চারু মজুমদারের সংগৃহীত রচনা সংকলন: নকশালবাড়ীর কৃষক সংগ্রাম – তার আগেও পরে (৪র্থ পর্ব)

নকশালবাড়ীর বীর কৃষক জিন্দাবাদ

 

ভারতবর্ষে আধা-সামস্ত ও আধা-উপনিবেশিক সমাজ ব্যবস্থা রয়েছে। কাজেই এদেশের গণতান্ত্রিক বিপ্লব মানে কৃষি-বিপ্লব। ভারতবর্ষের সমস্ত সমস্যা জড়িত রয়েছে এই একটি মাত্র কাজের উপর। এই কৃষি-বিপ্লবের প্রশ্নে এই শতাব্দীর শুরু থেকেই মার্কসবাদী মহলে মতবিরোধ রয়েছে এবং মার্কসবাদীদের মধ্যে বিপ্লব ও বিপ্লব বিরোধী-এই দুটো নীতির সংগ্রাম চলেছে। মেনশেভিকরা রাষ্ট্রক্ষমতার প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়ে মীমাংসা খুঁজেছিল প্রতিনিধিত্বমূলক ব্যবস্থা (municipalisation) এর মধ্যে। লেনিন তার বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেন এবং বলেন রাষ্ট্রক্ষমতার প্রশ্নকে পাশ কাটিয়ে এই সমস্যার কোন মীমাংসা সম্ভব নয়। তিনি দেখিয়েছিলেন যে, যতো প্রগতিশীল আইনই রচিত হোক না কেন, বর্তমান রাষ্ট্র কাঠামো সে আইনকে কার্যকর করতে পারে না। কৃষকের অবস্থা একই থেকে যাবে। তাই তিনি বলেছিলেন, শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্বে শ্রমিক কৃষকের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রই একমাত্র এই সমস্যার সমাধান করতে পারে। এই তো সেদিন, এমনকি রুশ পার্টির লেখক ইউদিন (Yudin) নেহেরুর মৌলিক বক্তব্য (basic approach) সমালোচনা করতে গিয়ে বলেছিলেন যে নেহেরু আজও কৃষক সমস্যার সমাধান করতে পারেন নি এবং শান্তিপূর্ণ পথে কি করে এ সমস্যার সমাধান করা যায় তা তিনি করে দেখান; এবং নেহেরু তা পারবে না। ইতিহাস প্রমাণ করেছে যে নেহেরু এই সমস্যার সমাধান তো দূরের কথা, বিন্দুমাত্র পরিবর্তন করতেও পারেন নি।

সোভিয়েত পার্টির বিংশ কংগ্রেসের পর সংশোধনবাদের যে দরজা খুলে দেওয়া হল, যার ফলে আজকে সোভিয়েত রাষ্ট্র একটা সমাজবাদী রাষ্ট্র থেকে ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হয়েছে, সেই বিংশ কংগ্রেসের শান্তিপূর্ণ পথে সমাজতন্ত্রে উত্তরণের যে থিওরি দেওয়া হয়েছে, তাকেই মূলমন্ত্র করে আমাদের দেশের সংশোধনবাদীরা তারস্বরে চিৎকার করছে যে কৃষকের জমির সংগ্রাম একটা অর্থনৈতিক দাবীর সংগ্রাম এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের কতা বলা হঠকারিতা। কী অদ্ভুত মিল ডাঙ্গে আর বাসব পুন্নায়ার কথায়। কী অদ্ভূত সহযোগিতা বিশ্বনাথ মুখার্জী এবং হরেকৃষ্ণ কোঙারের। এ ঘটনা আকস্মিক নয়, কারণ এর উৎস এক এবং সেটা হল মেনশেভিক বিপ্লব বিরোধী মহবাদ। তাই তো সোভিয়েত রাষ্ট্র ধূরন্ধরেরা বারবার ঘোষণা করছে যে ভারতবর্ষের খাদ্য সমস্যা সমাধান করা যায় কেবলমাত্র উন্নত বীজ আর চাষের উন্নত সাজ সরঞ্জাম দিয়েই। এই ভাবেই তারা ভারতবর্ষের প্রতিক্রিয়াশীল শাসক গোষ্ঠীকে বাঁচাতে এগিয়ে আসছে, জনতার চোখ থেকে ভারতবর্ষের খাদ্য, বেকারী, দারিদ্র প্রভৃতি সমস্যা সমাধানের মূল কার্যকরী পথ আড়াল করে রাখছে। কারণ ঐ সোভিয়েত রাষ্ট্র যে আজ বৃটিশ আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদীদের সাথে মিলিত হয়ে ভারতবর্ষের জনসাধারণের শোষক রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। তারাও যে আমাদের দেশে পুঁজি খাটানোর চেষ্টা করছে দেশীয় ধনিকশ্রেণীর সহায়তায়! তারাও ব্যবসা-বাণিজ্য প্রভৃতি ক্ষেত্রে সুবিধাভোগী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। তাইতো তাদের মুখ দিয়ে প্রতিক্রিয়াশীল শাসক গোষ্ঠীর যুক্তি বেরিয়ে আসছে অনর্গল স্রোতে, নির্দ্ধারিত বেগে। তাই তো বৃটিশ-মার্কিন সহযোগী হিসাবে সোভিয়েত রাষ্ট্রও আমাদের শত্রু এবং এদেরই পক্ষপূটে আশ্রয় নিয়ে ভারতবর্ষের প্রতিক্রিয়াশীল সরকার জনতার কাঁধে মৃতের বোঝা হয়ে টিকে আছে।

কিন্তু তবুও নকশালবাড়ী ঘটেছে এবং ভারতবর্ষে শত শত নকশালবাড়ী ধূমায়িত হচ্ছে। কারণ ভারতবর্ষের মাটিতে বিপ্লবী কৃষকশ্রেণী যে মহান তেলেঙ্গানার বীর বিপ্লবী কৃষকের উত্তরসূরী!  তেলেঙ্গানার বীর কৃষকদের সংগ্রামে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল তদানীন্তন পার্টি নেতৃত্ব এবং বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল মহান স্তালিনের নাম করে। আজকে যাঁরা পার্টির নেতা হয়ে বসে আছেন তাদের অনেকেই তো সেদিনকার বিশ্বাসঘাতকতার অংশীদার। তেলেঙ্গানার সেই বীরদের কাছে আমাদের নতজানু হয়ে শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে শুধু বিদ্রোহের লাল পতাকা বহন করার শক্তির জন্যই নয়, তাঁদের কাছ থেকে শিখতে হবে আন্তর্জাতিক বিপ্লবী কর্ত্তৃত্বের প্রতি বিশ্বস্ততার জন্যও। কী অসীম শ্রদ্ধা তাঁদের ছিল আন্তর্জাতিক নেতৃত্বের প্রতি, কমরেড স্তালিনের নানে তাঁরা নির্ভয়ে নিজেদের জীবন তুলে দিয়েছিলেন ভারতবর্ষের প্রতিক্রিয়াশীল সরকারের হাতে। এই বিপ্লবী বিশ্বস্ততা সব যুগে সব কালে প্রয়োজন বিপ্লব সংগঠিত করতে। তেলেঙ্গানার বীরদের অভিজ্ঞতা থেকে আমাদের শিখতে হবে-যারা স্তালিনের নাম নিয়ে মার্কসবাদ-লেনিনবাদের বিরোধিতা করে তাদের মুখোশ খুলে দিতে হবে। তাদের হাত থেকে ছিনিয়ে নিতে হবে শত শত শ্রমিক ও কৃষকের রক্তে রঞ্চিত লাল পতাকা, তারা ঐ পতাকাকে কলঙ্কিত করেছে তাদের বিশ্বাসঘাতক হাতের স্পর্শে।

নকশালবাড়ী বেঁচে আছে এবং বেঁচে থাকবে। কারণ এ যে অজেয় মাকর্সবাদ লেনিনবাদ-মাও সেতুঙ বিচারধারার উপর প্রতিষ্ঠিত। আমরা জানি সামনে আছে অনেক বাধা, অনেক বিপত্তি, অনেক বিশ্বাসঘাতকতা, অনেক বিপর্য্যয়, কিন্তু তবু নকশালবাড়ী মরবে না, কারণ চেয়ারম্যান মাও সেতুঙ-এর উজ্জল সূর্যালোকের আর্শীবাদ এসে পড়েছে। যখন মালয়ের রবার বন থেকে ২০ বছর ধরে সংগ্রামরত বীররা অভিননন্দন জানান নকশালবাড়ীকে, যখন নিজেদের পার্টির সংশোধনবাদী নেতৃত্বের বিরুদ্ধে সংগ্রামরত জাপানী কমরেডরা অভিনন্দন জানান, যখন তা আসে অষ্ট্রেলিয়ার বিপ্লবীদের তরফ থেকে, যখন মহান চীনের সৈন্যবাহিনীর কমরেডরা অভিনন্দন জানান, তখন অনুভব করি: দুনিয়ার শ্রমিক এক হও-এই অমর বাণীর তাৎপর্যে, তখন একাত্মতা অনুভব করি, দেশে দেশে আমাদের পরম আত্মীয়দের জন্য বিশ্বাস দৃঢ় হয়। নকাশালবাড়ী মরে নি, আর নকশালবাড়ী কোনদিন মরবে না।

শারদীয়া দেশব্রতী১৯৬৭

 

Advertisements


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s