হিজড়া জনগোষ্ঠীর অমানবিক জীবন এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব

হিজড়া বলতে আমরা বুঝি যারা নারী নন বা পুরুষও নন। আমাদের দেশের রাষ্ট্র হিজড়া জনগোষ্ঠীকে সম্প্রতি ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। যা বিশ্বের বুর্জোয়া রাষ্ট্রের অনেক সরকার বহু পূর্বেই দিয়েছে।
বাংলাদেশের বুর্জোয়া গবেষকদের হিসাব মতে সারাদেশে হিজড়াদের সংখ্যা দেড় লাখের উপরে। রাজধানী ঢাকাতে ১৫ হাজারের মতো। যদিও সরকারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের হিসেবে সারা দেশে ১০ হাজার।
এই সংখ্যা যে আরো দ্বিগুণ বা ৩ গুণ তা অনুমান করা যায়। কারণ হিজড়া বলতে সমাজে অপাঙক্তেয়, অশুচি, অভিশাপ- এই ভুল দৃষ্টিভঙ্গির কারণে হিজড়া শিশু জন্মগ্রহণ করলে বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজনরা গোপন রাখেন। সমাজকে জানতে দেন না। তাই এটা কোনো সত্যিকার অর্থে সঠিক সংখ্যা নয়।
হিজড়া জনগোষ্ঠী/সম্প্রদায় এই বুর্জোয়া রাষ্ট্র এবং সমাজে সাধারণ মানুষ হিসেবে বিবেচিত হন না। তারা নিগৃহীত, অসহায়, মানবেতর, মধ্যযুগীয় জীবন-যাপন করছেন। এক অপমানজনক পেশা হিসেবে বাজারে, বাসে, রাস্তায়, দোকানে টাকা তুলে জীবন নির্বাহ করছেন। যা ভিক্ষাবৃত্তির শামিল। রাস্তাঘাটে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের শিকার হচ্ছেন।
আরো একটি পেশা তারা করেন তাহলো কোনো বাড়িতে শিশু জন্মগ্রহণ করলে সেখানে নাচ-গান করে টাকা তোলা। তাদের দাবি পূরণ না হলে জবরদস্তি করেন, গৃহকর্ত্রী বা নবজাতকের পরিবারের সাথে অশালীন আচরণ করেন, গালাগাল করেন। ফলে তাদের এই সমস্ত আচরণে মানুষ বিরক্ত হয়, এদেরকে সমাজের কীট মনে করে।
পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় নারী পণ্য, নারী পুরুষের ভোগের সামগ্রী। সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র। একারণে হিজড়াদের অধিকাংশই নারীর পোশাক-পরিচ্ছদ, সাজ-গোজ করে নারীর রূপ ধারণ করে থাকেন। হিজড়াদের মধ্যে একটি অংশ বিকৃত যৌন ব্যবসাকেও রোজগারের পথ করে নেন। বাস্তবে তাদের কোনো যৌন জীবন নেই। এখানেও তারা নিপীড়িত হন।
বাস্তবত হিজড়া জনগোষ্ঠীকে রাষ্ট্র কোনো সাধারণ জনগোষ্ঠীর আওতায় আনতে না পারার কারণেই তারা রাস্তা-ঘাটে, বাসাবাড়িতে, বাজারে, দোকানে সর্বত্র মানুষকে বিরক্ত করতে বাধ্য হন। কারণ তাদেরকে মানুষ হিসেবে, নাগরিক হিসেবে তাদের সকল প্রকার অধিকার দিতে এবং সম্মানজনক মর্যাদাপূর্ণ জীবিকা নির্বাহের ব্যবস্থা করতে রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে।
সকল ধর্মেই হিজড়াদের অভিশাপ হিসেবে দেখা হয়- তাদেরকে কীট-পতঙ্গের সাথে তুলনা করা হয়েছে। তারা হবেন না বেহেস্তবাসী বা স্বর্গবাসী। হিজড়াদের মর্ত্য-স্বর্গ কোথাও স্থান নেই। এরা ধর্মের কাছে, প্রতিক্রিয়াশীল সমাজের কাছে অপাঙক্তেয়, অশুচি। গণবিরোধী রাষ্ট্র ও সমাজ এই দৃষ্টিভঙ্গির সৃষ্টি করেছে। রাস্তা-ঘাটে তথাকথিত সভ্য সমাজের মানুষ তাদের সাথে মর্যাদাপূর্ণ আচরণের বদলে চিড়িয়াখানার প্রাণীর মতো তাদেরকে দেখে, তাদের আচরণ তামাশা হিসেবে উপভোগ করে। ফলে তারা এই সভ্য সমাজের রীতি-নীতির বিরুদ্ধে চলবেন এটাইতো স্বাভাবিক। হিজড়াদের এই অমানবিক, মধ্যযুগীয় জীবনের মধ্যে ফেলে রেখেছে রাষ্ট্র, সমাজ এবং ধর্মীয় মূল্যবোধ।
বুর্জোয়া পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি হয়েছে- ঢাকাসহ সারা দেশে নাকি নকল হিজড়ার ছড়াছড়ি। অপারেশনের মাধ্যমে নাকি হিজড়া বানিয়ে এদেরকে দিয়ে ব্যবসা করা হচ্ছে। এটা ঠিক যে হিজড়াদের নিয়ে ১টি অপরাধী চক্র গড়ে উঠেছে। এই চক্রের সাথে জড়িত কিছু হাসপাতাল-ডাক্তার- পুলিশসহ সমাজের উঁচু শ্রেণির কিছু ব্যক্তিও।
যে রাষ্ট্র ও সরকারের আমলা মন্ত্রীরা দুর্নীতিবাজ, যে রাষ্ট্রে নকল মুক্তিযোদ্ধা হওয়া যায়, মুক্তিযুদ্ধে সাহায্যকারী বিদেশীদের নকল মেডেল দেয়া হয়- সেদেশে নকল হিজড়া হবে এতে অবাক হবার কিছু নেই।
’৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পরে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পালা বদল করে আওয়ামীলীগ, বি.এন.পি, জাতীয় পার্টি ক্ষমতায় এসেছে। এই অবহেলিত, বঞ্চিত হিজড়া জনগোষ্ঠীর স্বার্থে কোনো শাসক দলই কাজ করেনি। তারা যে তিমিরে ছিলেন সে তিমিরেই রয়ে গেছেন বিগত ৪৫ বছর ধরে। বর্তমান শাসক দল আওয়ামী লীগের ‘উন্নয়নের’ জোয়ার বয়ে গেলেও হিজড়াদের গায়ে তার ছোঁয়া লাগেনি। সরকার ১০ হাজার হিজড়ার গণনা করেছে। এবং ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ হিসেবেও স্বীকৃতি দিয়েছে। এই গণনা এবং স্বীকৃতি আওয়ামী ভোটবাজী রাজনীতির স্বার্থ হাসিল করার জন্য তা বলাই বাহুল্য। যেখানে হিজড়াদের গণনাই সঠিকভাবে শাসক দল করতে পারছে না/করেনি। তাদের সম্পর্কে ধর্ম ও সমাজ থেকে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের ব্যবস্থা না নিয়ে, তাদের জন্য মর্যাদাপূর্ণ পেশার ব্যবস্থা না করে, তাদেরকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখার চলমান ব্যবস্থার অবসান না করে এই গণনা ও নতুন নাম শাসক শ্রেণি ও তার দলের ধোঁকাবাজী ছাড়া কিছু নয়।
হিজড়ারা শারীরিকভাবে পঙ্গু নন, শারীরিকভাবে সক্ষম একেকজন মানুষ তারা। বিগত ৪৫ বছরে রাষ্ট্র তাদেরকে পুনর্বাসন করেনি। সম্মানজনক কোনো কাজ দেয়নি, কাজের পরিবেশ সৃষ্টি করেনি। উপরন্তু তাদেরকে রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে চাঁদা দিতে হয়, ক্ষমতাসীন দলের কেডার-মাস্তানদের মনোরঞ্জন করে খুশী না রাখলে তারা পাড়ায় বসবাস করতে পারেন না। রাষ্ট্র তাদেরকে তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে স্বীকৃতি দিলেই কী আসে-যায়।
সাম্রাজ্যবাদ ও শাসক শ্রেণি একেক সময় তাদের পছন্দমত একেকটি বিষয় নিয়ে মাতামাতি করে। কখনো-কখনো জনগণকে তাতে যুক্ত হতে বাধ্য করে। হাসিনা সরকার ও তার মেয়ে পুতুল-এর তেমনি একটি কর্মসূচি হচ্ছে অটিজম। অটিজম নিয়ে হাসিনা সরকার ও তার মেয়ে পুতুল সরকারি বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করছে। যা কিনা মূলত উচ্চবিত্ত-মধ্যবিত্তদের মাঝেই সীমাবদ্ধ। অথচ মানবেতর জীবনে থাকা হিজড়াদের জন্য কিছুই করছে না- যারা কিনা নিপীড়িত অবহেলিত মূল জনশক্তির অংশ। তাদের এই অটিজম নিয়ে কর্মকান্ডে শ্রমিক, কৃষক ও সাধারণ জনগণের অটিষ্টিক শিশুদের ভাগ্যের কতখানি পরিবর্তন হবে সে প্রশ্ন থেকে গেলেও পুতুল ও তার আওয়ামী দালাল সাঙ্গপাঙ্গরা বরাদ্দকৃত অর্থ লুট-পাট করে খাবার আরেকটি সেক্টর খুলেছে সেটা আজ সচেতন হিজড়াসহ ব্যাপক জনগণের বোঝার বিষয়।
* পৃথিবীর সর্বত্র হিজড়া জনগোষ্ঠী রয়েছেন। একেক দেশে তাদের জীবন-যাত্রার রকমফের হলেও পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থায় তারা সব দেশেই অবহেলিত, বঞ্চিত, নিগৃহীত। যেহেতু প্রচলিত সমাজ তাদেরকে গ্রহণ করে না। তাই তারা নিজেরা আলাদা সমাজ গঠন করে বসবাস করেন। তাদের রয়েছে নিজস্ব নিয়ম-শৃঙ্খলা। তথাকথিত সভ্য সমাজে হিজড়ারা অসভ্য, মারমুখো, অশ্লীল, অশালীন, অভদ্র হলেও তাদের নিজস্ব সমাজের নিয়ম-শৃঙ্খলা রীতি-নীতি তাদেরকে মানতে হয়।
আমাদের দেশে হিজড়া জনগোষ্ঠী দলবদ্ধভাবে বসবাস করেন। দলে একজন গুরুমা থাকেন। সারা দেশে হিজড়া জনগোষ্ঠীর সংখ্যা আমাদের হাতে নেই। রাজধানী ঢাকায় ৫ গুরুর আওতায় প্রায় ১৫ হাজার হিজড়া রয়েছেন। ১ জন গুরুর অধীনে ৮/১০টি দল থাকে। দলে তাদেরকে লিঙ্গভিত্তিক নামকরণ করা হয়। যেমন- যারা শারীরিকভাবে পুরুষ, কিন্তু মানসিকভাবে নারী- তাদেরকে ডাকা হয় ‘অকুয়া’। অন্যদিকে যেসমস্ত হিজড়া মানসিকভাবে পুরুষ শারীরিকভাবে নারী- তাদেরকে ডাকা হয় ‘জেনানা’। মানুষ সৃষ্ট হিজড়াদেরকে তারা ডাকেন ‘চিন্নি’ বলে।
তারা টাকা তুলে গুরুমা’র কাছে জমা দেন। গুরুমা যেহেতু তাদেরকে লালন-পালন করে বড় করেছেন, নিরাপত্তা দিচ্ছেন তাই তাদের অর্থের অর্ধেক গুরুমাকে দিতে হয় তাদের আইন অনুযায়ী। প্রতি সপ্তাহে গুরুমার নেতৃত্বে বিচারিক সভা বসে। কোনো হিজড়া তাদের নিয়ম ভঙ্গ করলে তার শাস্তি হয়। শাস্তি তারা মাথা পেতে নেন।
এরা রাষ্ট্র ও সমাজে অপাঙক্তেয় হলেও এদের রোজগারের অর্থের ভাগ থানার এস.পি, ওসি ও পুলিশরা পেয়ে থাকে। এবং আওয়ামী লীগ তথা শাসকদলের কেডার, মাস্তান, গুণ্ডাপাণ্ডাদের ভাগ না দিয়ে বস্তিতে তারা বসবাস করতে পারেন না। এমন কি এই সমস্ত পুলিশ প্রশাসন ও কেডার মাস্তানদের যৌন সন্ত্রাসের শিকারও তারা হন।
সমাজের সকল স্তরের জনগণকে হিজড়াদের সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটাতে হবে। সমাজের সচেতন প্রগতিশীল, বিপ্লবীমনা ব্যক্তিদের তাদেরকে পরিবর্তনের সংগ্রামে এগিয়ে আসতে হবে। হিজড়া জনগোষ্ঠীর মতাদর্শের পুনর্গঠনের জন্য- সং সাজার বদলে মানুষ হিসেবে ভাবতে শেখার বিপ্লবী রূপান্তর ঘটাতে হবে। যা এই পুঁজিবাদী সমাজ এবং রাষ্ট্রের অধীনে সম্ভব নয় তা বিগত ৪৫ বছরেও প্রমাণিত হয়েছে।
হিজড়া জনগোষ্ঠীকে সম্মানজনক স্থানে নিতে পারে শুধুমাত্র কোনো বিপ্লবী সরকার এবং রাষ্ট্র। যে রাষ্ট্রে শ্রমিক-কৃষক ও মধ্যবিত্ত জনগণের উপর কোনো শোষণ নিপীড়ন বঞ্চনা থাকবে না। থাকবে না নারী হত্যা, ধর্ষণ, এসিড নিক্ষেপ, নিপীড়ন। সেই উন্নততর সমাজ ব্যবস্থার বিপ্লবী সংগ্রামে শ্রমিক-কৃষকের সাথে সচেতন হিজড়াদেরকেও এগিয়ে আসতে হবে। তাছাড়া তাদের মুক্তির কোনো উপায় নেই। 

সূত্রঃ নারী মুক্তি, মার্চ ২০১৭ সংখ্যা

Advertisements


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s