পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলা পরিষদ বাতিল কর

rhdcbd20150919100429

পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলা পরিষদ বাতিল কর

(জানুয়ারি/’৯১)

স্বৈরাচারী এরশাদ সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামের সংখ্যালঘু জাতিসত্তাসমূহকে দমন করার উদ্দেশ্যে তার দালালদেরকে দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ গঠন করেছিল। এরশাদের পতনের পর পাহাড়ের জনতা আশা করেছিলেন এটা বাতিল করা হবে।  কিন্তু সম্প্রতি অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির এক ঘোষণায় তাদের সে আশা বানচাল হয়ে গেছে। পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানদের সাথে এক বৈঠকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলা পরিষদ বাতিল করা হবে না। এর সপক্ষে তিনি যুক্তি দেখিয়েছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলা পরিষদ নির্বাচন নাকি অবাধ ও নিরপেক্ষ (?) হয়েছে। ইতিপূর্বে সেনাবাহিনীর সদস্যদের সাথে এক সভায় তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভূমিকার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন। অন্যদিকে পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ, বিপ্লবী ছাত্র আন্দোলনসহ পাহাড়ী জাতিসত্তাসমূহের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার সমর্থনকারী বিভিন্ন সংগঠন জেলা পরিষদ বাতিল, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে প্রত্যাহারসহ পাহাড়ী জনগণের বিচ্ছিন্নতার অধিকারসহ স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে সংগ্রাম করে আসছে।
অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি, দুইনেত্রী, তিন জোট, সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য সকলেই এরশাদের পতনকে স্বৈরাচারের পতন বলেছেন। তারা অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচনের উপর বারবার গুরুত্বারোপ করছেন, যেহেতু এরশাদের আমলে কোন নির্বাচনই অবাধ নিরপেক্ষ হয়নি।  অথচ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সকলকে হতবাক করে দিয়ে ঘোষণা করলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হয়েছে। তাহলে যে স্বৈরতন্ত্র সমতল ভূমির জন্য ছিল ফ্যাসিবাদ, সেই একই সরকার পাহাড়ী জনগণের উপর ভুল করে গণতন্ত্র বর্ষণ করল? সমতলে করল কারচুপি, ভোট ডাকাতি, মিডিয়া ক্যু আর পাহাড়ে করল অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন? দুই নেত্রী এ প্রসঙ্গে নিশ্চুপ কেন? কেন নিশ্চুপ সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য, যাদের নেতৃবৃন্দ পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের সভায় বক্তৃতাতে পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের সমস্যা সম্পর্কে উদ্বেগ প্রকাশ করেন?
পার্বত্য চট্টগ্রামে যে কোন প্রশাসনিক কাজ বা ঘটনায় সেনাবাহিনী হস্তক্ষেপ করে। এরশাদের আমলে পুরো সময়টাতে এবং এখনও কার্যত সেখানে সামরিক শাসন চলছে। আর এ সময়গুলোতেই সেখানে চলছে পাহাড়ী জাতিসত্তার উপর হত্যাকান্সডহ নানারকম পাশবিক নির্যাতন। ১৯৮০ সালে কাউখালিতে, ১৯৮৩ সালে বরকল, ১৯৮৬ সালে বগাতচর, মাটিরাঙা, রামগড়, পানছড়ি, দীঘিনালা, ১৯৮৮ সালে বাঘাইছড়ি এবং সর্বশেষে ১৯৮৯ সালের ৪ঠা মে লংগদুতে সাধারণ পাহাড়ী জনগণের উপর যে বর্বরোচিত গণহত্যা পরিচালিত হয় তা পরিচালনা করেছিল এই সেনাবাহিনীই। এ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন সেমিনারে বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীরা প্রতিবাদ করেছেন। এসবের বিরুদ্ধে বিভিন্ন জার্নালে লেখালেখিও হয়েছে। পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের সাম্প্রতিক প্রচারপত্রে লেখা রয়েছে, “১৯৯০ সালে ২১শে অক্টোবর রাঙামাটির ১৪ জন উপজাতীয় কিশোরী মন্দির থেকে ফিরবার সময় সেনাবাহিনীর হাতে গণধর্ষণের শিকার হয়।” অস্থায়ী সরকার এ ব্যাপারে কোন প্রতিবাদও করেননি। যদি পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর ভূমিকা এই হয়ে থাকে, সেই ভূমিকাকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি প্রশংসনীয় বলছেন কি করে? অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বরাবরই ‘নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে’ দেশে ‘গণতান্ত্রিক’ ব্যবস্থা কায়েমের কথা বলছেন। উগ্র বাঙালী জাতীয়তাবাদ দ্বারা নির্যাতিত পাহাড়ের ৫০ হাজার জনগণ আজ ভারতে শরণার্থী হতে বাধ্য হয়েছে। এই ৫০ হাজার ভোটারকে দেশের বাইরে রেখে গণতান্ত্রিক নির্বাচন সম্ভব কি? দেশের একটা অংশে সেনা শাসন চালু রেখে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হতে পারে? যে স্বৈরাচারী সরকারের পতনের প্রেক্ষিতে আপনারা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কথা বলছেন, সেই স্বৈরাচারের দালাল রাজাকার পার্বত্য জেলা পরিষদ বহাল রেখে যে ‘গণতন্ত্র’ আপনারা জাতিকে দিতে চান তা কি একই অবস্থার পুনরাবৃত্তি নয়?
পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ শেখ মুজিব সরকার ও জিয়া সরকারকে তাদের প্রচারপত্রের মাধ্যমে পাহাড়ের সমস্যা সমাধানে ‘উদ্যোগী’ ‘আন্তরিক’ এসব চাটুবাক্য ছেড়েছে।  অথচ, শেখ মুজিবের আমলেই সেখানে বাঙালী পুনর্বাসন শুরু হয়েছে। শেখ মুজিব বাঙালীত্বের দাম্ভিকতা নিয়ে ’৭১-পরবর্তীতে পার্বত্য চট্টগ্রামে গিয়ে বলেছিলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের সবাই বাঙালী। অন্যদিকে বিএনপি সরকারের আমলেই ১৯৮০ সালে কাউখালিতে গণহত্যা সংঘঠিত হয়। এসময়েই পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনা শাসন জোরদার হয়। একে পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের পাতি বুর্জোয়া উচ্ছ্বাস, ইতিহাসের বিকৃতি এবং তাদের নিপীড়িত পূর্বসূরীদের প্রতি অবিচার ছাড়া আর কি বলা যায়?
পাহাড়ের সংগ্রাম, আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের সংগ্রাম যা আজ পাতিবুর্জোয়া ও বুর্জোয়াদের নেতৃত্বে সম্ভব নয়। পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ এত চাটুবাক্য ছেড়েও দাবি মানাতে পারেনি। দাবি মানা এত সহজ নয়, যারা মানবে এবং যারা মানাতে বাধ্য করবে উভয়েরই শ্রেণী স্বার্থের প্রশ্ন এতে জড়িত। শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বে, মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদের ভিত্তিতে আন্দোলনকে পরিচালিত করলেই কেবল পাহাড়ী জাতিসত্তাসমূহ তাদের জাতীয় মুক্তি অর্জন করতে পারবে। এখন সময় এসেছে তাদের এতদিনের সংগ্রাম ও ব্যর্থতাকে সারসংকলন করার। আমরা দ্ব্যর্থহীনভাবে দাবি জানাই- পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজাকার জেলা পরিষদ বাতিল করা হোক।
পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বাঙালী সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করা হোক। বাঙালী পুনর্বাসন এই মুহূর্ত থেকে সম্পূর্ণ বন্ধ করা এবং পুনর্বাসিতদের ফেরত এনে সমতল ভূমিতে পুনর্বাসন করা হোক।  

সূত্রঃ পাহাড় ও সমতলে আদিবাসী জাতিসত্ত্বার সংগ্রাম সম্পর্কে নিবন্ধ সংকলন, আন্দোলন প্রকাশনা

Advertisements


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s