ফিলিপাইনে সরকার ও মাওবাদীদের মধ্যকার শান্তি আলোচনা থমকে গেছে

মাওবাদী কমিউনিস্ট গেরিলা

মাওবাদী কমিউনিস্ট গেরিলা

ফিলিপাইনের সরকারের সঙ্গে কমিউনিস্ট মাওবাদীদের অতি গুরুত্বপূর্ণ শান্তি আলোচনা ভেস্তে দিয়েছে দেশটির প্রেসিডেন্ট দুতার্তে। আলোচনার শর্ত অনুযায়ী, কারাবন্দী ৪০০ মাওবাদী বিদ্রোহীকে মুক্তি দেয়ার প্রস্তাব ‘অগ্রহণযোগ্য’ বিবেচনা করে তিনি এ আলোচনা স্থগিতের ঘোষণা দেন। এর ফলে ছয় মাস ধরে দুই পক্ষের মধ্যে চলমান অস্ত্রবিরতি বাতিলের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

নরওয়ের মধ্যস্থতায় দেশটির রাজধানী অসলোতে ফিলিপাইন সরকার ও কমিউনিস্ট মতাদর্শের মাওবাদী বিদ্রোহী গোষ্ঠী নিউ পিপলস আর্মির (এনপিএ) মধ্যে ধারাবাহিক শান্তি আলোচনা চলছিল। এ আলোচনা এগিয়ে নিতে দু’পক্ষ অস্ত্রবিরতিও পালন করছে। চলতি মাসের শেষে দু’পক্ষের পরবর্তী বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। এর মাঝেই আলোচনা স্থগিতের ঘোষণা দিলেন দুতের্তে।

স্থানীয় সময় শনিবার জন্মশহর দাভাওয়ে এক বক্তব্যে দুতের্তে বলেন, ‘৪০০ মাওবাদী বিদ্রোহীকে মুক্তি দেয়ার শর্ত গ্রহণযোগ্য নয়। তাই আমি আলোচনা চালিয়ে যেতে প্রস্তুত নই। আলোচনা বাদ দিয়ে সরকারপক্ষের লোকজনদের দেশে ফিরে আসার নির্দেশ দিয়েছি।’  তিনি আরো বলেন, ‘আমি শান্তি আলোচনা সফল করতে অনেক ছাড় দিয়েছি। অসলোতে আলোচনায় অংশ নিতে বিদ্রোহী নেতাদের মুক্তি দিয়েছি। কিন্তু নতুন করে আর কোনো শর্ত মানা সম্ভব নয়।’ যেসব বিদ্রোহী নেতা অসলোতে শান্তি আলোচনায় অংশ নিয়েছেন, তাদের দেশে ফিরে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
এরপর দুর্মুখ প্রেসিডেন্ট দুতার্তে কমিউনিস্ট পার্টির সশস্ত্র শাখা নিউ পিপলস আর্মিকে ‘সন্ত্রাসী’ গোষ্ঠী হিসেবে আখ্যা দেন। উভয় পক্ষের মধ্যে যে দুর্বল ঐকমত্য ছিল, সেখান থেকে উভয়েই সরে এসেছে। ফলে ফিলিপাইনের প্রান্তিক অঞ্চলে নতুন করে সশস্ত্র বিবাদ শুরু হতে পারে। এসব অঞ্চলে কমিউনিস্ট আন্দোলন এখনো টিকে আছে। আবার অনেক জায়গায় তা শুরুও হচ্ছে।
ফিলিপাইনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডেলফিন লরেনজানা ঘোষণা দিয়েছেন, এই মাওবাদী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ‘সর্বাত্মক যুদ্ধ’ শুরু হবে। আরেক জেনারেল সতর্ক করে দিয়েছেন, তাঁর সেনারা ‘তাদের ঘাঁটিতে চতুর্দিক থেকে আক্রমণ করবে’। ওদিকে মাওবাদীরাও কম যায় না। তারা ভাবলেশহীনভাবে বলেছে, সরকার সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু করুক না। গর্ব করে তারা বলেছে, ‘সর্বাত্মক যুদ্ধ আমাদের কাছে নতুন কিছু নয়’।
দুতার্তের গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী অঙ্গীকারের মধ্যে একটি ছিল এ রকম যে, দ্বন্দ্ব-সংঘাতপূর্ণ ও দরিদ্র অঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার করা হবে। কিন্তু কমিউনিস্টদের দাবী সরকার না মানায় মাওবাদীরা আবারও গেরিলা যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরে যাওয়ার কারণে দুতার্তের এই প্রতিজ্ঞা পূরণ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

অন্যদিকে ফিলিপাইন পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি অসমতা ও দারিদ্র্যপীড়িত দেশ, সেখানে ভাগ চাষও পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি, যার জন্য দেশটি কুখ্যাত। সেখানে ব্যাপারটা এমন যে, নিপীড়ক ভূস্বামী, লোভী মধ্যস্বত্বভোগী ও সুবিধাবাদী রাজনীতিকেরা নিয়মিতভাবে লাখ লাখ সাধারণ কৃষককে নির্যাতন করেন। এই কৃষকেরা এখনো প্রকৃত অর্থে ভূমি সংস্কার কর্মসূচি থেকে লাভবান হননি।

এই নিপীড়নের ফলে দেখা গেল, ফিলিপাইনের গ্রামীণ অঞ্চলে মানুষের মধ্যে প্রভূত ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। মানুষের মধ্যে সামগ্রিকভাবে এই ক্ষোভ আছে বলে মানুষ বিদ্রোহ করছে, যাদের বেশির ভাগই মাওবাদীদের নেতৃত্বে কমিউনিস্ট ভাবাদর্শে উজ্জীবিত। কমিউনিস্ট আন্দোলন ১৯৮০-এর দশকের ফিলিপাইনে একনায়ক মার্কোসের আমলে চরমে পৌঁছেছিল। কিন্তু এই আন্দোলন সম্প্রতি শক্তি হারিয়েছে বলে সরকার পক্ষ বলছে ।

আজ দেখা যাচ্ছে, বড় বড় বিদ্রোহী গোষ্ঠীর উত্থানের কারণে এই আন্দোলন অন্যদিকে মোড় নিচ্ছে। বিশেষ করে, মোরো ইসলামিক লিবারেশন ফ্রন্টের কথা বলা যায়, যারা সরকারের সঙ্গে ২০১৫ সাল থেকে আলোচনা করে আসছে, যদিও মাঝে নানা ছেদ পড়েছে। তা সত্ত্বেও দুতার্তে কমিউনিস্টদের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী শান্তিচুক্তি করতে আগ্রহী ছিলেন, যিনি নিজ শহর দাভাওয়ে যুদ্ধরত বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে সমঝোতা আনার চেষ্টা করেছিলেন। আবার তিনি একজন স্বঘোষিত ‘সমাজতন্ত্রী’, যার সঙ্গে কমিউনিস্টদের সম্পর্ক তুলনামূলকভাবে ভালো। অনেকেই মনে করেন, এই দীর্ঘদিনের মাওবাদী বিদ্রোহের রাশ টানতে তাঁর ওপরই বেশি ভরসা রাখা যায়।

এমনকি দুতার্তে কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শ্রম, সমাজকল্যাণ, কৃষি সংস্কার ও দারিদ্র্য দমন কমিশনের মন্ত্রী বানাতে চেয়েছিলেন। আর এখানেই তিনি অন্য ফিলিপিনো প্রেসিডেন্টদের চেয়ে ভিন্ন। বস্তুত দুতার্তে ফিলিপাইনের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান তাত্ত্বিক হোসে মারিয়া সিসনের ছাত্র। অনেক বছর তাঁদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। কিছুদিন আগেও এমন আশা ছিল যে, ছাত্র-শিক্ষকের মিলন হবে। শিক্ষক তো নেদারল্যান্ডসে নির্বাসনে আছেন, সম্ভাবনা ছিল, তিনি ফিলিপাইনে ফিরে আসবেন। এটা করতে দুতার্তে প্রশাসনকে বহুদূর যেতে হতো। এর জন্য ওয়াশিংটনের সন্ত্রাসী তালিকা থেকে তাঁর শিক্ষককে বের করে আনতে হতো।

এর মধ্যে দুই দফা উচ্চপর্যায়ের আলোচনা হয়েছে, অসলো ও রোমে। ফলে এমন আশা সৃষ্টি হয়েছিল যে, দ্রুতই পারস্পরিকভাবে গ্রহণযোগ্য চুক্তির মাধ্যমে এশিয়ার সবচেয়ে পুরোনো কমিউনিস্ট বিদ্রোহের অবসান হবে। সিসনও আনন্দিত হয়ে বলেছিলেন, ‘আবার আমি দুতার্তের কাছে কৃতজ্ঞ, তিনি শান্তি আলোচনা এগিয়ে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন।’ প্রাক্তন ছাত্র ও বর্তমানে ফিলিপাইনের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী মানুষটির প্রতি তিনি এভাবেই কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিলেন।

প্রাথমিকভাবে শান্তি আলোচনায় সফলতা আসার পর অনেক ভাষ্যকারই কিছুটা ঠাট্টার সুরে বলেছিলেন, দুতার্তে শিগগিরই নোবেল শান্তি পুরস্কারের দাবিদার হবেন। সর্বোপরি কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট হুয়ান ম্যানুয়েল সান্তোস অনেক বছরের চেষ্টায় ফার্ক বিদ্রোহীদের আস্থা অর্জন করে তাদের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করেছেন। ফলে তিনি গত বছর নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন। কিন্তু দুটি ব্যাপার দুতার্তের প্রচেষ্টা ব্যাহত করেছে।

প্রথমত ও সর্বাগ্রে দুতার্তে খেপে গিয়ে বলছে, মাওবাদীরা কাঠামোগত ঐকমত্য ও আত্মবিশ্বাস তৈরি হওয়ার আগে নানা দাবি তুলেছে। সরকার শীর্ষ কমিউনিস্ট নেতাদের মুক্তি দেওয়ার পর তাঁরা আরেক দফা দাবি উত্থাপন করে। এতে সামরিক বাহিনীসহ যারা কমিউনিস্টদের সঙ্গে দীর্ঘদিন তিক্ত লড়াই করেছে, তারা বিরক্ত ও বিরোধিতা জানাচ্ছে। এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে দুতার্তে বাহ্যত তাঁদের সতর্ক করে দেন, তাঁরা যেন বেশি দাবি না করেন। কিন্তু তাতে কাজ হয়নি।

এরই মাঝে কমিউনিস্টদের স্থানীয় ইউনিটগুলো যুদ্ধবিরতি ও চলমান শান্তি আলোচনার মধ্যে কয়েকটি বিলাসবহুল রিসোর্ট ও সেনাদের ওপর হামলা চালিয়েছে। সেনাবাহিনী বলছে, এই সময় শান্তি আলোচনার সুযোগ নিয়ে মাওবাদীরা প্রায় ১০০০ নতুন গেরিলা সদস্য রিক্রুট করে ফেলেছে।

এই পরিপ্রেক্ষিতে দুতার্তে ভাবতে শুরু করেন, কমিউনিস্টদের সতর্ক করে স্বল্প মেয়াদে কৌশলগতভাবে জয়লাভ করতে চাচ্ছেন, যিনি এর বাইরে যাবেন না।

উল্লেখ্য, এনপিএ ফিলিপাইন কমিউনিস্ট পার্টির সশস্ত্র অংশ। প্রায় ৫০ বছর ধরে এ মাওবাদীদের সাথে দেশটির সরকারের সঙ্ঘাত চলছে। সঙ্ঘাতে এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। ১৯৮৯ সালে ফিলিপাইনে অবস্থিত মার্কিন সেনা কলোনিতে সশস্ত্র অভিযান চালিয়ে বিশ্বব্যাপী আলোচনায় আসে এ মাওবাদী বিদ্রোহীরা।

সূত্রঃ আল জাজিরা থেকে নেওয়া।

 

Advertisements


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s