কলকাতায় নকশালপন্থী ছাত্র সংগঠনের দ্বন্দ্বঃ USDF এর বিবৃতি

12

( বিবৃতিটি USDF এর পক্ষ থেকে আমাদের কাছে পাঠানো হয়েছে )

আমাদের কাছে আসা একটি মলেস্টেশানের অভিযোগের প্রেক্ষিতে আমরা যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, প্রথমেই মুক্তকন্ঠে সেই বিষয়ে আত্মসমালোচনা করছি। আসলে সাম্প্রতিক অতীতে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে হওয়া যৌন হেনস্থার কোনো ঘটনার ক্ষেত্রেই ICC ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারেনি। আর সেটাকে মাথায় রেখেই USDF ও RADICAL ঠিক করে যে কমিটির কাছে যাওয়ার পরিবর্তে তারা নিজেরাই বিকল্প কোনো পন্থায় অভিযোগটিকে উদ্দেশ করবে ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু দুঃখের কথা, এই বিষয়ে নিতে চাওয়া যাবতীয় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ব্যর্থ প্রতিপন্ন হয়। একটি সক্রিয় GSCASH এর – যেখানে ছাত্রছাত্রীদের তরফ থেকে প্রতিনিধিত্ব থাকবে এবং যা ক্যাম্পাসে লিঙ্গ সচেতনতা গড়ে তোলার কার্যক্রমের পাশাপাশি হেনস্থা-নির্যাতনের অভিযোগের বিচারের ক্ষেত্রেও ভূমিকা নেবে – প্রয়োজনীয়তা যে কতখানি, তা আবারও প্রকট হল এই ঘটনায়। অভিযোগের বিষয়টির উল্লেখ করে গত ২৮শে জানুয়ারি আমাদের তরফে সোশ্যাল মিডিয়ায় আমাদের পেজ’এ একটি বিবৃতি প্রকাশ করা হয়। যেহেতু এই বিবৃতিতে অভিযুক্তের নাম উল্লেখ করা হয়েছিল, তাই এটিকে কেন্দ্র করে দেখা দেয় কিছু বিতর্ক। ‘Gender Justice’ এর জন্য সক্রিয় নারীবাদী, বামপন্থী ও নানান গণতান্ত্রিক সংগঠন অতীতে একাধিকবার এইধরনের কিছু পদ্ধতি ব্যবহার করেছে নারীনিগ্রহ-নির্যাতন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনে। প্রাসঙ্গিকভাবে মনে পড়ে যাচ্ছে একলব্য চৌধুরী, কৌশিক রায়, ফ্রান্সিস মণ্ডল, তরুণ তেজপাল ও মানিক কাটিয়ালের কথা। বর্তমান ঘটনায় আমাদের বিবৃতির প্রেক্ষিতে যে বিভিন্ন মতামত উঠে এসেছে, সেগুলিকে আমরা আমাদের পদক্ষেপের সমালোচনার অংশ হিসাবে গ্রহণ করছি। আমরা আশা করছি যে নারীবাদী রাজনীতির প্রেক্ষিতে নির্দিষ্ট এই কৌশলের ব্যবহার প্রসঙ্গে আলোচনাকেও সমৃদ্ধ করবে এইসমস্ত মতামত। অভিযুক্ত সুশীল মান্ডি গত ২’রা ফেব্রুয়ারি থেকে নিখোঁজ। এরপর থেকে ‘ফ্রেন্ডস অফ সুশীল’ নামের একটি গোষ্ঠী, যার সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন র‍্যাডিকালের কিছু শীর্ষস্থানীয় নেতা ও নেত্রী, লাগাতার অভিযোগকারিণীর উপর দোষারোপ, অর্থাৎ Survivor Blaming করে চলেছে। অভিযোগকারিণী অম্বুজা রাজ সহ USDF এর চার সদস্যর বিরুদ্ধে FIR দায়ের করা হয়েছে। অম্বুজাকে অভিযুক্ত করা হয়েছে মানহানির মামলায় এবং USDF এর চারজনের বিরুদ্ধে আনা হয়েছে অপহরণ ও Caste Atrocity Act এর ধারা। Gender Justice এর প্রশ্নের বিপরীতে যেভাবে দাঁড় করানো হয়েছে জাতি-বর্ণকে, তাতে আমরা উদ্বিগ্ন। আমরা এটিকে Survivor Blaming এর সংস্কৃতির অংশ বলেই মনে করছি এবং এই ঘটনাটিকে দেখছি যৌন হেনস্থার সুবিচারের জন্য সরব হওয়া ব্যক্তিবর্গের কন্ঠরোধ করার প্রয়াস হিসাবে। ‘ফ্রেন্ডস অফ সুশীল’-এর পক্ষ থেকে প্রকাশ করা হয়েছে তীব্র নারীবিদ্বেষী, মিথ্যা অভিযোগ সম্বলিত একটি প্রেস বিবৃতি। গোটা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর জুড়ে অভিযোগকারিণী ও তার পক্ষে দাঁড়ানো ব্যক্তিদের শাস্তির দাবি জানিয়ে লাগানো হয়েছে পোস্টার। অভিষেক মুখার্জীর উস্কানিতে জনসমক্ষে বিশ্বরূপ প্রামাণিক (অভিষেক ও বিশ্বরূপ দুজনেই র‍্যাডিকালের সদস্য) প্রহার করেছে কৌস্তভ মন্ডলকে। অভিষেক মুখার্জী প্রকাশ্যে অম্বুজা রাজকে হুমকি দিয়েছে এবং তাকে মিথ্যাবাদী বলেছে। কিন্তু এসব সত্ত্বেও আমরা নোংরা আইনি লড়াইয়ের খেলায় নামতে চাইনি। ঘটনাক্রম যাতে আরো অনভিপ্রেত ও তিক্ত রূপ না নেয়, সে কথা মাথায় রেখে র‍্যাডিকাল ও আমরা একসাথে আলোচনায় বসি। আমরা নিজেদের পদক্ষেপের (অভিযুক্তের নাম প্রকাশ্যে আনার) সমালোচনা করি এবং দাবি জানাই যে র‍্যাডিকালকে তাদের ‘Survivor blaming’ এর জন্য আত্মসমালোচনা করতে হবে। কিন্তু এই আলোচনায় যা অগ্রগতির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল, র‍্যাডিকাল তা অচিরেই নস্যাৎ করে দেয় এবং সেদিনই সন্ধ্যেবেলা নতুনভাবে তিন দফা দাবি পেশ করে – ক) অম্বুজাকে এই মর্মে বিবৃতি দিতে হবে যে, সে সুশীলের ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্যই মলেস্টেশানের অভিযোগ তুলেছিল ; খ) USDF কে এটা বলতে হবে যে তারা মিথ্যা অভিযোগ করেছিল, এবং গ) সৌম্য মণ্ডলকে USDF এর সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে ইস্তফা দিতে হবে। এখান থেকে এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে FIR’গুলিকে র‍্যাডিকাল নিজেদের ক্ষুদ্র রাজনৈতিক স্বার্থের জায়গা থেকে ব্যবহার করছে অভিযোগকারিণী ও তার পাশে দাঁড়ানো ব্যক্তিদের চাপ দেওয়ার জন্য। আমরা এর তীব্র বিরোধিতা করি। আমরা কোনোমূল্যেই মলেস্টেশানের অভিযোগ ফিরিয়ে নেব না। আর নিজেদের এই অবস্থানের জন্য যদি আমাদের গ্রেপ্তার হতে হয়, তবে তাই হোক। র‍্যাডিকালের পুংবাদী ভাবনা-মূল্যবোধসঞ্জাত কার্যকলাপের আমরা তীব্র ভাষায় নিন্দা করছি। সুশীল মান্ডির নিরুদ্দেশ হওয়ার দুঃখজনক ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে পশ্চাৎপদ নারী-বিদ্বেষী উন্মাদনা তৈরি হয়েছে তার রাজনৈতিক মোকাবিলা না করতে পারলে আমাদের হয়ত আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে লিঙ্গসচেতনা ও ন্যায়ের প্রশ্নে যে রাজনৈতিক ও চেতনাগত অগ্রগতি সম্ভব হয়েছিল নির্ভয়া আন্দোলনের পরবর্তীতে, তার থেকে পিছিয়ে যেতে হবে। বর্ণ ব্যবস্থা ও লিঙ্গবৈষ্যম্যর অবসান ব্যতিরেকে মানুষের মুক্তির স্বপ্নের বাস্তবায়ন কখনোই সম্ভব নয়। লিঙ্গ রাজনীতির বিপরীতে বর্ণ রাজনীতিকে দাঁড় করানোটা একটা পশ্চাৎপদ ভাবনার প্রতিফলন। কেননা, এভাবে চলতে থাকলে তো হেনস্থাকারী/নির্যাতনকারীর বর্ণগত পরিচয় না জানা থাকলে প্রকাশ্যে যৌন হেনস্থার অভিযগো জানানো বা তা নিয়ে সোচ্চার হওয়া যাবে না, তাই না? ক্যাম্পাস ও ক্যাম্পাসের বাইরেও বিবিধ গণতান্ত্রিক স্বর অবস্থান নিক Gender Justice এর পক্ষে; পাশে দাঁড়াক অভিযোগকারিণী, পাশে দাঁড়াক আমাদের – প্রত্যাশা রইল এমনটাই। যেটা এখানে বলা একান্তই প্রয়োজনীয়, এবং আমরা দ্বিধাহীনভাবে বলছিও, তা হল – আমরা একেবারেই মনে করিনা যে সুশীল মান্ডি একজন ‘খারাপ মানুষ’, বা ‘বাজে মানুষ’ এবং আমরা আন্তরিকভাবেই চাই যে সুশীল সুস্থ শরীরে ফিরে আসুক ক্যাম্পাসে। শ্রেণী, বর্ণ, লিঙ্গ ও শারীরিক সক্ষমতার নিরিখে থাকবন্দি এই সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী লড়াই প্রয়োজন। লড়াই প্রয়োজন আমাদের অন্তরে ও বাইরে।

USDF

[USDF, Jadavpur University Preparatory Unit এর পক্ষে নবোত্তমা ও দিব্যকমল]

Advertisements


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s