গার্মেন্টস আন্দোলনঃ শ্রমিকদের বিপ্লবকে আঁকড়ে ধরতে হবে

সাম্প্রতিককালে আবারও গার্মেন্টস শ্রমিকরা মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলনে নেমেছিলেন। উল্লেখ্য, গার্মেন্টস শ্রমিকদের প্রায় ৮০ ভাগই হচ্ছেন নারী শ্রমিক। সাভারের আশুলিয়ায় এ আন্দোলনের সূচনা হলেও দ্রুতই শ্রমিকদের এ প্রাণের দাবিতে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন গার্মেন্টস এলাকায়ও তারা এ আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। তাদের মূল দাবিগুলোর মধ্যে প্রধান দাবি ছিল মূল মজুরি ১০ হাজার টাকাসহ মোট মজুরি ১৬ হাজার টাকা করতে হবে। বর্তমানে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির পরিস্থিতিতে তাদের এই ন্যায্য দাবিকে শুরু থেকেই গার্মেন্টস মালিকপক্ষ মেনে নিতে অস্বীকার করে। আন্দোলন দমনে একদিকে চক্রান্ত করতে থাকে, অন্যদিকে শ্রমিকদেরকে নানারকম ভয়ভীতি দেখাতে থাকে, হুমকি দিতে থাকে। কিন্তু শ্রমিকরা তাদের ন্যায্য আন্দোলন আরো জোরদারভাবে এগিয়ে নিতে থাকেন। দেশের প্রগতিশীল ও বিপ্লবী জনগোষ্ঠীও এ আন্দোলনকে সমর্থন করেন। এদের কোনো কোনো সংগঠন সরাসরি মাঠে শ্রমিকদের আন্দোলনে শামিল হয়। মালিকরা ঘাবড়ে যায়। এমনি পরিস্থিতিতে মালিকরা এবং তাদের সংগঠন বিজিএমইএ হাসিনা সরকারের মদদে শ্রমিকদের বিরুদ্ধে ফ্যাসিবাদী দমন নামিয়ে আনে। একইসাথে তারা এ আন্দোলনকে “ষড়যন্ত্র” বলে। একপর্যায়ে শ্রমিকদেরকে না খাইয়ে মারার ষড়যন্ত্রে তারা অনির্দিষ্টকালের জন্য গার্মেন্টস বন্ধ করে দেয়। বড় ধনীদের হাসিনা সরকারও শ্রমিকদের বিরুদ্ধে মালিকদের পক্ষ নিয়ে এ আন্দোলনকে গার্মেন্টস শিল্পের বিরুদ্ধে, উন্নয়নের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বলে দমনে নামে। তারা বলে যে, এটা হলো বহিরাগতদের কাজ। একইসাথে তারা আন্দোলনের নেতৃত্বকারী গার্মেন্টস শ্রমিকসহ বেশকিছু শ্রমিককে ছাঁটাই করে। এমনকি তারা যাতে অন্য কোনো গার্মেন্টসে কাজ নিতে না পারেন সে চক্রান্তেও নামে। মালিক-সরকার ফ্যাসিবাদী ঔদ্ধত্যের সঙ্গে বলে যে কোনোরকম মজুরি বাড়ানো হবে না। এ ধরনের চরম শ্রমিকবিরোধী অপতৎপরতার ফলে আন্দোলন থিতিয়ে এলে এক পর্যায়ে গার্মেন্টস খুলে দেয়া হয়।

শ্রমিক তথা শ্রমিক আন্দোলন সম্পর্কে মালিক ও শাসকশ্রেণির এই আচরণ নতুন নয়। যখনই শ্রমিকরা অস্তিত্বের জন্য, বেঁচে থাকার জন্য আন্দোলন করেছেন তখনই এরা একজোট হয়ে রাষ্টযন্ত্রকে ব্যবহার করে দমনে নেমেছে। এমনকি একে গার্মেন্টস শিল্প ধ্বংসের ষড়যন্ত্র বলেছে, বহিরাগতদের তৎপরতা বলে আখ্যায়িত করেছে। ইতিহাসে এটা দেশভেদে বারবারই দেখা গেছে, দেখা যায়। ইতিহাসের এই বাস্তবতা অত্যন্ত সঠিকভাবেই মূল্যায়ন করেছে যে, উভয়পক্ষের স্বার্থ সম্পূর্ণই হচ্ছে দুটি বিপরীত শ্রেণিস্বার্থ। শ্রমিক তার একমাত্র সম্পদ শ্রম বিক্রি করে বেঁচে থাকার জন্য। বিপরীতে মালিকপক্ষ এই শ্রমিকদের শোষণ করে সীমাহীন মুনাফা বাড়িয়ে চলার জন্য। এটা পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী শোষণমূলক ব্যবস্থার নিয়ম। এখানে পারতপক্ষে মালিকরা শ্রমিকদের মজুরি, সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করতে তথা মৌলিক অধিকার দিতে নারাজ। কিন্তু শ্রমিকদেরও এসবের জন্য আন্দোলন ছাড়া উপায় নেই। তাদের তা করতেই হবে, তারা তা করবেনও। কিন্তু শ্রমিকদের এই শোষণমূলক ব্যবস্থায় আন্দোলন করে দফায় দফায় মজুরি বাড়িয়েও মানবেতর জীবন কোনো সমাধান নয়। তাদেরকে এই শ্রম-দাসত্বের দুঃসহ জীবন থেকে মুক্তির জন্য শোষণমূলক এই সমাজব্যবস্থাকে পুরোপুরি বদলে ফেলতে হবে। এজন্য তাদেরকে শাসকশ্রেণির হাত থেকে রাষ্ট্রক্ষমতা নিজেদের হাতে নিতে হবে। এ এক বিপ্লবী দায়িত্ব। একে প্রধান কাজ হিসেবে নিতে হবে। নিজেদেরকে বিপ্লবী রাজনীতিতে শিক্ষিত ও সজ্জিত করতে হবে। পাশাপাশি দাবি-দাওয়ার আন্দোলনকে পরিকল্পিতভাবে, সংগঠিতভাবে ও জোরদারভাবে চালিয়ে যেতে হবে। 

সূত্রঃ নারী মুক্তি, মার্চ ২০১৭ সংখ্যা

 

Advertisements


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s