ফিদেল কাস্ট্রো : ভিন্ন চোখে

15400380_837714353037145_3353009999371613430_n

আলমগীর রহমান

কিউবার রাষ্ট্রীয় প্রচার মাধ্যমে ফিদেল কাস্ট্রোর মৃত্যু সংবাদ প্রচারিত হওয়ার সাথে সাথে বিশ্ববাসী নিশ্চিত হয়ে গেল এবার আর কোন গুজব নয়। সত্যিই ফিদেল চির বিদায় নিয়েছেন তাঁর প্রিয় স্বদেশভূমি থেকে। তার স্বদেশবাসী সত্যি সত্যিই হারালো তাদের প্রিয় নেতাকে। এমন একজন মানুষের মৃত্যুতে পৃথিবী দেখলো এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। একদিকে স্বজন-সাথী-নেতা হারানোর ব্যথায় ব্যথিত ক্রন্দনরত দেশবাসী। অন্যদিকে ফিদেলের কারণে দেশান্তরিত কিউবানরা তাঁর মৃত্যুসংবাদ নিশ্চিত হওয়ার সাথে সাথে নেচে গেয়ে উল্লাস করতে থাকে। সে এক বন্য উন্মত্ততা। মানুষের মৃত্যুতে মানুষ উল্লসিত হতে পারে, নাচ-গান করতে পারে আর সে মানুষটি যদি হয় ফিদেল কাস্ট্রোর মতো একজন। এ এক অকল্পনীয় বিষয়। এমনই অকল্পনীয়, অভাবনীয় মিশ্র অনুভুতির প্রকাশ ঘটলো কিউবার এক সময়ের অবিসংবাদিত নেতা ফিদেল কাস্ট্রোর মৃত্যুতে। কিউবার একশ্রেণির মানুষ তার মৃত্যুতে উল্লাস করায় হয়ত অবিসংবাদিত কথাটা প্রয়োগ করা যথাযথ নয় বলে মনে হতে পারে। কিন্তু তিনি যে ছিলেন কিউবার অধিকাংশ মানুষের নেতা। যারা উল্লাস করছে তারা শেকড়হীন, উন্মূল। সংখ্যালঘুর দল। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের মদদে বিক্রি হয়ে যাওয়া একটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশ। তাই এই শব্দটি প্রয়োগ। অবিসংবাদিত। এই একটি শব্দের দ্বারা তার প্রভাব কতটা বিস্তৃত ছিল সেটা বোঝানো সম্ভব।

আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী ডামাডোলের আওয়াজ শেষ হতে না হতেই প্রচারযন্ত্রীদের প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ফিদেল কাষ্ট্রোর চিরপ্রয়াণের সংবাদ । আর হবেই বা না কেন? এখন যে প্রচারমাধ্যম কাজ করছে তাদের কাছে জনগণ নয়, ব্যক্তিই ইতিহাস স্রষ্টা। এরা জনগণের শক্তিকে আড়াল করে দেখাতে চায় ব্যক্তি ফিদেল কাস্ট্রোই কিউবার মুক্তিদাতা। তিনিই আজকের দুনিয়ায় আমেরিকার একেবারে কোলের ভিতর থেকে আমেরিকার চোখরাঙানিকে উপেক্ষা করে প্রায় অর্ধ শতাব্দী ধরে কিউবার নেতৃত্ব দিয়ে গেলেন। প্রধানমন্ত্রী, প্রেসিডেন্ট হয়ে নতুন কিউবাকে পরিচালনা করলেন। সেই ফিদেল কাস্ট্রোর চিরবিদায় বিশ্বপ্রচারযন্ত্রের আকর্ষণীয় বিষয় হবে তাতে অবাক হবার কিছু নেই। এখন সংবাদ তো শুধু সংবাদ নয়, পণ্য হিসাবেও বিবেচিত হয়ে থাকে। প্রচার বেনিয়ারা তাই তাদের মুনাফার পরিমাণ পরিমাপ করে সংবাদের মূল্য (News value) নিরূপণ করে সংবাদ বেচাকেনায় সে কতোটা লাভবান হবে তার ওপর নির্ভর করে। আমেরিকা সমগ্র পৃথিবীতে তার দানবীয় প্রভাব বিস্তার করতে পারলেও কিউবার ক্ষেত্রে তা করতে প্রকৃতপক্ষে ব্যর্থই হয়েছে। যে কারণে ফিডেল কাষ্ট্রো আর কিউবার সাথে আর যে নামটি সামনে আসে, সেটিও আমেরিকা। এ যেন একই বেদিতে দেবতা আর দানবের পূজা।

দ্বিতীয় বিশ্বয্দ্ধু শেষে ফ্যাসিস্টদের পরাজয়ের পর থেকেই তরুণ ফিদেল কাস্ট্রোর মার্কসবাদের প্রতি আগ্রহ জন্মাতে শুরু করে। ফিদেল চল্লিশের দশকের শেষের দিকে এসে মার্কসবাদে দীক্ষা নেন। মাকিন যুক্তরাষ্ট্রের মদদে দালাল বাতিস্তার কিউবার ক্ষমতা দখল করে নেয়াকে ফিদেল কাস্ট্রো মোটেই মেনে নিতে পারেননি। কারণ মার্কিন সা¤্রাজ্যবাদকে কাস্ট্রো মোটেই পছন্দ করতেন না। যে কারণে বাতিস্তাকে উৎখাতের জন্য তিনি মরিয়া হয়ে ওঠেন। ‘মন্ত্রের সাধন কিংবা শরীর পতন’ এমনি জীবনপণ লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন ফিদেল কাস্ট্রো। ১৯৫৩ সালে বাতিস্তা সরকারকে উৎখাতের সংকল্প নিয়ে প্রয়োজনীয় অস্ত্র সংগ্রহের জন্য সেনাবাহিনীর মোকান্দা ব্যারাকে আক্রমণ চালান। সেই আক্রমণ ব্যর্থ হয়। তাঁর বহু সাথী ওই ব্যর্থ আক্রমণে নিহত হন। তিনিসহ বেশকিছু সহযোদ্ধা কারাগারে আটক হন। ১৯৫৫ সালে জেল থেকে বেরিয়ে আসেন তিনি। এই সময়েই তাঁর সাথে পরিচয় ঘটে চে গুয়েভারার। এখান থেকেই শুরু হয় নতুন পথযাত্রা। ১৯৫৯ সালে ফিদেলের নেতৃত্বে কিউবার জনগণ মার্কিন দালাল বাতিস্তার নামে-বেনামে সামরিক সরকারকে উৎখাত করে স্বাধীন কিউবা প্রতিষ্ঠা করে, সেদিন শুধু যে বাতিস্তার সরকার পালিয়ে বেঁচেছিল তাই নয়, মার্কিন দখলদারিত্বেরও অবসান ঘটেছিল।

সে এক ক্রান্তিকাল। কয়েক বছর আগেই মহাপ্রয়াণে গেছেন জোসেফ স্ট্যালিন। ষড়যন্ত্রকারীরা কেবল অন্ধকার গুহা থেকে হিংস্র শাপদের মতো সন্তর্পণে প্রকাশ্যে বেরিয়ে এলেও, তখন পর্যন্ত স্বরূপ প্রকাশে সাহসী হয়নি। এমনি সময়ে কিউবার জনগণের এমন একটি বিজয় বিশ্বজনগণের বিজয়রথের চলমানতারই প্রমাণ বলে ধরে নেওয়া যায়। এই বিজয়রথকে পিছন থেকে টেনে ধরে থামিয়ে দেবার সেই সময়েই অলক্ষ্যে চলছিল বিশ্বজনগণের জানি দুশমন ক্রুশ্চেভ চক্রের ষড়যন্ত্র, চক্রান্ত।

কিউবার জনগণের রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের সাথে সাথেই কাস্ট্রো এবং কিউবার সাথে আমেরিকার নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়ে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ তার কোলের ভিতর এমন একটি বিষফোঁড়াকে সহ্য করবে? এটা কখনো হতে পারে? এতো একেবারে অসহনীয় ব্যাপার। তার ওপর এর সাথে জড়িত রয়েছে জাতশত্রু সোভিয়েত রাশিয়া। এক সময়ের সোভিয়েত রাশিয়ার রাজনৈতিক অবস্থান আমূল পরিবর্তিত হয়ে সামাজিক সাম্রাজ্যবাদী রাশিয়ার আবির্ভাব হলেও কাস্ট্রোর সাথে তার সম্পর্কের পরিবর্তন ঘটেনি। কাস্ট্রোও বিভিন্ন সময়ে রাশিয়ার আর্থ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের সাথে সাথে যারা ক্ষমতাসীন হয়েছে তাদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখেছেন। আর তাই আইসেন হাওয়ার, সভ্যভব্য বলে আলোচিত জন এফ. কেনেডি থেকে শুরু করে জনসন, নিক্সন, হালের ওবামা এবং সদ্যনির্বাচিত ডোনাল্ড ট্রাম্প কেউই কিউবার অবস্থানকে সহ্য করেনি। কিন্তু কিউবানদের তাতে কিছু যায় আসেনি। কিউবার খুঁটির জোর সামাজিক সাম্রাজ্যবাদী রাশিয়া তো সাথেই রয়েছে। মার্কিন বিরোধিতা আর নিজের নেতৃত্বের গুণে কিউবাবাসীর মনে স্থান করে নিয়েছিলেন কাস্ট্রো সেই ১৯৫৫ সালেই।

আধুনিক প্রচার মাধ্যম তার প্রচারগুণে কিছু কিছু নামকে তাঁর দেশজাতির সমার্থক করে তোলে। ফিদেলও তার ব্যতিক্রম নন। তাই কিউবার নাম উচ্চারিত হবার সাথে সাথেই কৃষ্ণশ্মশ্রুমণ্ডিত কমব্যাট পোশাকসজ্জিত এক তারুণ্যদীপ্ত মুখচ্ছবিকে সর্বসমক্ষে পরিচিতি লাভ করে। সেই সময়ে ফিদেল ছিলেন যুদ্ধক্ষেত্রের কমান্ডার। আর তাঁর সাথে ছিল স্বাধীনতাপ্রিয় দেশবাসী, যাদের সাথে তার সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল সেই স্বাধীনতাযুদ্ধের প্রাক্কালে। সেই সময়ে সুখে দুঃখে তিনি তাদের সাথেই থেকেছেন। যে জন্যে তিনি তাঁর দেশবাসীর কাছে ছিলেন ভরসার জায়গা। এটিই হলো বাস্তবতা।

জীবিতাবস্থায় ফিদেল যে পরিমাণ পরিচিতি লাভ করেছিলেন, তাঁর মৃত্যুর পর পরিচিতির পরিধিটা আরও বেড়ে গেছে। তাঁর নাম সর্বমহলে ছড়িয়ে পড়েছে প্রচার মাধ্যমের কল্যাণে। এখন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের লোকজনও ফিদেল কাস্ট্রো নামের একজন মানুষের নাম জেনে গেছে- যিনি তার দেশের মানুষকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কবলমুক্ত করেছিলেন। ফিদেল যে দেশের নেতৃত্ব গ্রহণ করেছিলেন, সে দেশটি সহায় সম্পদে একেবারে দীনহীন ছিল এমন নয়। কৃষিপ্রধান দেশ হলেও খনিজ সম্পদেও ছিল সমৃদ্ধশালী। যা প্রকৃতপক্ষেই সাম্রাজ্যবাদের উৎকৃষ্ট মৃগয়া ক্ষেত্র। একেবারেই সাম্রাজ্যবাদী থাবার নাগালে এমন একটি দেশ হাতছাড়া হওয়াতে হতাশ হতেই পারে বিশ্বসাম্রাজ্যবাদের মোড়ল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ। এই অসহনীয় দুঃস্বপ্ন থেকে মুক্তি পেতে তাই তারা এতোটাই দিশেহারা হয়ে পড়েছিল যে, ওই দুঃস্বপ্নের স্থপতি ফিদেল কাস্ট্রোকে তারা হত্যা করতে ৬৩৮ বার চেষ্টা চালিয়েছে। প্রতিবারই তাদের সেই পরিকল্পনার গুড়ে বালি ঢেলে দিয়েছে কাস্ট্রোর অতন্দ্র প্রহরীরা। কাস্ট্রোর এই জীবননাশের পরিকল্পনাকারীদের এবং তাদের সহায়তাকারীদেরকে সঙ্গত কারণেই চরম শাস্তি ভোগ করতে হয়েছে। চরম শাস্তি বিধানের জন্য ক্যাস্ট্রোকে এবং তাঁর সহযোদ্ধাদের অবশ্যই কঠোর হতে হয়েছে। সে ক্ষেত্রে তারা যে পথ বেছে নিয়েছেন তা নিশ্চয়ই গোলাপের পাঁপড়ি বিছানো ছিল না। ফলে শাস্তিভোগকারী আর তাদের প্রভু এবং দোসরদের চোখে ক্যাস্ট্রো ছিলেন ডিক্টেটর- স্বৈরাচারী শাসক। নিজের, দেশ এবং দেশবাসীর অস্তিত্ব রক্ষার কাজে ক্যাস্ট্রোকে সতর্ক ও কঠোর অবস্থান নিয়ে চলতে হয়েছে।

তাঁর প্রমাণ মিললো তাঁর তিরোধানের মিশ্র প্রতিক্রিয়ায়। একদিকে অশ্রুসিক্ত দেশবাসী। অন্যদিকে দেশত্যাগী কিউবানদের উল্লাস নৃত্য। একদিকে সমাগত শঙ্কা, অন্যদিকে আশা জাগানিয়া পরিবেশ। ব্যক্তি কাস্ট্রো তাঁর দেশবাসীকে তাঁর ওপর এতোটাই নির্ভরশীল করে রেখেছিলেন যে, কাস্ট্রোবিহীন কিউবার অধিবাসীরা শঙ্কিত তাদের আগামী দিন কেমন যাবে? তাদের কাণ্ডারি তো আর নেই। এখন কে তাদেরকে দিশা দেবে? অনেকেই ভাবছে কাস্ট্রোর অনুপস্থিতিতে কে সামাল দেবে আমেরিকার বিষাক্ত ছোবল। যে ছোবলে তারা বার বার ঘায়েল করতে চেয়েছে কাস্ট্রোকে। আমেরিকার কাছে কাস্ট্রো শুধু একটি রক্তমাংসের মানুষ ছিল তেমনটি নয়। কাস্ট্রো ছিল মূর্তিমান আতঙ্ক। কাস্ট্রো মানেই কিউবা। কাস্ট্রো অর্থই আমেরিকার ব্যর্থতা। তাই তারা কাস্ট্রোবিহীন কিউবাকে মনে করতো আমেরিকার অনুগত আর পাঁচটি দেশের মতোই হবে। তাই তাকে প্রকৃত অর্থেই হত্যা করতে চেয়েছে। কখনো মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে দিয়েছে। কিউবাবাসীদের দুর্বল করার জন্য। মানসিকভাবে যাতে কিউবাবাসীরা ভেঙে পড়েন। কিন্তু বার বারই শক্রর মুখে ছাই দিয়ে কাস্ট্রো তার দৈহিকভাবে বেঁচে থাকার জানান দিয়েছেন। আর প্রতিবারই হতাশ হতে হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে। এমনিভাবেই কিউবার অধিবাসীরা কাস্ট্রোকে তাদের একান্ত নির্ভরশীল মানুষ নেতা হিসাবে বিবেচনা করে হয়ত আপাত কিছুটা হতাশ হয়ে পড়তে পারে। কিন্তু তারা যদি নিজেদের শক্তি সম্বন্ধে তাদের সাংগঠনিক কাঠামোকে জোরদার করতে পারে, তাহলে হয়ত আপাত বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা পেতে পারে।

এখন প্রশ্ন হলো কে এই কাস্ট্রো। কি তার পরিচয়। যাকে বিশ্বপ্রচার মাধ্যম এবং সংশোধনবাদের ধারক বাহকেরা কমিউনিস্ট বলে প্রমাণ করার জন্য সমানে গলা ফাটিয়ে চলেছে। যদিও যৌবনের প্রারম্ভে মার্কসবাদে আকৃষ্ট হয়েছিলেন, কিন্তু সময়ের সাথে সাথে তাঁর আর মার্কসবাদীদের সাথে সম্পর্ক থাকেনি। সংশোধনবাদীদের সাথেই তাঁর সখ্য গড়ে ওঠে। ১৯৫৯ সালে কিউবার প্রধানমন্ত্রী হলেন ফিদেল কাস্ট্রো আর ১৯৬১ সালে যোগ দিলেন জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনে। মৃত্যুবরণ করলেন জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের একজন প্রবক্তা হিসাবেই । সুতরাং কাস্ট্রোকে মূল্যায়ন করতে হলে বুঝতে হবে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনকে। তাহলে কাস্ট্রোকে নিয়ে আর কোন ধুম্রজাল থাকবে না।

অনেকে বলছেন কাস্ট্রো তাঁর নিজের মতো সমাজতন্ত্রী। কমিউনিস্ট আর নিজের মতো কমিউনিস্টদের মধ্যেই অবশ্যই বড় মাপের ফারাক থাকার কথা। কমিউনিজম ইতিহাসের পরম্পরায় একটি বিজ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্র এবং সমাজব্যবস্থা। যেখানে মনগড়া বা নিজের মতো বলে কোন কিছু নেই। অনেকে বিজ্ঞানের অগ্রগতি এবং তার যে নব নব সংযোজন এটাকে বুঝাতে গিয়েই নিজের মতো করে শব্দগুলো ব্যবহার করে থাকেন। সংযোজন আর সংশোধন এক জিনিস নয়। আজকের এই কথিত সমাজতন্ত্রীরা সেই সংশোধনবাদের পথকে বেছে নিয়েছে। শোধনবাদকেই বিজ্ঞানের নব সংযোজন হিসাবে অভিহিত করতে চাইছে।

পৃথিবীতে প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসাবে সোভিয়েত রাশিয়ার অভ্যুদয়ের আগে এবং পর থেকে শোধনবাদীরা সমাজতন্ত্রকে বিভিন্ন ভাবে, বিভিন্ন নামে জনগণের সামনে বিকৃতভাবে উপস্থাপনের নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা চালাতে থাকে। এরই এক পর্যায়ে সোভিয়েত রাশিয়ার অন্যতম রূপকার বিশ্বের নিপীড়িত জনগণের অকৃত্রিম বন্ধু জোসেফ স্ট্যালিনের মৃত্যুর পর ক্রুশ্চেভ চক্র ক্ষমতা দখল করে নেয়। ক্রুশ্চেভ রুশ পার্টির ২০তম কংগ্রেসে তার ‘সিক্রেট স্পিচ’এর মাধ্যমে প্রথম সসংকোচে আত্মপ্রকাশ করে। স্ট্যালিনকে বিকৃতভাবে উপস্থাপনের মাধ্যমে কমিউনিজম এবং কমিউনিস্টদেরকে সংশোধিত রূপে উপস্থাপন করতে থাকে। ক্রুশ্চেভ চক্র ক্ষমতা দখল করে ‘সর্বমানবের রাষ্ট্র’, ‘সব মানুষের পার্টি, ‘শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান’ ইত্যাদি ঘোষণা দিয়ে সেটিকে ষোলকলায় পূর্ণ করে। সাম্রাজ্যবাদী চক্রের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্নকেই বাস্তবে রূপ দেয় সমাজতন্ত্রের নামে পার্টির মধ্যে ঘাপটি মেরে পড়ে থাকা পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদের এই দালাল চক্র। সমাজতান্ত্রিক শিবিরের যে ক্ষতি ফ্যাসিবাদী এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তি করতে পারেনি, পার্টির অভ্যন্তরে থেকে ক্রুশ্চেভ চক্র সেই সর্বনাশ করতে সমর্থ হয়েছে। ক্রুশ্চেভের এই সর্বহারা শ্রেণির আদর্শ বিরোধী অবস্থান দেখে আলবেনিয়ার আনোয়ার হোজা যথার্থই বলেছিলেন, এটি ক্রুশ্চেভের সংশোধনবাদী চিন্তাধারা। ক্রুশ্চেভ সংশোধনবাদী।

সংশোধনবাদী ক্রুশ্চেভ চক্র কমিউনিস্টদের অর্জিত মূল্যবোধকে জলাঞ্জলি দিয়ে রাষ্ট্র যে শ্রেণি শোষণের হাতিয়ার তাকে আড়াল করে, শ্রেণি সংগ্রামকে পরিত্যাগ করে, শ্রেণি সমন্বয়ের পথ অনুসরণ করতে থাকে। এই সকল কর্মকান্ডের ভিতর দিয়ে কার্যত শ্রমিক শ্রেণির রাষ্ট্র, সংবিধান, রক্তরঞ্জিত পতাকার সাথে বিশ্বাসঘাতকতার পথ প্রশস্ত করতে থাকে। এই সংশোধনবাদীদের দ্বারা সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হতে পারে না। তখন থেকেই এই সত্য প্রকাশিত হয়ে পড়ে।

এই সময়েই ষাটের দশকের শুরুতেই, কোন জোটের সাথে সম্পর্কিত নই, (সমাজতান্ত্রিক জোট এবং পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদী জোট) এমন ঘোষণা দিয়ে আর একটি জোটের আবির্ভাব ঘটিয়ে এর নাম দেয়া হলো জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন। যদিও এর প্রবক্তারা এটিকে জোট না বলে একে আন্দোলন বলে আখ্যায়িত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবে এটি একটি জোটবদ্ধ সংগঠন হিসাবেই কাজ করে গেছে। এই কথিত আন্দোলন বা জোটের স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন যুগোশ্লাভিয়ার মার্শাল টিটো, ভারতের জহওরলাল নেহেরু আর মিশরের গামাল নাসের। জোটের আত্মপ্রকাশের মূল লক্ষ্য ছিল সমাজতান্ত্রিক শিবিরকে দুর্বল করা। এই লক্ষ্য সামনে বেখে ১৯৬১ সালে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ ঘটে। কিউবা আর তার নেতা ফিদেল কাস্ট্রো জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য হিসাবেই এই জোটে যোগ দেন।

জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা ফিদেল কাস্ট্রোকে তাঁর মৃত্যুর পর কমিউনিস্ট আখ্যা দেওয়ার জন্য সংশোধনবাদী-সমাজতন্ত্রী, পুঁজিবাদী সবাই এক জোট হয়ে কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছে। কিন্তু ফিদেল কাস্ট্রোর বড় পরিচয় তিনি জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের একজন প্রথম সারির নেতা। যারা কমিউনিস্ট এবং ধনবাদী উভয় ব্যবস্থারই বিরুদ্ধপক্ষ বলে দাবি করে এসেছেন। যদিও তাদের মূল কাজ হচ্ছে কমিউনিস্টদের বিরোধিতা করে সংশোধনবাদকে পুষ্টি যোগান দেয়া। পরোক্ষে পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার ভিতকেই শক্তিশালী করা। ১৯৭৯ সালে জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের হাভানা সম্মেলনে যে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, সেখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে, ‘আমরা কীভাবে আমাদের দেশ পরিচালনা করবো তার সবক পুঁজিবাদী কিংবা সমাজতন্ত্রীদের কাছ থেকে নিতে হবে না।’ এর ভিতর দিয়েই জোট নিরপেক্ষ ফিদেল কাস্ট্রোর রাজনৈতিক দর্শন পরিষ্কার হয়ে যায়। এখানেই শেষ নয়, গর্ভাচেভের নেতৃত্বে যখন সামাজিক সাম্রাজ্যবাদী রাশিয়ার ‘পেরেস্ত্রৈকা’ কর্মসূচি চলছে, তখন এই কর্মসূচিকে ‘শুভ উদ্যোগ’ বলেও উল্লেখ করতে দ্বিধা করেননি কাস্ট্রো। গর্ভাচেভ সম্পর্কে তাঁর মূল্যায়নে তিনি বলেছেন, ‘‘আমার নিশ্চিত বিশ্বাস, গর্ভাচভ সমাজতন্ত্রকে উন্নত করার জন্য সংগ্রাম করতে চেয়েছিলেন।’’ ফিদেল কাস্ট্রো তাঁর জীবদ্দশায় মুক্তবাজার অর্থনীতি ও বিশ্বায়নের বিরোধিতা করেননি। দেশবাসীকে সতর্ক করেছেন মাত্র। এর মাঝ দিয়েই তিনি স্পষ্ট করে দিয়ে গেছেন তাঁর আর্থ-রাজনৈতিক অবস্থান। সেই সাথে জন্মশত্রু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দ্বাররুদ্ধ নীতির অবসান ঘটিয়ে সম্পর্ক উন্নয়নের পথ বেছে নিয়েছিলেন তাঁর জীবিতকালেই। এমনি করেই তিনি একে একে ঘোমটার ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে স্বরূপে আবির্ভূত হতে থাকেন। মৃত্যুর কাছাকাছি এসে আদর্শের যে ধোঁয়াশাটুকু অবশিষ্ট ছিল, ওবামার কিউবা সফরের ভিতর দিয়ে সেটিরও মৃত্যুঘণ্টা বাজিয়ে প্রমাণ করে গেলেন তিনি কাদের লোক।

সূত্রঃ সাপ্তাহিক সেবা

Advertisements


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s