জাতিসত্তা প্রশ্নে লেনিন-স্ট্যালিন-মাও এর কয়েকটি উদ্ধৃতি

lenin_stalin_mao

জাতিসত্তা প্রশ্নে লেনিন-স্ট্যালিন-মাও এর কয়েকটি উদ্ধৃতি

 

কুুওমিনটাঙ-এর গণবিরোধী চক্রটি চীনে বহু জাতিসত্তা রয়েছে, এ কথাই অস্বীকার করে।  হান জাতিসত্তা ছাড়া আর সবাইকে তারা ‘উপজাতি’ বলে অভিহিত করে। . . . . . . . সরকারের প্রতিক্রিয়াশীল নীতি সংখ্যালঘু জাতিসত্তা সম্পর্কে তারা অনুসরণ করে চলেছে। সর্ববিধ উপায়ে তাদের নিপীড়ন ও শোষণ করে চলেছে। . . . . . . সংখ্যালঘু জাতিসত্তাসমূহের বিরুদ্ধে সশস্ত্র দমন অভিযান এবং . . . . . . . হত্যাকাণ্ডের অভিযান তার পরিষ্কার উদাহরণ।
কমিউনিস্টদের সক্রিয়ভাবে সকল সংখ্যালঘু জাতিসত্তাসমূহের জনগণকে . . . . . সংগ্রামে সাহায্য করতে হবে। . . . . . তাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক মুক্তি ও বিকাশের জন্য সাহায্য করতে হবে। . . . . . তারা যাতে নিজস্ব সৈন্যবাহিনী গড়ে তুলতে পারে সে ব্যাপারেও তাদেরকে সাহায্য করতে হবে। তাদের কথা ও লিখিত ভাষা, তাদের আচার-আচরণ ও রীতি-নীতি এবং তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসকে সম্মান করতে হবে।
– মাও সেতুঙ

জাতিসমূহকে অবাধভাবে আলাদা হবার অধিকারের প্রশ্ন, আর কোনো নির্দিষ্ট সময়ে জাতিকে আলাদা হতেই হবে কি না সে প্রশ্ন- এই দুটো প্রশ্নকে একসঙ্গে গুলিয়ে ফেললে কিছুতেই চলবে না।
– স্ট্যালিন  (জাতীয় ও ঔপনিবেশিক প্রশ্ন সম্পর্কে নির্বাচিত প্রবন্ধাবলী।)

বাস্তবিকই কোনো সমস্যার বিচারে যদি দ্বান্দ্বিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজন থাকে তো সে সমস্যা জাতিসমস্যা।
– স্ট্যালিন

নিপীড়িত জাতির মুক্তির অর্থ রাজনৈতিক ক্ষেত্রে দ্বিবিধ রূপান্তরঃ (১) জাতিসমূহের পরিপূর্ণ সমাধিকার।  এ নিয়ে তর্ক নেই, এবং তা কেবল রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ঘটনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য; (২) রাজনৈতিক বিচ্ছেদের স্বাধীনতা, এটা রাষ্ট্রের সীমানা নির্ধারণের সঙ্গে সংশি¬øষ্ট। কেবল এইটে নিয়েই তর্ক।
– লেনিন
(জাতীয় সমস্যায় সমালোচনামূলক মন্তব্য,
জাতিসমূহের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার।)

আমরা যদি একদিকে হাজার ঢঙে ঘোষণা ও পুনরাবৃত্তি করতে থাকি যে, সমস্ত জাতীয় অত্যাচারের আমরা ‘বিরোধী’ আর অন্যদিকে যদি নিপীড়কদের বিরুদ্ধে এক নিপীড়িত জাতির কোনো কোনো শ্রেণীর অতি গতিশীল ও আলোকপ্রাপ্ত অংশের বীরত্বপূর্ণ বিদ্রোহকে ‘ষড়যন্ত্র’ আখ্যা দেই, তাহলে আমরা কাউটস্কিপন্থীদের মতো সেই একই নির্বোধ স্তরে নেমে যাব।
– লেনিন

বিশুদ্ধ সমাজ বিপ্লব দেখবে এমন আশা যদি কারো থাকে তবে সে জীবনেও কখনো তা দেখতে পাবে না।  সে শুধু মুখেই বিপ্লবী, আসল বিপ্লব সে বোঝে না।
– লেনিন

জাতীয় সমস্যাকে অবহেলা করে, উপেক্ষা করে এবং তার অস্তিত্বকে অস্বীকার করে- আমাদের কিছু কমরেড যা করেন- জাতীয়তাবাদকে ধ্বংস করা যাবে না।  কোনো মতেই না। . . . . . জাতীয়তাবাদকে চূর্ণ করার জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন জাতীয় সমস্যার মোকাবিলা ও তার সমাধান করা।
– স্ট্যালিন
(জাতীয় ও ঔপনিবেশিক প্রশ্ন সম্পর্কে নির্বাচিত প্রবন্ধাবলী।)

লেনিন যেভাবে জাতিগুলির বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার অধিকারসমেত আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রশ্ন উপস্থিত করেছেন সেটা বিবেচনা করুন।  লেনিন কোনো-কোনো সময় জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের থিসিস একটি সরল সূত্রের আকারে প্রকাশ করেছেন; ‘সংযুক্তির জন্য বিচ্ছেদ’। চিন্তা করুন সংযুক্তির জন্য বিচ্ছেদ।  এটা এমন কি স্ববিরোধী বলে মনে হতে পারে এবং তা সত্ত্বেও এই ‘স্ববিরোধী’ সূত্রই মার্কসীয় দ্বন্দ্বতত্ত্বের জীবন্ত সত্যকে প্রকাশ করছে যার সাহায্যে বলশেভিকরা জাতি সম্পর্কিত প্রশ্নের সবচাইতে দুর্ভেদ্য দুর্গ দখল করতে পেরেছে।

যে কেউ পরিবর্তনের সময়ের এই বৈশিষ্ট্য এবং এই ‘স্ববিরোধী’ চরিত্র বুঝতে পারেননি; যে কেউ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার এই দ্বান্দ্বিক চরিত্র বুঝতে পারেননি, তিনিই মার্কসবাদে পৌঁছতে পারেননি।

আমাদের বিপথগামীদের দুর্ভাগ্য যে, তারা মার্কসীয় দ্বন্দ্বতত্ত্ব বোঝেন না, বুঝতে চান না।
– স্ট্যালিন

জাতি ও ভাষাসমূহের সমানাধিকার যে স্বীকার করে না এবং তার সপক্ষে দাঁড়ায় না, সর্বপ্রকার জাতীয় নিপীড়ন ও অসাম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে না, সে মার্কসবাদী নয়, এমন কি গণতন্ত্রীও নয়।
– লেনিন
(জাতীয় সমস্যায় সমালোচনামূলক মন্তব্য,
জাতিসমূহের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার।)

Advertisements

চীনের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রিয় কমিটির একাদশ পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনের সিদ্ধান্তবলী(আগষ্ট ৮, ১৯৬৬)

Figure 1.1

চীনের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রিয় কমিটির একাদশ পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনের সিদ্ধান্তবলী

আগষ্ট ৮, ১৯৬৬

.     বর্তমানে বিকাশরত মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লব জনগণের হৃদয় স্পর্শকারী এক বিরাট বিপ্লব যা আমাদের দেশে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের বিকাশের এক নয়া স্তর গঠন করে, একটা গভীরতর ও ব্যাপকতর স্তর।

পার্টির ৮ম কেন্দ্রিয় কমিটির দশম পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে কমরেড মাও সেতুঙ বলেনঃ রাজনৈতিক ক্ষমতা উচ্ছেদে সর্বদাই প্রয়োজন হচ্ছে সর্বাগ্রে জনমত সৃষ্টি করা, মতাদর্শিক ক্ষেত্রে কাজ করা। এটা বিপ্লবী শ্রেণীর জন্য যেমন সত্য, প্রতিবিপ্লবী শ্রেণীর জন্যও তেমনি সত্য। কমরেড মাও সেতুঙের এই থিসিস অনুশীলনে সমগ্রভাবে সঠিক প্রমাণিত হয়েছে।

উতখাত হওয়া সত্ত্বেও বুর্জোয়ারা ক্ষমতা পুনর্দখলের লক্ষ্যে শোষক শ্রেণীসমূহের পুরোনো ধারণা, সংস্কৃতি, অভ্যাস ও উপায়ের মাধ্যমে জনগণকে দূষিত করতে আর জনগণের মন জয় করার প্রচেষ্টা চালায়। সর্বহারা শ্রেণীকে করতে হবে ঠিক তার বিপরীত; মতাদর্শগত ক্ষেত্রে বুর্জোয়াদের সকল চ্যালেঞ্জের প্রতি সে নির্দয় মুখোমুখি আঘাত ছুঁড়ে দেবে এবং তার নিজস্ব নতুন ধারণা, সংস্কৃতি, অভ্যাস ও উপায়ের মাধ্যমে সমগ্র সমাজের মানসিক দৃষ্টিভঙ্গীর পরিবর্তন ঘটাবে। আমাদের বর্তমান লক্ষ্য হচ্ছে সংগ্রামের মাধ্যমে তাদের ধ্বংস করা কর্তৃপক্ষের মধ্যে যারা পুঁজিবাদী পথ অনুসরণ করছে, প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়াশীল বুর্জোয়া ‘কর্তৃপক্ষসমূহ’ কে সমালোচনা ও অপসারণ করা, বুর্জোয়া ও অন্যান্য শ্রেণীসমূহের মতাদর্শকে সমালোচনা ও প্রত্যাখ্যান করা, এবং সমাজতন্ত্রের অথনৈতিক ভিত্তির সাথে অসাঞ্জস্যপূর্ণ শিক্ষা, সাহিত্য, শিল্পকলা আর উপরিকাঠামোর অবশিষ্ট ক্ষেত্রসমূহকে রূপান্তর করা যাতে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার সুসংহতকরণ ও বিকাশে সহায়তা করা যায়।

.    শ্রমিক, কৃষক, সৈনিক, বিপ্লবী বুদ্ধিজীবি জনগণ ও বিপ্লবী ক্যাডাররা মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের প্রধান শক্তি। পূর্বে অজানা ছিলেন এমন বিপুল সংখ্যক তরুণ জনগণ সাহসী হয়ে উঠেছেন এবং সাহসী পথবিভাজনকারীতে (Path Breaking) পরিণত হয়েছেন। তারা কর্মততপরতায় সজীব ও বুদ্ধিমান। বৃহদাকৃতির পোস্টার ও মহা বিতর্কসমূহের মাধ্যম দিয়ে তারা যুক্তি প্রদান করেন, পূর্ণাঙ্গ উন্মোচন করে ও সমালোচনা করেন আর বুর্জোয়াদের প্রকাশ্য ও লুক্কায়িত প্রতিনিধিদের ওপর সুদৃঢ় আক্রমণ পরিচালনা করেন। এমন একটা বিরাট বিপ্লবী আন্দোলনে তারা যে কোন না কোন ধরণের সীমাবদ্ধতা প্রদর্শন করবেন তা খুব কমই এড়ানো যায়, তথাপি তাদের প্রধান বিপ্লবী গতি প্রকৃতি (Orientation) শুরু থেকেই ছিল সঠিক। মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবে এটা হচ্ছে প্রধান ধারা। এটা হচ্ছে প্রধান দিশা, যে দিকে মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লব অব্যাহতভাবে অগ্রসরমান।

সাংস্কৃতিক বিপ্লব যেহেতু একটা বিপ্লব এটা অনিবার্যভাবে প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়। এই প্রতিরোধ আসে প্রধানভাবে তাদের দিক থেকে কর্তৃপক্ষের মধ্যকার পার্টিতে অনুপ্রবেশকারী যারা পুঁজিবাদের পথ গ্রহণ করেছে। সমাজের পুরোনো অভ্যাসের শক্তি থেকেও এটা আসে। বর্তমানে, এই প্রতিরোধ এখনো যথেষ্ট শক্তিশালি ও একগুয়ে। যাই হোক, মোটের ওপর সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লব একটা অপ্রতিরোধ্য সাধারণ ধারা। জনগণ পূর্ণভাবে জাগরিত হলে এমন প্রতিরোধ যে তড়িত চূর্ণ হবে তার যথেষ্ট প্রমাণ আছে।

প্রতিরোধ যথেষ্ট শক্তিশলি হওয়ার কারণে উল্টানো ও এমনকি পুন পুন উল্টানো এত থাকবে। এটা সর্বহারা শ্রেণী ও অন্য মেহনতী জনগণকে বিশেষত নবীনতর প্রজন্মকে শক্তি প্রদান করে, তাদেরকে শিক্ষা দেয়, অভিজ্ঞতা দেয় এবং এটা বুঝতে সাহায্য করে যে বিপ্লবী পথ হচ্ছে আঁকাবাঁকা, সমতল নৌচালনা নয়।

.     পার্টি নেতৃত্ব জনগণকে জাগরিত করতে সাহসী কিনা তার দ্বারা এই মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ফলাফল নির্ণীত হবে।

বিবিধ স্তরে পার্টি সংগঠনসমূহের কর্তৃক সাংস্কৃতিক বিপ্লবের আন্দোলন কর্তৃক প্রদত্ত নেতৃত্ব সংক্রান্ত চারটি ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতি রয়েছে।

)     এই পরিস্থিতিতে পার্টি সংগঠনের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিগণ আন্দোলনের সম্মুখভাগে থাকে এবং জনগণকে সাহসের সাথে জাগরিত করে। তারা সবকিছুর ওপরে সাহসকে স্থান দেয়, তারা নির্ভীক কমিউনিস্ট যোদ্ধা এবং চেয়ারম্যান মাওয়ের ভাল ছাত্র। তারা বৃহত আকৃতি পোস্টার ও মহা বিতর্কের প্রবক্তা। তারা জনগণকে উতসাহিত করে সকল রকমের ভূত ও দানবের উন্মোচনে, সেইসাথে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের কাজের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা ও ভুল ভ্রান্তিকে সমালোচনায়ও। নেৃতত্বের এই সঠিক ধরণ হচ্ছে সর্বহারা রাজনীতিকে সম্মুখভাগে রাখা ও মাও সেতুঙ চিন্তাধারাকে নেতৃত্বে রাখার ফলশ্রুতি।

)     বহু ইউনিটেই, এই মহান সংগ্রামে নেতৃত্বের কর্তব্য সম্পর্কে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের খুবই দুর্বল উপলব্ধি রয়েছে, তাদের নেতৃত্ব সতর্ক ও কার্যকর হওয়া থেকে দূরে এবং সেই অনুসারে তারা নিজেদের অক্ষম ও দুর্বল অবস্থানে আবিষ্কার করেন। তারা সবকিছুর ওপর ভীতিকে স্থান দেয়, সেকেলে পথ ও নিয়মনীতির প্রতি দৃঢ় এবং প্রচলিত অনুশীলন ভেঙে বেরিয়ে আসা ও সামনে অগ্রসর হতে অনিচ্ছুক। তারা নতুন ধারার জিনিসসমূহ ও জনগণের বিপ্লবী ধারার ব্যাপারে অসচেতন, ফলে তাদের নেতৃত্ব পরিস্থিতির পেছনে পড়ে রয়েছে এবং জনগণের পেছনে পড়ে রয়েছে।

)    কিছু ইউনিটে যেসকল দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিগণ অতীতে কোন না কোন ধরণের ভুল করেছেন তারা ভীতিকে সবার উপরে স্থান দিতে এমনকি আরো করুন অবস্থায় আছেন এই ভয়ে যে জনগণ তাদের বর্জন করবে। প্রকৃতপক্ষে, যদি তারা সিরিয়াস আত্মসমালোচনা করেন এবং জনগণের সমালোচনা গ্রহণ করেন পার্টি ও জনগণ ভুলত্রুটিসমূহের জন্য ভর্তুকী দেবে। যদি দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিগণ তা না করেন, তাহলে তারা অব্যাহতভাবে ভুল করে যাবেন এবং গণআন্দোলনের প্রতিবন্ধকতায় পরিণত হবেন।

)     কিছু ইউনিট পার্টিতে অনুপ্রবেশকারী পুঁজিবাদের পথগামীদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। কর্তৃপক্ষের এই ব্যক্তিগণ জনগণ কর্তৃক উন্মোচিত হওয়ার আশংকায় চরমভাবে আতঙ্কিত। তাই তারা গণআন্দোলনকে দমন করার সম্ভাব্য সকল ছূঁতো খোঁজে। তারা আক্রমণের নিশানাকে বদল করা ও কালোকে সাদায় রূপান্তরের মতো রণকৌশল অবলম্বনের চেষ্টা করে আন্দোলনকে গোল্লায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টায়। যখন তারা নিজেদের খুবই বিচ্ছিন্ন ও আগের মতো চলতে অক্ষম আবিষ্কার করে, তারা আরো ষড়যন্ত্র পাঁকায়, জনগণের পিঠে ছুরিকাঘাত করে, গুজব রটায় এবং যতটুকু সম্ভব বিপ্লব ও প্রতিবিপ্লবকে একাকার করে দেওয়ার চেষ্টা করে, আর এসবকিছুই তারা করে বিপ্লবীদের আক্রমণের উদ্দেশ্যে।

পার্টির কেন্দ্রিয় কমিটি দাবী করে সকল স্তরের পার্টি কমিটি সঠিক নেতৃত্ব প্রদান করবে, সবকিছুর ওপর সাহসিকতাকে স্থান দেবেন, সাহসের সাথে জনগণকে জাগরিত করবে, দূর্বলতা ও অক্ষমতার অবস্থাকে পরিবর্তন করবে যেখানে তা বিদ্যমান, সেই কমরেডদের অনুপ্রাণিত করবে যারা ভুল করেছিল কিন্তু নিজেদের মানসিক বোঝাকে ঝেরে ফেলতে ও সংগ্রামে যোগ দিতে নিজেদের সংশোধনে ইচ্ছুক, কর্তৃপক্ষের যারা পুঁজিবাদের পথ গ্রহণ করেছে তাদের নেতৃত্বকারী পদ থেকে অপসারণ করবেন এবং এভাবে সর্বহারা বিপ্লবীদের নেতৃত্ব পুনকব্জাকরণ সম্ভব করবেন।

)     মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবে জনগণের জন্য একমাত্র পদ্ধতি হচ্ছে নিজেদের নিজেরা মুক্ত করা, এবং তাদের পক্ষ হয়ে কোন পদ্ধতি অতি অবশ্যই ব্যবহার করা যাবেনা।

জনগণকে বিশ্বাস করুন, তাদের ওপর নির্ভর করুন এবং তাদের উদ্যোগকে শ্রদ্ধা করুন। ভয় মুছে ফেলুন। বিশৃঙ্খলাকে ভয় করবেননা। চেয়ারম্যান মাও মাঝে মাঝে আমাদের বলেন যে বিপ্লব এত শুদ্ধ, এত ভদ্র, এত শান্ত, এত দয়ালু, এত বিনীত, এত সংযত, এত উদার হতে পারেনা। এই মহান বিপ্লবী আন্দোলনে জনগণকে নিজে নিজে শিক্ষিত হতে দিন এবং সঠিক ও বেঠিকের মধ্যে আর কাজের নির্ভুল ও ভুল পদ্ধতির মধ্যে পার্থক্য করতে শিখতে দিন।

বিষয়বস্তুর যুক্তিযুক্তকরণে বৃহদাকৃতির পোস্টার ও মহা বিতর্কসমূহের পুর্ণ সদ্ব্যবহার করুন যাতে জনগণ সঠিক মতসমূহ স্বচ্ছকরণে সক্ষম হন, ভুল মতসমূহকে সমালোচনায় সক্ষম হন এবং সকল ভূত ও দানবের উন্মোচনে সক্ষম হন। এভাবে সংগ্রামের মাধ্যমে জনগণ তাদের রাজনৈতিক সচেতনতাকে উন্নীত করতে সক্ষম হবেন, সক্ষমতা ও মেধাকে বিকশিত করতে পারবেন এবং সঠিককে ভুল থেকে আলাদা করতে পারবেন এবং শত্রু ও আমাদের মধ্যে পরিষ্কার পার্থক্য রেখা টানতে সক্ষম হবেন।

) কারা আমাদের শত্রু ? কারা আমাদের বন্ধু? এটাই হচ্ছে বিপ্লবের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এবং একইভাবে সাংস্কৃতিক বিপ্লবেরও এটা প্রথম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

পার্টি নেতৃত্বকে বাম আবিষ্কারে, বামের সারিকে বিকশিতকরণে ও শক্তিশালিকরণে ভাল হতে হবে এবং বিপ্লবী বামের ওপর দৃঢ়ভাবে নির্ভর করতে হবে। আন্দোলনের সময় সর্বাধিক প্রতিক্রিয়াশিল দক্ষিণপন্থীদের সমগ্রভাবে বিচ্ছিন্ন করতে, মধ্যপন্থীদের জয় করতে এবং ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠদেরকে ঐক্যবদ্ধ করার এটাই হচ্ছে একমাত্র পথ যাতে আন্দোলনের শেষে আমরা শতকরা ৯২ ভাগেরও অধিক জনগণের সাথে ঐক্য অর্জন করতে পারি।

মুষ্টিমেয় চরম প্রতিক্রিয়াশিল বুর্জোয়া দক্ষিণপন্থী ও প্রতিবিপ্লবী সংশোধনবাদীদের আঘাত হানতে, পার্টি, সমাজতন্ত্র ও মাও সেতুঙ চিন্তাধারার বিরুদ্ধে তাদের অপরাধকে পুর্ণরূপে উন্মোচন ও সমালোচনা করতে সকল শক্তি কেন্দ্রিভূত করুন যাতে সর্বোচ্চ বিচ্ছিন্নকরণ সম্ভব হয়।

বর্তমান আন্দোলনের প্রধান নিশানা হচ্ছে পার্টির মধ্যকার সেইসকল যারা কর্তৃপক্ষের মধ্যে রয়েছে আর পুঁজিবাদের পথ গ্রহণ করেছে।

পার্টি-বিরোধী, সমাজতন্ত্র বিরোধী দক্ষিণপন্থী এবং যে সকল পার্টি ও সমাজতন্ত্র সমর্থনকারী ভূল বলেছে অথবা করেছে অথবা কিছু বাজে প্রবন্ধ লিখেছে অথবা অন্য কাজ করেছে তাদের মধ্যে পার্থক্যকরণে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

কঠোরভাবে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে একদিকে প্রতিক্রিয়াশীল বুর্জোয়া পণ্ডিত একনায়ক ও ‘কর্তৃপক্ষ’ আর অন্যদিকে সাধারণ বুর্জোয়া একাডেমিক ধ্যান ধারণা আছে এমন জনগণের মধ্যে পার্থক্যকরণে।

)     কঠিন পার্থক্যরেখা অঙ্কন করতে হবে দুইটি ভিন্ন ধরণের দ্বন্দ্বের মধ্যেঃ জনগণের মধ্যকার দ্বন্দ্ব এবং আমাদের ও শত্রুদের মধ্যেকার দ্বন্দ্ব। জনগণের মধ্যেকার দ্বন্দ্বকে আমাদের ও শত্রুদের মধ্যেকার দ্বন্দ্বে পরিণত করা চলবেনা এবং আমাদের ও শত্রুদের মধ্যেকার দ্বন্দ্বকে জনগণের মধ্যেকার দ্বন্দ্ব বিচার করলে চলবেনা।

বিভিন্ন ধরণের মত পোষণ করা জনগণের জন্য স্বাভাবিক। বিভিন্ন মতের মধ্যে সংঘাত এড়ানোর অযোগ্য, প্রয়োজনীয় ও উপকারী। স্বাভাবিক ও পুর্ণ বিতর্কের প্রক্রিয়ায় জনগণ নিশ্চিত করবেন কোনটা ন্যায্য, সঠিক আর কোনটা বেঠিক এবং ক্রমান্বয়ে সর্বসম্মতি অর্জন করবেন।

বিতর্কে যে পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে তা হচ্ছে বাস্তব তথ্য উপস্থাপন, যুক্তি দিয়ে বিচার করা এবং যুক্তি প্রদানের মাধ্যমে অগ্রসর হওয়া। বিভিন্ন মত পোষণকারী সংখ্যালঘুদের ওপর বল প্রয়োগে মত চাপিয়ে দেওয়া অননুমোদনীয়। সংখ্যালঘুকে রক্ষা করতে হবে কারণ কখনো কখনো সত্য সংখ্যালঘুদের সাথে থাকে। এমনকি সংখ্যালঘু যদি ভুলও হয়, তখনও তাদেরকে নিজ বক্তব্য প্রদান করতে অনুমোদন করতে হবে এবং তাদের মতকে সংরক্ষণ করতে হবে।

যখন কোন বিতর্ক হবে তাকে যুক্তি প্রদানের মাধ্যমে হতে হবে বল প্রয়োগ অথবা চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে নয়।

বিতর্কের প্রক্রিয়ায় প্রত্যেক বিপ্লবীকে স্বাধীনভাবে চিন্তা করায় ভাল হতে হবে এবং চিন্তা করতে সাহসী হওয়া, কথা বলতে সাহসী হওয়া আর কর্মততপরতায় সাহসী হওয়ার কমিউনিস্ট উদ্যমকে বিকশিত করতে হবে। বিপ্লবী কমরেডদের যেহেতু একই প্রবণতাগত ভিত্তি রয়েছে, ঐক্যকে জোরদারের স্বার্থে পার্শ্ব ইস্যুসমূহে সীমাহীন বিতর্ক তাদের এড়াতে হবে।

)    সাংস্কৃতিক বিপ্লবে কিছূ বিদ্যালয়, ইউনিট ও কর্মততপরতা দল-এর দায়িত্বপ্রাপ্ত কিছু ব্যক্তি তাদের বিরুদ্ধে বৃহত আকৃতি পোস্টার সাঁটিয়েছিল যে-জনগণ তাদের বিরুদ্ধে পাল্টা আক্রমণ সংগঠিত করেছে। এই লোকেরা এমন শ্লোগান তুলে ধরেছেঃ একটা ইউনিট অথবা কর্মততপরতা দল-এর বিরোধিতার মানে হচ্ছে পার্টি ও সমাজতন্ত্রের বিরোধিতা, অর্থাত প্রতিবিপ্লব। এভাবে এটা অনিবার্য যে তাদের আক্রমণসমূহ কিছু প্রকৃত বিপ্লবী কর্মীর ওপর পড়বে। এটা হচ্ছে প্রবণতাগত ভ্রান্তি, লাইনের ত্রুটি এবং চরমভাবে অননুমোদনীয়।

গুরুতর মতাদর্শিক ভ্রান্তিতে ভোগে এমন বেশ কিছু ব্যক্তি, পার্টি বিরোধী সমাজতন্ত্র-বিরোধী দক্ষিণপন্থীদের অনেকে গণআন্দোলনের কতিপয় সীমাবদ্ধতা ও ভুলভ্রান্তির সুযোগ নিচ্ছে উদ্দেশ্যমূলকভাবে জনগণের অনেককে ‘প্রতিবিপ্লবী’ আখ্যা দিয়ে গুজব রটনা করতে, ঘোঁট পাঁকাতে, বিক্ষোভ করতে । এমন ‘পকেটমার’ দের ব্যাপারে সচেতন হওয়া প্রয়োজন এবং যথাসময়ে তাদের ষড়যন্ত্র ফাঁস করা দরকার।

আন্দোলনের প্রক্রিয়ায়, যা আইনি প্রক্রিয়ায় মোকাবেলা করতে হবে যেমন হত্যা, জ্বালাও পোড়াও, সাবোটাজ অথবা রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা চুরির মতো অপরাধের প্রমাণ রয়েছে প্রতিবিপ্লবীদের ক্ষেত্রে এমন ব্যতীত আন্দোলনে উদ্ভূত সমস্যাবলীর কারণে বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, মাধ্যমিক স্কুল ও প্রাইমারী স্কুলে ছাত্রদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেওয়া যাবেনা। আন্দোলনের প্রধান লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হওয়া প্রতিরোধের জন্য যে ছুঁতোয়ই হোকনা কেন জনগণকে একে অপরের বিরুদ্ধে এবং ছাত্রদেরও উত্তেজিত করা অননুমোদনীয়। এমনকি প্রমাণিত দক্ষিণপন্থীদেরকেও আন্দোলনের পরবর্তী স্তরে প্রতিটি ক্ষেত্রে গুরুত্ব অনুসারে মোকাবেলা করতে হবে।

)    ক্যাডাররা মোটা দাগে চার বর্গে পড়েঃ

)     ভাল;

)     তুলনামূলক ভাল

)    যারা গুরুতর ভুলভ্রান্তি করেছে কিন্তু পার্টি-বিরোধী সমাজতন্ত্র বিরোধী দক্ষিণপন্থী হয়নি

)     স্বল্পসংখ্যক পার্টি-বিরোধী সমাজতন্ত্র বিরোধী

সাধারণ পরিস্থিতিতে, প্রথম দুই বর্গ (ভাল ও তুলনামূলক ভাল) হচ্ছে ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠ।

পার্টি-বিরোধী সমাজতন্ত্র-বিরোধী দক্ষিণপন্থীদের সম্পূর্ণরূপে দেউলিয়া করে দিতে হবে ও তার প্রভাবকে দূরীভূত করতে হবে।  একইসাথে তাদেরকে একটা সমাধান দিতে হবে যাতে নতুনভাবে জীবন শুরু করতে পারে।

cultural-revolution-H

১০)    মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবে বহু নতুন জিনিস জন্ম নিতে শুরু করেছে। বহু স্কুল ও ইউনিটে জনগণ কর্তৃক সৃষ্ট সাংস্কৃতিক বিপ্লবী গ্রুপ, কমিটি, অন্যান্য সাংগঠনিক রূপ হচ্ছে নতুন জিনিস এবং বিরাট ঐতিহাসিক গুরুত্বসম্পন্ন।

এই সাংস্কৃতিক বিপ্লবী গ্রুপ, কমিটি ও কংগ্রেসসমূহ হচ্ছে চমতকার নয়া রূপের সংগঠন যেখানে কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে জনগণ নিজেদের শিক্ষিত করছেন।এগুলো হচ্ছে জনগণের সাথে আমাদের পার্টির ঘনিষ্ঠ সংযোগের এক চমতকার সেতু। এগুলো হচ্ছে সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ক্ষমতার অঙ্গ।

হাজার হাজার বছর ধরে সকল শোষক শ্রেণীসমূহের দ্বারা বাহিত পুরোনো ধ্যান ধারণা, আচার আচরণ ও অভ্যাসের বিরুদ্ধে সর্বহারা শ্রেণীর সংগ্রাম আবশ্যিকভাবে খুবই খুবই দীর্ঘকাল ব্যাপী হবে। তাই, সাংস্কৃতিক বিপ্লবী গ্রুপ, কমিটি ও কংগ্রেসসমুহকে অস্থায়ী সংগঠন নয় বরং স্থায়ী নিয়মিত গণসংগঠণ হতে হবে। তারা শুধু কলেজ, স্কুল ও সরকারের সমর্থক সংগঠণসমূহের জন্যই উপযোগী তাই নয় বরং সাধারণভাবে সকল কারখানা, খনি ও অন্য সংস্থাসমূহ, শহুরে জেলা ও গ্রামসমূহের জন্যও।

সাংস্কৃতিক বিপ্লবী গ্রুপসমূহ ও কমিটিসমূহের সদস্য ও সাংস্কৃতিক বিপ্লবী কংগ্রেসসমূহের প্রতিনিধি নির্বাচনের জন্য প্যারি কমিউনের মতো সাধারণ নির্বাচনের একটা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। প্রার্থীদের তালিকা বিপ্লবী জনগণ কর্তৃক পূর্ণ আলোচনার পর প্রদত্ত হতে হবে এবং বারংবার জনগণ তালিকাসমূহ আলোচনা করার পর নির্বাচন হবে।

সাংস্কৃতিক বিপ্লবী গ্রুপের সদস্যদের এবং সাংস্কৃতিক বিপ্লবী কংগ্রেসসমূহের প্রতিনিধিদের যে কোন সময় সমালোচনা করতে পারবে জনগণ। যদি এই সদস্যগণ অথবা প্রতিনিধিগণ অক্ষম প্রমাণিত হয়, তাদেরকে নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিস্থাপন করা যাবে অথবা আলোচনার পর জনগণ ফেরত আনতে পারবেন।

কলেজ ও স্কুলের সাংস্কৃতিক বিপ্লবী গ্রুপ, কমিটি ও কংগ্রেসসমূহ বিপ্লবী ছাত্রদের প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত হতে হবে। একইসাথে, বিপ্লবী শিক্ষক কর্মচারী ও শ্রমিকদের কিছু সংখ্যক প্রতিনিধিও তাতে থাকতে হবে।

১১)    মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবে একটা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য হচ্ছে পুরোনো শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষাদানের পুরোনো নীতিমালা ও পদ্ধতির রূপান্তর।

আমাদের স্কুলসমূহ বুর্জোয়া বুদ্ধিবীবিদের আধিপত্যে থাকার অবস্থাকে এই সাংস্কৃতিক বিপ্লবে সম্পূর্ণরূপে পরিবর্তন করতে হবে।

প্রতিটি ধরণের স্কুলে আমাদের অতি অবশ্যই কমরেড মাও সেতুঙ কর্তৃক এগিয়ে নেওয়া এই কর্মনীতিকে সামগ্রিকভাবে প্রয়োগ করতে হবে যে শিক্ষা সর্বহারা শ্রেণীকে সেবা করবে এবং শিক্ষাকে উতপাদনশীল শ্রমের সাথে যুক্ত হতে হবে যাতে শিক্ষার্থীদের নৈতিকভাবে, বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে ও শারীরিকভাবে বিকশিত করা যায় এবং তারা যাতে সমাজতান্ত্রিক সচেতনতা ও সংস্কৃতিযুক্ত শ্রমিক হতে পারে।

পাঠদানের পর্যায়কালকে ছোট হতে হবে এবং কোর্সসমূহকে হতে হবে স্বল্প ও অধিকতর ভাল। শিক্ষা সরঞ্জামকে সামগ্রিকভাবে রূপান্তরিত হতে হবে, কিছু ক্ষেত্রে সরলীকৃত জটিল বস্তু দ্বারা সূচিত হতে হবে। প্রধান কাজ অধ্যয়ন হলেও ছাত্রদের অন্যান্য বিষয়ও শিখতে হবে। বলতে গেলে, অধ্যয়নের সাথে সাথে তাদেরকে শিল্প শ্রম, কৃষি কাজ ও সামরিক বিষয়েও শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে এবং বুর্জোয়াদের সমালোচনার লক্ষ্যে সংঘটিত সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সংগ্রামে অংশগ্রহণ করতে হবে।

১২)    সাংস্কৃতিক বিপ্লবের গণ আন্দোলনের প্রক্রিয়ায় বুর্জোয়া ও সামন্ত মতাদর্শের সমালোচনাকে সর্বহারা বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গী ও মার্কসবাদ-লেনিনবাদ, মাও সেতুঙ চিন্তাধারার প্রচারের সাথে ভালভাবে যুক্ত হতে হবে।

পার্টিতে অনুপ্রেবেশকারী প্রচলিত (Typical) বুর্জোয়া প্রতিনিধি ও প্রচলিত (Typical) বুর্জোয়া একাডেমিক ‘কর্তৃপক্ষ’-এর সমালোচনা সংগঠিত করতে হবে, এবং এর অন্তর্ভুক্ত হতে হবে দর্শন, ইতিহাস, রাজনৈতিক অর্থনীতি এবং শিক্ষায়, সাহিত্য ও শিল্পকলার বিভিন্ন কর্মে ও তত্ত্বে এবং প্রকৃতিবিজ্ঞানের তত্ত্বে ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিদ্যমান বিবিধ প্রতিক্রিয়াশীল মত-এর সমালোচনা।

সংবাদ মাধ্যমে কারো নামে সমালোচনা সম স্তরে পার্টি কমিটির আলোচনার পর সিদ্ধান্তকৃত হতে হবে, কোন কোন ক্ষেত্রে উচ্চতর স্তরের পার্টি কমিটিতে পেশ করা হবে অনুমোদনের জন্য।

১৩)   বিজ্ঞানী, কৃতকৌশলী এবং কর্মচারীদের ব্যাপারে যতক্ষণ তারা দেশপ্রেমিক, সজীবতার সাথে কাজ করেন, পার্টি ও সমাজতন্ত্রের বিরোধী নন এবং বিদেশী কোন দেশের সাথে কোন অবৈধ সম্পর্ক রক্ষা করেননা, বর্তমান আন্দোলনে আমাদের ‘ঐক্য, সমালোচনা, ঐক্য’-এর কর্মনীতি অব্যাহতভাবে প্রয়োগ করতে হবে, আর যেসব বিজ্ঞান ও কৃতকৌশল কর্মী অবদান রেখেছেন, তাদের বিশ্বদৃষ্টিকোন ও কাজের স্টাইলকে ক্রমান্বয়ে রূপান্তরের জন্য তাদেরকে সহযোগিতা করার প্রচেষ্টা চালাতে হবে।

১৪)    বৃহত ও মাঝারি শহরগুলোর পার্টি ও সরকারের সাংস্কৃতিক ও শিক্ষা ইউনিটসমূহ এবং নেতৃত্বকারী অঙ্গসমূহ হচ্ছে বর্তমান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের মনোযোগের কেন্দ্র। মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবকে উভয়ত শহর ও গ্রামে চালাতে হবে এবং উচ্চতর স্তরে উন্নীত করতে হবে। নির্দিষ্ট পরিস্থিতি অনুসারে বিবিধ অঞ্চল ও বিভাগে এর প্রভাবে ব্যবস্থা গড়ে ওঠতে পারে।

গ্রামাঞ্চলে ও শহরের সংস্থাসমূহে চলমান সমাজতান্ত্রিক শিক্ষা আন্দোলনকে হতাশ হলে চলবেনা যেখানে মূল ব্যবস্থাপনা হচ্ছে যথার্থ এবং আন্দোলন ভালভাবেই চলছে বরং মূল ব্যবস্থাপনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে অব্যহত থাকতে হবে। যাইহোক, বর্তমান মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবে উত্থিত প্রশ্নসমূহ যথাযথ সময়ে জনগণের কাছে তুলে ধরতে হবে আলোচনার জন্য যাতে সর্বহারা মতাদর্শকে আরো এগিযে নেওয়া যায় এবং বুর্জোয়া মতাদর্শকে অপসারণ করা য়ায়।

কিছু কিছু এলাকায় মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবকে মনোযেগের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে সমাজতান্ত্রিক শিক্ষা আন্দোলনে গতি সঞ্চারক যুক্ত করতে এবং রাজনীতি, মতাদর্শ, সংগঠন ও অর্থনীতির ক্ষেত্রসমূহ পরিষ্কারকরণে। স্থানীয় পার্টি কমিটি যেখানে যথার্থ মনে করে সেখানে তা করা যেতে পারে।

১৫)    মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের লক্ষ্য হচ্ছে জনগণের মতাদর্শের বিপ্লবীকরণ এবং ফল হিসেবে কাজের সকল ক্ষেত্রে ব্যাপকতর, দ্রুততর, অধিকতর ভাল এবং অধিক অর্থনৈতিক ফলাফল অর্জন। যদি জনগণকে সম্পূর্ণরূপে জাগরিত করা হয় এবং যথাযথ ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করা হয়, উভয়তঃ সাংস্কৃতিক বিপ্লব ও উতপাদনকে পরিচালনা করা সম্ভব হবে একটি আরেকটিকে বাঁধাগ্রস্ত না করে, আমাদের সকল কাজে উচ্চ গুণাগুণের নিশ্চয়তা সহকারে।

মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লব হচ্ছে আমাদের দেশে সামাজিক উতপাদিকা শক্তির বিকাশে এক শক্তিশালি চালিকাশক্তি। মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবকে উতপাদনের বিকাশের বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর যে কোন ধারণা ভুল।

১৬)   সশস্ত্র বাহিনীতে সাংস্কৃতিক বিপ্লব ও সমাজতান্ত্রিক শিক্ষা আন্দোলন চালাতে হবে কেন্দ্রিয় কমিটির সামরিক কমিশন ও গণমুক্তি বাহিনীর সাধারণ রাজনৈতিক বিভাগের নির্দেশাবলীর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে।

১৭)    মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবে মাও সেতুঙ চিন্তাধারার মহান লাল ব্যানারকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে হবে এবং সর্বহারা রাজনীতিকে কমান্ডে রাখতে হবে। ব্যাপক শ্রমিক, কৃষক, ক্যাডার ও বুদ্ধিজীবিদের মধ্যে চেয়ারম্যান মাও সেতুঙের রচনাসমূহের সৃজনশীল অধ্যয়ন ও প্রয়োগের আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে হবে এবং সাংস্কৃতিক বিপ্লবে মাও সেতুঙ চিন্তাধারাকে কর্মের দিক নির্দেশক হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।

এই জটিল মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবে সকল স্তরের পার্টি কমিটিকে চেয়ারম্যান মাওয়ের রচনাবলীকে অধিক থেকে অধিক যতন সহকারে ও সৃজনশীলভাবে অধ্যয়ন ও প্রয়োগ করতে হবে। নির্দিষ্টভাবে, তাদেরকে সাংস্কৃতিক বিপ্লব এবং নেতৃত্ব সম্পর্কে পার্টির পদ্ধতিসমূহ সম্পর্কে মাওয়ের লেখা যেমন নয়া গণতন্ত্র সম্পর্কে, শিল্প ও সাহিত্য সম্পর্কে ইয়েনান ফোরামে আলোচনা, জনগণের ভিতরকার দ্বন্দ্বসমূহের সঠিক সমাধান সম্পর্কে, প্রচারকার্য সম্পর্কে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির জাতীয় সম্মেলনে বক্তৃতা, নেতৃত্বের পদ্ধতি এবং পার্টি কমিটির কাজের পদ্ধতি সম্পর্কে সমস্যাবলী তাদের বারংবার অধ্যয়ন করতে হবে।

সকল স্তরের পার্টি কমিটিকে চেয়ারম্যান মাও কর্তৃক বছর বছর ধরে প্রদত্ত নির্দেশনাকে মেনে চলতে হবে, তাদেরকে ‘জনগণের মধ্য থেকে আসা এবং জনগণের মধ্যে যাওয়া’র গণলাইন সামগ্রিকভাবে প্রয়োগ করতে হবে এবং তাদেরকে শিক্ষক হওয়ার আগে ছাত্র হতে হবে। তাদেরকে একতরফা ও সংকীর্ণ হওয়া এড়াতে হবে। তাদেরকে বস্তুবাদী দ্বন্দ্বতত্ত্বকে এগিয়ে নিতে হবে এবং অধিবিদ্যা ও পন্ডিতীপণাকে বিরোধিতা করত হবে।

কমরেড মাওকে শীর্ষে রেখে পার্টির কেন্দ্রিয় কমিটির নেতৃত্বের অধীনে মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের উজ্জ্বল সাফল্য সুনিশ্চিত।


বিশ্বের নিপীড়িত-বঞ্চিত নারীদের মহান নেত্রী কমরেড ‘ক্লারা সেৎকিন’

414463_01

বিশ্বের নিপীড়িত-বঞ্চিত নারীদের মহান নেত্রী

ক্লারা সেৎকিন

বুর্জোয়া পরিবারে জন্মগ্রহণকারী ও বুর্জোয়া একাডেমিক শিক্ষায় শিক্ষিত ক্লারা সেৎকিন জার্মান সমাজের শ্রেণি বৈষম্য ও পুঁজিতন্ত্র কর্তৃক শ্রমিক শোষণের ব্যবস্থা উচ্ছেদ তথা শ্রমিক শ্রেণির রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মার্কসবাদী দর্শন গ্রহণ করেন।
শ্রমিক শ্রেণির মতবাদ মার্কসবাদী দর্শন অনুযায়ী সমাজের আমুল রূপান্তর ঘটাতে হলে পশ্চাৎপদ নারীদেরকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করে তুলতে হবে এবং নারীজাতি তার শৃঙ্খল ভেঙ্গে মুক্ত হতে না পারলে মানবজাতির সামগ্রিক মুক্তি সম্ভব নয়- এ শিক্ষায় তিনি নিজেকে সুদৃঢ়ভাবে গড়ে তোলেন।  এবং নারীদের মাঝে ব্যাপকভাবে কাজ করেন।
ক্লারা সেৎকিন নারীদের সমস্যা নিয়ে ব্যাপক লেখালেখি করেন।  তিনি বিশ্লেষণ করে দেখান যে, জার্মান নারীরা কিভাবে পুঁজিবাদের শ্রম শোষণের শিকার, যৌন নিপীড়নের শিকার।  পুঁজিবাদ কিভাবে নারীকে ভোগ্যপণ্যে পরিণত করেছে। “গৃহে স্বামী বুর্জোয়া ও স্ত্রী সর্বহারা শ্রেণি গঠন করে”- এঙ্গেলসের এই বিখ্যাত উক্তিকে তিনি জোরালোভাবে আঁকড়ে ধরে তার ব্যাখ্যা করেন।  এবং এটা যে শুধু জার্মান নারীদের সমস্যা নয়, শ্রেণি বিভক্ত সমস্ত দেশের নারীদেরই সমস্যা তার বিশদ ব্যাখ্যা তিনি করেন।
ক্লারা সেৎকিন ১৮৯৬ সালে অনুষ্ঠিত তার পার্টি কংগ্রেসে নারীদের সমস্যার উপর এক দীর্ঘ বক্তৃতা করেন। কংগ্রেসে প্রদত্ত বক্তৃতায় তিনি বেকোফেন, মর্গান ও বুর্জোয়া নারীবাদীদের তীব্র সমালোচনা করেন।  এবং ব্যক্তিগত মালিকানা/সম্পদই হচ্ছে নারী নিপীড়নের মূল উৎস, সমাজতন্ত্র ও কমিউনিজমই পারে নারী নিপীড়নের মূল শিকড় উপড়ে ফেলতে- এই ধারণাই তিনি দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেয়ার আহ্বান জানান।  তিনি কিছু দিক নির্দেশনা (গাইডিং থট) পেশ করেন যে কীভাবে নারীদেরকে শ্রেণি সচেতন করে তুলতে হবে।  শ্রেণি সংগ্রামে অংশগ্রহণ করাতে হবে।  এবং সমগ্র ট্রেডইউনিয়নগুলোতে নারীদের অংশগ্রহণ আরো বাড়াতে হবে।  বৃহৎ শিল্প ছাড়াও কুটীর শিল্প, কারখানার নারীদেরকে জাগিয়ে তুলতে হবে।
১৯০৮ সালের ৮ মার্চ আমেরিকার নিউইয়র্ক শহরে সর্বহারা নারীরা তাদের ন্যায্য অধিকারের দাবিতে এক গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন করেন।  ১৯১০ সালে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সোস্যালিস্ট কংগ্রেসে ক্লারা সেৎকিন ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক সর্বহারা ও নিপীড়িত নারীদের অধিকার আদায়ের প্রতীক দিবস করার প্রস্তাব করেন।  কংগ্রেস ক্লারা সেৎকিনের প্রস্তাব গ্রহণ করে।  এরপর থেকেই বিশ্বব্যাপী ৮ মার্চ নারী দিবস পালন হয়ে আসছে।
ক্লারা সেৎকিন রুশ বিপ্লবের মহান নেতা কমরেড লেনিনের সাথে বহুবার সাক্ষাত করেছেন।  কমরেড লেনিন ক্লারা সেৎকিনের নারীপ্রশ্নে কিছু কিছু ভুল দৃষ্টিভঙ্গির সমালোচনা করেছেন। পরামর্শ দিয়েছেন।  ক্লারা সেৎকিন কমরেড লেনিনের সমালোচনা, পরামর্শগুলো গুরুত্বসহকারে শুনেছেন ও গ্রহণ করেছেন।
জীবনের শেষ কয়েক বছর তিনি সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত রাশিয়ায় কাটিয়েছেন।  এবং সমাজতান্ত্রিক বিনির্মাণ পর্যবেক্ষণ করেছেন।  সোভিয়েত যৌথ খামারের নারীদের মাঝে তিনি ছিলেন অতি প্রিয়জন।
শারীরিক অসুস্থতা উপেক্ষা করে তিনি জার্মানির রাইখস্টাগে বক্তৃতা দিতে যান।  ১৯৩২ সালের ৩০ আগস্ট ফ্যাসিবাদী একনায়কত্বের বিরুদ্ধে তিনি বক্তৃতা দেন।  এই বক্তৃতায়ও তিনি শ্রমজীবী সর্বহারা নারীদের উদ্দেশে বলেন- মনে রেখো বোনেরা, ফ্যাসিবাদ চায় তোমাদের শুধু স্বামীদের দাসী ও সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র বানাতে। ভুলো না সেই নারী যোদ্ধাদের যারা ফ্যাসিস্টদের হাতে প্রাণ দিয়েছে ও কারাগারের অন্তরালে আছে।
রাইখস্টাগে ফ্যাসিবাদ বিরোধী ভাষণ দেয়ার সময় তিনি জার্মান ফ্যাসিস্ট বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হন এবং তাদের অত্যাচারে ১৯৩৩ সালের ২০ জুন ৭৫ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।
১৯৩৩ সালের ৮ মার্চ নারী মুক্তির মহান নেত্রী ক্লারা সেৎকিনকে “অর্ডার অব লেনিন”- এ মর্যাদাপূর্ণ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

সূত্রঃ  নারী মুক্তি/২নং সংখ্যায় প্রকাশিত ॥ ফেব্রুয়ারি, ’০৪