নকশালদের জেল ভাঙার গল্প

naxal4

ইনস্পেক্টর জেনারেল অব প্রিজনস কৃষ্ণ সিং মোক্তান এর লেখা থেকে …

প্রেসিডেন্সি জেলে আড়াইশো কট্টর নকশালপন্থী ছিলেন। এঁদের মধ্যে পুরুষ এবং মহিলা বন্দিদের মধ্যে প্রায় সবাই ছিল তরুণ-তরুণী। এঁরা সবাই ছিল উজ্জ্বল ছাত্র, কলকাতা এবং অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ও কলা বিভাগের উচ্চ ডিগ্রিধারী। এঁরা কেমিস্ট্রি, ফিজিক্স, বায়োলজি, অঙ্ক, কর্মাস, পলিটিক্যাল সায়েন্স সহ বিভিন্ন বিষয়ের কৃতী ছাত্র। সপ্তাহে একদিন এইসব নকশালপন্থী বন্দিদের বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজনরা বিস্কুট সহ শুকনা খাবার, সাবান এবং দাঁতের মাজন নিয়ে জেলগেটে দেখা করতে আসতেন। দেখা করতে আসা এইসব ব্যক্তিদের নাম, ঠিকান, বন্দির সঙ্গে সম্পর্ক ইত্যাদি তথ্য একটা রেজিস্টারে লিখে রাখা হত আর এসব যাচাই করার দায়িত্বে থাকতেন কলকাতা পুলিশের স্পেশাল ব্যাঞ্চের ডেপুটি কমিশনার এবং জেলা পুলিশ সুপারিন্টেনন্ড ও ডিআইবি। সপ্তাহে একবার এই দেখা-সাক্ষাতের ব্যবস্থা ছিল এবং এই দেখা-সাক্ষাতের নির্ধারিত সময় ছিল দশ মিনিট এবং এই দেখা সাক্ষাৎ হত পুলিশের স্পেশাল বাঞ্চ এবং আইবি-র অফিসার প্রমুখ জেল কর্তৃপক্ষের উপস্থিতিতে। যেসব জিনিষ পত্র বন্দিদের জন্য আনা হত তা ভাল করে পরীক্ষা করে অনুমোদনের পর বন্দিদের দেয়া হত। এই দেখা সাক্ষাতের দিনগুলিতে ব্যাপক পুলিশি বন্দোবস্ত করা হত। জেলের প্রহরী ছাড়াও থাকতেন সিআইডি, সিআরপি, এসএসপি-র লোকজন। নকশালপন্থী বন্দিদের প্রত্যেকের সেলগুলি সর্তক প্রহরায় তালাবন্ধ থাকত।
… একদিনের ঘটনা-বেলা তখন দুটো। সেদিন নকশালপন্থী বন্দিদের সঙ্গে আত্মীয়স্বজনদের দেখা সাক্ষাতের দিন। জেলে তিরিশ ফুট উঁচু ওয়াচ টাওয়ার ছিল। এই ওয়াচ টাওয়ারে পাহারা দিত সশস্ত্র পুলিশ। এই টাওয়ার থেকে জেলের ভেতরের বন্দিদের কাজকর্ম এবং লোকজন ও গাড়ি ঘোড়ার চলাচল পরিষ্কারভাবে দেখা যেত। মাঝে মধ্যেই জেলের অধিকারকরা এই টাওয়ারে উঠে সরেজমিনে তদন্ত করে আসতেন ওয়াচ টাওয়ারের কাজকর্ম ঠিকঠাক চলছে কিনা। হঠাত বোমা বিস্ফোরণের শব্দে সবাই সচকিত হয়ে ওঠে। চারিদিকে হইচই পড়ে যায়। পাখিরা কিচিরমিচির করতে করতে আকাশে উড়ে যেতে থাকে। কী হলো! দেখা গেল ওয়াচ টাওয়ারের পাহারায় থাকা কনেস্টবেলরা বোমাক্রান্ত হয়েছেন। বিস্ফোরণের শব্দ এতটাই তীব্র ছিল যে তা যেন কানের পর্দা ফাটিয়ে দেওয়ার উপক্রম হয়েছিল। ন্যাশনাল লাইব্রেরি ও ভাবানীপুর থেকে এই শব্দ শোনা গিয়েছিল। ওয়াচ টাওয়ারের কর্তব্যরত পুলিশ কর্মীরা সমস্যায় পড়ে গিয়েছিলেন। জেলের বন্দি ও অন্যান্য পুলিশ কর্মীদের নিরাপত্তার চাইতে তাঁরা নিজেদের জীবন এবং নিজ নিজ পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন। জেলের ভেতরে এবং বাইরে ক্রমাগত বিস্ফোরণগুলি ঘটেছিল। জেলের ভেতরের প্রহরীরা রীতিমত ঘবড়ে গিয়েছিলেন, তাঁরা হতবাক এবং নিশ্চল হয়ে পড়েছিলেন। হ্যান্ডগ্রেনেডগুলো বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটালেও তেমন কোনো ক্ষতি করেনি। নকশালপন্থী বন্দিরা লুঙি আর গেঞ্জি পরা অবস্থায় খালি পায়ে সেল থেকে বেরিয়ে গেটের সামনে এসে ভিড় করেছিলেন। তাঁরা সংখ্যায় চল্লিশ/পঁয়তাল্লিশের মত। তাঁরা ভিতরের গেট খুলে রেশন ঘরের সামনে এসে দাঁড়ান। রেশন ঘরটি ছিল জেলের মূল প্রবেশদ্বারের কাছে। হঠাত তাদের মধ্যে চারজন একজন জেল প্রহরীকে ধরে ছুঁড়ে সামনের মেঝেতে ফেলে দেন আর অন্যরা একটা দশ কেজির বাঁটখারা দিয়ে তাঁর মাথাটা থেতলে দেয়। সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর মৃত্যু হয়। এই দৃশ্য দেখে অন্য দুজন প্রহরী জ্ঞান হারায়। বন্দিরা তার কেটে টেলিফোন ছুঁড়ে ফেলে দেয়। তাঁরা দেওয়াল ঘড়িটা ভেঙে ফেলেন, ঘড়িটা তিনটে পনের মিনিটে স্থির হয়ে যায়। তারপর তাঁরা চকিতে প্রহরীরের কোমর থেকে চাবির গোছাটা ছিনিয়ে নিয়ে জেলের মূল প্রবেশদ্বারের দুটো বড়ো বড়ো তালা খুলে ফেলেন আর তারপর এক এক করে নকশালপন্থী বন্দিরা বাইরে বেরিয়ে পালাতে শুরু করেন। এমন কি দুর্বল এবং আহত ও পা-ভাঙা নকশালপন্থী বন্দিদেরও তাঁরা পিঠে করে সহজেই বের করে নিয়ে চলে যান। এই বিস্ফোরণের শব্দ শুনে অসংখ্য জিজ্ঞাসু মানুষ জেলের গেটে ভিড় করতে থাকে। এই ভিড়ের মধ্যে পলায়নপর নকশালপন্থী বন্দিদের মিশে যাওয়ায় তাঁদের খুঁজে বের করা সম্ভব ছিল না। তার পরের ঘটনা শ্বাসরোধকারী। সেই বন্দিরা আলিপুর ব্রিজের কাছে আদিগঙ্গায় ঝাঁপ দেন এবং তারপর টেনে হিঁচড়ে সবাইকে একে একে ভাবানীপুরের পোটাপাড়ায় তীরে নিয়ে তোলেন। সেখানে এক অদ্ভুত দৃশ্য। তীরে একদল তরুণী লুঙি, ধুতি এবং টাওয়াল নিয়ে বন্দিদের স্বাগত জানচ্ছেন। নকশালপন্থী মুক্ত বন্দিরা কোনোরকম কালক্ষেপ না করে দ্রুত পোশাক পালটিয়ে কলকাতার জনারণ্যে মিশে যায়।
এদিকে ঘণ্টাখনেক ধরে চলতে থাকা এই নাটকীয় ঘটনার রেশ কাটিয়ে সম্বিত পেয়ে সবাই যেন জেগে ওঠেন। তখন জেলের সাইরেন বেজে ওঠে। জেলের প্রহরী, হাবিলদার, ডিসিপ্লিন অফিসার, ডেপুটি জেলর, জেলর এবং অন্যরা ব্যস্ত হয়ে রেজিস্টার ধরে সমস্ত বন্দিদের নাম ধরে ডাকতে শুরু করেন। পঞ্চান্নজন নকশালপন্থী বন্দি পালিয়ে গেছে এবং তাঁদের সঙ্গে এক সাজাপ্রাপ্ত আসামি তার ফাঁসুড়েকে বোকা বানিয়ে পালিয়ে গিয়েছেন। নকশালপন্থীদের দুঃসাহসী পরিকল্পনা এবং জেল থেকে পালিয়ে যাওয়ার এই ঘটনা যুগপৎ যেমন বিস্ময়কর তেমনি উতসাহজনক, সন্দেহ নেই। এই ঘটনাটি যখন সংগঠিত হয় তখন ভারত সরকার সারা দেশে জরুরি অবস্থা জারি করেছে। নকশালপন্থী বন্দিদের এভাবে জেল থেকে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে এনে দাঁড় করিয়েছিল। কলকাতার মতো মেট্রোপলিটন শহরে এ ধরনের ঘটনাকে গভীর উদ্বেগের বিষয় বলে গণ্য করা হয়েছিল। এই অভুতপূর্ব ঝড়ো ঘটনার পরিণতিতে বহু মহীরুহের পতন ঘটেছে। আইজি (প্রিজন), প্রিজন ডিআইজি, এবং প্রিন্সিপাল সিকিউরিটি অফিসার, প্রেসিডেন্সি সেন্ট্রাল জেলের সুপারিন্টেন্ডেন্ট, জেলর, ডেপুটি জেলর, ডিসিপ্লিল অফিসাররা ছ জন হাবিলদার সহ পনেরজন জেলের প্রহরী চাকরি থেকে সাসপেন্ড হন এবং তাঁদের বিরুদ্ধে ডিসিপ্লিনারি প্রসিডিংস শুরু হয়। এই ঘটনায় রাজ্য এবং জাতীয় রাজনীতিতে আলোড়ন ফেলে দেয়। এক বেসরকারি এবং খোলামেলা আলোচনার সময় ইন্ডিয়ান পুলিশ সার্ভিসের একজন অবসরপ্রাপ্ত আধিকারক আমাকে বলেছিলেন, ‘ যে যাই বলুক না কেন আমি কিন্তু নকশালপন্থীদের সাহস, ঘড়ির কাঁটা মিলিয়ে নিখুত পরিকল্পনার যথার্থ রুপায়ণকে প্রশংসা না করে পারছি না। এদের পেছনে প্রেরণাস্বরুপ যিনি রয়ে গিয়েছেন তিনি চারু মজুমদার ছাড়া আর কেউই নন’।

তথ্যসুত্র এবং অন্যকথা নকশালবাড়ি আন্দোলনের ৫০ বছর, ২০১৭ সাল।

Advertisements


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s