কমিউনিস্ট বিপ্লবী কমরেড আবদুল হক এর রচনা সমগ্র (১ম পর্ব)

কমরেড আবদুল হক

 

ক্ষুধা হইতে মুক্তি

আবদুল হক

সমগ্র পূর্ববাংলা জুড়ে চলছে এক চরম খাদ্যসংকট। সাধারণ মানুষ ভুমিহীন কৃষক, গরীব কৃষক, শ্রমিক ও নিম্ন-মধ্যবিত্তদের মনে প্রশ্ন উঠেছে “ক্ষুধার হাত হইতে কি মুক্তি নাই?” এই প্রশ্ন আরও সুতীব্র হয়ে উঠেছে এই জন্য যে, গত বাইশ বছরে খাদ্য-সংকটের তীব্রতা হ্রাস না পেয়ে এটা প্রতি বছর বেড়েই চলেছে। আর আমরা প্রতি বছর বিদেশ হতে বেশি বেশি করে খাদ্যশস্য আমদানী করে চলেছি। ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগষ্ট পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৫২-৫৩ সালে আমরা বিদেশ হতে খাদ্য আমদানী শুরু করি। কিন্তু ১৯৫৫-৫৬ সাল পর্যন্ত আমরা বিদেশ হতে অতি সামান্য খাদ্যশস্য আমদানী করি। এই সময় পর্যন্ত আমরা বিদেশ হতে কোনরূপ চাল আমদানী করিনি।

          ১৯৫৫-৫৬ সাল হতে আমরা বিদেশ হতে অধিকতর পরিমাণ গম এবং প্রথমবারের মত চাল আমদানী করি। ১৯৫৪ সাল হতে আমরা আমেরিকার “পাবলিক ল-৪৮০ পরিকল্পনা” অনুযায়ী আমেরিকা হতে খাদ্যশস্য আমদানী করতে আরম্ভ করি। এই আমদানীর পরিমাণ বৃদ্ধি পেতে থাকে ১৯৫৫-৫৬ সাল হতে। প্রেসিডেন্ট কেনেডী ক্ষমতায় বসবার পরে পি.এল-৪৮০ পরিকল্পনা অনুযায়ী বিদেশে আমেরিকার শস্য রপ্তানীর এক ব্যাপক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। প্রেসিডেন্ট কেনেডী এই পরিকল্পনার নাম দেন “শান্তির জন্য খাদ্য পরিকল্পনা”। “ব্রাজিলিয়ান অর্থনিতীবিদ ক্যারলের হিসেব অনুযায়ী জানা যায় যে, আমেরিকার বিরাট পরিমাণ বাড়তি খাদ্যশস্য গুদামে গুদামে প্রতি বছর জমা হচ্ছে। এর ফলে আমেরিকার খাদ্যশস্যের মূল্যের দ্রুত অবনতি ঘটছে। ক্যারল বলেন যে খাদ্যশস্যের ক্ষেত্রে এই  সংকটের নিরসনের জন্যই প্রেসিডেন্ট কেনেডী তথাকথিত শান্তির নামে বিদেশে আমেরিকার খাদ্যশস্য রপ্তানীর এক ব্যাপক পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। প্রেসিডেন্ট যে সমস্ত “অভাবী” দেশের নাম উল্লেখ করেন তার মধ্যে প্রথম ছিল ভারত। আর দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে পাকিস্তান। ১৯৫২-৫৩ সালে আমরা বিদেশ হতে ৬ লক্ষ ৫০ হাজার টন খাদ্যশস্য আমদানী করি। ১৯৫৯-৬০ সালে আমরা আমদানী করি ৯ লক্ষ ৬০ হাজার টন গম এবং ৩ লক্ষ ৬০ হাজার টন চাল। ১৯৬৫-৬৬ সালে আমরা আমদানী করি ১১ লক্ষ ৭০ হাজার টন গম এবং ৪ লক্ষ ৮ হাজার টন চাল।

          প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা চালু হয় ১৯৫৬ সালে। প্রাক-পরিকল্পনা কালে অর্থাৎ ১৯৪৭ সাল হতে ১৯৫৫ সালের মধ্যে আমাদের দেশের সমগ্র খাদ্যশস্যের মধ্যে বিদেশ হতে আমদানীকৃত খাদ্যশস্যের পরিমাণ ছিল একশত ভাগের দুই ভাগ। ক্রমাগত এই পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। চৌধুরী মোহাম্মাদ আলীর প্রধানমন্ত্রীত্বকালে প্রথম পরিকল্পনা চালু হয়। প্রথম পরিকল্পনার মেয়াদকালে প্রধানমন্ত্রীর গদি অলংকৃত করেন জনাব শহীদ সোহরাওয়ার্দী। প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে এই দুইজনই ঘোষণা করেছিলেন যে, পরিকল্পনার উদ্দেশ্য হল খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন। কিন্তু প্রাক-পরিকল্পনার বছরগুলোর তুলনায় খাদ্য ঘাটতি বৃদ্ধি পেয়েছে এবং আমরা বিদেশ হতে আরও বেশী পরিমাণ খাদ্য আমদানী করি। প্রথম পরিকল্পনাকালে আমাদের দেশের সমগ্র খাদ্যশস্যের মধ্যে বিদেশ হতে আমদানীকৃত খাদ্যশস্যের পরিমাণ ছিল একশত ভাগের আট ভাগ।

          দ্বিতীয় পরিকল্পনা চালু করা হয় ১৯৬১ সালে। তখন দেশের প্রেসিডেন্ট ছিলেন আয়ুব খান। তিনি ঘোষণা করলেন যে, আগেরকার সরকারগুলোর ব্যর্থতার জন্যই আমার খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে পারিনি। দ্বিতীয় পরিকল্পনাকালে দেশে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করবেই। কিন্তু দ্বিতীয় পরিকল্পনাকালে বিদেশ হতে খাদ্য আমদানী বৃদ্ধি পেয়েছে এবং দেশের সমগ্র খাদ্যশস্যের মধ্যে বিদেশ হতে আমদানীকৃত খাদ্যশস্যের পরিমাণ হল একশত ভাগের নয় ভাগ। দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে পারিনি।

          আয়ুবের শাসনকাল খাদ্য সংকটকে আরও সুতীব্র করে তোলো। ১৯৪৮-৪৯ সাল হতে ১৯৫৭-৫৮ সাল এই কয় বছরে পূর্ব বাংলায় বিদেশ হতে ৩৬ লক্ষ ৩৯ হাজার ৫শত ৮৬ টন গম ও ১০ লক্ষ ৪০ হাজার ৪শত ১৬ টন চাল আমদানী করা হয়। আয়ুব খান ক্ষমতায় বসেন ১৯৫৮ সালের অক্টোবর মাসে। ১৯৫৭-৫৮ সাল এই দশ বছরে পূর্ব বাংলায় ১ কোটি ৩৪ লক্ষ ৪২ হাজার ৭ শত ১০ টন গম এবং ১৯ লক্ষ ৬৫ হাজার ৬ শত ৩ টন চাল আমদানী করা হয়। অর্থাৎ এই বছরে পূর্বের দশ বছরের তুলনায় ২৬৯ ভাগ বেশি গম ও ৮৫ ভাগ বেশি চাল বিদেশ হতে আমদানী করা হয়।

          তৃতীয় পরিকল্পনা চালু হবার সাথে সাথে নতুন করে আবার খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের কথা ঘোষণা করা হয়। কিন্তু ইহা মরীচিকাই রয়ে গেছে। খাদ্যসংকট চরম আকার ধারণ করেছে। বর্তমান সরকার ঘোষনা করেছেন যে, পূর্ব বাংলায় খাদ্য ঘাটতির পরিমাণ হবে ১৭ লক্ষ টন। এই বিশ বছরের ইতিহাস হল খাদ্য ঘাটতির ইতিহাস। এই ঘাটতি পূরণের জন্য আমরা বিদেশ হতে প্রধানতঃ আমেরিকা হতে খাদ্যশস্য আমদানী করছি। গত বিশ বছরে আমেরিকার পি,এল ৪৮০ পরিকল্পনা অনুযায়ী পূর্ব বাংলায় ১ কোটি ৪০ লক্ষ টন গম ও ৪০ লক্ষ টন চাল আমদানী করা হয়েছে। এবার সরকার বর্ণিত ১৭ লক্ষ টন খাদ্যশস্যের ঘাটতি পূরনের জন্য ধর্ণা দিতে হচ্ছে আমেরিকার দুয়ারে । ধান দুর্বা দিয়ে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে পূজা করা হচ্ছে।

সরকারী ব্যাখ্যঃ-

          এই ক্রমবর্ধমান ঘাটতির জন্য সরকারীভাবে দায়ী করা হচ্ছে বন্যা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে। বন্যা পূর্ববঙ্গবাসীর জীবনে নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতি দুই বছর অন্তর আমাদের দেশে দেখা যাচ্ছে ভয়াবহ বন্যা। এই বন্যা আমাদের জীবনে বয়ে আনছে অবর্ণনীয় দুঃখ, দুর্দশা ও ক্ষয়-ক্ষতি। এক বেসরকারী হিসেব অনুযায়ী এই বিশ বছরে বন্যার দরুন পূর্ববাংলায় এক হাজার হতে দেড় হাজার কোট টাকার ধন সম্পত্তি নষ্ট হয়েছে। সরকারীভাবে বলা হচ্ছে যে, বন্যা ও প্রকৃতির দুর্যোগের পরে মানুষের হাত নেই। এর জন্য মানুষ দায়ী নয়। সুতারাং কন্যা আল্লার গজব।

দ্বিতীয়তঃ বলা হচ্ছে যে, উন্নয়নের জন্য যা কিছু করা হচ্ছে তা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে জনসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য। জনসংখ্যার মতবাদের প্রচারকদের মুখপাত্র হিসাবে ইএস ম্যাসন ঘোষনা করেনে যে, যদি জন্মনিয়ন্ত্রণ সার্থকভাবে না করা হয় তবে ধ্বংস অনিবার্য। (প্রমোটিং ইকনোমিক ডেভেলপমেন্ট পৃঃ-১৫৩) এই “অনিবার্য ধ্বংসের” আর একজন উপাসক ভগট বলেছেন যে, জনসংখ্যা এবং জীবনধারনের উপজীব্য- এই দুই রেখার মধ্যকার ব্যবধান ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। ইতিহাসে এরূপ আর কখনও ঘটেনি। লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি মানুষ মৃত্যুর মুখোমুখী দাঁড়িয়েছে। ( উইলিয়াম ভগট- রোড টু সারভাইবাল- পৃঃ ২৮৭) জনসংখ্যা ত্বত্তের পতাকাবাহীদের অন্যতম আর.সি. কুকের বক্তব্য হল যে, ইতিমধ্যে যা অবশ্যম্ভাবী তাই ঘটবে। খাদ্য উৎপাদনের তুলনায় জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাবে অনেক অনেক গুণ। এর অনিবার্য পরিণতি মৃত্যু ও ধ্বংস ( হিউম্যান ফ্যাটিলিটি পৃঃ ৩২২) জনসংখ্যার নীতি পৃথিবীতে সর্ব প্রথম তুলে ধরেন পাদ্রী ম্যালথাস। ম্যালথাস বলেছেন যে, খাদ্য উৎপাদনের তুলনায় জনসংখ্যার বৃদ্ধি ঘটছে চক্রবৃদ্ধি হাবে। এভাবে সমাজে সৃষ্টি হচ্ছে “ অবাঞ্চিত জনসংখ্যা”। মহামারি, বন্যা, মৃত্যু ইত্যাদি জনসংখ্যার এই অবাঞ্চিত অংশের হাত হতে সমাজকে করবে মুক্ত। ম্যালথাসের অনুসারীরা অবাঞ্চিত জনসংখ্যা সম্পর্কে নতুন নতুন নীতি আবিষ্কার করে চলেছেন। আমাদের দেশেও সরকারীভাবে এই সমস্ত নীতি প্রচার করা হচ্ছে। সরকারীভাবে বলা হচ্ছে যে, জনসংখ্যা বৃদ্ধি সমস্ত রকমের উন্নয়ন প্রচেষ্টাকে নস্যাৎ করে দিচ্ছে। জনসংখ্যার বৃদ্ধিকে আণবিক বোমার বিস্ফোরণের সাথে তুলনা করা হচ্ছে। ধ্বনি তোলা হচ্ছে যে, যে কোন প্রকারে জনসংখ্যার বৃদ্ধিকে বন্ধ রাখতে হবে আর তা না হলে জনসংখ্যার বৃদ্ধি যে বিস্ফোরণের সৃষ্টি করবে তাতে সব কিছু ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে। ম্যাসন,ভগট, ও কুকের বক্তব্যকে অনুসরণ করে সিদ্ধান্ত করা হচ্ছে যে আমাদের দেশের দুঃখ, দারিদ্র, অনাহার, খাদ্য-ঘাটতি ও অর্থনৈতিক অবনতির কারণ হল জনসংখ্যা বৃদ্ধিঃ-

          ইতিহাসের আলোকেঃ ইতিহাসরে দৃষ্টিতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির তত্ত্ববিদদের বক্তব্যকে বিচার করা যাক। জনসংখ্যার তত্ত্ববিদদের বক্তব্য অনুযায়ী বিশ্বের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকসমূহ অর্থনৈতিক ভাবে পশ্চাদপদ হতে বাধ্য। এই সমস্ত এলাকায় জনসংখ্যার চাপ সবচেয়ে বেশি। কিন্তু বাস্তব ঘটনার প্রতি দৃষ্টি দিলে আমরা দেখি যে, বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাসমূহ হল অর্থনৈতিকভাবে সবচেয়ে উন্নত। প্রফেসর গ্রান্ডফেস্ট এই বক্তব্যের সমর্থনে ধনী (উন্নত)  ও গরীব (অনুন্নত) দেশের একটি তালিকা প্রণয়ন করেছেনঃ

গরীব দেশ     প্রতি বর্গমাইলে জনসংখ্যা     ধনী দেশ        প্রতি বর্গমাইলে জনসংখ্যা

সুরিনাম (ডাচ ওয়েস্ট ইন্ডিজ)         ৪       বেলজিয়াম     ৮০০

বলিভিয়া        ১০     ইংল্যান্ড ও ওয়েলস  ৭৫০

বেলজিয়াম কঙ্গো      ১৩     হল্যান্ড         ৬১০

কলম্বিয়া        ২৬     ইতালী ৪৫০

ইরান-ইরাক   ৩০     ফ্রান্স   ২০০

ফিলিপাইন     ১৭৫   স্কটল্যান্ড       ১৭০

ভারত  ২৫০

উপরে বর্ণিত তালিকা হতে এটা সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, জনসংখ্যা বৃদ্দির সাথে একটি দেশের অর্থনৈতিক অবনতির কোনরূপ সম্পর্কই নেই। মার্কিন অর্থনীতিবিদ পল ব্যারন জে,এফ, ডিউহার্ষ্ট ও তাঁর সহযোগীদের সংগৃহীত তথ্যের পরে নির্ভর করে ১৯৫০ সালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মাথাপ্রতি আয়ের একটি তালিকা প্রণয়ন করেছেন।

 তালিকাটি  নিম্নরূপঃ-

দেশ    ডলার হিসেবে মাথাপ্রতি বার্ষিক আয় (এক ডলা=প্রায় পাঁচ টাকা)

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র         ১৮১০

কানাডা         ৯৭০

বৃটেন  ৯৫৪

বেলজিয়াম     ৫৮২

সুইডেন         ৭৮০

পশ্চিম জার্মানী ৬০৪

ফ্রান্স   ৭৬৪

সুইজার ল্যান্ড ৮৪৯

তুরস্ক  ১২৫

ভারত  ৫৭

বার্মা   ৩৬

( সূত্রঃ দি পলিটিক্যাল ইকোনমি অব গ্রোথ- পৃঃ ২৪০)

          বৃটেন ও বেলজিয়ামের মাথাপ্রতি বার্ষিক আয় যথাক্রমে ৪৭৭০ টাকা এবং ২৯৯০ টাকা। আর ভারতের আয় হল মাথাপ্রতি ২৮৫ টাকা। আমাদের দেশের অবস্থাও ভারতের অনুরূপ। উপরের হিসেব হল ১৯৫০ সালের। ১৯৬৮-৬৯ সালের মধ্যে মাথা প্রতি আয় প্রতি দেশেয় বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকারী হিসেব অনুযায়ী বর্তমানে পূর্ব বাংলার মাথাপ্রতি বার্ষিক আয় হল ৩০০ টাকা। প্রফেসর গ্রান্ডফেস্ট কর্তৃক পরিবেশিত তথ্যের সাথে ব্যারনের প্রদত্ত তথ্যের তুলনামুলক বিচার আমাদের সামনে আসলল সত্যকে তুলে ধরে।

           প্রফেসর গ্রান্ডফেষ্ট কর্তৃত পরিবেশিত তথ্যসমূহ হতে জানা যায় যে, বেলজিয়াম, ইংল্যান্ড এবং হল্যান্ডের জনসংখ্যা ভারত, ইরাক, ইরান প্রভূতি দেশ হতে অনেক বেশি। কিন্তু ভারত, ইরান, ইরাক প্রভূতি দেশের তুলনায় ইংল্যান্ড , হল্যান্ড ও বেলজিয়াম অনেক বেশি ধনী এবং উন্নত। পূর্ববাংলার প্রতি বর্গমাইলে ৭.৭৫ জন লোক বসবাস করে। আর পূর্ববাংলার চেয়ে জনসংখ্যা বেশি হল বেলজিয়ামের এবং পূবৃবাংলার প্রায় সম পরিমাণ জনসংখ্যা হল ইংল্যান্ডে। কিন্তু পূর্ববাংলা হল একটি অত্যন্ত গরীব দেশ এবং ইংল্যান্ড ও বেলজিয়াম হল খুবই ধনী দেশ। প্রফেসর গ্রান্ডফেষ্টের তালিকা এটা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, একটি দেশের জনসংখ্যার হারের সাথে অর্থনৈতিক অবনতি, দারিদ্র, অনাহার ও মহামারীর কোন সম্পর্ক নেই। জনসংখ্যার হারের সাথে অর্থনৈতিক পশ্চাদপদতা, অনাহার এবং মহামারীর যদি সংযোগ থাকত তা হলে পৃবিীর সবচেয়ে দারিদ্র ও অনাহার ক্লিষ্ট দেশ হত বর্তমান কালের ইউরোপের ধনী দেশসমুহ  ইংল্যান্ড, বেলজিয়াম প্রভূতি, আর পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী দেশ হত পূর্ববাংলা, ভারত, ইরাক, ইরান প্রভূতি।

          অন্যদিকে পূর্ববাংলা গঙ্গা-ব্রক্ষ্মপুত্রের অববাহিক অঞ্চলে অবস্থিত “বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার” রিপোর্ট অনুযায়ী গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্রের অববাহিকা অঞ্চল বর্তমানের তুলনায় আরও ৫ হতে ৭ গুন বেশি খাদ্যশস্য উৎপাদান করতে সক্ষম। এই অঞ্চল সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, সামন্যতম প্রচেষ্ট ও লক্ষ্য এই অঞ্চলকে বিশ্বের এক বিরাট ধনভান্ডারে পরিণত করতে পারে। জনসংখ্যা ও খাদ্য সমস্যা সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে কলিন ক্লার্ক বলেছেনঃ “বিশ্ব জনসংখ্যা প্রতি বৎসর শতকরা এক ভাগ বৃদ্ধি পাইতে পারে। কিন্তু কৃষি উৎপাদনের কৌশলের উন্নতির ফলে কৃষি উৎপাদন প্রতি বৎসর শতকরা দেড় ভাগ অথবা কোন কোন দেশে শতকরা দুই ভাগ বৃদ্ধি পাইবে। ম্যালথাসবাদীরা যে সুগভীর হতাশার জাল বিস্তার করিয়াছে তাহা সম্পূর্ণভাবে বাতিল হইয়া গিয়াছে বিশ্ব জনসংখ্যার বৃদ্ধিজনিত সমস্যাকে মোকাবিলা করিবার ক্ষেত্রে কেবলমাত্র বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারই যথেষ্ট। বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার প্রাক্তন প্রধান রয়েভ ওর বলেছেন আধুনিক বিজ্ঞান অপর্যাপ্ত সম্পদ সৃষ্টি করিতে সক্ষম। আর বৃটেন জনসংখ্যা ও সম্পদ সৃষ্টি সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছেন এই পৃথিবী সীমাহীন নয়। কিন্তু ইহার সকল অধিবাসীই ভরণ-পোষন করিতে সক্ষম।আজ বোধহয় সব চইতে বড় জিনিষ হইল এই যে, বিজ্ঞান ও প্রয়োগবিদ্যার উন্নতি এমন এক পর্যায়ে উপনীত হইয়াছে যখন ইহারা প্রচলিত সম্পদ হইতে কেবলমাত্র প্রয়োজন অনুযায়ী খাদ্য-সমাগ্রী উৎপন্ন করিতে পারে না সৃষ্টি করিতে পারে প্রাচুর্য্য। ( লেট দেয়ার বি ব্রে- পৃ-২২৩) আমাদের দেশে যারা ম্যালথাসের পতাকা হাতে নিয়ে এ কথা প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন যে, পূর্ব বাংলার খাদ্য ঘাটতি, কৃষি সংকট ও অনাহারের জন্য দায়ী হল জনসংখ্যার বৃদ্ধি তাদের বক্তব্যের অসারতা উপরের আলোচনা হতে সুষ্পষ্ট হয়ে ওঠে। পূর্ববাংলার মূল প্রশ্ন জনসংখ্যার বৃদ্ধির প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হল এই জনসংখ্যার হাতে সমাজের উৎপাদন শক্তি ও আধুনিক বিজ্ঞানকে তুলে দেয়া। এইক্ষেত্রে এঙ্গেসসের  বক্তব্য প্রণিদানযোগ্য, এঙ্গেলস বলেছেনঃ “ জনসংখ্যার চাপ পড়িবে আহার্য দ্রব্যাদির উপর নহে, চাপ পড়িবে আহার্য্য দ্রব্যাদির উৎপাদনের উপায়সমূহের উপর।”( ল্যাং এর নিকট এঙ্গেলসের চিঠি-২৯ শে মার্চ ১৮৬৫ সাল।) আমাদের দেশের ক্ষেত্রেও জনসংখ্যার হাতে তুলে দিতে হবে আহার্য দ্রব্যাদি উৎপাদনের উপায়সমূহ। এই উপায়সমূহের অধিকারী হলেই তারা প্রয়োজন অনুরূপ নয় প্রয়োজন অতিরিক্ত আহার্য্য দ্রাব্যাদি উৎপাদন করতে সক্ষম হবে। আমাদের দেশে উন্নয়নের হারের সাথে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হাতেরর প্রতিযোগিতা চলেনি। প্রতিযোগিতা চলেছে জনসংখ্যার বৃদ্ধি আর এই বর্ধিত জনসংখ্যা উৎপাদনের উপায়সমূহের মালিক হবে কিনা- এই দুয়ের মধ্যে । আজ আমাদের দেশে জনসংখ্যার সুবিপুল অংশকে সমাজের সমস্ত রকমের উৎপাদন প্রচেষ্টার বাইতে থাকতে হচ্ছে। জনসংখ্যার এই সুবিপুল অংশ অর্থাং একশত জনের ৯৯ জন উৎপাদনের উপায়সমূহ জমি, লাঙ্গল, গরু,ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি হতে বঞ্চিত। এই বিরাট অংশ ক্ষেতে খামারে কলে কারখানায় শ্রম করে, কিন্তু শ্রমের ফসলের ওপর তাদের কোন অধিকারই নেই। এইদিক দিয়ে বিচার করলে আমাদের দেশের জনসংখ্যা “বাড়তি”। প্রকৃতির চিরন্তন নীতি “অবঞ্চিত জনসংখ্যা” সৃষ্টি করেনি। একটি সুনিদিষ্ট ঐতিহাসিক পরিণতি হিসেবে দেখা দিয়েছে “বাড়তি জনসংখ্যার” সমস্যা।

 অনুরূপভাবে বন্যা আল্লার গজব নয় এটাও হল ইতিহাসের এমন একটি সুনিদিষ্ট পরিণতি-যে পরিণতি বন্যা নিরোধের জন্য আধুনিক বিজ্ঞনের প্রয়াসকে করেছে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার। সমুদ্রের জলসীমার নীচে অবস্থিত হল্যান্ড। হল্যান্ডের আক্ষরিক অর্থ হলো নীচু ল্যান্ড অর্থাং জমি। সমুদ্রের বাঁধ বেঁধে হল্যান্ডকে গড়ে তোলা  হয়েছে। বিজ্ঞানের সাহায্যে চীনের দুঃখ হোয়াংহোকে মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করা হচ্ছে। নাইয়াগ্র জলপ্রপাতকে বশ্যতা স্বীকার করতে বাধ্য করা হচ্ছে। মানুষ আজ চাঁদে পৌঁচেছে। বিজ্ঞান প্রয়োগবিদ্যা আজ নতুন নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। বিজ্ঞান ও প্রয়োগবিদ্যার সাহায্যে মানুষ আকাশ-বাতাশ বিশ্বচরাচরে নতুন নতুন বিষ্ময় সৃষ্টি করে চলেছে। আজ আমাদের বন্যা নিযন্ত্রণের কাজে বিজ্ঞান ও মানুষের উদ্ভাবনী শক্তিকে নিয়োগ করা হচ্ছে না । এটা কি আল্লার গজব ও প্রকৃতির খেয়াল? না- ইতিহাসের এমন একটি সুনির্দিষ্ট পরিণতিতে আমরা পৌঁছেছি যেখানে আধুনিক বিজ্ঞানকে বন্যা নিয়ন্ত্রণের কাজে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে বাধা উপস্থিত করা হচেছ এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণের কাজে বিজ্ঞানকে প্রয়োগ করতে অস্বীকার করা হচ্ছে। আজ বাইশ বছর পাকিস্তান কায়েম হয়েছে। কিন্তু এই বাইশ বছর ধরে বন্যা নিরোধের জন্য কোনরূপ ব্যবস্থা গ্রহন না করে কেবলমাত্র আল্লার ও প্রকৃতির দোহাই দেয়া হচ্ছে। এটা কোন আকষ্মিক ঘটনা নয়। ইতিহাসের এক বিশেষ সুনিদিংষ্ট পণিতিই এর জন্য দায়ী।

অতীতের দিকে তাকানো যাকঃ-

          ক্ষুধা,অনাহার, দারিদ্র, বন্যা ও অর্থনৈতিক অচলাবস্থাকে বোঝার জন্য এই ঐতিহাসিক পরিণতিকে উপলব্ধি করতে হবে। সেজন্য একবার অতীতের দিকে দৃষ্টিপাত করা দরকার। ইংরেজ আসার আগে আমাদের দেশে প্রতিষ্ঠিত ছিল স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রাম-ভিত্তিক সামন্তবাদী ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থার গর্ভে পণ্য উৎপাদন ব্যবস্থার বিস্তৃতি ঘটেছি। ইংরেজ এসে আমাদের দেশ দখল করে না নিলে কালে কালে পণ্য উৎপাদন ব্যবস্থার গতিপথে আমাদের দেশেও ধনবাদ বিকাশ লাভ করত। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজ এসে বিকাশের এই পথকে রুদ্ধ করে দিল। সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজ নিজেদের সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থে আমাদের দেশের পরে চালালো উলঙ্গ লুষ্ঠন এবং নিজেদের সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থে দেশে সুপ্রতিষ্ঠিত রাখার জন্য সৃষ্টি করল নতুন এক জমিদার শ্রেণী ও একদল মোসাহেব মুৎসুদ্দি দল।

           ইংরেজদের আসার পূর্বে সমাজদেহে নতুন পরিবর্তনের লক্ষণসমূহ প্রকাশ পাচ্ছিল। ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণ ঘটছিল। দেশীয় পণ্যে উৎপাদনের মাত্রা দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছিল। চৈনিক পরিব্রাজকের মতেঃ “ভারতীয় জনগণের একটি বিরাট অংশের শিল্প কুশলতা ছিল সুগভীল।” এই শিল্প কুশলতার পরে নির্ভর করে সুবিধাজনক পরিবেশে আমাদের দেশে সুনিশ্চিতভাবে ধনবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার বিকাশ ঘটত। ভেরা এ্যানসটে ইংরেজ বিরোধী ছিলেন না। তিনি পর্যন্ত মন্তব্য করেছেন যে, পাক-ভারত উপমহাদেশ নিজস্ব পথে ও প্রচেষ্টায় উন্নত ধরনের অর্থনৈতিক পর্যায়ে উপনীত হতে পারত। তিনি আরও মন্তব্য করেছেন অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত তুলনামূলকভাবে ভারতের অর্থনৈতিক অবস্থা ভাল ছিল। ভারতীয় উৎপা;ন পদ্ধতি এবং শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানসহ বিশ্বের যে কোন দেশের সহিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা করিতে পারিত। ইংরেজদের পূর্বপুরুষরা যখন আদিম জীবন যাপন করিতেছিল তখন ভারত উৎপাদন করিতেছিল এবং বিদেশে চালান দিতেছিল অতি উন্নত ধরনের কাপড় ও অন্যান্য মূল্যবান দ্রব্য সামগ্রী। আর সেই অসভ্য বর্বরদের সন্তান-সন্ততিরা যেদিন অর্থনৈতিক বিপ্লব সংগঠিত করিল সেইদিন ভারতীয়রা সেই বিপ্লবে অংশ গ্রহণ করিতে ব্যর্থ হইল”। (ভারতের অর্থনৈতিক বিকাশ- পৃঃ-৫)।

 ভেরা “অসভ্য বর্বররা” পাক-ভারত উপমহাদেশকে বেপরোয়া লুণ্ঠন করে অর্থনৈতিক বিপ্লব সংগঠিত করেছি।। ব্র“কস আদমের ভাষায় ফুটে উঠেছে তারই চিত্র।“ ভারতকে লুণ্ঠনের ব্যাপারে মেকলে চাইতে আর কোন বড় বিশেষজ্ঞের কথা উল্লেখ করা চলে না। মেকলে উচ্চপদে আসীন ছিলেন। তিনি সরকারী মুখপাত্র হিসাবে কাজ করিয়াছেন। পলাশীর যুদ্বের পর কিভাবে ইংল্যান্ডে অর্থ ও সম্পদের বৃষ্টি আরম্ভ হইল তার বর্ণনা তিনি দিয়েছেন। ক্লাইভ সম্পর্কে বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেছেন,“ আমরা ইহা সুস্পষ্টভাবে বলিতে পারি যে, যে ব্যাক্তির কিছুই ছিল না সেই ব্যাক্তি মাত্র চৌত্রিশ বছর বয়সে এক বিরাট সম্পদের মালিক হইলেন। কিন্তু ক্লাইভের চলিয়া যাইবার পর যাহা ঘটিল ক্লাইভ নিজের অথবা তাহার সরকারের জন্য যাহা নিয়াছিলেন তাহার তুলনায় তাহা ছিল অতি নগন্য। তুলনামূলকভাবে বলিতে গেলে ক্লাইভ এর চলিয়া যাইবার পর দেখা দিল পাইকারী হারে লুণ্ঠন এবং বাংলাদেশকে ঘিরিয়া ধরিল একদল লোভী কর্মচারী রূপী শকুনীরা। এই কর্মচারীরা চিল হিংস্য, শয়তান ও বেহিসাবী। ইহারা যাহা হাতে পাইল তাহাই লুণ্ঠন করিল। ইহারা বাংলাদেশকে নিঃস্ব করিয়া ফেলিল। ইহাদের একমাত্র চিন্তা ছিল বাংলাদেশ হইতে যে কোন প্রকারে হাজার হাজার পাউন্ড লুট করিয়া বিলাতে ফিরিয়া গিয়া অর্থের মাহাত্ম্য দেখানো। এইভাবে তিন কোটি মানুষকে সর্ব্বশান্ত করিয়া ফেলা হইল। ইংরেজদের এই ধরনের অরাজকতাপূর্ণ শাসন কার্যের তুলনা সভ্য সমাজে নাই।” পলাশীর যুদ্ধের পর পরই লুণ্ঠিত ধনদৌলত লন্ডনে এসে পৌঁছাতে লাগল। সঙ্গে সঙ্গেই এর প্রতিক্রিয়া দেখা দিল। বিশেষজ্ঞরা সকলেই একমত যে, “১৭৬০ সাল সূচনা করিল শিল্পবিপ্লবের। এই শিল্পবিপ্লবই নতুন যুগের সূচনা করে। ১৭৬০ সালের পূর্বে লাঙকাশায়ার কাপড় বুনবার জন্য যে সমস্ত যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হইত তাহা ছিল ভারতে কাপড় বুনিবার জন্য ব্যবহৃত যন্ত্রপাতিরই অনুরূপ। ( দি ল অব সিভিলাইজেশন এ্যান্ড ডিকে-র্পঃ-২৯৪) পলাশীল যুদ্ধের পর সব কিছুই নতুন রূপ ধারণ করে এমনকি ১৭৫০ সালে বৃটিশ লৌহ শিল্পে যে মন্দা-দেখা দিয়েছিল তা দুর হয়ে তেজীভাব দেখা দেয়।

          পলাশীর যুদ্ধের পর বাংলাদেশকে বেপরোয়া লুণ্ঠন করে ইংল্যান্ডের শিল্প বিকাশের আদি পুঁজি সংগ্রহ করা হয়। আমাদের দেশের সব কিছুকেই ইংল্যান্ডের শিল্প বিকাশের কাজে লাগানো হয়। রমেশ দত্ত তার ভারতের অর্থনৈতিক ইতিহাস নামক পুস্তকে তার বর্ণনা দেয়েছেন, “অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দশক এবং উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকগুলিতে ইংল্যান্ডের  একমাত্র কাজ ছিল ভারতকে গ্রেট বৃটেনের শিল্প আয়োজনের উদ্ধেশ্যে ব্যবহার করা । ভারতীয়রা গ্রেট বৃটেনের শিল্পের জন্য কাঁচামাল উৎপাদন করিবে এই উদ্দেশ্যে ভারতে উৎপাদিত রেশম ও সূতীবস্ত্রের উপর অতিরিক্ত করা ধার্য্য করা হইল। বৃটিশ পণ্য সম্ভারকে বিনা শুল্কে ভারতে প্রবেশ করিতে দেয়া হয়।। জীবিকা অর্জনের একমাত্র উপায় হইয়া দাঁড়াইল কৃষি। কৃষি যেটুকু সম্পদ সৃষ্টি করিতে সক্ষম বৃটিশ সরকার জমির খাজনা বাবদ তাহাও নিয়া নিল। ইহা কৃষিকে পঙ্গু করিয়া দিল এবং চাষীকে চিরকালের জন্য দারিদ্র ও ঋণের আবর্তে নিক্ষেপ করিল। জমি যেটুকু উদ্ধৃত্ত সৃষ্টি করিতে পারে বৃটিশ সরকার তাহার সবটাই আত্মসাৎ করিল।”

বৃটিশ সরকার এভাবে আমাদের দেশের অর্থনীতির ভিত্তিকেই ধ্বংস করে দেয়। ইংজের আমাদের দেশে লুস্ঠন ও দস্যুতার যে অধ্যায় সৃষ্টি করে তাকে বহাল রাখার জন্য সৃষ্টি করে “ নুতন নতুন শ্রেণী যাহারা চিরকালের জন্য নির্ভর করিবে তাহাদের উপর”। এই নতুন শ্রেণীসমূহ হল জমিদার শ্রেণী এবং মাযোগানদার, কর আদায়কারী, লোকখাটানো, হিসেবরক্ষক ও দেশীয় কাজ-কর্ম দেখাশুনা করাবার কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত মুৎসুদ্দি শ্রেণী।

          ইংরেজ  আসার আগেও আমাদের দেশে খাজনা প্রথা এবং সামন্তবাদী শোষণ বিদ্যামান ছিল। কিন্তু খাজনা নির্ভর করত ফসলের পরে। ফসলের এক চতুর্থাংশ খাজনা হিসেবে নেয়া হত। জমিতে ফসল ফললে কৃষক খাজনা দিত। যে বছর জমিতে ফসল ফলত না সে বছর কৃষককে খাজনাও দিতে হত না। ফসলের পরে যেহেতু খাজনা নির্ভরশীল ছিল সেহেতু ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য সবসময় নজর দেয়া হত। সমগ্র দেশে গড়ে তোলা হয়েছিল জালের মত সেচ ব্যবস্থা এই খালবিল নদী-নালাগুলি বর্ষার অতিরিক্ত পানি বহন করে নিয়ে যেত। আর খরার সময় এসবের পানি কৃষকরা ব্যবহার করত। এই সেচ ব্যবস্থাই ছিল আমাদের দেশের কৃষি অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। সেদিন হয়ত কখনও কখনও অজন্মা খো দিত কিন্তু তা ছিল অত্যন্ত আকষ্মিক ব্যাপার।

           ইংরেজ আসার পর চিরস্থায়ী ব্যবস্থার মাধ্যমে জমিদারী প্রথা কায়েম করা হল। জমিতে ফসল হোক অথবা না হোক খাজনা দিতে হবে। খাজনা আর ফসলের উপর নির্ভরশীল নয়। সুতরাং ফসল ও সেচ ব্যবস্থার প্রতি আর নজর দেবার প্রয়োজন রইল না। নদীসমূহ সংস্কারের অভাবে পলি মাটিতে হাজিয়া মজিয়া গেল। নদীগুলির বর্ষার পানি বহন করবার আর ক্ষমতা রইল না। দেখা দিতে লাগল বন্যার পর বন্যা। ইংরেজ লেখক টমসন বলেছেনঃ “দুর্ভিক্ষ হয়ত পূর্বেও হইত। কিন্তু ইংরেজ আমলে প্রতি কয়েক বৎসর অন্তর অন্তর দেখা দিতে লাগিল দুর্ভিক্ষ।” ইংরেজরা আমাদের দেশে তাদের শিল্পের প্রয়োজনীয় কাচামাল সরবরাহের এবং শিল্পজাত দ্রব্যাদি দেশের অভ্যন্তরে সুষ্ঠভাবে সামগ্রিক অর্থনৈতিক কল্যাণকে সামনে রেখে এই রেলব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়নি। রেল লাইন গড়ে তুলবার জন্য নদীর উপর পুল তৈরী হল। কিন্তু এই পুলগুলো এমনভাবে করা হল যাতে নদীগুলোর স্বাভাবিক গতি রূদ্ধ হয়ে যায়। টমসন বলেছেন নদীগুলির উপর পুল তৈয়ারী করিতে বাণিজ্যিক স্বার্থ ভিন্ন আর কিছুই লক্ষ্য করা হয় নাই। ইংরেজদের সাম্রাজ্যবাদী নীতি সে ব্যবস্থাকে ধ্বংস করল, বন্যা ও দুর্ভিক্ষকে স্থায়ী করাল এবং আমাদের দেশকে চির দুর্ভিক্ষের দেশে পরিণত করল। এইভাবে আমাদের দেশে সৃষ্টি হল চিরস্থায়ী কৃষি সংকট। জমিদারী শোষণের সাথে সাথে এসে জুটল মহাজনী শোষণ। জমিদারী শোষণ ও মহাজনী শোষণ এই দুই শোষণ একে অপরেরর সাথে হাত মিলিয়ে গ্রামাঞ্চলে এক বিভীষিকার রাজত্ব কায়েম করল। এই দিকেই লক্ষ্য করে রমেশ দত্ত লিখেছেনঃ “ভারতবর্ষে রাষ্ট্রই জমি হইতে যে উদ্ধৃত্ত সৃষ্টি হয় তাহাতে বাধা সৃষ্টি করিয়াছে। ইহা একভাবে অথবা অন্যভাবে কৃষকের উদ্ধৃত্তকে আত্মসাৎ করিয়াছে।… একবাবে অথবা অন্যভাবে বাড়তি ট্রাক্সের মাধ্যেমে সমস্ত রকমের অর্থনৈতিক উদ্ধৃত্ত শুষিয়া নিয়া ইংল্যান্ডে চালান দেওয়া হয়। স্বাভাবিকভাবে ভারতবর্ষে যে আর্দ্রতা সৃষ্টি হয় তাহা দ্বারাই অন্যান্য দেশের জমিকে উর্বর করা হয়।”

          অন্যদিকে ইংরেজরা দেশীয় ব্যবসায়ী, কস্ট্রাক্টর, হিসাবরক্ষক, মালের যোগানদার হিসেবে একদল পরগাছা শ্রেণী সৃষ্টি করে। নিজেদের স্বার্থেই এরা চিরকাল ইংরেজদের অনুগত থাকে। এই সমস্ত ব্যবসাদার, মালের যোগানদার ও কন্ট্রাকটারই গড়ে তোলে মুৎসুদ্দী শ্রেণী। এই দুই শ্রেণী জমিদার-মহাজন এবং মুৎসুদ্দী শ্রেণীর পরে নির্ভর করেই বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদীরা আমাদের দেশে তাদের সাম্রাজ্যবাদী শাসন ও শোষণ অব্যাহত রাখে। আমাদের সমাজে যে পরিমাণ অর্থনৈতিক উদ্ধৃত্ত সৃষ্টি হয় তার সবটাই আত্মসাৎ কারে সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজ ও তার দেশীয় সহযোগী জমিদার মহাজন এবং মুৎসুদ্দীরা। ব্যারন অত্যন্ত সংগতভাবে বলেছেনঃ “ ইহাদের (ইংরেজরা)দ্বারা প্রচলিত জমি ও ট্রাক্স সংক্রান্ত নীতিসমূহ ভারতের গ্রাম্য অর্থনৈতিকে ধ্বংস করে এবং তাহার স্থানে বসায় পরজীবী জমিদার ও মহাজনদের। ইহাদের প্রচলিত বাণিজ্যিক নীতি ভারতীয় হস্তশিল্পকে ধ্বংস করে এবং সৃষ্টি করে শহরের ঘৃণ্য বস্তিজীবনকে…। ইহাদের প্রচলিত অর্থনৈতিক নীতি দেশীয় শিল্প বিকাশের সমস্ত রকমের সূচনাকে ধ্বংস করে এবং সৃষ্টি করে ফটকাবাজী  ও মুনাফাখোরদের, ছোটখাট, ব্যবসাদার, দালাল ও ফাঁকিবাজদের যাহারা পচনশীল সমাজের অতি মূল্যবান বাকী সম্পদটুকুও আত্মসাৎ করে।”

          এই ঐতিহাসিক পরিণতিতেই আমাদের দেখা দেয় উদ্ধৃত্ত জনসংখ্যা, খাদ্যঘাটতি, ব্যাপক অনাহার ও দূর্ভিক্ষ। আল্লার গজব হিসেবে আমাদের দেশে বন্যা, দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়নি। এগুলো দেখা দিয়েছিল বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের এবং তাদের সহযোগী জমিদার-মহাজন এবং মুৎসুদ্দিদের শোষণের ফলেই। সাম্রাজ্যবাদী ইরেজ, সামন্তবাদী জমিদার, মহাজন এবং ব্যবসায়ী, কন্ট্রাক্টর মুৎসুদ্দীরা আমাদের দেশের জনগণের বুকের উপর চাপিয়ে দিয়েছিল শোষণের তিন পাহাড়। আর এর ফলেই দেখা দেয় উদ্ধৃত্ত জনসংখ্যা।

সাম্রাজ্যবাদীরা এবং তাদের আদর্শ প্রচারকেরা লোকচক্ষু হতে এই তিন শোষণকে আড়াল করে রাখবার জন্যই “ উদ্ধৃত্ত জনসংখ্যার” তত্ত্ব প্রচার করত। আমাদের অর্থনৈতিক পশ্চাদপদতা অনাহার ও বুভুক্ষার জন্য তারা দায়ী করত আমাদের দেশের মানুষের “অলসতা,” “উদ্রোগহীনতা” উদ্ধৃত্ত সৃষ্টিতে সমাজের ব্যর্থতা জনসংখ্যা বৃদ্ধি প্রভৃতিকে। ঐতিহাসিক ভিনসেন্ট স্মিথ পাক-ভারতের ইতিহাস লিপিবদ্ধ করতে গিয়ে অতি সুক্ষ্মভাবে এ সমস্ত সাম্রাজ্যবাদী তত্ত্ব তুলে ধরেছেন। আর অর্থনীতিবিদ হিসেবে জারখার এবং বেরী সাহেব অর্থীনতিক তত্ত্ব হিসেবে এই সমস্ত সাম্রাজ্যবাদী প্রচারকে ব্যাখ্যা করিছেন।

তিন পাহাড় ও জনতাঃ-

          সুজলা-সুফলা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক দুর্ণতি ও পশ্চাদপদতা অনাহার ও দারিদ্র, দুর্ভিক্ষ প্লাবনের জন্য দায়ী ছিল তিন পাহাড়-সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজ,সামন্তবাদী জমিদার-জোতদার-মহাজন এবং মুৎসুদ্দী ব্যবসায়ী, কন্ট্রাক্টর ও সাম্রাজ্যবাদী ইয়রেজের পেটোয়া ধনীরা। নিজেদের কাঁধ হতে এই তিন পাহাড়কে সরাবার জন্যই আমাদের দেশের জনতা দীর্ঘ দুইশ বছর ধরে সংগ্রাম করে আসছে। পলাশীর যুদ্ধের পর যেদিন ইংরেজরা আমাদের দেশ দখল করেছে তার পরমূর্হুর্তে হতে এই সংগ্রাম শুরু হয়েছে। এই সংগ্রাম কোনদিন থামেনি। কখনও কখনও এই সংগ্রামের আগুন লেলিহান শিখার ন্যায় সমগ্র দেশকে ছেয়ে ফেলেছে। আবার কখনও এর বেগ প্রশমিত হয়েছে। কিন্তু কখনই সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সামন্তবাদ বিরোধী এই সংগ্রামের আগুন নিভে যায়নি।

          দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর এই আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে। এই আগুনে সম্পূর্ণরূপে ভস্মীভূত হবার উপক্রম হয় সাম্রাজ্যবাদী ও তার সহযোগী সামন্তবাদী ও মুৎসুদ্দীদের শোষণের আমানত। এমতাবস্থায় শঙ্কিত হয়ে উঠল বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদও মুসলিম লীগের সামন্তবাদী-মুৎসুদী নেতৃত্ব। বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের ও সামন্তবাদের বিরুদ্ধে আমাদের দেশের শ্রমিক, কৃষক, মধ্যবিত্ত মেহনতী মানুষের সংগ্রাম একটি সশস্ত্র সাধারণ বিপ্লবে রূপান্তরিত হয়ে পড়ে এই ভয়ে ভীত হয়ে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদীরা এবং সাম্রাজ্যবাদীদের সাথে নিবিড়ভাবে যুক্ত মুসলিম লীগের সামন্তবাদী মুৎসুদিবাদী নেতৃত্ব একটি আপোষ-মীমাংসায় পৌঁছানো। শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বের দুর্বলতার দরুন শ্রমিক শ্রেণী সেদিন সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ওপর স্বীয় নেতৃত্ব কায়েম করতে সক্ষম হয়নি। ফলে আপোষ ও বিশ্বাসঘাতকতার রাজনীতি জয়যুক্ত হল। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগষ্ট জন্মলাভ করল পাকিস্তান।

তিন পাহাড় বিদ্যামান রইলঃ-

          সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও মুৎসুদ্দি পুঁজির যে তিন পাহাড় আমাদের দেশের ওপর চেপে বসেছিল সেই তিন পাহাড় অপসারিত হল না। এরা বিদ্যামান রয়ে গেল। সাম্রাজ্যবাদী ঔপনিবেশিক শাসনের ধরন কেবলমাত্র বদলালো। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধোত্তর কালের বিপ্লবী পরিস্থিতিতে নিজেদের শাসন ও শোষণকে অব্যাহত রাখার জন্য সাম্রাজ্যবাদীরা নতুন কৌশল গ্রহণ করতে বাধ্য হল। এর নাম হল নয়া-উপনিবেশবাদ। এই নয়া-উপনিবেশবাদী শাসন ও শোষণকে অব্যাহত রাখার জন্য সাম্রাজ্যবাদীরা নির্ভর করছে তাদের দুই সহযোগীর ওপর সামন্তবাদ ও মুৎসুদ্দী আমলা পুঁজির ওপর। এই নয়া-উপনিবেশবাদ উপনিবেশবাদেরই আরও ধূর্ত মারাত্মক রূপ। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগষ্ট হতে সাম্রাজ্যবাদী প্রত্যক্ষ উপনিবেশিক পরিবর্তে দেখা দিয়েছে নয়া-উপনিবেশবাদী শাসন ও শোষণ।

 আমাদের দেশে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের অর্থনৈতিক অবস্থানসমূহ অক্ষুন্ন রয়েছে। আমাদের দেশের পাটের রপ্তানী বাজারের নিয়ন্ত্রণকারী হল ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদ। আমাদের দেশের চা শিল্পের ওপরও বৃটিশ পুঁজির প্রাধান্য বিদ্যামান। আমাদের দেশের চা বাগানের সংখ্যা হল প্রায় ১৪৩টি। এর মধ্যে জেমস ফিনেল ও ডানকানদের পরিচালিত চা বাগানেই হল প্রধান। ব্যাঙ্কের ক্ষেত্রেও বৃটিশ প্রভাব বিদ্যামান রয়েছে। লয়েডস, অস্ট্রেলিয়া প্রভূতি প্রতিষ্ঠান ব্যাঙ্কের ক্ষেত্রেও বৃটিশ স্বাক্ষর বহন করে চলেছে। বৃটিশ সিংহ আজ দুর্বল হয়ে পড়েছে। তার স্থান অধিকার করেছে আমেরিকা। আমাদের দেশের আমদানী ও রপ্তানী বাণিজ্যের প্রায় অধেকের জন্য দায়ী হল আমেরিকা। ব্যাঙ্ক ও বীমার জগতে আমেরিকার এক্সপ্রেস ও আমেরিকান ইন্সিওরেন্স কোম্পানীর প্রভাব প্রতিদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

          আমেরিকার সাহায্য ও ঋণের পরিমাণও প্রতি বছর বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। ১৯৬৫ সালের ৩০ শে মার্চ পর্যন্ত আমেরিকার পুঁজির পরিমাণ ছিল ১৫০৪ কোটি টাকা। ১৯৬৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর এর পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে ২২০০ কোটি টাকায় গিয়ে দাঁড়ায়। আমেরিকার ঋণ ও সাহায্যসহ ঋণ ও সাহায্যের নামে আমাদের দেশে ২৯০০ কোটি টাকার বিদেশী বিনিয়োগ নিয়োজিত হয়েছে। আমাদের দেশের প্রতিটি মানুষের মাথায় বিদেশী ঋণের বোঝার পরিমাণ হল ৪২ টাকা। ১৯৬৬-৬৭ সালে বিদেশী ঋণের সুদ হিসেবে আমাদের দিতে হয়েছে ৩৬০ কোটি ৭০ লক্ষ টাকা। ১৯৬৯-৭০ সালে ঋণের সুদ বাবদ দিতে হবে ৪৭৫ কোটি ৭০ লক্ষ টাকা। অর্থাং আমাদের অর্জিত সমগ্র বিদেশী মুদ্রার একশত ভাগের বিশ ভাগ খরচ করতে হবে ঋণের সুদ পরিশোধ করতে। ঋনের সুদ হিসাবে আমাদের যে অর্থ দিতে হচ্ছে পরিমাণগতভাবে তা হল পূর্ব বাংলার বাজেটের প্রায় দ্বিগুণ। আমেরিকার সাহায্যের প্রধান রূপ হল পণ্য সাহায্য।

          আমাদের দেশের ওপর মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী নয়া ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণের কব্জা সুপ্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে প্রধান হাতিয়ার হল পি,এল ৪৮০ পরিকল্পনা মোতাবেক আমেরিকার উদ্ধৃত্ত পণ্য সাহায্য পরিকল্পনা। ১৯৫৪ সালে বগুড়ার মোহাম্মাদ আলীর আমলে সর্বপ্রথম আমেরিকার সাথে পণ্য সাহায্য চুক্তি সম্পাদিত হয়। প্রেসিডেন্ট কেনেডীর আমলে এই চুক্তির পরিধি সম্প্রসারিত করা হয়। ১৯৬১সালের আগষ্ট মাসে সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী আমেরিকা পাকিস্তানকে ৩৫০ কোটি ৯০ লক্ষ টাকার পণ্যসামগ্রি, যথা গম, গুড়া দুধ, খাবার তেল, চর্বি, মাখন ইত্যাদি সরবরাহ করার প্রতিশ্রুতি দেয়। এই পণ্য সামগ্রী বিক্রয় করে যে অর্থ পাওয়া যায় তা দ্বারাই গ্রাম্য ওয়ার্কস প্রোগ্রামের চালু করা হয়। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী কুমিল্লায় গবেষণাগার খোল হয়। এইভাবে গ্রাম্য ওয়ার্কস প্রোগ্রামের জন্ম হয়েছে আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদীদের বদৌলতে এবং পরিকল্পনার সাহায্যে আমেরিকা আমাদের দেশের গ্রাম্যঞ্চলেও প্রবেশ করেছে এবং গ্রাম্য অর্থনীতিকে কাজ করেছে।  ১৯৬৯ সালে ৩রা অক্টোবর আমেরিকার সাথে পাকিস্তানের নতুন করে ১১ কোটি টাকার পণ্য সাহায্য চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম এড শিক্ষা কেন্দ্র, শিক্ষক-ছাত্র কেন্দ্র ও মিলনায়তন ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানও গড়ে উঠেছে আমেরিকার টাকায়। নয়-উপনিবেশবাদী শাসন ও শোষণের হোতা আমেরিকা আমাদের দেশের কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি প্রতিটি ক্ষেত্রে আধিপত্য বিস্তার করেছে। ইপিআইডিসি, কৃষি উন্নয়ন সংস্থা প্রভূতি সরকারী প্রতিষ্ঠানসমূহও আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদীদের সাথে জড়িত।

          এতভিন্ন আমেরিকার ব্যক্তিগত পুঁজির অনুপ্রবেশও ঘটছে আন্তর্জাতিক ফাইন্যান্স করপোরেশন হল বিশ্বব্যাংকের সাথে সংশ্লিষ্ট একটি সংস্থা। দাউদ করপোরেশনকে এই সংস্থা তিন কোটি টাকার উপর ঋণ দিয়েছে। আন্তর্জাতিক ফাইন্যান্স করপোরেশন পাকিস্তান ইনডাষ্ট্রিয়াল ক্রেডিট এ্যান্ড ইভেষ্টমেন্ট করপোরেশকে ১৯৪২৩০ টাকা ঋণ দিয়েছে।

 ঋণ ও সাহায্যের নামে আমেরিকার যে টাকাই আমাদের দেশে আসছে তার মূল লক্ষ্য হল মুনাফা আরও বেশী মুনাফা। খোদ আমেরিকাতে আমেরিকার পুঁজির মুণাফার হার দিনের পর দিন হ্রাস পেয়ে চলেছে। অন্যদিকে আমাদের মত দেশে আমেরিকার পুঁজি তুলনামূলকভাবে বেশী মুনাফা অর্জন করতে সক্ষম। মিঃ ব্যারন খোদ আমেরিকা ও অনুন্নত দেশে আমেরিকার পুঁজি কর্তৃক মুনাফা অর্জনের একটি তুলনামুলক তালিকা উপস্থিত করেছেঃ নিম্নরূপঃ-

     বছর                           অনুন্নত দেশে                          আমেরিকায়

                                  (শতকরা হিসাবে)                      (শতকরা হিসাবে)

    ১৯৪৫                              ১১.৫                                     ৭.৭

     ১৯৪৬                              ১৪.৩                                     ৯.১

     ১৯৪৭                              ১৮.১                                     ১২.০

     ১৯৪৮                              ১৯.৮                                     ১৩.৮

এই তালিকার সাথে সাম্প্রতিককালের ঘটনাবলীকেও মিলিয়ে দেখতে হবে। বিদেশে মার্কিন পুঁজি বিনিয়োগ ও মুনাফা সম্পর্কে মার্কিন সরকারের পক্ষ হতে একটি সরকারী হিসাব প্রকাশ করা হয়েছে।

বিদেশে বিনিয়োজিত মার্কিন পুঁজির পরিমাণ (এক মিলিয়ন ডলার হিসাবে এক মিলিয়ন= দশলক্ষ। এক ডলার= পাঁচ টাকা।

          বছর             পুঁজির            পরিমাণ মুনাফা

          ১৯৬০            ১৬৭৪                       ৩৫৬৬

          ১৯৬৫            ৩৪১৮                      ৫৪৬০

          ১৯৬৬            ৩৫৪৩                      ৫৬৮০

উপরের তথ্যসমূহ হতে জানা যায় যে, প্রতি বছর বিদেশে মার্কিন পুঁজি লগ্নীর পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং সাথে সাথে বৃর্দ্ধি পাচ্ছে মুনাফার পরিমাণ। এই তথ্যসমূহ আরও প্রমাণ করে যে, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ এক নম্বরের নয়া-উপনিবেশবাদী শক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এইচ.এন. ব্রেলসফোর্ড সঠিক ভাবেই বলেছেনঃ “পুরাতন সাম্রাজ্যবাদ কর আদায় করত। নতুন সাম্রাজ্যবাদ সুদে টাকা ধার দেয়।” (ইস্পাত ও সোনার যুদ্ধ-পৃ-৬৫)

          নতুন সাম্রাজ্যবাদ নয়া-উপনিবেশবাদী মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ঋণের সুদ ও মুনাফা হিসেবে আমাদের দেশের সম্পদের সিংহভাগই নিজের দেশে চালান দিচ্ছে। আমাদের দেশের অর্থনৈতিক অনগ্রসরতা কাটাবার জন্য সম্পদের প্রয়োজন। কিনতু এই সম্পদ দেশে থাকছে না বিদেশে চলে যাচ্ছে। এটা হল বাস্তব সত্য। সত্যকে চিরকালের জন্য ঢেকে রাখা যায় না। জাতিসংঘকেও বাধ্য হয়ে বাস্তব সত্যকে স্বীকার করতে হয়েছে। ১৯৫৩ সালের এশিয়া ও দুর প্রাচ্যের অর্থনৈতিক পরিক্রমাতে বলা হয়েছেঃ “ সমগ্র লাভের বিরাট অংশ চলিয়া যায় দেশের বাহিরে।”

          মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের তল্পীবাহকরা প্রচার করে বেড়ায় যে, আমাদের দেশ হল অনুন্নত দেশ। আমাদের দেশকে গড়ে তোলার জন্য মার্কিন সাহায্য প্রয়োজন। ওদের স্মরণ রাখা দরকার যে, আমাদের দেশ যতটুকু উদ্ধৃত্ত সম্পদ সৃষ্টি করতে পারে আমেরিকা তা উচ্চহারে ঋণ ও মুণাফা আকারে নিয়ে যাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে সম্প্রতিকালের ভারতের দুইটি উদাহরণ উল্লেখ করা যেতে পারে। ১৯৬৭ সালে আমেরিকা ভারতে ১ কোটি ৪০ লক্ষ টাকা লগ্নী করে। ঐ পুঁজি হতে আমেরিকা সেই বছরই লাভ করে ২ কোটি টাকা। এর চেয়েও বিষ্ময়কর হল আর একটি ঘটনা। আমেরিকা ভারতীয় একটি প্রতিষ্ঠানে ৪০ লাখ টাকা খাটায়। আর সেই বছরই সে লাভ করে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য । আমাদের দেশেও এমন ঘটনা ঘটছে। কিন্তু আমাদের দেশের সব কথা জানা যায় না। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের এই চরিত্রকে লক্ষ্য করে এরিক সিকক বলেছেন যে, অনুন্নত দেশে আমেরিকা ঋণ ও সাহায্য বাবদ যা দেয় তার অনেক বেশী সে তুলে নেয় এবং এই বাড়তি টাকা আবার সে লগ্নী করে।

          মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীরা আমাদের দেশে রাস্তা, ঘাট, বাঁধ ইত্যাদি ব্যাপারে সাহায্য করছে কিন্তু এ সমস্ত পরিকল্পনার পিছনেও মার্কিন নয়া-উপনিবেশবাদী স্বার্থ নিহিত রয়েছে। একটি পরিকল্পনা করার জন্য প্রয়োজন সেই দেশের মাটি, পানি, আবহাওয়া প্রভূতি সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান। আমেরিকার পরিকল্পনা বিশারদদের এ সমস্ত বিষয় নিয়ে মাথা ঘামাবার প্রয়োজন নেই। গঙ্গা-কপেতাক্ষ ও কাপ্তাই পরিকল্পনার কথাই ধরা যাক। এই দুইটি পরিকল্পনা এমনভাবে করা হয়েছে যাতে এই দুই অঞ্চলের মানুষের জীবনে সীমাহীন দুঃখ ডেকে এনেছে। কাপ্তাই পরিকল্পনার ফলে চট্রগ্রামের এক বিরাট অংশে প্রতি বছর দেখা দিচ্ছে বন্যা। গঙ্গা-কপেতাক্ষ পরিকল্পনা কুষ্টিয়ার এক ব্যাপক অঞ্চলকে শস্যহীন করে ফেলেছে। প্রফেসর ফ্রানকেল এদিকে লক্ষ্য রেখেই মন্তব্য বরেছেনঃ “ অনেক উদাহরণ দেওয়া যাইতে পারে যেখানে রেলপথ, রাস্তা, বন্দর, সেচ পরিকল্পনা বেঠিক স্থানে বেঠিকভাবে কার্য্যকর করিবার ফলে সম্পদ সৃষ্টি না করিয়া তাহার বিপরীত ঘটিয়াছে।“ (অনুন্নত দেশের অর্থনৈতিক বিকাশ র্পঃ ১৪)।

          মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ঋণ পন্য সাহায্য পরিকল্পনা সাহায্য প্রভুতি অস্ত্রের সাহায্যে পূর্ব বাংলার সমাজে যেটুকু অর্থনৈতিক উদ্ধৃত্ত সৃষ্টি হচেছ তা আত্মসাৎ করছে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ আমাদের দেশের কৃষির উন্নতি চায় না, শিল্পবিকাশ চায় না। আমাদের দেশের কৃষির উন্নতি হলে আমরা আর আমেরিকা হতে উদ্ধৃত পচা গম, তেল, গুড়া দুধ, খাবার তেল আনব না। আমেরিকার বিরাট বাজার নষ্ট হবে। আমাদের দেশে শিল্প বিকাশ ঘটলে আমেরিকার পুঁজির আর প্রয়োজন পড়বে না। আমেরিকার পুঁজির মুনাফা লুণ্ঠনের রাস্তা বন্ধ হয়ে যাবে। আমেরিকা আমাদের দেশের বন্যা নিয়ন্ত্রণ চায় না। প্রতি বছর বন্যা দেখা দেবে ফসল ধ্বংস হবে ও দুর্ভিক্ষ আসবে। আর আমাদের দেশে বেশি বেশি করে মার্কিন গম ও চাল আমদানী করা হবে এইভাবে আমাদের দেশের ওপর আমেরিকার কজ্বা আরও সুদুঢ় হবে।

 অন্যদিকে অসম বাণিজ্যে মাধ্যমে আমেরিকা দেশের সম্পদ ও অর্থনৈতিক উদ্ধৃত্ত আত্মসাৎ করছে। আমারা বিদেশে প্রধানতঃ কাঁচামাল, কৃষিজাত পণ্যসামগ্রী রপ্তানী করি এবং বিদেশ হতে যন্ত্রপাতি, শিল্পের জন্য কাঁচামাল ও শিল্পজাত দ্রব্যদি আমদানি করি। এটা পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, আমাদের আমদানী ও রপ্তানী বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র হল আমেরিকা। আমেরিকা প্রতি বৎসর যন্ত্রপাতি ও শিল্পজাত দ্রব্যাদির মূল্য বৃদ্ধি করছে ও কৃষিজাত পণ্য সামগ্রীর দাম হ্রাস করছে। আমেরিকা আমাদের দেশ এই বিশ্বের অন্যান্য অনুন্নত দেশকে এইভাবে লুণ্ঠন করে চলেছে। এই লুণ্ঠনের চিত্র জাতিসংঘ কর্তৃক পরিবেশিত তথ্য পর্যন্ত লুকাতে পারেছি। ১৯৬১ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে পরিবেশিত জাতিসংঘের মাসিক বুলেটিন হতে নিম্নোক্ত তথ্য পাওয়া যায়। ১৯৫৩ সালের মূল্যকে ১০০ হিসাবে ধরেই প্রতি বছরের মূল্যের ওঠানামা বিচার করা হয়েছে।

          সাল    কাঁচামালের মূল্য                          শিল্পজাত পণ্যের মূল্য

          ১৯৫৮               ৯৬                                    ১০৬

         ১৯৫৯       ৯৪                                    ১০৬

         ১৯৬০       ৯৩                                     ১০৯

১৯৫২ সাস হতে শিল্পজাত পণ্যের মূল্যের তুলনায় কাঁচামালের মূল্য একশত ভাগের ১২ ভাগ হ্রাস পেয়েছে। এই ক্ষতিকে বহন করতে হয়েছে আমাদের দেশের মত অনুন্নত দেশসমূহকে। জাতিসংঘের  পরিবেশিত তথ্যাবলীর নিরিখে যদি হিসেব করা যায় তবে প্রতিবছর সাম্যাজ্যবাদী দেশগুলো এবং এর মধ্যে প্রধান হল আমেরিকা, অনুন্নত দেশসমূহ হতে প্রতি বছর ১০০০ মিলিয়ন ডলার অর্থাং ৫০০ কোটি টাকা লুণ্ঠন করে। সাম্রাজ্যবাদীদের বিশেষ করে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের চক্রান্তের ফলে আমাদের দেশেও পাট পানির দামে বিক্রি হচ্ছে। পাটের মূল্য হ্রাস পূর্ববাংলার  সমগ্র অর্থনীতিতে মন্দা দেখা দিচ্ছে। এইভাবে সাম্রাজ্যবাদীরা, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীরা অসম বাণিজ্যের মাধ্যমে দেশে অর্থনৈতিক উদ্ধৃত্ত সৃষ্টির পথে বাধা সৃষ্টি করছে।

সামন্তবাদী ও মুৎসুদ্দি-আমলা পুঁজিঃ-

          মার্কিন সাম্যাজ্যবাদীদের দেশীয় সহযোগী হল সামন্তবাদী জোতদার মহাজন এবং মুৎসুদ্দি আমলা শ্রেণী। আমাদের দেশে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্তবাদের সাথে নিবিড়ভাবে যুক্ত থেকে যে ব্যবসায়ী পুঁজির জন্ম ঘটেছিল সেই ব্যাবসায়ী পুঁজিকেই মুৎসুদ্দি পুঁজি বলা হয়। কনট্রাকটর, মালের যোগানদার ও ব্যবসায়ী হিসেবে এই মুৎমুদ্দি শ্রেণী পুঁজি সঞ্চয় করে। কনট্রাকটর, মালের যোগানদার ও ব্যবসায়ী হিসেবে এই মুৎমুদ্দি শ্রেণী নির্ভর করত বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের উপর। সাম্রাজ্যবাদের সহিত সহযোগিতা করেই এরা আমাদের দেশের সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী গণতান্ত্রিক বিপ্লবের শত্রুতা করে। ১৯৪৭ সালের ১৪ ই আগষ্টের পর সাম্রাজ্যবাদের সহিত সহযোগিতায় নিজেদের শ্রেণীস্বার্থে এরা আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে আমাদের দেশের অর্থনীতেতে নিজেদের অবস্থানকে শক্তিশালী করে। এইভাবে মুৎসুদ্দি পুঁজি মুৎসুদ্দি-আমলা পুঁজিতে পরিণত হয়।

          পাকিস্তানের বাইশ বছরের ইতিহাস হল সাম্রাজ্যবাদ-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের সহযোগী এই মুৎসুদ্দি আমলা পুঁজির লুণ্ঠনের ইতিহাস। আমাদের দেশে অন্তত সীমাবদ্ধ আকারে যে শিল্পবিকাশ ঘটেছে সে সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক সার্ভেতে মন্তব্য করা হয়েছেঃ “ অবস্থার চাপে পড়িয়া ব্যক্তিগত মালিকানা ভিত্তিক অংশের তুলনায় সাধারণ মালিকানা ভিত্তিক  অংশ বৃদ্ধি পাইয়াছে এবং কিছু কিছু সামাজিক ব্যবস্থা সহ সাধারণ মালিকানা ভিত্তিক অংশ যোগাযোগ, শক্তি, সেচ, প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ বিমানবন্দর এবং বন্দরসমূহকে তদারক করে। শিল্পক্ষেত্রে উন্নয়ন সংস্থাসমূহ রহিয়াছে। ইহাদের মাধ্যমে রাষ্ট্র সুনিদিষ্ট শিল্পসমূহ পরিচালনা করে যেমন পাট, কাগজ, ভারী ইঞ্জিনিয়ারিং, জাহাজ, ভারী রাসায়নিক, সার,চিনি, সিমেন্ট ,কাপড়, ঔষধ ও প্রাকৃতিক গ্রাস। অবশ্য ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার বদলে নয় ব্যক্তিগত মালিকানা ভিত্তিক শিল্প প্রচেষ্টাকে সাহায্য করিবার এবং এই প্রচেষ্টার পরিপূরক হিসাবে এই উন্নয়ন সংস্থাসমূহকে গড়িয়া তোলা হয়। রাষ্ট্র কর্তৃক কোন কোন প্রতিষ্ঠান গড়িয়া তুলিবার পর ইহাদিগকে ব্যক্তিগত মালিকানার হাতে তুলিয়া দেওয়া হইয়াছে।”

জাতিসংঘের অর্থনৈতিক পরিক্রমার বক্তব্য সম্পর্কে মনতব্য করা নি¯প্রয়োজন। বিদেশী বিশেষ ভাবে মার্কিন পুঁজির তত্ত্বাবধানে বাইশ বছর ধরে এদেশের মুৎসুদ্দী আমলা পুঁজি চালিয়ে যাচ্ছে উলঙ্গ শোষণ। লন্ডনের ফিনান্সিয়াল টাইমস পর্যন্ত মন্তব্য করতে বাধ্য হয়েছেঃ “ একদিকে কুখ্যাত বাইশটি পরিবারের হাতে জমা হইয়াছে অফুরন্ত অর্থ ও সম্পদ; আর অন্যদিকে বিরাজ করিতেছে শহরের শ্রমিক ও গ্রামের কৃষকদের ভিতর সীমাহীন দারিদ্র।”

“অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, একজন করাচীর ব্যবসায়ী আগামী দুই বছরের ভিতর একটি মার্কিন কোম্পপানীর সহযোগিতায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ২৫ কোটি টাকা লগ্নী করিবেন। ইহার মধ্যে থাকিবে দুইট তৈল শোধনাগার, একটি সারকারখানা, কাগজ ও পাটকল এবং তেল উত্তোলন।” (ইকনমিক টাইমস – ১৯৬৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারী।)

১৯৬৯ সালের ২৮  ফেব্র“য়ারী তারিখের দি ষ্টেসম্যান কাগজে মন্তব্য করা হয় মাত্র ২২টি পরিবার পাকিস্তানের সমগ্র শিল্পের তিন ভাগের দুইভাগ এবং ব্যাংকসমূহের পাঁচ ভাগের চার ভাগের মালিক।” সাম্রাজ্যবাদ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সহযোগী এই বিশটি পরিবার সমগ্র পাকিস্তানের জনগণের ওপর প্রতিষ্ঠিত করেছে বেপরোয়া শোষণের রাজম্ব।

          মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের আর এক সহযোগী হল সামন্তমক্তি। গুনার মীরডাল তার এশিয়ান ড্রামাতে বলেছেনঃ “ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পপর যে নেতৃত্বের হাতে ক্ষমতা আসিল তাহাদের শ্রেণী ভিত্তিই তাহাদের রাজনৈতিক বন্ধ্যাত্বের জন্য দায়ী।” পাঞ্জাবের ক্ষেত্রে সমগ্র আবাদী জমির একশত ভাগের ৬০ ভাগের মালিক ছিল বড় বড় জমিদারেরা। সিন্দু ইহল শোষণমূলক সামন্তশক্তির দুর্গ। সমগ্র আবাদী জমির মালিক ছিল কয়েকশত জমিদার। আইয়ুব আমলে ভূমি সংস্কার সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে মীরডাল আরও বলেন বস্তুত ভূমি সংস্কারের আসল উদ্দেশ্য হইল বংশানুক্রমিক জমিদারদের শক্তিকে সুসংহত করা। পূর্ববাংলার সমগ্র আবাদী জমির বিরাট অংশের মালিক জোতদার মহাজন। ১৯৬৩-৬৪ সালের মাস্টার সার্ভে হতে জানা যায় যে, বর্গা চাষে নিয়োজিত কৃষি খামারের সংখ্যা হল ২৩ লক্ষ ১০ হাজার। এ সংখ্যা মোট কৃষি খামারের একশত ভাগের ৩৭ ভাগ। অর্থাং কৃষক জনতার অন্তত একশত ভাগের ৩৭ ভাগ হল বর্গাচাষী। এ ভাবে পূর্ববাংলার গ্রামাঞ্চলে সুবিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে চলেছে জোতদারী শোষণ।

 জোতদারী শোষণ আর মহাজনী শোষণ এরা হল দুই যমজ ভাই। এরা একে অপরকে শক্তিশালী ও সাহায্য করে। জোতদারী শোষণে উৎপীড়িত হয়ে দুটি অন্নের জন্য কৃষক মহাজনের দুয়ারে ধর্ণা দেয়। আর মহাজন সুদের জালে জড়িয়ে ফেলে কৃষকের জমি হস্তগত করে। ১৯৬০ সালের সরকারী রিপোর্ট অনুযায়ী ৬০ লক্ষ ১৪ হাজার কৃষক পরিবারের মধ্যে ৩০ লক্ষ ১ হাজার পরিবারের মাথায় ঋণের বোঝা রয়েছে। অর্থাং একশতটি কৃষক পরিবারের মধ্যে ৪৯ টি কৃষক পরিবার ঋণে আবদ্ধ। অবস্থা আর খারপ। গ্রামাঞ্চালে বিভিন্ন ধরণের ঋণ প্রচলন  রয়েছে। টাকার ঋণের সাথে সাথে শস্য ঋণেরও প্রচলন রয়েছে। শস্যঋণ হিসেবে ধান কড়ারী ব্যবস্থা ব্রাপক আকার ধারন করেছে। একমণ কর্জ নিলে কৃষককে পাঁচ মণ পর্যন্ত ধান দিতে হয়।

          সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও মুৎসুদ্দী আমলাপুঁজি এ শক্তি আমাদের দেশে গড়ে তুলেছে শাসন ও শোষেণের এক ইমারত। আর এ শোষণের এই ইমারতকে রক্ষা করবার জন্য নিযুক্ত করা হয়েছে পাহারাদার। এই পাহারাদার হল আমাদের সরকার। গত বাইশ বছর ধরে আমাদের দেশে যতগুলো সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সমন্ত সরকারই শাসন ও শোষণের এই ইমারতকে রক্ষা করে চলেছে। সরকারের সমন্ত কাযকলাপ এই তিন শক্তির স্বার্থের সেবায় নিয়োজিত হয়েছে। নয়া-উপনিবেশবাদী শাসন ও শোষণের হোতা হল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ। সরকার অনুসৃত বিভিন্ন নীতির মাধ্যমে আমাদের দেশের ওপর মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নয়া-উপনিবেশবাদী শাসন ও শোষণের শৃঙ্খল সুদুঢ় হয়েছে। পাকমার্কিন সামরিক চুক্তি, পাক-মার্কিন পণ্য চুক্তি, পাক-মার্কিন সাংস্কৃতিক চুক্তি, পাক-মার্কিন বাণিজ্যিক চুক্তি, পাক-মার্কিন নৌ-চলাচল চুক্তি , পাক-মার্কিন লেন-দেন চুক্তি, অর্থনৈতিক চুক্তি, পাক-মার্কিন ছাত্র ও শিক্ষক বিনিময় চুক্তি প্রভূতি হল এরই প্রকাশ।

          অন্যদিকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ আমাদের দেশের ওপর তাদের নয়া-উপনিবেশিক শাসন ও শোষণের কজ্বা শক্ত করবার জন্য নির্ভর করছে সামন্তবাদ ও আমলা পুঁজির  ওপর। সরকারের অনুসৃত নীতি সমূহ প্রতিক্ষেত্রে এই দুই শক্তির স্বার্থকেই সুসংহত করছে। ট্যাকস হলিডে অর্থাং কর মওকুফ, বেপরোয়া মুনাফা অর্জনের জন্য সংরক্ষিত ও প্রয়োজনীয় বাজার সৃষ্টি ,সরকার তত্ত্বাবধানে কল কারখানা নির্মানের জন্য প্রয়োজনীয় জমি ও অন্যান্য জিনিসের ব্যবস্থার মাধ্যমে সরকারের পক্ষ হতে এভাবে আমলা পুঁজিকে সাহায্য করা হচ্ছে, বোনাস ভাইচার পদ্ধতি অনুযায়ী আমাদের দেশের পুঁজিপতি বিদেশে আমাদের দেশের তৈরি পণ্য রপ্তানী করে যে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে সেই মুদ্রা দ্বারা বিদেশ হতে পণ্য আমদানী করে অতিরিক্ত মূল্যে সেই সমস্ত পণ্যসামগ্রী দেশীয় বাজারে বিক্রি করতে সক্ষম হয়। রপ্তানী বাণিজ্য বৃদ্ধি ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের জন্যই নাকি সরকার এই ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। কিন্তু আসল ঘটনা অন্যরূপ। সরকার বিদেশে রপ্তানীকারকদের রপ্তানীকৃত পন্যসামগ্রীর গ্যারান্টি হিসেবে কাজ করে। এর বদলে রপ্তানীকারকগণ সুবিধাজনক শর্তে বিদেশে মাল রপ্তানী করতে পারে। অন্যদিকে আমদানীকৃত মাল উচ্চহারে বিক্রির মধ্য দিয়ে বিরাট মুনাফা অর্জনের সুযোগও তাদের ঘটে। রপ্তানী বাণিজ্য বৃদ্ধি ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের জন্য বোনাস ভাউচারের ব্যবস্থা গৃহীত হয়েছে  আমলা পুঁজির কল্যাণে।

সরকারের অনুসুত নীতিসমূহ সামন্তবাদী শক্তিসমূহের কজ্বাকেও সদূঢ় করে চলেছে। ১৯৫৯ সালের জমিদারী উচ্ছেদ আইন অনুযায়ী জমিদারী প্রথা ও মধ্যসত্বা বিলোপের নামে সামন্তবাদী শক্তিসমূহকে অব্যাহত রাখা  হয়েছে এবং শক্তিশালী করা হয়েছে। ১৯৫১ সালের ইই অনুযায়ী সামন্তবাদী জোতদারী ও মহাজনী পথাকে স্বীকার করা হয়এবং খাজনার শোষণের মাত্র আরও বহুগুণ বৃদ্ধি করা হয় । ২৯ টি জেলা নিয়ে গঠিত হয় অবিভক্ত বাংলাদেশ।সে সময় খাজনার পরিমাণ ছিল ৩ কোটি টাকা। ১৭ জেলা নিয়ে গঠিত হয় পূর্ববাংলা, কিন্তু খাজনার পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ১৬ কোটি টাকাতে। ১৯৫১ সালের আইনে জমির সিলিং বেঁধে দেওয়া হয় ১০০ বিঘাতে। আইয়ুব আমলে এই সিলিং ৩৭৫ বিঘা পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয় । আজও সে অবস্থা বিদ্যামান।

          আমাদের দেশের সমগ্র কৃষক জনতার একশত জনের প্রায় ৭০ জন হল ভূমিহীন ও গরীব কৃষক। সরকারী ১৯৬০ সালের কৃষি  সেন্সাসের রিপোর্ট অনুযায়ী জানা যায় যে, একশত জন কৃষকের মধ্যে ৩৬ জন কৃষকের গরু ও লাঙ্গর নেই । গরু-লাঙ্গল বিহীন এই ৩৬ জন কৃষক সাধারণভাবে ভূমিহীন কৃষক। এক বিঘা হতে তিন বিঘা-চার বিঘা জমির মালিকের সংখ্যা হল একশত জনের প্রায় ৩৭ জন। জোতদার-মহাজন ধনী কৃষক হল অবশিষ্ট একশত জনের প্রায় ১০জন। জোতদার-মহাজন পুরাপুরি সামন্তবাদী শক্তি। আমাদের দেশের ধনী কৃষকের সামন্তবাদী বৈশিস্ট্য হল প্রধান। ধনী কৃষক জমি বর্গা দেয় সুদে টাকা খাটায় ও ধান দাদন দেয়। এ সমস্ত হল সামন্তবাদী শোষণের প্রকাশ। আবার ধনী কৃষক অসম বাণিজ্যের ফলে সাম্রাজ্যবাদী বাজারের শোষণে শোষিত। সে তার পাটের, আখের তামাকের, হলুদের ন্যায্য দাম পায় না। অন্যদিকে তাকে উচ্চ মূল্যে কল-কারখানাজাত দ্রব্যসামগ্রী ক্রয় করতে হয়। এ দিক দিয়ে তারা আবার শোষিত। সরকার অনূসৃত কৃষিনীতি জোতদার-মহাজন ও ধনী কৃষকের হস্তকেই শক্তিশালী করছে। জমির গ্যারান্টির বিপরীতে সরকারী কৃষি ব্যাংকের ঋণ দেয়া হয়। ভূমিহীন ও গরীব কৃষকের হাতে যেহেতু জমি নেই অথবা গ্যারান্টি দেবার মত সে পরিমাণ জমিএনই সে জন্য তারা সরকারী ঋণের সুবিধা ভোগ করতে পারে না। সরকারী কৃষি ব্যাংকের ঋণ ভোগ করে জোতদার-মহাজন ও ধনী-কৃষক। তারা সে টাকা আবার বেশিসুদে লগ্নী করে। সরকারী গভীর নলকূপ ব্যবস্থা, উন্নত ধরনের সার ও বীজ পরিকল্পনা, ইরি ও বোরো পরিকল্পনাসমূহও জোতদার-মহাজন ও ধনী-কৃষকের হস্তকে শক্তিশালী করে। কেননা ভূমিহীন কৃষকের একেবারে জমিই নেই, আর গরীব কৃষকের জমির পরিমাণও অতি সামান্য। যাদের জমি নেই তারা উন্নত ধরণের সার ও বীজ ব্যবহার করবে কোথায়? যাদের জমি নেই অথবা সামান্য জমি আছে তারা বোরে পরিকল্পনা,ইরি পরিকল্পনা ও গভীর নলক’প ব্যবস্থার সুযোগ গ্রহণ করবে কেমন করে? এভাবে সরকারী ব্যবস্থাবলী গ্রাম্যঞ্চলে সামন্তবাদী শক্তিসমূহকে দিনের পর দিন শক্তিশালী করে চলেছে। গ্রামাঞ্চলে গত বাইশ বৎসর ধরে ক্রমাগত সামন্তবাদী শোষণের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। সামন্তবাদী শোষণের দোজখের আগুনের সমন্ত গ্রামাঞ্চল আজ পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। অনাহার জর্জরিত কৃষকের বুক ফাটা কান্না আজ গ্রামাঞ্চলের আকাশ বাতাসকে মথিত করে তুলেছে। অন্ন বস্ত্র নেই, বাড়ি নেই –পূর্ব বাংলার গ্রামাঞ্চল আজ শ্মশানে পরিণত হয়েছে। গোয়াল ভরা গরু, আর গোলা ভরা ধান গ্রামবাংলা সম্পর্কে যে প্রবাদের প্রচলন একদিন ছিল আজ তা কৌতুকের বিষয়বস্তুতে পরিনত হয়েছে। সীমাহীন লুণ্ঠন ও বেপরোয়া অত্যাচার ধ্বংসের বিভীষিকা আর মৃত্যুর তান্ডবের দৃশ্য যদি কোথাও বিরাজ করে থাকে তবে তা বিরাজ করছে পূর্ব বাংলার গ্রামাঞ্চলে।

          এ ভাবে সাম্রাজ্যবাদের দুই দেশীয় সহযোগী সামন্তবাদ ও মুৎসুদ্দী আমলা পুঁজি আমাদের সমাজে যেটুকু অর্থনৈতিক উদ্ধৃত্ত সৃষ্টি করে তা আত্মসাৎ করে। আমাদের দেশের অতীত ও বর্তমান সুস্পভাবে এ ঘোষণাই করছে যে, আমাদের দেশের জনগণের উপর সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও মুৎসুদ্দি আমলা পুঁজি এ তিন শোষণের যে পাহাড় চেপে বসেছে সেই তিন শোষণেই আমাদের দেশের অর্থনৈতিক অনগ্রসরতা, বণ্যা কৃষির অধঃপতন এবং জাতীয় জীবনের সমস্ত রকমের দুঃখ দারিদ্র বেকারী, অনাহার ও ক্ষুধার জন্য দায়ী। আমাদের দেশের উপর আজ যে নয়া-উপনিবেশবাদী শোষণ চেপে রয়েছে তার হোতা হল আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ। আজ বিশ্বের অন্যান্য সমস্ত সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ভিতর প্রধান হল আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ ও সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ। এখনও পর্যন্ত আমাদের দেশে মূল সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হল আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ। কিন্তু সাহায্য, ঋণ মারফত আমাদের দেশে সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদীদের অনুপ্রবেশ ঘটেছে এবং এটা বৃদ্ধি পেতে থাকবে।

          ভৌগোলিক অবস্থানের জন্য আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে পূর্ব-বাংলার একটি বিশেষ স্থান রয়েছে। রাজনীতিগত দিক দিয়ে বিচার করলে পূর্ব বাংলার ভৌগোলিক অবস্থান অতি গুরুত্বপূর্ণ। ভিয়েতনামে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের সুনিশ্চিত পরাজয় পূর্ব-বাংলার এই গুরুত্বকে আরও বৃদ্ধি করেছে। পূর্ববাংলা হতে গণচীনের অবস্থান বেশি দুরে নয়। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের উদ্দেশ্য হল গণচীনের বিরুদ্ধে জোট গড়ে তোলা। সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদীদের উদ্দেশ্যও একই। এদের দুইজনের দৃস্টিই পূর্ব-বাংলার প্রতি নিবন্ধ। এ দিকে লক্ষ্য রেখেই বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থের বিরুদ্ধে, বিশ্বের বিপ্লবী জনতার বিরুদ্ধে আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ ওসোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ হাত মিলাচ্ছে। অবশ্য নয়া উপনিবেশবাদী শাসন ও শোষণ চালিয়ে যাবার ক্ষেত্রে এদের নিজেদের মধ্যে বিরোধ এবং দ্বন্দ বিরাজ করছে। আমাদের দেশের রাজনীতি ও অর্থনীতের ক্ষেত্রে এর প্রতিফলনও ঘটছে। সাম্প্রতিকালে আমাদের দেশে সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদীরাও ঋণের সুদ, বিভিন্ন পরিকল্পনা প্রণয়নের ব্যবস্থাদি বাবদ খরচ,সাহায্য ইত্যাদি মারফত আমাদের দেশের অর্থনৈতিক উদ্বৃত্ত আত্মসাৎ করছে।

শোষণের তিন পাহাড়

          কেবলমাত্র শোষণের এই তিন পাহাড়কে ধ্বংস করেই আমরা ক্ষুধার হাত হতে মুক্তি পেতে পারি। অনাহার ও ক্ষুধার জন্য দায়ী জনসংখ্যা বৃদ্ধি নয়, দায়ী হল এই তিন পাহাড়। আমাদের দেশের বন্যা ও দুর্যোগের জন্য প্রকৃতি দায়ী হল এই তিন পাহাড়। এই তিন পাহাড়ই আমাদের দেশের বন্যা নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনাকে কার্যকরী হতে দেয় না। আধুনিক বিজ্ঞানকে মানুষের সেবায় নিয়োজিত হতে দেয় না। জনগণের এই তিন শত্রু আমাদের দেশের মানুষ যে সম্পদ সৃষ্টি করে তার সবটুকুই লুণ্ঠন করে নেয়। বন্যা নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনাকে কার্যকরী করবার অথবা আধুনিক বিজ্ঞানকে কাজে লাগাবার জন্য কোনরূপ সম্পদই আর অবশিষ্ট থাকে না।

আমাদের দেশের জনতার জানী দুষমন এই তিন শক্তির শাসন ও শোষণকে আড়াল করবার জন্য এই তিন শক্তি এবং তাদের তল্পী বাহক ও আদর্শ প্রচারকেরা জনসংখ্যা ও আল্লার  গজবের তত্ত্ব জোর গলায় প্রচার করে বেড়ায়। আমাদের দেশের সরলমতি কিছু কিছু ব্যাক্তি তাদের এই বক্তব্যের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনও করে।

          সাম্রাজ্যবাদ, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও তার দুই দেশীয় সহযোগী সামন্তবাদ এবং আমলা-পুঁজি আমাদের দেশের উপর নিজেদের শাসন ও শোষণ অব্যাহত রাখার জন্যই আমাদের দেশের যা কিছু পচা ও গলিত, প্রতিক্রিয়াশীল ও জনস্বার্থ বিরোধী সেই সমস্ত ধ্যান-ধারণা ও আদর্শকে শক্তিশালী করে চলেছে। জনসাধারণ যাতে নিজেদের শক্তি  সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠতে না পারে এবং শত্রুদের চিনতে না পারে সেজন্য তারা প্রচার করে বেড়ায় যে, সব কিছু হল নসিবের দোষ। জনতার ভিতর নিহিত রয়েছে যে শক্তি ও আত্মবিশ্বাস সেই শক্তি ও আত্মবিশ্বাসকে ধ্বংস করবার জন্যই তারা অদৃষ্টবাদের তত্ত্বকে তুলে ধরে। আমাদের দেশের সরলপ্রাণ শ্রমিক, কৃষক বিশেষ করে কৃষক জনতাকে মোহাচ্চন্ন করে রাখার জন্য তারা ধর্মকেও ব্যবহার করে। ক্ষুধার হাত হতে মুক্তির লড়াই, সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও আমলা-পুঁজির শাসন ও শোষণের হাত হতে মুক্তির সংগ্রামকে তারা ধর্মের বিরুদ্ধে সংগ্রাম বলে প্রচার করে বেড়ায়। এ ভাবে জনগণের এই তিন জানী দুষমন ধর্মকে নিজেদের সংকীর্ণ শ্রেণীস্বার্থ রক্ষা করবার কাজে ব্যবহার করে। সাম্রাজ্যবাদী ডালেস সাহেব খুব খোলাখুলি ভাবেই নিজেদের উদ্দেশ্য বর্ণনা করেছেন। তিনি তার শান্তি অথবা যুদ্ধ নামক পুস্তকে ঘোষণা করেছেন “ প্রাচ্যে ধর্মের শিকড় সমাজের অত্যন্ত গভীরে প্রবেশ করেছে। এ ভাবে প্রাচ্যের সাথে আমাদের যোগসূত্র  স্থাপিত হয়েছে এবং আমাদের কর্তব্য হল ইহাকে আবিষ্কার করা এবং এটার বিকাশ সাধন করা।” ডালাসের বক্তব্য সুস্পষ্ট। ডালেসের মত হচ্ছে অর্থাং আমাদের ন্যায় দেশে আমেরিকান নয়া-উপনিবেশবাদী শাসন ও শোষণ টিকিয়ে রাখবার জন্য ধর্মকে ব্যবহার করতে হবে। ডালেসের এই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতেই জামাতের কার্যকলাপ বিচার করতে হবে। জামাত এবং অন্যান্যরা ধর্মের নামে আমাদের দেশে আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ,সামন্তবাদ ও আমলা-পুঁজির শাসন ও শোষণকে অক্ষুন্ন রাখবার জন্য কাজ করে চলেছে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ এই সমস্ত প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক দলকে আশ্রয় দিচ্ছে, গড়ে তুলছে এবং সাহায্য করছে। এই ভাবে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ডালেসের উপদেশ অনুযায়ী  বিভিন্ন প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিদক দলের মাধ্যমে নিজেদের সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের অনুকুলে আমাদের দেশে ধর্মকে কি ভাবে ব্যবহার করা যায় তার পদ্ধতি আবিষ্কার করছে ও উহার বিকাশ সাধন করছে।

তিন পাহাড়কে উচ্ছেদের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রামঃ-

          আমাদের দেশের জনতা প্রতিদিনকার অভিজ্ঞাতা হতে আজ এই শিক্ষাই লাভ করেছে যে, ক্ষুধা হতে মুক্তির একমাত্র পথ হল আমাদের দেশের মাটি হতে সাম্রাজ্যবাদী, সামন্তবাদী ও আমলা পুঁজি এই তিন পাহাড়ের উচ্ছেদ সাধন। এই তিন পাহাড় আমাদের দেশের শ্রমিক, কৃষক, মধ্যব্ত্তি জনগণের কাঁধে যে শোষণভার চাপিয়ে দিয়েছে অনাহার ও মৃত্যু, ক্ষুধা ও বেকারত্ব, বন্যা ও দারিদ্রের জন্য তাঁরাই দায়ী। এই তিন পাহাড়কে উচ্ছেদের সংগ্রামই হল ক্ষুধার হাত হতে মুক্তির সংগ্রাম। এটা হল এক বিপ্লবী সংগ্রাম। জনতার তিন শত্র“ সর্বশক্তি দিয়ে জনতার এই সংগ্রামকে বাধা দিচ্ছে জনতার বিরুদ্ধে তারা প্রয়োগ করছে প্রতিবিপ্লবী শক্তি। জনতা তার বিপ্লবী শক্তি দ্বারাই এই প্রতিবিপ্লবী শক্তিকে ধ্বংস করতে পারেন। ক্ষুধার হাত হতে মুক্তির সংগ্রাম হল প্রতিবিপ্লবী শক্তির বিরুদ্ধে জনতার বিপ্লবী শক্তির সংগ্রাম। এই বিপ্লবের রূপ হল কৃষিবিপ্লব। কারণ আমাদের দেশের জাতীয় অর্থনীতি হল মূলতঃ সামন্তবাদী অর্থনীতি। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ মুলতঃ এই সামন্তবাদী অর্থনীতির উপর নির্ভর করেই আমাদের দেশে গড়ে তুলছে নয়াউপনিবেশবাদী শাসন ও শোষণ। এই সামন্তবাদ প্রধান অর্থনীতিই জাতীয় বিকাশের অগ্রগতির পথে অন্তরায়  হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এই অর্থনীতি  শিল্প বিকাশকে প্রতিপদে ব্যাহত করছে। সামন্তবাদী ধান, ধারণা, সংস্কৃতি  ভাবাদর্শ সমগ্র সমাজ জীবনে আধুনিক বিজ্ঞান ভিত্তিক ধ্যান ধারণা এবং জনগণের গণতান্ত্রিক শিক্ষা  সংস্কৃতি ও চেতনাবোধের বিকাশের ও অগ্রগতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সামগ্রিকভাবে বিচার করলে সাম্রাজ্যবাদী পরোক্ষ নয়া উপনিবেশবাদী শাসন ও শোষণকালে সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে আমাদের মত আধা উপ-নিবেশিক-আধা-সামন্তবাদী দেশের নিপীড়িত জাতির দ্বন্দ্ব মূলতঃ সামন্তবাদের সহিত কৃষকের দ্বন্দ্বের রূপান্তিরিত হয়ে উঠে সামন্তবাদ বিরোধী সংগ্রামের ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়ায় ব্যাপক গ্রামাঞ্চল। এই সংগ্রামের প্রকাশ ঘটে শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বে কৃষক জনতার বিপ্লবী সংগ্রামে। এই কৃষি বিপ্লবই হল আমাদের মত আধা ঔপনিবেশিক-আধা সামন্তবাদী দেশের বিপ্লবের মৌলিক বৈশিষ্ট্র। কৃষিবিপ্লবের সাফল্যের মধ্যে দিয়েই আমাদের দেশের শ্রমিক, কৃষক, মধ্যব্ত্তি সমগ্র জনতা সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও আমলাপুঁজি এই তিন শোষণ ও শাসনের পাহাড় হতে মুক্ত হবে। এই মুক্তি সংগ্রামে আমাদের দেশের শ্রমিক ও কৃষকরাই কেবলমাত্র আগ্রহী নয়, আগ্রহী হল আপামর জনসাধারন। কৃষি বিপ্লব শাসন ও শোষণের তিন পাহাড়কে উৎখাত করে সমগ্র দেশে এক অনুক’ল পরিবেশ সৃষ্টি করবে। এই অনুকুল পরিবেশের উপর নির্ভর করে বিকাশ লাভ করবার সুযোগ পাবে জনগণতান্ত্রিক অর্থনীতি, শিল্প, বাণিজ্য, শিক্ষা ও সংস্কৃতি। কৃষি বিপ্লব একমাত্র আঘাত হানবে জনগণের জানী দুষমন সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও আমলাপুঁজির উপর। কৃষি বিপ্লব সমাজের অন্যান্য সমস্ত শ্রেণীর স্বার্থকে রক্ষ করবে।

মুক্তির পথঃ-

          কৃষি বিপ্লবের মূল কাজ হবেঃ আমাদের দেশের ঔপনিবেশিক ও আধা সামন্ততান্ত্রিক সামাজিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সম্পূর্ণ বিলোপ সাধন- দেশের বুক হতে সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী, সামন্তবাদী ও আমলা পুঁজির শোষন সম্পূর্ণ উচ্ছেদ সাদন, জাতিগত নিপীড়নের পরিপূর্ণ অবসান এবং শোষন ও নিপীড়নের স্বার্থ রক্ষাকারী রাষ্ট্রযন্ত্রকে ধ্বংস করে ওনিপীড়নমূলক অর্থনীতি ও সংস্কৃতির সম্পূর্ণ উচ্ছেদ করে তার স্থানে জনগণের কৃষক, মজুর,মধ্যব্ত্তি সাধারণ মানুষের স্বার্থরক্ষাকারী জনগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রযন্ত্র, অর্থনীতি, রাজনীতি ও সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠাকরণ।

সামন্তবাদী শোষণের পরিপূর্ণ উচেছদ সাধন করতে হবে। জোতদারী মহাজনী প্রথার বিলোপ সাধন করে বিনামূল্যে জোতদার মহাজনদের জমি ভুমিহীন ও গরীব কৃষকদের ভিতর বিলি করতে হবে। সামন্তবাদী শোষণের পরিপূর্ণ বিলোপ সাধনের ফলে কৃষক হবে জমির মালিক। যুগ যুগ ধরে প্রচলিত সামন্তবাদী শোষণের অবসানের ফলে কৃষক যে অর্থনৈতিক উদ্ধৃত্ত সৃষ্টি করে তা আর সামন্তবাদী জোতদার মহাজনদের পকেটে যাবে না।তা  জাতীয় উন্নয়নের জন্য ব্যায়িত হবে। জাতীয় উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য যে অর্থনৈতিক উদ্ধৃত্ত তাকে আর সামন্তবাদীরা আত্মসাৎ করতে পারবে না। এটা কৃষি উন্নয়নের কাজে ব্যবহৃত হবে।

          অন্যদিকে কৃষক জনতার সৃজনশীল কর্মক্ষমতার উৎস খুলে যাবে। কৃষক হবে নিজের উৎপাদনের মালিক। কোনরূপ সামন্তবাদী শক্তিই আর তার উৎপাদনের মালিকান দাবী করতে পারবে না। ফলে উৎপাদন এক লাফে অনেক দুর এগিয়ে যাবে। কৃষক জনতা নতুন শক্তি ও বিশ্বাসে বলীয়ান হয়ে উঠবে। কৃষি অর্থনীতির তথ্য জাতীয় অর্থনীতির সংকট সমাধানের ক্ষেত্রে আমরা এক ধাপ এগিয়ে যাব। সামন্তবাদী পাহাড় অপসারিত করবার মধ্য দিয়ে কৃষক জনতা আত্মবিশ্বাস ফিরে পাবে এবং সৃজনশীল কর্মক্ষমতায় জোয়ার দেখা দেবে। সামন্তবাদী শোষণের অবসান এবং জমি বিলি করবার পর আমাদের দেশে পধানতঃ স্বল্প পরিমাণ জমির মালিক ক্ষুদে কৃষকের দেশে পরিণত হবে। আমাদের দেশের আবাদী জমির পরিমাণ হল প্রায় দুই কোটি বিশ লক্ষ একর। কৃষক পরিবারের সংখ্যা হল ৬০ লক্ষ ১৪ হাজার। এই মোট কৃষক পরিবারের একশত ভাগের ৭০ ভাগ হল গরীব ও ভুমিহীন কৃষক। সামন্তবাদী জোতদার-মহাজনরা সমগ্র আবাদী জমির এক শত ভাগের ৬০ বাগেরও বেশি জমির মালিক। জোতদার মহাজনের জমি ভুমিহীন ও গরীব কৃষকের মধ্যে বিলি করবার পর তারা প্রত্যেকে বিরাট পরিমাণ জমির মালিক হবে,না মালিক হবে খুবই অল্প জমির। কোন কোন ক্ষেত্রে একজন ভূমিহীন ও গরীব কৃষক মাত্র দুই তিন কাঠা জমির মালিক হবে। কোন কোন বুর্জোয়া বিশেষজ্ঞ এই ঘটনার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করি আমুল ভূমি সংস্কারের নীতির ব্যর্থতা সম্পর্কে গুরুগশ্ভীর আলোচনার সূত্রপাত করেন। কিন্তু যেহেতু তারা একটি বিশেষ শ্রেণীর দৃস্টিকোণ হতে আমুল ভূমি সংস্কারের নীতিকে বিচার করেন, সেহেতু তারা আমুল ভূমি সংস্কারের নীতির বৈপ্লবিক তাৎপর্যকে উপলব্দি করতে ব্যর্থ হন। ভূমিহীন ও গরবৈ কৃষকের অন্তরে সদ্য জ্বলতে থাকে একটা ক্ষুধার আগুন সে ক্ষুধা হল জমির ক্ষুধা। আমলি কৃষি সংস্কার ভূমিহীন  ও গরীব কৃষকের চিরকালের এ জমির ক্ষধাকে মেটাবে। ভূমিহীন ও গরীব কৃষক কি পরিমাণ জমি পেল এটা বড় প্রশ্ন নয়। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হল ভূমিহীন ও গরীব কৃষক জমি পেল এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত হল সামন্তবাদী শোষন। এটার ফলে ভূমিহনি ও গরীব কৃষকের জবিনে দেখা দেবে বৈপ্লবিক রূপান্তর। নতুন আত্মবিশ্বাসে তারা বলীয়ান হয়ে উঠবে। জীবনকে তারা নতুন দৃষ্টিতে দেখবে। তারা এটা উপলব্ধি করবে যে, সমস্ত দেশ জুড়ে চলেছে যে বৈপ্লবিক রূপান্তরের সংগ্রাম সেই সংগ্রামের অন্যতম প্রধান নায়ক হল তারাই। এ উপলদ্ধির মূল্য বিরাট।

          এ উপলব্ধিকে সামনে রেখেই পরবর্তী পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করতে হবে।আমরা আগেই বলেছি যে আমুল কৃষি সংস্কারের ফলে আমাদের দেশ ক্ষুদে কৃষকের দেশে পরিণত হবে। স্বল্প জমির মালিকদের পক্ষে জমির উন্নতি বিধান করা, চাষের ব্যাপারে উন্নত ধরনের সার ও বীজ এবং আধুনিক বিজ্ঞানের সাহায্য গ্রহণ অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। এদিকে লক্ষ্য রেখেই লেনিন বলেছেন যে, ছোট ছোট কৃষি খামার হল দারিদ্রের আবাসস্থল। কৃষকের হাতে জমি এই নীতি কার্যকরী করবার পর সমগ্র দেশে ব্যাক্তিগত মালিকান ভিত্তিক ছোট ছোট কৃষি খামার গড়ে উঠবে। কিন্তু এ ব্যবস্থা দারিদ্র ও কৃষি অর্থনীতির পশ্চাদপদতা দুর করতে সক্ষম হবে না। কৃষকের হাতে জমি বিলির সাথে সাথে কৃষক জনতার সামনে এ বাস্তব সত্যকে তুলে ধরতে হবে। অভিজ্ঞতা উপলব্ধির ভিত্তিতে কৃষক জনতাকে যৌথ কৃষিখামার গড়ে তুলবার পথে অগ্রসর করে নিয়ে যেতে হবে।কৃসক জনতাকে যৌথ কৃষি খামার গড়ে তুলবার পথে অগ্রসর করে নিয়ে যেতে হবে। ব্যক্তিগত মালিকানার স্থানে জন্ম নেবে যৌথ মারিকান। যৌথ-মালিকানা ভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থা আধুনিক বিজ্ঞান, উন্নত ধরনের সার বীজ ও আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি ইত্যাদিকে ব্যবহার করতে সক্ষম হবে। এটার ফলে অনুন্নত কৃষি ব্যবস্থা উন্নত ধরনের কৃষি ব্যবস্থায় উন্নীত হবে। কৃষি অর্থনীতির অনগ্রসরতা ও পশ্চাদপদতা দূর হবে। এভাবে সমাজে পূর্বের তুলনায় অনেক বেশি পরিমাণ অর্থনৈতিক উদ্ধৃত্তের সৃষ্টি হবে। এ অর্থনৈতিক উদ্ধৃত্তকে কৃষি অর্থনীতিসহ সমগ্র জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নের কাজে ব্যবহার করা যাবে।

          যৌথ মালিকানা ভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থা কৃষি অর্থনীতির অনেকগুলি সমস্য সমাধান করতে সক্ষম হলেও আরও অনেকগুলি সমস্য সমাধানের অপেক্ষায় থাকবে। আমাদের দেশ নদী-নালার দেশ। আমাদের দেশের ক্ষেত্রে বন্যা নিয়ন্ত্রণ, খাল-বিলের সংস্কার, বাঁধ ও সেচব্যবস্থার গুরুত্ব হল অপরিসীম। যৌ কৃষি ব্রবস্থাা এ সমস্ত সমস্যার পরিপূর্ণ সমাধান উপস্থিত করতে সক্ষম নয়। বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ, খালবিলের সংস্কার বৃহৎ সেচ ব্যবস্থা, পারিন সংরক্ষন প্রভূতি বৃহদাকারের পরিকল্পনাসমূহকে কার্যকরী করবার জন্য অধিক শ্রমশক্তি , সামগ্রিক পরিকল্পনা ও অর্থের প্রয়োজন। অধিকন্তু কৃষি অর্থনীতির মূল কথা গ্রামের সমস্ত শ্রমশক্তিকে কাজে লাগানো। যৌথ-কৃষি খামার ভিত্তিক ব্যবস্থা এ সমস্যার পরিপূর্ণ সমাধান উপস্তিত করতে পারে না। বর্তমান অবস্থায় প্রতিদিন আট ঘন্টা কাজে এ নিরিখে বিচার আমাদের দেশের কৃষক ৩৬৫ দিনের ভেতর ২৩০ দিন কাজ করে। ফেলিকস গ্রীন-কার্টেন অব ইগনোরেন্স ১৩৫ দিনের শ্রমশক্তি নষ্ট হয়। এ বিরাট পরিমাণ শ্রমশক্তির অপচয় কৃষি অর্থনীতি সহ জাতীয় অর্থনীতির সংকটকে চিরস্থায়ী করে তুলেছে। যৌথ কৃষি ব্রবস্তা এ সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে বেশ কিছুটা অগ্রগতি সাধন করতে সক্ষম হবে। কিন্তু যৌথ কৃষি ব্যবস্থার মাধ্যমে এ সমস্যার পরিপূর্ণ সমাধান সম্ভব নয়। যৌথ কৃষি ব্যবস্থাকে আরো সামগ্রিক ও পরিপূর্ণ রূপ দেবার মাধ্যমে এ সমস্যার পরিপূর্ণ সমাধান পাওয়া যায়। আমাদের মত ঘনবসতি সম্পন্ন আধা ঔপডনিবেশিক আধা সামন্তবাদী দেশে এ পদ্ধতির মাধ্যমে সম্যার পরিপূর্ণ সমাধানের পথে অগ্রসর হবে হবে। কৃষকের হাতে যখন মাঠে কাজ থাকবে না তখন সামগ্রিক ও পরিপূর্ণ যৌথ ব্যবস্থার মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলের বিরাট শ্রমশক্তিকে বড় বড় বাঁধ নির্মাণ, সেচ পরিকল্পনা, পানি সংরক্ষন প্রভূতি বৃহৎ আকারের কাজে নিয়োগ করা সম্ভব হবে। এ ভাবে গ্রামাঞ্চলের সমগ্র শ্রমশক্তিকে সম্পদ সৃষ্টির কাজে নিয়োগ করা যাবে। সমাজে আরও বেশি বেশি করে অর্থনৈতিক উদ্ধৃত্তের সৃষ্টি হবে। এ অর্থনীতির বিকাশ হবে ত্বরান্বিত।

এ কথা সত্য যে, পরিপূর্ণ ও সামগ্রিক যৌ-ব্যবস্থা যৌথ-মালিকানাকে নস্যাৎ করে নয় যৌথ-মারিকানাকে ভিত্তি করেই গড়ে উঠবে। কিন্তু যৌথ ব্যবস্থার অগ্রগতির পথে ক্রমান্বয়ে কৃষিতে সামাজেক মালিকানাবোধের কার্যকারিতাকেও তুলে ধরতে সক্ষম হবে। আমাদের মত আধা-সামন্তবাদী দেশে কৃষি অর্থনীতির ওপর নির্ভর করেই সমগ্র জাতীয় অর্থনীতি গড়ে উঠেছে। কৃষকের হাতে জমি সামন্তবাদী শোষণের অবসানের মধ্য দিয়ে যৌথ-কৃষি ব্যবস্থার পথ অনুসরণ করে আমরা আমাদের দেশের কৃষি অর্থনীতির চিরকালের বন্ধ্যাত্বকে দুর করতে সক্ষম হব। আমরা সক্ষম হব প্রকৃতির ধ্বংসকারী শক্তিসমূহ বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ওপর বিজয় অর্জন করতে।

          সামন্তবাদী শোষন হতে কৃষি অর্থনীতির মুক্তির সাথে সাথে দেশের অর্থনীতিকে সাম্রাজ্যবাদী ও আমলা পুঁজির হাত হতে মুক্ত করতে হবে। সমস্ত রকমের সাম্রাজ্যবাদী পুঁজি ও ঋণ এবং সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির অনুপ্রবেশ সম্পূর্ণরুপে বনধ করতে হবে। পূর্ব বাংরার সমস্ত বড় বড় শিল্প, ব্যাংক, বীমা, আমদানী-রপ্তানী বাণিজ্য, বিদ্যুৎ, পানি, ডাক,তার পরিবহন এবং পাট ও খাদ্য ব্যবসাকে সামাজেক সম্পত্তিতে পরিণত করতে হবে। এই সমস্তের মালিক হবে সমগ্র সমাজ। এর ফলে সাম্রাজ্যবাদীরা এবং আমলা পুঁজি আর অর্থনৈতিক উদ্ধৃত্ত আত্মসাৎ করতে পারবে না। সমাজ কর্তৃক সৃষ্ট সমগ্র অর্থনৈতিক উদ্ধৃত্ত জাতীয় অর্থনীতির বিকাশের কাজে ব্যবহৃত হবে। মাঝারী ধনিকদের বিকাশের সুযোগ করে দেয়া হবে। কিন্তু সাথে সাথে লক্ষ্য রাখতে হবে, যাতে তারা শ্রমিক, কৃষকের জনগণতান্ত্রিক রাষ্ট কর্তৃক অনুসৃত নীতিসমূহে এবং জনগণের স্বার্থের বিরুদ্ধে কোন কিছু না করেন। তারা যাতে অবাধ লুণ্ঠনের ব্যবস্থা না করতে পারেন সেজন্য তাদের মুনাফা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। অভিজ্ঞাতা ও উপলব্ধির মধ্য দিয়ে শিল্প ক্ষেত্রে অবশিষ্ট ব্যাক্তিগত মালিকানার বিলোপ সাধন করতে হবে। এবং ক্রমান্বয়ে সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। জনগণতান্ত্রিক পূর্ববাংলা পরিণত হবে সমাজতান্ত্রিক পূর্ব-বাংলায় । এ এক নিরবচ্ছিন্ন বিপ্লব। চিরকালের জন্য উচ্ছেদ হবে মানুষের উপর মানুষের শোষন। কৃষির উন্নতি শিল্পকে সাহায্য করবে। কৃষি যোগান দেবে শিল্পের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল এবং শ্রমিক শ্রেণীর আহার্য। তদুপরি কৃষক সমাজ হল শিল্পজাত দ্রব্যাদির সবচেয়ে বড় ব্যবহারকারী। অন্যদিকে শিল্প কৃষির যান্ত্রিকীকরণের ক্ষেত্রে ট্রাক্টর, হারভেষ্টার, রাসায়নিক সার, বিদ্যুৎও অন্যান্যভাবে সাহায্য করবে। শ্রমিক-কৃষকের মৈত্রি সূদূঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হবে। সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও আমলা পুঁজির উচ্ছেদ সাধন সমগ্র সমাজকে উন্নতির এক নতুন স্তরে উন্নীত করবে। এইভাবে জনগণের তিনশত্রুর ধ্বংস সাধন করে শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বে কৃষি বিপ্লবের বিজয়ের মধ্য দিয়ে আমাদের দেশের জনগণ সমগ্র অর্থনৈতিক উদ্ধৃত্তের মালিক হবে। সমগ্র সমাজ কর্তৃক সৃষ্ট অর্থনৈতিক উদ্ধৃত্তকে আর সাম্রাজ্যবাদ-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্রবাদ, সামন্তবাদ ও আমলা পুঁজি আত্মসাৎ করতে পারবে না। এই অর্থনৈতিক উদ্ধৃত্তের উপর নির্ভর করেই আমরা এক নতুন দেশ গড়ে তুলতে সক্ষম হব। সাম্রাজ্যবাদীদের আদর্শ প্রচারকেরা প্রচার করে বেড়ান যে, আমাদের দেশে যেহেতু সম্পদের অভাব সে জন্য বিদেশী সাহায্য বাতিত অর্থনৈতিক উন্নয়ন অসম্ভব। সাম্রজ্যবাদীদের স্বার্থেই ইহা প্রচার করা হয়। শোষণের তিন পাহাড়কে ধ্বংস করে আমাদের দেশে জনগণই হবে দেশের সমগ্র সম্পদের মালিক। আর এই সম্পদের উপর নির্ভর করেই শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বে আমাদের দেশের জনগণ গড়ে তুলতে সক্ষম হবে সমৃদ্ধশালী এক সমাজব্যবস্থা। এ সমাজে বন্য নিয়ন্ত্রিত হবে। সৃজনশীল কর্মশক্তির অধিকারী দেশের সমগ্র জনসংখ্যাকে নিয়োগ করা হবে নতুন নতুন সম্পদ সৃষ্টির কাজে। দেশ হতে চিরকালের জন্য নির্বাসিত হবে অনাহার ও ক্ষুধা। আমাদের দেশের সর্বব্যাপী ক্ষুধা ও অনাহারের জন্য দায়ী জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও আল্লার গজব নহে। ক্ষুধা ও অনাহারের জন্য দায়ী হল শোষণের তিন পাহাড়-সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও আমলা পুঁজি। শোষণের এ তিন পাহাড়কে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করার ফলেই আমাদের দেশ হতে চিরকালের জন্য দুর হবে অনাহার ও ক্ষুধা, বন্যা ও অন্যান্য প্রাকুতিক দুর্যোগ, খাদ্যঘাটতি ও বেকারত্ব। শ্রমিক শ্যেণীর নেতৃত্বে কৃষি বিপ্লবকে জয়যুক্ত করার মধ্য দিয়েই আমরা ক্ষুধা হতে মুক্তি পাব। এই পথেই আমাদের দেশের জনতা অগ্রসর হচ্ছে। এই সংগ্রামের বিজয়ের ফলেই শস্য শ্যামল পূর্ববাংলা ধন-ধান্যে,ফলে-ফুলে, হাসি আর গানে মেতে উঠবে।

 

Advertisements


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s