চারু মজুমদারের সংগৃহীত রচনা সংকলন: নকশালবাড়ীর কৃষক সংগ্রাম – তার আগেও পরে (২য় পর্ব)

500x350_0718bd934ac49f1e112b30cd4cfd4285_charu_majumder

 

নির্বাচনের শিক্ষা ও প্রকৃত মার্কসবাদী-লেনিনবাদীদের দায়িত্ব

১। গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা: চতুর্থ সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল পরিষ্কার দেখিয়ে দিলো যে ভারতে শাসকশ্রেণীর এক পার্টির একচেটিয়া শাসনের যুগ শেষ হয়ে গেলো। যে কংগ্রেস বৃহত্তম রাজনৈতিক দলের মর্যাদায় গত বিশ বছর একচেটিয়া শাসন চালিয়েছে, যার হাতে ছিলো ভোটার লিষ্ট, নির্বাচন কেন্দ্রের সীমানা নির্দ্ধারণ ও নির্বাচনে চাপ সৃষ্টির সামগ্রিক ক্ষমতা, বৃটিশ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের সাহায্য-পুষ্ট হয়ে এবং সোভিয়েত সংশোধনবাদীদের রাজনৈতিক অর্থনৈতিক সহযোগিতায় যে কংগ্রেস দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রতাপ চালিয়েছে, চীন, পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধ লাগিয়ে দুইবার উগ্র জাতীয়তাবাদের মুখোশ পুরোপুরি গ্রহণ করেছে, যে কংগ্রেস লাঠিগুলির দমন নীতির সাহায্যে সন্ত্রাসের রাজত্ব চালিয়ে দেখিয়েছে যে তার শক্তিই সবচেয়ে বেশী-সেই কংগ্রেস শোচনীয় ভাবে পরাজিত হওয়ায় প্রমাণিত হলো যে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি আপাত দৃষ্টিতে শক্তিশালী মনে হলেও আসলে কাগুজে বাঘ। তাই মানুষের মনে ১৯৪৭ এর ১৫ই আগস্টের মতোই এক জয়ের চেতনা এসেছে।

২। কংগ্রেসের পরাজয়ের কারণ: ২০ বছরের শাসনে কংগ্রেস জনগণের প্রধান শত্রু সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্তবাদের শোষণ শেষ তো করতে পারেই নি বরঞ্চ তাকে আরও বাড়িয়েছে। ফলে আমাদের দেশের সমস্ত জনগণের সাথে সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্ততন্ত্রের বিরোধ এতো তীব্র হয়েছে যে তা’ গত কয়েক বৎসর ধরেই ফেটে পড়তে শুরু করেছে। এই বিরোধ যত তীব্র হতে থেকেছে ততই শাসকশ্রেণীর সাথে জনগণ ও শ্রমিকশ্রেণীর বিরোধ, সংখ্যালঘু জাতিগুলির সাথে শাসকশ্রেণীর বিরোধ ফেটে পড়তে থেকেছে এবং তার চাপে সোভিয়েত-মার্কিন শক্তিজোটের সাথে বৃটিশ ও অন্যান্য শক্তি জোটের বিরোধ কার্যকরী হওয়ায় কংগ্রেসের এই শোচনীয় পরাজয় হয়েছে।

৩। আমাদের সামনে সমস্যা: যে বিরোধগুলো তীব্র হয়েছে সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্ততন্ত্র বৃহৎ বুর্জোয়াশ্রেণীর সহযোগিতায় তার সমাধান করতে পারবে না, বিরোধ আরও বেড়ে চলবেই। তার অর্থ নিশ্চয়ই এই নয় যে আপনা আপনি জনগণতান্ত্রিক সরকার কায়েম হয়ে যাবে! কারণ শোষকশ্রেণীর রাষ্ট্রযন্ত্র থেকেই গেল। সেই রাষ্ট্রযন্ত্রকে খতম না করে জনগণতন্ত্রে পৌঁছানোর স্বপ্ন দেখা সংশোধনবাদী ধারণা ছাড়া আর কিছুই না। এই রাষ্ট্রযন্ত্রকে খতম করতে পারে একমাত্র শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্ব। নেতৃত্বের দুর্বলতা অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে-কারণ ভারতব্যপী স্বতঃস্ফূর্ত গণবিক্ষোভে শ্রমিকশ্রেণীর সচেতন নেতৃত্ব ছিল অত্যন্ত দুর্বল। এই বিক্ষোভগুলির ক্ষণস্থায়ী চরিত্রের থেকে বোঝা যায় যে শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্বের দুর্বলতার ফলে বিক্ষোভ উত্তাল হয়েই দপ করে থেমে গিয়েছে। কোন রাজ্যেই আন্দোলনে স্থায়ীত্ব আসেনি।

৪। আমাদের কাজ: জনগণের বিজয় উল্লাসের পিছনে রয়েছে এ দেশকে সুখী সমৃদ্ধিশালী দেশ হিসাবে গড়ে তোলার আকাঙ্খা যা পূরণ করার ক্ষমতা অকংগ্রেসী বিকল্প সরকারগুলির নেই। সংসদীয় গণতন্ত্রের মধ্যে গণ্ডীবদ্ধ সরকারের তা থাকতেও পারে না। এই বিকল্প সরকার সম্বন্ধে আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে এই যে মূল সমস্যার অর্থাৎ সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্ততন্ত্র উচ্ছেদের সংগ্রামে এই সরকারকে ব্যবহার করা। শোষকশ্রেণী সারা ভারতে তাদের পক্ষে আজকের অনিশ্চিত অবস্থা থাকতে দিতে পারে না, তারা সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্ততন্ত্রের পক্ষে অবস্থা গুছিয়ে নিতে চেষ্টা করবেই। সাম্রাজ্যবাদী শক্তিজোটের মধ্যে বিরোধ থাকা সত্ত্বেও তারা ঐক্যবদ্ধভাবে ভারতে তাদের শাসন গোছাবার প্রয়োজনীয়তা বেশী করে অনুভব করছে এই জন্যে যে চীনের মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের প্রভাব ভারতে এসে পড়ায় সাম্রাজ্যবাদ ও সংশোধনবাদ কোনঠাসা হয়ে পড়েছে। তাই সাম্রাজ্যবাদ ও সংশোধনবাদ ঐক্যবদ্ধ হয়ে চীন বিরোধের ভিত্তিতে কেন্দ্র এবং রাজ্যে বিভিন্ন বুর্জোয়া পার্টিগুলির সাথে গোপন কমিউনিস্ট বিরোধী চুক্তি করে সাম্রাজ্যবাদী জোটের পক্ষে নিরাপদ অবস্থার সৃষ্টি করতে চাইবেই। তাই তাদের কাছে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার সংসদীয় গণতন্ত্রের মোহ সৃষ্টি করা। এর জন্যে বিভিন্ন শ্রেণীকে কিছু কিছু সুবিধা দেওয়া হচ্ছে কিন্তু যাকে যত সুবিধাই দিক, দেশের জনসংখ্যার বৃহত্তম অংশ কৃষকশ্রেণীকে কোন সুবিধে দেওয়ার ক্ষমতা আর তার নেই। এই কৃষকশ্রেণী আমাদের দেশের জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের প্রধান শক্তি। কৃষক-অঞ্চলে মুক্ত এলাকা গড়ে তোলার কাজই আজ শ্রমিকশ্রেণী ও অন্যান্য বিপ্লবী শ্রেণীর প্রধান দায়িত্ব। শ্রমিকশ্রেণী ও অন্যান্য বিপ্লবী শ্রেণীর শ্রেণী-সংগ্রামকে তীব্রতর করেই গ্রামাঞ্চলে মুক্ত এলাকা গড়ে তোলার কাজ ত্বরান্বিত হতে পারে।

৫। পার্টি: কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বের মধ্যে যে সংশোধনবাদী ঝোঁক রয়েছে তার প্রমাণ বারবার পাওয়া গিয়েছে। পার্টিতে নয়া সংশোধনবাদ চালু করার তারা যে চেষ্টা করেছেন সাম্প্রতিক কার্যকলাপে তা প্রমাণিত হচ্ছে।

(ক) মার্কসবাদ-লেনিনবাদের বর্তমান যুগের সর্বোচ্চরূপ যে মাও সেতুঙ-এর চিন্তাধারা তা আজও নেতৃবৃন্দ গ্রহণ করেন নি। সোভিয়েত সংশোধনবাদীদের মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সাথে মিলে বিশ্ব প্রভৃত্বের পরিকল্পনাকে নিন্দা করেন নি। এই চক্রান্তের বিরুদ্ধে সংগ্রাম না করলে এবং মাও সেতুঙের চিন্তাধারাকে সমর্থন না করলে বিপ্লবী আন্দোলনের জোয়ার তোলা যায় না, বিপ্লবী আন্দোলনে শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা হয় না।

(খ) ভারতবর্ষের বিপ্লবী পরিস্থিতিকে ক্রমাগত অস্বীকার করা হচ্ছে। যার ফলে শ্রমিকশ্রেণীর বিপ্লবী দায়িত্ব সৃষ্টি হচ্ছে না।

(গ) পার্টির মধ্যে আদর্শগত আলোচনাকে ক্রমাগত বন্ধ রাখা হচ্ছে যার ফলে বিপ্লবী চেতনায় পার্টি সভ্যদের উদ্বুদ্ধ করার কাজ অবহেলিত হয়েছে।

(ঘ) পার্টির মধ্যে সমালোচনা ও আত্মসমালোচনার আবহাওয়া সৃষ্টি না করে বৈপ্লবিক পার্টি গড়ে তোলার দায়িত্ব কার্যতঃঅস্বীকার করা হচ্ছে।

(ঙ) বিকল্প সরকারের প্রশ্নেও পার্টি নেতৃত্বের বক্তব্যে শ্রেণী-সমন্বয়ের ঝোঁক প্রকাশ পাচ্ছে। কমিউনিস্টদের বিকল্প সরকারে যোগদানের একটাই উদ্দেশ্য হতে পারে, তা হচ্ছে সরকারের মধ্যে থেকে সংগ্রামের আহ্বান দেওয়ার অবস্থা সৃষ্টি করা-সংসদীয় মর্যাদা রক্ষা করা নয়। কিন্তু সে পথ না নিয়ে একদিকে আন্দোলন করতে হবে বলে আবার, মালিকশ্রেণীর ভয়ের কোন কারণ নেই বললে আন্দোলনের লক্ষ্যকেই অস্পষ্ট করা হয়। আন্দোলনকা’র বিরুদ্ধে তার নির্দ্দেশ থাকে না। এবং এ পথ অবশ্যম্ভাবীভাবে শ্রেণীসম্বন্বয়ের পথে নিয়ে যেতে বাধ্য।

কমরেডস, নির্বাচনের আগে ও পরের ঘটনাগুলো সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করছে যে ভারতবর্ষ এক গভীর রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে চলেছে। এই সংকটকে গভীর করেছে ভারতের বৈপ্লবিক পরিস্থিতি। রাজনৈতিক সংকট বাড়তে থাকবেই এবং সেই সঙ্গে জনগণের রাজনৈতিক চেতনাও বাড়তে থাকবে। পরিস্থিতি কমিউনিস্ট পার্টির কাছে রাজনৈতিক নেতৃত্ব দাবী করবে, তাই পার্টিকে সাচ্চা মার্কসবাদী-লেনিনবাদী পার্টি হিসাবে গড়ে তোলার প্রশ্ন আরও জরুরী হয়ে পড়েছে। পার্টির আভ্যন্তরীণ সংগ্রামকে যত জোরদার করা যাবে তত বেশী সংখ্যক কমরেড আভ্যন্তরীণ আদর্শগত সংগ্রামে অংশ গ্রহণ করবেন, ভারতীয় বিপ্লবে শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্ব তত বেশী করে প্রতিষ্ঠিত হবে।

৩রা এপ্রিল, ’৬৭

 

Advertisements


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s