয়ে জ্বালাও-পোড়াও-এ অংশ নিতে আহ্বান করা হয়েছে- ‘বাঙালীদের যার যা আছে তাই নিয়ে আক্রমণ কর, যে তা করবে না সে পাহাড়ীদের রাজাকার হবে, ইত্যাদি।  এভাবেই সুপরিকল্পিতভাবে বিএনপি, আঃ লীগ, জামাত, সামরিক অফিসার, বাঙালী বড় ব্যবসায়ী, মহাজন ও বাঙালী শোষকদের নিয়ন্ত্রিত প্রশাসন ‘বাংলাদেশী’ বা বাঙালী জাতীয়তাবাদের নামে পাহাড়ীদের উপর জাতিগত নিপীড়নকে নিষ্ঠুর কায়দায় কার্যকর করছে।  এবং এজন্য গরিব সাধারণ বাঙালীদেরকেও বিভ্রান্ত করে সাধারণ পাহাড়ীদের বিরুদ্ধে ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করছে। যে কারণে সাধারণ গরিব বাঙালীরাও অনেক ক্ষেত্রে হত্যা-নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন।

জাতিগতভাবে সংখ্যালঘুতে পরিণত করা ও নিশ্চিহ্ন করাই চূড়ান্ত লক্ষ্য
পাকিস্তানী বড় বুর্জোয়া শ্রেণী যেমন বাঙালীদের উপর জাতিগত নিপীড়ন চালিয়েছিল, ঠিক একই কায়দায় ’৭২ সাল থেকে বাঙালী বড় বুর্জোয়া শাসক শ্রেণী ক্ষুদ্র পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর উপর জাতিগত শোষণ-নিপীড়ন চালিয়ে আসছে।  যা আজ গণহত্যা-জ্বালাও-পোড়াও-এর সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এই নিপীড়ন পরোক্ষ/অঘোষিত সামরিক শাসনরূপে চলছে। পাহাড়ীদের উচ্ছেদ করে বাঙালী পুনর্বাসনের প্রক্রিয়ায় এখন পাহাড়ীরা নিজ ভূমিতে সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়ে যাচ্ছেন।  ২০ বছর যাবত এই পুনর্বাসন প্রক্রিয়া চলছে।  আগামী ৫/১০ বছরের মধ্যে পাহাড়ী জনগণের আর জাতিগত অস্তিত্ব হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে না।  তারা জাতিগতভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারেন।  শাসক শ্রেণী বিগত ২০ বছর যাবত হত্যা করে, উচ্ছেদ করে, বিপরীতে বাঙালী পুনর্বাসন করে পাহাড়ীদের জাতিগতভাবে বিলুপ্তিকরণ করার এই প্রতিক্রিয়াশীল নীতিকেই বাস্তবায়ন করে চলছে। ইতিমধ্যেই বর্বর নীতির পরিণামে পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ীরা মোট জনসংখ্যার ৪৯% ভাগে নেমে এসেছে। কাজেই পাহাড়ী জনগণের আজকের সমস্যা হচ্ছে অস্তিত্ব রক্ষার জীবন-মরণ সমস্যা। নিশ্চয়ই তারা নিজেদের এভাবে অস্তিত্বহীন হয়ে যেতে দিবেন না।  শেষ বিন্দু রক্ত দিয়েও তা প্রতিরোধের চেষ্টা তারা করবেনই।  এজন্য পার্বত্য চট্টগ্রামে যদি চরম রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা ও হানাহানি বেধে ওঠে (যা ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে) এবং ১২ শত পাহাড়ীকে হত্যার প্রতিশোধে ১২ শত বাঙালী পুনর্বাসনকারীকে হত্যা করা হয়, তাহলে তার জন্য এই ফ্যাসিস্ট বাঙালী শাসক শ্রেণীই সম্পূর্ণ দায়ী হবে এবং সেদিকেই আজ পাহাড়ী জনগণকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে এই নিপীড়িত পাহাড়ীদের সম্পূর্ণ অধিকার রয়েছে হানাদার ফ্যাসিস্ট নির্যাতনকারী বাঙালী সেনাবহিনীকে আক্রমণ করার ও নিশ্চিহ্ন করার।

‘বাম’দের লোক দেখানো ভূমিকা ও ফাঁকা কথা
এই বড় বুর্জোয়াদের লেজ ধরে আমাদের দেশের ৫ দল ও বাম সংসদীয় নেতা রাশেদ খান মেনন, সুরঞ্জিত সেন গুপ্তরা লোগাং-এর গণহত্যার পর পাহাড়ীদের দরদে একটুখানি নিন্দা জানিয়ে কেমন তামাশাটাই না করলেন। এত বড় গণহত্যার পরও তারা সামান্য নিন্দা ও দুঃখ প্রকাশ ছাড়া খালেদার ‘গণতান্ত্রিক’ সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের আর কিছু খুঁজে পাননি।  এই বাম নেতারা পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যাকে উগ্র বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদীদের দ্বারা জাতিগত নিপীড়নের সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত না করে রাজনৈতিক সমাধানের ফাঁকা কথা বলছেন।  খালেদাও তাই বলছে।  খালেদার রাজনৈতিক সমাধানের কথা যে সম্পূর্ণই ভাঁওতা তা খুবই পরিষ্কার।
এই মুহূর্তের জ্বলন্ত সমস্যা হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সেনাবাহিনী প্রত্যাহার, বাঙালী পুনর্বাসন বন্ধ, পুনর্বাসিতদের ফেরত আনা; গণহত্যা, জ্বালাও-পোড়াও-এর জন্য দায়ী চিহ্নিত সামরিক-বেসামরিক ব্যক্তিদের কঠোর শাস্তির দাবিগুলোকে নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করে পাহাড়ী জনগণের পক্ষে দেশব্যাপী জনগণকে সচেতন করা ও আন্দোলন গড়ে তোলার কথা কেন তারা বলছেন না? বলছেন না এই কারণেই যে, এই নিপীড়ক ফ্যাসিস্ট বাঙালী দালাল বুর্জোয়া শাসক শ্রেণীটির শোষণ-নির্যাতনের ভাগ তারাও কিছুটা পাচ্ছেন।  তারাও এই শ্রেণীর সংসদ, ক্ষমতা, নির্বাচন ও শাসনকে ‘গণতন্ত্র’ আখ্যা দিয়েছেন।  তারা কীভাবে বলবেন পার্বত্য চট্টগ্রামে কার্যত সামরিক শাসন চলছে; গণহত্যা-গণনিপীড়ন চলছে এবং এটা গণতন্ত্র নয়? তারা কীভাবে বলবেন যে, এটা স্বৈরতন্ত্র, এটা গণবিরোধী, সর্বোপরি তারা কীভাবে বলবেন পার্বত্য চট্টগ্রামের নিপীড়িত পাহাড়ী জাতিসত্তার অধিকার রয়েছে স্বাধীনতার দাবি করার এবং বাঙালী সেনাবাহিনীই ওখানকার অশান্তির মূল কারণ? সুতরাং নিপীড়িত পাহাড়ী জনগণকে সরকারের সাথে সাথে আঃ লীগ, জামাত, জাতীয় পার্টিকেও শত্রু চিহ্নিত করতে হবে এবং সংশোধনবাদী ‘বাম’দের উপরও ভরসা ত্যাগ করতে হবে। তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে বাঙালী শ্রমিক-কৃষকের সাথে যারা শাসক দালাল বুর্জোয়াদের দ্বারা চরমভাবে শোষিত এবং যারা নিশ্চয়ই এই ফ্যাসিস্ট শাসক শ্রেণীকে উৎখাতের জন্য বিপ্লবী সংগ্রাম চালাবে।  তাহলেই পাহাড়ী জনগণ মুক্তির পথে এগোতে সক্ষম হবেন।  

সূত্রঃ পাহাড় ও সমতলে আদিবাসী জাতিসত্ত্বার সংগ্রাম সম্পর্কে নিবন্ধ সংকলন, আন্দোলন প্রকাশনা

Advertisements


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s