ফিদেল ক্যাস্ট্রোর উপর একটি মূল্যায়ন- বিপ্লবী শ্রমিক এবং বিপ্লবী ছাত্র-যুব আন্দোলন

fidel-castro-ruz

কিউবার একনায়ক ফিদেল ক্যাস্ট্রো ও তাঁর রাজনীতিঃ

কিউবা প্রজাতন্ত্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট এবং কিউবা বিপ্লবের মহানায়ক হিসেবে পরিচিত ফিদেল ক্যাস্ট্রো গত ২৬ নভেম্বর শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেছেন। বিশ্বজুড়েই ক্যাস্ত্রো ছিলেন জনপ্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। ল্যাটিন আমেরিকার বিশাল দ্বীপদেশ কিউবার এই মানুষটির জনপ্রিয়তার মূল কারণ হচ্ছে সারা দুনিয়ার পয়লা নম্বরের শত্রু মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী অবস্থান, সমাজতন্ত্রের প্রতিশ্রুতি ও সশস্ত্র সংগ্রাম। বিপ্লবপূর্ব কিউবা ছিল সাম্রাজ্যবাদী সামন্তবাদী শাসন-শোষণ-লুন্ঠনের এক অভায়ারণ্য। মার্কিন মদদপুষ্ট সামরিক জান্তা বাতিস্তার প্রতি জনরোষ ছিল তীব্র। এশিয়া-আফ্রিকা-ল্যাটিন আমেরিকার অন্যান্য রাষ্ট্রের মত কিউবার জনগণের মধ্যে ছিল জাতীয় মুক্তি ও সাম্রাজ্যবাদ-সামন্তবাদ বিরোধী চেতনা এবং সমাজতন্ত্রের প্রতি গভীর আগ্রহ। এ পরিস্থিতিতে মার্কিন পদলেহী বাতিস্তার স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ক্যাস্ট্রোর অনমনীয় লড়াকু সংগ্রাম তাকে জাতীয় বীর হিসেবে কিউবান জনমনে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। নিঃস্বার্থ, নির্লোভ, সৎ মনোভাবাপন্ন ক্যাস্ট্রোর শাসনামলে নানাবিধ গণমুখী সংস্কারমূলক পদক্ষেপের কারণে অন্য বুর্জোয়া রাষ্ট্রগুলো থেকে কিউবাকে স্বতন্ত্রতা দিয়েছিল। আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্ব ও বিশ্বরাজনীতির নানা পট পরিবর্তনের ফলে মার্কিনের নাকের ডগায় থেকেও মার্কিন বিরোধী ক্যাস্ট্রো একটানা ৫০ বছর কিউবার নেতৃত্ব দিতে পেরেছিলেন।

৯০ বছর বয়সী ক্যাস্ট্রোর মৃত্যুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাদে বিশ্বের প্রায় সকল রাষ্ট্রনায়ক, রাজনৈতিক ও খ্যাতনামা ব্যক্তিবর্গ শোক প্রকাশ করেছেন। বুর্জোয়া বিশ্ব মিডিয়াও বেশ গুরুত্ব সহকারে তাঁর রাজনৈতিক জীবন ও তাঁর জীবননাশে মার্কিনের ষড়যন্ত্র-চক্রন্তের কথা কোন রাখঢাক ছাড়াই জোরেশোরে প্রচার করছে। ব্যক্তি ফিদেলকে নায়ক বানাতে তারাও উঠেপড়ে লেগেছে, যেন ইতিহাসের নায়ক জনগণ নয় ব্যক্তি। কিউবানদের কাছে ক্যাস্ট্রোর এ জনপ্রিয়তা গড়ে ওঠে মূলতঃ ১৯৫৯ সালে এক অভ্যুত্থানে মার্কিনীদের আস্থাভাজন দূর্নীতিপরায়ন বাতিস্তা সরকারের পতন ঘটানোর মধ্য দিয়ে। ক্ষমতা দখলের পর ফিদেল যুক্তরাষ্ট্র সফরে গেলেও তাঁর জাতীয়তাবাদী ভাবমানসের কারণে তিনি মার্কিন সরকারের আস্থাভাজন হতে ব্যর্থ হন। এরই মধ্যে ’৬০-এর দশকে সমাজতান্ত্রিক রাশিয়া খোলামেলাভাবে সমাজতন্ত্রের খোলসে পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী হিসেবে বিশ্ব রাজনৈতিক মঞ্চে হাজির হয়। মার্কিনের সাথে সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের দ্বন্দ্ব প্রকট আকার ধারন করে। মার্কিনকে রুখতে ক্যাস্ট্রো সেই সময় সমাজতন্ত্রের প্রতি বিশ্বাসঘাতক সংশোধনবাদী ক্রুশ্চেভ চক্রের সাথে হাত মেলায়।
গত পাঁচ দশকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী অবস্থান এবং কিউবাতে বিশেষতঃ কৃষি, শিক্ষা ও চিকিৎসা খাতে বেশকিছু সংস্কারমূলক পদক্ষেপ তাকে বেশ জনপ্রিয় করে তোলে। তাছাড়া স্নায়ু যুদ্ধকালে মার্কিনীদের হাজারো আস্ফালন, পারমাণবিক বোমার ভীতি, অর্থনৈতিক অবরোধ সত্ত্বেও ক্যাস্ট্রোর লৌহদৃঢ় মনোভাব তাকে একজন জাতীয় বীর হিসেবেই বিশ্ব রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠা করেছে। কিন্তু মার্কিন বিরোধী ছিলেন বলেই তাঁকে সামগ্রিকভাবে সাম্রাজ্যবাদী বিরোধী মূল্যায়ন করা যায় না, কমিউনিস্ট তো আরও পরের কথা। কার্যতঃ মাও মৃত্যু পরবর্তী চীন পুঁজিবাদী লাইন গ্রহন করার মধ্য দিয়ে আজকের পৃথিবীতে আর কোথাও কোন সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অস্তিত্ব নেই। বুর্জোয়াদের তৈরি রাষ্ট্রে ব্যক্তিমালিকানা টিকিয়ে রেখে কিছু সংস্কার বা উন্নয়ন মূলক কার্যকলাপকে আধুনিক জামানার ক্রুশ্চেভ-ব্রেজনেভদের উত্তরসূরীরা সমাজতন্ত্র বলে চালাতে চায়। কার্যতঃ কিউবা কমিউনিস্ট পার্টির ছদ্মাবরনে সমাজতন্ত্রের নামে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এক পুঁজিবাদী রাষ্ট্র। এক সময়ের রুশ সাম্রাজ্যবাদের ফেরিওয়ালা সংসদীয় গণতন্ত্রী বামরা আজ ক্যাস্ট্রোকেও মহান কমিউনিস্ট হিসেবে মূল্যায়ন করে। এসব সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটদের কাছে শেখ মুজিবও সমাজতন্ত্রী ছিল। ক্যাস্ট্রোও এই রাজনৈতিক চেতনা থেকে মুক্ত ছিলেন না। আর তাই বাংলাদেশ সৃষ্টির পর শেখ মুজিবের সাথে সাক্ষাতকালে ক্যাস্ট্রো শেখ মুজিবকে হিমালয়ের সাথে তুলনা করেছিলেন। যখন কিনা শেখ মুজিব তার নিজ দেশে হাজার হাজার কমিউনিস্ট বিপ্লবী, বামপন্থী, প্রগতিশীল শক্তি নিধনে বর্বরোচিত এক হোলি খেলায় মেতেছিল। এসব সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটরা সংশোধনবাদের ভিতরেই বিপ্লব খুঁজে পায় আর প্রকৃত বিপ্লবকে তারা হঠকারী বলে বিষেদগার করে। গত শতাব্দীর মাঝামাঝি কিউবা বিপ্লবকালীন সময়ে বিশ্ব রাজনীতিতে সমাজতন্ত্রের সাথে সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার দ্বন্দ্বটি ছিল একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব। ৬০-এর দশকে সেই সময়েই সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের মধ্যে তীব্র মতাদর্শিক সংগ্রাম অর্থাৎ সংশোধনবাদ বিরোধী সংগ্রাম বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনকে বিভক্ত করেছিল। সমাজতন্ত্রের পিতৃভূমি বলে পরিচিত লেনিন-স্ট্যালিনের রাশিয়া ক্রুশ্চেভ-ব্রেজনেভ চক্র সামাজিক সাম্রাজ্যবাদী রাশিয়ায় (সোভিয়েত ইউনিয়ন) পরিণত করেছিল। কমিউনিস্ট হিসেবে দাবীদার যে কেউ আন্তর্জাতিক এ মহাবিতর্ককে এড়িয়ে যেতে পারেনা। এ প্রশ্নে সঠিক অবস্থানের উপরই নির্ভর করে কে কমিউনিস্ট আর কে নয়। কমিউনিস্ট আন্দোলনে ব্যক্তিগত সততা, ত্যাগ, আপোষহীনতা, লড়াকু মনোভাবের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও সেটাই সব নয়, মূলগতভাবে নির্ভর করে মতাদর্শগত রাজনৈতিক লাইনের সঠিকতা বেঠিকতর উপর। সমাজ বিপ্লবের অগ্রসর বিজ্ঞানকে অস্বীকার করে কার্যত: কমিউনিস্ট বিপ্লবী থাকা যায় না। পুঁজিবাদীযুগে মার্কসবাদকে অস্বীকার করে যেমন সমাজতন্ত্রী থাকা যায় না, সাম্রাজ্যবাদের যুগে লেনিনবাদকে না মানার অর্থ হল মার্কসবাদকেই খারিজ করা। তেমনি বর্তমানে মার্কসবাদের সর্বোচ্চ বিকাশ মাওবাদকে (মা. লে. মা) স্বীকৃতি না দিলে বা অনুশীলন না করলে কমিউনিস্ট বিপ্লবী হওয়া যায় না। মতাদর্শের এই উপলব্ধির দুর্বলতাই অনেক আন্তরিক বিপ্লবীদেরকে দিকভ্রান্ত করে। সর্বহারা শ্রেণির মহান শিক্ষাগুরু মার্কস-লেনিন-মাও বিপ্লবী আন্দোলনে মতাদর্শ-লাইনগত দিককে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন। কমিউনিজমের এই বিজ্ঞানের আলোকে ইতিহাস, সময় ও ব্যক্তির মূল্যায়ন করতে হবে। ইতিহাসের নির্মোহ বিশ্লেষনের উপরই আগামী দিনের কমিউনিস্ট আন্দোলনের গতি-প্রকৃতি নির্ভর করে। অন্যথায় বিপ্লব ও সংস্কারবাদকে গুলিয়ে ফেলা হবে। ক্যাস্ট্রো সমাজতন্ত্রের নামে পার্টি ও রাষ্ট্র পরিচালনায় একনায়কত্ব প্রয়োগ করলেও তিনি সমাজতন্ত্র-কমিউনিজমের বিজ্ঞান দ্বারা কখনো পরিচালিত হননি।

সূত্রঃ  https://www.facebook.com/permalink.php?story_fbid=1815053465402099&id=1688800484694065Top of Form

Advertisements


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s