প্রগতিশীল কলমযোদ্ধা মহাশ্বেতা দেবীঃ আদিবাসী ও নিপীড়িতদের স্বপক্ষে ছিলেন আমৃত্যু অবিচল

 

বৃটিশ বিরোধী “কল্লোল সাহিত্য আন্দোলন” ও তৎকালীন “গণনাট্য সংঘে”র সামনের সারিতে থাকা শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি সম্পন্ন এক মধ্যবিত্ত শিক্ষিত পরিবারে মহাশ্বেতা দেবীর জন্ম। তিনি ১৯২৬ সালের ১৪ জানুয়ারি ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মনীষ ঘটক কল্লোল সাহিত্য আন্দোলন ও গণনাট্য সংঘে’র সুপরিচিত কবি ছিলেন। সেই সূত্রে মহাশ্বেতা দেবীও গণনাট্য সংঘের সাথে যুক্ত ছিলেন। ভারতের বাংলাভাষাভাষী এই প্রগতিশীল লেখক সম্প্রতি বার্ধক্যজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করেছেন।

মহাশ্বেতা দেবীর সাহিত্যের প্রধানতম ক্ষেত্র ছিল আদিবাসী, দলিত ও নিপীড়িত জনগণ- যার এক বিরাট অংশ জুড়ে ছিল নারী। যারা নিজেদের অধিকারের জন্য বৃটিশের বিরুদ্ধে, ভারতের শাসকশ্রেণির বিরুদ্ধে ও উঁচুজাতের জোতদার, মহাজনদের বিরুদ্ধে নিরন্তর বীরত্বপূর্ণ লড়াই-সংগ্রামে জড়িত। তিনি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়ের গ্রামাঞ্চলে আদিবাসীদের মধ্যে বছরের পর বছর থেকেছেন, মিশেছেন। তাদের দুঃখ-কষ্ট-সংগ্রাম-আত্মবলিদান-সাহসী অধ্যবসায় প্রভৃতিকে গভীর উপলব্ধিতে ধারণ করেছেন। একে সাহিত্যে জীবন্তভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। তিনি বলেছেন- তার গল্পের কাহিনী তিনি তৈরি করেননি- এগুলো জনগণেরই জীবন এবং তাদেরই সৃষ্টি। আদিবাসীদের জীবন ও সংগ্রামকে ঘিরে তার এমনি এক অসাধারণ উপন্যাস “চোট্টিমুন্ডা ও তার তীর”।

তিনি সারা জীবন আদিবাসীদের ন্যায্য দাবি ও সংগ্রামের পক্ষে থেকেছেন। সেজন্যই পশ্চিমবঙ্গ সরকারের লালগড় ও নন্দীগ্রামের আদিবাসীদের জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধেও সোচ্চার ছিলেন তিনি। আদিবাসী ছাড়াও তিনি শাসকশ্রেণির রক্তচক্ষু ও হুমকিকে উপেক্ষা করে শ্রমিক-কৃষকসহ নিপীড়িত জাতিসত্তা ও জনগণের আন্দোলন-সংগ্রামের পক্ষেও বলিষ্ঠভাবে দাঁড়িয়েছেন, সাহসী প্রতিবাদ করেছেন, কলম ধরেছেন। এরই অংশ হিসেবে ভারতে মাওবাদীদের নির্মূল করতে শাসকশ্রেণির নির্বিচার গণহত্যা ও নিষ্ঠুর নির্যাতনের সামরিক অভিযান “অপারেশন গ্রিনহান্টে”র বিরুদ্ধে সোচ্চার থেকেছেন। উল্লেখ্য, ৬০-এর দশকে ভারতে মাওবাদীদের নেতৃত্বে ঐতিহাসিক নক্সালবাড়ি আন্দোলন তাকে প্রভাবিত ও আলোড়িত করেছিল। তখনও তিনি “নক্সালদের” উচ্ছেদে শাসকশ্রেণি ও তার রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসকে উন্মোচন করে রচনা করেছিলেন উপন্যাস “হাজার চুরাশির মা”। তিনি তার প্রথম উপন্যাস “ঝাঁসির রাণী”তে বৃটিশের বিরুদ্ধে এক যুদ্ধে নারী নেতৃত্ব লক্ষ্মীবাঈসহ অনেকের বীরত্বপূর্ণ লড়াই ও আত্মত্যাগকে অত্যন্ত নিপুণ হাতে তুলে ধরেছেন। সুদীর্ঘ ৬০ বছরের সাহিত্য সাধনার ফসল হিসেবে তিনি বাংলাভাষায় ১০০টিরও বেশি উপন্যাস এবং ২০টি গল্প সংকলন রচনা করেছেন এবং অসংখ্য সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। উল্লিখিত উপন্যাসগুলো ছাড়াও মহাশ্বেতা দেবীর উল্লেখযোগ্য আরো উপন্যাস হচ্ছে- তিতুমীর, অরণ্যের অধিকার, অগ্নিগর্ভ প্রভৃতি এবং গল্প- রোদালী, দ্রৌপদী, স্তন্যদায়িনী, ভাত ইত্যাদি। তার প্রগতিশীল রচনাসমূহ প্রগতিবাদীদের সাহিত্যকর্মের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ শর্ত এবং দৃষ্টান্ত। যা শ্রমিক-কৃষক সহ সকল নিপীড়িত জনগণের আন্দোলন-সংগ্রামের পক্ষে তাদের লেখালেখিতে উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি করবে, সাহস যোগাবে।

মহাশ্বেতা দেবীর উল্লিখিত অগ্রসর দিক সত্ত্বেও তার গুরুতর দুর্বল দিক সম্পর্কে কিছু না বললেই নয়। তিনি রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সংস্কারের দাবিতে আটকে থেকে বুর্জোয়া রাজনীতির বেড়াজালে বিভ্রান্ত হয়েছেন। যেমন, তার বুর্জোয়া প্রতিক্রিয়াশীল পার্টি তৃণমূল কংগ্রেসকে সমর্থন করা। একই কারণে শেখ মুজিব-হাসিনার আওয়ামী রাজনীতির প্রতিক্রিয়াশীলতাকে বুঝতে না পারা। সর্বোপরি নিপীড়িত জনগণের মুক্তির জন্য বিপ্লবী রাজনীতি-মতাদর্শ সম্পর্কে তার দুর্বলতা।

মহাশ্বেতা শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতী থেকে ইংরেজিতে সম্মান এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৬৪ সালে বিজয়গড় কলেজে শিক্ষকতা করেন। তার যোগদানের পর থেকে তারই প্রচেষ্টায় এই কলেজটি শ্রমজীবী নারী ছাত্রীদের প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে তিনি শিক্ষকতার চাকুরি ছেড়ে লেখালেখিকেই পেশা হিসেবে বেছে নেন। আমৃত্যু লেখালেখিই ছিল পেশা। ২০১৬ সালের ২৮ জুলাই তিনি মারা যান। 

সূত্রঃ নারী মুক্তি, মার্চ ২০১৭ সংখ্যা

Advertisements


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s