শিশু ধর্ষণ এই সমাজ ব্যবস্থার একটি ব্যাধি

পত্র-পত্রিকার পাতা খুললে প্রায়ই দেখা যায় কোথাও না কোথাও শিশু ধর্ষণের ঘটনা। শহর-গ্রাম ঘরে-বাইরে চলার পথে কোথাও শিশুরা নিরাপদ নয়। এ এক ঘৃণ্য অপরাধ। নির্মম বিভৎসতা, অমানবিক পৈশাচিকতা। ধর্ষণের শিকার একটি শিশুকে চির জীবনের জন্যে আতঙ্কগ্রস্ত থাকতে হয়। অনেকেই হয়ে যায় প্রতিবন্ধী।

সাধারণভাবে শিশুরা হয় দুরন্ত চঞ্চল। সহজ-সরল। সর্বদাই থাকে চিন্তামুক্ত ঝামেলাহীন। এমনি এক শিশু যখন ধর্ষণের মতো জঘন্য নির্মম নিপীড়নে পতিত হয় তখন অবুঝ শিশু আলোক উজ্জ্বল পৃথিবীকে অন্ধকার হিসেবে দেখতে থাকে।

২০১৫ সালের চেয়ে ২০১৬ সালে (২৯ নভেম্বর পর্যন্ত) শিশু ধর্ষণ বেড়েছে ১৫ শতাংশ। এ সময় ১১৭ শিশুকে গণধর্ষণ করা হয়। ধর্ষণ শেষে হত্যা করা হয় ৩৩ শিশুকে। ২০১৫ সালে ৯৯ শিশু গণধর্ষণের শিকর হয় এবং ৩০ শিশুকে ধর্ষণ শেষে হত্যা করা হয়। (শিশু অধিকার ফোরাম)। গ্রামে-গঞ্জে বহু শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটে- যা বিভিন্ন কারণে পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয় না। থেকে যায় অগোচরে। এতে বোঝাই যায় শিশু ধর্ষণের ঘটনা কতটা ভয়াবহ রকমের বেড়ে চলেছে।

এখানেই শেষ নয়। বিশেষত দরিদ্র শিশুরা ধর্ষণের কারণে এবং সামাজিক বিচারের নামে অপমানজনক নির্যাতনের কারণে অনেকে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়। ১০/১২/১৬ তারিখে সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার সোনাবাড়িয়া ইউনিয়নে এমনি এক ঘটনা ঘটে। এই ইউনিয়নের চেয়্যারম্যান মনিরুল ইসলাম যিনি একইসাথে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সম্পাদক, এক কিশোরীকে শালিসের নামে যে রায় দিয়েছে তার অপমান সইতে না পেরে সে আত্মহত্যা করেছে। বিবিসি সহ বিভিন্ন মিডিয়ায় এ খবর প্রকাশিত হয়েছে।

এমনি ভয়াবহ পরস্থিতিতেও বর্তমান সরকার আইন করে কন্যাশিশু ধর্ষণের কার্যত বৈধতা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক স্বীকৃত ১৮ বছর মেনে নিয়েও সরকার ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুদেরও বিশেষ কারণে বিয়ে দেয়ার আইন করেছে যা কিনা সমস্যাকে আরো বাড়িয়ে তুলবে।

কন্যাশিশু ধর্ষণ হচ্ছে পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নারী নিপীড়নের বিকৃত আরেক রূপ। পুরুষদের একাংশ বিভিন্ন উপায়ে নারীদের উপর জবরদস্তিমূলক নির্যাতন করেও সন্তুষ্ট হতে পারছে না। তাদের আরও বিকৃতির দিকে মনোযোগ। তাই তারা মেয়ে শিশু ছাড়াও ছেলে শিশুও ধর্ষণের বিকৃত পথ বেছে নিয়েছে। এখানেই শেষ নয়, ধর্ষণের পর শাস্তির ভয়ে এবং তথাকথিত মান-সম্মান রক্ষার জন্য কেউ কেউ কখনো কখনো ওই শিশুকে হত্যাও করছে। এটা ফ্যাসিবাদী হিংস্রতা। রাষ্ট্র ও শাসকশ্রেণি ফ্যাসিবাদী কায়দায় জনগণকে, প্রগতিশীল ও বিপ্লবীদেরকে খুন-গুম-‘ক্রসফায়ার’-গ্রেফতার-নিখোঁজসহ বিভিন্ন নিপীড়ন চালাচ্ছে। তারা এই ফ্যাসিবাদ আজ জনগণের মাঝেও নিয়ে গেছে।

প্রশ্ন হচ্ছে কেন এই শিশু ধর্ষণ? কেনই বা তা অব্যাহতভাবে বেড়ে চলেছে?

সাম্রাজ্যবাদ সম্প্রসারণবাদ নিয়ন্ত্রিত দালাল পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সাথে রয়েছে ক্ষয় হতে থাকা পুরানো সামন্তবাদী ব্যবস্থা। এই প্রতিক্রিয়াশীল দুই ব্যবস্থার মিশ্রণে গড়ে উঠেছে এক জগাখিচুড়ি মার্কা সংস্কৃতি। এখানে একদিকে বিরাজমান সামন্ততান্ত্রিক আচার-অনুষ্ঠান দৃষ্টিভঙ্গি, অন্যদিকে আধুনিকতার নামে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী ও বিকৃত পুঁজিবাদী শিল্প-সংস্কৃতির অবাধ চর্চা। প্রেম-বিয়ে যৌন জীবনে তার প্রতিফলন ঘটে নানা ধরনের বিকৃতি হিসেবে। যেমন- এদেশে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদীদের একচ্ছত্র অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের সাথে চলছে তাদের সাংস্কৃতিক আগ্রাসন। যেজন্য বাংলাদেশী টিভি ভারতে প্রদর্শিত না হলেও ভারতীয় বাংলা-হিন্দি চ্যানেল স্টার জলসা, স্টার প্লাস, জি বাংলা প্রভৃতির মাধ্যমে সিনেমা-সিরিয়াল-নাটক-গান-নাচ, যৌন উত্তেজক অনুষ্ঠান ও বিজ্ঞাপন প্রভৃতি প্রচার জনমনে তথা পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে বিকৃত প্রভাব তৈরি করে চলেছে। একে ঘিরে খুনোখুনিও হয়েছে। এই গণবিরোধী অনুষ্ঠানগুলো আমাদের দেশে গ্রাম-গ্রামান্তরে মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়েছে, পড়ছে। যা নানা বয়সের পুরুষদের একাংশকে যৌনতার লাগামহীন উন্মাদনায়ও ঠেলে দিচ্ছে। যে সংস্কৃতি খোদ ভারতের রাজধানী দিল্লিকেও ইতিমধ্যে ধর্ষণের নগরে পরিণত করেছে। এছাড়া ডিজিটালের নামে আকাশ সংস্কৃতির বদৌলতে ইন্টারনেট মোবাইল ফোনের মাধ্যমে যৌন ছবি দেখার অবাধ ব্যবস্থা করা হয়েছে বুর্জোয়াদের স্থূল মুনাফার স্বার্থে, প্রগতিশীল ও বিপ্লবী সংস্কৃতি রুখতে। এই সংস্কৃতির একটি বিকৃত রূপ হচ্ছে শিশু ধর্ষণ। এই সংস্কৃতির আগ্রাসনে ব্যাধিগ্রস্ত ধর্ষকরা নিজেদের ঝুঁকিমুক্ত নিরাপদ যৌন চর্চার একটি ক্ষেত্র খুঁজে ফিরছে এখানে। এজন্য এরা বেছে নেয় কোমলমতি শিশুদেরকেও। যারা ভয়-ভীতি-লজ্জা-শরমের কারণে এ জাতীয় ঘটনা সহসা প্রকাশ করবে না। এই সমাজে স্বেচ্ছামূলক প্রেম-বিয়ে-ভালবাসা-যৌনতা-বিচ্ছেদের অধিকারহীনতাও এক্ষেত্রে অন্যতম এক শর্ত।

বেশি ধর্ষণের শিকার হয় দরিদ্র শিশুরা। এই শিশুরা সর্বদাই হীনমন্য থাকায় সাধারণভাবে চুপ থাকে। এটা এক ধরনের শ্রেণি নিপীড়নও বটে।

শুধুমাত্র মেয়ে শিশুরা নয়, ছেলে শিশুরাও যৌন নির্যাতনসহ নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হয়ে থাকে। কয়েকমাস পূর্বে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ১০ বছরের শিশু সাগর বর্মণকে পায়ুপথ দিয়ে বাতাস ঢুকিয়ে পাশবিক কায়দায় খুন দেশবাসীকে শিহরিত করেছিল। এর কিছুদিন আগে খুলনায় এক শিশুকে একই কায়দায় বাতাস ঢুকিয়ে নির্যাতন করা হয়েছিল।

এসব শিশু নির্যাতন বন্ধের জন্য বুদ্ধিজীবীরা প্রায়ই বলে থাকে বিচারহীনতার কথা। বাস্তবে বিচার করে শাস্তি দিলেই শিশু ধর্ষণ শিশু নির্যাতন বন্ধ হবে না। বিগত কয়েক বছরে এ জাতীয় অপরাধে অনেককে শাস্তি দিলেও তা কমেনি।

এই বিকৃত সমাজ ব্যবস্থার সামাজিক ব্যাধি হচ্ছে শিশু ধর্ষণ। এজন্য ব্যক্তি-মালিকানাধীন পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা, যে ব্যবস্থায় নারীদেরকে নিজস্ব সম্পত্তি হিসেবে মনে করা হয়। এই ব্যবস্থার পরিপূর্ণ উচ্ছেদ ব্যতীত শিশু ধর্ষণ বন্ধ হবে না। যেমনি এই শাসক শ্রেণি পতিতাবৃত্তি বন্ধ করতে পারে না। একমাত্র সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবই শিশু ধর্ষণ-নির্যাতন পতিতাবৃত্তি উচ্ছেদ করতে পারে। মহামতি লেনিনের নেতৃত্বে রাশিয়ায় এবং মাও সেতুঙের চীনে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শিশু ধর্ষণসহ সকল ধর্ষণের অবসান হয়েছিল। 

সূত্রঃ নারী মুক্তি, মার্চ ২০১৭ সংখ্যা

Advertisements


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s