মাতৃভাষা দিবসে USDF এর প্রচার পত্র

147_54954

নেট(গবেষণা ও অধ্যাপনার জন্য) পরীক্ষায় একটা পেপার থাকে যেটা সমস্ত বিষয়ের পড়ুয়ার জন্য বাধ্যতামূলক, সেখানকার প্রশ্নগুলো নির্দিষ্ট বিষয়ের বাইরে, কিছুটা সাধারণ চিন্তাধর্মী এবং জটিল ভাষায়। পরীক্ষা দিতে গিয়ে দেখা যায় অনেক প্রশ্নের মানে কিছুতেই উদ্ধার করে উঠতে পারছে না চিরকাল বাংলা মিডিয়ামে পড়ে আসা বহুসংখ্যক বাঙালি ছাত্র, কিন্তু প্রশ্নটা বাংলায় হলে দিব্যি উত্তর করে দেওয়া যেত। বিভিন্ন জাতীয় স্তরের পরীক্ষায় এমন সমস্যায় অনেক ছাত্র-ছাত্রীকেই পড়তে হয়। অথচ খুব স্বাভাবিকভাবেই এই দেশের প্রত্যেক মানুষের অধিকার আছে এই সমস্যার মুখে না পড়ার। ১৯৫২ সাল, ২১ ফেব্রুয়ারি, ঢাকার রাজপথে মাতৃভাষার অধিকারের দাবিতে পাকিস্তানি শাসকের গুলিতে প্রাণ দিল বিশ্ববিদ্যালয়ের সালাম, বরকত, রফিক, জাব্বার সহ অনেক ছাত্র, একটা স্ফুলিঙ্গ থেকে দাবানল তৈরী হল, জাতীয় মুক্তির লড়াই। সমাজে শোষণকারী শক্তিগুলো একটা আদর্শ নিপীড়িত জনগণের মধ্যে প্রোথিত করে, যা সেই শক্তিগুলোর আধিপত্যকে কায়েম করবে। কোনো এক জাতির বিকাশ ও পরিচিতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম তার ভাষা, মাতৃভাষা। তাই ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো তাদের উপনিবেশগুলিতে মাতৃভাষার উপর আক্রমণ হানে, যা ধ্বংসের মাধ্যমে সেই নির্দিষ্ট জাতিকে সাংস্কৃতিক হীনমন্যতায় আক্রান্ত করে আধিপত্য স্থাপন করা যায়।। যে কারণে ইংরেজ আমলে মেকলে’র মিনিটের মাধ্যমে ভারতীয় ভাষাগুলির অবনমনের প্রক্রিয়া শুরু করা হয়। আবার তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তান, পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাভাষীর উপর চাপিয়ে দিতে চায় ঊর্দু ভাষা, যার বিরুদ্ধে শুরু হওয়া আন্দোলন শেষ পর্যন্ত পরিণত হয় জাতীয় মুক্তির সংগ্রামে। ভারতবর্ষের ক্ষেত্রেও ১৯৪৭ পরবর্তীকালে হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্থান নীতির মাধ্যমে বিভিন্ন ভাষাভাষীর মানুষের উপর অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসন চালানো শুরু হয়। অর্থাৎ যেমন ইংরেজদের অর্থনৈতিক শোষণের জায়গা নেই দেশীয় সাম্রাজ্যবাদের বন্ধু পুঁজিপতিরা, একইভাবে ইংরেজী ভাষার আগ্রাসনের জায়গাই শুরু হয় হিন্দি ভাষার চাপিয়ে দেওয়া। সরকারী বিভিন্ন কাজকর্মে, জাতীয় স্তরের বিভিন্ন পরীক্ষায় হিন্দি ও ইংরেজীকে গুরুত্ব দেওয়া হল,সংখ্যাগরিষ্ঠ ছাত্র-ছাত্রীর কাছ থেকে মাতৃভাষার অধিকার কেড়ে তাদের এক অসম লড়াই এ ঠেলে দেওয়া হল। আমরা যদি পশ্চিমবঙ্গের দিকেই তাকাই তাহলেই দেখতে পাবো ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়ে ওঠা একের পর এক পরিকাঠামোহীন ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল। যেখানে মাতৃভাষার ব্যাপারে কুন্ঠায় ভোগা মধ্যবিত্ত বাঙালি তাদের সন্তানদের পাঠাচ্ছেন, আর সেই কুন্ঠার সুযোগ নিয়ে শিক্ষাকে পণ্যে পরিণত করা হচ্ছে। এমনকি বাংলার মানুষের করের টাকাই চলা প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয় প্রবেশিকা পরীক্ষার একমাত্র মাধ্যম ইংরেজী ঘোষণা করে(পরে ছাত্র-ছাত্রীদের ক্ষোভ টের পেয়ে তা পালটে দেওয়া হয়)। মজার ব্যাপার হল এই যে ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার যে রাজনীতি তা থেকে আবার ভাষার জন্য লড়াই করা বাঙ্গালিও মুক্ত নয়। সে দার্জিলিং এর গোর্খা জনগোষ্ঠীর স্বাধীন হওয়ার লড়াইকে অস্বীকার করে, পুরুলিয়া-বীরভূম-বাঁকুড়া-পশ্চিম মেদিনিপুরের আদিবাসীদের উপর বাংলা ভাষা চাপিয়ে দিতে চায়। বাংলাদেশ নিজে চট্টগ্রামের চাকমা জাতির মানুষের উপর বাংলাভাষা চাপিয়ে তাদের স্বাধীনতার সংগ্রামকে দমন করতে চায়। একইরকম ভাবে মণিপুর, নাগাল্যান্ডে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ সেই একই পদ্ধতিতে দমন নামিয়ে আনে। রবি ঠাকুর, লেনিন থেকে শুরু করে সত্যেন বোস প্রত্যেকেই মাতৃভাষায় শিক্ষা অধিকারকে তুলে ধরেছেন একটি জাতির সঠিক বিকাশের পথ হিসেবে। ছোট-বড়(সংখ্যার নিরিখে) নির্বিশেষে সমস্ত ভাষাকে সমান গুরুত্ব ও সম্মান দিয়ে এবং প্রশাসনিক ভাবে কোনো বৈষম্যমূলক আচরণ না করার মাধ্যমে একটি জাতির সামগ্রিক বিকাশ ঘটানো সম্ভব। বিশ্বের দিকে তাকালে জাপান, জার্মানি, ফ্রান্স, চীন, ইতালি প্রভৃতি দেশ মাতৃভাষায় শিক্ষাচর্চার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের চেতনার বিকাশ ঘটাতে সক্ষম হয়েছে। তাই আজ ভাষা দিবস বেঁচে আছে ছত্তিশগড়ে বিপ্লবী কমিউনিস্ট আন্দোলনের স্থানীয় গোন্ডী ভাষার লিপি, অভিধান তৈরী ও শিক্ষাচর্চার মধ্যে; বালুচিস্তান, কাশ্মীর, মণিপুর, নাগাল্যান্ড, চাকমা উপজাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের স্বাধীনতার যুদ্ধ জিতিয়ে দিয়েছে মাতৃভাষা দিবসের লড়াইকে।

Advertisements


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s