মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে বন্দী কৃষকের জীবন

4408487670_dd7a022364_b

বাজারে সব ধরনের চালের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে কেজি প্রতি পাঁচ টাকা হারে। এই খবরটি দেশের অধিকাংশ পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। গত ডিসেম্বর মাসে আমন ধানের মৌসুম শেষ হয়েছে। সামনে আবার এপ্রিল-মে মাসে বোরো ধানের মৌসুম আসছে। এরই মধ্যে বাজারে কী প্রয়োজনে চালের মূল্য হঠাৎ করে কেজি প্রতি পাঁচ টাকা বৃদ্ধি পেল তার উত্তর রহস্যজনক। বাজারে ধান চালের কোন ঘাটতি নেই। ধান চালের ঘাটতিতে পড়ে দেশে কোন দুর্ভিক্ষাবস্থাও বিরাজ করছে না। তাহলে দাম বৃদ্ধি ঘটলো কোন যুক্তিতে? চালের এই মূল্য বৃদ্ধির জন্য চাতাল মালিকদের দায়ী করা হয়েছে। চাতাল মালিকদের পক্ষ থেকে আবার পাইকারদের দায়ী করা হয়েছে। মধ্যস্বত্বভোগীরা একে অন্যের উপর দায় চাপিয়ে ইতিমধ্যে চালের মূল্য বৃদ্ধি করে নিয়েছে। আসলে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রয়োজন ছিল দাম বাড়ানোর। সে যে যুক্তিতেই হোক না কেন, আর যাদের ওপর দায়ভার চাপানো হোক না কেন বাজারে দাম তো বৃদ্ধি পেল। চালের এই মূল্য বৃদ্ধিতে লাভবান হলো দেশের সকল মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণি।
ডিসেম্বরে আমন ধানের মৌসুম শেষ হওয়ায় কৃষক তার উৎপাদিত ধান বাজারে বিক্রী করে দিয়েছে। এখন ধান হচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগী গ্রামীণ ধনী কৃষক, জোতদার, মহাজন, আড়তদার ও চাতাল মালিকদের হাতে। ধনী কৃষক, জোতদার, মহাজন, আড়তদার ইত্যাদি মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণি কৃষি উৎপাদনের সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত নয়। কৃষি কাজের সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত গ্রামীণ মধ্য কৃষক, গরিব কৃষক ও দিনমজুরেরা। ধান, চাল উৎপাদনের মৌসুমে এরা উৎপাদন চালাতে গিয়ে তারা দেনার দায়ে আবদ্ধ হয়। কৃষি উৎপাদন চালানোর মতো প্রয়োজনীয় পুঁজি এই শ্রেণির হাতে থাকে। উচ্চ ফলনশীল উন্নত জাতের ফসলের চাষ আবাদ বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদন বেড়েছে ঠিকই, তবে প্রকৃত কৃষক সকল দিক থেকে সর্বস্বাস্ত হয়ে পড়েছে। সাবেকী প্রদ্ধতিতে চাষাবাদের জন্য বীজ কৃষক উৎপাদন করতো ও সংরক্ষণ করতো। উন্নত জাতের বীজ কৃষক নিজে উৎপাদন করতে পারে না। এখন তাকে উন্নত জাতের বীজ বাজার থেকে সংগ্রহ করতে হচ্ছে। উন্নত জাতের প্যাকেটজাত বীজ বাজারে পরিবেশন করে বহুজাতিক কোম্পানি ও বিপণন করে মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণি। কৃষককে শোষণ করে লাভবান হচ্ছে তারাই।

উচ্চ ফলনশীল ফসলের চাষাবাদে জমিতে সেচ ব্যবস্থা অপরিহার্য। এর জন্য দেশে বিভিন্ন ধরনের সেচ যন্ত্র চালু রয়েছে। এই সব সেচ যন্ত্রের মালিক অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গ্রামীণ জোতদার, মহাজন বা মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণি। এই সেচ যন্ত্র চালাতে গেলে জ্বালানির প্রয়োজন। এই জ্বালানির চাহিদা পূরণ করা হয় বিদেশ থেকে আমদানি করে। জমিতে চাষের ক্ষেত্রে পশুর ব্যবহার এখন নেই বললেই চলে। জমিতে চাষ হয় এখন পাওয়ার টিলার ও ট্রাক্টর দিয়ে। এই পাওয়ার টিলার ও ট্রাক্টরের মালিক জোতদার মহাজন বা মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণি। উচ্চ ফলনশীল জাতের ফসলের চাষাবাদে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার অপরিহার্য। এই সার অধিকাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। আর কীটনাশক দেশে একেবারেই উৎপাদন হয় না। সার ও কীটনাশক উৎপাদন করে সাম্রাজ্যবাদী দেশের বহুজাতিক কোম্পানি। এই বহুজাতিক কোম্পানি বহুমূল্যে দেশের বাজারে এই সার ও কীটনাশক সরবরাহ করে। আর ব্যবসায়ী নামক মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণি তা বিদেশ থেকে আমদানি করে এবং বিপণনের পর্যায়ে তা বহু হাত ঘুরে তা কৃষকের কাছে পৌঁছে থাকে। প্রতিবার হাত বদলের সাথে সাথে মধ্যস্বত্বভোগীদের মুনাফাও বৃদ্ধি পায় ও দাম বহুগুণ বৃদ্ধি ঘটে।

আমাদের মতো নয়া ঔপনিবেশিক আধা সামন্তবাদী দেশগুলোতে কৃষি পণ্যের মূল্য নির্ধারিত থাকে, মধ্যস্বত্বভোগীদের স্বার্থে পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করে জোতদার, মহাজন, আড়তদার ইত্যাদি মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণি। মধ্যস্বত্বভোগীরা সিন্ডিকেট করে ফসলের উৎপাদন মৌসুমে কৃষি পণ্যের মূল্য উৎপাদন খরচের চেয়েও অনেক কমিয়ে দেয়, তেমনিভাবে আবার কৃষকের হাতে যখন আর কৃষি পণ্য থাকে না তখন কৃষি পণ্যের মূল্য অনেক বাড়িয়ে দেয়। এই কৌশলে মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণি কৃষককে উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য না দিয়ে কম দামে কিনে নিজেরা মুনাফা অর্জন করে। আবার শাক সবজি ইত্যাদি কাঁচামালের ক্ষেত্রে কৃষককে স্রেফ ফাঁকি দেওয়া হয়। কাঁচামালের আড়তদার, মহাজনরা যে মূল্যে ক্রয় করে বিক্রয়ের সময়ে ভোক্তাদের নিকট থেকে তার চেয়ে দশগুণ বেশি মূল্য আদায় করা হয়। এক কেজি বেগুণ যেখানে মধ্যস্বত্বভোগীরা তিন টাকা মূলে ক্রয় করে বিক্রয়ের সময়ে তার মূল্য বেড়ে দাঁড়ায় কেজি প্রতি ৫০ টাকায়। এইভাবে প্রতিটি কাঁচামালের ক্ষেত্রে ক্রেতা ও ভোক্তা পর্যায়ে মূল্যের ব্যবধান ১০ গুণেরও বেশি হয়। শাক সবজি বিক্রি করে কৃষক মূল্য না পেলেও ভোক্তাকে কিন্তু অনেক বেশি মূল্য দিয়ে বাজার থেকে কিনে খেতে হয়।

এইভাবে আমন ধানের মৌসুম ডিসেম্বরে শেষ হয়েছে। জানুয়ারি মাসের কৃষকের হাতে বিক্রী করার মতো কিছু ধান অবশিষ্ট থেকে যায়। অবশিষ্ট ধান বিক্রী করে ফেলার ফলে কৃষকের হাতে আর কোন ফসল থাকে না। তখন ফেব্রেুয়ারি মাসে চালের মূল্য এক লাফে কেজি প্রতি পাঁচ টাকা বৃদ্ধি ঘটলো। লাভবান হলো সেই ব্যবসায়ী নামক মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণি। কৃষক যে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে, দিনে দিনে নিঃস্ব হচ্ছে তা আমাদের দেশের সরকার দেখেও দেখছে না। কারণ সরকার তো মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণির প্রতিনিধি। প্রচলিত রাষ্ট্র ব্যবস্থায় যে রূপের সরকার আসুক না কেন তারা মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা করে। আসলে গোটা দেশটার মালিক বা নিয়ন্ত্রের ক্ষমতা মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণির হাতে। দেশে বিদেশি সাম্রাজ্যবাদী লগ্নি পুঁজির বিনিয়োগ হয়। লগ্নি পুঁজির খাটিয়ে এদেশের মুৎসুদ্দি শ্রেণি যে লুটপাট চালায় তা সাম্রাজ্যবাদী প্রভুর হাতে তুলে দেয়। সাম্রাজ্যবাদীরা সেখান থেকে উচ্ছিষ্ট অংশ এদেশের মুৎসুদ্দি শ্রেণির দিকে ছুড়ে দেয়। মুৎসুদ্দি শ্রেণি সাম্রাজ্যবাদী লগ্নি পুঁজির মালিকদের ছুড়ে দেওয়া উচ্ছিষ্ট ভোগ করে নিজেরা তুষ্ট ও পরিপুষ্ট হয়। আর সরকার সাম্রাজ্যবাদ ও দেশীয় মুৎসুদ্দি শ্রেণির মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসাবে দু’পয়সা কামিয়ে নিচ্ছে।

সূত্র: সাপ্তাহিক সেবা, বর্ষ-৩৬।।সংখ্যা-০৬, রোববার।। ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৭।।

Advertisements


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s