মহান সর্বহারা সাহিত্যিক কমরেড ম্যাক্সিম গোর্কি (১৬ মার্চ জন্মবার্ষিকী স্মরণে)

ম্যাক্সিম গোর্কির প্রকৃত নাম আলেকসেই ম্যাকসিমোভিচ পেশকভ। গোর্কির জন্ম রাশিয়ার নিঝনি নভগোরদ শহরে ১৮৬৮ সালের ১৬ মার্চ তারিখে। গোর্কি একটি রুশ শব্দ। এর অর্থ হলো তিক্ত। এধরনের নামের পেছনে কারণ রয়েছে। গোর্কির বাস্তব জীবন সুখময় ছিল না। গোর্কির বাবার ডাকনাম ছিল ম্যাক্সিম। গোর্কির বাবা ছিলেন রুশ দেশের একজন সাধারণ গরিব শ্রমিক। গোর্কি তার বাবাকে হারান মাত্র সাত বছর বয়সে। এর অল্পকাল পরেই তিনি মাকে হারিয়ে এতিম বালক হিসাবে মাতামহের বাড়িতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। এই পরিবারে তার দিদিমা ছিল তার প্রতি স্নেহময়ী। কিন্তু দাদা মশাইয়ের আচরণ ছিল চরম স্বেচ্ছাচারী। আবার এই পরিবারটি ছিল ক্ষয়িষ্ণু কারিগর। রুশ সমাজে যে ভাঙ্গন ও পরিবর্তন চলছিল এই পরিবারটি তারই প্রভাবে সমৃদ্ধ স্বচ্চল অবস্থা থেকে সহায় সম্বলহীন জীবন যাপনে বাধ্য হয়। শেষ পর্যন্ত তার স্নেহময়ী দিদিমাকে ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন করে চলতে হয়। পরিস্থিতির চাপে এই অনাথ এতিম গোর্কিকে নয় বছর বয়সে শ্রমিকের কাজে নামতে হয়। অর্থনৈতিক অস্বচ্ছলতার কারণে ভালভাবে লেখাপড়া করার সুযোগ তার জীবনে আসেনি। তিনি বার তের বছর বয়সে অক্ষর জ্ঞান লাভ করেন। গোর্কি লেখাপড়া শুরু করেন ১৪ বছর বয়সে। স্কুলে পড়ার উদ্দেশ্যে তিনি কাজান শহরে যান। অর্থনৈতিক কারণেই তার আর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভ করা সম্ভব হয়ে উঠে নাই। জীবিকার সন্ধানে তাকে পথে পথে ঘুরতে হয়।

বিদ্যা শিক্ষার উদ্দেশ্য নিয়ে কাজান শহরে আসলেও অর্থনৈতিক প্রয়োজনে তাকে একটি রুটির কারখানায় শ্রমিকের কাজ নিতে হয়। এর আগে তাকে নিঝনি নভগোরদ শহরে বালক অবস্থাতেই জুতার দোকানে কাজ করতে হয়েছিল। কাজানে এসে তার পরিচয় ঘটে একদল বিপ্লবীর সঙ্গে। তখন রাশিয়াতে চলছিল পরিবর্তনের ঢেউ। ১৮৫৫ সালে রাশিয়ায় ভূমিদাস প্রথা উচ্ছেদ হয়। এর ফলে কৃষক শর্ত সাপেক্ষে জমির মালিক হওয়ার সুযোগ পায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অবশ্য কৃষককে অর্থ দিয়ে জমি কিনে নিতে হয়। আবার কৃষক জমির মালিক হয়েও জমির মালিকানা নিজের হাতে ধরে রাখতে পারে না। রাশিয়ায় মুদ্রা ও বাজার ব্যবস্থা ব্যাপক সম্প্রসারিত হয়। চাষের জন্য কৃষকের হাতে প্রয়োজনীয় উপকরণ ও পুঁজি না থাকায় রাশিয়ার পুঁজিপতিদের কাছে জমি বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়। কৃষক জমিতে চাষ করে উৎপাদন খরচ তুলতে পারে না। কৃষক সমাজে ব্যাপক ভাঙ্গন শুরু হয়। কৃষক জমি বিক্রি করে শহরে কাজের সন্ধানে গিয়ে মজুরের কাজ জীবিকা হিসাবে বেছে নেয়। এইভাবে গ্রামের ভূমিহীন কৃষক শহরে এসে শ্রমিকে পরিণত হতে থাকে। রাশিয়ায় পুঁজিবাদের বিকাশের কারণে বুর্জোয়া শ্রেণী শহরে শিল্পের বিকাশ ঘটায়। সেই সময়ে অপেক্ষাকৃত অগ্রসর পশ্চিম ইউরোপ ও আমেরিকার বুর্জোয়া শ্রেণী রুশ দেশে পুঁজি লগ্নি করে শিল্প কারখানা গড়ে তোলে। এইভাবে রুশ দেশে শহরের বিস্তার শিল্প কারখানা গড়ে উঠা ও মজুর শ্রেণীর বৃদ্ধি ঘটতে থাকে।

এই সময়ে রুশ দেশ ক্ষমতায় ছিল স্বৈরতান্ত্রিক, রাজতান্ত্রিক জার সরকার। জার সরকার কুলাক ও পুঁজিপতিদের স্বার্থ রক্ষা করে চলতো। দেশের শ্রমিক কৃষক জনগণের উপর নির্মম নিষ্ঠুর শোষণ নিপীড়ন চালাতো। ফলে শ্রমিক কৃষক জনগণের স্তরে বিক্ষোভের আগুন ধূমায়িত হচ্ছিল। এই সময়েই রাশিয়ার গণতান্ত্রিক আন্দোলন বেগবান হয়ে উঠেছিল। রাশিয়াতে সন্ত্রাসবাদী নৈরাজ্যবাদী বাকুনিনপন্থী মতবাদের বিস্তার ঘটছিল। সেই সাথে সোস্যাল ডেমোক্রাটিক, রেভ্যুলেশনারি ডেমোক্রাটিক, পপুলিস্ট ইত্যাদি নানা ধারায় সংঘবদ্ধ রাজনৈতিক আন্দোলন দ্রুত একটা পরিণতির দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। শ্রমিক শ্রেণীর চূড়ান্ত মুক্তির লক্ষ্যে প্রকৃত বিপ্লবী ধারার রাজনৈতিক সংগঠনও গড়ে উঠছিল। গোর্কি নিজের শ্রেণীগত অবস্থানের কারণেই প্রথমত মার্কসবাদী বিপ্লবী সংঘের সাথে যোগ দেন। এই সময়ে তিনি মার্কস-এঙ্গেলসের লেখা পড়ে অনুপ্রাণিত হন। অবশ্য তারও আগে গোর্কির পরিচয় ঘটে উনিশ শতকের রুশ সাহিত্যের সঙ্গে। বিশেষ করে রুশ কথা সাহিত্যের তখন সৃষ্টির জোয়ার চলছিল। পুশকিন, গোগল, দস্তয়েভস্কি, ইভান তুর্গেনেভ, টলস্টয় প্রমুখের হাতে পৃথিবীর সেরা সাহিত্য রচিত হয়। সেই সময়ের রুশ কবি সাহিত্যিকদের অধিকাংশের মতো ম্যাক্সিম গোর্কির অভিজাত পারিবারিক ঐতিহ্য ছিল না। একেবারে দীন হীন শ্রমিক পরিবারেই তার জন্ম হয়েছিল এবং তিনি নিজেও ছিলেন একজন শ্রমিক।

ব্যক্তিগত জীবনে ম্যাক্সিম গোর্কি একজন শ্রমিক হলেও দুনিয়া জোড়া খ্যাতির কারণ তার সৃষ্ট বিপ্লবী সাহিত্য কর্ম। লেখক হিসাবে ম্যাক্সিম গোর্কির আবির্ভাব উনিশ শতকে। তিনি রুশ সাহিত্যের মহান ঐতিহ্য আর উত্তরাধিকারের ধারাবাহিকতার অংশ। গল্প দিয়ে তার সাহিত্য জগতে প্রবেশ। তবে এর পেছনে সাহিত্যিক হিসাবে তার খ্যাতি পাওয়ার কোন লোভ ছিল না। এই কারণেই প্রথম গল্পটি তিনি বেনামে একটি পত্রিকায় পাঠিয়েছিলেন। আর তিনি যা লিখেছিলেন তা শিল্পীর কল্পনাপ্রসূত কিছু ছিল না, ছিল নিজের যাপিত জীবনের অভিজ্ঞতা। ম্যাক্সিম গোর্কির সাহিত্য জীবনের প্রথম পর্বে আছে তার গল্প। এরপর গোর্কি উপন্যাস ও নাটক রচনা করেছেন। সাহিত্য বিষয়ক আলোচনা, সাংবাদিকতা ধর্মী অনেক লেখাও তিনি লিখেছেন। তবে তার রচিত ‘মা’ উপন্যাস তাকে বিশ্বব্যাপী পরিচিত করে দিয়েছে। ম্যাক্সিম গোর্কির জীবন দুঃখময় ও বৈচিত্র্যপূর্ণ। জীবনের অধিকাংশ সময়ে তিনি নানা ঘাত প্রতিঘাতের মধ্যো দিয়ে অতিক্রম করেছেন। জীবনের শেষ দিকে তিনি ক্ষয়রোগসহ শ্বাসযন্ত্রের নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েন। ১৯৩৬ সালের ১৮ জুন তারিখে তিনি চিকিংসারত অবস্থায় মারা যান। তার এই মৃত্যু নিয়ে সেই সময়েই প্রশ্ন ছিল। এই সময়ে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত রাশিয়াতে রাষ্ট্র ও পার্টিতে ঘাপটি মেরে থাকা প্রতিক্রিয়াশীল বুর্জোয়া শ্রেণী ও সাম্রাজ্যবাদের চরেরা বিভিন্ন ধরনের প্রতিবিপ্লবী সন্ত্রাসী অন্তর্ঘাতি তৎপরতায় লিপ্ত ছিল। তৎকালীন সোভিয়েত রাশিয়ার ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি ও রাষ্ট্রের সর্বস্তরে এর প্রভাব ছিল। এই প্রতিবিপ্লবী সন্ত্রাসী চক্রের নেতা ছিল ট্রটস্কি। এই চক্র চিকিৎসকদের দলে ভিড়িয়ে ভুল চিকিৎসা পদ্ধতি অনুসরণ করিয়ে পার্টি ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের হত্যা করতো। এই চক্র গুপ্তঘাতক দিয়ে হত্যাসহ নানাবিধ পদ্ধতি হত্যাকান্ড চালাতো। এছাড়াও এরা রাষ্ট্রের বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনার সাথে যুক্ত থেকে সেখানে ধ্বংসাত্মক তৎপরতা চালাতো। মস্কো ষড়যন্ত্র মামলার বিচার প্রক্রিয়ায় এদের চক্রান্ত সম্পূর্ণরূপে উদ্ঘাটিত হয়। ম্যাক্সিম গোর্কি এই প্রতিবিপ্লবী সন্ত্রাসী চক্রের শিকারে পরিণত হন। গোর্কিকে এই পদ্ধতিতে হত্যার কারণ হচ্ছে সাহিত্যিক হিসাবে বিশ্বব্যাপী তার প্রভাব এবং সোভিয়েত রাষ্ট্রের প্রতি তার আনুগত্য।

রুশ কথা সাহিত্যের অন্যতম উত্তরাধিকার ম্যাক্সিম গোর্কি। গণমানুষের লেখক হিসাবে তার খ্যাতি গোটা পৃথিবী জুড়ে। মেহনতি মানুষের জীবনকে গোর্কি তার সাহিত্যের অন্যতম উপকরণ হিসাবে বেছে নিয়েছিলেন। উনবিংশ শতকের শেষ দিকে এবং বিংশ শতকের শুরুর দিকে রাশিয়ার রাজনৈতিক বাতাবরণে ম্যাক্সিম গোর্কির রচিত গল্প-উপন্যাস মুক্তিকামী শ্রমজীবী মানুষের কাছে প্রেরণাদায়ক ভূমিকা পালন করে। বিশ্বের সকল দেশের সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ, ঘৃণা-ভালোবাসা, স্বপ্ন-বাস্তবতা, যন্ত্রনা, সংগ্রাম সর্বোপরি জীবনের শাশ্বত কথা পাওয়া যায় ম্যাক্সিম গোর্কির লেখায়। বাংলা সাহিত্যের পাঠকদের কাছে গোর্কির নাম এত বেশি পরিচিত যে তাকে রুশ ভাষার লেখক বলে মনে হয় না। গোর্কির মা উপন্যাসের কথা জানেন না এমন পাঠক পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ। মা উপন্যাসের জন্য ম্যাক্সিম গোর্কি বাংলাভাষীদের কাছে বিশেষভাবে পরিচিত। ম্যাক্সিম গোর্কির কোন উপন্যাসটি শ্রেষ্ঠ- তার বিচার করা আপেক্ষিক ব্যাপার। তিনি অসংখ্য উপন্যাস ও ছোট গল্প লিখেছেন। যা সারা পৃথিবী ব্যাপী পাঠকদের কাছে আজও নন্দিত, সমাদৃত। মা উপন্যাসসহ তার আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস আমার ছেলেবেলা, পৃথিবীর পথে, পৃথিবীর পাঠশালায়, এদেশের জনগণের মুক্তির সংগ্রামে নিয়োজিত কর্মীদের অবশ্যই পাঠ করা উচিত। পৃথিবীর অসংখ্য ভাষায় তার সাহিত্যকর্ম অনুদিত হয়েছে। ম্যাক্সিম গোর্কির সাহিত্য এখনো সারা বিশ্বে আগের মতোই জনপ্রিয়। গোর্কি সম্পর্কে সাহিত্য সমালোচক ও পাঠক সাধারণের দৃষ্টিভঙ্গি এবং মূল্যায়ন এক জায়গায় আটকে নেই। তার সাহিত্য নিয়ে আজ নতুন নতুন চিন্তা ভাবনা যুক্ত হচ্ছে।

শিল্প সাহিত্য শ্রেণীর উর্ধ্বে নয় এবং তা শ্রেণী বিভক্ত সমাজ ব্যবস্থায় কোন না কোন শ্রেণীর সেবা করে। ম্যাক্সিম গোর্কির সৃষ্ট সাহিত্যকর্ম সর্বহারা শ্রেণীর স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করে। তার সৃষ্ট সাহিত্য প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থায় গতানুগতিক কোন সাহিত্য নয়। তার সাহিত্যকর্ম ছিল প্রচলিত শ্রেণী বিভক্ত সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে। গতানুগতিক সাহিত্যে নিছক মানব মানবির প্রেম বিরহ ভালবাসা, প্রকৃতি নিয়ে কথামালার বিস্তার ঘটানো হয়ে থাকে। ম্যাক্সিম গোর্কির সাহিত্যকর্মে শ্রেণী বিভক্ত সমাজে বিভিন্ন শ্রেণীর অবস্থান ও তাদের মধ্যেকার কঠিন কঠোর সংগ্রামের চিত্র ফুটে উঠেছে। শ্রেণী বিভক্ত বর্তমান সমাজে শ্রমিক শ্রেণী শুধুমাত্র নিপীড়িত শ্রেণী নয়, এই শোষণমূলক সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংগ্রাম রত শ্রেণীও বটে। বুর্জোয়ার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শ্রমিক শ্রেণীই হচ্ছে নেতা। অন্যান্য শ্রেণীকে মুক্ত না করে শ্রমিক শ্রেণী তার মুক্তির লড়াইয়ে বিজয় অর্জন করতে পারে না। তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন যে, এই যুগে বুর্জোয়া শ্রেণীর ভূমিকা হচ্ছে প্রতিক্রিয়াশীল, পরজীবী শ্রেণী হিসাবে তারা শ্রমিক কৃষককে শোষণ নিপীড়ন করেই টিকে থাকে। যার প্রেক্ষিতে শ্রমিক কৃষকের জীবনে নেমে আসে চরম দুর্ভোগ। এর থেকে মুক্তি পেতে শ্রমিক কৃষককে তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক সংগঠনে সংগঠিত হতে হবে। তীব্র শ্রেণী সংগ্রামের মাধ্যমে প্রতিক্রিয়াশীলদের উচ্ছেদ করে শ্রমিক কৃষকের নিজস্ব রাষ্ট্র ও সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করতে পারলেই তাদের মুক্তি আসতে পারে। আজীবন সংগ্রামী, শ্রমিক শ্রেণী, বিশ্বের নিপীড়িত জাতি ও জনগণের অকৃত্তিম বন্ধু ম্যাক্সিম গোর্কির জন্ম দিবসে তার স্মৃতির প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা।


চারু মজুমদারের সংগৃহীত রচনা সংকলন: নকশালবাড়ীর কৃষক সংগ্রাম – তার আগেও পরে (৪র্থ পর্ব)

নকশালবাড়ীর বীর কৃষক জিন্দাবাদ

 

ভারতবর্ষে আধা-সামস্ত ও আধা-উপনিবেশিক সমাজ ব্যবস্থা রয়েছে। কাজেই এদেশের গণতান্ত্রিক বিপ্লব মানে কৃষি-বিপ্লব। ভারতবর্ষের সমস্ত সমস্যা জড়িত রয়েছে এই একটি মাত্র কাজের উপর। এই কৃষি-বিপ্লবের প্রশ্নে এই শতাব্দীর শুরু থেকেই মার্কসবাদী মহলে মতবিরোধ রয়েছে এবং মার্কসবাদীদের মধ্যে বিপ্লব ও বিপ্লব বিরোধী-এই দুটো নীতির সংগ্রাম চলেছে। মেনশেভিকরা রাষ্ট্রক্ষমতার প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়ে মীমাংসা খুঁজেছিল প্রতিনিধিত্বমূলক ব্যবস্থা (municipalisation) এর মধ্যে। লেনিন তার বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেন এবং বলেন রাষ্ট্রক্ষমতার প্রশ্নকে পাশ কাটিয়ে এই সমস্যার কোন মীমাংসা সম্ভব নয়। তিনি দেখিয়েছিলেন যে, যতো প্রগতিশীল আইনই রচিত হোক না কেন, বর্তমান রাষ্ট্র কাঠামো সে আইনকে কার্যকর করতে পারে না। কৃষকের অবস্থা একই থেকে যাবে। তাই তিনি বলেছিলেন, শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্বে শ্রমিক কৃষকের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রই একমাত্র এই সমস্যার সমাধান করতে পারে। এই তো সেদিন, এমনকি রুশ পার্টির লেখক ইউদিন (Yudin) নেহেরুর মৌলিক বক্তব্য (basic approach) সমালোচনা করতে গিয়ে বলেছিলেন যে নেহেরু আজও কৃষক সমস্যার সমাধান করতে পারেন নি এবং শান্তিপূর্ণ পথে কি করে এ সমস্যার সমাধান করা যায় তা তিনি করে দেখান; এবং নেহেরু তা পারবে না। ইতিহাস প্রমাণ করেছে যে নেহেরু এই সমস্যার সমাধান তো দূরের কথা, বিন্দুমাত্র পরিবর্তন করতেও পারেন নি।

সোভিয়েত পার্টির বিংশ কংগ্রেসের পর সংশোধনবাদের যে দরজা খুলে দেওয়া হল, যার ফলে আজকে সোভিয়েত রাষ্ট্র একটা সমাজবাদী রাষ্ট্র থেকে ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হয়েছে, সেই বিংশ কংগ্রেসের শান্তিপূর্ণ পথে সমাজতন্ত্রে উত্তরণের যে থিওরি দেওয়া হয়েছে, তাকেই মূলমন্ত্র করে আমাদের দেশের সংশোধনবাদীরা তারস্বরে চিৎকার করছে যে কৃষকের জমির সংগ্রাম একটা অর্থনৈতিক দাবীর সংগ্রাম এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের কতা বলা হঠকারিতা। কী অদ্ভুত মিল ডাঙ্গে আর বাসব পুন্নায়ার কথায়। কী অদ্ভূত সহযোগিতা বিশ্বনাথ মুখার্জী এবং হরেকৃষ্ণ কোঙারের। এ ঘটনা আকস্মিক নয়, কারণ এর উৎস এক এবং সেটা হল মেনশেভিক বিপ্লব বিরোধী মহবাদ। তাই তো সোভিয়েত রাষ্ট্র ধূরন্ধরেরা বারবার ঘোষণা করছে যে ভারতবর্ষের খাদ্য সমস্যা সমাধান করা যায় কেবলমাত্র উন্নত বীজ আর চাষের উন্নত সাজ সরঞ্জাম দিয়েই। এই ভাবেই তারা ভারতবর্ষের প্রতিক্রিয়াশীল শাসক গোষ্ঠীকে বাঁচাতে এগিয়ে আসছে, জনতার চোখ থেকে ভারতবর্ষের খাদ্য, বেকারী, দারিদ্র প্রভৃতি সমস্যা সমাধানের মূল কার্যকরী পথ আড়াল করে রাখছে। কারণ ঐ সোভিয়েত রাষ্ট্র যে আজ বৃটিশ আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদীদের সাথে মিলিত হয়ে ভারতবর্ষের জনসাধারণের শোষক রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। তারাও যে আমাদের দেশে পুঁজি খাটানোর চেষ্টা করছে দেশীয় ধনিকশ্রেণীর সহায়তায়! তারাও ব্যবসা-বাণিজ্য প্রভৃতি ক্ষেত্রে সুবিধাভোগী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। তাইতো তাদের মুখ দিয়ে প্রতিক্রিয়াশীল শাসক গোষ্ঠীর যুক্তি বেরিয়ে আসছে অনর্গল স্রোতে, নির্দ্ধারিত বেগে। তাই তো বৃটিশ-মার্কিন সহযোগী হিসাবে সোভিয়েত রাষ্ট্রও আমাদের শত্রু এবং এদেরই পক্ষপূটে আশ্রয় নিয়ে ভারতবর্ষের প্রতিক্রিয়াশীল সরকার জনতার কাঁধে মৃতের বোঝা হয়ে টিকে আছে।

কিন্তু তবুও নকশালবাড়ী ঘটেছে এবং ভারতবর্ষে শত শত নকশালবাড়ী ধূমায়িত হচ্ছে। কারণ ভারতবর্ষের মাটিতে বিপ্লবী কৃষকশ্রেণী যে মহান তেলেঙ্গানার বীর বিপ্লবী কৃষকের উত্তরসূরী!  তেলেঙ্গানার বীর কৃষকদের সংগ্রামে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল তদানীন্তন পার্টি নেতৃত্ব এবং বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল মহান স্তালিনের নাম করে। আজকে যাঁরা পার্টির নেতা হয়ে বসে আছেন তাদের অনেকেই তো সেদিনকার বিশ্বাসঘাতকতার অংশীদার। তেলেঙ্গানার সেই বীরদের কাছে আমাদের নতজানু হয়ে শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে শুধু বিদ্রোহের লাল পতাকা বহন করার শক্তির জন্যই নয়, তাঁদের কাছ থেকে শিখতে হবে আন্তর্জাতিক বিপ্লবী কর্ত্তৃত্বের প্রতি বিশ্বস্ততার জন্যও। কী অসীম শ্রদ্ধা তাঁদের ছিল আন্তর্জাতিক নেতৃত্বের প্রতি, কমরেড স্তালিনের নানে তাঁরা নির্ভয়ে নিজেদের জীবন তুলে দিয়েছিলেন ভারতবর্ষের প্রতিক্রিয়াশীল সরকারের হাতে। এই বিপ্লবী বিশ্বস্ততা সব যুগে সব কালে প্রয়োজন বিপ্লব সংগঠিত করতে। তেলেঙ্গানার বীরদের অভিজ্ঞতা থেকে আমাদের শিখতে হবে-যারা স্তালিনের নাম নিয়ে মার্কসবাদ-লেনিনবাদের বিরোধিতা করে তাদের মুখোশ খুলে দিতে হবে। তাদের হাত থেকে ছিনিয়ে নিতে হবে শত শত শ্রমিক ও কৃষকের রক্তে রঞ্চিত লাল পতাকা, তারা ঐ পতাকাকে কলঙ্কিত করেছে তাদের বিশ্বাসঘাতক হাতের স্পর্শে।

নকশালবাড়ী বেঁচে আছে এবং বেঁচে থাকবে। কারণ এ যে অজেয় মাকর্সবাদ লেনিনবাদ-মাও সেতুঙ বিচারধারার উপর প্রতিষ্ঠিত। আমরা জানি সামনে আছে অনেক বাধা, অনেক বিপত্তি, অনেক বিশ্বাসঘাতকতা, অনেক বিপর্য্যয়, কিন্তু তবু নকশালবাড়ী মরবে না, কারণ চেয়ারম্যান মাও সেতুঙ-এর উজ্জল সূর্যালোকের আর্শীবাদ এসে পড়েছে। যখন মালয়ের রবার বন থেকে ২০ বছর ধরে সংগ্রামরত বীররা অভিননন্দন জানান নকশালবাড়ীকে, যখন নিজেদের পার্টির সংশোধনবাদী নেতৃত্বের বিরুদ্ধে সংগ্রামরত জাপানী কমরেডরা অভিনন্দন জানান, যখন তা আসে অষ্ট্রেলিয়ার বিপ্লবীদের তরফ থেকে, যখন মহান চীনের সৈন্যবাহিনীর কমরেডরা অভিনন্দন জানান, তখন অনুভব করি: দুনিয়ার শ্রমিক এক হও-এই অমর বাণীর তাৎপর্যে, তখন একাত্মতা অনুভব করি, দেশে দেশে আমাদের পরম আত্মীয়দের জন্য বিশ্বাস দৃঢ় হয়। নকাশালবাড়ী মরে নি, আর নকশালবাড়ী কোনদিন মরবে না।

শারদীয়া দেশব্রতী১৯৬৭