“মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লব” (GPCR)- মানবেতিহাসে গণবিপ্লবের সর্বোচ্চ চূড়া

নিপীড়িত জনগণ ও নিপীড়িত জাতিসমূহ নিজেদের মুক্তির জন্য কোনোমতেই সাম্রাজ্যবাদ ও তার পদলেহী কুকুরদের ”শুভবুদ্ধির” উপর ভরসা করে বসে থাকবেন না, কেবলমাত্র নিজেদের ঐক্যকে সুদৃঢ় ক’রে এবং অটলভাবে সংগ্রাম চালিয়েই তাঁরা বিজয় অর্জন করতে পারেন।
মাও সেতুঙ, আগষ্ট, ১৯৬৩

 

field_1492447i

“মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লব” (GPCR)- মানবেতিহাসে গণবিপ্লবের সর্বোচ্চ চূড়া

মানবেতিহাসে শ্রেণি-শোষণ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে অসংখ্য মহান মহান সব বিদ্রোহ হয়েছে। সংখ্যায় তত না হলেও গণ-বিপ্লবের সংখ্যাও কম নয়। অনেক বিপ্লব সফল হয়েছে। অনেকগুলো শাসকদের তরবারি ও গুলির আঘাতে রক্তস্রোতের মধ্য দিয়ে ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু এরকম বিপ্লব কখনো মানবজাতি দেখেনি। মহান মাও সেতুঙের নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক চীনে যেটি পরিচালিত হয়েছিল। সময়কালটি ছিল ১৯৬৬ সাল থেকে ১৯৭৬ সাল- তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত। দশ বছর ধরে চলা এ বিপ্লব “মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লব” (জিপিসিআর-GPCR) বা সংক্ষেপে “সাংস্কৃতিক বিপ্লব” নামে পরিচিত হলেও তা ছিল এক বিশাল ও মহান রাজনৈতিক বিপ্লব। এর অর্থ হলো, এর দ্বারা নিপীড়িত শ্রেণি, যে নিজেই তখন শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত, সে শাসনক্ষমতার একাংশে অধিষ্ঠিত নিপীড়ক প্রতিক্রিয়াশীল শ্রেণিকে উচ্ছেদ করে সেসব জায়গার ক্ষমতা দখল করে নিয়েছিল। বিস্ময়ের শেষ থাকে না যখন দেখা যায় যে, এ বিপ্লব করেছিল ক্ষমতাসীন একটি পার্টি সমাজতান্ত্রিক একটি দেশে সেই দেশের প্রধান নেতা মাও সেতুঙের নেতৃত্বে ক্ষমতাসীনদেরই একাংশের বিরুদ্ধে। যদিও বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদী ও প্রতিক্রিয়াশীলরা একে মাও সেতুঙের কুক্ষিগত ক্ষমতা রক্ষার একটি প্রাসাদ চক্রান্ত হিসেবে এর বিরুদ্ধে হাজারো মিথ্যা প্রচার চালিয়েছে, কিন্তু এটি যে কোটি কোটি মানুষের এক বিশাল উত্থান ছিল, এবং তা-যে অর্থনীতি ও রাজনীতিতে, বিশেষত শিক্ষা ও সংস্কৃতিগত ক্ষেত্রে সমাজ ও রাষ্ট্রে এক বিপুল পরিবর্তন ও রূপান্তর ঘটিয়েছিল তা তারা লুকাতে পারেনি। এটি হজম করতে বিশ্বের সকল রাজনীতিক ও রাষ্ট্রর-তো বটেই, কমিউনিস্ট ও সমাজতন্ত্রী বলে পরিচিত ও বিশ্বাসী প্রগতিশীল মানুষদের জন্যও কঠিন ছিল। তাদের সবার কাছেই তা ছিল অভূতপূর্ব ও অশ্রুতপূর্ব এক বিষয়। সমাজতান্ত্রিক এক দেশে, যা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এক দীর্ঘস্থায়ী ২২ বছরের গণযুদ্ধের ভেতর দিয়ে, এবং পরে আরো ১৭ বছর ধরে চলা সমাজতান্ত্রিক রূপান্তরের দ্বারা যার ভিত্তি হয়েছিল প্রতিষ্ঠিত, তেমন একটি দেশের ক্ষমতাসীন নেতাদের এক বড় অংশ গণ-বিপ্লবের শত্রু হিসেবে ধুলিসাৎ হলো। কোটি কোটি ছাত্র-তরুণ স্কুল-কলেজ ছেড়ে মাও-উদ্ধৃতি ও হাতে লেখা বড় অক্ষরের পোস্টার নিয়ে নেমে পড়লো রাস্তায়, ছড়িয়ে পড়লো কারখানা মফস্বল ও গ্রামাঞ্চলে। তাদের পিছু ধরেই নামলো বিপ্লবের আসল কারিগর শ্রমিক শ্রেণি ও কৃষক সমাজ- আরো বিপুল বৃহৎ সংখ্যায়। স্বয়ং মাও তাদেরকে রাজধানী বেজিং-এর তিয়েন আন মেন স্কোয়ারে সাক্ষাৎ দিলেন নিজে এই “রেড গার্ড” সংগঠনগুলোর প্রতীকী ব্যান্ড নিজ বাহুতে বেঁধে। প্রথমে ১০ লক্ষ, পরে ১ অক্টোবর বিপ্লব বার্ষিকীতে ২০ লক্ষ, এবং সবমিলিয়ে প্রায় ১ কোটি ৩০ লক্ষ তরুণ জীবনের চরম উত্তেজনায় ও অবিশ্বাস্য শৃঙ্খলায় তাঁকে প্রত্যক্ষ করলো ও তাঁর সামনে দিয়ে প্যারেড করে গেলো। তারা ঝঞ্ঝার মত সারা দেশের স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, কারখানা, নগর পরিচালনা সংস্থা, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে হানা দিয়ে ক্ষমতাসীন পার্টি-নেতা ও আমলাদেরকে গণআদালতের মুখোমুখি করলো। আর যাদেরকে মনে হলো পুরনো মূল্যবোধ, ধ্যান ধারণা, রীতি ও সংস্কৃতির ধারক তাদেরকে ক্ষমতাচ্যুত করলো। গঠন করলো নতুন ক্ষমতার সংস্থা “বিপ্লবী কমিটি”। তাদের নেতৃত্বে দেশের প্রতিটি সেক্টরে নতুন নতুন সব সমাজতান্ত্রিক ‘জিনিষ’-এর উদ্ভব ঘটলো। নতুন মূল্যবোধ গড়ে উঠতে লাগলো। মানুষের মধ্যে নতুন সম্পর্ক স্থাপিত হলো। এই হলো সাংস্কৃতিক বিপ্লব।
’৬৯-এ গিয়ে মাও ও তাঁর নেতৃত্বে নতুন চীনা পার্টি ঘোষণা করলো, প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো সমাজতান্ত্রিক চীনেও পুঁজিবাদ পুনঃপ্রতিষ্ঠার যে প্রক্রিয়া চলছিল তাকে নস্যাৎ করে দিয়ে বিপ্লব মহান বিজয় অর্জন করেছে। কিন্তু মাও জানালেন, এটাই শেষ নয়। যারা চীনকে পুঁজিবাদের দিকে নিয়ে যেতে চায় তারা শেষ হয়নি। কে জিতবে- সমাজতন্ত্র না পুুঁজিবাদ- তার চূড়ান্ত মীমাংসা হয়নি। তাই বিপ্লব অব্যাহতভাবে চালিয়ে যেতে হবে। সেটা বোঝা গেল দু’বছর না যেতেই। যে নেতাদের মনে হয়েছিল সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পক্ষে, তাদেরই একটি অংশ লিন পিয়াও-এর নেতৃত্বে বিপ্লব সমাপ্ত করে দেবার পরিকল্পনা করে। এই পরিকল্পনা যখন ব্যর্থ হয়ে যায় তখন তারা মাওকে হত্যা ও কুদ্যেতা’র মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের প্রচেষ্টা নেয়। এই ষড়যন্ত্রকে নস্যাৎ করার কর্মকান্ডে আবার বিপ্লবের প্রথম পর্বের ধিকৃত পুঁজিবাদের পথগামীরা জায়গায় জায়গায় পদে উঠে আসে। তাদের একাংশ ১৯৭৬ সালে তেং শিয়াও পিং-এর নেতৃত্বে মাথা জাগানো ও মাও-কে বিরোধিতার নতুন প্রয়াশ পায়। মাও পুনরায় এই “ডান বিচ্যুতিপন্থী হাওয়া”র বিরুদ্ধে লড়াই-এ পার্টিকে আহ্বান রাখলেন। দুর্ভাগ্য, এই লড়াই-এর কোন সমাপ্তির আগেই মাও বার্ধক্য-জনিত কারণে মারা যান। সেটা ১৯৭৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর।
পার্টির কেন্দ্রে মাওপন্থী নেতারা যখন ৬ অক্টোবর,’৭৬ কেন্দ্রীয় কমিটির সভার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন, তখনই অপ্রত্যাশিতভাবে ঐ ডানপন্থীরা হুয়া-কুয়ো ফেংকে সামনে রেখে একটি কুদ্যেতা ঘটায়। মাওপন্থী ও জিপিসিআর-পন্থীদের গ্রেফতার করে। সত্যিকার মাওপন্থীরা বিভ্রান্তিতে কিছুটা সিদ্ধান্তহীন থাকলেও বহু নগর ও শহরে বিদ্রোহ হয়, যাকে ক্ষমতাসীনরা রক্তাক্ত পথে দমন করে। হাজার হাজার মাওপন্থীকে গ্রেফতার ও গায়েব করে দেয়া হয়। নব্য ক্ষমতাসীনরা কিছুদিন নিজেদেরকে মাওপন্থী হিসেবে দেখানোর ভড়ং করে, আর নিজেদের ক্ষমতাকে সুসংহত করে। ১৯৭৮ থেকে তারা খোলস খুলতে থাকে। ১৯৮১ সালে মাও-পত্নী কমরেড চিয়াং চিং ও চ্যাং চুন চিয়াওসহ জিপিসিআর-এর মহান মাওবাদী বিপ্লবীদের বিচারের প্রহসন করে এই দু’জনকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে। বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বিশেষত কমরেড চিয়াং চিং মাও ও জিপিসিআর-এর জয়গান গাইলেও চীনের পথকে আর পরিবর্তন করতে পারেননি। সেই চীন আজ বিশ্বের অন্যতম প্রধান শ্রমিক শোষণের দেশ, সা¤্রাজ্যবাদের পুঁজির অন্যতম প্রধান বিনিয়োগকারী দেশ, এক নতুন সাম্রাজ্যবাদ অভিমুখী পুঁজিবাদী দেশ। দশ বছর ধরে চলা সাংস্কৃতিক বিপ্লব যদিও এভাবে পরাজয় বরণ করতে বাধ্য হয়, কিন্তু তার যে মহিমা তা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। সেই শিক্ষা নিয়ে বিশ্বের মাওবাদীরা পরে নিজেদেরকে নতুনভাবে সংগঠিত করে।
এই মহান বিপ্লবের তত্ত্ব ও কাহিনী, ঘটনা ও বিবরণ, সমাজে তার প্রবল আলোড়নমূলক প্রভাব ও রূপান্তর- সেসব অল্প কথায় বর্ণনা করা সম্ভব নয়। সেসবের উত্তরাধিকার বিশ্বের মাওবাদীরা এবং তাদের সবচেয়ে অগ্রসর সুসংহত আন্তর্জাতিক ফোরাম ‘রিম’ (বিপ্লবী আন্তর্জাতিকতাবাদী আন্দোলন) ও তার অংশগ্রহণকারী পার্টিগুলো। তারা বিগত বহু বছর যাবৎ অসংখ্য সাহিত্য ও দলিলাদির মাধ্যমে জিপিসিআর-এর তত্ত্ব ও কার্যক্রম, ইতিহাস ও অবদানকে প্রচার করেছে। বিশেষত অধুনা বিলুপ্ত রিম-এর আদর্শে অনুপ্রাণিত আন্তর্জাতিকতাবাদী পত্রিকা ‘এ ওয়ার্ল্ড টু উইন’(বিশ্ব বিজয়) তার বিভিন্ন সংখ্যায় বিভিন্ন নিবন্ধের মাধ্যমে সেসব প্রকাশ করেছে। কিন্তু মাওবাদী কমিউনিস্টরাই যে শুধু সাংস্কৃতিক বিপ্লবের কাহিনী ছড়িয়ে দিয়েছে তা নয়। সাংস্কতিক বিপ্লব সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায়, অর্থনীতি ও নিপীড়িত জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায়, সংস্কৃতি ও শিক্ষায়, চিকিৎসা প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এতসব অভূতপূর্ব রূপান্তর নিয়ে আসে যা পৃথিবীতে কেউ কখনো চিন্তা করেনি। ফলে মাওবাদীরা ছাড়াও বিশ্বের বহু কোণা থেকে অসংখ্য আগ্রহী সত্যাসন্ধানী অগ্রসর মানুষ, পণ্ডিত জ্ঞানী লেখক চিন্তাবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীরা জিপিসিআর-এর উপর অসংখ্য পুস্তক ও নিবন্ধ রচনা করেছেন। একইসাথে জিপিসিআর-এর অপব্যাখ্যা ও অপপ্রচার চালিয়ে লিখিত ও প্রচারিত মিডিয়া বিষয়াদি ও পুস্তকাদির সংখ্যা আরো বেশি।
চীনের সাচ্চা সমাজতন্ত্র ও মাও-পরবর্তীতে তার পুঁজিবাদে অধঃপতনকে বুঝতে হলে জিপিসিআর-কে জানা ও বোঝার কোন বিকল্প নেই। বহু আন্তরিক বিপ্লবী-যে চীনের অধঃপতনের পর চীনের পুঁজিবাদের পথগামীদের দোসর হয়ে গেল, অথবা তাদের মিথ্যা ও ব্যাখ্যা দ্বারা নিজেদের বিভ্রান্ত হতে দিল, তার কারণ এখানেই নিহিত। কেন তারা মাও-পরবর্তী চীনকে সমাজতন্ত্র বলেই গান গেয়ে চললো? কারণ, তারা সোভিয়েতের অধঃপতন থেকে শিক্ষা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। আরেকটি বিরাট অংশ এই শিক্ষা নিতে ব্যর্থ হলো নিজেদের মাওপন্থী দাবি করেও জিপিসিআর ‘অনেক বাড়াবাড়ি করেছে’- এই যুক্তি দেখিয়ে। পৃথিবীর এমন কোন বিপ্লব কি রয়েছে যেখানে ‘বাড়াবাড়ি’ হয়নি? মাও ‘বাড়াবাড়ি’ সম্পর্কে তার “হুনান রিপোর্ট”-এ বলেছিলেন, যাকে সবারই পড়া উচিত। মাও আরো বলেছিলেন সীমা অতিক্রম না করলে কোন ভুলকে কাটানো যায় না। জিপিসিআর-যে যথেষ্ট পরিমাণে বাড়াবাড়ি করেনি তার প্রমাণ তো আমরা চীনের বিয়োগান্তক হারানোর মধ্য দিয়েই পেয়েছি।
সোজা হিসেব দেখিয়ে দেয় যে, জিপিসিআর চলাকালে চীন ছিল মাও-এর নেতৃত্বে এক মহান সমাজতান্ত্রিক দেশ। শুধু তাই নয়, জিপিসিআর এই প্রথম মার্কসবাদের তত্ত্ব ভা-ারে সংযোজন করেছে সেই তত্ত্ব যা দ্বারা সমাজতান্ত্রিক সমাজে কীভাবে বিপ্লব অব্যাহত রাখা যাবে। কীভাবে তাকে পুঁজিবাদী পথগামীদের হাত থেকে রক্ষা করা যাবে। কীভাবে তাকে বিশ্ব বিপ্লবের ঘাঁটি হিসেবে রক্ষা করে বিশ্বব্যাপী কমিউনিজম প্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়ে নেয়া যাবে। এই তত্ত্ব সংযোজনের মাধ্যমেই মাও কমিউনিস্ট মতবাদকে তার তৃতীয় স্তরে উত্তরণ ঘটান। যাকে আমরা মাওবাদ বলে থাকি, আর আমাদের সমগ্র মতবাদটিকে আখ্যায়িত করি মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদ (মালেমা) হিসেবে। ষাট-সত্তর দশকের বহু বিপ্লবী-যে পরে সত্যিকার কমিউনিস্ট বিপ্লব ও তত্ত্বে থাকতে পারেনি তার কারণ মাওবাদে আমাদের মতবাদের বিকাশটিকে ধারণ না করা। জিপিসিআর যে মতবাদিক বিকাশের ভারকেন্দ্র। আমাদের দেশেও আমরা এমন বহু লোক পাবো, বহু পণ্ডিত পাবো, যারা জিপিসিআর ও মাওবাদকে জানা ও বোঝার চেষ্টা করেনি, তাকে অধ্যয়ন করেনি, বা তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক শত্রুর প্রচারে বিভ্রান্ত থেকেছে।
এটা হলো তত্ত্বের দিক। কিন্তু জিপিসিআর-এর ঘটনার ইতিহাস ও সমাজের রূপান্তরকে আরো কিছুটা তুলে ধরা যায় যখন আমরা এই মহান বিপ্লব সূচনার ৫০-তম বার্ষিকী উদযাপন করছি। শুধু আমরাই নই, সারা বিশ্বের মাওবাদী ও প্রকৃত সমাজতন্ত্রী বিপ্লবীরাই সেটা করছেন। তা করছেন এই তত্ত্ব দ্বারা নিজেদের সজ্জিত করার জন্য। যাতে আগামী বিপ্লবগুলোকে আমরা এই সবচেয়ে অগ্রসর বিপ্লবী চেতনা ও মতবাদ দ্বারা পরিচালিত করতে পারি। এছাড়া জিপিসিআর তর্পণের আর কোন উদ্দেশ্য থাকতে পারে না। বিপ্লবের পাথেয় খোঁজা ছাড়া বিপ্লবের স্মৃতিচারণ অর্থহীন।

* মাও কেন জিপিসিআর পরিচালনা করতে উদ্বুদ্ধ হলেন? কারণটি মাও-এর নিজ বক্তব্য থেকেই জানা যাক। তিনি এর আগে চীনা পার্টির বিভিন্ন স্তরের নেতৃত্বে জেঁকে বসা পুঁজিবাদী বিচ্যুতির বিরুদ্ধে সংগ্রামে বিভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করেছিলেন। যেমন, শিক্ষা আন্দোলন, শুদ্ধি আন্দোলন, পদচ্যুত করা ইত্যাদি। বড় পদচ্যুতির ঘটনাটি ঘটেছিল সামরিক বাহিনীর প্রধান পেং তে-হুয়াই-এর বিরুদ্ধে ১৯৫৯ সালে। পেং “গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড” নামে গণকমিউন প্রতিষ্ঠার কর্মসূচিকে বিরোধিতা করেছিলেন এবং তার মাধ্যমে চীনে সমাজতন্ত্রকে এগিয়ে নেয়ার বিরোধিতা করেছিলেন। আসলে তখনো বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলন পুরোপুরিভাবে জানতো না যে কীভাবে সমাজতন্ত্র পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে অধঃপতিত হয়। কিন্তু ১৯৫৬ সালে ক্রশ্চেভীয় সংশোধনবাদের দ্বারা সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েতে পুঁজিবাদ প্রতিষ্ঠার পর তার কারণ কী তা নিয়ে মাও সেতুঙ গভীরভাবে গবেষণা করতে শুরু করেন। পার্টিতে বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ গৃহীত হয়। এমনকি ’৬০-দশকের প্রথমার্ধে চীনা পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি কর্তৃক “ওয়ার্ক টিম” গঠন করে শুদ্ধি ও শিক্ষা আন্দোলন চালাতে গিয়েও দেখা গেল তারও নেতৃত্বে পুঁজিবাদের পথগামীরা ঢুকে পড়েছে। এর ফল হলো মারাত্মক বিপরীত। যেখানে প্রয়োজন ছিল পুঁজিবাদের পথগামীদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, সেখানে দেখা গেল তাদের পক্ষ হয়ে পার্টির বামপন্থী ও জনগণের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চলছে। এর কারণ হলো, যারা সেই শিক্ষা ও শুদ্ধি আন্দোলন করবেন সেই সব কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যেই পুঁজিবাদী চেতনা গেড়ে বসেছিল। এরই সারসংকলন করে মাও জিপিসিআর-এর ডাক দিলেন, যার মূল উপায় ছিল নিচে থেকে লক্ষ-কোটি তরুণ ও জনগণকে জাগরিত করা, সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তাদেরকে শিক্ষিত করা, তাদের এই উত্থানকে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে মদদ দেয়া এবং এই গণ-উত্থানের দ্বারা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত পুঁজিবাদের পথগামী কর্তৃস্থানীয় ব্যক্তিদের ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদ করা। সর্বোপরি সমাজের সর্বস্তরে চিন্তার রূপান্তর ঘটানো। আর এসবের মধ্য দিয়ে অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতির সকল ক্ষেত্রে “সমাজতান্ত্রিক নতুন জিনিষ”-এর সৃষ্টি করা।
সোভিয়েত ইউনিয়নে পুঁজিবাদ পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর চীনের পুঁজিবাদের পথগামীরা এতটাই বেপরোয়া হয়ে গিয়েছিল যে, পিকিং-এর একজন ডেপুটি মেয়র উ-হান “হাই জুই-এর পদচ্যুতি” নামের এক নাটকে পেং তে-হুয়াই-এর সাফাই গায়। প্রয়োজন পড়লো তার কঠোর সমালোচনা করা। কিন্তু মাও কাউকে নিজ পক্ষে পেলেন না। অবশেষে মাও-পতœী চিয়াং চিং-এর গাইডেন্সে তরুণ নেতা ইয়াও ওয়েন ইউয়ান একটি সমালোচনা পত্র লিখলেন। এটি রচনার মধ্য দিয়ে মাও তার অনুসারী এই তরুণ নেতৃবৃন্দকে বিপ্লবী রাজনীতিতে শিক্ষিত করেও তুলতে চাইলেন। কথিত আছে রচনাটি প্রায় ১১ বার সংশোধন করা হয়েছিল স্বয়ং মাও-এর পরামর্শে। কিন্তু এটি পিকিং-এ কোথাও প্রকাশ করা গেল না। কারণ, খোদ পিকিং মেয়র পেন চেন তাতে বাধ সাধলো, যাকে মদদ দিচ্ছিল লিউ শাও চি ও তেং শিয়াও পিং-এর মতো শীর্ষ নেতারা। অবশেষে লেখাটি নভেম্বর, ’৬৫-এ সাংহাই থেকে প্রকাশিত হলো। রচনাটি প্রকাশ হতেই শীর্ষ পুঁজিবাদের পথগামীরা সতর্ক হয়ে গেলো। মাও নিজে প্রতি-আক্রমণে গেলেন। কেন্দ্রীয় কমিটিতে যখন বিষয়টি নিয়ে আলোচনা তুললেন তখন তিনি প্রথমে সংখ্যালঘু ছিলেন। মাও-এর সংগ্রামের পর তিনি সংখ্যাগুরু হলেন এবং কেন্দ্রীয় কমিটি ১৬ মে সার্কুলার নামের দলিলটি প্রকাশ করলো। মাও যাকে বলেছিলেন সাংস্কৃতিক বিপ্লবের “ইঙ্গিত”।
কেন্দ্রীয় কমিটি এটি পাশ করলেও উচ্চ পদগুলোতে তখনো ডানপন্থীরা বহাল ছিল। মাও জুন ও জুলাই মাসের প্রায় ৫০ দিন পিকিং থেকে সরে থাকলেন। ডানপন্থীরা গুজব রটালো মাও অসুস্থ, শিগগির মারা যাবেন। সা¤্রাজ্যবাদীরা তাতে মদদ দিলো। চীন সীমান্তে সা¤্রাজ্যবাদীদের শক্তির মহড়া চললো। এই সময়েই ২৫ জুলাই ইয়াংসী নদীতে স্রোতের বিপরীতে মাওকে সেই ৭৩ বছর বয়সে কয়েক কিলোমিটার সাঁতার কাটতে দেখা গেল, এবং সেই ছবি সারা দুনিয়ায় প্রচারিত হলো। ডানপন্থীরা এবার সত্যিই ভয় পেয়ে গেলো। আগস্টে মাও রাজধানীতে ফিরেই কেন্দ্রীয় কমিটির সভা ডাকলেন। সেখানে তিনি ৫ আগষ্ট প্রকাশ করলেন যে, “হেডকোয়ার্টারে তোপ দাগো” লিখিত বড় হরফের পোস্টারটি তার নিজেরই লেখা ছিল।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ১৬ মে সার্কুলারের পরই তাতে উদ্বুদ্ধ হয়ে পিকিং-এ সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ঢেউ শুরু হয়ে যায়। প্রথমে পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ছাত্র ও কর্মচারী সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বড় হরফের পোস্টার সাঁটায়। তাদেরকে দমনের জন্য অপচেষ্টা হলেও দ্রুত এই বড় হরফের পোস্টার আন্দোলন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এমন কোন জায়গা ছিল না যেখানে সেই পোস্টার পড়েনি। “হেড কোয়ার্টারে তোপ দাগো” পোস্টারের পর লিউ শাওচি ও তেংশিয়াওসহ বড় বড় নেতাদের নাম ধরে ছাত্ররা পোস্টার সাঁটাতে লাগলো। দলে দলে তরুণদের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সংগঠন ‘রেড গার্ড’ (লাল রক্ষী) গড়ে উঠলো।
৮ আগস্ট কেন্দ্রীয় কমিটি ১৬-দফা সার্কলার প্রকাশ করে, যা ছিল সাংস্কৃতিক বিপ্লবের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি ও গাইড। ইতিমধ্যে কেন্দ্রীয় কমিটিতে মাও-এর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হয়েছে। কিন্তু এবার ডানপন্থীরা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পক্ষের শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়ে তাতে নৈরাজ্য সৃষ্টি এবং সত্যিকার বামপন্থীদেরকে টার্গেট করার অপচেষ্টা করলো। সাংহাই-এ তারা ক্ষমতার বেশ কিছু জায়গায় শক্ত কর্তৃত্ব স্থাপন করলো। মাও চ্যাং চুন চিয়াও-কে পিকিং থেকে সাংহাই পাঠালেন পরিস্থিতি বিপ্লবীদের অনুকূলে আনার জন্য। সেখানকার শ্রমিক নেতা ওয়াং হুং ওয়েনের সহযোগিতায় শ্রমিক উত্থানের মধ্য দিয়ে সাংহাই-এর ক্ষমতার সংস্থাগুলো দখলে নেয়া হলো জানুয়ারি, ’৬৭-এ। যাকে “জানুয়ারি ঝড়” বলা হয়ে থাকে।
সাংস্কৃতিক বিপ্লব ছড়িয়ে পড়লো নগর থেকে গ্রামাঞ্চলে। সর্বত্র এক বিপুল উত্থান ও রূপান্তরের জোয়ার বইতে লাগলো। যাকে সুসংহত করা হয় ’৬৯ সালের ৯ম পার্টি কংগ্রেসে।

* সাংস্কৃতিক বিপ্লব যে পরিবর্তনগুলো এনেছিল সমাজের সকল ক্ষেত্রে, সেসব বিস্তৃতভাবে জানার উপায় হলো বিদেশী বিশেষজ্ঞ, যারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবকে কাছে থেকে দেখেছেন, এর উপর গবেষণা করেছেন, এবং যারা বেশির ভাগই কমিউনিস্ট নন, তাদের রচিত গুরুত্বপূর্ণ পুস্তক ও লেখা থেকে। এখানে শুধু সংক্ষেপে অল্প কিছু দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হলো।
শিক্ষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে হাজার বছরের চেতনা ও ধারাকে উল্টে ফেলা হয়। “চার পুরনো”Ñ পুরনো রীতি, অভ্যাস, সংস্কৃতি ও ধ্যান-ধারণার বিরুদ্ধে সংগ্রাম গড়ে তোলা হলো। লিন বিরোধী সংগ্রামের সময় হাজার বছরের কনফুসিয় ধ্যান-ধারণার বিরুদ্ধে তীব্র সংগ্রাম চালানো শুরু হয়। পুরনো সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় সম্পর্কে মাও বলেছিলেন, সেটার নাম দেয়া উচিত জমিদার, স¤্রাট, সেনাপতি, সৌন্দর্য মন্ত্রণালয়। এখন তাদেরকে উচ্ছেদ করে মঞ্চ দখল করলো শ্রমিক কৃষকের বীরত্ব কাহিনী ও বীরেরা।
শিক্ষা ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটানো হয় শিক্ষা বর্ষকে সংক্ষিপ্ত করা, উচ্চশিক্ষায় ভর্তির নিয়ম বদলে শ্রমিক-কৃষকের সাথে একাত্মতাকে প্রধান মানদন্ড করে। পুস্তকের শিক্ষাকে উৎপাদন সংগ্রাম ও শ্রেণি সংগ্রামের সাথে সংযুক্ত করা হলো। বিশ্ব বিদ্যালয় গুলোর পরিচালনায় যুক্ত হলেন বিপ্লবী শ্রমিক ও সৈনিকেরা।
শিল্প ও কৃষির ব্যবস্থাপনায় বুর্জোয়া ব্যক্তি-পরিচালনার বদলে শ্রমিক ও কৃষকদেরকে ব্যবস্থাপনায় যুক্ত করা হয়। শ্রমিক/কৃষক, টেকনিশিয়ান ও অফিসার- এই তিনের সমন্বয়ে “একের ভিতরে তিন” পদ্ধতির বিকাশ করা হয়।
ক্ষমতার সংস্থা হিসেবে “বিপ্লবী কমিটি”র বিকাশ ঘটানো হয়। যাতে পার্টি, বাহিনী ও গণসংগঠন- এই তিনের প্রতিনিধি থাকবে এবং এখানেও “একের ভিতর তিন” পদ্ধতির বিকাশ সাধন করা হয়। জনগণের “চার বড় অধিকার” নিশ্চিত করা হয়- বড় হরফের পোস্টার সাঁটানো, বিরাটাকারের সমালোচনা করা, ব্যাপক বিতর্ক করা ও ব্যাপক স্বাধীনতা। এই বৃহৎ চার অধিকার এবং বিপ্লবী কমিটির ক্ষমতার সংস্থায় জনগণের অংশগ্রহণ যেকোন বুর্জোয়া গণতন্ত্রের চেয়ে যে বহু বহু গুণের উন্নত গণতান্ত্রিক অধিকার জনগণকে দিয়েছিল তা বলাই বাহুল্য। আর এ কারণেই তেং চক্র ক্ষমতায় গিয়ে প্রথমেই তা হরণ করে নেয়।
মার্কস বলেছিলেন, পুঁজিবাদ থেকে কমিউনিজমে উত্তরণ হতে হলে পুঁজিবাদের ৪ ধরনের সম্পর্কের সকলগুলোর রূপান্তর প্রয়োজন। এগুলোকে “৪ সকল” বলা হয়ে থাকে। সেগুলো হলো- (১) সাধারণভাবে সকল শ্রেণি পার্থক্য বিলোপ; (২) যে উৎপাদন সম্পর্কগুলোর উপর এগুলো দাঁড়িয়ে রয়েছে সে সকল-এর বিলোপ; (৩) এই উৎপাদন সম্পর্কসমূহের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ সকল সামাজিক সম্পর্কের বিলোপ; এবং (৪) এই সামাজিক সম্পর্কসমূহ থেকে জন্ম নেয়া সকল ধারণাসমূহের বিপ্লবীকরণ। সাংস্কৃতিক বিপ্লব ছিল এই মার্কসীয় নির্দেশ প্রয়োগের এক জীবন্ত উদাহরণ।

আজ যখন আমরা জিপিসিআর-এর ৫০-তম বার্ষিকী উদযাপন করছি তখন আমাদেরকে আজকের বিশ্ব পরিস্থিতিতে তুলে ধরতে হবে মানবজাতির এক নতুন সমাজ-গঠনে এই বিস্ময়কর অগ্রগতি ও পরীক্ষা-গবেষণার সাহসী যুগান্তকারী অধ্যায়কে। আজকে সেই অগ্রসর দৃষ্টান্ত তুলে ধরার মধ্য দিয়েই আজকের অন্ধকারকে সংগ্রাম করতে হবে। সমাজতন্ত্র-কমিউনিজমের সবচেয়ে অগ্রসর তত্ত্ব ও চেতনা দ্বারা আমাদের সজ্জিত হতে হবে। যাতে আগামী দিনের বিপ্লবে নতুন প্রজন্মকে পথ দেখানো যায়। বিশ্বের সেই উজ্জল ভবিষ্যতের পথেই আমাদেরকে চলতে হবে।

Advertisements


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s