মাওবাদী হিসেবে অভিযুক্ত কারামুক্ত ভারতীয় সাংবাদিকের লড়াই অব্যাহত রাখার প্রত্যয়

দেড় বছর পর মুক্তি পাওয়া সাংবাদিক সন্তোষ যাদব। মার্চ ১২, ২০১৭। [সন্তোষ যাদবের সৌজন্যে]

সাংবাদিক সন্তোষ যাদবের মতে মধ্যভারতের বামপন্থী মাওবাদী গেরিলা অধ্যুষিত অঞ্চলে পুলিশি নিষ্ঠুরতার বিপক্ষে লেখার জন্যই তাঁকে বন্দী ও নির্যাতন করা হয়েছিল।

প্রায় দেড় বছর কারাবাসের পর গত সপ্তায় জগদলপুর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মাওবাদী অধ্যুষিত ছত্রিশগড়ের ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক সন্তোষ যাদব মুক্তি পান। ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে তাঁকে মাওবাদী সমর্থক অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়।

মধ্য ও পূর্ব ভারতের বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকা ও বনাঞ্চলে ঘাঁটি করে ১৯৬০ সাল থেকে মাওবাদীরা ভারতীয় নিরাপত্তা রক্ষীদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র আন্দোলন চালিয়ে আসছে। মাওবাদীরা নকশাল হিসেবেও পরিচিত।

চীন বিপ্লবের নেতা মাও সেতুং এর অনুসারী এই বামপন্থীদের দাবি, তারা বনাঞ্চল থেকে সরকার কর্তৃক উচ্ছেদ হওয়া দরিদ্র এবং ভূমিহীন জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।

২০১৪ সালে হিন্দু জাতীয়তাবাদী বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ছত্রিশগড়ের অন্তত অর্ধ ডজন সাংবাদিককে হয় গ্রেপ্তার, না হয় এলাকা ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে। সন্তোষ তাঁদের মধ্যে একজন।

সন্তোষের মতে, ছত্রিশগড় সাংবাদিকদের জন্য একটা উভয় সঙ্কটের স্থান।

“যারা মাওবাদী সংশ্লিষ্ট বিষয়ে নিরপেক্ষভাবে লেখে, যা অনেক ক্ষেত্রেই হয় পুলিশি নির্যাতন ও হত্যার ঘটনা, তাঁদেরকে পুলিশও প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখে,” বেনারেক বলেন সন্তোষ।

সন্তোষের আইনজীবী অরবিন্দ চৌধুরীর মতে তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যে অভিযোগ আনা হয়েছিল।

“পুলিশ বলছে যে তারা সন্তোষকে একটি অভিযানের সময় মাওবাদীদের সাথে দেখেছে। একজন কর্মকর্তা বলেছেন অন্ধকার রাতে ফ্লাশ লাইট জ্বালিয়ে তিনি সন্তোষকে দেখে চিনতে পারেন। অথচ সেই কর্মকর্তাই কিন্তু তাঁকে অন্যান্যদের মধ্যে দেখে চিহ্নিত করতে পারেননি,” বেনারকে বলেন এই আইনজীবী।

তবে বিষয়টি এখন আদালতের এখতিয়ারে রয়েছে বলে ছত্রিশগড়ের দুজন উচ্চ পদস্থ পুলিশ কর্মকর্তার কেউ সন্তোষ যাদবের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

সাক্ষাৎকার

মুক্তির পর সন্তোষ যাদব বেনারের সাথে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেন। কথোপকথনের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য অংশ:

প্রশ্নঃ আপনাকে কেন গ্রেপ্তার করা হয়েছিল?

সন্তোষ যাদব: আমি সংবাদ পেয়েছিলাম যে, পুলিশ কয়েকজন আদিবাসীকে পাশের একটি গ্রাম থেকে ধরে নিয়ে গেছে। তখন আমি তাঁদের পরিবারের সাথে কথা বলার জন্য সেখানে যাই। পরে পরিবার সদস্যদের অনুরোধে গ্রেপ্তারের বিষয়ে জানতে আমি তাঁদের সাথে স্থানীয় পুলিশ স্টেশনে যাই। সেখানে পুলিশ দাবি করে যে, গ্রেপ্তারকৃতরা মাওবাদী এবং তাঁরা পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, তারা ছিল নিরীহ গ্রামবাসী। আমি পুলিশকে এই বিষয়গুলো নিয়ে প্রশ্ন করায় পুলিশ আমাকে সন্ত্রাসে মদদ দেওয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার করে।

প্রশ্নঃ আপনি কখন আপনার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো জানতে পারেন?

সন্তোষ যাদব: অনেক পরে। আটক করার কয়েকদিন পর আমাকে জানানো হয় যে, মাওবাদীদের সাথে সম্পৃক্ততার অভিযোগে আমাকে আটক করা হয়েছে। আমি নাকি অভিযানের সময় মাওবাদীদের সাথে ছিলাম। সত্য হলো সেদিন আমি ওই এলাকাতেই ছিলাম না।

প্রশ্নঃ গ্রেপ্তারের পর কী ঘটেছিল?

সন্তোষ যাদব: আমাকে জগদলপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখা হয়েছিল। সেখানে প্রায় প্রতিদিনই অমানবিকভাবে মারধর ও নির্যাতন করা হতো। সেখানে জীবন যাপনের ব্যবস্থা ছিল দুর্বিসহ। অখাদ্য খাবার খেয়ে আমাকে সেখানে থাকতে হতো। যতদিন পারা যায় সহ্য করে আমি প্রতিবাদ করার সিদ্ধান্ত নেই। কিন্তু জেলখানার নিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা মানে, বাড়তি আরো কিছু নির্যাতন ডেকে আনা ছাড়া আর কিছু না।

প্রশ্নঃ আপনার গ্রেপ্তারে আপনার পরিবারের প্রতিক্রিয়া কী ছিল?

সন্তোষ যাদব: আমার তিন মেয়ে। আট বছরের দিব্য, চার বছরের ইসমেয়া এবং আমার গ্রেপ্তারের সময় ছোটটির বয়স ছিল মাত্র এক মাস। আমার স্ত্রী পুনম মাতৃসেবা ও পরিচর্যার কাজ করে। আমার বাবা একজন পিয়ন। আমার ছোট মেয়েটার নাম রাখার আগেই আমি গ্রেপ্তার হয়ে যাই। আমার স্ত্রী আমি মুক্তি পাবার আগ পর্যন্ত মেয়েটির নাম রাখতে চায়নি। আমরা এখনো তার নাম ঠিক করিনি। আমার পরিবার সব সময় আমার পেছনে একটি বিশাল সমর্থন হিসেবে ছিল, তারা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার পক্ষে প্রচুর কাজ করেছে।

প্রশ্নঃ আপনার পরবর্তী পরিকল্পনা কী?

সন্তোষ যাদব: আমি ছত্রিশগড় থেকেই সংবাদ প্রচার অব্যাহত রাখব। এই ঘটনা আমাকে আমার কাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারবে না। আমি নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা অব্যাহত রাখব। মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়গুলো যেমন বন্ধ হওয়া দরকার, তেমনি কাউকে না কাউকে তো ভারতের অভ্যন্তরীণ যুদ্ধে সব চেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামীণ এবং আদিবাসী মানুষদের মুখপাত্র হিসাবে কথা বলতেই হবে।

 

এক নজরে সন্তোষ যাদব

নবভারত এবং দৈনিক ছত্তিশগড়ের পূর্বতন কর্মী। সশস্ত্র সংগঠন, ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি (মাওবাদি) নামক নিষিদ্ধ গোষ্ঠির সদস্য হিসাবে অভিযুক্ত। ইউ,এ,পি,এ এবং সি,এস,পি,এস,এ ধারাগুলিতে অভিযুক্ত। দোষী সাব্যস্ত হলে ১০বছরের সাজা।

বাস্তার জেলার দারবা নামক ছোট্ট একটি জনপদে সন্তোষ যাদবের জন্ম এবং বেড়ে ওঠা। স্কুলে পড়ার সময় তার ইচ্ছে ছিল বড় হয়ে পুলিশ অফিসার হবার। কিন্তু হয়ে গেলেন সাংবাদিক। নিজের এলাকায় মাওবাদি সংগঠন এবং পুলিশি অত্যাচারের খবর বাইরের জগতের কাছে পৌছে দেওয়াই তার মুখ্য কাজ। নবভারত এবং দৈনিক ছত্তিশগড় নামক জাতীয় এবং স্থানীয় সংবাদপত্রের সংবাদ পরিবেশক। কিন্তু রাষ্ট্রের সপক্ষে সংবাদ পরিবেশন করতে না চাওয়ার কারণে তাকে গ্রেফতার করা হয়।

২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে দরবা জঙ্গলের ভেতর মাওবাদি দমনের নামে বদ্রিমাহু গ্রামের ৫জন আদিবাসীকে রাজ্য পুলিশ গ্রেফতার করে। গ্রামবাসীদের বক্তব্য তাদের মিথ্যা মামলায় ফাসানো হয়েছে। সন্তোষ যাদব বদ্রিমাহু থেকে শুধু এই ঘটনার বিবরণ পাঠিয়েই ক্ষান্ত হননি, আদিবাসীদের জগদলপুরের আইনি সহায়তা কেন্দ্রের সাথেও যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছেন, যাতে তারা আদালতে এই গ্রেফতারির বিরোধিতা করতে পারে।

রাজ্য পুলিশের হাতে আদিবাসীদের এই নিগ্রহ সন্তোষ যাদবের সংবাদের ফলে সকলের দৃষ্টিগোচর হয়। ফলে এর কয়েকদিনের মধ্যেই পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের কারণ হিসাবে বলা হয়, ২৯শে সেপ্টেম্বর প্রতিরক্ষা বাহিনীর ওপর সশস্ত্র মাওবাদী নাশকতায় তিনি যুক্ত ছিলেন এবং সন্ত্রাস ও অপরাধ মূলক ষড়যন্ত্রে যুক্ত ছিলেন। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে খুন এবং নিষিদ্ধ মাওবাদী সংগঠন, ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি (মাওবাদি), এর সক্রিয় সদস্য হওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে ছত্তিশগড় জনসুরক্ষা আইন এবং ইউ এ পি এ ধারায় চার্জ গঠণ করা হয়েছে। এই দুটো আইনই আন্তর্জাতিক মানবিধিকার রক্ষা বিধি ও আরও অনেক আইনের পরিপন্থী। অভিযোগ প্রমাণে ১০ বছর জেল হওয়ার সম্ভাবনা।

তার পত্নী পুনম যাদব অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এর ভারতীয় শাখাকে জানান,” ওর কাজের জন্য ওকে নানারকম ভাবে ভয় দেখানো হত। আমি ওকে অনেক সাবধান করেছি, এমনকি এই কাজ ছেড়ে অন্য কোথাও কাজ খুজতেও বলেছি। কিন্তু ও বোলতো, আমি অন্যকে সাহায্য করছি, আমি কাউকে ভয় পাইনা। পুলিশ ওকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়েছে।“

সন্তোষ যাদবের আইনজীবী, ঈষা খান্ডেলয়াল, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ভারতীয় শাখাকে জানান যে, সন্তোষ যাদবকে পুলিশ মনগড়া কারণে গ্রেফতার করেছে। সাংবাদিককে লক্ষ্যবস্তু বানানোর কারণ তার পাঠানো সংবাদে আদিবাসীদের ওপর পুলিশি অত্যাচারের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা জনসমক্ষে প্রকাশিত হয়ে পড়ছিল। তিনি এও বলেন, “ ২০১৩ সাল থেকে পুলিশ ওকে উত্তক্ত করছে। একবারতো পুলিশ তাকে নিজেদের হেফাজতে নিয়ে উলঙ্গ করে অপমানিত করে। ওকে পুলিশি চর বানানোর অনেক চেষ্টা করা হয়েছে।“

“তার একটাই অপরাধ, সে সাংবাদিকতার কাজকে ছাপিয়ে গ্রামবাসীদের আইনি সহায়তা পেতে সাহায্য করেছে। বাস্তারের পুলিশ চায়, সাংবাদিকরা কেবলমাত্র তাদের হয়েই কথা বোলবে। সন্তোষ যাদব দুদিকের কথাই তার লেখায় প্রকাশ করতো।“ ন্যাশনাল ডেলি পত্রিকার সাংবাদিক, রাজকুমার সোনি, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ভারতীয় শাখাকে বলেন, “ পুলিশের বোঝা উচিৎ যে, উভয়পক্ষের কথাই বলা সাংবাদিকের কাজ। মাওবাদীদের সাথে কথা বলেছে বলেই একজন সাংবাদিক মাওবাদী হয়ে যায়না।”

তিনি আরও বলেন, “ আপনি কোনো ঘটনার বিষয় পুলিশের কাছে জানতে চাইলে, পুলিশ বলবে, আপনি দেশদ্রোহী তাই আপনাকে কোনো তথ্য দেওয়া যাবেনা। বাস্তারে মাওবাদীদের সাথে আপনি সাংবাদিক হিসাবে কালেভদ্রে একবার কথা বলতে পারবেন ঠিক যেমন মুম্বাইয়ের সাংবাদিকরা সেখানকার শিল্পপতি, রাজনীতিবিদ বা পুলিশ আধিকারিকের সাথে কথা বলেন কোনো ঘটনার বিষয় তাদের মতামত জানার জন্য। এমন কোনো আইন আছে কি যে সাংবাদিকরা মাওবাদীদের বক্তব্য প্রকাশ করতে পারবে না !”

 



Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.