শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস ও শাসক শোষক শ্রেণীর ভূমিকা

genocide-27

প্রতিবছরের মতোই দেশের শাসক শোষক শ্রেণীর সকল অংশ-ই ঘটা করে ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস পালন করবে। এই দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রীয়ভাবেও নানা কর্মসূচির আয়োজন করা হবে। আর দিবসটি সামনে নিয়ে দেশের প্রচার মাধ্যমগুলো বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠান ও নিবন্ধ প্রচার করে এই দিবসের তাৎপর্যকে বিশেষভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করবে। এখানে একটি কথা আলোচনা না করলেই চলে না- শাসক শোষক শ্রেণীর সকল অংশ-ই সব সময়ে পরস্পরের বিরুদ্ধে ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ তুলে থাকে। প্রকৃত ইতিহাস জাতির সামনে তুলে ধরা হচ্ছে না এই অভিযোগ তুলে তাদের সুবিধামতো করে সাজানো বিকৃত ইতিহাস-ই তুলে ধরে। চলতি বছরেও তারা এই কাজ করতে কোন ভুল করবে বলে মনে হয় না। তাই আজ গণতান্ত্রিক শক্তির দায়িত্ব হচ্ছে প্রকৃত ইতিহাস জনগণকে জানানো এবং শাসক শোষক শ্রেণীর বিকৃত ইতিহাস চর্চার স্বরূপ তুলে ধরে জনগণের স্তরে ছড়ানো সকল বিভ্রান্তির অবসান ঘটানো।

বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়াশীল প্রধান প্রধান সকল রাজনৈতিক দলই উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদ তথা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি বলে দাবি করে থাকে। সম্প্রতি জামায়াতে ইসলামীও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি দাবি করে স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস ইত্যাদি পালন করে চলেছে। মুক্তিযুদ্ধ বলতে বিগত ১৯৭১ সালে উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকালীন আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্ব সংঘাত তার ভিত্তিতে সৃষ্ট যুদ্ধকে বুঝিয়ে থাকে। অবশ্য বাংলাদেশ রাষ্ট্র সৃষ্টির ভিতর দিয়ে দেশের শ্রমিক কৃষক জনগণের প্রকৃত মুক্তি এসেছে কি-না তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েই গিয়েছে। বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ভিতর দিয়ে সাম্রাজ্যবাদী শাসন শোষণ থেকে এদেশের জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম তার কাঙ্খিত বিজয় ছিনিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে কিনা- সে প্রশ্নের মীমাংসা আজও হয়নি। তারপরও দেশের প্রধান প্রধান প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক দলগুলো এই ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা তুলে ধরতে বড়ই ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস পালনের ক্ষেত্রেও দেশের প্রতিক্রিয়াশীলদের আয়োজনের কোন ঘাটতি নেই। ১৯৭১ সালের ঘটনাবলি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান রাষ্ট্রে সাম্রাজ্যবাদ বিশেষত মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের পরিকল্পনায় উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদ চাঙ্গা করে এতদঞ্চলে বসবাসরত বাঙালি ও আবাঙালিদের মধ্যেকার জাতিগত সংঘাত সৃষ্টি করে। সাম্রাজ্যবাদী পরিকল্পনায় এদেশে উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদের পক্ষের মূল শক্তি তৎকালীন প্রধান প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক দল সেনানিবাস অবরোধের ঘোষণা দিয়ে তা কার্যকরী করার উদ্যোগ নিলে এই সংঘাত চরম আকার ধারণ করে। পাকিস্তানের অবাঙালি প্রতিক্রিয়াশীল সামরিক বাহিনী তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বসবাসকারী জনগণের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ও হত্যাকান্ড সংঘটিত করে।

এই সময়ে সাম্রাজ্যবাদের দালাল উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদের পক্ষের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও বুদ্ধিজীবীরা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে দেশের জনগণের ওপর ভরসা করতে পারেনি। ওই সময়ে তারা এদেশের জনগণকে রক্ষা করার ক্ষেত্রেও কোন কার্যকরী ভূমিকা গ্রহণ করেনি। তারা জনগণের ওপর নির্ভর করে রক্ষা পাওয়ার নীতি অবলম্বন না করে জনগণকে অরক্ষিত রেখে নিজেরা পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেয়। এই সকল রাজনৈতিক নেতারা সাম্রাজ্যবাদের দালাল ভারতের সামন্ত-মুৎসুদ্দি শ্রেণীর আশ্রয় প্রশ্রয়ে থেকে মার্কিন প্রতিপক্ষ সাম্রাজ্যবাদী শক্তি তৎকালীন সোভিয়েত রাশিয়ার পরিকল্পনায় তৎপরতা চালায়। এই সময়ে প্রতিক্রিয়াশীলদের একাংশ আবার নিজ গৃহে অবস্থান নিয়ে স্বেচ্ছায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে ধরা দেয়।

এই সময়ে দেশের প্রগতিশীল শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ, চিকিৎসকসহ দেশপ্রেমিক বুদ্ধিজীবীরা জনগণের এই চরম দুঃসময়ে জনগণকে ছেড়ে প্রাণ বাঁচাতে দেশত্যাগ করেন নাই। তাঁরা নিজেদের প্রাণের মায়াকে উপেক্ষা করেই দেশে অবস্থান করে জনগণকে রক্ষায় ভূমিকা নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। এবং শেষ পর্যন্ত জনগণের পাশে থেকে জনগণের সেবায় নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। এখানে উল্লেখ্য যে, এই প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীদের অধিকাংশই দেশের রাজনৈতিক মহলে পিকিংপন্থী নামে পরিচিত ছিল। তৎকালীন মস্কোপন্থী বলে পরিচিত বাম বুদ্ধিজীবীরা তো অনেক আগেই উগ্র জাতীয়তাবাদের জোয়ারে ভেসে গিয়ে প্রাণ বাঁচাতে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল।

১৯৭১ সালে দেশে অবস্থান করে যে সকল বুদ্ধিজীবীরা শহীদ হয়েছিলেন তাঁরা ছিলেন প্রকৃত বাম প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক বিপ্লবী দেশপ্রেমিক শক্তি। জনগণের শক্তির প্রতি অগাধ বিশ্বাস ও অকৃত্তিম শ্রদ্ধা ভালাবাসার কারণেই তাঁরা জনগণকে উস্কে দিয়ে বিপদে ফেলে প্রতিক্রিয়াশীলদের মতো প্রাণ বাঁচাতে দেশত্যাগ করেন নাই। জনগণের প্রতি তাদের এই দায়বদ্ধতা, শ্রদ্ধা ও ভালবাসা-ই তাদের জীবনের জন্য কাল হয়েছিল। পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়াশীল সেনাবাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার আলবদর ইত্যাদি বাহিনী তাই যুদ্ধ চলাকালীন গোটা সময়ে বেছে বেছে এই বাম প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীদের নির্মমভাবে হত্যা করেছিল।

১৯৭১ সালের যুদ্ধে যে শক্তি বিজয়ী হয়েছিল তারাও ওই একই কারণে এই বাম প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীদের রক্ষা করেনি। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে ভারত পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হলে ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকেই পাকিস্তান সেনাবাহিনী দেশের বিভিন্ন রণাঙ্গনে কোণঠাসা হয়ে পড়তে থাকে এবং একের পর এক শহর ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা তাদের হাতছাড়া হয়ে যেতে থাকে। পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ডিসেম্বরের ১৩ তারিখেই ঢাকা সেনানিবাসে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। মূলত ১৪ ডিসেম্বরেই ঢাকা শহরের ওপর বিজয়ী শক্তির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। আর এই ১৪ ডিসেম্বর তারিখেই বুদ্ধিজীবীদের একটি বড় অংশ ঢাকা শহরে থেকে হত্যাকান্ডের শিকারে পরিণত হন। এই বুদ্ধিজীবীদের অধিকাংশেরই কে বা কারা তাদের বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায়। আজও যাদের কোন সন্ধান মেলেনি।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় সেক্টরের প্রধান একে নিয়াজি ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় সেক্টরের প্রধান জগজিৎ সিংহ অরোরার কাছে আত্মসমর্পণ করে ও উভয়ের মধ্যে একটি আত্মসমর্পণ চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়। তারপরও এই বুদ্ধিজীবী হত্যা প্রক্রিয়া বন্ধ হয়নি। বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও সরকার প্রতিষ্ঠার পরও ১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসে সম্ভবত ৩০ তারিখে জহির রায়হান নিখোঁজ হয়ে যান। বিভিন্ন তথ্যসূত্রে যতটা জানা যায় তৎকালীন ঢাকা জেলা পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপারকে সাথে নিয়ে একটি গাড়িতে করে একটি পুলিশ দলসহ জহির রায়হান তার ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারের লাশের সন্ধানে বেরিয়েছিলেন। সেই গাড়ি থেকে সহকারী পুলিশ সুপারসহ জহির রায়হান নিখোঁজ হয়ে যান। আজও তাদের কোন সন্ধান মেলেনি। আজ পর্যন্ত দেশে যারাই ক্ষমতায় এসেছে তারাই এই সব ঘটনার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ নিজেদের মতো করে দিয়ে এই সব ঘটনার জন্য অন্যের ওপর দায় চাপিয়ে নিজেরা দায়মুক্ত ভাবছে।

এদেশের বাম প্রগতিশীল বিপ্লবী বুদ্ধিজীবীদের উপর নিধনযজ্ঞ চালাতে শুধু যে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী আর তাদের সহযোগিরা ভূমিকা নিয়েছিল তাই নয়, সকল শাসক শোষকেরাই এই বুদ্ধিজীবীদের ব্যাপারে খগড়হস্ত। বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে বুদ্ধিজীবী হত্যার সকল দায় শুধুমাত্র পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ওপর চাপানোর চেষ্টা হয়ে আসছে। যুদ্ধে বিপর্যস্ত হয়ে পলায়নপর পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ও তার সহযোগিরা নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে যখন আশ্রয়ের সন্ধানে ব্যস্ত তখন কিভাবে তারা প্রতিপক্ষের দ্বারা অবরুদ্ধ শহরে পরিকল্পিতভাবে বুদ্ধিজীবীদের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে তুলে আনবে- সে এক পরম রহস্য বটে। এই সকল শহীদ বাম প্রগতিশীল বিপ্লবী বুদ্ধিজীবীরা যতদিন বেঁচে থাকবেন ততদিন জনগণের একজন হিসাবে জনগণের স্বার্থ রক্ষায় নিজেদের উজাড় করে দেবেন- এই আশঙ্কা থেকেই হয়তো শাসক শোষক শ্রেণীর কোন শক্তিই এদের জীবনকে দীর্ঘায়িত করার সুযোগ দিতে চায়নি।

ঔপনিবেশিক শক্তির এতদঞ্চলে উপনিবেশ স্থাপনের প্রক্রিয়া থেকে এদেশে হত্যা ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতি শুরু হয়েছে, তা আজও বন্ধ হয়নি। নয়াঔপনিবেশিক বাংলাদেশে তা সমানতালে কার্যকরী রয়েছে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তি এদেশে সকল হত্যা ও ষড়যন্ত্রের দায়ভার অন্যের ওপর চাপিয়ে নিজেদের দায়মুক্ত করার যে সংস্কৃতি এদেশে চালু করেছিল তা আজ এদেশের শাসক শোষক শ্রেণীর কল্যাণে বহু শাখা প্রশাখার বিস্তার ঘটিয়েছে। শাসক শোষক গোষ্ঠী আজ এই হাতিয়ারটির যথেচ্ছ ব্যবহার করছে। হত্যা ষড়যন্ত্রের রাজনীতি যুগে যুগে দেশে দেশে শোষক শ্রেণীর-ই রাজনীতি। যা আজও এদেশে বহাল রয়েছে। সাম্রাজ্যবাদ ও তাদের দালাল শাসক শোষক সামন্ত-মুৎসুদ্দি শ্রেণীর শোষণ মুক্ত দেশ ছাড়া এর অবসান হবে না।

সূত্রঃ সাপ্তাহিক সেবা

Advertisements


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s